প্রতিবর্ত

অনিন্দ্য রাউত


১০ই জানুয়ারি, সকাল ৯টা
এডগারের প্রথম কেস

হাডসন ড্রাইভের মতোই এই সুন্দর রাস্তার দুই পাশে ছিমছাম কিছু বাড়ি। বাড়ির সামনে কিছুটা উঠোন, গাড়ি রাখার মতো জায়গাও। এই রাস্তার ধারেই মিস্টার ব্রাইটনের বাড়ি। আর সেখানেই আমার গন্তব্য।

আমি ইউনিফর্ম পরে যখন পৌঁছাই তখন অফিসার রোজমুন্ড দাঁড়িয়ে বাইরে। ব্রিফ শুনতে শুনতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম। বাইরে একটি ভক্সহল করসা গাড়ি দাঁড়িয়ে। অবস্থাপন্ন মিস্টার ব্রাইটন। বাড়ির ভিতর দেখেও তাই ইঙ্গিত মেলে। উডেন স্ট্রাকচারের বাড়ির ভেতরটা ভীষণই আধুনিক। মিস্টার ব্রাইটন ইংল্যান্ডের বাকি অধিবাসীর মতোই ফুটবল প্রেমী। হলের ডেকোরেশন ভর্তি সরঞ্জাম। একটা ছোট এশট্রে। তবে সিগার রাখা ওপরে। এরকম এশট্রে সিগারের জন্য সাধারণত হয় না। দেওয়ালের চারিদিকে চোখ বোলালাম। হোম থিয়েটারের পেছনে চেলসির বড় কাটআউট আর ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট অনেক নীল রঙের জার্সি, মার্চেন্ডাইজ। সব এক লহমায় দেখে ভেতরের ঘরে যখন পৌঁছলাম তখন মিসেস ব্রাইটন মাথায় হাত দিয়ে বিছানার ওপর বসে। আমি চেয়ারটা টেনে বসলাম। রোজমুন্ড পেছনে দাঁড়িয়ে।

“সরি মিসেস ব্রাইটন।”

মিসেস ব্রাইটন একবার ঘাড় তুলে আমায় দেখে আবার মাথা নিচু করে।

“আপনাকে আমাদের সঙ্গে কিছু সাহায্য করতে হবে। যদি পারমিশন দেন কিছু সাধারণ প্রশ্ন করবো।”

মিসেস ব্রাইটন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন।

“যখন ঘটনাটি ঘটে তখন আপনি কোথায় ছিলেন?”

“এক বন্ধুর বাড়িতে।” খসখসে গলায় ভীষণ ধীরে বললেন মিসেস ব্রাইটন। সারা শরীরের মতো কণ্ঠস্বরেও এক হঠাৎ ধাক্কা লাগার ছাপ। আমি আবার প্রশ্নে ফিরলাম।

“ঠিক কখন আপনি ঘরে ঢুকলেন? আর ঢুকে কি দেখলেন?”

“আমি ঘরে ঢুকি রাত ১১টা নাগাদ। অনেকবার ডাকাডাকিতেও ঘরের দরজা খুলছিলো না। তখন ভাবলাম জোনাথন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার কাছে সবসময়ই একটা এক্সট্রা চাবি থাকে। তাই দিয়ে দরজা খুললাম। এই ঘরে এসে চেঞ্জ করে পাশের ঘরে উঁকি মেরে দেখি জোনাথন ঘুমাচ্ছে। আমি তখন এই ঘরে এসে শুয়ে পড়ি।”

“কোনো অস্বাভাবিকতাই টের পাননি?”

“না।”

আমি যথাসম্ভব সংযত থেকে জিজ্ঞেস করলাম আবার, “আপনি এই ঘরে এসে… শুলেন কেন? যদি আপনি কিছু মনে না করেন, বললে ভালো হয়।”

“জোনাথন আর আমার কিছুদিন ধরে ঝগড়া চলছিল।”

আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি নিয়ে?”

মিসেস ব্রাইটন একটু অস্বস্তিবোধ করে এদিক ওদিক তাকাতে থাকলেন।

আমি ব্যাপারটা দেখে, “ঠিক আছে, অসুবিধা নেই, পরেই বলবেন। আজ তাহলে আমরা উঠি। আপনি পারলে একা থাকবেন না।”

“আলবার্ট স্ট্রিটে আমার বোন থাকে। ও একটু পরে আসবে। আমি ওর সঙ্গে থাকবো।”

“খুব ভালো।” বলে আমরা বেরোলাম ঘর থেকে। মিস্টার ব্রাইটন যে ঘরে কাল রাতে শুয়েছিলেন ঐ ঘরটিতে এলাম। সবকিছু বেশ গোছানো। দেখে কিছুতেই বোঝা যায় না এখানে একটা এত বড় ঘটনা ঘটেছে। একবার চারিদিকে ভালো করে চোখ ঘুরিয়ে রোজমুন্ডকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি যখন প্রথমবার এসেছিলে কিছু পেয়েছিলে?”

