স্যাম্পল

২৭ ডিসেম্বর ২০১৬
গত ১৩ই ডিসেম্বর ২০০০ থেকে জিম্বো নামের একটি অ্যালসেশিয়ান কুকুর হারিয়ে গেছে। শক্ত সমর্থ গড়ন। রঙ সাধারণ অ্যালসেশিয়ানের মতোই। পেতলের চেন সহ খয়েরী রঙের ক্রশবেল্ট পড়ানো আছে। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি সন্ধান পেলে নিম্নোক্ত ঠিকানায় জানাতে অনুরোধ করা হচ্ছে বা ফোন করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।
শুভ্রাংশু পাল
প্রযত্নে – সুধাংশু কুমার পাল
১৮/৭ ভট্টাচার্য পাড়া লেন
বহরমপুর মুর্শিদাবাদ
ফোন – ০৩৪ ৮২৯ ৫৭০০

মাসছয়েক ধরে বেশ কিছু ম্যাগাজিন আর বই কেনা হয়েছে যেগুলো বাড়ির এখানে ওখানে ঘুরেঘুরে বেড়াচ্ছিল। সেগুলোকে বুক সেলফে সাজিয়ে রাখতে গিয়ে ওপরের ওই বয়ান লেখা ছোটো হ্যান্ডবিলটা একটা বইয়ের ভাঁজে পেয়ে সবেমাত্র পড়েছি, তখনই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। যে নামটা ভেসে উঠলো সেটা দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম। শুভ্রাংশুদা এতদিন পর!

শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর শুভ্রাংশুদা যে খবর দুটো দিলেন তার একটা অবিশ্বাস্য আর একটাকে কি বলবো বুঝতে পারছি না।

হিসেব মতো প্রায় ষোলো বছর হয়ে গেল শুভ্রাংশুদারা এখান থেকে চলে যাওয়ার। প্রথম প্রথম চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল ভালোই। সেটা বন্ধ হয় ফোনের দৌলতে। শেষ তিন বছরে আর কোনো ফোন আসেনি ওদিক থেকে। আমিও যেচে করিনি।

কিন্তু উনি যা বললেন তাও কি সম্ভব? যে কুকুর হারিয়ে গেল বহরমপুর মুর্শিদাবাদে, সে ফিরে এলো ১৬ বছর বাদে পুরুলিয়ার সাহেব বাঁধ এলাকায়! একে অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছাড়া আর কি বলবো! আর দ্বিতীয় খবরটা হলো সুধাংশুবাবু মানে শুভ্রাংশুদার বাবা কথা বলতে পারছেন। যা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই সময়ে, যখন জিম্বো হারিয়ে যায়।

মাথাটা কেমন যেন করে উঠলো। তাহলে সুধাংশু বাবু সেই সময় আমাকে যে লিখিত বয়ান পড়তে দিয়েছিলেন তা সত্যি? একই সাথে আতঙ্ক, বিস্ময় আর অবিশ্বাস আমার মাথার ভেতরে তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছে।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৬

বছরের শেষদিনগুলোতে কাজের চাপ তেমন থাকে না। প্রত্যেকবারই কোথাও না কোথাও বেড়াতে যাই। এবার সোজা চলে এসেছি শুভ্রাংশুদাদের বাড়ী। পুরুলিয়া।
সবার আগে দেখা করলাম নব্বই পার করা মানুষটার সাথে। আমার দিকে ক্ষণিক বিহ্বল চোখে চেয়ে থেকে বললেন, “রাতে একান্তে কথা হবে। এখন বিশ্রাম নাও।”
রাত নটার মধ্যে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে হাজির হলাম সুধাংশুবাবুর ঘরে। প্রথম যে কথাটা উনি বললেন, “অতনু ওরা আবার ফিরে এসেছে। কোথায় কবে কি হবে বুঝতে পারছি না!”

জবাবে বললাম, “দেখুন কবে কোথায় কি হবে সে সব কথা ভেবে আপনি তো কিছু করতে পারবেন না। তার চেয়ে আমায় একটা অনুমতি দিন।”

—“অনুমতি! কিসের?”

—“মনে আছে আশা করছি আমার একটু লেখালেখির শখ আছে। সেই সূত্রে বেশ কিছু সংবাদপত্রের মানুষজনের সাথে আমার চেনা জানা আছে। ২০০০ সালের বাড়ি রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। আপনি অনুমতি দিলে ঘটনাটা যা ঘটেছিল সেটা জনসাধারনকে জানাতে চাই।”

—“তুমি ভুল পথে ভাবছো অতনু।”

—“মানে?”

—“মানে অতি সোজা। ঘটনাটা কি ঘটেছিল এটা জানালেই তো হবে না। উপযুক্ত কিছু প্রমাণ তো দিতে হবে। আমার মুখের কথায় কি কিছু প্রমাণ হবে।”

—“সত্যিই তো একথাটা তো ভাবিনি।”

—“তাছাড়া আমার বয়েস হয়েছে। আগের তুলনায় সংবাদপত্রের সংখ্যা বেড়েছে। তোমার লেখার প্রেক্ষিতে ধরেই নিচ্ছি অনেকেই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাবে। সে চাপ নেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। ওই দিন কি ঘটেছিল একমাত্র তুমি ছাড়া আমি আর কাউকে জানাই নি। শুভ্রাংশুও মনে হয় না এসব ঝুটঝামেলা পছন্দ করবে।”

কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললাম, “আচ্ছা নাম পরিচয় বদলে কেবলমাত্র স্থান আর কাল এক রেখে গল্পের মতো করে এটা প্রকাশ করার অনুমতি দেবেন আমায়?”

