পিকচার আভি বাকি হ্যায়

কেয়া রায়


প্রথম পর্ব

একেতেই আজ রবিবার। দুপুরের ভোজনপর্ব সেরে প্রায় সব বাঙালিই নাকে সরষের তেল ঢেলে ঘুম দিতে ব্যস্ত। ফলে শত দরকারের সময় কাউকে ফোনে পাওয়া বিশাল চাপের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অগত্যা নিজের ঘরের সামনের ব্যালকনিতে ইতস্তত ভাবে পায়চারি করছে কিংশুক। কোনও প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে মনে হল এখানে ওখানে। চুলগুলো উস্ক-খুস্ক, গালভর্তি দাড়ি, জিনসের ওপর পাঞ্জাবি পরা, বাঁ হাতে সিগারেটটা পুড়ছে আর ডান হাত পাঞ্জাবির পকেটে। বাইরের পরিবেশটাও গুমোট হয়ে আছে অনেকক্ষণ যাবত। কে জানে বৃষ্টি হবে হয়তো শেষ রাতের দিকে। কিংশুক পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ডায়াল করল কাকে একটা যেন। ও প্রান্ত থেকে সেই ব্যক্তি কল রিসিভ করতেই কিংশুক বেশ ঝাঁঝিয়ে উঠল, “দেখুন সুজিত বাবু, আপনাকে ঠিক যতটুকু করতে বলেছি, ঠিক ততটুকুই করবেন। এর চেয়ে একচুল বেশি বা কম যেন না হয়। কাজ হলে বাকি ৭০% টাকাও পেয়ে যাবেন সময়মতই। ওকে বাই!”

ফোন রাখার পর কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কিংশুক, “নাহ আর বেশি ভাবলে চলবে না, আব তো যো হোগা দেখা জায়েগা।” এইসব মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই কিংশুকের স্ত্রী সায়নী চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।

বিকেলবেলার এই চা পর্বটা ওরা একসাথেই সারে প্রতিদিন। কারণ সারাদিনে একেবারেই সময় হয়ে ওঠে না ওদের। সম্বন্ধ করেই বিয়েটা হয়েছে। সায়নীর রূপে হয়তো তেমন কোনও বিশেষত্ব ছিল না, কিন্তু মেয়েটার স্বভাব-চরিত্র দেখে কিংশুকের মা-বাবা একবারেই রাজী হয়ে যায়। ফলে তাদের ছেলেকেও অনেক কসরত করে রাজী করানো হয় শেষে। তা হলে কি হবে, বিয়ের এত মাস পেরোনোর পরও ওদের মধ্যেকার সম্পর্ক এখনও সেভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। দায়বদ্ধতার খাতিরে যতটুকু না থাকলেই নয়, ঠিক ততটুকুই বর্তমান। আচমকা বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। সায়নী হাতের চায়ের কাপটা রেখে কোনওমতে ছুটে গেল ছাদে, শুকোতে দেওয়া কাপড়গুলো আনতে। কিংশুকের মা-বাবা থাকেন নীচতলায় আর ওরা থাকে দোতলায়। ফলে জামাকাপড় শুকোতে দেওয়া বা তুলে আনার দায়িত্ব সায়নীর ওপরেই রয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির ছাঁটে জামাকাপড় গুলোর সাথে সায়নী নিজেও খানিকটা ভিজে গিয়েছে। ছাদ থেকে নেমে শাড়ির আঁচল দিয়েই মুখ-হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল।

কিংশুক বিছানায় বেশ রিল্যাক্স মুডে বসে আর একখানা সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে। বিছানা থেকেই আড়চোখে সায়নীকে দেখছে মাঝে মাঝে। শাড়িটা বেশ ভিজে যাওয়ায় গায়ের সাথ খানিকটা সেঁটে রয়েছে, চুলও ভিজে যাওয়ায় খোঁপা খুলে দিয়েছে সায়নী - ফলে সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা মাদকতা ছড়িয়ে দিয়েছে ঘরটায়। কিংশুকও আজ তাতে আসক্ত হচ্ছে একটু একটু করে। বিছানা থেকে উঠে এসে কিংশুক এই প্রথম নিজের স্ত্রী’কে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। সায়নী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওকে বিছানায় নিয়ে শরীরী উষ্ণতায় কেঁপে উঠল দুজনে। সায়নী সুখসাগরের অতল গভীরে পৌঁছোতে পৌঁছোতে ভাবল, “তবে আজ থেকেই কি আমি সম্পূর্ণরূপে ওর স্ত্রী হয়ে উঠলাম?” ঠিক সেই মুহূর্তেই কিংশুক সায়নীর বুকের খাঁজে নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে আপনমনে বলে উঠল, “কোয়েল প্লিজ ট্রাস্ট মি, আই রিয়্যালি লাভ ইউ কোয়েল।”


দ্বিতীয় পর্ব

বিছানার ওপর সমস্ত গল্পের বইগুলো ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেই অগোছালো বিছানারই দু’প্রান্তে বসে কোয়েল আর মৃণ্ময় গল্প করে যাচ্ছে বিকেল থেকে। দুজনের হাতে ভিন্ন ভিন দুটো বিষয়ের ওপর দু’খানা বই, কোয়েলের প্রিয় ব্যোমকেশ সমগ্র আর মৃণ্ময়ের হাতে সোনালি অর্কিড। ওদের গল্পের থিমটা খুব সম্ভবত ওই দু’খানা বইয়ের ভেতরকার বিষয়কে কেন্দ্র করেই বেশ জমে উঠেছে। কিন্তু ওদের গল্পের মাঝে ছন্দপতন ঘটল খানিকটা, কারণ কোয়েলের গলার পোড়া জায়গায় হঠাৎ টনটন করে উঠল। মৃণ্ময় দিশেহারা হয়ে কোয়েলের মা’কে ডাকল আর কোয়েলের সামনে এসে নিচু গলায় বলতে লাগল, “দেখলি তো, আবার ব্যথাটা শুরু হয়ে গেল। তোকে বারবার বলছিলাম আমি, এত কথা বলিস না। কিন্তু কে শোনে কার কথা !” কোয়েল মুচকি মুচকি হাসছে ওর কথা শুনে। ওর হাসিটা ঠিক চোখে পড়তেই মৃণ্ময় রেগে গিয়ে বলল, “আবার হাসছিস? থাক তুই এখানে। আই জাস্ট হেট ইউ।” এই বলেই দূরে সরে গিয়ে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াল।

