সূচিপত্র - অক্টোবর ২০১৭

প্রচ্ছদ শিল্পী - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল

সম্পাদকের কথা - অক্টোবর ২০১৭

পুজো-টুজো শেষ, তবে উৎসবের তো আর কমতি নেই। প্রতিদিনই হরেক কিসিমের হুজুগ লেগেই আছে। দুগ্গা দুগ্গা বলে নাকের জলে চোখের জলে ভেসে বিসর্জন দিতে না দিতেই লক্ষ্মীদেবী হাজির। তিনি পাততাড়ি গোটানোর পরপরই আবার কালীপুজো, দীপাবলী। তিমিরবিনাশের, তিমিরবিলাসের উৎসব। সেসবও ফুরোয়। ছেঁড়াখোড়া ফানুস ল্যাম্পপোস্টে আটকে বৃষ্টিতে ভিজে চুব্বুস হয়। কত কত বছরের পর দেখা হয় ভাইবোনের। সর্ষেক্ষেতের দুপ্রান্ত থেকে ওরা ছুটে আসে দুহাত ছড়িয়ে। প্রবাসী ফোঁটা নিয়ে মুঠোফোনের স্ক্রিন রাঙা হয়।

মধ্যবিত্তিয় উষ্ণতায় - অমিত ঠাকুর

“শূন্য পথঘাটে রোদের তীব্র আঁচে পথিকরা ঘর্মাক্ত,
পিষছে দেহ গ্লুকোজ ঝড়িয়ে উষ্ণ হচ্ছে শ্রমিকের রক্ত।
মধ্যবিত্তের পরিধি সে এক বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ..
কত স্বপ্ন কত ইচ্ছের তাগিদগুলো যেন আজ স্তব্ধ।
চায়ের আসর অলিতে গলিতে তর্ক করেই শেষ,
সময় গড়িয়ে কত কি হারিয়েছে এখনও কাটেনি রেশ...

মুখচোরা - ঈশানী বসাক

তুমি আসবে আমি জানি
বদলাবে নৈঃশব্দ্যের মানে
একান্ত রাস্তার এককোণে চায়ের শব্দ
সে শব্দের আঘাতে মানুষ এক আহত ফর্দ।

সোনালি শুভ্রতা জীবনের ভ্রম
আমরা সবাই হারিয়ে যাচ্ছি
অসমাপ্ত তৃষ্ণা, যেদিন মিটবে
সেদিন ফুরাবে বসন্তের ঘ্রাণ ।

জানো মায়া ঘিরে আছে বইয়ের পাতায়
নাম ডুবুক আবশ্যক ঋণের বোঝায়
কতটুকু ইচ্ছে কবর দিলে
বুঝবে আত্মহত্যা করতে রক্ত ঝরাতে হয়না।

সব থেকেও একলা বনে পথ চাওয়া
ঝড়ের গতিতে বৃষ্টি জিজ্ঞাসা চিহ্ন
কতদিন এভাবে হাসিমুখে চলি
কবেই হারিয়েছে খাতার মুখচোরা নরম পলি।


অলংকরণ - কর্ণিকা বিশ্বাস

বিসর্জন - সই

ইচ্ছে ছিল, এবার শারদীয়ায় শিউলি মাখা ভোরে
শিশিরে পা ভিজিয়ে আগমনীর গান শোনাব তোমায়,
তুলো পেঁজা মেঘের ভিতর দিয়ে উঁকি দেবে সোনালী রোদ্দুর;
গান শেষে, জড়িয়ে টেনে নেবে তোমার বুকের কাছে
আর আমি জন্মের কান্না কাঁদব তোমায় আঁকড়ে...

ইচ্ছে ছিল, ঝিমিয়ে পড়া এক বিকেলে হাঁটব তোমার সাথে,
তোমার হাতের ’পরে আমার হাত, পা মেলাবে পায়ের সাথে;
কথা বলব অনেক, যারা জমে আছে রাতের পর রাত,
এক কোণে ঘাপটি মেরে, খুব চুপচাপ, হারিয়ে যায়
তবে ফুরোয় না কিছুতেই, থাকে আড়ালে আবডালে...

ইচ্ছে ছিল, ঈশান কোণের এক শ্রাবণ মেঘ জমাবো চোখে,
ভীষণ অভিমানে মুখ ফিরিয়ে চলে আসব যখন, তখন তুমি
মানিয়ে নেবে আমায়, বাঁধ ভাঙবে শ্রাবণের, দুচোখের
জল তুমি আটকে দেবে আঙুল দিয়ে চিবুক স্পর্শ করার আগেই
তারপর উষ্ণতার বৃষ্টি নামবে ঠোঁটজুড়ে, ভীষণ ভালোবেসে...