—“হ্যাঁ সেটা করতে পারো। গল্পের ছলেই না হয় মানুষের কাছে সত্যিটা প্রকাশ হোক।”

জানুয়ারী ২০১৭

পুরুলিয়া থেকে ফিরে খুঁজে বার করলাম ডিসেম্বর ২০০০ ‘বহরমপুর খবর’ এর চতুর্থ সপ্তাহের সংস্করণটা। বড় সংবাদপত্রে খবরটা বের হতে দেখিনি কিন্তু লোকাল এই ট্যাবলয়েড বেশ গুরুত্ব দিয়েই খবরটা প্রথম পাতাতেই ছাপিয়েছিল।

বাড়ী ঘিরে রহস্য
নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর খবর

গত ১৩ই ডিসেম্বর ২০০০, বহরমপুর লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানীর প্রধান অফিসের পেছনের পাড়ায় একটি একতলা বাড়িতে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। কোনও রকম বিস্ফোরণ না হওয়া সত্বেও বাড়ীটির তিনটে ঘরের ছাদ দেওয়ালের সংযোগস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দরজা জানলাগুলিকে কোনো এক অমানুষিক শক্তি ঠেলে বার করে দিয়ে বাইরের দিকে। তিনটে জানলা ছিটকে গিয়ে পড়েছে বাইরের দিকের মাঠে। অন্তত ফুট দশেক দূরে। সিঁড়ি ঘরের ওপরে লাগানো করোগেটের টিনের ছাদ বেঁকে উঠে গেছে ওপর দিকে কোনাকার হয়ে। আশ্চর্যের বিষয় ঘরের ভেতরের কোনো জিনিষপত্রের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়নি। কেবলমাত্র ফ্রিজের দরজা চেপ্টে ঢুকে গেছে ভেতর দিকে। ঘরে শুয়ে থাকা পরিবারের তিনজন সদস্যের গায়ে একটি আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল সকলেই। জানতেই পারেনি কি হয়েছে। ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর স্থানীয় মানুষ পুলিসে খবর দেয়। তারাই এসে ওদের ঘুম ভাঙান।

ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট বা পুলিসের তরফ থেকে এ ঘটনার কোনো সমাধান সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মফস্বলের নিস্তরঙ্গ জীবনে বেশ একটা সাড়া পড়ে গিয়েছিল ঘটনাটা নিয়ে। দলে দলে লোক দেখতে গিয়েছিল বাড়িটাকে। আমিও বাদ যাইনি। স্থানীয় কেবল নেটওয়ার্কের খবরেও দেখিয়েছিল কয়েকদিন ধরে। তারপর সব চুপচাপ হয়ে যায়।

ফেব্রুয়ারী ২০১৭

একেই কি বলে কাকতালীয়! না, সেদিন কথাটা মনে হলেও পুরুলিয়া থেকে ফিরে আসার পর আজ লিখতে বসে বুঝতে পারছি মোটেই কাকতালীয় ঘটেনি।

১৫ ডিসেম্বর ২০০০

পিকি কিক কিক কিঁ ইঁ ইইই...

কলিং বেলটা বেজে উঠতেই বিরক্তি জড়ানো স্বরে সাড়া দিলাম, যাচ্ছি। ধ্যাত্তেরি! কেরে বাবা এই সকালে! রহস্যময় বাড়ীটার একটা প্রতিবেদন দেখাচ্ছিল ইউ সি এল কেবল চ্যানেলে।

দরজা খুলেই দেখলাম দেবারতি দাঁড়িয়ে আছে।

—“আরে তুই? এখন হঠাৎ! কি ব্যাপার? আজ তো...”

—“পড়তে আসিনি কাকু।”

গলাটা কেমন যেন ভারী ভারী শোনালো। মুখে বিষন্নতার ছায়া।

—“তাহলে?”

—“বাবা পাঠালো?”

—“শুভ্রাংশুদা ? কেন রে?”

—“জানো কাকু, দাদু না কথা বলতে পারছে না। আর জিম্বোকেও পাওয়া যাচ্ছে না।”

বলতে বলতেই ওর দুচোখ দিয়ে গড়িয়ে এলো কয়েক ফোঁটা জল।

—“সে কিরে! কবে থেকে মানে কখন... আয় আয় ভেতরে আয়।”

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলাম, “কথা বলতে পারছেন না মানে? অসুখ টসুখ হয়েছে নাকি? কবে হলো?”

—“গত পরশু থেকে। তুমি তো জানোই দাদুর রোজ মর্নিংওয়াকে যাওয়া চাইই চাই। শীত বর্ষা মানেন না। জিম্বোও যেত রোজ দাদুর সাথে। ওই দিন দাদু বাড়ি ফিরলেন। সাথে জিম্বো নেই। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম। কোনও উত্তর নেই। ইশারা করে বোঝালেন উনি কথা বলতে পারছেন না।

—“তারপর?”

“তারপর...” কেঁদে ফেললো দেবারতি। “ডাক্তার দাদু এসে ঘুমের ওষুধ দিয়ে গেছেন। দুদিন ধরে বিছানাতেই আছেন। কি হবে কাকু?”

দেবারতি আমার কাছে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো দেখিয়ে নেয়। কাশীশ্বরী স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ওর বাবা আমার দাদার বন্ধু। সেই সুত্রে আলাপ। দু’পরিবারের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক আছে আত্মীয়তা ছাড়াই। বুঝতে পারছিলাম না শুভ্রাংশুদা ওকে আমার কাছে কেন পাঠিয়েছেন। তাই জিজ্ঞাসা করলাম। আমাকে কি কোথাও যেতে হবে?