রোজমুন্ড না বললো। আমি শুনে বললাম, “আচ্ছা, তুমি একবার ভালো করে সব চেক করে নাও। তারপর আমরা মিস্টার ব্রাইটনের অফিসে যাবো একবার।” রোজমুন্ড আবার একবার ভেতরে যাওয়াতে আমি বাড়ির পেছনদিকে গেলাম। দুটো ছোট ঘর নিয়ে একটা অফিস তৈরি হচ্ছিল। মিস্টার ব্রাইটনেরই অফিস। ওনার অধীনে থাকা কিছু ওয়ার্কার কাজ করছিল। তাদের সবাইকেও জিজ্ঞেস করতে হবে। মিস্টার ব্রাইটনের কনস্ট্রাকশনের বিজনেস। ছোট ছোট বাড়ি, অফিস বানানো, সাজানোর কাজ করে তারা। রোজমুন্ডের তথ্য অনুযায়ী, তা বেশ ভালো চলছিল। তবে মিস্টার ব্রাইটন বেশ কিছু টাকাও খুইয়েছেন রিসেন্টলি। তাই নিজের এই অফিসের কাজ শেষ তিন চারদিন বন্ধ ছিল। আর আমার মনে হয়, এই টাকা খোয়ানোর জন্যই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সাময়িক বিবাদ ছিল।


৯ই জানুয়ারি, বিকেল ৪টে
এডগারের জেরা

প্রতিদিন আমায় এই রাস্তাতেই আসতে হয়। আর এখন এই মিস্টার ব্রাইটনের কেসটা হাতে নেওয়ার পর থেকে তো আরও বেশি। আজ সকাল থেকে তিনবার ওনার বাড়িতে এসেছি। রোজমুন্ড দাঁড়িয়ে। আমি মাঝে মাঝে অবাক হই রোজমুন্ড নিজের কাজে এতটা এগিয়ে কিভাবে? নিশ্চয়ই ও আমার সব বলা কাজগুলো এতক্ষণে করে ফেলেছে।

“হাই রোজমুন্ড, গুড আফটারনুন। এনি প্রোগ্রেস?”

“বাড়ি তল্লাশি করে আর কিছু পাওয়া যায়নি। মিসেস ব্রাইটন ইতিমধ্যে বোনের বাড়ি শিফট করেছেন। আপাতত দুজন পুলিশকে আজ রাতের মতো এখানে থাকতে বলা হবে। এরপর আপনার ইন্সট্রাকশন।”

“ভেরি গুড রোজমুন্ড। আর ওয়ার্কাররা?”

“ইয়েস। অফিসের সমস্ত ডাটা অনুযায়ী মিস্টার ব্রাইটনের অধীনে মোট আটজন ওয়ার্কার কাজ করতো। সাতজনের খোঁজ আজ পাওয়া গেলেও একজনকে পাওয়া যাচ্ছে না।”

“কেন?”

“সবার কথা অনুযায়ী ওর মায়ের শরীর খারাপ। তাই ওকে গ্রামে যেতে হয়েছে। আমরা ওর গ্রামে খোঁজ নিচ্ছি।”

“বাকিরা কোথায়?”

“ঐ অফিসে।”

“আমি ৭ জনের জেরা আলাদা ভাবে করতে চাই।”

“সেরকমই ব্যবস্থা করা আছে।”

রোজমুন্ড বলার পর আমরা রওনা দিলাম প্রায় তৈরি হয়ে যাওয়া অফিসের দিকে। দুই কামরার অফিস। হয়তো শুধুই ডেস্ক জবের জন্য তৈরি। ভেতরে ঢুকে দেখি প্রথম রুমেই ৭ জন নীল রঙের জামা প্যান্ট পরে বসে আছে। বুকে অফিসের ক্রেস্ট। মনে হয় এটি এই অফিসের ওয়ার্কারদের ইউনিফর্ম। এই ইউনিফর্ম মিস্টার ব্রাইটনের ঘরেও রাখা। ৭ জনেরই চেহারার অদ্ভুত এক সাদৃশ্য রয়েছে। ছোট করে চুল ছাঁটা, বেশ বড় চেহারা, গায়ের রং একটু চাপা, চোখগুলো কেমন ঘোলাটে যেন। আমি বাম দিক থেকে প্রথম জনকে থাকতে বলে বাকিদের অন্য রুমে যেতে বললাম।

“তোমার নাম কি?”

“এডওয়ার্ড স্টোন।”

“কত বছর ধরে এখানে কাজ করছো?”

“শুরু থেকে। প্রায় ৫ বছর।”

এই সময় একটা ব্যাপার আমার নজর এড়ালো না। ও উত্তরগুলো দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতে কি একটা গুনছে। আমি খেয়াল করলেও কিছু বুঝতে দিলাম না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কাল তোমরা কাজ থেকে কখন ফিরলে?”

“কাল কোনো কাজ হয়নি। লাস্ট তিনদিন ছুটি ছিল।”

“কেন?”

“জানি না।”

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। দেখলাম পারতপক্ষে ও চোখের পাতা ফেলছে না।

“তোমরা তো এখানেই কাজ করতে, সবসময়। কোনো কারণে কী ঐ বাড়ি যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল?”