যাই হোক, কিছুক্ষণের মধ্যেই কোয়েলের মা এসে মলম লাগিয়ে মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কোয়েলের মা আর মৃন্ময় ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে কোয়েল বলল, “মা, আমি ঠিক আছি। তুমি যাও, কাজ করো গিয়ে। ও থাকুক আমার এখানে। সারাটাদিন একা একা থাকতে ভালো লাগে না যে আমার। তুমি চিন্তা করো না, আমি কথা বলব না একটুও। শুধু ওর কথা শুনব।”

কোয়েলের মা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মৃণ্ময় কোয়েলের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, “তুই কি আমাদের বিয়ের পরও আমার কথার এতটা অবাধ্য হবি? তুই কেন বুঝিস না যে, আমার কত চিন্তা হয় তোর জন্যে।” কোয়েল মুখ ঘুরিয়ে চোখের জল মুছে মৃণ্ময়কে কাছে টেনে কানে কানে বলল, “আমার এই অ্যাসিড-পোড়ায় ক্ষত শরীরকে বিয়ে করে কি পাবি তুই বল?”

—“আমি যদি তোর শরীরটাকেই পাওয়ার চেষ্টা করতাম তাহলে বহুদিন আগেই তোর এই শরীরটা চেখে নিয়ে ফেলে দিতাম। আর অ্যাসিড-পোড়া ক্ষতটা কোনও দুর্ঘটনা নয়, বরং কিংশুকের মতো জানোয়ারদের লালসাকে বাস্তবায়িত করতে না পারার ফলাফল মাত্র। তাই এরপরে আর কখনও ওইধরনের বাজে প্রশ্ন করবি না।”

—“আচ্ছা বাবা সরি বলছি। এই দ্যাখ কানও ধরছি। হয়েছে শান্তি।”

—“এভাবে বারবার পুরনো কথা মনে করে নিজের ক্ষতগুলোকে আরও বাড়িয়ে কি লাভ বলতো? তুইও কষ্ট পাস আর আমিও।”

কোয়েল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, “আমি সত্যি খুব লাকি রে তোর মতো একটা ছেলেকে আমার লাইফ পার্টনার হিসেবে পেয়ে। আই লাভ ইউ মৃণ্ময়।”

মৃণ্ময় কোয়েলের চোখের জল মুছে দিল আলতোভাবে আর বলল, “একবার শুধু বিদেশে যাওয়ার অফারটা পেয়ে যাই হাতে, তারপর তোকে নিয়ে চলে যাব এখান থেকে। আমাদের দুজনের বাড়িতেও রাজি, তোকে নিশ্চিন্তে আগলে রাখতে পারব আর তোর ভালো ট্রিটমেন্ট করাতে পারব তখন।” এই বলেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল মৃণ্ময়। কোয়েল আজ সলজ্জ হাসি হাসল বহুদিন পর।

মৃণ্ময় চলে যাওয়ার পর কোয়েল ধীরে ধীরে উঠে বসল বিছানায় হেলান দিয়ে। চিন্তা-ভাবনাগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আজ থেকে বছর খানেক আগে ইউনিভার্সিটির কেমিস্ট্রির ল্যাবে, প্রফেসর কিংশুক রায় তারই মেধাবী ছাত্রী কোয়েলকে পাওয়ার জন্যে যা করতে চেয়েছিলেন, তা কি ভালোবাসাকে কাছে না পাওয়ার আক্রোশ নাকি, ভালোবাসাকে নিজের করে নেওয়ার চেষ্টায় প্রেমিকার শরীরে অ্যাসিড ছুঁড়ে দেওয়া? কোয়েলের কাছে এর কোনও উত্তর নেই। তাই বলে অতীতের সাথে বর্তমানের দ্বন্দ্ব কি এভাবেই চলতে থাকবে আজীবন! বাইরে বৃষ্টিটা থেমেছে মনে হয়, বেশ ঠাণ্ডা হাওয়াও দিচ্ছে। গুমোট ভাবটাও কেটে গিয়েছে। হঠাৎ কোয়েলের খেয়াল হল, মৃণ্ময় তাড়াহুড়োয় ওর রেনকোটখানা না নিয়েই চলে গিয়েছে। আপনমনেই ও হেসে বলে উঠল, “এক্কেবারে ভুলোমন একটা।” মোবাইলটা হাতে নিয়ে মৃণ্ময়কে ফোন করল এই ভেবে, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই বাড়িতে চলে গেল নাকি ছেলেটা, কিন্তু ওপ্রান্ত থেকে শুধু ‘নট রিচেবল’ বলে যাচ্ছে। ফলে কোয়েলের কপালে অজান্তেই চিন্তার রেখা ফুটে উঠল।