মাথা নেড়ে একটা ভাঁজ করা কাগজ বাড়িয়ে ধর লো আমার দিকে।

—“কি ওটা?”

—“বাবা কিছু লিখে দিয়েছেন?”

খুলতেই দেখলাম ভেতরে জিম্বোর একটা ছবি।

ভাই অতনু,

দেবারতির মুখে আশা করি শুনে ফেলেছো সব। খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি বাবাকে নিয়ে। একটা কাজ করে দিতে হবে ভাই। জিম্বোকে বাড়ীর আর এক সদস্যর মতো ভাবা হয় সেটা তো জানোই। ওকে খুঁজে বার করার জন্য কিছু লিফলেট ছাপাতে চাই। এসব ব্যাপারে আমার কোনও আইডিয়া নেই। যা করতে হয় তুমি কোরো। খরচাপাতি যা হবে আমার কাছ থেকে নিয়ে নিও।

শুভ্রাংশুদা
ফেব্রুয়ারী ২০১৭

এরপর লিফলেটের বয়ান লিখে, দেবারতিকে বাড়ি পৌছে দিয়ে, উদয়ন প্রেসে ছাপাতে দিয়ে এসেছিলাম। শুভ্রাংশুদার লেখা চিঠিটাও পেয়ে গেলাম ২০০০ সালের ডায়েরির মধ্যে। সাথেই পেয়ে গেলাম সুধাংশুবাবুর দেওয়া জেরক্স করা কাগজগুলোও।

২৪ জানুয়ারী ২০০১

বন্ধুর বোনের বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরছিলাম। আমার আবার রাত নটা থেকে সাড়ে নটার মধ্যে খেয়ে নেওয়ার অভ্যাস। তার ওপর শীতকাল, তাই প্রথম ব্যাচেই বসে গিয়েছিলাম। ঘড়িতে তখন পৌনে দশটা। দেখতে পেলাম সুধাংশুবাবুর ঘরের জানলাটা খোলা। অবাক হলাম। ঠান্ডার দিন। বয়স্ক মানুষ। এগিয়ে গেলাম ব্যাপার কি জানার জন্য। দেবারতিদের বাড়িটা তিনতলা। ওঠানামা করার হাত থেকে বাঁচার জন্য এক তলায় রাস্তার ধারের ঘরটা উনি নিজেই বেছে নিয়েছেন। মেসোমশাই বলে ডাকতেই জ্বলে উঠলো ঘরের আলো। একটু বাদেই খুলে গেল সদর দরজাটা। ইশারায় আসতে বললেন ভেতরে। দরজাটা লাগিয়ে অনুসরণ করলাম ওনাকে। ঘরে ঢোকার পর আমাকে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করলেন। জানলা ও দরজা ভালো ভাবে লাগিয়ে নিজে এসে বসলেন বিছানায়। পাশেই রাখা ছিল একটা কাগজের প্যাড আর পেন। কথা বন্ধ হওয়ার পর থেকে এ দুটো ওনার নিত্য সঙ্গী। ভাব আদানপ্রদানের একমাত্র মাধ্যম।

আমি কিছু বলার আগে প্যাডের ওপরের কভারটা উঠিয়ে আমার দিকে বাড়ীয়ে ধরলেন। দেখতে পেলাম লেখা আছে, “তোমার জন্যই অপেক্ষা করিতেছিলাম। তোমাকে যাইতে দেখিয়াছিলাম। অনুমান করিয়াছিলাম জানালা উন্মুক্ত রহিয়াছে তোমার দৃষ্টিতে আসিবে। আমার অনুমান নির্ভুল। আমি তোমায় কিছু কথা বলিতে উৎসুক।”

বললাম, “হ্যাঁ, বলুন না।” প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি সাধু ভাষায় লেখাটা মেসোমশায়ের চিরকালের অভ্যাস। কথা অবশ্য চলিতেই বলেন। মানে এই অবস্থা হওয়ার আগে পর্যন্ত বলতেন।

বোর্ডটা আবার এগিয়ে ধরলেন।

—“গ্রহান্তরের সভ্যতায় তুমি কি বিশ্বাস পোষন করিয়া থাকো?”

প্রশ্নটা পড়ে একটু থতমত খেয়ে গেলাম। আপনা থেকেই মাথাটা হ্যাঁ-না গোছের মতো নড়ে উঠলো।

বোর্ডে খসখস করে লিখলেন, “উত্তর কিন্তু পাইলাম না।”

মনে ভেসে এলো ডিসকভারি চ্যানেলে দেখা বিভিন্ন প্রোগ্রামের কথা। গোটা পৃথিবী জুড়ে এনিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছেই। কোনো স্থির সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া যায়নি বলাটাই স্বাভাবিক।

উনি আবার লিখলেন, অধিক কি ভাবিতেছ?

—“দেখুন বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে সম্ভাব্যতা সূত্রকে যদি মানি তাহলে এত বড় বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে আমাদের এই গ্রহ ছাড়া আর কোথাও যে আর কোনো সভ্যতা থাকতে পারে না এটা বিশ্বাস করি না।

—“অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে।”

—“ধন্যবাদ! কিসের জন্য? কেন?”

—“আসলে যাহা বলিতে চলিয়াছি তাহার প্রতি সামান্যতম বিশ্বাস যদি সম্মুখস্থ শ্রোতার নাহি রহে তাহা হইলে বক্তব্যটি পেশ করিবার কোন উপযোগিতা থাকিবে না।”

—“মানে কি বলতে চাইছেন আপনি?”

