মাতৃস্নেহ

অঙ্কন মুখোপাধ্যায়


১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের প্রতি চার দফা দাবি পেশ করেন, এর কিছুদিন পর ২৫শে মার্চ উনি বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করেন। সেইদিনই, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে সেনা অভ্যুত্থানের নির্দেশ দেন, শুরু হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নির্বিচারে গণহত্যা পর্ব।

পশ্চিম পাকিস্তানের, সেনাদলের রেজিমেন্টে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে, আফজলের আগমন ঘটে। আফজল বয়সে পাকিস্তান রাষ্ট্রের থেকে মাত্র তিন বছরের বড়। অন্যান্য হাজারও সৈনিকের মতই, সে এদেশে হত্যালীলায় ঘাতকের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করতে এসেছে। বয়স এতটা কম হলেও, মানুষ মারতে আফজলের হাত কাঁপে না । আসলে ওদের ওইভাবেই তৈরি করা হয়েছে, নির্মম, ক্ষমাহীন, হিংস্র।

আফজল পাকিস্তানের লাহোরে বড় হয়েছে, যদিও আশ্চর্যের বিষয়, ওর জন্ম যশোরে। বুনিয়াদী শিক্ষা, মৌলবাদী চিন্তাধারা, ধর্মের গোঁড়ামি ও ঠুনকো ঔদ্ধত্য এগুলো ছোটবেলা থেকেই পেতে শুরু করেছিল লাহোরে। এর উপর ওর মায়ের অনুপস্থিতি, বাবার ওর প্রতি ক্রুর ব্যবহার... সব মিলিয়ে ছেলেটার মধ্যে মানুষের প্রতি ভালবাসা, মানবতার উপর বিশ্বাস, মায়ামমতার ছিটেফোঁটা নেই।

আফজলের রেজিমেন্টের কমান্ডর ঠিক করলেন ওনারা যশোর থেকে নোয়াপাড়া অবধি একটা সৈন্যবেষ্টনী তৈরি করবেন, এর কারণ দুটো; প্রথমটা তাৎক্ষনিক, যশোর থেকে এই নোয়াপাড়া যেতে বহু ছোটবড় গ্রাম পড়ে। ওনারা জানতে পেরেছেন এই গ্রামগুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তাই প্রথমেই তাদের নিরস্ত করা। দ্বিতীয় কারণটা সুদূরপ্রসারী, ভারত আজ নয় কাল সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলে এই সমগ্র জায়গাটা হবে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা ছাউনি। সেক্ষেত্রে ভারতের আক্রমণ ঠেকাতে তাদের কিছুটা সুবিধে হবে।

পাকিস্তান সৈন্যদের অভিযান শুরু হল। মুক্তিযোদ্ধারাও প্রস্তুত, বাংলাদেশের বাঙালি সৈন্যরা সরকারী শিবির ত্যাগ করে তাদের বাঙালি ভাইবোনদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। শুরু হল ভীষণ যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধ কারা করবে, আসলে দুর্বল বাঙালিদের উপর অকথ্য অত্যাচার শুরু হল। আফজলরা ঝাঁপিয়ে পড়ল বাংলাদেশের অগণিত অসহায় মানুষের উপর, নারী-পুরুষ-বাচ্চা-বুড়ো কিছুই বাদ দিল না, চোখের সামনে যাকে পেয়েছে, গুলি করেছে। গ্রামের পর গ্রাম, ছোট গ্রাম, বড় গ্রাম পাকিস্তান সৈন্যরা ধূলিসাৎ করে এগিয়ে চলল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে রাহাজানি, অনাহার, মড়ক। যেন জাহান্নামের দরজা খুলে গেছে।

