শতরূপ সান্যালের DIARY ১


প্রথম পর্ব
হত-দন্ত

ডিসেম্বর ১, ২০১৪; রাত ১২টা

আমি সিনিয়র জার্নালিস্ট শতরুপ সান্যাল। ডায়েরি লেখার অভ্যাসটা ছোট থেকেই। রুমালচোরের রুমাল হারানোর ঘটনা থেকে পরীক্ষায় চোতা সমেত ধরা পড়ে স্যারের উদোম কেলানি সবই অবলীলায় লিখে ফেলি। অগত্যা! নাক গলাই জার্নালিজম-এ। পিছু ছাড়ে না লেখা। ঘটনার ঘনঘটা আমাকে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রেখেছে। এক সেকেন্ডও সময় নেই ভাববার।

দু-দিন হলো এসেছি উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে। এখানকার আনপ্রটেক্টেড জঙ্গল এরিয়ায় কি ক্রিয়াকর্ম শুরু হয়েছে, তারই হাল-হদিশের জন্য সুবীরদা তড়িঘড়ি পাঠান এখানে। সুবীরদা মানে আমার উঁচুতলার দাদাবিশেষ। বসও বটে। এখানে আসা অবধি চারিদিকে এতো সবুজ দেখছি। যা দেখে কেস সালটাবো কি! বেশ রোমান্টিসীজম আসছে। কলকাতার ট্রাফিক আর ধোঁয়ার গুঁতো খেতে খেতে সবুজ কি জিনিস ভুলতে বসেছিলাম।

আমার হোটেলটা দেরদুনের টাউন থেকে বেশ খানিকটা দূরে। ১১কিমি। আই.টি. পার্ক পেরিয়ে রামেস্বরম কলোনিতে। ডায়ে-বাঁয়ে আগুপিছু তপোবনের এরিয়ার কাছাকাছি বলেই রুমটা নিলাম। মন্দ লাগছে না। তার উপর জাঁকিয়ে শীত তার লেপ, কম্বল নিয়ে একেবারে স্নায়ু পর্যন্ত থরথরিয়ে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ওয়েদার হিস্ট্রি বলছে, মাইনাসে রান করে অনেকসময়। আমার আবার এলার্জির ধাত। আপাততঃ চোখ টানছে। কলম বন্ধ করতেই হচ্ছে।


ডিসেম্বর ৫, রাত সাড়ে ১০টা

চারদিন চক্কর মেরেছি খবরা-খবরের হদিশে। এস-পি লোকেশ ঢাকের সাথে কথাও বলেছি— “সাব শান্ত হ্যায় ভাইয়া, কাহি পার কোই সোর নেহি।” (গারোয়ালি ভাষায় পান চিবোতে চিবোতে পরম আয়েশে কথাগুলো বলেছিলেন) কিন্তু আমার খবরটা যে অন্য তা তাঁকে বুঝতে দিইনি বা বলার প্রয়োজনটুকু মনে করিনি।


ডিসেম্বর ৭, রাত ১১টা

শোরগোল। ঘোর শোরগোল। রাত ১০টা বাজলেই মনে হয় ডিসকভারি চ্যানেলের মাঠে এসে বসেছি। কি নেই, এ কদিনে শিয়াল, গিদ্ধার মানে স্থানীয় ভাষায় ওই নামেই ডাকে, ‘ফেউ’-এর ডাক আর গোটা দুই বুক কাঁপানো নিশাচরের তীক্ষ্ণ শব্দ শুনেছি। তাঁরা আছেন দুনের পথে ঘাটে তা জেনেই আসার আকর্ষণ পেয়েছিলাম এখানে আসার। কিন্তু এভাবে?

সবে ল্যাপটপটা খুলতে যাবো কি বীভৎস হুঙ্কার আর তার সাথে একটা মৃদু কম্পন অনুভব করেছিলাম। থেমে থেমে এক নাগাড়ে কতগুলো পটকার আওয়াজ। জোরে, ক্রমশঃ জোরে। আওয়াজটা এগিয়ে আসছে। আরো, আরো জোরে। না, ওটা তো পটকা ঠিক নয়।

ফায়ার!



