নেই তবু আছে

প্রতিম দাস




গত চার বছরে কতবার যে বাড়ি ভাড়া নিলো আর ছাড়লো ওরা তার ঠিক ঠিকানা নেই। তিনজনের সংসার । সোহিনী, সঞ্জয় আর ওদের আট বছরের মেয়ে সৃজা। বছর সাতেক আগে থেকে অবনতির শুরু। একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতির চাপে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে নিতে ব্যবসাটার বারোটা বাজিয়েছে সঞ্জয়। অবশ্য, কয়েকজন কর্মচারীর বেইমানিও দায়ী। আগে কাজের ক্লান্তি চাপ কমাতে দু পেগ করে মদ খেত সঞ্জয়। সেটা এখন নেশায় পরিণত হয়েছে। তার সাথে ছিল এবং আছে ক্রিকেট খেলা দেখার নেশা। একাধিক কেবল চ্যানেল এবং আই.সি.সি-র দৌলতে এখন তো বছরে ৩৬৫ দিন ক্রিকেট। এই দুই নেশার বাঁধনে পড়ে সঞ্জয়ের আর্থিক অবস্থা দিন দিন নিম্নগামী।

মদের নেশা ইদানীং হয়েছে। ক্রিকেটের নেশা আরও সাঙ্ঘাতিক। আট বছর আগের ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের দিনটার কথাই ধরা যাক। যেদিন সৃজার জন্ম হয়। খেলা দেখার উন্মাদনায় সোহিনীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়টা পর্যন্ত দিতে পারেনি সঞ্জয়। আর তার জন্য ঘটে যাওয়া ঘটনার সূত্রে সোহিনী কোনও দিনই সঞ্জয়কে ক্ষমা করতে পারবে না।

নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে, দেনা মিটিয়ে ক্রমশঃ শহরতলীর দিকে বদলেছে ওদের ভাড়া বাড়ির ঠিকানা। এখন যে বাড়িটায় ওরা আছে সেখানে একটা ভূগর্ভস্থ ঘর আছে। যাকে ইংরেজিতে বলে সেলার। বাড়ির প্রয়াত মালিক কি জন্যে বানিয়েছিল কে জানে? সৃজার আবার এ ঘরটা বেশ পছন্দের। যখনই সময় পায় কাঠের সরু সিঁড়ি দিয়ে ঐ ঘরে নেমে যায়। খেলনা পাতির গামলাটাও নিয়ে গেছে ঐ ঘরে। সোহিনী এই নিয়ে বেশী মাথা না ঘামালেও, সঞ্জয়ের মোটেই পছন্দ নয় এটা।

১২ মার্চ, ২০১১

সঞ্জয়ের তো এখন পোয়াবারো। চলছে বিশ্বকাপ। সকালে, টুকটাক এদিক ওদিক ঘুরে এসেই বসে পড়ছে টিভির সামনে। সাধারণত দুশ্চিন্তায় মানুষের শরীর খারাপ হয়ে যায়। সঞ্জয়ের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো। দিন দিন মোটা হচ্ছে। কারণটা একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়। পানীয়ের প্রভাব এবং বেশী হাঁটা চলা না করা। সে সব কথা থাক আমরা আপাতত রঙ্গমঞ্চে ফিরি। আজ ভারত-দঃ আফ্রিকা গুরুত্বপূর্ণ খেলা। প্রথম হাফটা, কিছু আগেই শেষ হয়েছে। সোহিনী খেলা না দেখলেও টুকটাক খবর রাখে। সঞ্জয়ের কথা বলার ধরনেই বুঝতে পারছে অবস্থা মোটেই ভালো নয়। রাতের তরকারীর জোগাড় যন্ত্র করতে করতে টের পেল ধপ ধপ পদ শব্দে সঞ্জয়ের আগমন হচ্ছে।

–সৃজা কোথায়?

–কোথায় আবার, যেখানে থাকে সেখানেই। বললো সোহিনী।

–সেইখানটা কোথায়?

–খেলার ঘরে।

–খেলার ঘরে মানে, সেলারে?