স্টোন উত্তর দিলো, “মাঝে মাঝে আমাদের যেতে হতো। বিভিন্ন বিল আর তাছাড়া অফিসের কাজকর্ম দেখাতে নিয়ে যেতে হতো।”

“কে যেত?”

“বেশিরভাগ সময় পল যেত, মাঝে মাঝে আমরা সবাইই কেউ না কেউ যেতাম।”

“পল, এখানে আছে?”

স্টোন জিভ দিয়ে একবার ঠোঁটটা চেটে উত্তর দিলো, “না, ও ওর গ্রামে গেছে।”

আমি হঠাৎই হাওয়ায় একটা প্রশ্ন করে বসলাম, “তোমাদের কাছে ঐ ঘরের চাবি ছিল তাই না, মিসেস ব্রাইটন বললেন।”

প্রতিটা স্নায়ু, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিভিন্ন বিভিন্ন ভাবে আচরণ করে বিভিন্ন প্রশ্নে, আর আমাদের মতো পুলিশের কাজ হলো সেই প্রতিটা আচরণ খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা। স্টোন এই প্রশ্ন হয়তো আশা করেনি। একটু হকচকিয়ে চোখের পাতা স্বাভাবিকের থেকে বেশি পড়লো, ঘাড় এদিক ওদিক হলো সামান্য আর মুখ থেকে যা বেরোলো তার থেকে বুঝতে পারলাম, কোথাও কিছু গন্ডগোল আছে। স্টোন বললো, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, মানে, চাবি… চাবি থাকতো আমাদের কাছে। তবে ঐ পল, যেহেতু ও বেশি যেত বাড়িতে, ওর কাছেই বেশি থাকতো।”

“আচ্ছা, তুমি যেতে পারো। পরেরজনকে পাঠিয়ে দিও।” মুখের কোণে একটু হাসি লেগে রইলো আমার।

স্টোন উঠে কিছুটা গিয়ে একটু ফিরে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা, অফিসার আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি?”

“হ্যাঁ, শিওরলি।”

“আমাদের সবাইকে এখানে ডেকে আনা হলো কেন? কি হয়েছে?”

আমি মুখটা যথাসম্ভব কঠিন রেখে বললাম, “মিস্টার ব্রাইটন কাল রাতে খুন হয়েছেন।”


৯ই জানুয়ারি, রাত ৮টা
এডগারের স্টাডি

মাথাটা কেমন একটা তালগোল পাকিয়ে আছে। এটা আমার প্রথম কেস, তবু কোথায় গিয়ে মনে হচ্ছে এসবই আমার আগে দেখা, এসবই আগে ঘটে গেছে। তবু ঠিক মনে পড়ছে না। না, নিজের মাথাকে আর কষ্ট না দিয়ে ভাবতে লাগলাম পুরো ব্যাপারটা।

মিস্টার ব্রাইটন খুন হয়েছেন কাল রাতে। সম্ভবত শ্বাসরোধ করে খুন, শরীরের অন্য কোথাও আঘাত নেই। হয়তো ঘুমের মধ্যেই ওনার শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে। তাই মিসেস ব্রাইটন যখন ওনাকে দেখেন কিছু অস্বাভাবিক টের পাননি। ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক হওয়ার ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে ওনার মেডিক্যাল হিস্ট্রি সেরকম ইঙ্গিত দেয়নি। অন্তত সেটাই রোজমুন্ড বলেছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের অপেক্ষা করতে হবে, যদিও। ওখানেই জানা যাবে সবটা। মিসেস ব্রাইটনের কথানুযায়ী, ঘরের দুটো চাবি। একটা রাখতেন মিস্টার ব্রাইটন, আরেকটা থাকত মিসেস ব্রাইটনের কাছে। তবু এডওয়ার্ড আর বাকি ওয়ার্কারদের কথা অনুযায়ী আরেকটা চাবিও ছিল। তাহলে, হয় মিসেস ব্রাইটন জানেন না সেটা বা তিনি ভুলে গেছেন বলতে বা কোনোপক্ষ মিথ্যে বলেছে।

পুরো ব্যাপারটা ভাবতে গেলেই বুঝতে পারি খুব অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে তাহলে। দরজা ছিল সব ভেতর থেকে বন্ধ। মিসেস ব্রাইটন আসার আগেই বা উনি যখন ঘুমিয়ে পড়েন তখন খুন হয়েছে। এদিকে এডওয়ার্ড বলছে, চাবি পলের কাছে আছে। তাহলে ও কি দেশের বাড়ি যায়নি? এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে। খুনটা হয়তো ঐ করেছে মিসেস ব্রাইটন আসার আগে। রোজমুন্ড লোক পাঠিয়েছে পলের গ্রামে। নিশ্চয়ই কোনো খবর কাল সকালে চলে আসবে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দেখলেও অনেকটা ধারণা করা যাবে। তবে আজ এডওয়ার্ড এর আচরণও কিছু স্বাভাবিক ছিল না। বেশিমাত্রায় সজাগ ছিল। মাফিন, রব, জন বা বাকি সব ওয়ার্কারগুলোও কেমন সব একইরকম উত্তর দিলো, এডওয়ার্ড এর মত। হয় ওরা সবাই সত্যি বলছে, নাহলে খুব অর্গানাইজডলি মিথ্যে বলছে। তবে একটা ব্যাপার ভীষণই ক্লিয়ার যে এমন কেউ মেরেছে যার ব্রাইটন হাউসে অবাধ যাতায়াত ছিল।

