কচি কলাপাতা

পারিজাত ব্যানার্জী

“কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরেছিল ও।” বলেই বুঝলাম, নিতান্তই বোকামি করে ফেলেছি। যে ছেলের জন্মকর্ম সব লণ্ডনে, সে আর কি করে বুঝবে কচি কলাপাতা রঙের মাহাত্ম্য? আপনারাই বলুন!

গহনের দৃষ্টিতে অপার মুগ্ধতাটুকু তবুও লেগেই রইল। “You mean to say green? মানে, স-বু-জ?” যাক, কিছুটা ঠিকই আন্দাজ করেছে দেখছি! কি করে ঢিলটা ছুঁড়ল ঠিকঠাক? সাহেবরা অবশ্য সব পারে। দুশো বছর কেমন রাজত্বটাই না করেছিল, ভাবা যায়? তাছাড়া নীরেনকাকা একেবারে এই গাঁয়েরই ছেলে। এমনকি, মধুকাকিমা যতই ইংরেজদের ঠাটবাট নিয়ে চলুক, তাঁরও শুনেছি আদিবাড়ি এই গঙ্গার পাড়েই— নৈহাটীতে।

যদিও গহনকে দেখছি বাংলাটা একদম শেখায়নি কেউই। কেমন টেনে টেনে বলে। আরে, বাংলা হল গিয়ে সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা। এ ভাষাতেই রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের হাতেখড়ি। আর এ ভাষাই কিনা বিদেশে ব্রাত্য?

আমি খানিকটা গলা পরিষ্কার করে বললাম, “অনেকটাই— But তুমি say করতে পারো, ওটা green-এর এক type যাকে বলা চলে, কলাপাতা colour green!”

গহন অবাক চোখে আমায় দেখল কিছুক্ষণ। ওর মুখে তারিফের কিছু রেখা খেলে গেল কি? বাংলা মিডিয়ামে আদ্যন্ত পড়াশোনা করেও এমন ইংরেজি— ও বোধহয় এতটা আশা করেনি! স্বাভাবিক। যারাই একবার এদেশের বাইরের হাওয়া খেয়েছে, তারা তো আর আমাদের প্রতিভাগুলো চেনার চেষ্টাই করে না! আসল কথা হল, গ্রাম্য হতে পারি, অশিক্ষিত তো নই! তবে কাকার মতো বিদেশে কোনোদিন বসবাস করলেও ছেলেটাকে বাংলাটা অন্তত একটু শেখাতাম। বাংলা আমাদের গর্ব বলে কথা!

“Then what happened? Did she agree to marry you?” উফ্, আবার ইংরেজির কচকচি! অত তাড়াতাড়ি কথা বললে, ইয়ে, তা একটু গুলিয়ে যায় বইকি! আচ্ছা, দেখি। Then মানে তো তারপর, marry মানে হল গিয়ে বিয়ে— ওহো, ঠিকই ধরেছি, ও জানতে চাইছে তারপর বিয়ে কখন হল?

আমি একগাল হেসে আবার শুরু করলাম— “Then আমি ওর Father-কে প্রস্তাব দিলাম (প্রস্তাব তো আবার বুঝবে না ছেলে, কি যেন বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ) মানে propose করলাম, তাঁর মেয়েকে marry করব বলে।”

হোহো করে হেসে উঠল গহন। কি ব্যাপার? এমন কি হাসির কথা বললাম শুনি? ওদেশে বিয়ের কথা শুনলে হাসে বুঝি? সবাই তো আসলে কি যেন করে, ওই লিভ-ইন না কি। যত সব অনাচার!

