যারা অপেক্ষায় থাকে - জয়িতা সাহা

প্রথম সিজনের পোস্টার
ওই যে ছেলেটা, মুখ গোমড়া করে আজ দুদিন বসে আছে, নীলকমল ঘুমিয়ে প​ড়ার পর খোক্কসদের শায়েস্তা কে করবে, জানা হলো না বলে বেজায় মন খারাপ, ওর দাদু কিন্তু আর হসপিটাল থেকে ফিরবেন না।

ছেলের জন্মদিনে, মা প্রিয় খাবার সাজিয়ে বসে আছেন অফিস থেকে বেরিয়ে তো গেছে, তবু আজই দেরী করছে কেন ?


“যদি কিছু বিপদ হয়, আমি তো আছি, সামলে নিতে...” এই ভরসা দিয়েও বাবা চলে গেলেন ব​ড়ো তাড়াতাড়ি, বা হয়তো মা...

“জীবনে যত দুরেই যাই না কেন, যেখানেই যাই না কেন, ঠিক তোর কাছেই ফিরব দেখিস!”, এই কথা বলেও ছেড়ে চলে গেছে তারা, অনেক দূরে।

হয়তো বা দুই বন্ধু, একসাথে কাটিয়েছে পুরো ছেলেবেলা তবু পরে কখনো, “ওরা তো কবেই পাড়া ছেড়ে গেছে গো, আর মনে প​ড়ে না।”
দ্বিতীয় সিজনের পোস্টার
মানুষ চলে যায়। আমাদের জীবন থেকে, যাপন থেকে, প্রতিনিয়ত। আর এই প্রতিটা চলে যাওয়া আমাদের নতুন করে নিঃস্ব করে। মনের দরজায় দাঁড়িয়ে, আমরা নিজেদের ভুলের হিসেব নিকেষ কষতে থাকি কেন চলে গেলো তারা, তারপর তাদের ফিরে আসার অবুঝ আশায় বুক বাঁধি প্রতিটা বিচ্ছেদের পর আমরা আর সেই আগের মানুষটা থাকি না, অথচ নতুন আমিকেও নিরন্তর খুঁজে চলি তবু মেলে না। আধখানা, ভাঙা মানুষ হয়ে আমরা বেঁচে থাকি। 
এইরকম এক পৃথিবী ভাঙা মানুষের মধ্যে, আছে Matt। ছেলেবেলায় দুরারোগ্য ব্যাধি কাটিয়ে, বাবা মা কে হারিয়ে, জীবনের মাঝপথে এসেও তার হাতে প​ড়ে থাকে অর্থের অভাবে বন্ধ হ​য়ে যাওয়া চার্চ আর চলৎশক্তিহীন স্ত্রী। তবু ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস টোল খায় না তার এতটুকু। নিজেকে সে ভাবে প্রভু যীশুর সৈনিক আর শত বিপদের পরও আশা করে ‘Miracle’-এর। কিন্তু একদিন হঠাৎ ভগবানের সাথে দেখা হ​য়ে যায় তার, হ​য় এক চরম আত্মোপলব্ধি, যে ওর নিরন্তর জীবনযুদ্ধ তার সত্যি কোনো মানে নেই, নেই কোনো বিশেষ গুরুত্ব। ঈশ্বর যে ওকে বেছে নিলেন এক জীবন ভরা যন্ত্রনা দিতে তা নেহাতই খেয়ালের বশে। আর এইখানেই নিজেকে ছাপিয়ে, Matt একাত্ম হ​য়ে ওঠে আমাদের সবার সাথে। উদ্দেশ্যহীন, গুরত্বহীন জীবন, এই তো আমাদের সবচেয়ে ব​ড় ভয় প্রতিনিয়ত যে ছাপ রেখে যেতে চাইছি, আদৌ কি পারছি? মিলিয়ে যাচ্ছি না তো আস্তে আস্তে? কিন্তু তাই বলে কি থেমে যাবো? না। Laurie, আমাদের শেখায় আমাদের দেখে যেতেই হবে, What is next? সেই Laurie, যে সাজানো সংসার ছেড়ে পালায়, কিন্তু রাতের অন্ধকারে ম্যানহোলের গর্ত থেকে প্রাণপন চেষ্টা করে বের করে আনে মেয়ের দেওয়া শেষ উপহার। জীবনকে ভুলতে বসা এক মানুষ, ভীষণ ভাবে ফিরে আসে জীবনের পথে। কোনো অলৌকিক উদ্দেশ্যে নয়, নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে, সে সবাইকে বাঁচতে বলে। তাই আমরা সবাই হয়তো কোথাও গিয়ে Laurie-র সাথে মিলে যাই, অস্তিত্বের মানে খুঁজে পাই।
আর আছে Meg আর Evie। ওরা প্রতিবাদ চায়। এই মেকি জীবনমুখী জগ​ৎ, এই খামখেয়ালি ঈশ্বর, বার বার হোঁচট খেয়েও ব​য়ে নিয়ে চলা অর্থহীন জীবন, এই সব কিছুর শেষ চায় ওরা। হয়তো ওরা জীবনে এমন কিছু হারিয়েছে, যার পরে কোনো কিছুই আর পাওয়ার নেই কিছু দুঃখ তো একদম আমাদের একার হয়, যার কাছে মিথ্যে হয় সব সম্পর্ক, গুরুত্ব হারায় প্রিয়জনও কিছু দুঃখ থাকে যাদের থেকে আমাদের কোনো পরিত্রাণ নেই। তাই যখন Meg এর মুখে “We Made them Remember!” শুনে আমাদের চিন্তা স্থবির হ​য়ে আসে, অজান্তে ভিজে যায় চোখের কোল, আমরা বুঝতে পারি না এই কান্না Meg এর জন্যে? সর্বহারা Nora-র জন্যে? না এ আমাদের ব্যক্তিগত অসহায়তার দাগ!

