অ্যাক্সিডেন্ট - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ

প্রথমে ভেবেছিলাম গুলি করে মেরে ফেলি। খুব একটা কঠিন কাজ হবে না। পিস্তলের লাইসেন্স করা আছে। যদিও ওটা ব্যবহার করলে ধরা খেয়ে যাব, তাও ভাবলে কি একটা উপায় বের হবে না? কিন্তু গুলি করে মারলে তো আমার উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। ঠিক মত কাজ সারতে পারলে ব্যাটা কোন কষ্টই পাবে না, আবার একটু এদিক ওদিকে হয়ে গেল, আমি নিজেই ধরা খেয়ে যাব। কিন্তু আমি চাই ও কষ্ট পেয়ে মরুক, আর আমিও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকি। সুতরাং, গোলা গুলি বাদ।

এরপর ভাবলাম বিষ খাইয়ে দেই, কিন্তু আজকালকার বিষ যা বানাচ্ছে। ভাল ওষুধ না হলে চলবে না। র‍্যাট কিল-ফ্যাট কিল খেয়ে ইঁদুরই নেচে বেড়ায়। দেখা যাবে দুই দিন পাতলা পায়খানার পরই ব্যাটা ঠিক হয়ে গেছে। আর যদি ভাল ওষুধ পাইও, ওর তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে মরাটা তো দেখতে পাব না।

এরপর মাথায় আসলো গলা টিপে মারি, কিন্তু সাথে সাথেই বাদ দিয়ে দিলাম। ব্যাটার যে হাতির মত দেহ, আমার ছোট খাট শরীরটা ওর সামনে পাত্তাই পাবে না। দেখা যাবে উল্টা আমাকেই ধরে......

 একে একে পানিতে চুবিয়ে, গাড়ী ধাক্কা দিয়ে, সবই চিন্তা করলাম। কিন্তু কোনটাই মনঃপুত হল না। পানির ধারে কাছে ব্যাটাকে একা পাবার সম্ভাবনা একেবারেই কম। আর হিট এন্ড রানের সাক্ষীর কি অভাব পড়ে কখনো? কেউ না কেউ ঠিকই দেখে ফেলে। ভাবতে ভাবতে মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল। কেউ কখনো ভেবে দেখেছে, মানুষ খুন করার একটা নিরাপদ পন্থা আবিষ্কার করা কত কঠিন?

গোয়েন্দা কাহিনীগুলো যখন পড়ি, তখন মনে হয় ব্যাপারটা কত সোজা। খুনী গাধার মত এই ভুলটা না করলে ধরাই খেত না। কিন্তু একবার নিজে একটা খুন করার কথা ভাবতে গেলেই, পেটের সব ভাত চাউল হয়ে যায়।

অবশ্য এই সব বই যে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় তা না। কারণ এমন একটা বইয়ে পড়া একটা লাইন পড়েই আমার মাথায় বুদ্ধিটা এল —একদম সহজ আর ফুলপ্রুফ। কোনান ডয়েলের একটা বইয়ে পেলাম — ‘যাকে খুন করতে চাও, তার ব্যক্তিগত অভ্যাস খুঁজে বের কর। খুনের পদ্ধতি আপনা আপনিই পেয়ে যাবে।’ যদিও ডয়েল সাহেব বুদ্ধিটা খুনি ধরতে ব্যবহার করেছেন, আমি নাহয় খুন করতেই ব্যবহার করি। আর রেজার ব্যক্তিগত অভ্যাস, যেটা ব্যবহার করে খুন করতে চাই, সেটা এমনিতেই দুর্ঘটনা প্রবণ।


