অযাচিত

চিন্ময় মহান্তী


প্রথম পরিচ্ছেদ

দ্বিপ্রহর হইতে সারাক্ষণ বৃষ্টি ঝরাইয়া মেঘগুলি কাজল বর্ণ হারাইয়া শুভ্র শ্বেত বর্ণ ধারণ করিয়াছে, তাহাদের উজ্বলতা হইতে কিরণ আসিয়া বর্ষণ ধৌত ধরিত্রী বক্ষের ঔজ্জ্বল্য স্বল্পমাত্রায় বাড়িয়া উঠিয়াছে; ইহা সকল লোকের নিকট ‘কনে দেখা আলো’ নামে বহু পূর্বকাল হইতেই পরিচিতি পাইয়াছে। কিঞ্চিত অদূরে সন্ধ্যাকাল অপেক্ষারত রহিয়াছে, সময় আসিলেই আপন স্থান লইয়া লইবে।

এমত সময়ে সুখেন কোথা হইতে আসিয়া উঠানের এক অঙ্গুলি কাদা সুকৌশলে অতিক্রম করিয়া ঘরে ঢুকিল, দেখিল তাহার বধূ দীপা মেঝের মধ্যিখানটিতে বহুল ব্যবহারে জীর্ণ মাদুরিটি পাতিয়া লইয়া শুইয়া রহিয়াছে। এই অকাল শয়ন দেখিয়া সে খানিক বিস্মৃত হইয়া বধূর শিয়রে মাদুরির একটি কোনা দখল করিয়া বসিল, জানিতে চাহিল, “দীপা তোমার কি হয়েছে ?” প্রত্যুত্তরে দীপা লজ্জিতা মুখটি বিপরীত পানে ফিরাইয়া লইল। সুখেন ইতস্তত ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকা বধূর কেশরাশির উপর আঁকিবুকি কাটিতে কাটিতে পুনরায় জানিতে চাহিল, “তোমার কি হয়েছে ?” দীপা এইবার উত্তর করিল, লজ্জিতা ওষ্ঠটি মৃদু কাঁপাইয়া বলিল, “তোমার মায়ের কাছে জানবে যাও।” সুখেন বুঝিতে পারিয়াছে তথাপি আপন বধূর মুখ হইতে শুনিতে ইচ্ছা করিতেছিল। তাহার সেই ইচ্ছা পূর্ণ হইল না। নারীজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার লজ্জা, তাহা দীপার বদন হইতে বিচ্যুত হইল না।


উঠানের ঈশান কোনায় অনেকগুলি ইঁট গারা দিয়া প্রাচীর নির্মাণের উদ্দেশ্যে স্তুপাকৃত রহিয়া শ্যাওলার আবাসে পরিণত হইয়াছে। সুখেনের মাতা সেইগুলি হইতে কিছু তুলিয়া লইয়া কাদার উপর বিছাইয়া পথ নির্মাণ করিতেছিলেন। স্রষ্টা যেরূপ কিছু নির্মাণ না করিয়া বসিয়া থাকিতে পারেন না ইনিও সেইরূপ কিছু না কিছু নির্মাণ করিয়া এই সংসারে স্রষ্টার ভূমিকা পালন করিয়া আসিতেছেন।

সুখেন ঘর হইতে উঠানে আসিয়া মায়ের সন্মুখে বাধ্য বালকের ন্যায় দাঁড়াইল। বাল্য দশা কাটাইয়া এযাবৎ সে এরূপে মায়ের সন্মুখীন হয় নাই। পূর্বেই ‘অভিশাপ’ গল্পে বলিয়াছি এস্হলেও বলিতেছি এই বিশ্ব সংসারে একটিই মাত্র সশরীরে বিদ্যমান দেবী রহিয়াছেন যিনি সন্তানের মুখ দেখিয়াই উপলব্ধি করিতে পারেন তাহার হৃদয়ে কিছু ঘটিয়াছে। সুখেনের মাতারও বুঝিতে কিছু মাত্র বিলম্ব হইল না। তিনি বলিলেন, “কাল বৌমাকে ডাক্তার দেখিয়ে আন।” সুখেন মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইয়া লজ্জিত বদনে ঘরে ঢুকিয়া গেল। মাতা সন্তানের এইরূপ আচরণ দেখিয়া আপন মনে হাসিলেন।