এরকমই একটি গ্রাম, বদরতলা। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বড় অংশ এখানে রণকৌশল শিখছে, এমন খবর পাওয়া গেল। আফজলের সৈন্যদল সেইদিন ভোররাতেই বদরতলা আক্রমণ করল। অতর্কিত আক্রমণে বহু গ্রামবাসী মারা পড়ল, বিশেষ করে গ্রামের যুবকরা রেহাই পেল না আর যুবতীরা পাকিস্তান সৈন্যদের ভোগলীলার শিকার হল। যুদ্ধের শেষে আফজলের বন্ধুরা যখন এই চড়ুইভাতিতে মেতেছে, তখন আফজলই বা বাদ যায় কেন? তাই আফজলও একটা মাটির বাড়িতে দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ল। ঘরের এককোণে একটা তক্তপোশ, কিছু এলোমেলো আসবাব, আর পাশের ঘরে যাওয়ার একটা ছোট দরজা, হয়তো রান্নাঘর ওইদিকে । আফজল রাইফেল উঁচিয়ে ধীরেধীরে ঘরটাতে প্রবেশ করল, তখন ভোরের আলো সবে খড়ের চালের ফাঁক দিয়ে ঢুকছে, তক্তপোশের চারদিকটা কিছুটা দৃষ্টিগোচর । ওর পিছনের দরজা দিয়ে বাইরের কিছুটা হাওয়া ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল, পোড়া বারুদের গন্ধ, কিছুটা এগোতে তক্তপোশের একদিকে একজনকে লুকিয়ে থাকতে দেখল, মেয়েমানুষ, বারুদের গন্ধের মধ্যেও নারী মাংসের গন্ধ ওর নাকে এসে ঠেকতে লাগল। আফজলের মুখে তখন শিকার বাগে পাওয়ার আলাদা তৃপ্তি, রাইফেল নামিয়ে নিলো ও। কোনও বিপদ নেই। দরজাটা বন্ধ করতেই মহিলাটি আফজলের পিছন থেকে এক ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। আফজল কিছুটা সামলে নিয়ে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটে এক বাড়ি মারল, মহিলাটির গুঁতো খেয়ে প্রাণ বেরিয়ে যায় যায় অবস্থা। দম নিতে পারছে না, আফজল তারই উপর কষিয়ে থাপ্পড় মারল, হুমড়ি খেয়ে তক্তপোশের পায়াতে ওর মাথা ঠুকে গেল, মহিলাটি নিস্তেজ হয়ে ধরাশায়ী হয়ে পড়ল । ব্যাস আফজল তো এটার অপেক্ষাতেই ছিল, রাইফেলটাকে একদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে, বুট জুতো খুলে আশ মিটিয়ে মহিলাটিকে ভোগ করল।

আফজল এতক্ষণ খেয়াল করেনি যে মহিলাটি মাঝবয়সী। সকালের কিছুটা সময় পেরিয়ে গেলে সেটা সে বুঝতে পারে, অবিশ্যি তার বয়স নিয়ে মাথা ব্যথা নেই, ওর শরীর একটা পেলেই হল । ধস্তাধস্তিতে জামাটার কলারের কাছটা একটু ছিঁড়ে গেছে, সে যাকগে’ । আফজল তৈরি হয়ে নিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে নিজের সৈন্যদলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। ও অবশ্য ওর দলের অন্য সৈন্যদের মত মহিলাটিকে মেরেই ফেলতে পারত, ওরা যেখানেই এইরকম ঘটনা ঘটিয়েছে, যৌনতার বিনিময়ে প্রত্যেকের কপালে একটা করে বুলেট ভরে দিয়ে এসেছে, কেউ আবার সেটুকু করতেও কার্পণ্য করেছে। গলা টিপে তাদের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করেছে। কেউ আবার এমন পাশবিকভাবে যন্ত্রণা দিয়েছে যে অনেকে এমনিই মরে গেছে। তবে আফজল এগুলোর কোনটাই করল না । কোনও অজানা কারণে মহিলাটিকে বাঁচিয়ে রাখল, হয়তো তার মহিলাটির মাঝবয়সী শরীর পছন্দ হয়েছে, হয়তো সে ভাবল মহিলাটি যন্ত্রণায়ে হোক বা আত্মহত্যা করে নিজেই মরবে। যাই হোক আফজল ও তার অন্যান্য সাথীরা রাইফেল উঁচিয়ে দিগবিজয়ীর মত বুক ফুলিয়ে এক জায়গায় সমবেত হল। এদিনের বাকি সময়টা তারা এখানেই কাটাবে।

