ঝলকানি

অনিমেষ ভট্টাচার্য্য



পারমিতা পড়ল মহা ফাঁপরে। গত কয়েক মাস থেকেই সুবিমল উইকেন্ডের এক-আধ দিন করে বাড়িতে থাকত না। কখনও কখনও উইকডেজেও দেরি করে ফিরত। চাকরির চাপ আছে, তারপর খামখেয়ালি মানুষ। এদিক ওদিক ঘুরতে ভালবাসে। তাই পারমিতা অত গা করে নি।

আজ বাইশ বছর ধরে সংসার করছে। বাড়িতে ছেলে মেয়ে আছে। মেয়েটার সেকেন্ড ইয়ার হবে। আর রঙিনের ক্লাস ফাইভ। এরকম বয়েসে এসে অন্য কোন মেয়েমানুষের সঙ্গে লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম-পিরিতি – ব্যাপারটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনে নি সে। ঐ বাংলা সিরিয়ালটা দেখতে দেখতেই মনে হল...

আর তাছাড়া, গেল শনিবার, প্রতিবেশী পামেলা, সুবিমলকে ‘ভোলা বেডিং হাউস’-এর পাশের রাস্তা দিয়ে কোথায় একটা যেতে দেখেছে। অথচ বাড়িতে বলে গেছিল “বোলপুর চললাম। এই সময়টা কৃষ্ণচুড়া ফুটবে।” তাহলে?

পরের দিনই ফিরে এসেছিল। বেশ হাসি খুশি। সরল স্বভাবের মানুষটার প্রতি সন্দেহ করতে মন চায়নি। সেদিন, স্বেচ্ছাসেবী সমিতি থেকে ফেরার পর পারমিতা একাই ছিল বাড়িতে। ছেলে মেয়ে দুটো পড়তে গেছে আর সুবিমল নাকি অফিস ফেরতা কফি হাউস যাবে, কবিতা নিয়ে আড্ডা আছে তাই। বিয়ের পর সুবিমল ওকে একটা শার্লক হোমস গিফট করেছিল। এক কাপ কফি নিয়ে সেটা খুলে বসল। বুদ্ধিটা শানাতে হবে। সুবিমলের হাবভাব দেখে জানতে হবে কার সঙ্গে কী গোল বাধাচ্ছে, লুকিয়ে লুকিয়ে!

কলিং বেলটা বাজল। অন্যদিন যেরকম বাজে সেরকমই। তার মানে আলাদা কোন উত্তেজনা নেই। রিম্পা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই প্লাস্টিকের প্যাকেট হাতে সুবিমল ঢুকল। জুতোটা খুলে রাখল র্যাকে। জুতোতে কাদা নেই। তার মানে রাস্তায় জল দাঁড়ায় নি। হুম! অর্থাৎ বৃষ্টি হয় নি, কিংবা জলের পাইপ অক্ষত। কিন্তু একটু আগেই আকাশ বার্তায় দেখাচ্ছিল কলেজ স্ট্রীটের ওদিকটায় বৃষ্টি হয়েছে। বেশ ভালোই। খটকা!

চশমা পড়তেই নজরে এলো গোঁফের কাছটায় কিছু সাদা সাদা রোঁয়া। রুমাল, রুমালের সুতোগুলো লেগে আছে। অর্থাৎ, রুমাল দিয়ে নাক ঢাকতে হয়েছিল। কেন? কোন গন্ধ সুবিমলের অসহ্য লাগে! চকিতে শান্তিনিকেতনের বাইরে বিলুদার চপের দোকানের কথা মাথায় এলো। চপ ভাজার সময় যে সর্ষের তেলের ঝাঁঝ উঠত সেটা বিমলের একদম সহ্য হয় না! বিয়ের পর থেকে তো সাদা তেলেই...

তার মানে যার বাড়িতে গেছিল সে নিশ্চয় তেলেভাজা বানিয়েছিল! চপ না পেঁয়াজি?

“কী হল মিতা, অমন ড্যাব ড্যাব করে কী দেখছ?” প্যাকেট হাতে সামনে এগিয়ে এলো সুবিমল।

“তোমার ব্লাড প্রেসার নর্মাল?” বেশি তেলেভাজা খেলে ব্লাড প্রেসার বাড়ে, ব্রণ বেরোয়। পারমিতা সানন্দা থেকে জেনেছে।

“হ্যাঁ! ব্লাড প্রেসার, কুকার, সুগার সব নর্মাল!” বলেই ‘হা, হা, হা’ করে প্রাণ খুলে হাসি!

এত বাজে জোক লোকটা আগে দিত? নাকি ফ্লার্ট করতে এসব লাগে! শেষ বাজে জোক দিয়েছিল ফ্রেশার্সের সময়!

