সৌর্যালোক

পারিজাত ব্যানার্জী


একসাথেই তো যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল দুটিতে। পাশাপাশি বসত, একে অপরের জন্য জায়গা রাখত অলিখিত কোনও নিয়মের ফেরেই। অন্য বন্ধুদের সাথে একজন বেশী সময় কাটালে অপরপক্ষ অভিমানে ঠোঁট ফোলাতো। ক্লাসের সব নোটস একসাথেই তৈরি করত তারা। একে অপরকে পড়া না বোঝালে সেদিনের পড়াটাই যেন শেষ হতো না ওদের। একজন একদিন না বলেকয়ে ডুব দিল কি দিল না, সব ক্লাস ফেলে অন্যজন সোজা পৌছে যেত তার বাড়ি। বাড়িরও সবাই জানত এক প্রাণ এক আত্মা এই সূর্য, তৃষা। এদের আলাদা করা ভগবানেরও অসাধ্য।

কিন্তু ভগবান নিজে বোধহয় অন্যরকম কিছু চেয়েছিলেন। আর সেখানেই শুরু হয় আমাদের গ ল আর প— ‘সৌর্যালোক’।


কলেজের পড়া শেষ করে তৃষা পোস্ট ডক্টরেট করতে যাদবপুরেই রয়ে যায়। তার বরাবরই ইচ্ছা প্রফেসর হওয়ার। ফিজিক্সে তার দখলও বেশ ঈর্ষনীয়। কিন্তু সূর্য হঠাৎ সব ছেড়ে ছুড়ে দিল। এতে তার বাড়ির লোক যতটা না অবাক হল, তার চেয়েও বেশী সন্দিহান হয়ে উঠল তৃষা। সূর্য বরাবরই প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি কলেজে। সে যে আরও পড়াশোনা করবে, এমনই বিশ্বাস ছিল কলেজের প্রফেসরদেরও। মনে আছে তৃষার, সে দুটো ফর্ম তুলেছিল পি. এইচ. ডি. অ্যাপলিকেশনের। সূর্য শুনে ফোনেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। “কেন তৃষা? তোর কি পয়সা বেশী হয়েছে? দুটো ফর্ম কেন তুললি? আমি বলেছিলাম?”

স্বভাবতই বেশ থতমত খেয়ে গিয়েছিল তৃষা। এমন রূঢ় ভাবে তার সাথে এর আগে কখনও কথা বলেনি সূর্য। “পরে যদি ফর্ম শেষ হয়ে যায়! তাই তো আমি—”

ওর কথা শেষ করতে দেয়নি সূর্য। খুব ঠাণ্ডা মাথায় কেটে কেটে বলেছিল, “আমার আর ডিগ্রী লাগবেনা। আমার রিসার্চ যা করার বাড়িতেই করব। তুই ওই ফর্মটা অন্য কাউকে দিয়ে দে।”

“সেকি? তোর এত ব্রাইট ফিউচার? বাড়ি বসে থাকবি?” আঁতকে উঠেছিল তৃষা।

অদ্ভুতভাবে হেসেছিল সূর্য। “শুধু ব্রাইট হলেই হবে? ঝলমল করতে হবে তো! ঝলসে যেতে হবে! তবেই না জ্বলে উঠবে আমার ‘সৌর্যালোক’! সময় কোথায় আমার অন্যদিকে মন দেওয়ার?”

“মানে? ‘সৌর্যালোক’ মানে কী? কী বলছিস তুই? সত্যি বলছি, আজ বড় অচেনা লাগছে আমার তোকে! একদম অন্যরকম। এই সূর্যকে তো আমি চিনি না!”