লোকে বলে আমি নাকি জীবনে ভাবনা চিন্তা ছাড়া একটা কাজই করেছি — জিনিয়াকে বিয়ে করা। কী করব? ওকে দেখলে যে কেউ চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই... স্প্যানিশ মা আর বাংলাদেশী বাবা, ওকে দুই দেশেরই সবচেয়ে সুন্দর বৈশিষ্ট্যগুলো উপহার দিয়েছে। ওর বাবা বেশ বড় ধরণের ব্যবসায়ী। জীবনের অনেকটা সময় ইউরোপের নানা দেশে কাটিয়েছেন। হঠাৎ কি মনে করে, ব্যবসা নিজের শালার হাতে ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে আসলেন। ইউরোপের মেয়ে হলেও, রোজালিন স্বামীর পিছু পিছু এসে হাজির হলেন দেশে। জিনিয়াও সাথে চলে এল, তখন ওর বয়স ১৬-১৭।

জিনিয়ার সাথে আমার প্রথম দেখা আমার বন্ধু শামীমের বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে। অসাধারণ এই সুন্দরীকে দেখে আমি যাকে বলে প্রথম দেখাতেই চিৎপটাং। শামীমের একটা বায়িং হাউস আছে, আমি ওর বন্ধু হলেও পার্টনার নই। আমার বায়িং হাউসটা শামীমের মত বড় না হলেও বেশ ভাল। ব্যবসায় সুনামও ভাল। বাবা-মা কেউ নেই, নেই ভাই বোনও। তাই আসলে কোন পিছুটানও নেই। তাই সেদিনের পর দেখা গেল জিনিয়া যেখানেই যায়, আমিও সেখানেই যাই। স্কীইং করতে সে খুব পছন্দ করত, আর জায়গা হিসেবে পছন্দ ছিল সিকিম। আমি জীবনে স্কীইং না করলেও ওর পিছু পিছু সিকিম চলে যেতাম। দুই বছর ধরে ওর পিছু পিছু ঘোরার পর আমাদের বিয়ে হয়।
লোকে বলে সুন্দরী বউ পোষার মত হ্যাপা নাকি আর নেই। সবাই পিছু পিছু ছোঁকছোঁক করে। তবে এদিক দিয়ে আমি শামীমের চেয়ে লাকী। রুমা ভাবীও খুব সুন্দরী, আর তাকে নিয়ে রটনাও কম না। কিন্তু জিনিয়াকে নিয়ে এমন রটনা কখনোই হয়নি। রুমা ভাবীর এমন কীর্তিকালাপের কথা জানা থাকলেও, আমি কিন্তু শামীমদের কখনোই এড়িয়ে চলিনি। এমনকি একসময় দেখা গেল, স্কীইং করার জন্য আমরা আর শামীমরা একই সাথে সিকিম যাচ্ছি। তাই শামীম যদি ওর দুর্ভাগ্যের জন্য আমাকে দায়ী করে, তাহলে অবাক হবার কিছু নেই। কেননা রেজার সাথে দেখা হবার জন্য তাহলে পক্ষান্তরে আমিই তো দায়ী হলাম, নাকি?

আসল ঘটনা অনেক পরে জেনেছি। তবে আন্দাজ করতে পারিনি বলা ভুল হবে। হয়েছিল কী, কোন এক বার গিয়েছি স্কীইং করতে, সাথে শামীমরা। আমি জীবনে স্কীইং করিইনি। তাই আমাকে সবসময় বি-ট্রাকে স্কী করতে হত। জিনিয়া এক্সপার্ট বলে স্কী করত এ-ট্রাকে। রুমা ভাবীও বেশ এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলেন, এমনকি সেবার উনাকে বি-ট্রাক থেকে এ-ট্রাকে যাবার অনুমতিও দেয়া হয়েছিল। সেই এ-ট্রাকেই রেজার সাথে রুমা ভাবীর দেখা।

