গর্ভবতী - সাজিদ রহমান

রানু সাধাসিধা আটপৌরে একটি মেয়ে। বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকা শহরটি যেন বুক চিতিয়ে আছে সবাইকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। নদীর স্রোত কখনও একই, সমান ঢেউয়ের সৃষ্টি করে না, জীবনও তাই।

রানুর আজ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হলো। উঠতেই শরীরে ব্যথাটা ছেঁকে ধরল, আর তখনই মনে পড়লো গতরাতে মারের কথা। স্বামী সোহাগিনী সে যে না, তা আগে থেকেই জানে। তবে এই শারীরিক অত্যাচার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কী করবে, কিছুই ভেবে পায় না। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে চলে যাবে যেদিকে দু চোখ যায়। কিন্তু, চাইলেই কি আর পারা যায়? মানুষটিকে যে সে ভালোবাসে নিজের থেকেও বেশী। চলে গেলে লোকটা কী করবে, কোথায় থাকবে, কী খাবে এসব ভেবে আর যাওয়া হয়ে উঠে না। মানুষটি কি বোঝে তার এই আবেগ ভালবাসার কথা? মনে হয় না। বুঝলে কি তাকে এভাবে মারতে পারতো? সন্তান না হওয়া কি শুধু তার একার দোষ, আর কোনও কারণ থাকতে পারে না? আর হয় না তো হয় না, কী করবে সে? স্বামীরও তো সমস্যা থাকতে পারে, এটা তাকে কে বোঝাবে?

আসলে লোকটা এই উছিলায় আরেকটি বিয়ে করতে চায়। বিয়ে যদি করতে মন চায় করো, আমি তো আর বাধা দেই না। কিন্তু না, তার লিখিত পারমিশন দরকার। আমি বাপু লিখিত পারমিশন দেব না। এটা আমার আত্ম-মর্যাদার ব্যাপার।

গরিবের সংসার স্বামীর একার টাকায় চলে না, তাই সে মানুষের বাসায় বাচ্চা পালার কাজ করে। ভালো টাকা পয়সা আয় হয়, কিছু টাকা নিজের হাতে রেখে, সব তুলে দেয় স্বামীর হাতে। তবুও মানুষটার মন পায় না! প্রতিদিন একই কথা শুনতে আর ভালো লাগে না। আবার এই কাজ নিয়েও করে সন্দেহ, মনে হয় চারিদিক থেকে সব কিছু যেন চেপে আসছে। এর একটা বিহিত করতে হবে। কিন্তু কি বিহিত করবে রানু, তা জানেনা। যা খুশি করো গিয়ে, আমি কিছু বলবনা। রানু কাজে বের হওয়ার জন্য নিজের কাজগুলো শেষ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রোজী ভাবী আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে, তার নাকি অফিসে মিটিং আছে। সে গেলে বাবুইকে তার কাছে রেখে বের হবে। বাবুইকে তার ভালোই লাগে। বেশ সুন্দর একটি বাচ্চা। যদিও বাচ্চা পালা অনেক কঠিন কাজ, তা-ও সে এই কাজটা অনেক আনন্দের সাথে করে।

কিন্তু এখানে সমস্যা যে নাই তা না। রোজী ভাবীর স্বামী কায়সার সাহেব বড় বিরক্ত করে। ভাবী চাকরি করে আর সে করে ব্যবসা। তাই যখন তখন বাসায় চলে আসে। যে কোনও কাজের অছিলায় রুমে ডেকে নেয়। এটা তার বদ অভ্যাস। কয়েকবার ভেবেছিল যে কাজ ছেড়ে দেবে, কিন্তু মাস শেষে একসাথে এতগুলো টাকা পাওয়ার পর মন ঘুরে যায়। কি করবে ভেবে পায় না। তাই রোজ এক চিন্তা নিয়ে এই বাসায় ঢোকে রানু। আজ এমনিতেও তার মন ভালো নেই, তার উপর এই চিন্তা। ভালো লাগে না কিছুই।

আজ বাসায় ঢোকা মাত্র কায়সার সাহেবের সামনে পড়ে যায় রানু।

“কি ব্যাপার রানু, আজ তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? রাতে ঘুম হয়নি?”, খারাপ ইঙ্গিত করল কায়সার সাহেব। “যাও যাও ভিতরে যাও, তোমার ভাবী অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। আর শোনো, আজ আমি দুপুরে বাসায় আসব, তখন তোমার সাথে চুটিয়ে গল্প করা যাবে।”, হাসতে থাকে কায়সার সাহেব।