প্রত্যুষে বর্ষণ ধৌত ধরিত্রী অধিক মাত্রায় নির্মল দেখাইতেছে, একদল পক্ষী কূজন করিতে করিতে উড়িয়া যাইতেছে; দুইটি নর নারী একে অপরের মুখপানে বারংবার চাহিয়া মৃদু স্বরে কথা বলিতে বলিতে হাঁটিতেছে।

যাত্রী প্রতীক্ষালয়ে পৌঁছাইয়া সুখেন দীপাকে লইয়া চিকিৎসককে দেখাইবার নিমিত্তে যাতায়াতের মাধ্যম বাসে চড়িয়া বসিল। নির্ধারিত সময়ে বাস ছাড়িয়া গঁ গঁ শব্দে শহর অভিমুখে চলিল। শহরে আসিয়া যখন উহারা পৌঁছাইল তখন রৌদ্রের তাপ বাড়িয়াছে।

চিকিৎসকের কক্ষের সন্মুখে পৌঁছাইয়া সুখেন দেখিল পূর্বেই কয়েকটি সন্তান সম্ভবা মহিলা বেঞ্চিতে বসিয়া রহিয়াছে, তাহাদিগের সহিত আগত স্বামী অভিভাবকেরা নিকটস্থ একটি কাঁঠাল গাছের নিম্ন কাণ্ড দেশ ঘিরিয়া নির্মিত বেদীতে বসিয়া, সদ্য পরিচিত হইয়া পৃথক পৃথক ভাগে ভিন্ন ভিন্ন গল্পে মাতিয়াছে। সুখেন তাহার বধূর নামটি নথিভুক্ত করিয়া তথায় বসিল। কিয়ৎ সময় অতিবাহিত হইলে চিকিৎসক আসিলেন, একের পর এক রোগী কক্ষ হইতে বাহির হইতে লাগিল; যদিও এস্হলে ইহাদের রোগী বলা যুক্তি সঙ্গত হইবে না কারণ ইহারা কোনো প্রকার রোগগ্রস্ত নহেন। বিধাতার নিয়মে সকল জীবের মধ্যেই মাতা নামক ঈশ্বরী রহিয়াছেন যাহারা নব জীবের জন্ম দান করিয়া পৃথিবীর জীবন প্রবাহ সঞ্চালিত করিয়া থাকেন। কিন্তু তৎসত্বেও চিকিৎসকের নিকট যাইলে সকল লোক তাহাকে রোগী বলিয়া থাকে, আমিও বলিতেছি।

কম্পাউন্ডার দীপার নাম ডাকিলেন, দীপা কক্ষে প্রবেশ করিল। পশ্চাতে সুখেনও প্রবেশ করিল। চিকিৎসক যন্ত্র লইয়া দীপাকে দেখিয়া সুখেনের মুখপানে চাহিয়া বলিলেন, “আপনি বাবা হতে চলেছেন।” যদিও সুখেন পূর্বেই অবহিত হইয়াছে তথাপি চিকিৎসকের মুখ হইতে শুনিয়া মনে যে প্রফুল্ল হইয়াছে তাহা আপন আচরণে প্রকাশ করিল। দীপা স্বামীর প্রতি চাহিয়া তাহার প্রফুল্লতা দেখিয়া প্রীত হইল। চিকিৎসক ব্যবস্থা পত্র লেখিয়া কিঞ্চিত মৌখিক উপদেশ দিলেন। উহারা ব্যবস্থা পত্রটি লইয়া কক্ষ ছাড়িয়া বাহির হইল।
সুখেন ও দীপা পিতা মাতা হইবার আনন্দ পথে হাঁটিয়া বাড়ি ফিরিবার নিমিত্তে বাসে চড়িয়া বসিল। সমস্ত পথ উভয়ে মিলিয়া হৃদয়ে স্বপ্ন মাকু চালাইয়া ভবিষ্যৎ জীবনের কাল্পনিক জাল বুনিয়া কাটাইল।