তৃতীয় পর্ব

পুজোর পর সায়নীর বাপের বাড়িতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও, বাধ্য হয়ে কিংশুককে সস্ত্রীক পদার্পণ করতে হল বিজয়া দশমীর প্রণাম জানাতে। বিয়ের পর ওদের প্রথম পুজোটা এমন যাবে সায়নী হয়তো নিজেও আশা করেনি। সম্পর্কটা যেন ক্রমশ আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। বাপের বাড়িতে গিয়ে কিছুটা হলেও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সায়নী। সেদিন বিকেলের পর থেকে শারীরিকভাবেও আর মিলিত হয়নি ওরা, কিংবা বলা যায় সায়নী আর সায় দিতে পারেনি মন থেকে। সত্যি বলতে তা হয়তো সম্ভবও নয়। বাড়িতে আসার পর থেকে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে সায়নী। কিন্তু নিজের ছোটবেলার বন্ধু শর্মির চোখকে তা এড়াতে পারেনি। দ্বিতীয় দিন সকালে ওখান থেকেই কিংশুক সোজা কলেজে চলে গেলে সুযোগ বুঝে সায়নী শর্মিকে সামনের এক কফি শপে ডেকে নিলো। বেলা প্রায় তখন ১২টা ঘড়ির কাঁটায়। দুজনে গিয়ে কোণার দিকের দুটো সীট নিয়ে বসল আর দুটো কোল্ড কফির অর্ডার দিল ওয়েটারকে ডেকে। শর্মি কোনোরকম ভণিতা না করেই সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করল, “সায়নী, সত্যি করে বল, তুই হ্যাপি তো কিংশুক দা’র সাথে?”

বেশ কিছুক্ষণ চুপটি করে থাকার পর সায়নী মুখ খুলল, “কি করে হ্যাপি থাকা যায় বলবি রে আমাকে?”

—“মানেটা কি? এসব কি বলছিস? ইজ এনিথিং রং?”

—“এভরিথিং ইজ রং, একটা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ফিজিক্যাল রিলেশনের সময় যদি সেই স্বামী অন্য কোনও মেয়ের নাম মুখে আনে, তবে সেই স্ত্রী কি করে হ্যাপি থাকবে বলতে পারিস?”

—“হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি? আই জাস্ট কান্ট বিলিভ দিস।”

—“কিন্তু আমি ঠিকই বলছি। এবার মনে হচ্ছে তোর কথাটা শুনলেই ভালো হত।”

—“আমার তো প্রথম থেকেই কিংশুক দা’র হাবভাবে ডাউট হচ্ছিল। তোকে বললাম ভেবেচিন্তে ডিসিশন নিতে। কিন্তু...”

—“হ্যাঁ ঠিক, কিন্তু আমি মা-বাবার মুখের দিকে চেয়ে ডিসিশনটা একটু বেশিই জলদি নিয়ে ফেললাম আর কি...”

—“বাড়িতে জানিয়েছিস এ ব্যাপারে?”

- “পাগল নাকি? বাবার অবস্থাটা তো জানিসই, এসব শুনলে আর বাঁচবে না রে।”

—“তাহলে কি করবি?”

—“অ্যাট ফার্স্ট আমায় সমস্ত ঘটনা জানতে হবে অ্যাট এনি কস্ট। আচ্ছা তোর বর সুজিত দা’ও তো এখন কিংশুকের কলেজেই ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট, তাই না?”

—“হ্যাঁ, কিন্তু কেন বলতো?”

—“তোর বরের কাছ থেকে কিংশুকের ব্যাপারে খবর নিয়ে আমায় জানাবি প্লিজ? কিন্তু কাজটা করতে হবে তোকেই আর ইনডিরেক্টলি। মানে সুজিত দা’কে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে তুই আমার হয়ে কাজ করছিস।”

—“হুম বুঝলাম, তাহলে তাই হবে। কিন্তু আমিই কেন?”

—“কারণ, তোকে আর তোর বরকে কিংশুক আজ পর্যন্ত দেখেনি আর আমার বিয়ের সময়ও তুই এখানে ছিলিস না বলে পরিচয়টাও হয়নি। এদিকে তোর বর শুধু আমায় দেখেছিল তোর বিয়ের সময়। কলেজে ওরা দুজনে কলিগ হলেও সামনাসামনি দুজন দুজনের সাথে পরিচিত নয়। তাই তুই ছাড়া এই কাজটা কেউ করতে পারবে না।”

—“হুম তা বটে। সত্যিই আজও তুই মাস্টারমাইণ্ড।”

—“হা হা, বলছিস?”

- “আলবাত বলছি। তবে সিরিয়াসলি বলছি, তুই আবার তোর আগের ফর্মে ফিরে আয় সায়নী। জানি তোর মানসিক পরিস্থিতি ঠিক নেই, তবুও বলছি।”

—“হ্যাঁ রে, তাই হতে হবে এখন দেখছি।”

আজ থেকে আট মাস আগে শর্মির সাথে সুজিতের বিয়ে হয় ম্যাট্রিমনি সাইটের মাধ্যমে আর তার তিন মাস পর সায়নীর সাথে কিংশুকের বিয়ে হয় দুই পরিবার থেকে দেখাশোনা করে। কিন্তু সায়নীর যখন বিয়ে হয় তখন শর্মিরা ব্যাঙ্গালুরুতে গিয়েছিল সুজিতের স্ত্রী শর্মির হার্টের চেক-আপের জন্যে। ফলে এই ক’মাসের মধ্যে দুই ছোটবেলার বান্ধবীর আর দেখাও হয়নি আর তাদের হাজব্যাণ্ডের মধ্যে ফেস টু ফেস ইন্ট্রোডিউজটাও আর হয়ে ওঠেনি কোনও না কোনোভাবে। বিয়ের পর দুজনেই প্রথম বিজয়া দশমীতে এসেছে বাপের বাড়িতে। তবে ভগবান হয়তো যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন। কারণ, এই একে অপরের অপরিচিত হয়ে থাকাটাই আজ সায়নীর জীবনে আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। এইসব ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে সায়নী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিজের অজান্তেই। শর্মি তা দেখে ওর হাতটা ধরে বলল, “এত চিন্তা করিস না। আমি তো আছিই তোর পাশে সবসময়।” কথাগুলো শুনে সায়নী কিছুটা হলেও মনে জোর পেল বলে মনে হল। যাই হোক, বিল পেমেন্ট করে ওরা একসাথে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির উদ্দেশ্যে।