“বলছি শোনো না, তুমি আমাকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার বই কিনে আনতে বলেছিলে না? মনে আছে? এই দ্যাখো দুটো কাব্য গ্রন্থ নিয়ে এসেছি।” বলে প্যাকেট থেকে খড়মড় করে বই দুটো টেবিলে রাখল।

পারমিতা এসব ওকে কবে বলেছিল? আদৌ কী বলেছিল! বুড়ো যে কার প্রেমে মজেছে কে জানে!

“আ–আ–আমি? কবে বলেছিলাম?”

“আরে মনে নেই? সেই বিয়ের আগে যখন কলকাতা ঘুরতে এলাম। চাকরিটা সবে পেয়েছিলাম। তুমিও তখন এই এন-জি-ও’র সঙ্গে অত ব্যস্ত হয়ে পড়ো নি। মনে আছে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। তখন তো তুমি প্রথম মাসের মাইনেও পাওনি।... বলে ছিলাম বটে। কফি হাউসে বসে আড্ডা দেওয়ার সময়, না? সেকথা এত দিনে খেয়াল হল, তোমার?”

“বেটার লেট দ্যান নেভার! হে হে...” তারপর জামা ছাড়তে চলে গেল সে।

সত্যি কিসব দিন ছিল। আগে কলেজে একসাথে ঘুরে বেড়ানো, আম্রকুঞ্জে কবিতা পাঠ, ফুল পেড়ে দিত বিমল ওর জন্য... তারপর দোল উৎসবে বাঁধভাঙা হৃদয়ের উচ্ছ্বাস। বসন্তের রঙে যেদিন বিমল ওকে মনের কথাটা বলল... সেইসব দিনগুলো ভাবলেই কেমন একটা করে! বলে বোঝানো যাবে না...

অথচ, আজ দুজনেরই এমন হেক্টিক শিডিউল... ভালো করে বসে সেইসব দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করারও জো নেই। পারমিতা বই গুলোর পাতা ওলটাতে ওলটাতে উঠে গেল। রুটি বানাতে হবে। কাল আবার সকাল সকাল অফিস, স্কুল, কলেজ... নিজেরও একটা প্রোগ্রাম আছে।


জায়গাটা খানিকটা আচমকাই আবিষ্কার করে বসল পারমিতা। পিউদের বাড়িতে নেক্সট দিনের অ্যাজেন্ডা নিয়ে আলোচনা সেরে ফিরছিল। কী খেয়াল হল বেডিং হাউসের পাশের রাস্তাটা ধরল। একটু ঘুরপথ, কিন্তু তাও। চারদিকে ষ্টেশনারি দোকানপত্র। বাড়িঘর কম। একটা ছোট শিশু উদ্যান আছে। তার পাশে ইন্দিরা গান্ধির আবক্ষ মূর্তি। সেখান থেকেই তেলের আড়তের কড়া গন্ধটা নাকে আসছিল। টুক করে সেদিকে বাঁক নিল। দুদিক দেখতে দেখতেই হাঁটছিল। একটা পুরনো দালান বাড়ির সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। ব্যানার লাগানো আছে, “ঝলকানি – আমরা সময় দিয়ে থাকি”।

কোথায় যেন দেখেছে! খুব বেশি দিন না, এই কিছু মাস আগেই হবে। কোথায় যেন! ও হ্যাঁ, সুবিমলের পার্সে। গ্যাসওয়ালাকে টাকা দিতে গিয়ে। বিমল তখন ওয়াশরুমে ছিল। জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, “আমার এক স্কুল ফ্রেন্ড একটা কাউন্সিলিং হাউস খুলেছে। এটা সেখানকার কার্ড। সেদিন দেখা হল, তাই...”

সাহস করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। হালকা আলোয় ঘেরা ঘরটা। একটা লোক টুলের ওপর বসে ঢুলছে। ওভাবেই জিজ্ঞেস করল, “কটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট? কোথায় যেতে চান, অতীতে না ভবিষ্যতে? কতক্ষণের জার্নি করবেন? এগুলো এই ফর্মে লিখে জমা দিন। একজন এখুনি ফিরবে, সেরকম হলে আগে সিট পেয়ে যেতে পারেন। পেন আছে সঙ্গে?”

“একি রে দিদি, তুই দরজা খুলছিস! মা কোথায়?”, রঙিন ঢুকেই জিজ্ঞেস করল।

“কোথায় আবার। ঐ ওখানে। একসঙ্গেই বেরিয়েছে। দেখ গে, আজ আবার নাকি পৌষমেলা যাবে দুজনে। ওখানেই বাবা প্রথম কানের দুল কিনে দিয়েছিল মাকে।”, ফোনটা চার্জে বসাতে বসাতে বলল রিম্পা।

“ওরে বাব্বা! তা বেশ। ...বলছি তুই স্যুপি নুডলস বানাতে পারিস?”

“অসহ্য! যা ফ্রেশ হয়ে আয়। দিচ্ছি–”, মুখ বেঁকিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল রিম্পা। টিভিতে আবৃত্তির একটা অনুষ্ঠান চলছে... “আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে?”

অলংকরণ - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল

পাঠকেরা যা পড়ছেন