নয় মাস অতিবাহিত হইয়াছে। দীপার জঠরের সুপ্ত বীজ ক্রমে মানব শিশুর রূপ পাইয়া ভূমিষ্ঠ হইবার অভিলাষে অধীর আগ্রহী হইয়া উঠিয়াছে। সন্ধ্যা হইতে দীপা বুঝিতে পারিতেছে আজ তাহার বহু যত্ন লালিত আশা ভূমিষ্ঠ হইবে। রাত্রি অনেক বাড়িয়াছে, পূর্ণিমার চন্দ্রলোক বাতায়নে প্রবেশ করিয়া দীপাকে স্নিগ্ধ করিয়াছে। সুখেন পাসটিতে বসিয়া রহিয়াছে।

অকস্মাৎ দীপা চিৎকার করিল, তাহার প্রসব বেদনা আরম্ভ হইয়াছে। চিৎকার শুনিয়া মাতা বিছানা ছাড়িয়া ছুটিয়া আসিলেন, সুখেনের উদ্যেশ্যে বলিলেন, “তাড়াতাড়ি গাড়ি ডাক, বৌমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।” সুখেন কোনও উত্তর না করিয়া দ্রুত বাহির হইয়া গেল। নিকটস্থ বন্ধু রমেশের পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক বন্ধুর গাড়ির ব্যবসা রহিয়াছে, রমেশের নিকট ফোন নম্বর লইয়া ফোন করিয়া ফিরিয়া আসিয়া সে দেখিল দীপার রক্তক্ষরণ শুরু হইয়াছে। সুখেন ভীত হইয়া পড়িল, মাতা সান্ত্বনার সুরে বলিলেন, “এমন একটু আধটু হয় , ভয়ের কিছু নাই।”
মায়ের সান্ত্বনা বাক্যে সুখেন কিছুটা সাহস পাইল বটে কিন্তু ভীতির উপশম হইল না।

দীপার রক্তক্ষরণ বাড়িতে লাগিল, সে চিৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিল। সুখেন হতভম্ভ হইয়া যাইতে লাগিল। গাড়ি আসিল, সুখেন দীপাকে আড়কোলা করিয়া গাড়িতে তুলিয়া দিয়া গৃহের সদর দরজায় তালা লাগাইয়া গাড়িতে চড়িল; মাতাও উহাদিগের সঙ্গ লইলেন ।

গাড়ি কিছুদূর অগ্রসর হইল। গাড়ির ভেতর হইতে একটি সদ্যজাত শিশুর ক্রন্দন ভাসিয়া আসিল। পিতা হইবার আনন্দ সুখেনের মুখ হইতে প্রকাশিত হইল না, দীপার রক্তক্ষরণ বাড়িতেছে দেখিয়া সে শিটাইয়া রহিয়াছে । সুখেনের মাতা সদ্যজাত কন্যা শিশুটিকে বুকে জড়াইয়া লইলেন। গাড়িটির গতি পূর্ব অপেক্ষা বাড়িয়া গেল।

