দ্য মেথড শেরিফ

এড ল্যাসি
রূপান্তরঃ আদনান আহমেদ রিজন


ব্যাংক ভবনটা ছোট হলেও আধুনিক। তবে এটা আসলে অনেক দূরে অবস্থিত সিটি ব্যাংকের একটা শাখা। গ্রামের সীমান্তবর্তী আড়াআড়ি মাঠে ভবনটা সম্প্রতি নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তার মোড়ের দিকে মুখ করা প্রবেশপথ। মোড়টা আবার হাইওয়ের সাথে সংযোগস্থাপন করেছে একটা নতুন ব্রিজের মাধ্যমে। শেরিফ বেইনসও অনেকটা সেই গ্রামের মতোই দেখতে... বৃদ্ধ, বেঁটে আর জীর্ণ। তিনি ব্যাংকে প্রবেশ করার সাথে সাথে দৌড়ে এল হ্যাংলা-পাতলা হিসাবরক্ষক এমা। সাথে গলা ফাটিয়ে চিৎকার, “আঙ্কল হ্যাঙ্ক, আমাদের সবকিছু নিয়ে গেছে! সবকিছু!” হিস্টিরিয়া-গ্রস্তের মত বিবর্ণ দেখাচ্ছে মেয়েটার চেহারা, ভয়ে চোখদুটো বিস্ফারিত।

“ডা...ডাকাতি?” আকস্মিক শকে যেন শেরিফের কাঁধ দুটো নুয়ে পড়ল, চোখে বিহ্বল ভাব। কয়েক সেকেন্ড পর সামলে উঠে মৃদু ঝাঁকি খেলেন তিনি। হিসাবরক্ষকের কাঁপতে থাকা কাঁধ এক হাতে ধরে, অন্য হাতে হোলস্টার থেকে পিস্তল আলগা করলেন। “এমা, শান্ত হও। আমাকে বলো কি হয়েছে!”

“ওহ, আঙ্কল, একটা......” এমা কাঁদতে আরম্ভ করল।

“এমা, আমাকে শেরিফ বেইনস বলে ডাকো। এটা একটা অফিশিয়াল ব্যাপার। সবচেয়ে জরুরী কথা, তুমি আগে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনো। তারপর আমাকে বলো যে ঠিক কী হয়েছে।”

ফোঁপাতে থাকা মেয়েটাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে শেরিফ ব্যাংকে থাকা একমাত্র পুরুষ মানুষ, ম্যানেজারের দিকে তাকালেন। “ঠিক আছে, টম, তুমি বলো কী হয়েছে। তাড়াতাড়ি করো, অপরাধ ঘটার পর প্রাথমিক সময়টুকু খুবই মূল্যবান।”

“আমরা প্রতিদিনের মত সকাল ৯টায় ব্যাংক খুলি,” জবাব দিল ম্যানেজার। এখন থেকে প্রায় আধঘণ্টা আগে। তখন দু’জন লোক আসে। ডেস্কে বসে সকালের চিঠিপত্র খোলা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আমি। লোক দু’জন অপরিচিত হলেও দেখতে সন্দেহ করার মতো কিছু না। এমা তার কাউন্টার সবেমাত্র খুলেছে, আর হেলেন ছিল ভল্টে। কয়েক মিনিট পর লোক দু’জন চলে গেলে এমা চিৎকার করে উঠল। তারা নাকি তাকে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, সব টাকাপয়সা একটা বড় কাগজের ব্যাগে ভরে দিতে, নইলে আমাদের সবাইকে খুন করবে। তারপর আমি বাইরে একটা গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দ শুনি, তবে আরও গাড়ি-ঘোড়ার শব্দে ঠিক বুঝতে পারিনি তারা কোনদিকে গিয়েছে। যাই হোক, এরপর আমি দরজার দিকে দৌড়ে গেলাম আর আপনাকে ফোন করলাম।”

শেরিফ বেইনস নোটবুকের খোঁজে তার উইন্ডব্রেকারের পকেটে হাতড়াতে লাগলেন। না পেয়ে ম্যানেজারের ডেস্ক থেকেই এক টুকরা কাগজ আর একটা পেনসিল তুলে নিলেন।

“ঠিক আছে, ডাকাতির সময় ঘড়িতে ক’টা বাজে, টম?”

“সাড়ে ন’টার পর। সম্ভবত... নয়টা বেজে বত্রিশ মিনিট।”

মাথা নেড়ে সায় দিলেন শেরিফ, তারপর ঠোঁটের ফাকে ধরে থাকা পেন্সিল দিয়ে সময়টা কাগজে টুকে নিলেন।

“কি পরিমাণ টাকাপয়সা খোয়া গেছে?”