—“আমার সাথে উহাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ হইয়াছে।”

লেখাটা দেখে আমার অবস্থাটা কি হয়েছিল আশা করি পাঠক পাঠিকাদের অনুমান করিতে অসুবিধা হচ্ছে না। চোয়াল ঝুলে পড়া কথাটা শুনেছিলাম। আমার যে সেটাই হয়েছে বুঝতে পারলাম এবারের লেখাটা দেখে। স্বভাবরসিক সুধাংশু বাবু লিখেছেন, “মুখগহ্বরটি বন্ধ করা আবশ্যক অতনু। যদিচ শীতকাল তদাপি মশক জাতীয় যে কেহ প্রবেশে দ্বিধা করিবে না।”

বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকা মনে আমি কোন কথা না বলে হাঁ বন্ধ করলাম। ওদিকে সুধাংশুবাবু লিখেছেন, “আমার বুঝিতে অসুবিধা হইতেছে না তোমার পক্ষে ইহা বিশ্বাস করা কি পরিমাণ কঠিন বিষয়। ঘটনাটি ঘটিয়া যাইবার বেশ কয়েকদিন পর অবধি আমি নিজেই বিশ্বাস করিয়া উঠিতে পারিতেছিলাম না। ভাবিয়াছিলাম স্বপ্ন দেখিয়াছি। স্বপ্ন যে নহে তাহার প্রমাণ আমার বাকশক্তি লুপ্ত হওয়া তৎসহ জিম্বোর অন্তর্ধান। যেক্ষণে আমি নিজেকে বিশ্বাস করাইতে পারিলাম সেক্ষণে উপলব্ধি করিলাম এই সকল বাক্য অপরের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করিয়া তোলা কি পরিমাণ দুঃসাধ্যজনক কর্ম। বিগত দিনগুলিতে অনেক ভাবিয়াছি কাহাকে বলা যায় এই অভিজ্ঞতার বিবরণ। কোনজন যে আমাকে অন্ততপক্ষে উন্মাদ বিবেচনা করিবে না।

—“আমার কথা আপনার মনে হলো কেন?”

—“আমার পৌত্রীর সাথে এলিয়েন বিষয়ে তুমি একদিন আলোচনা করিতেছিলে আমি শুনিয়াছিলাম। তোমার কথাবার্তায় মনে হইয়াছিল তুমি বিশ্বাস রহিয়াছে যে গ্রহান্তরে জীবিত প্রাণের সভ্যতা বর্তমান। ভাবিয়াছিলাম আলোচনার নিমিত্ত তোমায় আমার গৃহে আসিবার নিমিত্ত সংবাদ পাঠাইবো। দরকার পড়িল না। সাক্ষাৎ হইয়া যাইলো।”

কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। আচমকা কোন শক পেয়ে মানুষটা পাগল টাগল হয়ে যাননি তো। সাতপাঁচ এমন সব কথা ভাবছি ইতিমধ্যে সুধাংশুবাবু উঠে গিয়ে বিছানার উলটোদিকে রাখা আলমারি খুলে ভেতর থেকে গোল করে পাকানো বেশ কয়েকটা কাগজ আমার সামনে এনে রাখলেন।

—“এগুলো কি মেশোমশাই ?”

আবার প্যাডে লিখলেন, “আমার দিনলিপির ফটো কপি। রাত্রি হইয়াছে। উহা আর এই স্থানে খুলিয়া দেখিবার প্রয়োজন নাই। গৃহে লইয়া যাও। শান্ত মানসিকতায় একান্তে পাঠ করিয়া দেখিও।”

ঘড়ির দিকে তাকালাম। একঘণ্টা পেরিয়ে গেছে প্রায়।


ফেব্রুয়ারী ২০১৭

সেদিন বাড়ি ফিরে পর পর দুবার পড়েছিলাম লেখাটা। সেদিন বিশ্বাস করেছিলাম এটা বললে মিথ্যেই বলা হবে। কল্পবিজ্ঞানের গল্পে, সিনেমায় অনেকবার এরকম ঘটনা পড়েছি দেখেছি। বাস্তবে এরকম হতে পারে, তাও আবার আমারই চেনা একজন মানুষের সাথে এটা বিশ্বাস করতে কেমন যেন মন চায়নি সেদিন। দেবারতির দাদুর কথা বন্ধ হওয়া, জিম্বোর হারিয়ে যাওয়া এবং রহস্যময় বাড়ি যে এক সূত্রে বাঁধা এটা ভাবিইনি কখনো।

মেসোমশায়ের লেখা পড়েও একশো শতাংশ বিশ্বাস সেদিন কোনোভাবেই মনে জমাতে পারিনি। যদিও সেই অবিশ্বাস আজ আর নেই। কেটে গেছে ফিরে আসা জিম্বোকে দেখার পর। আর কথা না বাড়িয়ে আসুন আরো একবার পড়ে দেখি আপনাদের সাথে কি লিখেছিলেন সুধাংশুবাবু তার দিন লিপির পাতায়।

***

আমি সুধাংশু কুমার পাল। ৭৮টি নানা রঙে বর্ণময় বৎসর কাটাইয়াছি এই পৃথিবীতে। সরকারী দপ্তরে চাকুরি করিতাম। নির্দিষ্ট সময়ে অবসর গ্রহণ করিয়াছি। কোনও দিন কোনো খারাপ বা বদ নেশার বশ হই নাই। এক মাত্র নেশা পুস্তক পাঠ। বিশেষ ভালো লাগা বিষয় বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞান। আমার সংগ্রহে এধরনের দেশ বিদেশের পুস্তকের সংখ্যা পাঁচশতাধিক। এতো দিন যাহা কেবলমাত্র বিজ্ঞান ভাবনায় জারিত লেখককুলের কল্পনার জগত বলিয়া ভাবিয়া আসিয়াছি তাহা জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া বাস্তব রূপে প্রতিপন্ন হইলো। অনুধাবণ করিতে পারিতেছি না আমি ভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা?