আজ তাহার কন্যা জন্মিয়াছে, তথাপি সুখেনের এই আনন্দ বিষাদে পরিণত হইয়াছে। হাসপাতালে আসিয়া যখন গাড়িটি পৌঁছাইল তখন গাড়ির মেঝে বহিয়া রক্ত মাটিতে পড়িতেছে, দীপার গাত্র বর্ণ ফ্যাকাশে হইয়াছে। সুরেশ একটি স্ট্রেচার লইয়া আসিয়া দীপাকে শুয়াইয়া আপদকালীন বিভাগের দিকে চলিল। দীপা বাম হস্ত দিয়া সুখেনের বাম হস্তের কব্জি ধরিয়া অস্ফুট স্বরে বলিল, “মেয়েকে দেখো, আমি তো আর.....” কথাটি শেষ হইল না। সুখেনের বাম হস্ত হইতে তাহার বাম হস্ত শিথিল হইয়া স্ট্রেচারের উপর ধপ্ করিয়া পড়িয়া গেল। সুখেন উচ্চস্বরে ডাকিল, ‘ডাক্তার।’ আপদকালীন বিভাগ হইতে আওয়াজ শুনিয়া কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্স বাহির হইলেন। দীপাকে দেখিয়া চিকিৎসক নার্সের উদ্যেশ্যে বলিলেন, “যাও ডেথ সার্টিফিকেটের কাগজ নিয়ে এসো।” সুখেন কথাটি শুনিয়া আর স্থির রহিতে পারিল না, সেই স্থানে বিমূঢ় হইয়া বসিয়া পড়িল। সুখেনের মাতার কোলের নবজাতিকা তখনো কাঁদিতেছিল।

সুখেনের মাতা সুখেনকে বুঝাইতে গিয়া কি বলিবেন খুঁজিয়া না পাইয়া বহুবার বাক্ রুদ্ধ হইলেন। নার্স আসিয়া একখানি মৃত্যু শংসাপত্র সুখেনের হাতে দিলেন। সে সেটি হাতে লইয়া ভাবিতে লাগিল মানুষ যাহা না চাহিয়া থাকে তাহা পাইয়া যায় আর যাহা চাহিয়া থাকে তাহা পায় নাই।

সুখেন কখনো কল্পনাতেও দীপার মরণ চায় নাই, চাহিয়াছিল দুই জনে মিলিয়া হাসিয়া স্বপ্ন আঁকিয়া জীবন নদী পার হইবে; কিন্তু তাহা আর হইয়া উঠিল না। হাসপাতালের ফিনাইল গন্ধ শুঁকিয়া তাহাদের হাসি স্বপ্ন সকলি মরিয়া গেল।

সমস্ত গ্রাম জুড়িয়া শোকের হাওয়া বহিতে লাগিল। প্রতিটি গৃহের দেওয়ালে কান পাতিলেই শোনা যাইতে লাগিল সুখেনের বৌ মরিয়াছে। শ্মশান হইতে বধূর শেষকৃত্য সম্পন্ন করিয়া সুখেন গৃহে ফিরিল।

আজ তাহার ঘরে ঢুকিতে ইচ্ছা করিতেছে না। উঠানে দাঁড়াইয়া সে যেন শুনিতে পাইল দীপা ঘর হইতে তাহাকে ডাকিতেছে, সে বুঝিল ইহা তাহার মনের ভ্রম।

কন্যারত্নটি সুখেনের মাতার কোলে শুইয়া গোঁদোল হইতে দুগ্ধ পান করিতেছে। তাহার সন্মুখে দীপার নিত্য দিনের গল্পের সাথি রত্না বসিয়া রহিয়াছে। সুখেনকে দেখিয়া রত্না বলিল, “দেখো নারায়ণী কাকিমার কোলে তোমার মেয়ে কি সুন্দর শুয়ে রয়েছে।” সুখেন কথাটি শুনিয়া একবার কন্যার মুখের পানে চাহিয়া শয়ন ঘরে ঢুকিল। দীপার ব্যবহার্য সমস্ত সামগ্রী ছুঁইয়া তাহার স্পর্শ অনুভব করিতে লাগিল।

বৃদ্ধ যেরূপ তাহার অবলম্বন লাঠি হাতের নিকট না পাইলে অসহায় বোধ করেন সুখেনও সেইরূপ তাহার অবলম্বন দীপাকে হারাইয়া অসহায় বোধ করিতে লাগিল।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

এক্ষনে সুখেন কন্যারত্নটির মিষ্টি হাসির মধ্যে হারাইয়া গিয়া দীপাকে হারাইবার শোক ভুলিতে চেষ্টা করিতেছে। বধূর নামে কন্যার নামকরণ করিয়াছে ‘দীপা’। সে দীপাকে অবলম্বন করিয়া নতুন করিয়া বাঁচিতে চেষ্টা করিতেছে। কিন্তু কাহারো কপালে দুঃখ থাকিলে কাহারো মাধ্যমে তাহা তাহার নিকট পৌঁছাইয়া যায়। ইচ্ছা না থাকিলেও তাহা ঘটিয়া যায়।