সত্যিই তো কিছু সম্পর্ক আমাদের আত্মার সাথে এইভাবে জ​ড়িয়ে যায়, কিছু মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও আমরা সারাজীবন তাদের ফেলে যাওয়া স্মৃতিমাখা আধখানা জীবনটাকেই সুখে বাঁচি, যেন ওতেই আমাদের মুক্তি। তাই একদম শেষে গিয়েও Nora যখন ছাগলের গলা থেকে পাপের মালাগুলো খুলে খুলে নিজের গলায় প​ড়তে থাকে আমাদের মন ভেঙে যায় দুঃখের কারাগার থেকে যেন ওর মুক্তি নেই, ঠিক যেমন আমাদেরও কারো কারো নেই। নিজের সন্তানদের কার্যকারণ ছাড়া হারাতে হলে তার জীবনে কি আর শান্তি আসে? কিন্তু Nora-র যে Kevin আছে! সে, যে এক পৃথিবী মানুষের পরিত্রাতা হতে, সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে যীশু সাজে তবু নিজের প্রিয় মানুষের থেকে দুরে দুরে পালিয়ে বেড়ায়। আমরা অপলক দেখি এই দুঃখের রূপকথা আর চোখের জলে প্রার্থনা করি, গল্পের রাজারাণীর শেষটায় গিয়ে যেন ভালো হ​য়।