পরদিন সকালে আফজলদের দলের কমান্ডর সবাইকে ডেকে বললেন, “আমাদের আক্রমণ ভালো হয়েছে, আমরা ঠিক করেছি যে আমরা এখন এখানেই কিছুদিন বেসক্যাম্প রাখব আর এখান থেকেই আশেপাশের এরকম কিছু গ্রামকে আক্রমণ করব।”

আফজল ভাবল, “তবে এখন এখানেই কিছুদিন কাটাতে হবে, এখানে থেকেই যখন বিভিন্ন দিকে আক্রমণ করতে হবে, তার মানে দিনের শেষে এখানেই ফেরা হবে। জবরদস্ত। তবে কাল রাতের ওইঘরে আবার যাওয়া যেতেই পারে কিন্তু সে যদি মরে গিয়ে থাকে?” এইসব ভাবতে ভাবতে আফজল ওই মহিলাটির ঘরে গিয়ে পৌঁছল।

সেখানে পৌঁছে আফজল দেখল মহিলাটি নিজের শুশ্রূষা করছে। আফজল কিছুটা অবাকই হল। ওর উপস্থিতি বুঝতে পেরেই মহিলাটি চেঁচিয়ে উঠতে গেল, আফজল মুখ চেপে ধরল, আফজল ঠিক এটাই চায়, আফজলরা ঠিক এটাই চায় । ভয় পেয়ে না চেঁচিয়ে উঠলে বলৎকার করে মজা কি?
আফজল এই ব্যাপারটাকে প্রতিদিনের অভ্যেসে পরিণত করে ফেলল। এভাবেই চলতে থাকল প্রতিদিনের ইজ্জত নেওয়ার পর্ব। ও প্রতিদিন যুদ্ধে যায়, মানুষ মেরে ফিরে আসে, বন্ধ করে রাখা ঘরটিতে মহিলাটিকে দিয়ে যৌন খিদে মেটায়, তারপর যাওয়ার আগে ক্যাম্প থেকে আনা কিছু রুটি, কিছু ভাত যখন যেটা পায়, নিয়ে এসে মুখের সামনে ছুঁড়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে সেদিনের মত চলে যায়। ওই মুরগিকে দানাপানি দেওয়ার মত আর কি, ওটাই ওই মহিলাটির সারাদিনের পথ্য, ওর দোস্তেরা এইসবের কিছুই টের পায় না। এমনিতেও ওর কাছের দোস্ত বলে কেউই নেই, কোনদিন ছিলও না। ও মোটামুটি একাই। আর আফজল ওর এই প্রতিদিনের ঘটনা কাউকে জানতেও দেয় না, পাছে কেউ ওর শিকারের ভাগ চেয়ে বসে।

এইভাবে কিছুদিন চলার পর আফজল একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ছোঁড়া গুলিতে ঘায়েল হয়। যদিও চোট অতটা গভীর নয়। ওর ডান হাতের কনুইয়ের উপরের দিকটা গুলিটা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে, শরীরে তাকত আছে। ওই নিয়েই আফজল চলল প্রতিদিনের মত বিছানাতে যুদ্ধ করতে। মহিলাটি প্রতিদিনই আপ্রাণ চেষ্টা করে বাঁচার জন্য আর আফজল ওর শরীরের থেকে ওর এই চেষ্টা করাটাই বেশি উপভোগ করে। অন্যান্য দিনে মহিলাটি আফজলের সাথে পেরে ওঠে না কিন্তু সেদিন আফজলের হাতের দুর্বলতার জন্য সে একবার হলেও আফজলকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা খেয়ে অবশ্য আফজলের আক্রোশ আরও বেড়ে যায়। কিন্তু মহিলাটি বুঝতে পারে আফজল আহত, সেদিনের মত ভোগলীলা তারপর শেষ হয়।