আমার দুইটি দিনলিপি খাতা। একটি সর্বসমক্ষে দৃশ্যমান, অপরটি রহে গুপ্তস্থানে। প্রথমটিতে দিন প্রতিদিনের জীবন যাপনের খুঁটিনাটি লিখিয়া রাখি। এই অভ্যাস দীর্ঘ ষাট বৎসরের। আর দ্বিতীয়টি যাহাতে আমি এই মুহূর্তে লিখিতেছি তার বয়স দশ। ইহাতে লিপিবদ্ধ হইয়া চলিতেছে আমার জীবনের বিশেষ বিশেষ ঘটনা সমূহ। যাহা এতক্ষণ লিখিলাম তাহা আজ অবধি কোনোদিন লিখি নাই। কিন্তু বর্তমান আমার যা অবস্থা তাহাতে লিখন ব্যতীত আর কিই বা করিতে পারিব।
বিগত ১৩ ডিসেম্বর ২০০০ হইতে আমার বাকশক্তি রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। অদ্য ১৭ ডিসেম্বর। সময় বৈকাল পাঁচ ঘটিকা। ‘উহারা’ আমার কথা বলিবার ক্ষমতাটি হরণ করিয়া লইয়া চলিয়া গিয়াছে।

সাথে লইয়া গেছে আমার সারমেয়টিকে। গত সাত বছর ধরিয়া সে ছিল আমার সর্বক্ষনের সঙ্গী। ১৩ তারিখের পর হইতে আমার পারিবারিক সদস্যরা উহার অনেক খোঁজ করিয়াছে। কিন্তু সন্ধান পায় নাই। কি করিয়া পাইবে? এই পৃথিবীতে থাকিলে তবে তো পাইবে। বিবিধ চিকিৎসক আমার বিবিধ রকমের পরীক্ষণ করিয়া ধারনা করিতে পারে নাই আমার সঠিক কি হইয়াছে। পারিবে না জানিতাম। তৎসত্ত্বেও কিছু জানাইতে সাহস হয় নাই। সকলে আমাকে উন্মাদ মনে করিত। ইহা বুঝিয়াছি উন্নতির চরম শিখরে উহাদের প্রযুক্তির অবস্থান। আমাকে বাকহীন করিলেও মানসিক ভারসাম্যের কিছু মাত্র ক্ষতি করে নাই। এই লেখনী ভবিষ্যতের মানুষের উদ্দেশ্যে লিখিতেছি। আমার বিশ্বাস অদূর ভবিষ্যৎ কালের মানুষ আমার এই লেখনী পড়িয়া বিশ্বাস করিবে। উহারা আসিয়াছিল। প্রমাণ রাখিয়া গিয়াছে মহাবিশ্ব মাঝে পৃথিবীবাসীরাই একমাত্র প্রাণ নহে। কিন্তু এই রূপে কেন? ইহা আমার বুদ্ধির অগম্য।

অন্যান্য দিনের ন্যায় ১৩ ডিসেম্বর বাহির হইলাম প্রাতঃ ভ্রমণে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ইহা আমার জীবনের অঙ্গ। ইহা না করিলে সারাটা দিন মনের অন্দর মহলটি ছটফট করে। ইহা লইয়া গৃহে অনেক কটুকাটব্য হজম করিতে হয় প্রায়শই, কিন্তু আমি অপারগ। গ্রীষ্মকালের দিনগুলিতে কিছু সমবয়স্ক মানুষের সঙ্গ মিলিলেও বাকি ঋতুগুলিতে আমি একাই ভ্রমণ করে আসি। সামান্য ভুল বলিলাম। গত ছয় বছর ধরিয়া জিম্বো, আমার সারমেয়, আমার সাথে গমন করে। প্রসঙ্গত জানাইয়া রাখি আমার প্রাতঃ ভ্রমণ কোন বিশেষ উদ্যানে বাঁধা নয়। আমি ঘুরিয়া বেড়াই এই শহরের বিভিন্ন গলিপথে। আমার কৈশোর যৌবনের দিনের স্মৃতি রোমন্থন করিয়া বেড়াই ওই সব পথে চলিতে চলিতে। বয়স হইয়াছে খেই হারাইতেছি— মাফ করিবেন সুধী ভবিষ্যৎ পাঠক পাঠিকাগণ। ভুলিয়া যাইবেন না বলা হইয়া থাকে, বাহাত্তুরে মন, ঘুরে বেড়ায় হেথা সেথা বৃন্দাবন।

জিম্বো এইক্ষণটির অপেক্ষাতে বসিয়া থাকে প্রত্যহ। আমাকে সদরদ্বারের নিকট যাইতে দেখিলেই নিজ মুখে আপনার চেন বেল্ট লইয়া হাজির হইয়া যায়। যাহা হউক বাহির হইলাম। গৃহ অভ্যন্তর হইতে উন্মুক্ত করা যাইবে এমন তালা লাগাইয়া শুরু করিলাম পদচারণা। মনে মনে ছকিয়া লইলাম কোন কোন পথে ভ্রমণ করিব। কল্পনা সিনেমা হলের মোড় হইয়া সতীমা স্টোরসের পার্শ্বস্থ পথ ধরিয়া এল আই সি অফিসের পশ্চাতের গলিপথ এবং লাল দিঘি।