দেশের প্রতিষ্ঠিত কয়েকটা গার্মেন্টসের মাঝে একটার মালিক রেজা খান। লম্বা, দেখতে খুব সুপুরুষ না হলেও, কথার রাজা। সহজেই সবাইকে পটিয়ে ফেলে। আর স্কীইং এর কথা কি বলব, জিনিয়াও বোধহয় এত দক্ষ না। প্রতিদিন সকালে ইন্সট্রাকটরের আগেই গিয়ে স্কী করা শুরু করে। আমরা গিয়ে দেখি এ-ট্রাকে তিন চার পাক খাওয়া শেষ। হাসি সবসময় মুখে লেগেই আছে। কিন্তু হাসি-খুশি ভাব দেখে ভিতরের কি চলছে তা কেউ আন্দাজই করতে পারবে না। রুমা ভাবী আর শামীমের সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছিল। শামীমের বায়িং হাউস প্রায়ই বিদেশী ক্রেতাদের জন্য কাপড় সাপ্লাই দেয়। তাই রেজার সাথে ভালই মিলে গেল। ফিরে আসার আগেই শুনলাম ওরা নাকি একটা চুক্তিও করে ফেলেছে।

দেশে ফিরে দেখি আমারও কয়েকটা বড় অর্ডার এসে গেছে। মাস খানিক কোন দিকে তাকাবার ফুরসতই পেলাম না। একটু গুছিয়ে নিয়ে, স্বস্তির শ্বাস ফেলব ফেলব করছি — এমন সময় শুনলাম শামীম আর রুমা ভাবীর ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। শুনে কষ্ট পেলেও অবাক হলাম না, রুমা ভাবীর কথা তো জানিই। ফোন দিলাম ওকে, ভাবলাম কিছুদিন বাইরে গিয়ে বেড়িয়ে আসি। কিন্তু ফোন ধরল না। খোঁজ নিয়ে জানলাম উধাও হয়ে গেছে। ওর মা জানালেন, ছেলে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে — একটু একা থাকতে চায়। আমিও কথা বাড়ালাম না।

শামীমের বায়িং হাউস না থাকায়, আমার বিজনেস কিন্তু আরও ভাল চলতে লাগল। আসলে এই মাসে কয়েকটা বড় অর্ডার দিয়ে আমি নাম কামিয়ে ফেলেছি। কিন্তু একটা নির্ভরযোগ্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির অভাবে বেশ দিশেহারা বোধ করছিলাম। এমন সময় মনে পড়ল রেজার কথা। ফোন দিলাম ওকে, তখন যদি জানতাম খাল কেটে কুমির আনছি, তাহলে কি আর সেদিকে পা বাড়াতাম?

আমার ফোন পেয়ে মনে হল অবাকই হয়েছে, কথায় কথায় জানালাম, আমার বায়িং হাউস আর ভবিষ্যৎ অর্ডারের কথা। সেও হ্যাঁ-বাচক কথাই বলল। কথা প্রসঙ্গে শামীম আর রুমা ভাবীর কথাও জিজ্ঞাসা করল। আমি বাইরের একটা লোককে তাদের পার্সোনাল কথা জানানো সমীচীন মনে করলাম না, তাই হ্যা-হু করে পাশ কাটিয়ে দিলাম। তখন কি আর জানতাম যে, সেই এই ডিভোর্সের জন্য দায়ী?

যাইহোক, আমাদের চুক্তি পরের সপ্তাহেই ফাইনাল হয়ে গেল। চুক্তি শেষে রেজা আমাকে দাওয়াত দিল ওর বাড়ীতে, ডিনারের জন্য। বলল, “জিনিয়া ভাবীকেও আনতে হবে কিন্তু।” আমি কিছু বললাম না, শুধু একটু হেসে সায় দিলাম।

নির্ধারিত দিনে রেজার বাসায় একতোড়া ফুল নিয়ে গেলাম। জিনিয়া আবার দাওয়াত পেলে খুব খুশি হয়, সাজগোজ করার চান্স পায় বলেই হয়ত। আমিও মানা করি না, পাশে অপ্সরী থাকলে কারই বা মন্দ লাগে?