জমানো কথারা হারিয়েছে স্বরে, বিস্মৃতির শরণাপন্নে আশ্রিত স্মৃতি;
অবিরত অন্তঃক্ষরণের জ্বালায় কান্নারা শুকিয়েছে গলার কাছে।
নির্জীব ঠোঁট, আজ ফ্যাকাশে শুকনো শীতলতায় মোড়া।
চোখে জমেছে ধূসর মেঘ, আবছা করেছে অবচেতনের দৃষ্টি;
আগমনীর সুর বদলেছে বিসর্জনের মহোল্লাসে।

হয়তো আর কোনো দিন দেখা হবে না, স্মৃতিতেও না, স্বপ্নেও না;
পথ হয়ে গেল আলাদা, এত দিন আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম
মোড়ে মোড়ে বড্ড ভিড় জমেছে তাই, তুমি ভীষণ দূরে আজ আমার থেকে
তোমাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি তাই স্পর্ধিত আমার পা মাটিতে নেই
মহাযাত্রার পথে পা বাড়িয়েছি, চারিদিকে হরধ্বনির চরম স্নিগ্ধতা!

আর আমার মন গাইছে “আমি তোমারই তোমারই তোমারই নাম গাই, আমার নাম গাও তুমি”....


অলংকরণ - নাদিয়া (শাটারস্টক)

ছোঁয়া - ছন্দা মান্না পন্ডিত

শ্বাসের ওপর শ্বাস যখন সমদ্বিখন্ডিত,
তারায় ফুটে ওঠা আরশিমুখ,
আধান নির্বিশেষে বাঁ’দিকের বাসিন্দা,
চেটোর উষ্ণতায় অস্থিমজ্জা।

ফিরে এসো প্রাণ!
শেষ ছাই দিয়ে গড়ব আবার
মিলিয়ে দেবো কর্ণিয়া,
বেরিয়ে যাওয়া রক্তের
সঞ্চালন হবে শিরায়,
বেজে উঠবে হৃদপিন্ড,
অস্থির হবে পূর্ণাঙ্গ।

নির্বিকার মায়া!
পাঁজর ফোকরে ছটফটায়,
আলাদীনের প্রদীপ খোঁজে,
জন্মান্তরে হাতড়ায়।

সকাল ফের সাংসারিক ব্যাখ্যায়।
হাজার ব্যস্ততার মাঝে অদৃশ্য দহন পেরিয়ে;
নশ্বর এই দেহে লেগে থাকে

শেষ ছোঁয়ার অনুভূতিটা...


অলংকরণ - পিম চাউই (শাটারস্টক)

নতুন পরিচয় - তপন বাড়ৈ

নরপিশাচের কবলে যখন ক্রুদ্ধ বাঘিনী
সর্বশেষ থাবাতেও রেহাই মেলেনি সম্মান বাঁচাবার,
ঘামে ভেজা শিথিল শরীরের তখন
কাঁচা মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছিল পিশাচের দল।

কুটুম কাটাম - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল

হৃদয়ের বার্তাবাহক

গর্ভবতী - সাজিদ রহমান

রানু সাধাসিধা আটপৌরে একটি মেয়ে। বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকা শহরটি যেন বুক চিতিয়ে আছে সবাইকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। নদীর স্রোত কখনও একই, সমান ঢেউয়ের সৃষ্টি করে না, জীবনও তাই।

রানুর আজ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হলো। উঠতেই শরীরে ব্যথাটা ছেঁকে ধরল, আর তখনই মনে পড়লো গতরাতে মারের কথা। স্বামী সোহাগিনী সে যে না, তা আগে থেকেই জানে। তবে এই শারীরিক অত্যাচার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কী করবে, কিছুই ভেবে পায় না। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে চলে যাবে যেদিকে দু চোখ যায়। কিন্তু, চাইলেই কি আর পারা যায়? মানুষটিকে যে সে ভালোবাসে নিজের থেকেও বেশী। চলে গেলে লোকটা কী করবে, কোথায় থাকবে, কী খাবে এসব ভেবে আর যাওয়া হয়ে উঠে না। মানুষটি কি বোঝে তার এই আবেগ ভালবাসার কথা? মনে হয় না। বুঝলে কি তাকে এভাবে মারতে পারতো? সন্তান না হওয়া কি শুধু তার একার দোষ, আর কোনও কারণ থাকতে পারে না? আর হয় না তো হয় না, কী করবে সে? স্বামীরও তো সমস্যা থাকতে পারে, এটা তাকে কে বোঝাবে?