শীতের ভোর। চারি পার্শ্বের গৃহগুলির দরজা জানালা বন্ধ। মৃদু কুয়াশার চাদরে আচ্ছন্ন হয়ে আছে আশপাশ। দুই একটি সারমেয় কুন্ডলী বদ্ধ হইয়া হেথা হোথা নিদ্রামগ্ন। জিম্বোর প্রতি নজর নাই। এই ঠান্ডায় শত্রুতা প্রকাশের ইচ্ছে হইতেছে না উহাদের। একটি মানুষকে দেখিলাম বুক কর্নার দোকানের শাটারে হেলান দিয়া বসিয়া আছে কম্বল মুড়ি দিয়া। উহার পাশেই একটি কাঠের ঢপ এবং উনান। সম্ভবত তেলেভাজা ও চা বিক্রেতা।

কি মনে হইতে হাত ঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করিলাম। যাহা ভাবিতেছিলাম তাহাই। আজ কিঞ্চিৎ আগেই বাহির হইয়াছি। ইহার জন্যই আশপাশ অতিরিক্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন বোধ হচ্ছিল। আমি ভাবিয়াছিলাম মেঘের সঞ্চার হইয়াছে। কি আর করা যাইবে, বাহির যখন হইয়াছি ফিরিবার প্রশ্নই নাই। হাঁটিতে থাকিলাম। কীর্তনাঙ্গের একটি গানের কলি গুন গুন করিতে করিতে এক সময় পৌছাইলাম এল আই সি অফিস গৃহের পশ্চাৎ এর মাঠটিতে। জিম্বো সহসা পাথরের মূর্তির ন্যায় স্থির হইয়া গেল। সমস্ত শক্তি একত্র করিয়াও উহাকে নিজের দিকে আনিতে পারিলাম না। ভোরের আবছা আলোয় লক্ষ্য করিলাম উহার রোমগুলি সজারুর ন্যায় খাড়া খাড়া হইয়া গিয়াছে। মার্জার দেখিলে যেমনটা হয়। জিম্বো যেদিকে তাকাইয়া ছিল সেদিকে দৃষ্টি হানিলাম। না, মার্জার নহে, কিন্তু উহা কি?

জমির ওপর ভাসিতেছে একটি স্বচ্ছ ম্রিয়মাণ আলোর ঘনক। আকারে ১০-১২ বর্গ ফুট তো হইবেই। ঠিক যেন একটি বৃহদাকৃতি লুডোর ছক্কা। স্বচ্ছ কিন্তু অভ্যন্তরে কি রহিয়াছে অবলোকন করা যাইতেছে না। কুয়াশার কারণে ঝাপসা হইয়া যাওয়া চশমার কাঁচ ভালো করে মুছিয়া লইয়া আবার তাকাইলাম। ঘনকটির আলো যেন একটু বৃদ্ধি পাইলো। যে পার্শ্ব দেখিতে পাইতেছিলাম সেই পার্শ্বে উলম্ব ও আনুভূমিক দাগ কাটা। দেখিয়া মনে হইতেছে অনেক গুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘনক দ্বারা সম্পূর্ণ ঘনকটি বানানো হইয়াছে। অগ্রসর হইলাম আরো ভালো করিয়া দেখিবার উদ্দেশ্য লইয়া। জিম্বোর আমার সাথে যাইবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা রহিয়াছে বলিয়া মনে হইলো না। তৎসত্ত্বেও উহাকে টানিতে টানিতে লইয়া যাইলাম। দশ বারো পা অগ্রসর হইবার পর ঘনকটি আরো স্পষ্ট রূপে প্রতীয়মান হইলো। বিশেষ কিছু অবশ্য দেখিতে পাইলাম না। তবে বুঝিলাম আকার আমার অনুমানের চেয়েও বেশী এবং উহা অন্ততঃ দু তিন হাত উচ্চে শূন্যে ভাসিয়া আছে। কিন্তু কিভাবে তাহা বুঝিতে পারিলাম না। কাছে পিঠে কোথাও কোনো রূপ দন্ড বা রজ্জু সদৃশ কিছু দেখিতে পাইলাম না।

কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চমকিয়া উঠিলাম। একটি ক্ষুদ্র আলোর ঘনক আমাদের দিকে ধাইয়া আসিতেছে! কিছু করিল না অবশ্য শুধু আমাদের ঘিরে কয়েক পাক ঘুরিয়া লইলো। অনুভব করিলাম আমার নড়িবার শক্তি চলিয়া গিয়াছে। দেখিতে পাইতেছি, শব্দ শুনিতে পাইতেছি, সব কিছু বুঝিতে পারিতেছি কিন্তু নড়িতে পারিতেছি না। জিম্বোর কিন্তু কিছু হয় নাই। যে একটু আগে আসিতেই চাহিতেছিল না সে অগ্রসর হইতেছে ঘনকটার দিকে। নিজের ইচ্ছায়!