কলিং বেল বাজালে, রেজা নিজেই এসে আমাদেরকে ভিতরে নিয়ে গেল। শুধু আমরাই মেহমান দেখে একটু অবাক হলাম। রেজা একটু পুরোনো ধাঁচের বাড়ীতে থাকে। লোক সংখ্যা অনেক হলেও, জানলাম সেও আমার মতই আত্মীয় স্বজনহীন। আমার তো তাও জিনিয়া আছে, ও এখনও বিয়েই করেনি। ঘর বাড়ী ঘুরে ঘুরে দেখাতে লাগল। তবে মনে হল, আমার চেয়ে জিনিয়াকে দেখাবার আগ্রহই বেশী। আমি অবশ্য এতে অভ্যস্ত। আর তাছাড়া চুক্তি পাকা হলেও, সাইনিং বাকি আছে। শুধু শুধু ঝামেলা করে লাভ কী!

জম্পেস একটা খাবারের পর আমরা ঘরে ফিরে এলাম। এরপর দিন সাতেক আমি আমার ক্রেতাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। রেজাকে আগেই বলে এসেছি, যেন চুক্তি সাইন করার সময় হলে আমাকে খবর দেয়।

তাই যখন শুনলাম, সে চুক্তি বাতিল করেছে, আর ক্ষতিপূরণের ৫ লাখ টাকা চেক মারফত আমার এ্যাকাউন্টে জমা করে দিয়েছে, খুব অবাক হলাম। কিন্তু ক্রেতাদের কথা দিয়ে ফেলেছি, মাল তো সাপ্লাই দিতে হবে। তাই, অন্য সাপ্লায়ার খুঁজে বের করার কাজেই মনোযোগ দিলাম। ভাবলাম, ঝামেলা শেষ করেই খবর নিব।

এদিকে শামীমের ডিভোর্সের খবর শোনার পর বেশ কয়েক মাস পার হয়ে গেছে। তাই যখন ও নিজেই ফোন দিয়ে দেখা করতে চাইল, আমি সাথে সাথে চলে গেলাম রুপসী বাংলায়। গিয়ে দেখি ওকে চেনাই যায় না। বিধ্বস্ত অবস্থা পুরোপুরি।

শামীম আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল, কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করল, “কী রে, কী অবস্থা তোর?


“আছি এই আরকি, তোর অবস্থা বল।
, আমি বললাম।

ও একটু হাসি হেসে বলল, 
দেখতেই পাচ্ছিস, কেমন আছি। কিন্তু আমি আজকে তোর সাথে সিরিয়াস কিছু কথা বলার জন্য এসেছি।

“বল।”

“আমার আর রুমার কথা তো জানিস। কিন্তু কেন এমন হল তা তো জানিস না। রুমার স্বভাব নিয়ে কথা আগেও অনেকে বলত। কানে নেইনি। কিন্তু এবার তো নিজের চোখেই...”

“দেখ তোর ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাকে না বললেও চলবে 


আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল, 
দেখ দোস্ত। এখন ব্যাপারটার সাথে তুই ও জড়িয়ে পড়েছিস।

“মানে? কীভাবে?”

“রেজার কথা মনে আছে? সেবার সিকিমে দেখা হল?”

আমি মাথা নেড়ে জানালাম মনে আছে, ওকে রেজার সাথে চুক্তিটার কথা বলতে যাব, কিন্তু হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিল।

“আমি জানি, তুই ওই হারামীটার সাথে চুক্তি করে ঝামেলায় পড়েছিস। ব্যাটা যে এক নম্বরের লম্পট তা কি জানিস? সে বার সিকিমেই ও রুমাকে পটিয়ে বিছানায় নিয়েছে। এরপর আমার সাথে চুক্তি করার কথা বলে দাওয়াত দিয়েছিল ওর বাড়ীতে। শুধু আমাদের দুইজনকেই। পরে রুমাকে আরও কয়েকবার...। এরপর খায়েস মিটে গেলে আমাকে ৫ লাখ টাকার চেক পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছে চুক্তি বাতিল। পরে জানলাম এটাই প্রথম না।”

আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম এরপর সে কি বলবে ভেবে। যখন শামীম মুখ খুলল, আমার ভয় সত্য প্রমাণিত হল, 
যে হোটেলে সময় কাটিয়েছে, খাবার খেয়েছে, সেসব হোটেলে আমি খোঁজ নিয়েছি। কয়েকদিন আগেই জিনিয়া ভাবী আর ওকে...

আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল, আমার জিনিয়া, আমার বিশ্বস্ত জিনিয়া...

শামীম বলল, 
সাবধানে দোস্ত। হঠাৎ করে কোন সিদ্ধান্ত নিস না .... আরও কী কী যেন বলল, আমার কানে ঢুকল না। সেই দিনেই ঘরে ফিরতে ফিরতে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি রেজাকে খুন করব। 

ওই যে বলছিলাম, লোকে বলে আমি নাকি জীবনে সব কাজ খুব ভেবে চিন্তে করেছি। এমন একটা কাজ হঠাৎ করে করার প্রশ্নই ওঠে না। অনেক চিন্তা ভাবনা করে, অনেক প্ল্যান করে ঠিক করলাম কিভাবে কি করব। কাজটা হবে সিকিমেই। ঝামেলা ছাড়াই হয়ে যাবে। ছয় মাস লাগল আমার প্ল্যান করতে আর এক মাস অপেক্ষা করতে হল বাস্তবায়ন করার জন্য।

জিনিয়াকে কিছু বুঝতেই দিলাম না। এমন ভাব করলাম যেন কিছুই হয়নি। জিনিয়ার আমার প্রতি খেয়াল রাখা, যত্ন আত্তি করা বেড়ে গেল। একসময় ভাবলাম, হয়ত একটা ভুল হয়েই গেছে। আগের মত ভালবাসাটুকু না থাকলেও ওর উপস্থিতি সহ্য করা শিখে গেলাম। দিন চলতে লাগল। এক দিন ঘুম থেকে উঠে ক্যালন্ডার দেখে বুঝতে পারলাম, সময় সমাগত।

সাধারণত আমরা সিকিমের ১৪-১৫ দিন থাকি। এবার জিনিয়াকে জানালাম, এক সপ্তাহ আগেই যাব। পুরো ২১দিন থাকব। ও তো আনন্দে আত্মহারা। আমিও, যদিও ওর আর আমার কারণ ভিন্ন। প্লেনে উঠে গতবারের কথা মনে করে বলল, “শামীম ভাইরা তো আর যাচ্ছে না। পরিচিত বলতে কেবল রেজা সাহেবের সাথেই দেখা হবার সম্ভাবনা আছে, না?” ও জানে না, আমার পিছু হটবার যতটুকু সম্ভাবনা ছিল, তাও শেষ হয়ে গেল।

আমরা সিকিমে গিয়ে সেই আগের হোটেলটাতেই উঠলাম। জানি বাকি সবার আসতে অনেক দেরী আছে। আমি জান-প্রাণ ঢেলে আমার বি-ট্রাকে প্রাকটিস করতাম। অনেক উন্নতি হল। সাত দিন হবার আগেই, আমার উন্নতি দেখে জিনিয়া বলল, “জোকে বলে তোমাকে এ-ট্রাকে আনার ব্যবস্থা করতে হয় দেখছি।” জো হল এ-ট্রাকের ইন্সট্রাকটর।

আমি মৃদু হেসে আবার প্র্যাকটিসে মন দিলাম। আক্ষরিক অর্থেই এর উপর আমার জীবন মরণ নির্ভর করছে। আট দিনের দিন আমি আমার শিকারের দেখা পেলাম। কিন্তু আরও নিশ্চিত হবার জন্য নিজেকে নিজেই দুই দিন সময় দিলাম। তাড়াহুড়োর কিছুই নেই।

রেজাকে দেখে মনে হল আমাকে দেখে খুবই বিব্রত। মনে মনে গালি দিয়ে বললাম, শালা, আমার বউয়ের সাথে শোয়ার সময় মনে ছিল না? হারামজাদা। মুখে বললাম, “আরে নাহ। ব্যবসায় এরকম হতেই পারে। আর ক্ষতিপূরণ তো পেয়েই গেছি।”