চতুর্থ পর্ব

সেদিন ঐ বৃষ্টিভেজা রাতে কোয়েলের বাড়ি থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে মৃণ্ময় নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল বটে। তবে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেল ওদের বাড়ির নতুন ভাড়াটে সুজিত দা’কে কিংশুকের সাথে দুটো বাণ্ডিল টাকা হাতে নিয়ে বেশ তর্কাতর্কি চলছে। মৃণ্ময়ের মনে সন্দেহ চাগাড় দিয়ে ওঠায় নিজের কৌতূহল আটকে রাখতে পারল না। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে একটা বটগাছের আড়াল নিলো জলদি। সেখান থেকে শুনতে পেল ওদের তর্কাতর্কির মূল বিষয়। কিংশুক বারবার বলে যাচ্ছে, “দেখুন সুজিতবাবু, আপনার ভালোর জন্যেই কিন্তু কাজটা আপনাকে দিয়েছি। নইলে আমার এ কাজের জন্যে এর চাইতে কম টাকায় অন্য কাউকে ঠিক করা কোনও ব্যাপার নয় আমার কাছে। আশা করি আপনি আমার ক্ষমতা ভালো করেই বুঝে গিয়েছেন ইতিমধ্যে।”

সুজিত বাবু হাতজোড় করে অনুরোধ করে বলল, “দেখুন স্যার, আমি অতি সাধারণ একটা মানুষ। আপনি এর আগে কোয়েল ম্যাডামের খবর আনতে বলেছিলেন, আমি সব খবর এনে দিয়েছি। এমনকি এর জন্যে ভাড়াবাড়িটাও অবধি চেঞ্জ করে মৃণ্ময়বাবুর পাশের বাড়িতে এলাম। কিন্তু তাই বলে কারোর ক্ষতি করা সম্ভব নয়।”

—“আরে তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? তুমি ধরা পড়বে না। এমনভাবে প্ল্যান করা হবে যে, সাপও মরবে কিন্তু লাঠিও ভাঙবে না। আর চিন্তা করো না, কাজটা হলে দ্বিগুণ টাকা পাবে তুমি। তাতে রিসেন্টলি তোমার ওয়াইফের হার্টে যে হোল রয়েছে সেটা ব্যাঙ্গালুরুতে গিয়ে সার্জারিও করাতে পারবে তাড়াতাড়ি। এমনিতেই টাকার জন্যে অপারেশনের ডেট পিছিয়ে যাচ্ছে তোমাদের, সে খবর আমার অজানা নয়। তাই বলি কি, আমার কথাটা মানা ছাড়া তোমার অন্য গতি নেই।”

ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সুজিত মিত্র ততক্ষণে ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছেন যে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। দু’চোখ বেয়ে ক্রমাগত জল গড়াচ্ছে। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কিংশুক ভালো করেই জানে, কোনও কাজ আদায় করতে হয়ে মানুষের দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে হয়। তাই ও নিশ্চিন্তে একখানা সিগারেট ধরিয়ে অপেক্ষা করল সুজিতের উত্তরের। সুজিত অম্লানবদনে বলল, “আমি রাজি। বলুন কি করতে হবে আমায়?”

মৃণ্ময় এহেন কথোপকথন শুনে পুরোদস্তুর হতবাক হয়ে গেল। এসব কি শুনেছে ও, নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। “নাহ আর নয়। যদি ওরা সত্যি সত্যি কোয়েলের আরও বড়ো কোনও ক্ষতি করতে চায় তবে আর ছাড়ব না আমি..আমিও দেখিয়ে দেব কত ধানে কত চাল ! কিন্তু তার আগে আমায় জানতে হবে যে, ওরা কার কি ক্ষতি করতে চাইছে।” মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়েছিল মৃণ্ময়। কিন্তু ঘুম আসছিল না কিছুতেই। রাত প্রায় ১২টা তখন, ঘড়ির কাঁটাও জানান দিচ্ছে। বিছানা ছেড়ে ছাদে গিয়ে একখানা সিগারেট ধরাল আর ফোন করল কোয়েলকে। কোয়েল ঘুম জড়ানো গলায় কল রিসিভ করে বলল, “হ্যাঁ রে বল, এখনও ঘুমোসনি তুই?”

—“না শুয়েছিলাম, কিন্তু ঘুম আসছিল না।”

—“আচ্ছা সেইজন্যে এত রাতে আমায় ফোন আর তার সাথে সিগারেট ধরিয়েছিস?”

—“সব বুঝে যাস কি করে বলতো? আচ্ছা ওসব ছাড়, আমার একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিবি?”

—“হ্যাঁ নিশ্চয়ই। বল কি বলবি।”

—“বলছিলাম কি, তুই কি কোনোভাবে জানতে পেরেছিস, কিংশুক বিয়ে করেছে কিনা?”

—“উম হ্যাঁ জানি তো। শুনেছিলাম বিয়ে হয়েছে কিছু মাস হল। অ্যারেঞ্জড ম্যারেইজ, মেয়েটার নামটা খুব সম্ভবত সায়নী। কিন্তু তুই এসব হঠাৎ জিজ্ঞাসা করছিস কেন?”