–তাই তো মনে হয়।

–তোমায় বলে ছিলাম না ও যেন ওখানে না যায়। কোন কথাই কানে নাও না দেখছি!

–ও যদি ওখানে খেলে তোমার আপত্তি কিসের?

–অতশত বলতে পারবো না। আমার ভালো লাগে না, ব্যস।

–তা নিজে ডেকেই সে কথাটা বলে দাও না ওকে।

–হ্যাঁ সেটাই করতে যাচ্ছি। যত্ত সব।

ধপ ধপ শব্দটা পিছিয়ে গেল। সোহিনী শুনতে পেল সঞ্জয়ের ক্রুদ্ধ চিৎকার– সৃজা!

মাত্র একবারই। তারপর চুপ হয়ে গেল কেন সঞ্জয়? কি আবার হলো? কাজ ফেলে, সোহিনী পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সেলারের দিকে। দেখতে পেল, সঞ্জয় হাঁটু গেড়ে বসে আছে ঘরটায় নামার পথটার মুখে। কি যেন শোনার চেষ্টা করছে। কি? একদণ্ড অপেক্ষা করে সোহিনী জানতে চাইলো, “কি গো? কি করছো?”

অদ্ভুত একটা চাহনি সহ মুখটা ঘোরালো সঞ্জয়। তারপর বললো– ও কার সাথে কথা বলছে সোহিনী?

–কার সাথে আবার বলবে! নিজের মনেই বকবক করছে? এ তো ওর চিরকালের স্বভাব।

–নাহ, আমি একটা ছেলের গলা শুনলাম।

–ক-পাত্র হয়েছে আজ?

–বাজে কথা বোলো না সোহিনী। তুমি কি বলতে চাও আমার নেশা হয়েছে?

–আমি একবারও সে কথা বলিনি। সৃ... সৃজা, উঠে আয় সোনা। পড়তে বসতে হবে।

–শোনা গেল কচি গলার আওয়াজ – যাই মা।

নিচে জ্বলতে থাকা টিম টিমে আলোটা নিভে গেল। পুরনো কাঠের সিঁড়ির মৃদু ক্যাঁচ কোঁচ শব্দের সাথে ওপরে উঠে এলো, কোঁকড়ানো চুলের পুতুল পুতুল দেখতে সৃজা। সঞ্জয়ের সবে কিছু বলতে যাচ্ছিলো ওদিকে ভাষ্যকারের গলা শোণা গেল টিভি থেকে, দঃ আফ্রিকার ইনিংস শুরু হচ্ছে। আপাতত কিছু না বলেই সেদিকে চলে গেল সঞ্জয়।

১৭ মার্চ, ২০১১

ইংল্যান্ডের ইনিংস শেষ ২৪৩ রানে। যাক মনে হচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজই জিতবে। তাহলে শেষ আটে যাওয়া নিয়ে চিন্তাটা আর থাকবে না। খুশী মনেই রান্না ঘরের দিকে চললো সঞ্জয়। জলের বোতলটা আনার জন্য। চোখ পড়লো সেলারের দরজাটার দিকে। ওটা খোলা। তার মানে সৃজা আবার নিচে নেমেছে। নাহ, ওখানে একটা তালা মারতেই হবে। আর সেটা এখনই করবো। তার আগে মেয়েটাকে তো উঠাতে হবে। দরজাটার কাছে যেতেই সঞ্জয় শুনতে পেল সেদিনকার মতই। হ্যাঁ, ঐ তো দুটো শিশু কণ্ঠ। একটা ছেলে একটা মেয়ে।

ছেলেটি বললো– সৃজা তুই আমকে সাহায্য করবি তো?

