দ্য প্যাটার্ন

বিল প্রোন্‌যিনি
রূপান্তর: মারুফ হোসেন


ছাব্বিশ এপ্রিল, শনিবার রাত ১১:২৬। চোখে রিম্লেস চশমা আর গায়ে ধূসর রঙের বিযনেস সুট পরা ছোটখাটো এক লোক এসে হাজির হল স্যান ফ্রান্সিসকোর ‘হল অফ জাস্টিস’-এ। ডিটেকটিভ স্কোয়াড রুমে এসেই বে এরিয়া-র তিন গৃহবধূকে খুনের স্বীকারোক্তি দিল লোকটা। মহিলা তিনজনের লাশ সেদিন বিকেল আর সন্ধ্যাতেই পাওয়া গেছে।

ইন্সপেক্টর গ্লেন রক্সটন সবার আগে কথা বলল লোকটার সাথে। প্রথমে ভেবেছিল, লোকটা বোধহয় পাগলাটে। সব বড় শহরেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এমন খুনের গল্প ফেঁদে স্বীকারোক্তি দেয় অনেক লোক। অনেকে আবার মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে খুন করে এসে স্বীকারোক্তি দেয়। লোকটাকে সহকর্মী ড্যান টোবিয়াসের সঙ্গে রেখে সিনিয়র অফিসার ল্যাফটেন্যাণ্ট জ্যাক শেফিল্ডের সাথে কথা বলতে গেল রক্সটন।

“জ্যাক, এক লোক এসেছে কিছুক্ষণ আগে। বলছে, আজ লাশ পাওয়া গেছে যে মহিলা তিনজনের, তাদের নাকি সে-ই খুন করেছে।” জ্যাক শেফিল্ডের উদ্দেশ্যে বলল রক্সটন। “লোকটা বোধহয় পাগল।”

ডেস্কে বসে চিফের অফিসে পাঠানোর জন্য রিপোর্ট টাইপ করছিল শেফিল্ড। হাতের কাজ রেখে রক্সটনের দিকে ফিরল সে। “লোকটা স্বেচ্ছায় এসেছে আমাদের এখানে?”

নড করে সায় জানাল রক্সটন। “এই তো তিন মিনিট আগে এসে হাজির।”

“নাম কী বলছে?”

“অ্যাণ্ড্রু ফ্র্যান্‌যেন।”

“ঘটনা কী, বলেছে কিছু?”

“না। এখনও পর্যন্ত শুধু খুনের স্বীকারোক্তি দিয়েছে,” জানাল রক্সটন। “আমিও আর কিছু বলার জন্য চাপ দিইনি। মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটাকে খুব সহজভাবে নিয়েছে লোকটা।”

“আচ্ছা। পাগলদের লিস্টে ঢুকিয়ে দাও ব্যাটার নাম। তারপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রস্তুত করো,” শেফিল্ড বলল। “জিজ্ঞাসাবাদ করার আগে খুনের রিপোর্টগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নেব।”

“স্টেনোগ্রাফারের ব্যবস্থা করব?”

“তা হলে তো ভালই হয়।”

শেফিল্ডের অফিস থেকে বেরিয়ে গেল গ্লেন রক্সটন। খচ্‌-খচ্‌ করে গাল চুলকে নিল শেফিল্ড। শীর্ণকায় লেফটেন্যাণ্টের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। পাক ধরেছে মাথার চুলে, নাকটা বাজপাখির চঞ্চুর মত বাঁকানো। বিষণ্ণ, ক্লান্ত চোখদুটো এরই মধ্যে পৃথিবীর কদর্য দিকটার বেশিরভাগ দেখে ফেলেছে। তার পরনে নীল সুট— গায়ে চাপানো শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা।

খুন তিনটের প্রাথমিক রিপোর্টের ওপর চোখ বোলাতে শুরু করল খুঁতখুঁতে স্বভাবের শেফিল্ড।