ঘটনা ঘটাবার আগের দিন কোর্স পুরো ফাঁকা হবার পর আমি কাজে নামলাম। স্কী কোর্সে স্কীয়ারদের সেফটির জন্য অনেক লাল লাল পতাকা পোঁতা থাকে। উদ্দেশ্য যেন আমরা এই দুই পাশের পতাকার মাঝখান দিয়ে যাই। কেননা ইচ্ছা মত নামতে গেলে, যে কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। আমি এই রকম খান ত্রিশেক পতাকা তুলে আনলাম। আনবার আগে চিহ্ন ঠিক করে রাখলাম, যেন আবার কাজ শেষ হলে সেখানে পোঁতা যায়। এবার আগের 
থেকে ঠিক করে রাখা প্ল্যান অনুযায়ী নতুন করে পতাকাগুলো পুঁতলাম। কাজ শেষ হলে আবার চেক করে দেখলাম, যে বি-ট্রাকে আগে আসেনি, সে কোনভাবেই টের পাবে না।
পরের দিন কাক ডাকা ভোরে উঠে পড়লাম। আজকেই সেই দিন, আমার প্রতিশোধের দিন। আমি জিনিয়াকে না জাগিয়ে বের হয়ে এলাম। হোটেলের স্টাফ যেন না দেখে তাই উলের টুপি পড়ে নাক মুখ ঢেকে ফায়ার এক্সিট ব্যবহার করলাম। জানি রেজা সবার আগে আসবে। তাই অপেক্ষা করতে থাকলাম স্কী লিফট এর গোড়ায় (স্কী লিফট – যে লিফট দিয়ে লোকেরা পাহাড়ের চুড়ায় যায়)। মনে মনে দুয়া করতে থাকলাম, হারামীটা যেন নিজের অভ্যাস পরিবর্তন না করে। খোদা আমার দুয়া শুনলেন।

দশ মিনিটের মাঝেই দেখি রেজা স্কী ঘাড়ে নিয়ে আসছে। কাছাকাছি এসে আমাকে দেখে খুব অবাক হল। আমি হেসে বললাম, “ওর ইচ্ছা এবারই আমার সাথে এ-ট্রাকে স্কী করবে।” রেজাও হাসল, আমার মনে হচ্ছিল এক ঘুষিতে সব দাঁত ফেলে দেই। কিন্তু নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, এই তো আর কিছুক্ষণ।

আমার ভয় ছিল লিফটের চালককে নিয়ে। কিন্তু রেজা নিজেই সেই সমস্যার সমাধান করে দিল। হেসে, পকেট থেকে চাবি বের করে বলল, “আমি প্রতিদিন সকালে আসি দেখে ওরা আমাকে একটা চাবিই দিতে দিয়েছে। টাকা কিছু গুণতে হয়েছে, কিন্তু লাভ হয়েছে অনেক বেশী।” লিফট একেবার উপরে গিয়ে থামলে আমরা নেমে পড়লাম।

স্কী শুরু করার জন্য আমি বি-ট্রাকে আর রেজা এ-ট্রাকে গিয়ে দাঁড়াল। আমি একটু ইতস্তত করার ভান করে ওকে ডেকে বললাম, “ইয়ে, আমার একটা উপকার করবেন?”

“কী?”

“আসলে জিনিয়া আপনার খুব প্রশংসা করে তো।” একটু ভিজিয়ে নিলাম ব্যাটাকে, “আমার সাথে যদি একটু এই ট্রাকে এসে কিছু টিপস দিতেন, খুব ভাল হত।”

রেজার চোখ চক চক করে উঠল, মনে হয় আমাকে দেখিয়ে দিতে চায় আমার চেয়ে কতটা ভাল। বলল, “এর চেয়ে ভাল হয় আসুন আমরা রেস খেলি। পুরষ্কার এই ধরেন ৫০০০ টাকা। বাজীও বলতে পারেন।”

আমার এতে আপত্তি করার কোন প্রশ্নই উঠে না। আমি হেসে বললাম, “টাকা পয়সা না। অন্য কিছু।”

“কী?”