আর ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। মাথায় কেমন একটা অস্বস্তি।


৭ই জানুয়ারি, দুপুর ১২টা
মেলেনার ফেরা

হয়তো মানুষ তখনই নিজেকে আর তার চারপাশটা বুঝতে পারে যখন সে বিপদে পড়ে। পল আজ আসার পর যা করলো, আমি ভাবতে পারিনি এতটা নীচ মানুষ হতে পারে। আমি, আমিই কী এরজন্য দায়ী? এতটা ওকে বাড়তে আমিই সুযোগ দিয়েছি। অন্ধ, অন্ধ ছিলাম আমি। ভালোবাসা না উপেক্ষা কোনটা আমাকে দিয়ে এত ভুল বারবার করালো? জোনাথন কি এর জন্য দায়ী নয় একটুও?

চিবুকের কাছটা আবার জ্বালা করে উঠলো। আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। নিজের রূপ দেখে ঘেন্না লাগছে। চাকা চাকা লাল দাগ শরীরের এপাশে ওপাশে। দংশনের দাগ। পলের দাঁত খুবলে খুবলে খেয়েছে আজ, বাধা দেওয়ারও উপায় ছিল না আমার। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে হয়েছে। গত এক বছরে ও পলকে নিজের মালিকের জায়গায় বসিয়েছে। প্রথমে লজ্জা পাওয়া, ভীত পলের সঙ্গে আজকের এই পশুর মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। পল যখন ধীরে ধীরে বুঝলো যে আমি ওর নেশায় চুর তখন থেকে নিজের দাঁত, নখ বের করতে লাগলো। দুজনের এক হওয়ার সময় নোংরা থেকে নোংরাতর কাজ করাতো। এমনকি রেকর্ডিংও করতে শুরু করলো আর বাড়তে লাগলো ওর চাহিদা। নিজের সঙ্গে সঙ্গে মাফিন আর বাকিদেরও চিনিয়ে দিলো আমি কি, আমি কতটা পণ্য। বাধা দিতে গেলে শুরু হলো ব্ল্যাকমেলিং। জোনাথনকে সব জানিয়ে দেওয়ার হুমকি। রেকর্ডিংগুলো দেখিয়ে দেওয়ার হুমকি। আজ যখন আমার মোহভঙ্গ তখন আমি অসহায়। জোনাথনের থেকে দিনের পর দিন মিথ্যে বলে টাকা নিতে নিতে আমাদের সম্পর্ক অতীব খারাপ জায়গায়। অথচ মানুষটার কী দোষ সেইরূপ কিছু ছিল? এখন তো পল জোনাথনকেও তোয়াক্কা করে না। একটা অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে ওর সামনে। যেন ও কাজ নাও করতে পারে। যে এককালে চাকর ছিল তাকে সে আজ মনিবের জায়গায় বসেছে।

নাঃ, মুক্তি চাই আমার। এক্ষুণি মুক্তি চাই। জোনাথনকে জানতে দেওয়া চলবে না। পল বলছিল, জোনাথন নাকি কিছু টের পেয়েছে। সত্যি কী তাই? নাঃ, আমায় একটা সুযোগ নিতে হবে জোনাথনের সব জানার আগেই, আমায় একটা সুযোগ নিতে হবে। আমি আবার সব ঠিক করে নেব জোনাথনের সঙ্গে। পলের আমার জীবন থেকে সরে যাওয়া দরকার। তারপর একটু সময়, ব্যস। সব ঠিক হয়ে যাবে, আবার। যেভাবে পল আমায় তিলে তিলে শেষ করেছে, আমিও সেই একইভাবে ওকে শেষ করে ছাড়বো।

তাড়াতাড়ি মোবাইল নিয়ে ডায়াল করলাম।

“হ্যালো, মাফিন ? একটা কাজ ছিল।”


১০ই জানুয়ারি, সকাল ৮টা
এডগারের সংকেত

“চিংং…”

মাথাটা ধরে হঠাৎ উঠে পড়ি আমি। একটা শক রোজ আমায় ঘুম থেকে তুলে দেয়। মাথার মধ্যে যেন একটা জোর ধাক্কা লাগে আর ঘুম ভাঙে। মাথাটা ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকি। শকের ভাবটা কমলে উঠে পড়ি। আমি এই পুরো ব্লকটায় একা থাকি। স্পেশাল আরেঞ্জমেন্ট আমার জন্য, যদিও কেন ঠিক তা জানি না। দরকার ছিল না। তবে চেঞ্জ করার ইচ্ছেও নেই। বেরিয়ে পড়লাম সেই একই রাস্তা দিয়ে। হাডসন ড্রাইভের মতো।