“এখনও চেক করে দেখিনি। তবে ছাব্বিশ হাজার ডলারের কাছাকাছি হবে, পুরোটাই ছোট নোটে,” বলতে বলতে ধপ করে চেয়ারে বসে মাথায় হাত দিল ম্যানেজার।

“হ্যাংক, মাত্র তিন মাস আগে ব্যাংকটা খুলেছি আর এখনই এমন একটা ডাকাতি! আমার চাকরি চলে যাবে!”

“হায়-হুতাশ বন্ধ করো টম! তুমি কি ভালো ভাবে ডাকাতদের বর্ণনা দিতে পারবে?”

“আমি শুধুমাত্র একবার তাদের দিকে তাকিয়েছিলাম। দু”জনের বয়সই ত্রিশের কাছাকাছি হবে। পরনে ছিল কালো রঙের স্যুট আর... হ্যাঁ, অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যবান লোকটার হাতে একটা শপিং ব্যাগ। মাথায় কোন টুপি নেই আর তার চুল ছিল কালো, সুন্দরভাবে আঁচড়ানো। অন্য লোকটার হাতে একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ আর মাথায় একটা টুপিও। তবে তার চুলের রঙ আমি মনে করতে পারছি না।”

“আমি ওদেরকে ভালো ভাবে দেখেছি, হ্যাংক”, অ্যাকাউন্টেন্টের ডেস্কের পার্টিশনের পেছন থেকে আসতে আসতে এক মহিলা বলল। হেলেন স্মিথ, সোনালী চুল, মধ্যবয়স্ক। “টুপি ছাড়া লোকটার চুল ছিল উজ্জ্বল কালো রঙের আর চেহারা খুবই তীক্ষ্ণ। বিদেশীদের মত দেখতে চিকন গোঁফ-ওয়ালা অন্যজনের মাথায় ছিল একটা হান্টিং ক্যাপ। আমার মনে হয় সে ন্যাড়া আর......”

“কি রঙের হান্টিং ক্যাপ, হেলেন?” শেরিফ জিজ্ঞেস করলেন।

“বাদামী রঙের এক ধরণের ক্যাপ।”

“না না, তার টুপি ছিল কমলা রঙের। সে-ই তো তার হাতের ভাঁজ করা খবরের কাগজটা কাউন্টারে রেখে আমাকে চিরকুটটা দিয়েছিল,” এমা তার চেয়ারে বসেই বলল।

“তার কথায় কি আঞ্চলিক টান ছিল?”

“আঙ্কল, তাদের কেউ কোন কথাই বলেনি। শুধু আমাকে চিরকুটটা দিয়েছিল। তাতে টাইপ করে লেখা—

“ব্যাগটা টাকা দিয়ে ভরে দাও, নাহলে সবাই মারা পড়বে। ভাঁজ করা খবরের কাগজের ভেতর একটা ব্যারেল-কাটা শটগান আছে। কোনো ধরনের অ্যালার্ম বাজানোর আগে দশ মিনিট অপেক্ষা করবে। বাইরে সাবমেশিনগানধারী আমাদের লোক আছে।”

“আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম,” এমা যোগ করল। “প্রায় জ্ঞানহীন অবস্থায় আমি ড্রয়ারের সব টাকা তাদের সেই বড় কাগজের ব্যাগে ভরে দেই। লোকগুলো আমার কাউন্টারের সামনের দিক ব্লক করে রেখেছিল যার জন্য টমকে কোন সংকেত...”

“চিরকুটটা কোথায়?” শেরিফ বেইনস কথার মাঝে বাগড়া দিলেন।

“চিরকুট? ওরা টাকার সাথে সেটাও নিয়ে গেছে।”

শেরিফ কঁকিয়ে উঠলেন, “ভালো ভাবে মনে করো, এমা। তুমি কি তাদের শপিং ব্যাগে বিশেষ কিছু লক্ষ্য করেছ?”

“হ্যাঁ! এইমাত্র মনে পড়ল, তাদের ব্যাগে A&P প্রিন্ট করা ছিল।”

শেরিফ হ্যাটটা পেছনে ঠেলে দিয়ে মাথা চুলকালেন। “ধুর ছাই... এখান থেকে পঞ্চাশ মাইল আশেপাশে এমন অন্তত ডজন-খানেক দোকান পাওয়া যাবে। ঠিক আছে...” বলে তিনি ডেস্কের দিকে ফিরে ফোন হাতে তুলে নিলেন। “আমি বরং সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফোন করছি। কেউ কি তাদের পালানোর গাড়িটা সম্পর্কে কিছু লক্ষ্য করেছ?”

পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল ম্যানেজার আর মহিলা দু’জন। এমা বলল, “আমি নিশ্চিত না যদিও, তবে জানালা দিয়ে বাইরে একটা পুরনো ধুসর সেডান পার্ক করা দেখেছিলাম।”

শেরিফ মাথা নেড়ে ফোনটা নিচে নামিয়ে রাখলেন।

“ব্যাংকে তোমরা ছাড়া আর কেউ ছিল?”

“না স্যার, আমরা তখন সবেমাত্র ব্যাংক খুলেছি”, জবাব দিল টম।

“তোমার কাছে অতগুলো টাকা কিভাবে এসেছিল?” জিজ্ঞেস করলেন শেরিফ।

“হ্যাঁ, হ্যাংক...মানে শেরিফ বেইনস, নতুন ব্রিজ হওয়ার পর এই ব্যাংক খোলার একটা কারণ হলো— নদীর অপর পাড়ের দুটো ফ্যাক্টরির পে-রোলগুলো আমরাই আনা নেয়া করি, উনিশ হাজার পাঁচশত আটষট্টি ডলার করে প্রতি বুধবার সকালে। আমরা মঙ্গলবার রাতেই পে-রোলের টাকা গুছিয়ে রাখি। আর প্রতিদিনের লেনদেনের শুরুতে এমার ড্রয়ারে পাঁচ বা ছয় হাজার ডলার মজুদ থাকে।”

মাথা নাড়ল হেলেন। “বুঝতে পারছি না লোকে কী বলবে। আগে কখনওই এই গ্রামে কোন ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। আপনি তো জানেন, হ্যাঙ্ক, আমরা...”

শেরিফ হঠাৎ অ্যাকাউন্টেন্টের কাউন্টারের সামনে হেঁটে গেলেন। উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “হাতের ছাপ! তোমাদের মধ্যে কেউ কি এই কাউন্টার স্পর্শ করেছ?”

এমা চেঁচিয়ে উঠল, “বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম, তাদের দু’জনের হাতেই শুয়োরের চামড়ার গ্লাভস ছিল।”

শেরিফ বেইনস দুর্বলভাবে মাথা দোলালেন। “ধুর ছাই! আমাদের কাছে কোন সূত্রই নেই।” তিনি জানালার সামনে হেঁটে গিয়ে পাল্লা সরিয়ে দিলেন। বাইরে তাকিয়ে ঘোষণার সুরে বললেন, “বৃষ্টি হতে পারে”।

একটু পরে তিনি ঘুরে গিয়ে ডেস্কে বসে তার হাতের কাগজপত্র গুছাতে লাগলেন। “ঠিক আছে। খুব একটা মন্দ নয়। এমা, তোমার কান্নার অভিনয়টা আরেকটু ভাল করতে হবে, বিশেষ করে যখন সেনাবাহিনী আসবে। আন্টি হেলেন, আপনার অংশটুকু ভাল হয়েছে। সত্যিকারের বিভ্রান্ত গ্রামবাসীর মতোই অভিনয় করেছেন। টম, তুমিও ভাল করেছ তবে তোমাকে আরেকটু বিষণ্ণ দেখাতে হবে। আমরা কালকে শেষবারের মত রিহার্সেল করব। তারপর মঙ্গলবার রাতে আমি সাথে করে ছাব্বিশ হাজার ডলার নিয়ে যাব। জেলের মেঝের নিচে একটা সুন্দর লুকানোর জায়গার ব্যবস্থা করেছি। বুধবার সকালে, টম, ব্যাংক খোলার পরপর কোন কাস্টোমার আসার আগেই তুমি আমাকে ফোন করবে। এই তাহলে পরিকল্পনা। শুধুমাত্র মনে রাখা ছাড়া আমরা কারও সাথেই এই ব্যাপারে কোন কথা বলব না। টাকাটা বের করার আগে আমরা ছয় বা সাত মাস অপেক্ষা করব। তারপর এই পুরস্কার ভোগ করতে কোন সমস্যাই থাকবে না। এখন বল টম, আমার অভিনয় কেমন হলো?”

“গেঁয়ো পুলিশের চরিত্রে তুমি ভালোভাবেই উৎরে গেছ, বাবা।”

অলংকরণ - মৈনাক দাশ

পাঠকেরা যা পড়ছেন