রোদ পড়ে গেছে সুলতানা - শৌভিক নস্কর

রোদ পড়ে গেছে সুলতানা,
উঠোনে ছড়িয়ে আছে চাল—
সকালে যেখানে ঘর ছিল
সেখানে এখন শীতকাল।
পায়রারা উড়ে গেছে ঘরে—
তাদেরও এখন তাপ চাই।
রোদ পড়ে গেছে সুলতানা,
কাঠ আনো, আগুন জ্বালাই।

পাতা ঝরে ঢেকে আছে মেঝে,
কুয়াশায় ডুবে আছে ঘর,
দেয়ালে শীতকালের ছবি
বাঁধানো রয়েছে পরপর,
বিছানায় রোদের কফিন,
বাগানে স্বরলিপির স্তূপ—
রোদ পড়ে গেছে সুলতানা,
আর কোনও কথা নয়, চুপ।

যেখানে হারিয়ে যেতে গেছি
সেখানে তোমার সাথে দেখা,
হাতে যারা দস্তানা পরে
ভাবো তারা কী ভীষণ একা।
তোমার জন্য রেখে যাব
প্রেম ও বিচ্ছেদের শোক—
রোদ পড়ে গেছে সুলতানা,
এবার আগুন জ্বালা হোক।

পোশাক তো পরাই রয়েছে,
বলারও তো আর কিছু নেই,
আমার দেয়ালঘড়ি থেকে
গুলির শব্দ আসছেই—
এখানে স্বদেশ মানে দাঁড়,
এখানে মানুষ মানে কাক,
রোদ পড়ে গেছে সুলতানা।
যাচ্ছি। আগুনটুকু থাক।



চিত্রালংকরণ: কর্ণিকা বিশ্বাস

পাহাড় ঘেরা সবুজ জগত - শুভদীপ বিশ্বাস

চারদিকে উঁচু পাহাড় ঘেরা একটা ছোট্টো সবুজ উপত্যকা, প্রবল জলধারার ক্ষীণ গর্জনের রেশ ছাড়া একদম শান্ত । পাশের উঁচু পাহাড়ের চুড়োগুলো কখনো সাদা মেঘের আড়ালে, কখনো মেঘ কেটে উঁকি মেরে যেন খিলখিলিয়ে হাসছে । সারি সারি দেবদারু আর পাইন গাছের ফাঁকে মেঘের খেলা চলছে অবিরত। মেঘ কেটে গেলে, বিশাল পাহাড়ে ধাপে ধাপে হরেকরকম সবুজ রঙের খেলায় চোখ ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়ে । সেই পাহাড়গুলোর হঠাৎ কিছু কিছু জায়গা থেকে জলধারা, বহু উঁচু থেকে উপত্যকার সর্বনিম্ন ঢালে, প্রবল বেগে পড়ছে। এরকম অনেক জলধারা মিলে বিশাল জলপ্রবাহ তৈরি করেছে। আমি যে জায়গার কথা বলছি সেখানে এই জলধারা পার্বতী নদী নামে পরিচিত। শুধু ঠান্ডা জল নয়, পাহাড়ের কিছু কিছু জায়গায় গরম জলের কুন্ড থেকে গরম জলও এসে মিশছে। 