—“না না তেমন কিছু না, এমনি আর কি মনে হল, তাই জিজ্ঞাসা করলাম। যাক গে, ঘুমো গিয়ে তুই। সরি এত রাতে ফোন করে তোকে জ্বালালাম বলে।”

—“পাগল একটা। টাটা, গুড নাইট।”

—“হুম লাভ ইউ আ লট।” এই বলেই কল ডিসকানেক্ট করে দিল মৃণ্ময়। এরপর সিগারেটের শেষ সুখটান দিয়ে বিছানায় চলে গেল।

এই ঘটনা ঘটে যাওয়ার কিছুদিন পর সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরনোর সময় মৃণ্ময় লক্ষ্য করল যে, গতরাতের সেই লোকটি মানে সুজিতবাবু ওর পিছু নিয়েছে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। ফলে সতর্ক হতে কোয়েলের কলও রিসিভ করেনি ও। রিং হয়ে হয়ে একসময় বন্ধ হয়ে গিয়েছে নিজে থেকেই। মৃণ্ময় অফিসের বাসে উঠে বসে ভাবতে লাগল কিভাবে সেই লোকটিকে হাতেনাতে ধরা যায়। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। সেদিন সন্ধেবেলায় ফেরার সময় আবার সুজিতবাবু মৃণ্ময়ের পিছু নিয়েছিল। কিন্তু মৃণ্ময় বুদ্ধি খাটিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে একটি চায়ের দোকানের ভেতরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। ফলে লোকটি মৃণ্ময়ের অবস্থান ধরতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

কোনও উপায় না পেয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কিংশুককে ফোন করে জানাল, “স্যার, মৃণ্ময় বাবু সন্ধ্যার অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে আচমকা আমার চোখের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছেন মনে হয়। আর তো পিছু নেওয়া সম্ভব নয় এখন। আমি কি করব এবার?” ব্যাস, ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে একটা বলিষ্ঠ চেহারার হাত এসে সুজিতবাবুর কাঁধে এসে পড়ল। থতমত খেয়ে কল ডিসকানেক্ট করে মুখ ঘোরাতেই দেখে, যার পিছু এতদিন ধরে নিয়েছে, আজ সে নিজেই সামনে দাঁড়িয়ে। ভয়ে তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল ক্রমশ। তিনি নিজেও হয়তো জানেন না, পরবর্তীতে ঠিক কি হতে চলেছে তার সাথে!


পঞ্চম পর্ব

ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট সুজিত মিত্রের সাথে মৃণ্ময়ের সাক্ষাৎ হওয়ার ঠিক চার দিনের মাথায় কিংশুকের স্টাডিরুম থেকে কিংশুকের মৃতদেহ আবিষ্কার করে ওর বাবা। তৎক্ষণাৎ লোকাল পুলিশকে খবর দেওয়া হয়ে গিয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব সকলেই যেন স্তম্ভিত। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, খুন করা হয়েছে কিংশুককে। আর এহেন চাঞ্চল্যকর খবরটা চাউর হতে বেশি সময় লাগেনি। কিংশুকের স্ত্রী সায়নী সাদা থান পরিহিতা হয়ে ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে রয়েছে। দু’চোখে কান্নার লেশমাত্র নেই, কিন্তু রয়েছে ঝড় থেমে যাওয়ার পর শান্ত-সমাহিত অবস্থা। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে। সেই সূত্রেই নাকি জানা গিয়েছে, “গতকাল সন্ধেবেলায় কিংশুকের ঘরে ওরই কলেজের একজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট এসেছিলেন। তার সাথে কোনও একটা বিষয় নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি হয়, এমনকি শেষ পর্যন্ত সেই তর্কাতর্কি হুমকিতে পর্যবসিত হয়। সেসময় ঘরে শুধু কিংশুকের মা-বাবা ছিলেন আর সায়নী বাইরে বেরিয়েছিল কিছু ওষুধ কিনতে।” ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের প্রথম সন্দেহ গিয়ে পড়ে ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্টের ওপর।

কিংশুক যেদিন খুন হল সেদিন বিকেলেই সায়নীর ফোনে শর্মির ম্যাসেজ এলো। লেখা রয়েছে, “সায়নী, একটা খবর দিচ্ছি তোকে ম্যাসেজেই। সামনাসামনি বললে হয়তো খুব ভালো হত। কিন্তু উপায়ও নেই। তোর বর কিংশুক-দা তোকে বিয়ে করার আগে কোয়েল নামের একজন স্টুডেন্টকে ভালোবাসতো। কিন্তু কোয়েলের মৃণ্ময় নামের একটি ছেলের সাথে সম্পর্ক থাকায় কিংশুক-দা একদিন ল্যাবে গিয়ে নাকি গায়ে হাত দিয়ে জোরজবরদস্তি করে রিলেশনশিপে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েটা তখন নিজেকে বাঁচাতে সামনে রাখা অ্যাসিড কিংশুক দা’র গায়ে ছুঁড়ে দিতে গেলে কিংশুক দা একটা ধাক্কা দেয় ওকে। ফলে অনেকটা অ্যাসিড কোয়েলের গলায়, হাতে আর বুকে গিয়ে পড়ায় পুরে যায়। কোয়েলকে তক্ষুনি নার্সিংহোমের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করানো হয় আর এদিকে ইউনিভার্সিটির কর্তৃপক্ষ প্রফেসর কিংশুককে বাঁচাতে সমস্ত ঘটনাকে অন্যভাবে সাজিয়ে ধামাচাপা দেয়।”

ম্যাসেজটা পড়ামাত্রই সায়নী শর্মিকে ফোন করে। শর্মি কল রিসিভ করতেই সায়নী বলে, “সরি টু ডিস্টার্ব ইউ শর্মি। কিন্তু তুই এসব জানলি কিভাবে?”

—“আসলে আমার বর মানে তোর সুজিত দা’র একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে গতকাল রাতে বাড়ি ফেরার সময়। তাই হসপিটালে আছি এখন। কাল হসপিটালে নিয়ে আসার সময় অ্যাম্বুলেন্সেই কথাগুলো কোনওমতে আমাকে জানায় ও। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সেই মুহূর্তে ও অজ্ঞান হয়ে যায়। আজ রাতে ওর একটা মেজর অপারেশন হবে, আমি ফোন রাখছি রে। ভীষণ টেনশনে আছি। তোকে এখন যা করার নিজেই করতে হবে।”

—“কিংশুক আর বেঁচে নেই রে। পুলিশ বলছে, ওকে নাকি খুন করা হয়েছে। আজ সকালে আমার শ্বশুরমশাই ওর স্টাডিরুমে ওর ডেডবডি প্রথম দেখে। এখন আর ওর বিরুদ্ধে কি স্টেপ নেব বল?”