পরদিন আবার আফজল যথারীতি সেখানে যায়, কিন্তু সে বলৎকার করে সেই তৃপ্তিটা পেল না। সেই পাশবিকতার প্রকাশ যেন ঠিক মত হল না, অপরকে কষ্ট দেওয়ার সেই মজাটা আজ খুঁজে পেল না কারণ মহিলাটি ওকে কোন বাধা দেয়নি, উলটে ওর হাতের ক্ষততে একবার ধীরে হাত বুলিয়ে দিয়েছে। আফজল একটা টেনে চড় কষিয়ে দিল।

পরদিন আবার, তারপর দিন আবার, আফজলের ক্ষত কিছুদিনের মধ্যেই শুকোতে শুরু করেছে, কিন্তু যত দিন যাচ্ছে ও বুঝতে পারছে মহিলাটি ওকে বাধা না দিয়ে ওকে ভালবাসতে শুরু করেছে। তবে এ ভালবাসা অন্য ধরনের ভালবাসা। ও সেটা অনুভব করছে। এতদিন আফজল ওই মহিলাটির সাথে কোনও কথাই বলত না, সেদিন বলল, বলতে যেন বাধ্য হল। ওর ওইদিন আর কিছু করতে যেন ইচ্ছে হল না। আফজল বহুদিন মন খুলে কারোর সাথেই কথা বলেনি, গল্প তো করেইনি। রাষ্ট্রের আদেশ মানতে মানতে সে নিজের মধ্যে ক্লান্তি অনুভব করল। খুব ক্রুরভাবে ও কথা বলতে শুরু করল, মহিলাটিও ওকে ধীরে হলেও উত্তর দিল । ওদের এদেশে পাঠানোর আগে, এদেশের বাঙালিদের কথা বোঝার জন্য, আসলে বিরোধীদের মতলব বোঝার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকেই ওদের কাজ চালানোর মত বাংলা শেখানো হয়েছিল । কি অদ্ভুত পরিহাস, এই বাংলা ভাষা ঠেকানোর জন্য ওদের বাংলা শেখাতে হয়েছে । নিজের অজান্তেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলাতে তাই কথা বলে উঠল আফজল...

─ ওই তুহার নাম কি আছে? ওই, তুহারে কেহেছি, কিরে?

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর মহিলাটি বলে উঠল, “তা জেনে তোর কি কাজ?”

─ কামকাজ নেই বলেই জানছি। এখানে কতদিনের বাসা?

─ বহুদিনের, তোর নাম কি?

─ আফজল নাম আছে, আফজল আহমেদ। তোর সাথে আর কেউ থাকে না? মানে থাকত না?

─ না, আমার সাথে... আমি একাই থাকি।

─ একালা থাকিস? বাজারি আউরত নাকি? কি বলে যেন তোদের? আমার দোস্তরা কেহেছিল, কি যেন, হাঁ, রাঁড়।

─ হারামজাদা, বেশরম, দিনের পরদিন আমার ইজ্জত নিয়েছিস, এই বাসাকে তুই হারেম বানিয়েছিস।

আফজল মহিলাটিকে এরপর অনেকক্ষণ কিছু বলল না, আসলে ওকে রাগিয়ে দেওয়ার ওর ইচ্ছে নেই। ওর সাথে একটু পরিচয় করারই ওর ইচ্ছে। কিছুক্ষণ এটা সেটা বলতে বলতে আফজল বুঝল মহিলাটি ওর সাথে কোন কথাই বলবে না। তাই নিজেই ওর সামনে নিজের কিছু জমে থাকা কথা বেমালুম বলতে শুরু করল, মহিলাটি শুনল কি শুনল না সে নিয়ে ওর মাথা ব্যথা নেই।