যে উপত্যকার কথা এতক্ষণ বললাম সেটি পার্বতী উপত্যকা অঞ্চলে অবস্থিত, যার পোশাকি নাম ক্ষীরগঙ্গা। অসাধারণ সৌন্দর্য আর উষ্ণপ্রস্রবণের (পার্বতী কুন্ড)জন্য এটা সর্বাধিক বিখ্যাত। শুধু দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নয়, বিদেশ থেকেও বহু মানুষের ঢল নামে বছরের বিভিন্ন সময়। শীতকালে বরফে মোড়া থাকে পাহাড়গুলো, আর থেকে থেকে তুষারবৃষ্টি পর্বত আরোহীদের মনকে নাড়িয়ে দেয়। তবে অসাধারণ সুন্দর এই জায়গায় পৌঁছনোটা আদৌ সহজ নয়। অতি দুর্গম যাত্রাপথের মধ্যেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের নিরবিচ্ছিন্ন খেলা, অভিযাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে যে 'ভয়ঙ্কর সুন্দর' করে তোলে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। 
যাত্রাপথের বর্ণনা দেবার জন্য প্রথম থেকেই শুরু করা যাক। চণ্ডীগড় শহরের সেক্টর ৪৩ থেকে ১৯ নম্বর বাস টার্মিনাল থেকে কুল্লু মানালি যাবার বাসে চড়ে বসলাম সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বাসে। প্রসঙ্গত বলে রাখি জনা প্রতি খরচ আনুমানিক দুহাজার টাকা(দুদিন এক রাত)। সঙ্গে জল ও কিছু শুকনো খাবার থাকলে খরচ অনেক কম হয়।বৃষ্টি সারাক্ষণ সাথী। মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে গেলে রেইনকোট বা ছাতা সঙ্গে অল্প গরম কাপড় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যাবার কথায় ফেরা যাক।চণ্ডীগড় থেকে কুল্লু মানালি বাস এ করে কুল্লু শহরের বুনটার জায়গায় পৌঁছলাম তখন ভোর চারটে (আট ঘন্টার বাস যাত্রায় দুবার বাস থামে) তারপর অন্য একটি বাসে সকাল ছটায় আবার বুনটার শহর থেকে কাসুলি হয়ে বারশানিতে বাস এসে থামে নটার দিকে। সমাপ্ত গাড়িতে যাত্রা। অনেকে বুনটার থেকে ছোট গাড়ি করে কাসুলিতে পৌঁছে হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে আবার বাসে করে সাড়ে সাতটায় কাসুলি থেকে বারশানিতে পৌঁছতে পারে, তবে খরচ বেশী হয়ে যাবে। বারশানিতে কিছু ব্রেকফাস্ট সেরে, ওখান থেকে ট্রেকিং পথ শুরু। ক্ষীরগঙ্গা পর্যন্ত তেরো কিলোমিটারের পথ। সময় লাগে আনুমানিক পাঁচ থেকে ছঘন্টা। ভয়ঙ্কর সুন্দর পথ অতিক্রম করার প্রথমেই চোখে পড়বে সেই ভয়ানক স্রোতস্বিনী নদী। আর কানে লেগে থাকবে তার গর্জন। পাহাড়ি উপত্যকা বরাবর নদীর পাশ ধরে চলতে থাকার মাঝে চোখ পড়বে অসাধারণ পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য । 
ক্ষীরগঙ্গা পর্বত-অভিযাত্রীদের জন্য যেমন আকর্ষণীয়, ঠিক তেমনি ধর্মপ্রাণ মানুষের আগমনের অন্যতম ধর্মপীঠ। এক প্রবীণ অধিবাসীর কথায়, আগে তেমন লোকজনের দেখা মিলত না। কেবল সাধু-সন্ন্যাসীদের আগমন ছিল। ইদানিংকালে অভিযাত্রীদের সংখ্যা প্রবল ভাবে বেড়েছে, বিদেশি বা বিদেশিনীদের মধ্যে ইজরায়েলী যাত্রীরা সংখ্যায় বেশি। তাদের সাথে আড্ডায় অনেক সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়। সবই উৎসুক ইজরায়েলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এত সমস্যার কারণ জানতে। ইজরায়েলীরা বলতে চান, তারা শুধু চান ‘শান্তি’। তাঁদের এখানে আসার একটাই উদ্দেশ্য ট্রেকিং এর সাথে অসাধারণ সৌন্দর্য উপভোগ করা। জায়গাটির এ হেন নামকরণের কারণ সম্ভবত, গরম জলের উৎস থেকে যে জল আসে তার সাথে সাদা এক ধরণের ক্ষীরের ন্যায় দেখতে ছোট ছোট পদার্থ মিশে থাকে, সেই কারণেই ক্ষীরগঙ্গা। জলের কুন্ডটি এখন সুন্দর করে বাঁধানো, প্রায় ছশো পঁচিশ বর্গফুট। অনবরত সেখানে ‘বেশ গরম’ জলের এক ধারা এসে পড়ছে।ছেলে এবং মেয়েদের জন্য স্নানের জন্য পৃথক জায়গা রাখা রয়েছে । ক্ষীরগঙ্গাতেই ,কুণ্ড থেকে কিছু নিচে, ওই অঞ্চলের লোকেরা অস্থায়ী ধাবা এবং থাকার জায়গা করে রাখেন,সঙ্গে তাঁবুও থাকে। যাত্রীদের যার যেরকম পছন্দ সে সেরকম ঘর ভাড়া নিতে পারেন । প্রতি রাত একশ টাকা,কম্বল বালিশ সমেত।

