চ্যাংরাবান্ধার পাড়াগাঁ

গোবিন্দ সরকার


মাটির সোঁদা সোঁদা গন্ধের টান,
পথের দুপাশে হাস্নুহানা,
কেতকীর গন্ধ মাখানো বাউল মন
মায়া ভুলিনি আজও, ফুটিয়া ওঠে দর্পণ।
ছুটে আসি তাই একতারাটি হাতে
আলবাঁধানো এলোমেলো ধুলোমাখা পথে—
দীনদরিদ্রের অলংকার অমৃতসম ধূলিকণা—
গায়ের সহস্র শ্রমে যায়গো ভালবাসা বোনা।
কিছুদূর গিয়েই তো পেত্নীদিঘির মাঠ,
নেমে গেছে পথ মাঠের বুক চিরে;
পথের দুব্বাঘাস নিজেকে করিয়া সমর্পন
ধূসরিত পথ বিধবামায়ের সিথীর মতন।
একতারা হাতে গেয়ে যাই মাটি মানুষের গান,
আহা! গাইলেই কি তৃপ্তি আসে হিয়ায়!
ছাতিম তলায় দিবানিদ্রা দিয়েছি কত,
স্নিগ্ধ শীতল মমতাময়ী, ভুবনভুলানো গাঁ
যতবারই আসি ততবারই লাগেগো নতুন—
চ্যাংরাবান্ধার নয়নজুড়ানো পাড়াগাঁ।
ছোট্ট ছোট্ট ঘরগুলি একচালা কুটির
উঠোনে দোপাটিফুলের আলপনা, যেন শান্তির নীড়।
মানুষেরা নম্র, শান্ত, সভ্যতার চালিকা
ঘর তাদের কুঁড়ে হলেও মনটা অট্টালিকা।
গরুর গাড়ি চেপে একতারা হাতে বকুলতলায়,
যেখানে বসত আগে বাউল গানের আসর
গাইতাম, “পথ হারানো পথিক ওরে...”
উপচে পড়ত মানুষের ভিড়।
এখন সে অতীত—
আর অতীত ইতিহাসের পাতাতেই শোভায়।
গড়িয়ে এল বিকেল, পড়ল ছুটির ঘন্টা
কচিকাঁচাদের দৌড়ঝাঁপ, সঙ্গে হাটুয়া ব্যাগটা।
কেউ বাজায় মিড-ডে মিলের থালা,
কেউবা আমের আঁটির ভেঁপু।
ওপাড়ার পাঁচু কামারের ছোট্ট ছেলে ফটিক,
চোখে তার কালশিটে দাগ—
সারা দেহে দীনতার ছাপ;
সুযোগ মেলেনি তার স্কুলে আসার
ভর্তি হয়েও স্কুলছুট, এ দারিদ্র্যতার অভিশাপ।
টায়ার চালিয়ে হাজির, বুকে পাহাড়প্রমাণ খুশি
হাঁপালেও দমেনি সে মুখে নজরকাড়া হাসি।
এদিক ওদিক তাকায় সে, পলকই ফেলেনা
দেখতে, পাশের বাড়ির ফুলুর ছুটি হয়েছে কিনা?
শিহরিয়া উঠিল বুক সহস্র খুশির মাঝে—
নিষ্পাপ বালকের এই করুণ অসহায়তা;
বেদনায় উঠিল বাজিয়া হৃদয়ের একতারাটা।

অলংকরণ : প্রমিত নন্দী

পাঠকেরা যা পড়ছেন