─ কি জানিস, হরদিন খুনখারাবি করতে আমার ইচ্ছা লাগে না, রোজ, হরপল সোচতা হু কি চলে যাই এখান দিয়ে, আমার ঘর পাকিস্তানের লাহোরে, নাম শুনেছিস? উধার আমার আব্বু থাকে, আমার আম্মি নেই, আমার চাচা আমাকে বলেছিল আজাদির আগে আমার আব্বু এই বাংলাতেই ছিল। ওর ছিল মসলিনের খরিদারি, উনি একাই এসছিলেন ইহাপে। এখান থেকে মসলিন লেকে লাহোরে বেচে দিতেন, উসকে বাদ এখানের যশোরের পাশে কোন আউরতের সাথে মহব্বত হল। আব্বু এখানেই কাজি পকড়কে নিকাহ করলেন, আমি ভি এখানেই পায়েদা হুয়া থা। পরে আজাদির দিনে হিন্দুস্তান-পাকিস্তান হওয়ার দিনে আব্বু লাহোরে চলে যেতে চায়, আমার আম্মি লেকিন ডরকে যেতে চায়নি। আব্বু আম্মিকো ছোড়কে, তালাক দেকে আমাকে নিয়ে লাহোর চলে যায়। উহাপে ফিরসে কারোবার শুরু করে লেকিন সব বেকার হয়ে যায়। আব্বু পাগাল হয়ে যায়, আমি তব বহুত ছোটা, এসবের কুছভি নিজে দেখিনি, আমার চাচা আমাকে মেহেরবানি করে বড়া করে। আব্বু আমাকে হরদম গালি দিতেন আর সবসে গালি দিতেন আমার আম্মিকে, অর-তো-অর, উনহে হিন্দুস্তানকে লিয়ে ভি নফরত থা, শালা ইন কাফিরোকে লিয়েহি এইসব হচ্ছে। ওরা তোদের ছেলেগুলোকেও পাকিস্তানকে নফরত করনে শেখাচ্ছে, আলাদা বতন হতে শেখাচ্ছে। আব্বু মরে গেলে আমি ফৌজে চলে আসি, অর এখন এখানে।

─ আর তোর মা? তোর আম্মির কি হল?

─ কওন? আম্মি? পতা নেহি, মুঝেতো ইয়াদভি নেই, মরে গেছে সায়েদ।

কথাটা শোনার পরেই মহিলাটি হাউহাউ করে কেঁদে উঠল, আফজল কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। দু’ একবার ওকে জিজ্ঞেস করার চেষ্টাও করল কিন্তু মহিলাটি ওকে আর কোনও উত্তর দিল না। এমনিতেও আফজলের কোনও কিছুই যেন ভালো লাগছে না, তাই সময় নষ্ট না করে প্রতিদিনের দানাপানির ঠোঙাটা মহিলাটির পাশে রেখে বেরিয়ে পড়ল, ওটা, মুখে ছুঁড়ে মারল না।

পরদিন আফজল আবার ওই মহিলাটির কাছে গেল, তবে যেহেতু আগের দিন কিছু করার ইচ্ছে ছিল না তাই ও সেদিন ঘরে ঢুকেই নিজের প্রয়োজন মেটাতে উদ্যত হল। মহিলাটিও ওকে বাধা দিল না, উলটে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। আফজল এগুলো মানতে পারছিল না। ওর এইসব ভালবাসাবাসি পোষায় না, ও ভালবাসাটাকেই ঘেন্না করে। মহিলাটিকে একটা চড় মেরে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে রে মাগি?”

মহিলাটি কিছু বলল না, আফজল আবার একটা চড় মারল, “কি হয়েছে তোর?”

─ কিছু হয়নি রে আফজল।

─ ফির? এরকম করছিস কেন?

─ একটা কথা বলছি তোকে, আমিই আসলে তোর হারিয়ে যাওয়া, মা।

─ মতলব? কি বলছিস? এসব কি বলছিস?