গহন হাসি থামিয়ে বলল, “আপনি বাংলায় বলুন— আমি বুঝি। বাবা ভীষণ particular এসব ব্যাপারে। ”

আগে বলবে তো ছোকরা! শুধু শুধু এত হ্যাপা! কিন্তু, আমি তো তেমন ভুল কিছু বলিনি, তাহলে? ও বুঝল কি করে... যাক, একদিকে এই ভালো হল। একটা গল্প বলার সময় এত হোঁচট খাওয়া কোনোদিন পোষায় না আমার।

মুখে হাসি সাবলীল করেই বলতে শুরু করলাম, “হ্যাঁ, তা কাকা সত্যিই এই গ্রামের গর্ব গহন। কতবড় মানুষ, তবু অহঙ্কারের ছোঁয়াটুকু নেই। (বাইরেই দেখায় না আদতেই অমন, তা অবশ্য জানি না) যাক যা বলছিলাম, ওর বাবাও আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল আর ব্যস, আজ তেরো বছর হয়ে গেল, সংসারধর্ম করে চলেছি তোমার ওই বৌদির সাথেই!”

“She seems too young! তা কত বয়স?”

আমি একবার হিসেবটা করে বলি, “এই তেতাল্লিশ!”

বিরক্ত হয় গহন, “ওহো, আপনার নয়, বৌদির।

আমি ভ্রূ নাচাই। “অ— কত আর হবে। এই তিরিশের কোঠাতেই হবে!”

আবার একরাশ মুগ্ধতা গ্রাস করে গহনকে। “দেখে বোঝাই যায়না। কি সুন্দর মিশতে পারে সবার সাথে বউদি!” নাঃ, ঘরে অমন কচি বউ থাকাও দেখছি বিপদ। দেশ বিদেশের সবাই পিছনে পড়ে যায়। ওদের ওখানে তো কোনো ব্যাপার না, গ্রামে একটিবারও ঢিঁঢিঁ পড়ে গেলে আর যে রক্ষে নেই! একেবারে গাঁ ছাড়া করে ছাড়বে!

গহন বলেই চলে, “আমি ওনাকে প্রণাম করতেই উনি হেসে বলেন, “আজ থেকে তুমি আমার ভাইটি!”

“হেঁ হেঁ ‘ভাই’! তা বেশ তো! ভালো কথা তো! ভাই তো বটেই!” এযাত্রায় তাহলে সবদিক রক্ষা হল! হরি হরি! নাহলে শেষে কিনা... ভাবনার মাঝে ছেদ পড়ল। প্রিয়া একথালা লুচি, আলুর দম, মিষ্টি সাজিয়ে ঘরে ঢুকল। “এই নাও। তোমার জন্য জলখাবার এনেছি ঠাকুরপো!” গহনের চাহনিতে ফিরে এল সেই অপার মুগ্ধতা!

“এটা—এটাই কি সেই কচি—”

খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে প্রিয়া। আহা, যেন ঝর্ণা! “কি, কচি? আমায় আবার কচি কি দেখলে, আমি বেশ বুড়ি কিন্তু, আগে থাকতেই বলে রাখলাম। পরে আবার দোষ দিও না কিন্তু!”

আমি ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে দিলাম। “এতগুলো লুচি? না মানে, বিদেশে থাকে, এত তেল মশলা হুট করে খাওয়াটা কি ঠিক হবে?” বুঝলাম, প্রিয়ার মুখটা কিছুটা ম্লান হয়ে গেল।

গহন তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “না-না বৌদি, আমি লুচি খুব ভালোবাসি। Every Sunday আমাদের সকালে লুচিই তো হয়! দেখি তোমার হাতের রান্না কেমন!” দিব্যি ফুলকো গরম লুচির মধ্যে এক আঙুলে ফুটো করে সব ধোঁয়া বার করে দিয়ে এক টুকরো ছিঁড়ে আলুর দমের কাই মাখিয়ে মুখে পুরল। এমনভাবে তৃপ্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করল, দেখেই খিদে পেয়ে গেল আমার।

তৃপ্তির অনুভব প্রিয়ার আরক্ত গালেও। “ঠিকমতো হয়েছে?”

“হয়েছে মানে, It's amazing!”

“আরও দুটো দিই তাহলে?”

“না-না, আগে এতগুলো তো শেষ করি! রাতে আবার খাবো বরং!”