রোজমুন্ডের দুটো মেসেজ। আর্জেন্ট যেতে হবে। রোজমুন্ডের ফ্ল্যাটের তলায় গাড়িটা রেখে ওপরে উঠলাম। এই রাস্তাটা আমি চিনি। ওর ঘরে আগে এসেছি কিনা মনে পড়ছে না। রোজমুন্ডের ফ্ল্যাট নাম্বার কত ভাবছি এমন সময়ে দেখি রোজমুন্ড সামনে দাঁড়িয়ে।

“গুড মর্নিং অফিসার। চলুন।” রোজমুন্ড সম্বোধন করলো।

আমরা আবার গাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আজও ওর ঘর দেখা হলো না। গাড়িতে উঠেই ও আমায় পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ব্যাপারে বললো। খুন হয়েছে, রাত ১০:৩০ নাগাদ। তার মানে মিসেস ব্রাইটন আসার আগেই। শ্বাসরোধ করেই খুন, শরীরে আর কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই। মানে ঠিক যেরকমটা আমার মনে হয়েছিল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “পলের খোঁজ পাওয়া গেছে?”

রোজমুন্ড বললো, “না, পাওয়া যায়নি। গ্রামে ও গত ৪ বছর যায়নি।”

আমি উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। “তার মানে কী ভীষণভাবে এটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না যে পল অনেককিছু জানে।”

“হ্যাঁ, ঠিক। তবে আমি কিছু দেখাতে চাই, তাই ব্রাইটন হাউসে যাচ্ছি আমরা। কিছু পোড়া কাগজ পাওয়া গেছে।”

ব্রাইটন হাউসে এসে আমরা অফিসের দিকে গেলাম। বাড়ির সামনে থেকে পাহারা সরে গেছে। এখন তালা দেওয়া।

আমরা যখন অফিসের সাইডে পৌঁছাই সেখানে দেখতে পাই পোড়া কাগজের স্তুপ। বেশিরভাগই ছাই। রোজমুন্ড পকেট থেকে দুটো কাগজ বের করে। পুড়ে যাওয়া সবটা থেকে একটু হয়তো এখনো ঠিক আছে। সেখানে লেখা, ‘ভাবিনি মেলেনা…’ আর ‘শেষ অব্দি একজন...’

দুটো কাগজের এইটুকু লেখা মিলিয়ে দিলে কিছু কী পাওয়া যাচ্ছে? ভাবতে ভাবতে হঠাৎই এক জিনিস চোখে পড়লো।

“রোজমুন্ড তুমি রাস্তার বা বাড়ির চারপাশের যা সিসিটিভি ফুটেজ পাও, তা জোগাড় করো এক্ষুণি আর এডওয়ার্ডদের সবাইকে ফলো করার জন্য লোক পাঠাও। মিসেস ব্রাইটনের বোনের বাড়িতেও নজরদারি রাখো। আমরা খুব বড় ভুল করে ফেলেছি।”

রোজমুন্ড চলে যায়। প্রতিটা পদক্ষেপে এখন যেন মনে হচ্ছে আমরা খুব কাছে চলে এসেছি।


৮ই জানুয়ারি, বিকেল ৬টা
মেলেনার সংকট

“তুমি কি পাগল? আর ইউ শিওর?”

“হ্যাঁ, ম্যাডাম। আমি যখন ড্রয়ার থেকে আজ ডায়েরিটা বের করে দেখতে গেলাম, তখন দেখি ডিভোর্স ফাইলের পেপার।”

মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। মাফিন কানের কাছে বলে চললো, “ব্রাইটন নীল ডায়েরিতে রোজই যে কিছু লেখে, তা দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু তোমায় জানাতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ সেটা তোমার কাছে নিয়ে আসার জন্য যখন অফিসে গেলাম তখন দেখি ব্রাইটন অলরেডি অফিসে। ও অন্য ঘরে গেলে ড্রয়ার খুলে চোখে পড়লো ডিভোর্স পেপার, নীল ডায়েরির ওপর।”

আমার মাথা কিছু কাজ করছে না। মাফিন কি বলছে এসব? জোনাথন কি লেখে ডায়েরিতে রোজ? ও কি সত্যিই টের পেয়েছে কিছু? সেটাই হবে নাহলে কেন ডিভোর্স পেপার? চোয়ালটা শক্ত হয় আমার। আমাকে ডিভোর্স দিলে আমি পথে বসবো। সেটা হতে দেওয়া যায় না। আর আমি নিজেকে কারোর কাছে অসহায়ভাবে দেখতে পারব না। কারোর কাছে না।


১০ই জানুয়ারি, বিকেল ৫টা
মেলেনার শেষ ইচ্ছে

আর কতবার? আর কতবার একই ভুল করবো? পাষন্ডটা এইভাবে আমার জীবন শেষ করে দেবে ভাবতে পারিনি। আমি চলে যাব। আমি চলে যাব এই জায়গা ছেড়ে। জোনাথনের যত টাকা আছে, সব আমার অন্য একাউন্টে জমা করতে হবে। দরজা খুলে বেডরুমের দিকে তড়িঘড়ি করে গেলাম। সিন্দুকের পাসওয়ার্ড টাইপ করে খুললাম সিন্দুকটা। হ্যাঁ, দলিল আছে। দলিল নিয়ে সিন্দুক বন্ধ করে ব্যাগের মধ্যে রাখতে যাবো, এমন সময় খুব দৃঢ় গলায় কে বলে উঠলো, “মেলেনা, দলিলটা আমায় দাও।”