—“এসব কি বলছিস তুই? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।”

—“ছাড় এখন এসব কথা। সুজিত দা’র অপারেশনটা আগে সাকসেসফুল হোক। টেনশন নিস না। এখন রাখছি।”

—“হুম রাখ। ভেঙে পড়িস না রে। পরে কথা হবে। বাই।”

দু’দিন পর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলো কিংশুকের খুনের। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথমত কিংশুকের পেটে গুঁড়ো কাঁচ মেশানো মদ আর দ্বিতীয়ত ঠোঁট থেকে সারা শরীরে পটাশিয়াম সায়ানাইড যে ছড়িয়ে পড়েছে সেটারও সন্ধান মিলেছে। কিন্তু কি করে তা সম্ভব হল পুলিশ তা বের করতে দিন-রাত এক করে দিচ্ছে। যেহেতু ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট সুজিত বাবুকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে ওরা, তাই প্রথমেই সুজিত বাবুকে জেরা করতে পৌঁছে গেল তার বাড়িতে। কিন্তু প্রমাণ তো পেলই না, বরং হসপিটাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে পারল যে, “সুজিত বাবুর অ্যাক্সিডেন্টের ফলে একটা মেজর ইন্টারনাল হ্যামারেজ হয়েছে এবং সেটার অপারেশনের পর এখনও জ্ঞান ফেরেনি ওনার। আর জ্ঞান ফিরলেও উনি কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে থাকবেন না।” এসব শোনার পর অগত্যা ব্যর্থ হয়েই পুলিশকে ফিরে যেতে হল। আর এদিকে যেদিন কিংশুক খুন হয় সেদিন সম্পূর্ণ বাড়ি চিরুনি তল্লাশি করে না কোনও মদের বোতল না কোনও প্রমাণ হাতে পেয়েছেন তারা। বলা যায় সব মিলিয়ে শেষে উত্তর দাঁড়াচ্ছে সেই শূন্য।

কিংশুকের মৃত্যুর পরবর্তী শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে যাওয়ার পরদিন সকালে একটা কল আসে সায়নীর মোবাইলে। এমনিতেই বাড়ির পরিস্থিতি ঠিক হয়নি, তাই ও ছাদে গিয়ে কল রিসিভ করল। ওপ্রান্ত থেকে শান্ত গলায় উত্তর এলো, “শুনলাম আপনি নাকি পরশুদিন বাপের বাড়িতে এসে কটা দিন থেকে যাবেন, মনের শান্তি ফিরে পেতে। তা সেইসময় সময়-সুযোগ করে বেহালার আমতলায় ৩/৪৬ নং বাড়িতে আসুন। তখনই আশা করি আপনার মনের কৌতূহল মিটে যাবে।” বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সায়নী বলল, “বেশ, তবে তাই হোক।”

ফোন রাখার পর দু’প্রান্তের দুটি মানুষের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি খেলে গেল। ঐ হাসিতে কি লুকোনো রয়েছে তা অজানা। হঠাৎ মাথার ওপরের আকাশটাতে কালো মেঘ করে এলো, বৃষ্টি হবে বুঝি। সায়নী ছাদে শুকোতে দেওয়া কাপড়গুলো নিয়ে নীচে নামতে যাবে, ঠিক এমন সময় ওর শ্বশুরমশাই নীচ থেকেই হাঁক দিল তার বৌমার উদ্দেশ্যে, “নীচে এসো সায়নী, পুলিশ এসেছেন। কিছু কথা আছে নাকি ওনাদের।”

সায়নী জিজ্ঞাসু মন নিয়ে ড্রয়িং রুমে পুলিশ ইন্সপেক্টরের সামনে এসে বসল। পুলিশ ইন্সপেক্টর বলতে শুরু করলেন, “দেখুন আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি কিংশুক বাবুর খুনিকে ধরতে। তবে কিছু সময় তো লাগবেই, কারণ আমরা সেভাবে প্রমাণ এখনও জোগাড় করতে পারিনি। তবে ওনার বিয়ের আগের লাইফ নিয়ে জানার চেষ্টা চালাচ্ছি। যদি তেমন কিছু জানতে পারি, তাহলে খুনিকে ধরার কাজটা দ্রুত হওয়া সম্ভব হবে। নইলে তো যেমন, তেমনই রয়ে যাবে।”

এসব শোনামাত্রই সায়নী আচমকা বেশ কিছুক্ষণ গুম মেরে রইল। তারপর যেই না কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওর শ্বশুরমশাই বলে বসল, “আপনাদের আর কষ্ট করতে হবে না। আমাদের ছেলে তো আর ফিরে আসবে না এসব করে। তাই আমরা আর চাইছি না যে, আমাদের ছেলের অতীত বা বর্তমান নিয়ে আপনারা আর কাটাছেঁড়া করুন। চলুন, আজই থানায় গিয়ে এই কেস আমি তুলে নিচ্ছি।” অগত্যা বিদায় নিয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর সায়নীর শ্বশুরমশাইকে সাথে করে বেরিয়ে গেলেন থানার উদ্দেশ্যে। সায়নী দরজায় দাঁড়িয়ে একটা নিঃস্বাস ফেলল।