–হ্যাঁ-হ্যাঁ, কেন করবো না। আমরা তো দুজনেই ছোটো। একে অপরকে সাহায্য না করলে কি করে হবে।

–একদম ঠিক বলেছিস।

আজ একেবারে হাতে নাতে ধরবো, এই মানসিকতা নিয়ে যতটা সম্ভব শব্দ কম করে সঞ্জয় সিঁড়িটা দিয়ে নামতে থাকলো। পাশে কোন রেলিং নেই সিঁড়িটার। নিচে নামার পর, অল্প পাওয়ারের বাল্বের আলোয় সঞ্জয় দেখল সত্যিই তো সৃজা ছাড়া আর কেও নেই ওখানে। বাবু হয়ে বসে আছে সৃজা ওখানে। মুখ দেওয়ালের দিকে। সামনে গত জন্মদিনে সঞ্জয়েরই কিনে দেওয়া পুতুলটা। যেটা একটা ছেলে পুতুল। কি নেবে জানতে চাওয়ায় ওটার কথা জানিয়েছিল সৃজা। সাধ অপূর্ণ রাখেনি সঞ্জয়।

–সৃজা কার সাথে কথা বলছিস তুই?

প্রশ্ন টা শুনে কিছুটা চমকেই পেছন ফিরল সৃজা।

–ওঃ! বাবা তুমি, বাপ রে, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম!

–কার সাথে কথা বলছিলি?

–ওর সাথে, পুতুলটা দেখিয়ে বললো সৃজা।

–কিন্তু আমি যে একটা ছেলের গলা পেলাম?

–সে তো আমারই গলা। ও তো আর কথা বলতে পারে না তাই আমাকেই ওর হয়ে বলে দিতে হয়।

বিশ্বাস না হলেও নিজেকে সংযত করলো সঞ্জয়।

–ঠিক আছে। অনেক খেলা হয়েছে। এবার ওপরে চলো।

রাতে খাওয়ার টেবিলে মেজাজ বিগড়ানো অবস্থায় এসে বসলো সঞ্জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরে গেল। হতচ্ছাড়া গুলো! এখন যদি দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশকে ম্যাচ ছেড়ে দেয় তাহলে কি হবে? ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো ছাড়া কোন পথ খোলা থাকবে না। ভারতের ব্যাটসম্যানদের যা পারফরমেন্স! বোলিংও তথৈবচ।

ছোলার ডালে রুটি ভিজিয়ে মুখে দিয়েই, সঞ্জয়ের বিগড়ানো মেজাজ ফেটে পড়লো আগ্নেয়গিরির মতো। নুন বেশী হয়েছে ডালে।

–রান্না করার সময় কি এমন রাজকার্য থাকে, যে নুনটাও ঠিকঠাক দিতে পারো না? যেমন মা তেমনি মেয়ে। কেও কথা শোনে না। কবে থেকে বলছি সৃজার সেলারে যাওয়া আমার পছন্দ নয়। ওটাও বন্ধ করতে পারছো না। কানেই ঢোকে না মহারানীর।

–ওর ওখানে খেলতে ভালো লাগে সঞ্জয়।

–আমার ভালো লাগে না কতবার বলবো শুনি? কেন বাইরে গিয়ে খেলতে পারে না। আশেপাশে তো অনেক বাচ্চা আছে। তারা তো এমন ঘরকুনো নয়।

–সবার স্বভাব এক রকম হয় না।

–ওসব বুঝি না। বেশী বোকো না বুঝলে। আমি কাল থেকে যেন ওকে ওর ভেতরে নামতে না দেখি। দেখলে আমারই একদিন কি...

–কেন কি করবে? মারবে?

–দরকার হলে সেটাই করবো। কোনো নজরই তো রাখোনা । সোহিনী মেয়েটা পাগল হয়ে যাচ্ছে। নিজের সাথে নিজে গলা পালটে কথা বলছে। এটা মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ।

–কোথাকার সবজান্তা গামছাওয়ালা এলেন রে। বাচ্চারা ও রকম একা বকর-বকর করে।

–যে করে করুক। আমি চাই না সৃজা আর ঐ ঘরে যাক। বকার ইচ্ছে হলে সেটা অন্য যেখানে ইচ্ছে করুক। এটা আমার শেষ কথা।

১৮ মার্চ, ২০১১

ঘরটা থেকে সৃজার খেলনার গামলা আর পুতুলটা নিয়ে এসে তালা মেরে দিয়েছে সোহিনী। এমনিতেই নানা সমস্যা সংসারে, তার ওপর আর এ নিয়ে ঝামেলা ভালো লাগছে না ওর।

স্কুল থেকে ফিরে সেলারে তালা বন্ধ দেখে অবাক হল সৃজা। মার কাছে জানতে চাইলো কি ব্যাপার?