“সূর্যকে কেই বা কবে চিনেছে বল? তার শক্তিতেই আমাদের জোর, অথচ তিনিই বড় অবহেলিত বরাবর! আর তোকে বলব না ভাবছিস? না রে, বলব। যথাসময় আসুক, তোকেই জানাবো সব। আজ আমায় কিছু জিজ্ঞেস করিস না। ”

সত্যিই আর কিছু জানতে চায়নি তৃষা। অপেক্ষা করেছিল। অনন্ত অপেক্ষা।


চার বছর পেরিয়ে গেছে। এ কবছরে হাতেগোনা কয়েকবার দেখা হয়েছে সূর্যের সঙ্গে তৃষার। তৃষাই জোর করেছে, না হলে সূর্য পারতপক্ষে ওর বাড়ি থেকে বের হয় না। সবসময় চুল উসকোখুসকো, জামাকাপড় অবিন্যস্ত, চোখে যেন অন্য জগতের চিন্তা। তৃষাকে যেন চিনেও চিনে উঠতে পারে না সে। সূর্যর বাবা পুত্রশোকে প্রাণ হারিয়েছেন— তারও প্রায় দেড় বছর হয়ে গেল। তবু কোনও হেলদোল নেই ছেলের। সারাক্ষণ নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে খুটখাট করে চলে। কারুর, এমনকি তৃষারও প্রবেশ নিষেধ সে ঘরে।

তৃষা ইতিমধ্যেই কলেজের পার্টটাইম শিক্ষয়িত্রী। পাশাপাশি তার গবেষণাও শেষের পথে। বাঙালি বাড়ির মেয়ে, যথারীতি বিয়ের চাপ আসছে বাড়ি থেকে। কিন্তু তৃষার প্রাণ তো সূর্যের কোটরে বাঁধা। আর সূর্য যে এসব চিন্তার ঊর্ধ্বে এখন, বুঝতে বাকি নেই তার। তাই বাড়ির লোকেদের হার মানতেই হয় তৃষার প্রেমের কাছে হেরে যাওয়াতে।


“হ্যালো, তৃষা? সূর্য বলছি।”

বিছানায় উঠে বসে তৃষা। চশমাটা চোখে পরে। রাত সোয়া তিনটে। এত বছরে এই প্রথম সূর্য নিজে থেকে ফোন করল… তাও এত রাতে?

“হ্যাঁ বল। সব ঠিক আছেতো? কাকিমার শরীর টরীর—”

“না না। সব ঠিকই আছে। এতোদিনে সব ঠিক হল মোটামুটি, বুঝলি? আমার গবেষণার ফসল আজ আমার সামনে ডানা মেলেছে, প্রথমবার!”

“কোন গবেষণা? কি ফসল? আমি তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না একদম!”

“বলব। আজ সব তোকে বলব। কে জানে, এরপরে আর বলার সুযোগ হবে কিনা কখনও!”

“মানে? কি হয়েছে?” চমকে ওঠে তৃষা। সূর্যর গলা এমন অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা কেন?

“ছোটবেলা থেকেই শখ বড্ড জানিস, ওই সূর্যে পাড়ি দেব। ওর অন্দরমহলে উঁকিঝুঁকি মারব। সূর্যকে চক্কর কেটেই কাটিয়ে দেব সারাজীবন। আমার ওই নেমসেক বড় টানে রে আমায়!”

“হ্যাঁ, সেসব তো জানি। কতবার এসব গল্প বলেছিস তুই আমায়! এর সাথে তোর রিসার্চের কি সম্পর্ক?” নিজের অজান্তেই কেমন ঠোঁট কেঁপে ওঠে তৃষার।

“আমার সেই স্বপ্ন আজ পূর্ণ হতে চলেছে। আমার যান তৈরী। ‘সৌর্যালোক’! এখনই পাড়ি দেব আমি সূর্যের উদ্দেশ্যে।”

“কি বলছিস তুই? ক্ষেপেছিস? আমার— আমার কথা, কাকিমার কথা একটুও ভাববি না? এসব তোর ইলিউশন! কল্পনা! এখনও সময় আছে। আমি নিজে সবচেয়ে বড় সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবো তোকে। কোথ্থাও যাবি না তুই। আমি আসছি। দাঁড়া।”

সূর্য হাসে। “আর সময় নেইরে। ইঞ্জিন চালু করে দিয়েছি। সমস্ত পুড়ে ছারখার হবার আগেই চড়ে বসতে হবে আমায়। কথা দিলাম, যদি ফিরতে পারি কোনওদিন, ঠিক ফিরে আসব। তুলে নেব তোকেও আমার ‘সৌর্যালোক’-এ। ততক্ষণের জন্য, বিদায়!”