আমি পেছন ঘুরে তাকিয়ে দেখি স্বয়ং মূর্তিমান। হাতে পিস্তল। ও গর্জে উঠলো, “মেলেনা, কোনো চালাকি না করে দলিলটা দিয়ে দাও আমায়।”

আমি জানি, এই দলিল দিলে আমার আর কোনোকিছুই থাকবে না। কোনোমতেই আমি দেব না এই দলিল। আমি মাথা নাড়লাম।

“শুধু শুধু জেদ করে না মেলেনা। দ্বিতীয়বার একই কাজ করতে আমার হাত কাঁপবে না।”

আমি পিছিয়ে গেলাম। নিজের অন্যায়ের শাস্তি যদি এইভাবে পেতে হয়, তাহলে তাই। ও একটা ক্রুর হাসি হেসে শান্ত ভাবে বললো, “তাহলে, তাই হোক।”
নিজের এই পরিণতি হবে কখনো ভাবিনি। তবে যে অপরাধ আমি করেছি তার আর ক্ষমা হয় না। চোখ বন্ধ করলাম। মুহূর্ত গুনছি। তীব্র এক গুলি চালানোর শব্দ হলো। মনে হলো, আমি পালস মিস করে ফেলেছি।


১১ই জানুয়ারি, বিকেল ৫টা ৫ মিনিট
এডগারের শেষ অঙ্ক

“বন্দুকটা রেখে দাও এডওয়ার্ড।” গুলিটা ওর পায়ের মাংসপেশি ছিঁড়ে হাড়ে বিঁধেছে, আমি নিশ্চিত। এডওয়ার্ড গোঙাচ্ছে। রোজমুন্ড আর বাকি অফিসাররা ওকে গ্রাউন্ডেড করে দেয়।

আমি কাছে গেলাম। চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “পল কোথায় গেছে? আর কবে ফিরবে যেন?”

এডওয়ার্ড চুপ করে থাকে। আমি বুট দিয়ে একটা লাথি মারি ওর মুখে। ও লুটিয়ে যায়। মিসেস ব্রাইটন মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে। চেঁচিয়ে বলি, “আপনি অন্তত সত্যিগুলো বলতে পারতেন। এতটা কষ্ট করতে হতো না কাউকে। আপনাকে আর এডওয়ার্ড ওরফে পল কে, এবার কেউ বাঁচাতে পারবে না।”

মিসেস ব্রাইটন ফুঁপিয়ে ওঠে। কি মোটিভ ছিল আপনার মিসেস ব্রাইটন? সম্পত্তি না এই পলের সঙ্গে সম্পর্ক? উনি চুপ করে থাকেন।

“ছাড়ুন, আমিই বলি। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল মিস্টার ব্রাইটনের ঘুমের ঘোরে স্ট্রোক হয়েছিল। আসলে ঘরের সব দরজা যখন ভেতর থেকে বন্ধ, তখন কি করে কোনো বাইরের লোক ঢুকে খুন করতে পারে? তখনই মনে হলো, যদি আপনি মিথ্যে বলে থাকেন। তো সেই ভাবনা নিয়েই আমি এডওয়ার্ডকে একটা টোপ দিই, ভুল, মিথ্যে কথা বলে। ও বলে দেয়, আপনারা দুই স্বামী স্ত্রী ছাড়াও চাবি ছিল আর একজনের কাছে। সে হলো পল। কিন্তু পল এখানে নেই। কিছুদিন থেকেই। পল যেখানে গেছিলো বলে সবাই দাবি করছিল, সেখানে আমরা লোক পাঠিয়ে বুঝলাম, যে পল সেখানে গত চার বছর যায়নি। তাহলে পল পালিয়ে গেছে। আর পলের কাছেই চাবি ছিল। তো ভাবলাম, পলই খুন করেছে মিস্টার ব্রাইটনকে, কোনো রাগ বা ঘৃণা থেকে। একই অফিসে কাজ করলে এরকম ঘৃণা থাকেই। কিন্তু কিছু খটকা থেকে গেল। আপনি কেন মিথ্যে বললেন আর পল যেহেতু নিরুদ্দেশ।

এই সময় রোজমুন্ড বললো, কিছু পোড়া কাগজ পাওয়া গেছে। তাতে আপনার নাম লেখা। হয়তো মিস্টার ব্রাইটন ডায়েরি লিখতেন। আর সেখানেই এসব লিখেছেন আর সেটাকেই পোড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাড়াহুড়ো আর এই আবহাওয়ার জন্য সবটা পোড়েনি। সেরকমই ডায়েরির এক পাতায় দেখলাম লেখা ৭ জন ওয়ার্কারের নাম। কিন্তু এডওয়ার্ড এর নাম নেই। কোথায় গিয়ে মনে হলো, হয়তো কোম্পানি থেকে পুলিশকে কেউ ভুল তথ্য দিয়েছে। তাই সঙ্গে সঙ্গে সি সি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখলাম অফিসে গিয়ে এই এলাকার। সেখানে দেখলাম গত কয়েকদিন আপনি ঘর থেকে তেমন বেরোননি আর গত পরশুও আপনি রাত ১০টার পর আর বেরোননি, অন্তত আপনার গাড়ি বেরোয়নি। তখন এডওয়ার্ড আর আপনার পিছু করতে থাকলাম, দুর্ভাগ্যবশত একজনের আজ আরেকজনকে মারার ইচ্ছে হয়েছিল।”

