ফুল

নীলাঞ্জনা মন্ডল


–এই ফুলি, ফুলি কি সুন্দর গন্ধ রে মা এটায়! ওটা দে, ওটা দে.. আহ! কি খুশবু। এটা রাজা বল? আচ্ছা, তুই যে এগুলো পেড়ে আনিস, কেউ দেখলে কী হবে জানিস?

–কী হবে গো? ওরা তো কেউ নেয় না, তাই আমি নিই। জানো তো, ওই বাড়িতে একটা ছেলে আছে, একভাবে তাকিয়ে থাকে আমি ফুল পারলে। মাঝে মাঝে হাসলে লালা গড়ায়। কেমন জানো!

–ওরকম বলে না সোনা, ওর বোধহয় বড় অসুখ।

–ছাড়ো না মাসি, শোনো ও বাড়িতে খুব সুন্দর গন্ধরাজ লেবুও আছে জানো, কিন্তু হাত পাই না। খুব উঁচু.. কিন্তু চিন্তা নেই। আর বড়জোর ৭–৮ দিন, ততদিনে ঠিক নাগাল পেয়ে যাব। তোমার জন্য না ইয়াব্বড় লেবু নিয়ে আসব। ভাত দিয়ে মেখে খেলে দেখবে রাজা রাজা মনে হবে।

খিলখিল করে হেসে ওঠে বছর সাতেকের ফুলি। ওর এই হাসি মুখটার দিকেই চেয়ে বসে থাকে মঞ্জু। মা–বাপ মরা মেয়েটাকে সবসময় নিজের করে আগলে রাখে। গেল বছর শহরে জিনিস বেচতে গিয়ে মারা যায় ফুলির বাপ–মা। সঙ্গে সঙ্গে ইহকালের পাট চোকায় মঞ্জুর বরও। কোন একখান ব্রিজ নাকি আস্ত ভেঙে পড়ে.. লাগোয়া সমস্ত কিছু মিশে গিয়ে ধুলো ধুলো হয়ে যায় নিমেষে। নেতা বাবুরা সে সময় খুব দুঃখ করেছিলেন। ব্যস ওই অবধি। তারপর সবকিছুর মতো ধামাচাপা পড়ে যায় ফুলি–মঞ্জুদের ভালো থাকাও। কার দায় কে নেয়!

–আজও পেলাম না জানো। আরও তিন–চার দিন পর পাব গো। ও মাসি, মাসি! দেখো টগরটায় কী সুন্দর গন্ধ। আজ আমি যাব না তুমি?

–তুই যাবি? পারবি যেতে? অত বড় রাস্তা পার হতে পারবি? আমার শরীরটা ভালো লাগছে না রে মা!

–কেন গো মাসি? তোমারও কি ডেনু জ্বর হল?

–না রে মা, ওসব বড় জ্বর বাবুদের হয়, আমাদের না। মশাগুলোও বোধহয় আমাদের ছুঁতে চায় না। নিজেদের ভাগ্যের ওপর নিজেরাই হো–হো করে হেসে ওঠে দু'জন অসমবয়সী বন্ধু।

–আজ যাই মাসি? তোমার জ্বর কমেছে একটু। ঘরেও কিছু নেই আর। না বেচলে খাব কী?, ছোট হয়ে আসলে মুখটা নামিয়ে নেয় ফুলি। মাথায় গালে হাত বুলিয়ে দেয় মঞ্জু।

এরকম চুপচাপ ফুলিকে একবারই দেখেছিল মঞ্জু, বাপ–মা মারা যাওয়ার পর। মরে যাওয়ার দুঃখটা বোধহয় ওকে ছুঁতে পারেনি তখন, ছুঁয়েছিল কারোর আদর করে কাছে না টানার ভয়টা। মঞ্জুকে পেয়ে সেটাও ভুলে গেছিল ফুলি। কিন্তু আজ আবার...

–মাসি আজও পেলাম না গো।

“কেন রে?”, হেসে উঠে মঞ্জু বলে, “একটুও লম্বা হচ্ছিস না নাকি?”

–লম্বা হলেও আর পাব না গো।

–যাহ, এ আবার কী কথা? কী হয়েছে বলবি?

–মাসি ওরা সব গাছ কেটে দিয়েছে। টগর, মাধবীলতা, শিউলি সব.. এমনকি লেবু গাছটাও গো।
ওদের বাড়ির ছেলেটা জানো ওই ডেনু জ্বরে মারা গেছে পরশু রাতে। তাই রাগ করে ওরা সব গাছ কেটে দিয়েছে। ঝোপ হচ্ছিল বলে। পাশের বাড়িগুলোতেও সব গাছ কাটছে। ওরাই বলল সব। গাছ থাকলেই কি শুধু কেউ মরে যায় বলো? ওরা বোঝে না!

কিছু বলার মতো ভাষা পায় না মঞ্জু। বারবার যাই আঁকড়ে ধরতে যায় ফুলি, ফাঁক গলে ঠিক ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায় সেসব। যাদের দায়িত্ব এসবে নজর রাখা, তাদের না রয়েছে খেয়াল, না নড়ছে টনক। শুধু ক’টা মানুষ বারবার হারায় নিজেদের সম্বলগুলো। আর পাপের মাশুলগুলো জমতে থাকে অন্য জায়গায়। কার দায় যে সত্যিই কে নেয়!

বড় শান্ত আজ ফুলি। শুধু বিড়বিড় করে চলেছে, –ঠিকই বলেছিলে গো মাসি, চুরি করলে ঠাকুর পাপ দেয়।


অলংকরণ - নীলাদ্রি ভট্টাচার্য্য

পাঠকেরা যা পড়ছেন