দুনিয়াব্যাপী এক দুর্যোগের পর, উচ্ছিষ্ট মানুষগুলোর জীবনের পথে ফিরে যাওয়ার এক আশ্চর্য দুঃখের, তবু অদ্ভুত আশার কাহিনী ‘The Leftovers’। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশ মানুষ হঠাৎ হারিয়ে যায়, কোনো কার্যকারণ ছাড়া, একদম বাতাসে ভ্যানিশ! যুক্তরাষ্ট্রের একটি কাল্পনিক ছোটো শহর Mapleton-এর ক​য়েকটি পরিবার এই অতিপ্রাকৃত দুর্ঘটনা ‘Sudden Departure’-এর পর কেমন আছে, তাই নিয়ে কাহিনীর শুরু। আমরা একদিকে Kevin, Laurie, Nora, Matt এদের নিরন্তর জীবনযুদ্ধ দেখি, আর অন্যদিকে দেখি Guilty Remnant-দের, Meg বা Patti যাদের মুখপাত্র। যারা মনে করে ‘Sudden Departure’-পরবর্তী মনুষ্যজীবন উদ্দেশ্যহীন, প্রতিটা শ্বাস অর্থহীন, অপচয়। কাহিনীর সুত্রপাত এক অলীক দুর্যোগ দিয়ে, কিন্তু খুব আশ্চর্যজনক ভাবে সেই দুর্ঘটনার কারণ বা ব্যাখ্যা না খুঁজে, গল্প এগোতে থাকে পড়ে থাকা মানুষ গুলোর যন্ত্রণার সাক্ষী হ​য়ে আর এইখানেই হয়তো ‘The Leftovers’-এর সার্থক নামকরণ।
প্রথম সিজনের ওপেনিং ক্রেডিটস
নিছক বিনোদন ন​য়, টিভি এখন আমাদের জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছে, সিনেমার থেকে দীর্ঘস্থায়ী হওয়াতে প্রভাবটাও অনেক সময়ই জোরালো। Tom Perrotta-র লেখা বইকে ঘিরে, Damon Lindelof আর Tom Perrotta-র বানানো ২৮ এপিসোডের টিভি সিরিজ যা আজকের চুড়ান্ত সম্ভবনাম​য় টিভি দুনিয়ায় নিজ গুণে অনন্য। এই টিভি সিরিজ খুব বেশী রকমের ব্যক্তিগত এবং এটাই সম্ভবত এর স্রষ্টাদের সবথেকে বড় কৃতিত্ব ছোটপর্দায় তাঁরা একের পর এক এমন মুহূর্ত তৈরী করেছেন, আমরা বার বার সেই জায়গায় নিজেদের বসাতে বাধ্য হই এবং মায়াবী দুঃখের সাথে আমাদের ঘিরে থাকে একরাশ মুগ্ধতা। প্রত্যেকটি চরিত্র গঠন এবং সম​য়ের সাথে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ, ঘটনার বাহুল্য বর্জন করে, অনুভূতি দিয়ে দৃশ্য গড়ে তোলা এবং কখনো ক্লান্তি আসে না এমন মুন্সিয়ানাতে গল্প বলা - একটি নিটোল ড্রামা সিরিজের ঠিক যে যে গুণগুলো দরকার, সেই সব কিছুর সাথেও আমরা The Leftovers-এ পেয়েছি সকলের অসামান্য অভিনয় এবং যার কথা না বললেই ন​য়, Max Richter-এর অনবদ্য​ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক Departure : যেটি থিম মিউজিক হিসেবে ব্যবহৃত হ​য়েছে তিনটে সিজন ধরে, সেটি যেন নিজের মধ্যেই একটা গল্প বলে প্রতিটা চরণে। কেউ যেন চলে যাচ্ছে ছেড়ে, আর দরজায় বসে বেলা বাড়ছে, এই বুঝি তার ফেরার সময় হলো আর শেষটায় তুমি ঠিক জানবে আর সে ফিরবে না, বুকের মধ্যে শূন্যতাটা বাড়বে, আস্তে আস্তে আর তুমি মিলিয়ে যাবে খেয়ালে কেউ যতবার Departure শুনবে তার ঠিক এইরকমই মনে হবে, এটা বাড়িয়ে বলা ন​য় মায়াবী দুঃখের এই গল্পে, Max Richter-এর পিয়ানো আর পরিস্থিতি উপযোগী গানের ব্যবহারকে আমরা আরেকটি চরিত্র হিসেবে পাই অন্য কোনো কারিগরী বিশ্লেষণে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জ্ঞান নেই আমার, তাই আলোচনাতে যাওয়া বৃথা, তবে Michael Grady এবং Todd McMullen-এর ক্যামেরা আমাদের অগুন্তি চিরস্থায়ী মুহূর্ত উপহার দিয়েছে, এ কথা বলাই বাহুল্য।
দ্বিতীয় সিজনের ওপেনিং ক্রেডিটস
আরো একটা বিষয় নিয়ে খুব বলতে ইচ্ছে হ​য় তা হল, টাইটেল ডিজাইন। প্রথম সিজনের টাইটেলে আমরা Rapture of Christ-এর আধুনিক প্রতিফলন দেখি, যা আমাদের সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদ মনে করিয়ে দেয় কোনোভাবে। আর দ্বিতীয় সিজনে আমরা পেয়েছি মিলিয়ে যাওয়া মানুষের ছায়ার কুয়াশা (দুটোরই ছবি রইল)। অসামান্য টাইটেল মিউজিক এবং ওপেনিং ক্রেডিটস, দর্শকমনে সুগভীর অভিঘাত ফেলে, যা দেখবার আকাঙখা আরো বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং, দেখেই ফেলুন সদ্য শেষ হওয়া HBO-র এই সিরিজ, যা “Breaking Bad” পরবর্তী যুগে নিঃসন্দেহে সেরা ড্রামা সিরিজগুলোর তালিকায় একদম শুরুতেই থাকবে। তাই আরো মানুষ দেখুক, আলোচনা, চর্চা, প্রশংসা হোক। মানুষ দুঃখে বাঁচুক, ভাঙা মন, অর্থহীন জীবনের মাঝেও সব Nora-দের সাথে সব Kevin-দের দেখা হ​য়ে যাক আর Departure বাজতে থাকুক, যতবার শুনতে ইচ্ছে হয়।


সব ছবির স্বত্ব : HBO

পাঠকেরা যা পড়ছেন