সুখেনের মাতুল এযাবৎ মানে আমার গল্পের সূচনা হইতে কক্ষনো তাহার ভগিনীকে দেখিতে আসেন নাই, আজ হঠাৎ করিয়া আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ভ্রাতাকে দেখিয়া ভগিনী অতীব আনন্দ পাইয়া বলিলেন, “চন্দ্র এতোদিন পর তোর আমার কথা মনে পড়ল।” চন্দ্র মৃদু লজ্জার হাসি হাসিলেন। নারায়ণীর ভ্রাতার নাম চন্দ্র ঠিকই কিন্তু নামের সহিত তাহার কোনও কিছুরই সাযুজ্য নাই, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, মাথায় টাঁকওয়ালা বৃদ্ধকে দেখিলে যেকাহারও তাহা মনে হইবে; কাহাকেও ছোটো করা আমার উদ্যেশ্য নহে, নামের সহিত গঠনের বৈপরীত্য অবগতার্থে বলিলাম।

চন্দ্র ও নারায়ণী মধ্যাহ্ন ভোজনে বসিয়াছেন। চন্দ্র যদিও সমস্ত অবগত রহিয়াছেন তথাপি ভ্রাতাকে নিকটে পাইয়া নারায়ণী পাশ্চাতের দিনগুলি বর্ণনা করিতেছেন। অন্তিম গ্রাসটি মুখে তুলিয়া চন্দ্র বলিলেন, “ছেলে না হলে সুখেনকে কে দেখবে?” কথাটি শুনিয়া ভগিনী ভীষণ চিন্তিত হইলেন।

সুখেন রত্নার নিকট হইতে দীপাকে লইয়া আসিয়া ঘরে ঢুকিল। রত্নার কোলে চড়িয়া বেড়াইতে বেড়াইতে খাইতে সে ভালোবাসে, সেই কারণে সুখেন তাহাকে লইয়া গিয়াছিল। সুখেনকে মাতা ডাকিলেন, “বাবা একবার এদিকে আয়তো।” সুখেন কন্যাকে বিছানায় শুয়াইয়া বাহিরে আসিয়া মাতার সন্মুখে দাঁড়াইল।

নারায়ণী তাহার ভ্রাতার যুক্তিগ্রাহ্য কথাটি উত্থাপন করিলেন । সুখেন শুনিয়া কিঞ্চিত বিরক্ত হইয়া বলিল, “তা সম্ভব নয়।”

এতক্ষণ চন্দ্র, মাতা ও পুত্রের কথোপকথন শুনিতেছিলেন। আহার শেষ করিয়া এক ঘোঁট জল পান করিয়া ঘটিটি নামাইয়া বলিলেন, “সুখেন তোমার এমন আচরণ শোভা পায় না, সংসারে পুত্র সন্তানের প্রয়োজন আছে, তুমি বিয়ে করো।” ইহা ব্যতীত নানান বাক্য প্রয়োগ করিয়া তাহাকে বুঝাইতে লাগিলেন।

তাপ প্রয়োগ করিলে বরফ যত কঠিনই হউক গলিয়া জল হইবেই। এস্থলে সুখেনের দৃঢ়তা ক্রমে গালিয়া তরল হইল , মাতার মুখপানে চাহিয়া রাজি হইল বটে কিন্তু কন্যার কথা ভাবিয়া বলিল, “মেয়েটির কি হবে!” চন্দ্র বলিলেন, “সেই ভাবে কথা বলে পাত্রী ঠিক করবো।” সুখেনের সংশয় কাটিয়া গেল। এই কাটিয়া যাওয়া সংশয় যে কবে জটিল সংশয় হইয়া উঠিবে তাহা মনুষ্যের বোধগম্য নহে।