সবথেকে আকর্ষণীয় হল আকাশ। রাত হোক কিংবা দিন, নিজের খেয়াল খুশিতে সর্বদা সে লাস্যময়ী রূপে বিদ্যমান। কখনও মান-অভিমানে রত, কখনও সে খুশি, কখনও আবার দুঃখী। এক একদিনের আকাশ এক একরকমের। দিনের বিভিন্ন সময়েও তার কত রূপ। সাধারণত সকালের দিকে মেঘলা ও কুয়াশা আছন্ন থাকলেও, বেলা বাড়ার সাথে সাথে কিছুটা দৃশ্যমান হয় আশপাশটা। অপূর্ব সেই পাহাড়ি রাজ্যে মেঘেদের পাড়ি। কখনও ঘন মেঘে ঢেকে যায়, কিছুক্ষণ পরেই আবার দেখা যায় আলপাইন গাছের সারি। কিছু জায়গা পাইন বন, আবার সেই ঘন বন থেকে দৃষ্টি সরালেই, যেখানে পাইন গাছের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে, সেখানে গজিয়ে উঠেছে, নাম না জানা হরেক রকমের পাহাড়ি গুল্ম-লতার ঝোপ। দূর থেকে সে যেন আর ঝোপ নয়। রঙের বাহার। চোখ যেন তাতে আটকে পড়ে থাকে। কত ধরনের নাম না জানা রংবেরঙ্গের যে ফুলের এই মেলা, মনকে উতফুল্লিত করে তোলে। সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে একরাশ মেঘের দল এসে তাদের কে ঢেকে দিয়ে চলে গেল তার বোঝার অবকাশটুকু দেয় না। বহু দূরে ৩-৪ টি পাহাড় দেখা গেলেও, ক্ষীরগঙ্গা থেকে পাহাড়ের গায়ে ছোট গ্রামের চিহ্ন টুকুও দেখা যায়না। অবশ্য ক্ষীরগঙ্গা যাবার পথে একটি পাহাড়ি (৩০-৪০ টা ঘর সমন্বিত) গ্রামের মধ্যে দিয়ে আতিক্রম করতে হয়। গ্রামের লোকদের পেশা বলতে আপেল চাষ আর গোদুগ্ধ সংগ্রহ। বর্তমান সময়ে ক্ষীরগঙ্গা অভিযাত্রীদের সংখ্যা বাড়ার ফলে তারা ছোট ছোট ধাবা খুলে রেখেছে ঘরের পাশে। যাত্রীদের ক্ষণিক বিশ্রাম আর কিছু আহার তাঁদের আরও ৯ কিমি হাঁটার জন্য চাঙ্গা করে তোলে। 