“যে জিতবে, সে জিনিয়াকে সব খুলে বলবে।” বলেই লাফ দিলাম। আমার কথা শুনে বোধহয় ব্যাটা হকচকিয়ে গিয়েছিল। তাই একটু দেরীতে শুরু করল। আমার এই দেরীটুকু খুব দরকার ছিল, কেননা যে জায়গায় ঘটনা ঘটবে, সেখানে আমি আগে পৌছাতে চাই। অবশ্য আমি এই ট্রাকটাকে এখন হাতের তালুর মতই চিনি। তাই বাড়তি সুবিধা পাব।

প্রায় মাইল খানিক আসার পর রেজা আমাকে প্রায় ধরে ফেলল। আমি অবশ্য খুব একটা চিন্তিত না। কারণ জায়গায় পৌছে গেছি। আমি একটু একটু করে ট্রাকের ডান ধারে চলে গেলাম। এই সুযোগ নিয়ে রেজা অবশ্যই আমার বামে চলে আসবে। একেবারে শেষ মুহুর্তে আমি ট্রাকের ধারে আগের রাতেই আমার জমিয়ে রাখা বরফের স্তুপের দিকে ঝাপ দিলাম। জানি রেজা নিজেকে কিছুতেই থামাতে পারবে না, সামনে গিরিখাতে ওকে পড়তেই হবে। হলোও তাই, রক্ত হিম করা এক চীৎকার করে সে গিরিখাত দিয়ে পড়ে গেল। একেবারে প্ল্যানমাফিক ঘটল সবকিছু।

আমি একবার ভাবলাম, উঁকি দিয়ে নীচে দেখি। যতদুর জানি ১০০ ফিট গভীর খাত। পড়ে গিয়ে শরীরের সব হাড় ভেঙ্গে যাবার কথা। আসলে সাহস হল না। যে আমি জীবনে কোনদিন একটা রেড লাইট অমান্য করি নি, সেই আমি কাউকে খুন করার পর কেমন বোধ করতে পারি, তা তো জানা কথা।

আমি কাঁপতে কাঁপতে (শীতে না শকে, বলতে পারি না) আমার পোঁতা পতাকাগুলো নিয়ে ঠিক আগের মত করে পুঁতে দিলাম। এরপর স্কী করে পাহাড়ের নীচে নেমে সেই ফায়ার এক্সিট দিয়েই হোটেলে ঢুকে পড়লাম। কাপড় চোপড় ছেড়ে জিনিয়ার পাশে শুয়েছি কি শুইনি, আমাকে জড়িয়ে ধরে জিনিয়া বলল, “কই গিয়েছিলে?”

আমি একটু হাসি হেসে বললাম, “ঘুম আসছিল না। তাই একটু...”

জিনিয়া হেসে বলল, “ঠান্ডা হয়ে আছে। কাছে এসো গরম করে দেই।”

***

আধাঘন্টা পর আমরা দুই জনেই নীচে এসে রেস্টুরেন্ট বসলাম। নাস্তার অর্ডার দিয়েছি, এসেও গেছে, শুরু করব এমন সময় শুনি এ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ। আমি বুঝতে পারলাম, এতক্ষণে কেউ খুঁজে পেয়েছে রেজাকে। আমি কেবল একটু ঠান্ডা হয়েছি, জিনিয়া এমন একটা কথা বলে বসল যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম, “মনে হয় কোন এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। এত সকালে তো রেজা বাদে কেউ স্কী করে না, ওই বোধহয়।”

আমি যেন জমে গেলাম, “হু।” আর কিছু গলা থেকে বের হল না।

কিন্তু জিনিয়ার পরের কথায় আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, “ভাল হয়েছে।” আমি বলদের মত ওর দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ও বলল, “আর বোলো না। রুমা ভাবীকে পটানোর আগে আমার সাথে চান্স নিতে চেয়েছি। স্পষ্ট না করে দিয়েছি। এরপর আবার যখন দাওয়াত খেতে গেলাম, তখনও। শেষে হোটেলে দাওয়াতও দিল। গিয়ে শেষ বারের মত বলে আসলাম–আমি রাজী নই!” একটু থেমে হেসে বলল, “অবশ্য রুমা ভাবীর মতে দেহটাই যা বড়। অন্যসব ......”