প্রভাতে সূর্য উঠিয়া যেরূপ কিরণ বিলাইয়া থাকেন সেই রুপেই বিলাইতেছেন। সকলে যেরূপ আপন আপন কর্মে ব্যস্ত হইয়া থাকে সেইরূপেই হইতেছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি আসিয়া ধরিত্রীকে যেরূপ ধৌত করিয়া থাকে সেইরূপেই করিতেছে। ইহাদিগের কোনরূপ পরিবর্তণ হয় নাই। কেবলমাত্র সুখেনের জীবন পরিবর্তিত হইয়া এক তরী ডুবিয়া অপর তরীতে আরোহণ করিতেছে।

কোথা হইতে চন্দ্র হন্তদন্ত হইয়া আসিতেছেন দেখিয়া নারায়ণী বলিলেন, “কিরে চন্দ্র এত ব্যস্ত হয়ে আসছিস?” চন্দ্র অল্প দম লইয়া বলিলেন, “আড়ালি গ্রামে গিয়েছিলাম, ওখানকার গরীব চাষী পঞ্চাননের একটি মেয়ে রয়েছে, মেয়েটি কালো হলেও মুখশ্রী চলনসই, বয়স বেশি হওয়ার জন্য বিয়ে দিতে পারছেন না, মেয়েটি প্রথমে বিয়েতে রাজি ছিলনা এখন হয়েছে, আমি সমস্ত খুলে বলেছি ওরা রাজি হয়েছেন।”

পাত্রীর সন্ধান পাইয়া নারায়ণী খুশি হইলেন, তিনি ভাবিয়াছিলেন তাহার পুত্রের এই ঘটনা শুনিয়া কেই বা বিবাহ করিতে চাহিবে। এক্ষনে বুঝিতে পারিলেন এই বিচিত্র ধরিত্রীতে প্রয়োজনীয় সকল কিছুই জুটিয়া যায়, সঠিক স্থানে গিয়া সন্ধান করিতে হয় মাত্র।

বিবাহের শুভ দিনে সুখেন দীপাকে রত্নার দায়িত্বে রাখিয়া বিবাহ করিতে যাইবার নিমিত্তে গাড়িতে চড়িল। বিবাহ করিতে যাওয়া দেখিতে জনা কয়েক মহিলা উৎসুক হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাদের মধ্য হইতে কেহ কেহ টিপ্পনী কাটিয়া বলিল, “দোজবর যাচ্ছে।” এই টিপ্পনী সুখেনের কর্ণকূহর অবধি পৌঁছাইল না। গাড়িটি ধীর হইতে ক্রমে দ্রুত হইল।

দীপা বাড়িয়া উঠিতেছে, আধো আধো করিয়া পিতাকে ‘বাবা’, ঠাকুমাকে ‘তিতি’, রত্নাকে ‘পিতি’ ও তাহার সৎমাতাকে ‘মা’ বলিয়া ডাকিতেছে। সকলে ইহা শুনিয়া প্রীত হইতেছে। বিশেষত রত্নাকে যখন ‘পিতি’ বলিয়া ডাকে রত্না অধিক আনন্দ পাইয়া চুমু খাইয়া আদর করিয়া এক করিয়া তোলে। এই অত্যধিক আনন্দ যে দীর্ঘস্থায়ী হইবে না তাহা পাঠক গণ সম্যক ধারনা করিতে পারিতেছেন। কারণ অত্যধিক আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় না ইহা আমরা সকলেই বাস্তবের উপর দাঁড়াইয়া কোনও না কোন ভাবে উপলব্ধি করিয়াছি। কিছু না কিছু বিষাদ আসিয়া আনন্দকে কাড়িয়া লয়।

সুখেনের দ্বিতীয়া বধূর কোলে একটি পুত্র সন্তান আসিল। নিজের ঔরসজাত সন্তান থাকিলে কেহ অপরের সন্তানকে সেইরূপ আদর করিতে পারে না। বিশেষত সেই স্থলে যদি পুত্র হইয়া থাকে তাহা হইলে কন্যার কিরূপ অবস্থা হয় তাহা সেই বলিতে পারে, এই ঘটনা ধ্রুব সত্য আমার অস্বীকার করিবার ক্ষমতা নাই।