অতি উৎসাহী পর্যটকরা অবশ্য ক্ষীরগঙ্গা পৌঁছে ক্ষান্ত হন না। ক্ষীরগঙ্গা থেকে আরও ১০০০ মিটার উপরে মান্তালাই হ্রদ(৪১১৬ মিটার) ট্রেকিং শুরু করেন কেউ কেউ। তবে এই রাস্তা আরও ভয়ঙ্কর এবং প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষীরগঙ্গা পর্যন্ত রাস্তায় মানুষের সাক্ষাৎ মেলে, খাবার মেলে, কিন্তু মান্তালাই হ্রদ যেতে, আর কিছুই মিলবে না। রাস্তাও খুব স্পষ্ট ভাবে নেই, নিজেকেই খুঁজে বার করে নিতে হবে। কেউ কেউ অবশ্য পিন- পার্বতী পাস (৫৩১৯ মিটার) পর্যন্ত ট্রেকিং করেন, সেটা যে আরও দুর্বিষহ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ক্ষীরগঙ্গা থেকে মান্তালাই আর পিন পার্বতী ট্রেকিং যথাক্রমে  দিন ৩-৪ ও ৭-৮ দিন লাগতে পারে।
এবার ফেরার পালা। ক্ষীরগঙ্গা থেকে যে পথ ধরে এসেছিলাম সেই পথ ছাড়াও বারশানি পৌছনোর আর একটা পথ আছে। তবে বেশিরভাগ মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন না। ক্ষীরগঙ্গা থেকে বুনি – বুনি পাস হয়ে কালগা ব্রিজ পার হয়ে বারশানিতে পৌছনো যায়। আমারা যখন ফেরার জন্য রওনা দিলাম তখন সকাল ১০টা। আকাশ কুয়াশা আর মেঘে আচ্ছন্ন। পাহাড়ে ওঠার থেকে নামার গতি কিছুটা বেশই থাকে। তবুও পাহাড়ি সৌন্দর্য্যের হাতছানি উপেক্ষা করার মত নয়। ছবি তোলার সময় খেয়াল থাকেনা কখন সময় চলে যায়। নিচে নামার সাথে সাথেই মেঘ কাটল না। তবে রোদ্দুর বাড়ার সাথে সাথে কিছুটা আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠল। পাহাড়ি ঝর্নার অবিরাম প্রবাহ এখনও একই গতিতে বহমান। পোকার ডাক পার্বতীর গর্জনকেও ছাপিয়ে যাছে মাঝে মাঝে। ক্ষণিক বিশ্রাম। আবার হাঁটা। গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় ছোট ছোট শিশুদের ছবি তোলার সময় আবার তাঁদের সেই লাজুক হাসি ফিরে ফিরে আসছে। হঠাৎ পথ ভুলে অন্য পথে চলে যাওয়া। অবশ্য পথ ভুল করে মন্দ হয়নি। বিস্তর আপেল বাগান ভর্তি কাঁচা-পাকা আপেলগুলি লালসার সঞ্চার করছিল। দু-একটা আপেল ছিঁড়ে নেবার ইচ্ছা যে হাতছানি দিচ্ছিল তা বলতে বাধা নেই। মাঝেমধ্যে নতুন অভিযাত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ায় এটাই মনে জাগছিল, এরাও এক আজব দেশে যাছে, যেখানে নেই ধর্মীয় গণ্ডির বাধ্যবাধকতা, নেই হানাহানি, নেই মারামারির সঙ্কীর্ণতা, নেই কোন মলিনতা । আছে শুধু শান্তি। এক পরম শান্তি।

ছবি - লেখক  

কুটুম কাটাম - এবারের শিল্পী সিঞ্চন দাস

হাসির অন্তরালে বিধ্বংস (রং পেনসিল)

তোমরা স্বাধীন আমার রাজত্বে (পেনসিল স্কেচ)

বিষাক্ত আসক্তি (রং পেনসিল)

যারা অপেক্ষায় থাকে - জয়িতা সাহা

প্রথম সিজনের পোস্টার
ওই যে ছেলেটা, মুখ গোমড়া করে আজ দুদিন বসে আছে, নীলকমল ঘুমিয়ে প​ড়ার পর খোক্কসদের শায়েস্তা কে করবে, জানা হলো না বলে বেজায় মন খারাপ, ওর দাদু কিন্তু আর হসপিটাল থেকে ফিরবেন না।

ছেলের জন্মদিনে, মা প্রিয় খাবার সাজিয়ে বসে আছেন অফিস থেকে বেরিয়ে তো গেছে, তবু আজই দেরী করছে কেন ?