ষষ্ঠ পর্ব

সায়নীর শ্বশুরমশাই থানায় গিয়ে কেস তুলে নেওয়ার ঠিক দু’দিন পর সায়নী বাপের বাড়ি চলে যায়। সায়নীর মা-বাবা দুজনেই ওর শ্বশুরবাড়িতে আসেন মেয়েকে ক’টা দিন তাদের কাছে রাখার অনুমতি নেওয়ার জন্যে। যাই হোক, সায়নী বাপের বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই পরিবারের সকলে মিলে ওকে খুশিতে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এই ঘটনাটির পর সায়নীর মধ্যে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে তা নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যেই একরকম ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। যা দূর থেকে হলেও সায়নী নিজেও টের পায় আজকাল। অবশ্য এতে ওর বিন্দুমাত্র যায় আসে না। কিংশুক মারা যাওয়ার পর সর্বক্ষণ সায়নীকে অফ হোয়াইটের ওপর শাড়িতেই দেখা যায়। এতদিন যে পার্সোনালিটি ওর মধ্যে ছিল না, ইদানীং সেটাই বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে। বলা যায়, আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে ক্রমশ। বাপের বাড়িতে আসার এক সপ্তাহ পর সায়নী সেই পূর্ব নির্ধারিত বেহালার আমতলায় ৩/৪৬ নং বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। কলিংবেল বাজাতেই বেরিয়ে এলেন একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা, “এইসময় কে?” সায়নী জবাবে নিজের পরিচয় দিতেই তিনি বললেন, “ভেতরে এসে বসো, মা।”

জিনস আর টি-শার্ট পরিহিত সাতাশ বছর বয়সী এক যুবক এবং তার সাথে ফুল স্লিভস কুর্তি-লেগিংস আর গলায় স্কার্ফ ঝুলিয়ে বছর পঁচিশের এক যুবতী এসে দাঁড়ালো। সাথে সাথেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সায়নী বলল, “হ্যালো মৃণ্ময়বাবু, হ্যালো মিস কোয়েল”

কোয়েল খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কিন্তু আমি তো ঠিক আপনাকে চিনতে পারলাম না।” এই বলেই কোয়েল মৃণ্ময়ের দিকে তাকালো। মৃণ্ময় চোখ টিপে আশ্বস্ত করে বলল, “কোয়েল, ইনি হলেন সায়নী। প্রফেসর লেট কিংশুকের স্ত্রী।” এবারে সায়নীকে উদ্দেশ্য করে মৃণ্ময় বলল, “প্লিজ বি সীটেড।” প্রাথমিক আলাপ পর্ব মিটিয়ে তিনজনেই যার যার আসন গ্রহণ করল। একদিকে সায়নী আর অন্যদিকে কোয়েল দুজনের কৌতূহলের পারদ ক্রমশ চড়ছে। মৃণ্ময় “এক্সকিউজ মি” বলে উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে শর্মিকে ডেকে আনল। শর্মিকে দেখে সায়নী পুরোদস্তুর হতবাক হয়ে গেল। কিছুই বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে।

মৃণ্ময় এবারে মুখ খুলল। প্রথমে সায়নীকে বলল, “দেখুন, আমি জানি কিংশুকবাবুর খুনের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে যে তথ্য দুটি উঠে এসেছে তা নিয়ে আপনি কৌতূহলে রয়েছে সেদিন থেকেই। এবারে বলি কিভাবে পুলিশ বডি পোস্টমর্টেম করায় পেটে মদের সাথে গুঁড়ো কাঁচ আর ঠোঁটে পটাশিয়াম সায়ানাইড পেল। কিংশুকবাবু খুন হওয়ার আগের দিন আপনি বিকেলে যখন ঘর থেকে বের হলেন আমার সাথে দেখা করার জন্যে, তখন আমি আপনাকে একখানা সিগারেট দিয়েছিলাম, ঘরে ফিরে কিংশুক বাবুর পকেটে যে সিগারেটের প্যাকেট থাকে সেখানে ভরে রাখার জন্যে। আসলে সেই সিগারেটের নিকোটিনে পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল। ভালো করে মনে করে দেখুন, আমি আপনাকে বলেছিলাম যে, সিগারেটটা ভরে রাখার পর হাত ভালো মতো ধুয়ে নিতে।”

—“জাস্ট আ মিনিট। আপনি কি করে জানতেন যে কিংশুক ঐ সিগারেটটিই খাবেন?”

—“হুম গুড কোয়েশ্চেন। কোয়েলের কাছেই কথাপ্রসঙ্গে একসময় জেনেছিলাম যে, কিংশুকবাবু নাকি চেন স্মোকার ছিলেন। কারণ, ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেওয়া আর ল্যাবে থাকার সময়টুকু বাদে বাকি সবসময় সিগারেট খেয়েই যেতেন।”

—“ও আই সি। ওকে প্লিজ কন্টিনিউ..”

—“হুম এবারে আসি পরের প্রসঙ্গে। আপনার বান্ধবী শর্মির সাথে আমি যেচেই আলাপ করেছিলাম আমাদের বাড়িতে, কিংশুকবাবু খুন হওয়ার দু’দিন আগে। ওনাকে সমস্তটা জানাই। উনি তখন তার স্বামী মানে সুজিতবাবুকে এই ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচাতেই আমার কথামতো খুনের আগের দিন সন্ধ্যায় যখন কিংশুকবাবু বারে যান প্রতিদিনের মতো মদ গিলে টেনশন মেটাতে, সেইসময় শর্মি ম্যাডাম পিছু নিয়ে ঐ বারে যান। তবে আপনার বান্ধবীর বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়। আপনার হাজব্যান্ড যখন এক বোতল হুইস্কি অর্ডার দিলেন, ঠিক তখন শর্মি ম্যাডাম কাউন্টার থেকে একখানা হুইস্কির বোতল নিয়ে তাতে কাঁচের গুঁড়ো ঢেলে দিয়ে ওয়েটারকে ডেকে বললেন কিংশুকবাবুর টেবিলে দিয়ে আসতে, কারণ হিসেবে এও দেখালেন যে শর্মি ম্যাডামের মাথা ঘোরাচ্ছে। তাই উনি ড্রিংকস নেবেন না। ব্যাস এতেই কাজ দিল। কাজ সেরেই দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন উনি।”

সায়নী এসব শুনে রীতিমতো মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর মাথা উঠিয়ে বলল, “তার মানে কিংশুক যেদিন খুন হল সেদিন শর্মি আমায় ম্যাসেজে যা বলেছিল সবই মিথ্যে। তাই তো?”