বলে কী? আমি কি তাহলে শুধু শুধুই একজনকে খুন করলাম?

পরের খানিকক্ষণের কথা আমার মনে নাই। মাথার ভেতরে শুধু ঐ একই চিন্তা ঘুরছে। হুঁশ ফিরে পেলাম তখন, যখন স্কী করার জন্য স্কী লিফট থেকে নামতে গিয়ে পা মচকে ফেললাম। আজকে আমার এ-ট্রাক শুরু করার কথা ছিল। জিনিয়া বলল, “কী, ভয়ে বাঁচার রাস্তা করে নিলে নাকি?”

ওখানে থাকা মেডিক বলল, আমার পা এর এক্স-রে করাতে হবে। তাই আমাকে নিয়ে যাওয়া হল কাছের হাসপাতালে। জিনিয়াকে বাইরে দাঁড়াতে বলে আমাকে ডাক্তারের রুমে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে এক্সরে করে ডাক্তার ফিল্ম দেখে বললেন, “কিছুই হয়নি, নাজমুল সাহেব। একটু মচকে গেছে। শক্ত করে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি। ঠিক হয়ে যাবে কিছুদিনেই। আপনার আগেরজনকে যদি দেখতেন।”

“কেন? তার আবার কি হয়েছে?”, আমি দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞাসা করলাম। জানি ডাক্তারসাহেব রেজার কথাই বলছেন।

“এই যে এক্স-রে গুলো দেখছেন, এগুলোই হয়েছে,” হাত দিয়ে সামনের পাঁচটা এক্স-রে দেখালেন। “দুই হাত, দুই পা আর মুখের কয়েকটা হাড় ভেঙ্গে ফেলেছে। গাধা কোথাকার। এসব লোকেরা মনে করে খুব এক্সপার্ট, আসলে ছাতা। মনে হয় গার্লফ্রেন্ডের সামনে ভাব নিতে গিয়ে ঐ খাত থেকে লাফ দিয়েছে।”

‘“লাফ দিয়েছে?” আমার প্রশ্ন।

“তাই তো মনে হয়। এই মিঃ রেজা আমার ১৪ বছরের ছেলের চাইতেও কাঁচা। আমার ছোটটাও ওই গিরিখাত থেকে লাফ দিয়ে সুন্দর ল্যান্ডিং করতে পারে। যাক বেঁচে আছে এই বেশী।”

“বেঁচে আছে?” আমার বিশ্বাসই হতে চায় না।

“চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে, হাত পা ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু বেঁচে আছে।” ডাক্তার বললেন।

আমি হাসিমুখে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বের হয়ে জিনিয়ার কাছে গেলাম। ও উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করল, “কী বলল ডাক্তার?”

আমি হাসতে হাসতে বললাম, “দুই হাত, দুই পা ভেঙ্গে গেছে। আর চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে।”

জিনিয়ার মুখ শুকিয়ে গেল, “বল কি? আমি তো ভেবেছি হালকা আঘাত।”

“আরে আমার না, রেজার। সকালে এ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ শুনলে না? ওই আঘাত পেয়েছে। কিন্তু বেঁচে যাবে।”

“আফসোসের কথা,’ জিনিয়া আমার হাতে হাত ঢুকিয়ে বলল, ‘বাদ দাও। চেষ্টা তো আর কম করনি!”

মূল – এ চ্যাপ্টার অফ এক্সিডেন্টস / জেফরী আর্চার


চিত্রালংকরণ - কর্ণিকা বিশ্বাস

পাঠকেরা যা পড়ছেন