আরো দুইটি ক্ষুদ্র আলোর ঘনক বাহির হইয়া আসিল বড় ঘনকটি হইতে। সংযুক্ত হইলো আগের ঘনকটির সহিত। উহারা নামিয়া আসিলো জিম্বোর শরীরের উপর। চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া প্রত্যক্ষ করিলাম জিম্বো অদৃশ্য হইলো। তিনটি সংযুক্ত ঘনক উঠিয়া প্রবেশ করিল বড় ঘনকটির অভ্যন্তরে। সাহায্যের প্রত্যাশায় চিৎকার করিতে চেষ্টা করিয়া অনুভব করিলাম আমি কথাও বলিতে পারিতেছি না। এ কি হইতেছে? শরীর যেন ক্রমশ ঠান্ডা হইতে শুরু করিল।

সময় বইয়া যাইতেছিল মিনিটে মিনিটে। আমি দন্ডায়মান পাথরের মূর্তির ন্যায়। সহসা বড় ঘনকটি হইতে একটি সোনালী আলোক রশ্মিরেখা ঘনকটির সম্মুখস্থ সাদা একতল বিশিষ্ট গৃহটির ওপর আছড়াইয়া পড়িল। সানাই এর পোঁ ধ্বনি সুলভ একটি শব্দ আমার মস্তিষ্কে অনুরণিত হইলো তীব্র রূপে। আর সাথে সাথেই ওই গৃহটির তিনখানি কাষ্ঠ নির্মিত লৌহ জালিকা সম্বলিত জানালার ফ্রেম ছিটকিয়া গিয়া পড়িল সম্মুখস্থ জমিতে। সাথে সাথে প্রধান দরজাটিও। সিঁড়ি ঘরের উপরিস্থিত টিন নির্মিত আচ্ছাদন বাঁকিয়া ত্রিভুজাকৃতি রূপ ধারণ করিল। অনেকগুলি আলোক নির্মিত ঘনক ছিটকাইয়া বাহির হইয়া আসিল শূন্য গবাক্ষ পথগুলি হইতে। মিলিত হইলো বৃহৎ ঘনকটির সহিত এবং পলক ফেলিতে না ফেলিতেই অবিশ্বাস্য গতিতে সমগ্র ঘনকটি ঊর্ধ্বপানে ধাইয়া কোথায় যেন অন্তর্হিত হইলো মহাকাশে।

শীতের ভোর। তথাপি আমার সম্পূর্ণ শরীর ঘর্মসিক্ত। আমি এখন নড়িতে পারিতেছি। ফিরিয়া পাইয়াছি চলিবার শক্তি। কিন্তু বাকশক্তি নাই। নাই সাথে আমার সঙ্গী জিম্বো। চারিপার্শ্বের গৃহগুলি হইতে মানুষ বাহির হইয়া আসিতেছে কি ঘটিল প্রত্যক্ষ করিবার নিমিত্ত। কিরূপে নিজ গৃহে ফিরিয়া আসিয়াছিলাম জানি না। আমি বোধ হয় আর বাঁচিব না।

***

বিগত দশ বছরের প্রেক্ষিতে একই দিনে দুইবার এই গুপ্ত খাতায় কিছু লিখিতেছি।

“আমি বোধ হয় আর বাঁচিব না।”

কথা কয়টি লিখিবা মাত্র মাথার ভিতর কেমন যেন একটা করিয়া উঠিলো। একটি ধাতব কন্ঠস্বর যেন বলিয়া উঠিল, “স্কিপি তুমি বেঁচে থাকবে। কোন চিন্তা কোরো না।”

স্কিপি! কতকাল বাদে নামটি শুনিলাম। এস কে পি, সুধাংশু কুমার পাল। বন্ধুরা ডাকিতো স্কিপি বলিয়া।

—“আমাদেরও বন্ধু বলেই ভাবতে পারো।”

আশ্চর্য বোধ হইলো। আমার মনের অভ্যন্তরে কে কথা বলিতেছে আমার সহিত!

“স্কিপি, তোমার মানসিক ভাবনা পাঠের ক্ষমতা আমাদের কাছে অতি সহজসাধ্য ব্যাপার। আমাদের জগতে শব্দের কোন ব্যবহার নেই। শুধুমাত্র মানসিক তরঙ্গের আদান প্রদান। তুমিও আসলে কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছো না। মস্তিষ্কের অনুরণন তোমার কাছে শব্দ বলে মনে হচ্ছে।”

মনে ভাসিয়া উঠিলো প্রশ্ন, “কে তোমরা? আমি কথা বলিতে পারিতেছি না কেন?”

—“আমরা গ্রহান্তরের অধিবাসী। যাদের তুমি নিজের চোখে দেখেছ। আর কথা বলতে পারছো না কারণ ওটা না করলে এই মানস তরঙ্গের আদান প্রদান করা সম্ভব হত না।”

—“জিম্বো কোথায়?”

—“আমাদের মহাকাশ যানে।”

—“আর একটা প্রশ্ন করিতে পারি?”

—“একটা কেন যত খুশি করো।”

—“কোথা হইতে এবং কি উদ্দেশ্য নিয়ে তোমাদের আগমন হইয়াছে?”

—“তোমাদের গ্রহের বিজ্ঞানের ভাষা অনুসারে এই পৃথিবী হইতে ১০.৪ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থান করছে তিনটি নক্ষত্র। রস ১২৮, এপিসিলন এরিদানি এবং লিটেন ৭৮৯-৬। এই তিনটে নক্ষত্রকে সরল রেখা দ্বারা জূড়লে যে ত্রিভুজ পাওয়া যাবে তাহার মধ্য বিন্দু হইতে আরো ২৭ আলোক বর্ষ দূরে ১৭টি গ্রহ নিয়ে আমাদের নক্ষত্র জোনাস-এর সংসার। আর সেখানকার একাদশতম গ্রহ এস্টিও। তারই অধিবাসী আমরা। তোমাদের ভাষায় বললে আমাদের পারিভাষিক নাম কিউ। পৃথিবীতে আগমনের কারন স্যাম্পল সংগ্রহ করা।”

—“মানে?”