কচি কলাপাতা

পারিজাত ব্যানার্জী

“কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরেছিল ও।” বলেই বুঝলাম, নিতান্তই বোকামি করে ফেলেছি। যে ছেলের জন্মকর্ম সব লণ্ডনে, সে আর কি করে বুঝবে কচি কলাপাতা রঙের মাহাত্ম্য? আপনারাই বলুন!

গহনের দৃষ্টিতে অপার মুগ্ধতাটুকু তবুও লেগেই রইল। “You mean to say green? মানে, স-বু-জ?” যাক, কিছুটা ঠিকই আন্দাজ করেছে দেখছি! কি করে ঢিলটা ছুঁড়ল ঠিকঠাক? সাহেবরা অবশ্য সব পারে। দুশো বছর কেমন রাজত্বটাই না করেছিল, ভাবা যায়? তাছাড়া নীরেনকাকা একেবারে এই গাঁয়েরই ছেলে। এমনকি, মধুকাকিমা যতই ইংরেজদের ঠাটবাট নিয়ে চলুক, তাঁরও শুনেছি আদিবাড়ি এই গঙ্গার পাড়েই— নৈহাটীতে।

যদিও গহনকে দেখছি বাংলাটা একদম শেখায়নি কেউই। কেমন টেনে টেনে বলে। আরে, বাংলা হল গিয়ে সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা। এ ভাষাতেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের হাতেখড়ি। আর এ ভাষাই কিনা বিদেশে ব্রাত্য?

আমি খানিকটা গলা পরিষ্কার করে বললাম, “অনেকটাই— But তুমি say করতে পারো, ওটা green-এর এক type যাকে বলা চলে, কলাপাতা colour green!”

ছোটখাট ব্যাপার - প্রমিত নন্দী

বাইরে পারদের কাঁটা চল্লিশের গন্ডি টপকে গিয়েছে। ঘরের মধ্যেকার শীতাতপনিয়ন্ত্রক যন্ত্রটি তার কাজ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিল।

“আমার ঘরটা এর চেয়ে ঠাণ্ডা।” গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে বললেন ৪-সির বাসিন্দা পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই মিসেস নীলিমা সেন। তিনি এসেছেন একুশ তলায়, মিসেস রায়চৌধুরীর ফ্ল্যাটে। মিসেস গার্গী রায়চৌধুরীও নয় নয় করে পঞ্চাশের কোঠা পেরিয়েছেন বেশ কিছুদিন।

মিসেস রায়চৌধুরী বললেন, “ছোটখাট ব্যাপারগুলোই হজম হয় না, বুঝলে! গরমটা তাও মেনে নিতে পারি। কিন্তু জল পড়ার এই টপটপ শব্দটা! এ তো আর সহ্য হচ্ছে না হে। ওই যে, শুনতে পাচ্ছ না?”

বোবা উত্তর - রুমেলা দাস

সবে মার্চ। কলকাতার রোদে পা রাখলে, শুধু শরীর কেন? মনও জ্বলে দাউদাউ করে। তা ভালোমতোই টের পাচ্ছেন, সায়ন মল্লিক। জ্বালা ধরা চোখে সামনের মানুষজন, ফুটপাথে বসা হকার, জেব্রা ক্রসিংয়ের খানিক দূরে দাঁড়ানো খৈনি টেপা পুলিশ সবই বড্ড অচেনা লাগছে। অথচ এ রাস্তায় যাতায়াত, সেই সাদা-কালোর সময় থেকে।

জীবনদীপ বাসস্ট্যান্ড থেকে চ্যাটার্জী তলার কাছাকাছি পৌঁছতে সময় লাগে মিনিট পনেরো কুড়ি। তবু মনে হচ্ছে এ পথ অনন্ত। বারেবারে গুলিয়ে যাচ্ছে কোন পথে যাবে সায়ন? মিলেমিশে তাল পাকিয়ে যাচ্ছে টুকরো টুকরো সন্দেহ, বিষ, অপবাদ যা কয়েকমাস যাবদ সহস্র ফণার বিষ ঢেলেছে সায়ন আর প্রমিতার জীবনে। তিল তিল করে বেড়ে ওঠা একুশ বছরের একটা স্বাধীনচেতা জীবনের স্বাধীনতা শক্ত সুতোর গেরো পরিয়েছে সায়নের ফুসফুস দুটোকে।

পাঠকেরা যা পড়ছেন