বাড়ির লোকজনকে তুলে দাদাকে সঙ্গে নিয়ে আধঘণ্টায় পৌছে গিয়েছিল তৃষা সূর্যদের বাড়ি। না, সূর্যকে আর পাওয়া যায়নি। বাড়ির উপরের তলাটা সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিল কোনও অজানা কারণে। আশ্চর্য, দোতলায় শুয়ে তার আঁচও পাননি সূর্যের মা আর পোষ্য স্প্যেনিয়ালটা!


কতবছর যে কেটে গেছে এরপর, সেই হিসেব আর রাখে না তৃষা। চুলে তার পাক ধরেছে— কতটা বয়েসে, কতটা অকালে, তাও জানে না সে। নিজের ঘরের কোনটায় ঠায় বসে থাকে। কোনও কথা বলে না। সেদিনের পর থেকেই আর রা কাড়েনি মেয়েটা। থমকে গেছে ওর জীবন যেন, এক লহমায়!

দাদার মেয়ে তার পিপির খুব নেওটা। বরাবর। সেই সকালে খাইয়ে স্কুলে যায়। রাতে এসে আবার খাইয়ে দেয়। হুঁশ ফেরে না তৃষার। শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে আবার সূর্য ওঠার অপেক্ষায়।

রাতে ঘুমোয় না তৃষা। কে জানে কেন, ঘুম আসেই না বছরের পর বছর! হঠাৎ একদিন চমকিত হল সে এক অপার্থিব চোখ ঝলসানো আলোয়। ধাঁধিয়ে গেল চারপাশ হাজার তারার উগ্রতায়। তারপরেই ভেসে এল সময়ের বুকে মিলিয়ে যাওয়া সূর্যের আওয়াজ! “তৃষা, কথা দিয়েছিলাম, নিতে আসব তোমায়! এই দেখো এসেছি। সূর্য জয় করে, ‘সৌর্যালোকে’!”

হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যায় তৃষা। “কোথায়, কোথায় তুমি? আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন? একবারটি দেখা দাও! সবাই যে অবিশ্বাস করে আমায়! মানে না তোমার সৃষ্টি! ভাবে, আমি, তুমি—আমরা সব্বাই পাগল! দেখিয়ে দাও ওদের! দোহাই তোমার!”

“সময়ের আগে যা কিছু হয়, লোকে ভাবে অনাসৃষ্টি। তাতে কি মিথ্যে হয়ে যান গ্যালিলিও, আইন্সটাইন, নিউটন? ওসব নিয়ে ভেবো না। আমি তোমায় নিতে এসেছি। তুমি উঠে আসতে পারবে এ যানে, কিন্তু নামার যে উপায় জানা নেই আমার! অভিমন্যূর মতো চক্রব্যূহে ফেঁসেছি, তবে এ বেড়ি স্বেচ্ছায় পরা, এই যা!”

“কি করতে হবে বলো, আমি ফিরিয়ে আনব তোমায় পৃথিবীতে!”

হাসে সূর্য। “আমি এখন সূর্যমানব! আমার শরীরে উত্পাদিত হয় আলোকরশ্মি। আজ আমিই সূর্যালোক। তুমি আসবে না তৃষা আমার কাছে?”

কিছুক্ষণ কি যেন চিন্তা করে নেয় তৃষা।

“সেই ভালো, পৃথিবী তো অন্ধকার বড্ড তোমায় ছাড়া! আজ তোমার মধ্যেই বিলীন হবে তৃষা। হয়তো জ্বলে যাবে এ চামড়া, তবু তো তৃষ্ণা মিটবে শেষমেষ!”


পাশের ঘরেই তৃষার ভাইজি, বছর চোদ্দর অপরাজিতা শোয়। এত বছর পর পিপির গলার আওয়াজ পেয়ে একছুট্টে চলে যায় সেই ঘরে।

ঘর অবশ্য ততক্ষণে ফাঁকা, ভস্মীভূত।

অলংকরণ - মৈনাক দাশ

পাঠকেরা যা পড়ছেন