প্রথম মৃতদেহটা পাওয়া গেছে ৩৯ অ্যাভিনিউ-এর এক ছোট্ট ডুপ্লেক্স বাড়িতে। জায়গাটা গোল্ডেন গেট পার্কের কাছেই। খুন হওয়া মহিলার নাম জ্যানেট ফ্লেণ্ডার্স। বিকেল সোয়া চারটায় জ্যানেটের প্রতিবেশী তার মরদেহ আবিষ্কার করে। ভোঁতা কোনও জিনিস দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি কয়েকটা বাড়ি মেরে খুন করা হয়েছে মহিলাকে। কীসের সাহায্যে খুন করা হয়েছে, সেটা বের করা যায়নি এখনও।

খুনের দ্বিতীয় শিকারের নাম ভায়োলা গর্ডন। তার মৃতদেহও খুঁজে পায় এক প্রতিবেশী। সাউথ স্যান ফ্রান্সিসকোতে বিকেল সাড়ে পাঁচটার কিছুক্ষণ পরে নিজের কটেজে পাওয়া যায় মহিলার মৃতদেহ।

তৃতীয় শিকার, ইলেইনি ডানহিলের মৃতদেহ পাওয়া গেছে সন্ধ্যে ছয়টা বেজে সাঁইত্রিশ মিনিটে। পরিচিত এক লোক বই ফেরত দিতে এসে খুঁজে পায় তার মৃতদেহ। স্যান ফ্রান্সিসকোর উত্তরে, সসালিটো হারবার-এর অরণ্যে-ছাওয়া এক পাহাড়ে কেবিন-স্টাইলের বাড়িতে থাকতেন মিসেস ডানহিল। তিনিও মারা গেছেন ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে মাথার পেছনে উপর্যুপরি আঘাতের কারণে। এবং এবারও পাওয়া যায়নি খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রটা।

একটা খুনেরও কোনও সাক্ষী নেই— নেই কোনও সূত্র। খুন তিনটেতে কেবল দুটো মিল আছে— একই দিনে সঙ্ঘটিত হয়েছে, এবং একই ধরনের অস্ত্রের আঘাতে মারা গেছে মহিলা তিনজন। এছাড়া আপাতদৃষ্টিতে খুনগুলোর মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই। সাদা চোখে তেমনটা মনে হলেও, একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যাবে, খুন তিনটে একই সুতোয় গাঁথা।

সূত্র ১: খুন হওয়া মহিলা তিনজনের প্রত্যেকের বয়সই তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। প্রত্যেকেই সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী এবং স্বর্ণকেশী।

সূত্র ২: তিনজনই অনাথ এবং কেউই ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় নয়। গত ছয় বছরের মধ্যে মধ্যপশ্চিমের ভিন্ন তিনটে এলাকা থেকে এসে স্যান ফ্রান্সিসকো’র বে এরিয়া-তে সংসার পাতিয়েছে।

সূত্র ৩: তিনজন মহিলাই বিয়ে করেছে ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যানকে। প্রত্যেকের স্বামীই মাসের খুব কম সময়ই বাড়িতে থাকে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সবার স্বামীই বাইরে ছিল খুন হবার সময়।

সব খুনেরই একটা নির্দিষ্ট ধরন থাকে, ফাইল দেখতে দেখতে ভাবল শেফিল্ড। এই কেসও তার ব্যতিক্রম নয়। এই খুন তিনটের ধরন এক সুতোয় গাঁথতে পারলেই জবাব বেরিয়ে আসবে। কিন্তু খুন তিনটেকে কোনওভাবেই এক বিন্দুতে মিলাতে পারছে না সে। স্বর্ণকেশী, তিরিশের কোঠায় বয়স, একাকিনী গৃহবধূদের খুন করে বেড়ায় এমন কোনও সাইকোপ্যাথকে খুনি হিসেবে ধরে নিলেই কেবল মিলছে হিসেব।

শেফিল্ড জানে, মিডিয়াও এভাবেই প্রচার করবে খবরটা। এতে করে খবরের কাগজের কাটতি বাড়বে। কিছুক্ষণ আগে সুপারশপে যাওয়ার সময় শেফিল্ড রেডিওতে শুনে এসেছে, খুনগুলোকে ‘মুগুর-হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে প্রচার করছে সংবাদ পাঠক।