“সে রাত হতে অনেক দেরী। ও-কটায় ততক্ষণে খিদে পেয়ে যাবে!”

“এখন একদম পারব না বৌদি। দাদাকে দিলেন না? আপনি খান না লুচি?”

আমি হেঁহেঁ শুরু করার আগেই প্রিয়া বলে উঠল, “ওর হার্টের ব্যামোয় ধরেছে গেল বছর। তেলেভাজা সব জিনিস একদম বাদ। ডাক্তারের কড়া হুকুম!”

ডাক্তার না ছাই। ওই পাড়ার রমেনজ্যাঠাও নাকি আবার ডাক্তার। তেমন কিছুই হয়নি, খালি মাঝেসাঝে একটু হাঁপ, তাতেই যেন গেলগেল রব। আরে বাবা, মরতেই যদি হবে, তার আগে ভালোমন্দ খেয়ে নিলে দোষ কোথায়? তা কে বোঝাবে সেসব কথা গিন্নীকে?

মুখে গম্ভীর একখানা জম্পেশ ভাব ফুটিয়ে বললাম, “আমি ওসব পছন্দও করি না। আগে ওরাই জোর করত, খেতাম, এখন মানা করে, খাই না। তা ভালোই হয়েছে।” হাসিটা চাপতেই কিনা কে জানে, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল প্রিয়া। যত্তসব!

গহন খাওয়া থামিয়ে প্রশ্ন করল হঠাৎ, “ওটাই ওই কচি শাড়ি?”

“কচি কলাপাতা? আরে না-না, ওটাতো শ্যাওলা। মানে ওই আর কি, সবুজেরই অন্যপ্রকার।” কি বুঝল কে জানে, গহন দেখলাম আবার খাওয়ায় মন দিল।

হঠাৎ যেন দমকা পরশ ছড়িয়ে পড়ল ঘরময়। “জামবাবু! উফ, কি যে ভালো লাগছে? তোমাদের এই গ্রামের যেন আলাদা একটা গন্ধ রয়েছে— যতবারই আসি, একেবারে এখানকারই হয়ে যাই। কাল সকালে বরং—”ঘরে ঢুকে গহনের দিকে চোখ পড়তেই অবশেষে থামল জন-শতাব্দী এক্সপ্রেস। অর্থাৎ আমার একমাত্র শ্যালিকা, পত্রী। কলকাতায় বাড়ি। ওখানেই পড়াশোনা করছে। ওকে ওর দিদিই ডেকে পাঠিয়েছে এই সময় কারণ, ওই আর কি...

গহনেরও খাওয়া আবার থেমে গেছে। চোখই ফেরাচ্ছে না পত্রীর দিক থেকে। আসলে ওর দোষ নেই। পত্রী ওর দিদির রূপটাই পেয়েছে, রঙটা যা একটু চাপা। মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিল শেষমেশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমিই আলাপ পর্বটা সেরে ফেললাম দুজনের। তারপর পত্রীকে প্রশ্ন করলাম আমার শ্বশুর শ্বাশুড়িও এসেছেন কিনা।

পত্রী মুখ না তুলেই বলল, “বাবা মা নিচেই রয়েছে। আমি বরং দিদির কাছে যাই।”

একছুট্টে বেরিয়ে গেল ও ঘর থেকে। যেই মেয়ে নিশ্বাস নিতেও কথা থামাল না কোনোদিন, সে হঠাৎ আজ লাজবন্তী হয়ে গেল কোন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায়? সত্যিই, মেয়েদের মন বোঝা যে কি জিনিস, যে ফেঁসেছে, সেই জানে। আমি গহনের মুখের দিকে চাইলাম। সেখানেও সিঁদুরে মেঘ জমাট বেঁধেছে।

গলা তুলে ঘোর কাটাতেই বললাম, “খাবার তো সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল। খেয়ে নাও। আমি বরং নীরেনকাকাকে ফোনটা করেই ফেলি। কি বলো?”