—“মানে ঠিক যেমন ভাবে তোমাদের গ্রহের বিজ্ঞানীরা কোন নতুন স্থান থেকে নতুন বস্তুর নমুনা সংগ্রহ করেন সেরকমই।”

—“একটু বিস্তারিত রূপে বলিলে বুঝিতে সুবিধা হয়।”

—“বেশ। আমাদের এস্টিওতে বসবাস করার জন্য কোন আলাদা আধারের দরকার হয় না। মহাকাশ যাত্রা পথে আমাদের চোখে পড়ে তোমাদের গ্রহটা। তোমরা কি কারনে এবং কি ভাবে ওই রূপ বাক্স জাতীয় আধারের ভেতর বসবাস করো এটা জানার কৌতূহল থেকেই আমরা এখানে অবতরণ করি।”

—“কিরূপ ছিল তোমাদের পরিকল্পনা?”

—“তোমার মতো কিছু জীব সহ একটা আধারকে গোটাটাই সাথে করে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সম্ভব হলো না। আধারটির বেশ খানিকটা অংশ এখানকার ভুমির ভেতর প্রোথিত থাকায় আমরা ওটাকে উঠাতে সক্ষম হইনি। স্যাম্পল ভেঙে যাচ্ছিলো চার দিকে।”

—“দরজা জানালা ভাঙ্গিলে কেন?”

—“তোমাদের প্রযুক্তি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান না থাকা আর আমাদের প্রতিকূল পরিবেশ।”

—“বোধগম্য হইলো না।”

—“আমাদের এস্টিও ঠান্ডা আবহাওয়ার গ্রহ। গরম বা জোরালো আলো আমাদের কাছে প্রাণঘাতী। যে কারণে তোমাদের গ্রহে প্রবেশ করিয়াছিলাম এই অঞ্চল হইতে তোমাদের প্রধান নক্ষত্র অন্য দিকে সরে যাওয়ার পর। সেই সময়ে ওই আধারটির অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ খোলা ছিল। সুযোগ মতো ঢুকে গিয়েছিলাম আমরা বেশ কয়েকজন। তারপর নিজেদের শরীর সম্প্রসারণ করে ছড়িয়ে দিই আধারটির ভেতরে। ভেবে ছিলাম নিজেরা ভেসে উঠলেই তোমাদের আধারটি আমাদের সাথে ভেসে উপর দিকে উঠে যাবে। কিন্তু অনুমান ভুল ছিল।

—“হায় উন্নত প্রযুক্তির বুদ্ধিহীনের দল। সঠিক রূপে তথ্য সংগ্রহ করিয়া তবেই অভিযান করা উচিত এই জ্ঞানটুকু না লইয়াই বাহির হইয়া পড়িয়াছ স্যাম্পল সংগ্রহে!”

—“ঠিকই বলেছ। কিন্তু ওই যে বললাম প্রতিকূল পরিবেশ। তোমাদের প্রধান নক্ষত্রের উপস্থিতি আমাদের সেই সু্যোগটা দেয়নি। আর সময়ও খুব বেশী ছিল না আমদের কাছে হঠাৎ দেখা এই গ্রহ বিষয়ে বেশি করে খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য। দ্রুত কিছু স্যাম্পল নিয়ে ফিরে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য ছিল।”

—“দরজা জানালাগুলি ভাঙিলে কি কারনে তাহার উত্তর পাইলাম না?”

—“তোমাদের প্রধান নক্ষত্রর আলো ও তাপ বিকিরণ করার সময় এগিয়ে আসছে এই সংকেত পেয়ে আমার নিজেদের প্রয়োজন মতো সংকুচিত করে ওই আধার থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। কিন্তু পথ খুঁজে না পেয়ে ওটা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।”

—“বুঝিলাম। কিন্তু রেফ্রিজারেটর-এর ওই অবস্থা কি রূপে হইলো?”

—“ওটাও আরেকটা ভুল। ওই জানলা দরজার মতোই ভেবেছিলাম ওটাকেও।“

—“অন্তিম প্রশ্ন। আমি কি আর বাকশক্তি ফিরিয়া পাইবো না?”

—“কেন পাবে না। বাক শক্তির সাথে সাথে তোমার ওই চারপেয়ে সঙ্গীটাকেও ফিরিয়ে দেবো। আমরা আবার ফিরে আসছি খুব শীঘ্র তোমাদের গ্রহে। সেদিন সব ফিরিয়ে দেবো। আর এই সময়ে তুমি আমাদের এজেন্ট-এর কাজ করবে। আমরা তোমার মানস তরঙ্গ মাধ্যমে এ গ্রহের সব তথ্য সংগ্রহ করে নেবো। ফলে পরবর্তী সময়ে আর স্যাম্পল সংগ্রহে কোন ভুলচুক হবে না। বিদায় স্কিপি। বিদায়।”

মানসিক কথোপকথনের সমাপ্তি ঘটিয়া ছিল এখানেই। ভুলিয়া যাই পাছে তাই সত্বর লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিলাম। এসব কথা কাহাকে বলিব। কেহই বিশ্বাস করিবে না। এখন অপেক্ষা ভবিষ্যতের সেই দিনটির উদ্দেশ্যে। যেদিন উহারা পুনরায় ফিরিয়া আসিবে। কবে আসিবে কে জানে? আমি কি ততদিন বাঁচিয়া থাকিবো? জানি না।
ওরা এবার হয়তো আর ভুল করিবে না। স্যাম্পল রূপে কত কি লইয়া যাইবে এই ধরা হইতে কে বলিতে পারিবে! বা আবারো কিছু ভুল করিবে এবং আবার জন্ম লইবে আরো একটি বা অনেকগুলি সূত্রহীন রহস্য।


অলংকরণ - প্রতিম দাস


পাঠকেরা যা পড়ছেন