খুনগুলোর কিনারা করতে শেফিল্ড দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ওর এলাকা ছাড়াও বাকি যে দুই শহরে খুন হয়েছে সেই দুই শহরের পুলিশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে সে। প্রমাণ ছাড়া অনুমানের ভিত্তিতে আগেই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া বোকামি হবে। সাইকোপ্যাথ হোক আর না-ই হোক, খুনি বড্ড ভোগাবে মনে হচ্ছিল এতক্ষণ।

ঠিক তখনই এই অ্যান্ড্রু ফ্র্যান্‌যেনের উদয়।

লোকটা কি পাগল? নাকি সত্যিই খুনি? কেসটা কি এতই সোজা? নাকি লম্বা একটা শিকলের কেবল শুরু এই ফ্র্যান্‌যেন?

যা-ই হোক, খুব শীগগিরই জানতে পারব, ভাবল শেফিল্ড। ফাইল বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল সে। তারপর বেরিয়ে এল অফিসের দরজা দিয়ে। স্কোয়াড রুমে কেবল কম্পিউটার ঠিকঠাক করে শেষ করেছে রক্সটন। স্কোয়াড রুমের পেছনের গ্লাসে-ঢাকা ইণ্টারেগোশন রুমের দিকে তাকাল শেফিল্ড। ড্যান টোবিয়াসকে দেখতে পেল একটা ধাতব ডেস্কে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্কোয়াড রুমে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে স্বীকারোক্তি দিতে আসা অ্যান্ড্রু ফ্র্যান্‌যেন। এক কোণে পুলিশের একজন স্টেনোগ্রাফার বসে আছে। অ্যান্ড্রুর স্বীকারোক্তি হুবহু লিখে রাখবে সে।

শেফিল্ড জিজ্ঞেস করল, “ঠিক আছে, গ্লেন, চলো লোকটার বক্তব্য শুনি।”

ইণ্টারোগেশন রুমের ভেতর ঢুকল সে আর রক্সটন। উঠে দাঁড়াল টোবিয়াস। আলতো করে মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দিল, ওর কাছে মুখ খোলেনি ফ্র্যান্‌যেন। লম্বা, পেশিবহুল লোক টোবিয়াস। মুখে সবসময় লেগে থাকা আন্তরিক হাসিটাও কোমলতা এনে দিতে পারেনি পোড় খাওয়া চেহারায়।

ডেস্কের ডান পাশে দাঁড়িয়ে গেল সে, রক্সটন দাঁড়াল বাঁয়ে। শেফিল্ড গিয়ে বসল ডেস্কের উপর। তারপর একটু ঝুঁকে গেল ডেস্কের সামনে বসে থাকা ছোটখাটো মানুষটার দিকে।

ফ্র্যান্‌যেনের নিরীহ, গোলগাল চেহারা দেখে যে কারও মনে মায়া জন্মাতে বাধ্য। ঢেউখেলানো চুলগুলো সুন্দর করে ছাঁটা। এর ফলে বাচ্চা বাচ্চা একটা ভাব চলে এসেছে তার চেহারায়। তবে শেফিল্ড অনুমান করল, চল্লিশের আশেপাশে হবে লোকটার বয়স। রিমলেস চশমার পেছনের বাদামি চোখদুটো দেখতে স্প্যানিয়েল জাতের কুকুরের মত।

কোটের পকেট থেকে একটা বলপয়েণ্ট কলম বের করে সামনের দাঁতে দিয়ে হালকা করে কামড়ে ধরল শেফিল্ড। জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় হাতে সবসময় কিছু না কিছু রাখতে হয় তাকে। নইলে জিজ্ঞাসাবাদ জমে না। অবশেষে নিজের পরিচয় দেয়ার মাধ্যমে নীরবতা ভাঙল সে। “আমি শেফিল্ড। এখানকার দায়িত্বে আছি। তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার আগে তোমার আইনগত অধিকার সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া আমার দায়িত্ব।”

তারপর ফ্র্যান্‌যেনকে অল্পকথায় সবগুলো আইনগত দিক বুঝিয়ে সে। “সবকিছু ঠিকমত বোঝাতে পেরেছি তো?”

আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নড করল খর্বাকায় লোকটা।

“তা হলে কোনও উকিলের উপস্থিত্তি ছাড়াই যে-কোনও প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত তুমি?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ,” সোৎসাহে বলে উঠল অ্যান্ড্রু ফ্র্যান্‌যেন।

দাঁত দিয়ে কিছুক্ষণ বলপয়েণ্ট কলমটা কামড়াল শেফিল্ড। “ঠিক আছে,” শেষমেশ বলল সে। “তোমার পুরো নাম বল।”

“অ্যান্ড্রু লিওনার্ড ফ্র্যান্‌যেন।”

“কোথায় থাক?”

“স্যান ফ্রান্সিসকোতেই।”

“ঠিকানা?”

“নাইন-ও-সিক্স গ্রিনউইচ।”

“জায়গাটা তোমার ব্যক্তিগত বাসভবন?”

“না, একটা অ্যাপার্টমেণ্ট বিল্ডিং।”

“তুমি চাকরি কর?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায়?”

“আমি একজন কনসালট্যাণ্ট।”

“কী ধরনের কনসালট্যাণ্ট?”

“আমি কম্পিউটারের ভাষা ডিযাইন করি।”

“একটু বুঝিয়ে বলবে?”

“খুব সহজ কাজ,” ভাবলেশহীন গলায় বলল ফ্র্যান্‌যেন। “একেক বিযনেস ফার্মের একেক ধরনের কম্পিউটার থাকে। এরকম ভিন্ন ধরনের দুটো ফার্ম যখন পরস্পরের কম্পিউটারের মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য ব্যবহার করে উপকৃত হতে চায়, তা হলে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। তখনই আমার ডাক পড়ে। আমি দুটো কম্পিউটারের মধ্যে ইলেকট্রনিক কানেকশন দিই যাতে এক কম্পিউটার অন্যটার ভাষা বুঝতে পারে। ফলশ্রুতিতে কম্পিউটার দুটো নিজেদের সংগ্রহে থাকা তথ্য বিনিময় করতে পারে।”

“কাজটা তো খুব স্পেশাল মনে হচ্ছে,” বলল শেফিল্ড।

“হ্যাঁ, তা বলতে পারেন।”

“কেমন রোজগার হয়?”

“বছরে আশি হাজার ডলারের মত।”

সরু দুটো বলিরেখা পড়ল শেফিল্ডের কপালে। ফ্র্যান্‌যেন বুদ্ধিমান লোক, বুদ্ধি বেচেই খায় সে। তার কাজটাও সম্মানজনক। তা হলে ওর মত একজন লোক কেন সাধারণ তিনজন গৃহবধূর নৃশংস খুনের স্বীকারোক্তি দিতে এল? তার চেয়েও জটিল প্রশ্ন হচ্ছে, ফ্র্যান্‌যেনের স্বীকারোক্তি যদি সত্যি হয়, তা হলে খুনগুলোই করল কেন সে?

“আজ রাতে তুমি এখানে এসেছ কেন, মি. ফ্র্যান্‌যেন?” জানতে চাইল শেফিল্ড।

“স্বীকারোক্তি দিতে।” রক্সটনের দিকে তাকাল ফ্র্যান্‌যেন। “এই কথা তো আমি কয়েক মিনিট আগেই বলেছি উনাকে।”

“কীসের স্বীকারোক্তি দিতে এসেছ?”

“খুনের।”

“কোন্‌ খুনের? ঠিক করে বল।”

ফ্র্যান্‌যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আজ বে এরিয়া-তে খুন হওয়া মহিলা তিনজনের হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি দিতে এসেছি আমি।”

“শুধু এই তিনটে খুনের স্বীকারোক্তি দিতেই এসেছ?”

“হ্যাঁ।”

“এদের বাইরে আর কাউকে খুন করনি?”