“যদি কিছু বিপদ হয়, আমি তো আছি, সামলে নিতে...” এই ভরসা দিয়েও বাবা চলে গেলেন ব​ড়ো তাড়াতাড়ি, বা হয়তো মা...

“জীবনে যত দুরেই যাই না কেন, যেখানেই যাই না কেন, ঠিক তোর কাছেই ফিরব দেখিস!”, এই কথা বলেও ছেড়ে চলে গেছে তারা, অনেক দূরে।

হয়তো বা দুই বন্ধু, একসাথে কাটিয়েছে পুরো ছেলেবেলা তবু পরে কখনো, “ওরা তো কবেই পাড়া ছেড়ে গেছে গো, আর মনে প​ড়ে না।”
দ্বিতীয় সিজনের পোস্টার
মানুষ চলে যায়। আমাদের জীবন থেকে, যাপন থেকে, প্রতিনিয়ত। আর এই প্রতিটা চলে যাওয়া আমাদের নতুন করে নিঃস্ব করে। মনের দরজায় দাঁড়িয়ে, আমরা নিজেদের ভুলের হিসেব নিকেষ কষতে থাকি কেন চলে গেলো তারা, তারপর তাদের ফিরে আসার অবুঝ আশায় বুক বাঁধি প্রতিটা বিচ্ছেদের পর আমরা আর সেই আগের মানুষটা থাকি না, অথচ নতুন আমিকেও নিরন্তর খুঁজে চলি তবু মেলে না। আধখানা, ভাঙা মানুষ হয়ে আমরা বেঁচে থাকি। 
এইরকম এক পৃথিবী ভাঙা মানুষের মধ্যে, আছে Matt। ছেলেবেলায় দুরারোগ্য ব্যাধি কাটিয়ে, বাবা মা কে হারিয়ে, জীবনের মাঝপথে এসেও তার হাতে প​ড়ে থাকে অর্থের অভাবে বন্ধ হ​য়ে যাওয়া চার্চ আর চলৎশক্তিহীন স্ত্রী। তবু ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস টোল খায় না তার এতটুকু। নিজেকে সে ভাবে প্রভু যীশুর সৈনিক আর শত বিপদের পরও আশা করে ‘Miracle’-এর। কিন্তু একদিন হঠাৎ ভগবানের সাথে দেখা হ​য়ে যায় তার, হ​য় এক চরম আত্মোপলব্ধি, যে ওর নিরন্তর জীবনযুদ্ধ তার সত্যি কোনো মানে নেই, নেই কোনো বিশেষ গুরুত্ব। ঈশ্বর যে ওকে বেছে নিলেন এক জীবন ভরা যন্ত্রনা দিতে তা নেহাতই খেয়ালের বশে। আর এইখানেই নিজেকে ছাপিয়ে, Matt একাত্ম হ​য়ে ওঠে আমাদের সবার সাথে। উদ্দেশ্যহীন, গুরত্বহীন জীবন, এই তো আমাদের সবচেয়ে ব​ড় ভয় প্রতিনিয়ত যে ছাপ রেখে যেতে চাইছি, আদৌ কি পারছি? মিলিয়ে যাচ্ছি না তো আস্তে আস্তে? কিন্তু তাই বলে কি থেমে যাবো? না। Laurie, আমাদের শেখায় আমাদের দেখে যেতেই হবে, What is next? সেই Laurie, যে সাজানো সংসার ছেড়ে পালায়, কিন্তু রাতের অন্ধকারে ম্যানহোলের গর্ত থেকে প্রাণপন চেষ্টা করে বের করে আনে মেয়ের দেওয়া শেষ উপহার। জীবনকে ভুলতে বসা এক মানুষ, ভীষণ ভাবে ফিরে আসে জীবনের পথে। কোনো অলৌকিক উদ্দেশ্যে নয়, নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে, সে সবাইকে বাঁচতে বলে। তাই আমরা সবাই হয়তো কোথাও গিয়ে Laurie-র সাথে মিলে যাই, অস্তিত্বের মানে খুঁজে পাই।
আর আছে Meg আর Evie। ওরা প্রতিবাদ চায়। এই মেকি জীবনমুখী জগ​ৎ, এই খামখেয়ালি ঈশ্বর, বার বার হোঁচট খেয়েও ব​য়ে নিয়ে চলা অর্থহীন জীবন, এই সব কিছুর শেষ চায় ওরা। হয়তো ওরা জীবনে এমন কিছু হারিয়েছে, যার পরে কোনো কিছুই আর পাওয়ার নেই কিছু দুঃখ তো একদম আমাদের একার হয়, যার কাছে মিথ্যে হয় সব সম্পর্ক, গুরুত্ব হারায় প্রিয়জনও কিছু দুঃখ থাকে যাদের থেকে আমাদের কোনো পরিত্রাণ নেই। তাই যখন Meg এর মুখে “We Made them Remember!” শুনে আমাদের চিন্তা স্থবির হ​য়ে আসে, অজান্তে ভিজে যায় চোখের কোল, আমরা বুঝতে পারি না এই কান্না Meg এর জন্যে? সর্বহারা Nora-র জন্যে? না এ আমাদের ব্যক্তিগত অসহায়তার দাগ!