কান প্রায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম। কৌতুহল আর উৎকণ্ঠায় জানলার ধারে যাবো ঠিক তখনই মাইকের আওয়াজ “কই ঘারসে নিকাল না নেহি”। ব্যাপারটা কি? দ্বিগুণ বেড়ে যায় জানার আগ্রহ। পর্দা সরিয়ে সিমেটের বাঁধানো রাস্তার দিকে সরাসরি চোখ পড়তেই দেখি... একটা নয়, একেবারে দু-দুটো গজরাজ শুড় দুলিয়ে হোটেলের দিকে এগিয়ে আসছে সশব্দে। কি ভয়ঙ্কর আওয়াজ! কাঁচের জানলার এপারে আমি সম্বিৎ হারিয়ে নিথরসম। বিছানা লাগোয়া টেবিলটা তখনো কাঁপছিল। একেকটা পায়ের ওজন কত জানা নেই! তবে ঘোর শহুরে হওয়ায় এমন অভিজ্ঞতা তুলনাহীন! কিন্তু হাতি দুটোর পিছনে কে ওরা জিপে? সিভিল ড্রেসে! ব্ল্যাংক ফায়ার করছে?

সকালে জেনেছিলাম, হরিদ্বার আর ঋষিকেশের মাঝে রাজাজি ন্যাশনাল পার্কের লাগোয়া জঙ্গল থেকেই তিনটি দাঁতাল কোনোমতে এদিকে চলে আসে। আর তাদেরই ধাওয়া করে, ফরেস্ট রেঞ্জার অফিসারের দল। স্থানীয়দের সতর্কীকরণের জন্যই মাইকে ঘোষণা। এমনটা হয়েই থাকে। আশেপাশের কলাগাছ কিংবা উরোদ ডালের কিয়দংশ ধ্বংস করে দাপিয়ে বেড়ায় হাতির দল। সাংঘাতিক!

ওয়েবের যুগে হোটেলে বসে এমন আদিম দেখার সৌভাগ্য কজনের হয় জানি না! তবে এমন ইতিহাসের স্বাক্ষর যে শতরুপ সান্যাল হয়ে রইলো তা বলাই বাহুল্য। দাঁতালের হুঙ্কার আর মাটি কাঁপানো ভাইব্রেট জাস্ট আনবিলিবেভেল।


ডিসেম্বর ১০, দুপুর ২টো

“ক্যায়া বোলে থে আপ? সাব শান্ত হ্যায়! তো ইয়ে ক্যায়া হ্যায়? অপলোগো কা পাতা তাক নেহি থা।”

“আপ জার্নালিস্ট লোক স্রেফ মাজা লুটতে হ্যায়। কারণে কো তো কুছ ভি নেহি হ্যায়।”

“ইত না গুসসা মাত দিখাইয়ে স্যার। সাব কুছ আপকি সামনে হ্যায়!”

বটলব্রাশ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমার আর লোকেশ ঢাকের কথাগুলো না তুললে আজকের ঘটনাটা ঠিক বোঝাতে পারবো না। ৬ই ডিসেম্বর হাতি দেখার ঠিক একদিন পরেই ৮-তারিখ তপোবনের লখন্ড শিব মন্দিরের রাস্তায় ভোর নাগাদ ক্ষেতের কাজ করতে এসে স্থানীয় একজন দেখতে পান মৃত হাতি দুটো। মৃত হাতি দুটোর শুঁড়ের দুপাশে রক্তাক্ত ক্ষতের চিহ্ন। দাঁত গায়েব! কিন্তু কি করে? যতদূর জেনেছি এ সমস্ত এলাকায় হাতি বা জংলী কিছুর উপদ্রব হলে এলাকার লোকেরা সাহায্যের জন্য রেঞ্জারের নাম্বারে ডায়াল করে। তাঁরা ঘুম পাড়ানিগুলি বা পিছু ধাওয়া করে গভীর জঙ্গলে তাদের মুভ করায়। সেদিনও তো তেমনটাই হয়েছিল। তবে? তাহলে কি জঙ্গলের কোথাও লুকিয়ে ছিল কেউ! আর সুযোগ বুঝেই! সুবীরদা এরকম একটা আঁচ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এভাবে নাকের ডগার সামনে দিয়ে রাহাজানি!