এই কথা শুনা মাত্র রানুর বুকটা কেঁপে উঠলো। এই ধরনের মানুষ রানুর একদম অপছন্দ। আজ আর কাজে মন বসবে না। তবুও বাবুই-এর কাজগুলো করতে থাকে একে একে আর বারবার ঘড়ি দেখতে থাকে। কিন্তু আজ আর কায়সার সাহেব বাসায় ফেরে না। সন্ধ্যায় ভাবী বাসায় ফিরলে বাবুইকে বুঝিয়ে দিয়ে বাসার দিকে রওনা দেয়।

রাস্তার মাঝখানে কায়সার সাহেব তাকে থামায়। রানু বিব্রত হয়ে পড়ে। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। যাক, কিছু ঘটবার আগেই কায়সার সাহেব চলে যায় সেখান থেকে।

রানু ক্লান্ত দেহ মন নিয়ে বাড়ি ফিরে। ফিরতে তার মন চায় না এই ঘরে। শান্তি যে নেই এখানে। তবুও মানুষটার জন্য খাবার তৈরি করতে থাকে। খাবার তৈরি করে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে রানু। এই ঘুম ভাঙ্গে সকালে।

দেখে দরজা ভ্যাজানো মানুষটার কোনও খবর নাই। রানু একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল। কিন্তু এই ভেবে ভালো-ও লাগল যে, অন্তত এক রাতের জন্য হলেও মারের থেকে রক্ষা পেল।

কেন জানি ঘুম থেকে উঠেই আজ মনটা ফুরফুরে লাগছে। গায়ে কোনও ব্যথা নেই বলেই হয়তো! অনেকক্ষণ লাগিয়ে গোসল সেরে নিল সে। তারপর নাস্তা সেরে হালকা একটা সাজ নিয়ে বেরিয়ে গেল কাজে।

আজও সেই একই দৃশ্য... মানে কায়সার সাহেবের সামনে পড়ে গেল রানু।

কায়সার সাহেবের যেন এটা একটা রোগ, মেয়ে মানুষ দেখলেই গায়ে পড়ে কথা বলবেই। কথা না বললে তার পেটের ভাত হজম হয় না। "কি ব্যাপার, আজ তো খুব সুইট লাগছে তোমাকে!"
কথাটা শোনা মাত্র গা-টা ঘিনঘিন করে উঠল রানুর। মনে হলো আরেকবার গোসল করলে ভালো লাগতো তার।

রোজকার মতো কাজ করতে থাকে রানু, কখন যে বিকেল পড়ে আসছে খেয়াল নেই তার। রানু বাড়ি যাওয়ার জন্য রেডি হয়। হঠাৎ একটা শক্ত হাত চেপে বসে তার উপর... রানু ছাড়াতে চেষ্টা করে কিন্তু ক্লান্ত লাগে। সে পড়ে থাকে... কতক্ষণ এভাবে পড়েছিল তার জানা নেই। একসময় উঠে পা বাড়ায় বাড়ির পথে। কিছুটা শান্ত আবেশ লাগা মন নিয়ে।

এই ঘটনাটা সে কারো সাথে বলে না এমনকি রোজী ভাবিকেও না। সেদিনের এই ঘটনার পর থেকে কায়সার সাহেবও তার সামনে আর পড়েনি। এভাবে পেরিয়ে যেতে থাকে সময়, রানু ভগ্ন মন নিয়ে কাজে যায় আর আসে। এক সময় তার দেহ ও মনে পরিবর্তন আসে। পরিবর্তনটা তার ভালো লাগে। আবেশ ছড়িয়ে থাকে সারা শরীরে সর্বময়।

স্বামীর চোখে ধরা খায় রানু। এক রাতে চেপে ধরে রানুকে...

“বল, কেডা তোর এই সর্বনাশ করলো?”

“কেন? তুমি।” এটা বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সে। সে হাসিতে ছিল স্বামীর প্রতি তীব্র ঘৃণা। চোখে মুখে তা ফুটে উঠেছিল।

রানুর স্বামী জানে, পরাজিত সে। তাই সে রাতের অন্ধকারে পা বাড়ায় পিছনে তীব্র ঘৃণামিশ্রিত অট্টহাসি ফেলে...

অলংকরণ - কর্ণিকা বিশ্বাস

পাঠকেরা যা পড়ছেন