এডওয়ার্ড হিসহিস করে বললো, “তাতে কি প্রমাণ হয়? আর আমিই এডওয়ার্ড।”

আমি এডওয়ার্ডকে একবার দেখে মিসেস ব্রাইটনের দিকে ঘুরলাম, “আর চুপ করে থাকবেন না। আপনি এখন মুখ না খুললে পুলিশ বা উকিল আপনার মুখ খোলাবে। আপনি যে মিস্টার ব্রাইটনের খুনের ব্যাপারে জড়িত তা প্রমাণ করা আমাদের পক্ষে কঠিন হবে না।”

মিসেস ব্রাইটন পুরো ভেঙে পড়ল। “এই লোকটা আমায় শেষ করে দিলো। আমি এর আসক্তিতে পড়ে সব হারিয়েছি। জোনাথনকে ঠকিয়েছি দিনের পর দিন। আমায় ব্ল্যাকমেল করতো পল। তাই যখন পলের অত্যাচার আর সহ্য করতে পারলাম না, প্ল্যান করলাম পলকে খুন করানোর। মাফিন অনেক টাকার বিনিময়ে রাজি হলেও ও আমায় চিট করলো। অন্য এক লোকের মুখ থেঁতলে দাওয়া মৃতদেহ আমায় দেখিয়ে বলেছিল ওটা পলের মৃতদেহ। আর আমায় ভয় দেখিয়েছিল যে জোনাথন অলরেডি সব জেনে আমায় ডিভোর্স দিতে চায় বলে।”

আমি বলে উঠলাম। “হ্যাঁ, জোনাথন জানতো। তবে খুব সম্ভবত ডিভোর্স দেওয়ার কথা ভাবেনি। মেনে নিতে না পারলেও আপনাকে বাধা দেয়নি। শুধু সব ওয়ার্কারদের বিনা নোটিশে ছাঁটাই করেছিল ভেঙে গিয়ে। তাই কাজ বন্ধ ছিল। আর সেখানেই সব ওয়ার্কার এক হয়ে গেল পলের সঙ্গে। মাফিন পলকে না মেরে আপনার থেকে টাকাও নিলো আর প্ল্যান করলো জোনাথনকে মারার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আপনার থেকে আরো টাকা হাতাবে।”

মিসেস ব্রাইটন চেঁচিয়ে উঠলো, “হ্যাঁ, এই পাষণ্ড সেই রাতে আমার বাড়িতে উদয় হয়। আমি ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম। ও আমার মুখে টেপ দিয়ে আমায় এক ঘরে বন্ধ করে দেয়। হয়তো তখনই ও জোনাথনকে...”

মিসেস ব্রাইটন ফুঁপিয়ে ওঠে আবার। আমি পলের কলার ধরে ওকে তুলে বলি, “ হ্যা, তখনই ও খুন করে আর আপনাকে শাসিয়ে যায়। আবার আপনি ভয় পেয়ে ওর কথামতো চলতে থাকেন আর ও হয়ে যায় এডওয়ার্ড। পলের ওপর সব দোষ চাপিয়ে যাতে ও বাঁচতে পারে আর সুযোগ বুঝে আপনার থেকে আরো টাকা নিয়ে এই দেশ ছেড়ে চলে যেত। কিন্তু আমি বুঝলাম না আপনি আজ এখানে এলেন কেন? কি আছে ঐ উইলে?”

“এটা আমার সই করা উইল। সবকিছু পলের নামে করে দেওয়া। আর এই নীচে এই উইলটা পুরানো যেখানে জোনাথন সব আমার নামে করে দিয়েছিল। আমি আজ এই নতুন উইলটা পুড়িয়ে ফেলতাম। সেদিন শকে নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এই শয়তান আজ বুঝে ঠিক চলে এলো।” মেলেনা ওরফে মিসেস ব্রাইটন এক ফুলদানি ছুঁড়ে মারলো পলের দিকে আক্রোশে। পলের গায়ে লাগল না। মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায়। আমি আর রোজমুন্ড দুজনের দিকে এগিয়ে গ্রেপ্তার করি আর ভাবতে থাকি কিভাবে মানুষ ভুল পথে হাটতেই থাকে আর একটা ভুলকে লুকোতে পরপর ভুল করেই যায়।