ইশ, কি অসহায়ভাবে চোখ বুজিয়ে আছে হাতি দুটো। পশু চিকিৎসক বলেছেন, একটি মাদি হাতি সন্তানসম্ভবাও ছিল। টাকার আগে কি কিছুই নেই? একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির একেকটি দাঁতের ওজন প্রায় ৪কেজি করে। তাই সমস্ত কাজটি সেরেছে জনা-পাঁচেক কি তারও বেশি লোক। মনে পড়ে যাচ্ছে প্রবাদটা ‘হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা’। সোনা রূপো হিরের পাশাপাশি শৌখিন দামি পণ্যের তালিকার প্রথমদিকে পাকা জায়গা করে নিয়েছে আইভরি(হাতির দাঁত)। এক জরিপে দেখা গেছে আইভরি ব্যবসার কারণে গড়ে প্রায় ৩০,০০০ হাতিকে খুন করা হচ্ছে! আর ৫১,০৮২ স্কোয়ার কিলোমিটার ব্যাপ্ত, প্রায় ৪,০০০হাজার বেশি উদ্ভিদ অঞ্চল দেরাদুনে গা ঢাকা দিয়ে থাকাটা এমন কিছু বড় ব্যাপার ও নয়! ভাবি! নোটের আগে কি কিছুই নেই? হয়তো লোকেশেরও কিছু পার্সেন্টেজ ছিল? একের পর এক সবুজ হারাচ্ছে। ফোঁপরা হচ্ছে গোটা পৃথিবী। কিছু করতে না পারার যন্ত্রণাটা কলমে এসে আটকে যাচ্ছে। আজ আর কিছুই ভালো লাগছে না।


ডিসেম্বর ১২, সকাল ৯টা

সমাধান যে হয়েছে একথা বলবো না। অসংরক্ষিত এলাকায় বসেছে চৌকি। দিনে রাতে দুজন পাহারাদার। ভরসা দিচ্ছে প্রশাসন। ইলেক্ট্রিক তারে ঘিরেছে কিয়দংশ। কিন্তু প্রশ্নটা রয়েই গেল। সেদিনে হাতিদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছিলো কারা? দুনের ডিপার্টমেন্টাল রেঞ্জার মিঃ নৌটিয়াল সেদিন ডিউটিতে ছিলেন। কিন্তু তিনি জানিয়েছেন, তিনি কোনো এলার্ম কল পাননি। এলাকার সকলেই ভেবেছে কেউ না কেউ দাঁতালের সংবাদ হয়তো অফিসারদের দিয়েছে। আর তাতেই জিপ এসেছে। এমনকি মাইকের সতর্কবার্তা অন্যান্য দিনগুলোর মতোই।

তবে কে বা কারা? যারা বুক ফুলিয়ে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে এসব করেছে? তারা কি পারবে না নজরদারির চোখ এড়াতে! সবই কি প্রশাসনের প্রয়াস মাত্র। প্রচেষ্টা নয়। নাহলে এমনটা হয় কি করে? ফিউচার একদিন হয়তো জলভাতের মত সহজ দৃশ্যত হবে। যারা পারবে, তারাই জিতবে। কিন্তু দুনিয়াটা ফলস আর কৃত্রিমতায় ভরবে। ধূসর, বাদামির উপর তৈরি হবে স্টাডি থেকে বেডরুম।

একটা আদ্যোপান্ত রিপোর্ট তৈরি করে আমিও হয়ত প্রোমোশনের চৌকাঠে যেতে পারবো। কিন্তু মনে থাকবে ওই দাঁতবিহীন দাঁতালের দেহ দুটো কিংবা আরো কিছু। যা কিনা ধনীগন্ধের পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবে নোনা ধরা একটা তেতো গন্ধ।

(শতরুপ সান্যালের ডায়েরির অংশটা কাল্পনিক হলেও, পথঘাট সবুজ আর মিথ্যায় ভরা দুনিয়াটা সত্যি। এসবকে সামনে রেখেই আরো অসংখ্য সত্যি-মিথ্যার কলম ফুটে উঠবে সিনিয়র জার্নালিস্ট এর কলমে। পাশে থাকুন, পড়তে থাকুন, চিনতে থাকুন পৃথিবীটাকে)

(ক্রমশঃ)

অলংকরণ - মৈনাক দাশ




পাঠকেরা যা পড়ছেন