সত্যিই তো কিছু সম্পর্ক আমাদের আত্মার সাথে এইভাবে জ​ড়িয়ে যায়, কিছু মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও আমরা সারাজীবন তাদের ফেলে যাওয়া স্মৃতিমাখা আধখানা জীবনটাকেই সুখে বাঁচি, যেন ওতেই আমাদের মুক্তি। তাই একদম শেষে গিয়েও Nora যখন ছাগলের গলা থেকে পাপের মালাগুলো খুলে খুলে নিজের গলায় প​ড়তে থাকে আমাদের মন ভেঙে যায় দুঃখের কারাগার থেকে যেন ওর মুক্তি নেই, ঠিক যেমন আমাদেরও কারো কারো নেই। নিজের সন্তানদের কার্যকারণ ছাড়া হারাতে হলে তার জীবনে কি আর শান্তি আসে? কিন্তু Nora-র যে Kevin আছে! সে, যে এক পৃথিবী মানুষের পরিত্রাতা হতে, সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে যীশু সাজে তবু নিজের প্রিয় মানুষের থেকে দুরে দুরে পালিয়ে বেড়ায়। আমরা অপলক দেখি এই দুঃখের রূপকথা আর চোখের জলে প্রার্থনা করি, গল্পের রাজারাণীর শেষটায় গিয়ে যেন ভালো হ​য়।