–তোমার বাবার আদেশ।

–তুমিও কি এটাই চাও মা?

–মানে!

–বাবা যখন যা করেন সেটাই মানে নাও কেন?

সোহিনী মনে মনে বললো কি করবো সোনা। পরিস্থিতিই যে এরকম। তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যা সব বুঝতে পারবি। মুখে বললো –ওপরেই খেল সোনা। বাবা তাহলে রাগ করতে পারবে না।

–মা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

–কি কথা মা?

–আমার একটা যমজ ভাই হয়েছিল?

গোটা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো সোহিনীর। যে কথা হাসপাতালের কয়েকজন আর সঞ্জয় ছাড়া আর কেও জানেনা সেটা সৃজা জানল কি করে?

–তু...তুই জানলি কি করে? কে বললো তোকে?

–অভি বলেছে। অভিনন্দন।

–কে?!

সোহিনীর হৃদপিণ্ডের চলন একধাপে কয়েক গুন বেড়ে গেল। ফরসা মুখটায় রক্ত যেন ফেটে বেড়িয়ে আসতে চাইছিল। বিস্ফারিত চোখে তাকাল সৃজার দিকে। অভিনন্দন! অভিনন্দন রায়। সোহিনীর মৃত দাদুর নাম। ওকে খুব ভালো বাসতেন। যদি ছেলে হয়, এই নামটা রাখবে বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল ও। সঞ্জয় পাত্তা দেয়নি।

–এ নাম তুই কোথা থেকে শুনলি?

–ঐ বললো, এটা ওর নাম।

–ও কে?

সোহিনীর মন হল ওর বোধ শক্তি যেন লোপ পাচ্ছে।

–মা ... ও মা, তুমি অমন করে তাকিয়ে আছো কেন? আমি সব জানি। ভাই সব কথা বলেছে আমায়। যেদিন আমার জন্ম হয় সেদিন ছিল বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া। অফিসে ছুটি ঘোষণা করে সারাদিন ক্লাবেই ছিল বাবা, সকাল থেকে। তোমায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল। পাশের বাড়ির এক কাকিমা তোমায় ট্যাক্সি ডেকে হাস পাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। দুজনের মধ্যে আমি বেঁচে থাকি আর আমার ভাই, যার নাম তুমি অভিনন্দন রাখতে চেয়েছিলে, সে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ হারায়।

সোহিনীর দুগাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা।

–এ মা, মা তুমি কাঁদছ কেন? ও তো ফিরে এসেছে। আমার সাথে ও কথাও বলে। ঐ খেলাঘরটা ওর খুব পছন্দের। মা, বাবা যখন খেলা দেখতে ব্যস্ত থাকবে তখন না হয় ঘরটা খুলে দিও। আমি ওর সাথে খেলা করবো।

সম্মোহিতের মতো মাথা নাড়লো সোহিনী।

২০ মার্চ, ২০১১

দিনটা রবিবার। সঞ্জয় খেলা দেখায় ব্যস্ত। দক্ষিণ আফ্রিকা ২৪৮ রান করেছে। বাংলাদেশ ব্যাটিং করবে কিছুক্ষণ পরেই।

সৃজাকে খাইয়ে, নিজে খেয়ে, বাসনকোসন ধুয়ে, বিছানায় শুয়ে ছিল সোহিনী।

–মা, বাবা-তো খেলা দেখছে। ঘরটা একটু খুলে দাও না।

–দিচ্ছি, খেলা আগে শুরু হোক।

একের পর এক উইকেট পড়ছিল আর উল্লসিত চিৎকার শোনা যাচ্ছিল সঞ্জয়ের। ছয় উইকেট পড়ে যাওয়ার পর চেয়ার থেকে ভারি শরীরটা কোনওমতে ওঠালো ও। খেলা দেখবে বলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়েছিল। এখন আবার খিদে পাচ্ছে। দেখা যাক সোহিনীর ভাঁড়ারে কিছু পাওয়া যায় নাকি। বেডরুমের দিকে যাওয়ার পথে সেলারের ঢাকনাটা খোলা দেখেই খুশীর আমেজের তারটা গেল কেটে। চেঁচিয়ে উঠলো – সোহিনী! সৃজা কোথায়?