─ হ্যাঁরে তোর আব্বু আমাকে ছেড়ে তোকে নিয়ে লাহোর চলে গেছিল, সেই থেকে আমি একা থাকি এখানে।

আফজল ক্ষোভে ফেটে পড়ল। “বেশরম আউরত, জবানকো লাগাম দে। হামসে ঝুট?” এই বলে আফজল মহিলাটির উপর প্রচণ্ড রেগে গেল। মহিলাটি কিছু বলার আগেই ও ওর মুখ চেপে ধরল, তারপর পাশে রাখা একটা গামছা দিয়ে মুখটা বেঁধে ওর যৌন চাহিদা মেটাতে শুরু করল। মহিলাটি ওকে কোন প্রকার বাধা দিল না।

পরদিন আবার আফজল মহিলাটিকে ভোগ করতে গেল, তারপরের দিন আবার। মহিলাটি কিন্তু ওকে ভালবেসেই যাচ্ছে। ওর কোনরকম অসুবিধে করছে না। এইভাবে কিছুদিন চলার পর আফজলেরও কোথাও যেন মনে হতে লাগল, “এ আমার আম্মি নয়তো? না, না... তা কি করে সম্ভব ? কিন্তু...” আফজল বিচলিত হতে থাকে, রোজ যুদ্ধে যায়, গুলি করে মানুষ মারে, কিন্তু মাঝেমাঝেই ওর ওই মহিলাটিকে মনে পড়ে যায়, ওর কথাগুলো মনে পড়ে যায়, ওর নগ্নদেহটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ওর মনে হতে থাকে, “ আচ্ছা এই আমার আম্মিও তো যশোরের কাছাকাছিই কোথাও একটা থাকত, চাচা তো তাই বলেছিল।” এই সমস্ত চিন্তাভাবনা ওকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিতে থাকে। ওর ভেতরটা কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে । মহিলাটির মুখোমুখি প্রতিদিন হলেও আফজল এই নিয়ে কথা বাড়ায় না আর এই কদিন মহিলাটি পাছে কিছু বলতে পারে তার আগেই মুখে কাপড় বেঁধে দেয় । আর বলৎকার ? না ওটা ও আর করতে পারছে না। এখন ওদের মধ্যে যা হচ্ছে তাকে বলৎকার বলা যায় না।

এরকমই একদিন আফজল বন্ধ দরজা খুলে দেখে মহিলাটি তক্তপোশের উপর নিজেই মুখে কাপড় বেঁধে, নগ্ন হয়ে ওর অপেক্ষা করছে। আফজল এই দৃশ্য দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, মহিলাটির পায়ের সামনে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল। মহিলাটিও ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, ওকে আরও কাছে টেনে নিলো। আফজল পাশে রাখা কাপড়টা ওকে জড়িয়ে দিল। মহিলাটি যখন কাপড়টা পড়ছে আফজলের মনের ভিতরটা তখন বেআব্রু হতে শুরু করেছে। ওর বিশ্বাস হল এই মহিলাই ওর আম্মি। হ্যাঁ তাই কারণ তা না হলে এতকিছুর পরেও নিজের সন্তান ছাড়া কেউ কাউকে এতটা ভালবাসতে। এতটা ক্ষমা করে দিতে পারে না। তবুও এতদিনের চারিত্রিক কাঠিন্যের বর্ম খুলে ও বেরোতে পারল না। ও মহিলাটির কাছে কোন ক্ষমাই চাইল না। মহিলাটি ওকে তক্তপোশের একপাশে বসিয়ে স্নেহ করতে লাগল, এতদিন ধরে যে জিনিসটা আফজল পায়নি, সেটা পেতেও ওর খুব দ্বিধা হল। তার উপর এই কদিন ধরে ও যা করেছে। লজ্জা-রাগ-দুঃখে ও পাগল হয়ে গেল, নিজের উপর বিতৃষ্ণায়, আত্মগ্লানিতে মানসিক ভারসাম্য হারাল। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আফজল ওর রাইফেলটা তুলে সকাতরে বলে উঠল, “আম্মিজান, মুঝে বকস দেনা, মুঝে মাফ করে দিও। ” এই বলে নিজের গলার সামনে রাইফেলের নলটা ঠেকিয়ে গুলি চালিয়ে দিল, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গোটা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে, মহিলাটির মুখেও রক্ত ছিটিয়ে এসছে, আফজল ওই বিছানাতেই লুটিয়ে পড়ল। রক্তে বিছানার চাদর ভিজে যাচ্ছে। মহিলাটি পাথর হয়ে গেছে, স্তম্ভিত কিন্তু পরমুহূর্তেই জ্ঞান ফিরে পেয়ে আফজলের শরীরটা চুলের মুটি ধরে সরিয়ে, তাড়াতাড়ি করে বিছানার তলা থেকে একটা পুরনো সাদাকালো ছবি বুকে চেপে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ছবিটা ততক্ষণে আফজলের রক্তে অনেকটাই ভিজে গেছে।