“না, না।”

“বল তো, আমাদের হাতে ধরা দিতে এসেছ কেন তুমি?”

“কেন? কারণ আমি দোষী। কারণ আমি ওদের খুন করেছি।”

“শুধু এই কারণেই ধরা দিতে এলে?”

এক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল ফ্র্যান্‌যেন। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “না, ওটাই একমাত্র কারণ নয়। আজ দুপুরে স্যান ফ্রান্সিসকো ফিরে আসার পর অ্যাকুয়াটিক পার্কে হাঁটতে গিয়েছিলাম। তখনই বুঝতে পারি, আসলে যতই পালিয়ে বেড়াই না কেন, কোনও লাভ নেই। একসময় না একসময় আপনাদের হাতে ধরা পড়বই। দুই দিন আগে আর পরে। একবার পালিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু কীভাবে পালাব ভেবে পেলাম না। সত্যি বলতে কী, জীবনে যত কাজ করেছি, তার সবই করেছি ক্ষণিকের আবেগের বশে। কাজগুলো করার আগে একবারও যদি ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে বসতাম, তা হলে সেগুলো আর করা হত না। সেই একই বোধহীন, উন্মাদ আবেগের বশে ওদের তিনজনকে খুন করি। খুনগুলো করার আগে যদি একবারের জন্যও ভাবতাম, তা হলে খুনগুলো কখনও করতাম না।...”

বাকি দুই ইন্সপেক্টরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল শেফিল্ড। তারপর বলল, “কাজটা কীভাবে করলে আমাদের বলবে, ফ্র্যান্‌যেন?”

“কী?”

“ওদের খুন করলে কীভাবে?” জিজ্ঞেস করল শেফিল্ড। “কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছ?”

“কাঠের হাতুরি দিয়ে। মাংস পিটিয়ে নরম করা হয় যেটা দিয়ে। শেষপ্রান্তে খাঁজকাটা আছে।”

“নীরবতা নেমে এসেছে ইণ্টারোগেশন রুমে। পালাক্রমে রক্সটন আর টোবিয়াসের দিকে তাকাল শেফিল্ড। একই চিন্তা খেলে যাচ্ছে তিনজনের মনে। মিডিয়ার কাছে পুলিশ খুনের অস্ত্রের ব্যাপারে কোনও কথা ফাঁস করেনি। শুধু বলেছে, ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে খুন করা হয়েছে মহিলা তিনজনকে। তবে প্রথম নিহতের ল্যাব রিপোর্ট ও প্রাথমিকভাবে অন্য দুই নিহতের মরদেহ দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, একটা বর্গাকৃতির শক্ত অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে খুনের কাজে। সাথে এ-ও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মাংসের মধ্যে খাঁজ-কেটে বসার মত ‘দাঁত’ আছে অস্ত্রটায়। ফ্র্যান্‌যেন যে কাঠের হাতুড়ির কথা বলল সেটার সাথে খুনের অস্ত্রটার বৈশিষ্ট্য খাপে খাপ মিলে যায়।

শেফিল্ড জিজ্ঞেস করল, “হাতুড়িটা কী করলে, ফ্র্যান্‌যেন?”

“ওটা ফেলে দিয়েছি।”

“কোথায়?”

“সসালিটো-তে। রাস্তার পাশের এক ঝোপে।”

“জায়গাটা আবার চিনতে পারবে?”

“পারব বোধহয়।”

“তাহলে পরে আমাদের ওখানে নিয়ে যেতে পারবে?”

“পারব।”

“সবার শেষে কাকে খুন করেছ? ইলেইনি ডানহিলকে?”

“হ্যাঁ?”

“তাকে কোথায় মেরেছ?”

“বেডরুমে।”

“বেডরুমের কোথায়?”

“ড্রেসিংটেবিলের পাশে।”

“তোমার প্রথম শিকার কে ছিল?” রক্সটন জানতে চাইল।

“জ্যানেট ফ্লেণ্ডার্স।”

“ওকে তুমি বাথরুমে খুন করেছ, তাই না?”

“না, না, কিচেনে...”

“তার পরনে কী ছিল?”