মাথা নামাল গহন। লাজে ওদেশেও তবে রাঙাই হয় লোকে! গোরাদের দেশ বলে কথা!

“কিগো, গহনের খাওয়া হলে একবার এদিকটায় এসো দেখি একটু।” হাঁক দেয় প্রিয়া।

তাড়াতাড়ি গহন উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে নেয়। আধখানা লুচি তখনও প্লেটে পড়ে। “সরি দাদা, এত ভাল খাবার তাও আর পারলাম না। রাতেও যে কি করে আর খাবো, বৌদিকে ম্যানেজ করুননা প্লিজ্!”

সেই, এই শর্মাকে সবারই শেষে প্রয়োজন হয়! এই যেমন এখন প্রিয়ারও হচ্ছে। আর পত্রীর যে কি অবস্থা এখন, কে জানে!

আমিও শশব্যস্ত হয়ে উঠে পড়লাম। “হ্যাঁ হ্যাঁ চলো। তোমার বৌদির আবার সময়ের জ্ঞান ভীষণরকম। দেরী হলেই আর রক্ষে নেই!”

গহনের হাতটা ধরেই বুঝলাম, চিন্তায় একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আমি সাহস জোগান দিলাম একটু। “সব ঠিকই হবে। ঠিকই তো হচ্ছে, কি বলো?”

ও হাসল। আমার দিকে আর তাকালো না তেমন একটা। তবে সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য আমিই হতবাক হয়ে গেলাম। আমার সামনে তখন দাঁড়িয়ে তেরো বছর আগের সেই প্রিয়া! সেই মায়া মাখানো চোখ, খোঁপায় জুঁইয়ের মালা আর—

“কচি কলাপাতা! Wow!” গহন চোখে চোখ রাখে সেই সবুজঘন শাড়ি পরা প্রিয়ার থুড়ি, পত্রীর।

কিছুক্ষনের নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রিয়াই বলে ওঠে, “কি ঠাকুরপো, মনে ধরেছে আমার বোনকে? তুমি যেমনটি চেয়েছিলে, ‘নিখাদ ভারতীয়’, ও কিন্তু তাই। আর পত্রী, এই নে তোর ‘বিলেত ফেরত রাজপুত্র’। এবার সামলা দেখি কেমন পারিস! আমরা বরং পাশের ঘরেই যাই। ” আমায় চোখ টিপল কি প্রিয়া? এই বুড়ো বয়সে এসব কি আর মানায় আমাদের? মাঝেমাঝে কি যে করে না গিন্নী!

পাশের ঘরে ঢুকেই ওর হাতটা ধরে ফেলি অবশ্য খপ করে। “ওটাতো তোমার সেই শাড়িটা! যাই বলো, দারুণ লাগছে কিন্তু পত্রীকে। ঠিক যেন তুমি।”

“ব্যস, শালিকে পেয়ে ভুলে গেলে তো আমায়? জানতাম। যাগ্গে, মিয়াবিবির যে একে অপরকে পছন্দ হয়েছে, এই ঢের! আমার দিকে হাঁ করে চেয়ে না থেকে নীরেনকাকাকে খবর দাও দেখি। আজই পাকা কথাটা হয়ে যাক একেবারে।”

আমি আলতো করে তুলে ধরি ওর পানপাতার মতো মুখটা। প্রিয়ার আগের কথার রেশ ধরেই বলি, “সেই কচি কলাপাতা রঙ তো আজও ঝলসে দিচ্ছে তোমার রূপ! কিন্তু, আমি ভাবছি অন্য কথা।”

প্রিয়া অবাক হয়ে তাকায়। “কিগো?”

“গহন জানল কি করে বলো দেখি, ওইটেই কচি কলাপাতা রঙ?”

হাতটা সরিয়ে খিলখিলিয়ে ওঠে প্রিয়া। “ধ্যাৎ, তুমি না সত্যিই, পারোও বটে!”



অলংকরণ - কর্ণিকা বিশ্বাস

পাঠকেরা যা পড়ছেন