আফজলদের বেসক্যাম্প ওখান থেকে বেশি দূরে নয়। এমন গভীর রাতে চারিদিক নিস্তব্ধ, তার মধ্যে গুলির আওয়াজ পেয়ে ওর কিছু দোস্ত যারা রাত জেগে টহল দিচ্ছিল তারা ওইদিকে ছুটে গেল। এদিকে মহিলাটি চিৎকার করে কেঁদেই চলেছে, কাঁদতে কাঁদতে আবার পাগলের মত হাহাকারও করে উঠতে থাকল। সৈন্যরা সেই আওয়াজের দিকে ছুটে চলল, বহুদিন হল এইধরনের চিল-চিৎকার ওরা এই গ্রামের চারপাশেও শোনেনি, এমন চিৎকার শুনে ওরা অবাক হয়ে গেল। মহিলাটি ততক্ষণে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে আফজলের রাইফেলটা তুলে ওর মৃত শরীরের দিকে তাক করে গুলি করতে যাবে, এমন সময় দরজা ভেঙ্গে আরেক জন সৈন্য ঘরে প্রবেশ করল। আফজল আর মহিলাটির এই রকম অবস্থায় দেখে কিছু ভাবার আগেই মহিলাটিকে নিজের রাইফেল দিয়ে গুলি করল। অব্যর্থ নিশানা। মহিলাটির তলপেটে এসে গুলিটা গেঁথে গেল । মহিলাটি মাটিতে তক্তপোশের একপাশে লুটিয়ে পড়ল, সেই তক্তপোশ, যা বহু ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকল।

ফেহমিদা বিবি তখনও মারা যায়নি, ধীরেধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস অনিয়মিত হচ্ছে, তীব্র যন্ত্রণায় শরীর নেতিয়ে পড়েছে, দৃশটি ঝাপসা হয়ে আসছে, আশেপাশের শব্দও কমে আসছে। ও যেন নিজের ছেলে সাকিবকে ওদের বাড়ির উঠনে দেখতে পাচ্ছে। সাকিব যে মুক্তিবাহিনীতে দেশের জন্য যোগদান করেছিল। সাকিব যাকে তার মায়ের সামনেই আফজল ও তার দোস্তরা গুলি করেছিল। সাকিব যার জন্য তার মা প্রতিশোধ নিলো। ফেহমিদা বিবি অস্ফুটে শুনতে পারছে, এখনও যেন সাকিব মুক্তিবাহিনীর শপথ বাক্য পাঠ করছে, “আমি শপথ করিতেছি যে আমি আমার প্রাণের বিনিময়ে হইলেও মুক্তিবাহিনীর একজন সৈনিক হিসাবে আমার মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সর্ব শক্তি নিয়োগ করিব। জয় বাংলা!”

বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিতে বঙ্গবন্ধু সমাজের নারীজাতিকেও আহ্বান করে বলেছিলেন, “মা-বোনেরা অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ মুক্ত কর।” একজন মায়ের কাছে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রটা কি? আফজলের মরণ সেই অস্ত্রেই হল।


অলংকরণ - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল

পাঠকেরা যা পড়ছেন