দুনিয়াব্যাপী এক দুর্যোগের পর, উচ্ছিষ্ট মানুষগুলোর জীবনের পথে ফিরে যাওয়ার এক আশ্চর্য দুঃখের, তবু অদ্ভুত আশার কাহিনী ‘The Leftovers’। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশ মানুষ হঠাৎ হারিয়ে যায়, কোনো কার্যকারণ ছাড়া, একদম বাতাসে ভ্যানিশ! যুক্তরাষ্ট্রের একটি কাল্পনিক ছোটো শহর Mapleton-এর ক​য়েকটি পরিবার এই অতিপ্রাকৃত দুর্ঘটনা ‘Sudden Departure’-এর পর কেমন আছে, তাই নিয়ে কাহিনীর শুরু। আমরা একদিকে Kevin, Laurie, Nora, Matt এদের নিরন্তর জীবনযুদ্ধ দেখি, আর অন্যদিকে দেখি Guilty Remnant-দের, Meg বা Patti যাদের মুখপাত্র। যারা মনে করে ‘Sudden Departure’-পরবর্তী মনুষ্যজীবন উদ্দেশ্যহীন, প্রতিটা শ্বাস অর্থহীন, অপচয়। কাহিনীর সুত্রপাত এক অলীক দুর্যোগ দিয়ে, কিন্তু খুব আশ্চর্যজনক ভাবে সেই দুর্ঘটনার কারণ বা ব্যাখ্যা না খুঁজে, গল্প এগোতে থাকে পড়ে থাকা মানুষ গুলোর যন্ত্রণার সাক্ষী হ​য়ে আর এইখানেই হয়তো ‘The Leftovers’-এর সার্থক নামকরণ।
প্রথম সিজনের ওপেনিং ক্রেডিটস
নিছক বিনোদন ন​য়, টিভি এখন আমাদের জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছে, সিনেমার থেকে দীর্ঘস্থায়ী হওয়াতে প্রভাবটাও অনেক সময়ই জোরালো। Tom Perrotta-র লেখা বইকে ঘিরে, Damon Lindelof আর Tom Perrotta-র বানানো ২৮ এপিসোডের টিভি সিরিজ যা আজকের চুড়ান্ত সম্ভবনাম​য় টিভি দুনিয়ায় নিজ গুণে অনন্য। এই টিভি সিরিজ খুব বেশী রকমের ব্যক্তিগত এবং এটাই সম্ভবত এর স্রষ্টাদের সবথেকে বড় কৃতিত্ব ছোটপর্দায় তাঁরা একের পর এক এমন মুহূর্ত তৈরী করেছেন, আমরা বার বার সেই জায়গায় নিজেদের বসাতে বাধ্য হই এবং মায়াবী দুঃখের সাথে আমাদের ঘিরে থাকে একরাশ মুগ্ধতা। প্রত্যেকটি চরিত্র গঠন এবং সম​য়ের সাথে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ, ঘটনার বাহুল্য বর্জন করে, অনুভূতি দিয়ে দৃশ্য গড়ে তোলা এবং কখনো ক্লান্তি আসে না এমন মুন্সিয়ানাতে গল্প বলা - একটি নিটোল ড্রামা সিরিজের ঠিক যে যে গুণগুলো দরকার, সেই সব কিছুর সাথেও আমরা The Leftovers-এ পেয়েছি সকলের অসামান্য অভিনয় এবং যার কথা না বললেই ন​য়, Max Richter-এর অনবদ্য​ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক Departure : যেটি থিম মিউজিক হিসেবে ব্যবহৃত হ​য়েছে তিনটে সিজন ধরে, সেটি যেন নিজের মধ্যেই একটা গল্প বলে প্রতিটা চরণে। কেউ যেন চলে যাচ্ছে ছেড়ে, আর দরজায় বসে বেলা বাড়ছে, এই বুঝি তার ফেরার সময় হলো আর শেষটায় তুমি ঠিক জানবে আর সে ফিরবে না, বুকের মধ্যে শূন্যতাটা বাড়বে, আস্তে আস্তে আর তুমি মিলিয়ে যাবে খেয়ালে কেউ যতবার Departure শুনবে তার ঠিক এইরকমই মনে হবে, এটা বাড়িয়ে বলা ন​য় মায়াবী দুঃখের এই গল্পে, Max Richter-এর পিয়ানো আর পরিস্থিতি উপযোগী গানের ব্যবহারকে আমরা আরেকটি চরিত্র হিসেবে পাই অন্য কোনো কারিগরী বিশ্লেষণে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জ্ঞান নেই আমার, তাই আলোচনাতে যাওয়া বৃথা, তবে Michael Grady এবং Todd McMullen-এর ক্যামেরা আমাদের অগুন্তি চিরস্থায়ী মুহূর্ত উপহার দিয়েছে, এ কথা বলাই বাহুল্য।
দ্বিতীয় সিজনের ওপেনিং ক্রেডিটস
আরো একটা বিষয় নিয়ে খুব বলতে ইচ্ছে হ​য় তা হল, টাইটেল ডিজাইন। প্রথম সিজনের টাইটেলে আমরা Rapture of Christ-এর আধুনিক প্রতিফলন দেখি, যা আমাদের সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদ মনে করিয়ে দেয় কোনোভাবে। আর দ্বিতীয় সিজনে আমরা পেয়েছি মিলিয়ে যাওয়া মানুষের ছায়ার কুয়াশা (দুটোরই ছবি রইল)। অসামান্য টাইটেল মিউজিক এবং ওপেনিং ক্রেডিটস, দর্শকমনে সুগভীর অভিঘাত ফেলে, যা দেখবার আকাঙখা আরো বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং, দেখেই ফেলুন সদ্য শেষ হওয়া HBO-র এই সিরিজ, যা “Breaking Bad” পরবর্তী যুগে নিঃসন্দেহে সেরা ড্রামা সিরিজগুলোর তালিকায় একদম শুরুতেই থাকবে। তাই আরো মানুষ দেখুক, আলোচনা, চর্চা, প্রশংসা হোক। মানুষ দুঃখে বাঁচুক, ভাঙা মন, অর্থহীন জীবনের মাঝেও সব Nora-দের সাথে সব Kevin-দের দেখা হ​য়ে যাক আর Departure বাজতে থাকুক, যতবার শুনতে ইচ্ছে হয়।