চিৎকার শুনেই তন্দ্রার ভাবটা কেটে গেল সোহিনীর। কাপড় সামলে ছুটে এলো পড়িমরি করে। মুখে আতঙ্কের ছাপ।

–ডাকছিলে?

–সৃজা আবার ওখানে নেমেছে ,তাইনা?

–প্লিজ সঞ্জয় ওকে বোকো না। সব দোষ আমার। ছোটো মেয়ে। মন মরা হয়ে বসেছিল, তাই...

–নিকুচি করেছে মন মরা হওয়ার। আজ ওর একদিন কি আমার একদিন। সৃজা... অ্যাই সৃ!

অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠলো সোহিনীর। বলতে চাইলো, ও এখন অভির সাথে আছে সঞ্জয়। ওকে কিছু বোলো না। অভি তোমায় পছন্দ করে না। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন ওর কণ্ঠস্বর রোধ করে দিল।

মেঝে কাঁপিয়ে সঞ্জয় এগিয়ে গেল।

–সৃজা উঠে আয় তাড়াতাড়ি।

কোন উত্তর এলো না নিচ থেকে।

–কি হল কানে কথা যাচ্ছে না নাকি?

–সৃজা যাবে না ওপরে। ভেসে এলো একটি বালকের কণ্ঠস্বর।

চমকে উঠলো সোহিনী। ফিরে তাকালো সঞ্জয়।

–কি আমি তোমায় বলেছিলাম না? কে আসে খেলতে বাড়িতে ওর সাথে?

সোহিনী বাক্যহীন।

–সৃজা শেষবারের মতো বলছি উঠে আয়। আর যে সাথে আছে তাকেও নিয়ে আয়।

–সৃজা এখন যাবে না। শোনা গেল একই কণ্ঠস্বর।

–আসবি না। ঠিক আছে তাহলে আমিই নামছি...

ক্রুদ্ধ কণ্ঠে কথা গুলো বলে উত্তেজনায় তাড়াহুড়ো করে নামতে গেল। কয়েক ধাপ নামার শব্দও শুনতে পেল সোহিনী।

সঞ্জয়ের পা পড়ল একটা কিছুর ওপর। নাকি কেউ ওর পাটা টেনে ধরলো! কিছু বুঝতে পারার আগেই ক্ষণিকের অন্যমনস্কতায় ভারসাম্য হারালো ভারী শরীরটা। রেলিং না থাকায় কোন কিছু ধরার সুযোগও পেল না। একটা আর্ত চিৎকার শোনা গেল। সাথেই সজোরে আছড়ে পড়ার একটা আওয়াজ। কেঁপে উঠলো ঘরটা। কেঁপে উঠলো সোহিনী। কয়েকবার সজোরে কেঁপে উঠলো সঞ্জয়ের শরীরটাও। তারপর নিথর হয়ে গেল।

ছুটে গেল সোহিনী। নিচের টিমটিমে আলোয় দেখতে পেল সঞ্জয়ের ঘাড় মুচড়ে পড়ে থাকা শরীরটাকে। আর তখনই উঠে এলো সৃজা। হাতে সেই পুতুলটা। মাথাটা চেপ্টে গেছে ভারী পায়ের চাপে।

–বাবা মনে হয় এটার ওপর পা দিয়ে ফেলেছিল।

কাঁপা কাঁপা গলায় সোহিনী জানতে চাইলো – ওটা কোথায় ছিল?

–সিঁড়ির ওপর থেকে চার ধাপ নিচে।

–ওখানে ওটা এলো কি করে? ওটা তো সব সময় তোর সাথে থাকে?

–অভি যে বললো ওকে ওখানে বসিয়ে রাখতে। ও তো একা একা উঠতে পারে না। তাই আমি ওকে সাহায্য করে ছিলাম।


অলংকরণ - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল
(সমাপ্ত)

পাঠকেরা যা পড়ছেন