রত্নার চাকুরীরত স্বামী শহরে গৃহ নির্মাণ করিয়াছেন, রত্না তথায় চলিয়া গিয়াছে। নারায়ণী নাতিকে লইয়া সারাক্ষণ মাতিয়া থাকিতেছেন। সৎমাতাও দীপাকে লইয়া সেইরূপ বিচলিত নহেন। দীপার বুদ্ধির বিকাশ ঘটিয়াছে, সে বুঝিতে শিখিয়াছে। বুঝিতেছে এই পরিবারে তাহার ভালোবাসা ক্রমে ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইতেছে। একমাত্র তাহার পিতা ব্যতীত কেহ তাহাকে সেরূপ ভালোবাসে না। পিতার ভালোবাসা সেইরূপই রহিয়াছে। ভাইয়ের জন্য কিছু লইলে আগে তাহার জন্য ক্রয় করেন, এই লইয়া তাহার সৎমাতার সহিত পিতার বহুবার বাকযুদ্ধ হইয়াছে তাহা সে দেখিয়াছে। কিন্তু পিতার হৃদয়ে তাহার কোনোপ্রকার প্রভাব লক্ষ্য করে নাই।

প্রভাতে কতগুলি কাগজ গুছাইয়া লইয়া সুখেন শহরে চলিয়া যাইল। একটু বেলা হইতেই কোথা হইতে মেঘ আসিয়া মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হইল। বৃষ্টিতে ভিজিবার লোভ দীপা সম্বরণ করিতে পারিল না। ভিজিতে তাহাকে কোনোপ্রকার বাধা পাইতে হইল না। ঠাকুমা ঘরে বসিয়া নাতিটিকে কোলে লইয়া গান শুনাইতেছিলেন, সৎমাতা দেখিয়াও গ্রাহ্য করে নাই। সে প্রাণ ভরিয়া ভিজিল। সন্ধ্যা নামিয়াছে, দীপার সর্ব শরীর পুড়াইয়া জ্বর আসিল। সে বিছানায় শুইয়া গোঁঙাইতে লাগিল।

সুখেন শহর হইতে ফিরিয়া দেখিল তাহার আদরের দীপা অত্যধিক জ্বরে কাবু হইয়া পড়িয়াছে। নারায়ণী তাহার মস্তকে জলের পটি দিতেছেন, তাহা অতি দ্রুত শুকাইয়া যাইতেছে। বধূ বিছানায় শুইয়া কোনও ভ্রুক্ষেপ না করিয়া কোলের পুত্রটিকে দুগ্ধ পান করাইতেছে। দিপাকে চিকিৎসক দেখাইবার কোনওরূপ আয়োজন হয় নাই। সুখেন আর শান্ত থাকিতে পারিল না, বধূর এরূপ আচরণ দেখিয়া রাগান্বিত স্বরে বলিল, “কাত্যা তোমার এটা কি ঠিক হচ্ছে?” সুখেনের বধূর নাম কাত্যায়ণী হইলেও সুখেন নিজের মতো করিয়া নামটিকে কাটিয়া সংক্ষিপ্ত করিয়া কাত্যা বলিয়া ডাকে। কাত্যায়ণী সেইরূপ থাকিয়াই জবাব দিল, “তোমার মেয়ে তুমি বোঝো, আমি পারব না।”

সুখেন কন্যার কাছে গিয়া বলিল, “তোর কি হয়েছে মা?” দীপা বেহুঁশ হইয়া শুইয়া থাকিয়াও পিতার স্পর্শ পাইয়া বুঝিল পিতা আসিয়াছেন, সে পিতার মুখপানে অস্পষ্ট চাহিয়া অস্ফুট স্বরে বলিল, “বাবা আমি মায়ের কাছে যাব।”

অলংকরণ - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল

পাঠকেরা যা পড়ছেন