*********

পিটার ক্র্যাসবেথ মঞ্চের আলো জ্বালিয়ে ফেললেন। আর স্টেজে উঠে বললেন, “এই ছিল আমাদের রিপোর্ট। আমাদের ডিপার্টমেন্টের একজন, যিনি আবার এক আমেচার লেখকও, তিনি লিখেছেন। ভুল লাগলে বা রহস্য না মনে হলে ক্ষমা করবেন। আসলে পুরোটাই আমাদের অটোবটসদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী। এবং চেষ্টা করা হয়েছে যাতে রহস্য রেখে লেখা যায়। তাই কিছুদিনের তথ্য আগে পরে করা। আমরা যদিও ঐ দিনেই ওদের থেকে তথ্য পেয়েছি আমাদের সার্ভারে।

আপনারা জানেন যে আমরা হিউম্যানয়েড অটোবটসদের নিয়ে কাজ করছি বেশ কিছু বছর ধরে। চেষ্টা করছিলাম যাতে তারা মানুষদের মতো শুধু দেখতে, বলতে, শুনতে না হয় এমনকি মানুষদের মতো সব পরিস্থিতিতে মাথা খাটাতেও পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে, প্রবলেম সলভ করতে পারে। সব প্রফেশনে বিশেষ করে পুলিশবাহিনীতে যাতে আমরা এরকম সেলফ ফাংশনেই কাজ করা রোবটদের কাজে লাগাতে পারি তাই আমরা এরকম অনেক মডেল বানিয়ে আমাদের ল্যাবে রাখি। লন্ডনের বিশেষ বিশেষ জায়গার অনুকরণে বানিয়ে সেখানে কিছু চরিত্র ক্রিয়েট করা। আর একটি মার্ডার কেস তৈরি করা। যেখানে সব চরিত্রই এক একটি রোবট। কিন্তু তারা সেটা বুঝবে না। অটোবটসদের কিছুজন খুনী, কিছুজন ভিক্টিম, কিছুজন পুলিশ। বারবার এই একই পরীক্ষা করি আমরা। একই কেস। কেস শেষ হলে মেমোরি ইরেজ করে দিই ওদের মাথা থেকে। কেস শুরু হওয়ার আগে তাদের স্মৃতিকে একটা নির্দিষ্ট দিন অব্দি পৌঁছে দিই আমরা। তাই মেলেনা, জোনাথন, মাফিন, এডওয়ার্ড, পল, রোজমুন্ড আর এডগার তৈরি হয়। তাদের আবছা এক স্মৃতি দেওয়া হয় যাতে তাদের মাথায় কোনো সন্দেহ না জাগে আর তারা সেরকমভাবেই ব্যবহার করে যেরকম ভাবে তাদের মাথায় পুরো ব্যাপারটা আছে। তাই জোনাথন খুন হয়। মেলেনা নিজেকে দোষী মনে করে। পল দোষী হয়েও খারাপ ফিল করে না। শুধু আমরা এডগারকে ব্ল্যাংক রাখি। মানে ও কেসটায় ঘটা ঘটনাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে রিয়াক্ট করে। মানে মোর লাইক হিউম্যান। ঘটনা সাজিয়ে, নিজের মাথাতে নিজের বুদ্ধিতে সলভ করে কেস। এতদিন বারবার এই একই কেস ওকে দিচ্ছিলাম। কিন্তু প্রতিবার ও ব্যর্থ হয় দোষীকে খুঁজে বার করতে। কিন্তু এবারে পেরে গেল এবং তা একদম সঠিকভাবে। আমরা এর আগে প্রতিবারই ওর মেমোরি ইরেজ করে ওকে নতুনভাবে ভাবতে দিয়েছি। তবু ও ওর অনুভূতিতে আর প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় কিছু জিনিস ঠিক মনে রাখছিল। মানে ও এক মানুষের মতোই অনেকটা বিহেভ করছিল। ওর সিদ্ধান্ত নেওয়া, অনুসন্ধান করা মানুষদের মতো করার চেষ্টা করছিলাম, যাতে ও আমাদের এই লন্ডন পুলিশ ফোর্স জয়েন করে আর কাজ করে। মানুষদের মতো ভাবতে শিখলেও ও মানুষদের থেকে আরো অনেক বেশি কাজ করতে পারবে কারণ ও কোনোদিনও ক্লান্ত হবে না, অযথা কষ্ট বা আনন্দকে গুরুত্ব দেবে না। কাজ ছাড়া ওর কোনো ফ্যামিলি হবে না, তাই। হি ইজ দ্য আল্টিমেট হিউম্যানয়েড অটোবট।”

পিটার ক্র্যাসবেথ থামলেন আর দর্শকদের সবাই হাততালিতে ফেটে পড়ে। আজ ১২ই জানুয়ারি, ২০৩৬-এ এই লন্ডনে বিশ্বের প্রথম সেলফ-ফাংশনে কাজ করা হিউম্যানয়েড অটোবট প্রকাশ পেল বিশ্ব দরবারে এবং মানুষের সঙ্গেই মানুষদের মতো পুলিশ হয়ে কাজ করবে। হয়তো ভবিষ্যতে মানুষের থেকেও অনেক দ্রুত কেস সলভ করতে পারবে।


অলংকরণ - প্রমিত নন্দী

পাঠকেরা যা পড়ছেন