—“না, সবটা নয়। কারণ, সুজিতবাবুর সত্যি সত্যিই সেদিন অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল আর উনি এখন হসপিটালাইজড।”

শর্মি এতক্ষণে মুখ খুলল, “সায়নী, ভগবান যা করেছে হয়তো ভালোর জন্যেই করেছে। আমার কোনও আক্ষেপ নেই আমার এই কাজের জন্যে। আর এই দেখ না, সুজিতের অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ায় পুলিশও আর কিছু জিজ্ঞাসাবাদ চালাতেও পারেনি। হ্যাঁ অবশ্য ডাক্তার বলেছেন, সুজিতের সুস্থ হতে সময় লাগবে। তবে আমার মনে কোনও কষ্ট হচ্ছে না আর। কারণ আমি কারোর ভালোর জন্যই এই কাজটা করেছি মৃণ্ময়বাবুর কথায়।”

ওদের মধ্যেকার কথোপকথন থামিয়ে দিয়ে কোয়েল উত্তেজিত হয়ে মৃণ্ময়কে উদ্দেশ্যে করে বলল, “তুই কেন এমন কাজ করলি বল? আমি তো কখনও তোকে বলিনি এসব করতে? এমনকি ঘুণাক্ষরেও জানতে পর্যন্ত দিলি না আমায়।” মৃণ্ময় কোয়েলকে শান্ত করে বলতে শুরু করল, “দেখ, কিংশুক এতকিছুর পরও সহ্য করতে পারছিল না তোকে আমার সাথে দেখে। ভেবেছিল, আমি হয়তো তোকে ছেড়ে দেব আর তারপর বাধ্য হয়ে তুই ওর কাছে ফিরে যাবি। কিন্তু তা হয়নি, ওর বিয়ে দিয়ে দেয় সায়নীর সাথে বাড়ি থেকে। ফলে তোর ওপরে জমে থাকা রাগটা আরও চাগাড় দিয়ে ওঠে। সুজিতবাবুকে ঘুষ দিয়ে প্রথমে তোকে আর আমাকে ফলো করতে বলে এবং শেষে আরও টাকা দিয়ে তোকে খুন করতে বাধ্য করে। কারণ, শর্মি ম্যাডামের হার্টের সার্জারিটা তাড়াতাড়ি হওয়া খুব জরুরী ছিল, কিন্তু সীমিত টাকার জন্যে হচ্ছিল না। তাই বেশি টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বাধ্য করে। আর আমি সেদিন তোর বাড়ি থেকে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার কিছু আগেই কো-ইন্সিডেন্টলি আড়াল থেকে কিংশুকবাবু আদ সুজিতবাবুর মধ্যেকার কথোপকথন শুনে ফেলি। তার কিছুদিন পরই একদিন হাতে-নাতে সুজিতবাবুকে আমায় ফলো করতে গিয়ে ধরে ফেলি। তারপর উনি কান্নায় ভেঙে পড়ে সমস্ত ঘটনা খুলে আমায় জানান। আমি তখনই ডিসাইড করি যে, তোকে বাঁচাতে হলে আমাকেই যা করার করতে হবে। এরপরই একদিন সায়নী ম্যাডামকে দেখি শর্মি ম্যাডামের সাথে বাজারে দাঁড়িয়ে কথা বলতে। কথা বলা শেষ হলে আমি পিছু নেই আর কিছুদূর যাওয়ার পর সায়নী ম্যাডামের মুখোমুখি হই। সেদিন সব কথা হয় আমাদের মধ্যে। উনি তখন ক্লিয়ার বয়ে যান পুরো ব্যাপারটা, মানে কিংশুকবাবু কেন কোয়েলের নাম নিতেন কোনও ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তে। যাই হোক, আমি এরপর সায়নী ম্যাডামকে পাশে পেয়ে যাই খুব সহজেই। আর বাকি সমস্ত ঘটনা তো আগেই শুনলি...”

ঘরে উপস্থিত কোয়েল ও শর্মি দুজনেই অঝোরে কেঁদে চলেছে ততক্ষণে। সায়নী ধীর গলায় বলল, “দেখুন কোয়েল, ভয়ের কোনও কারণ নেই। কারণ, আমার শ্বশুরমশাই তার ছেলের অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি হবে বলে আর পাছে আমি সব জেনে যাই কু-কীর্তির কথা সেই ভয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে কেস তুলে নিয়েছে অলরেডি। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, ঐ শয়তান-রূপী প্রফেসরের এই দুনিয়াতে থাকার কোনও অধিকার নেই। আপনিও বেঁচেছেন আর আমিও.. আর শর্মি, কি বলে তোকে ধন্যবাদ দেব জানিনা। তবে তোর হার্টের সার্জারির জন্যে আমি তোকে যা টাকা লাগে দেব। চিন্তা করিস না আর...”

এই কথা শোনামাত্রই শর্মি গিয়ে সায়নীর গলা জড়িয়ে ধরল। মৃণ্ময় আর কোয়েল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনাদের এমন বন্ধুত্ব দেখে কিন্তু আমাদেরও লোভ হচ্ছে এবার।” সায়নীও আলতো হেসে বলল, “আর আপনাদের ভালোবাসা দেখে আমার! চলি তবে, ভালো থাকবেন। নমস্কার।”

অলংকরণ - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল
(সমাপ্ত)

পাঠকেরা যা পড়ছেন