“নকশাকাটা হাউসকোট।”

“মহিলাকে খুন করার পর বিবস্ত্র করেছ কেন?”

“আমি তো তেমন কিছু করিনি। আমি কেন...”

“মিসেস গর্ডন তোমার দ্বিতীয় শিকার ছিলেন, তাই না?” জিজ্ঞেস করল টোবিয়াস।

“হ্যাঁ।”

“তাকে কোথায় খুন করেছ?”

“কিচেনে।”

“উনি তো সেলাই করছিলেন, তাই না?”

“না, ও কেক বানাচ্ছিল,” উত্তর দিল ফ্র্যান্‌যেন। “টেবিলে বসে কেক বানাচ্ছিল ও...”

এতক্ষণে আর্দ্র হয়ে উঠেছে ফ্র্যান্‌যেনের শুকনো চোখ। কথা থামিয়ে চোখ থেকে রিমলেস চশমা খুলে ফেলল সে। অশ্রুতে ভিজে যাওয়া কাঁচ মুছল বাঁ হাতে। ওকে দেখতে দেখতে স্বস্তি ও দুঃখের মিলিত একটা অনুভূতি হচ্ছে শেফিল্ডের। লোকটা যে নিঃসন্দেহে মহিলা তিনজনের খুনি প্রমাণিত হয়েছে, এজন্য স্বস্তি বোধ করছে সে। রক্সটন আর টোবিয়াসের চোখেমুখেও একই অনুভূতির ছাপ ফুটে উঠেছে স্পষ্টভাবে। অনেকভাবে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে প্রশ্ন করে অবশেষে নিশ্চিত হতে পেরেছে ওরা। একটি কথাও মিথ্যে বলেনি অ্যান্ড্রু ফ্র্যান্‌যেন। মিডিয়া-প্রচারিত আর কোনও ‘মুগুর-হত্যাকাণ্ড’ সঙ্ঘটিত হওয়ার সুযোগ নেই। আর, এরকম নিরীহ চেহারার, সাদাসিধে জীবনযাপনকারী এক লোককে ঠাণ্ডা মাথার খুনি হিসেবে দেখতে পেয়ে দুঃখ লাগছে শেফিল্ডের।

কিন্তু কেন? ভাবছে শেফিল্ড। এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। খুনগুলো করল কেন লোকটা?

সে জিজ্ঞেস করল, “খুনগুলোর কারণ আমাদের জানাতে চাও, মি. ফ্র্যান্‌যেন? ওদের খুন করলে কেন?”

জিভ দিয়ে চেটে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল ছোটখাটো লোকটা। “খুব সুখী জীবন কাটাচ্ছিলাম আমি। আমার জীবনটার অর্থপূর্ণ ছিল, চ্যালেঞ্জ ছিল...সবকিছুই ছিল আমার। কিন্তু ওই সবকিছুই ধ্বংস করে দিল আমাকে।” হাতের দিকে তাকাল সে। “ওদের একজন আসল সত্যিটা জেনে ফেলল। কীভাবে জানল, জানি না। তারপর বাকি দু’জনকে খুঁজে বের করল। আজ সকালে জ্যানেটের কাছে যাবার পর ও বলে যে, ওরা সবাই মিলে আমার জারিজুরি ফাঁস করে দেবে। সাথে সাথে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। কাঠের হাতুড়িটা তুলে নিয়ে খুন করলাম ওকে। তারপর বাকি দু’জনের বাসায় গিয়ে ওদেরও খুন করলাম। নিজেকে থামাতে পারিনি। আমি যেন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে হাঁটছিলাম।”

“কী বলতে চাইছ তুমি?” শেফিল্ড জানতে চাইল। “ওই মহিলা তিনজনের সাথে তোমার কী সম্পর্ক ছিল?”

বিদ্যুতের আলোতে চক-চক করছে অ্যাণ্ড্রু ফ্রেন্‌যেনের চোখের জল।

“আমার স্ত্রী ছিল ওরা,” বলল সে।

অলংকরণ - প্রমিত নন্দী



পাঠকেরা যা পড়ছেন