সব ছবির স্বত্ব : HBO

বড় হওয়ার আগে (শেষ পর্ব) - কর্ণিকা বিশ্বাস

আমি বরাবরই বেড়াতে যেতে ভালোবাসি। স্কুল জীবনে সেই সুযোগ অবশ্য বেশী পাইনি। মানছি, সেটার জন্য দায়ী প্রধানত আমি নিজে। হুকুম-তামিল ছাত্রী হিসাবে ইস্কুলে আমার বেশ একটা খ্যাতি ছিল। শিশু শিক্ষার নাম করে তথাকথিত নামী বিদ্যালয়গুলি যে অন্যায্য প্রত্যাশার ফানুস তৈরী করতে শেখায়, তার দাম দেয় কে? মিথ্যা পিয়ার প্রেশারের ভাঁওতা দিয়ে শিক্ষিকারা আমাকে বুঝিয়েছিলেন, প্রথম হতে না পারলে কপালে নির্ঘাত কালাপানি নাচছে। পড়া নষ্ট হওয়ার ভয়ে যার রাতের ঘুম উড়ে যায়, তার পক্ষে কি বেড়াতে যাওয়া সহজ ব্যাপার? মাধ্যমিক পাশ করে সোনা-হেন মুখ করে ভর্তি হই দক্ষিণ কলকাতার এক নামী ইস্কুলে। যা হবার ছিল, তাই হল। কল্পনার বুদবুদ ফাটতে বেশী সময় লাগেনি। নম্বরের ঝুড়ির সাথে নম্বরধারীও বাস্তবের মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। সত্যিকারের ভাল ছাত্র দেখে চোখ খুলে গেল। তার সাথে আর একটা জিনিস হল। স্বেচ্ছা বঞ্চনার গ্লানি এমনভাবে চেপে বসল, যে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোটা পরম কর্তব্য রূপে মান্য করলাম! নানাবিধ অফার এবং ক্যাশব্যাকের কল্যাণে আমার সাথে সাথে সেই নেশাও ক্রমশ বড় হয়েছে। তবে, ছোটবেলায় বাবা-মার সাথে দেখা বম্বে-গোয়ার সমুদ্রতট, উত্তরবঙ্গের অরণ্য, সিকিমের পাহাড়, নালন্দার ধ্বংসাবশেষ মনের একটা বিশেষ কোণ দখল করে রয়েছে। বড় হয়ে নিজের পছন্দে অনেক নামী-অনামী জায়গায় গেছি, কিন্তু বাবার হাত ধরে বেড়ানোর অনুভূতির তুলনা নেই। তালিকা মিলিয়ে গোছগাছ করা নেই, গাড়ী বুক করা নেই, ফ্লাইট স্কেডিউল মেলানো নেই। অনেক স্বাধীনতার মাঝে এই নেইগুলো বড্ড মিস করি। 

পাঠকেরা যা পড়ছেন