চার্লস ডেক্সটার ওয়ার্ড এর আজব কাহিনী ১


এইচ পি লভক্রফট


“প্রানীদেহাংশের সারবস্তু থেকে এমন এক বিশেষ ধুলো এতো ভালোভাবে প্রস্তুত এবং সংরক্ষণ করা যেতে পারে, যার সাহায্যে যেকোনো একজন বুদ্ধিমান শিক্ষিত মানুষ তার নিজের পরীক্ষাগারে চাইলেই নোয়ার নৌকাতে যত জীবজন্তু ছিল সবকিছুকেই বানিয়ে নিতে পারে। পছন্দের যে কোনো পশুপাখীর আকৃতি নিখুঁতরূপে নির্মাণ করাটা কোনো ব্যাপারই না। আর ঠিক এভাবেই মানুষের দেহাংশের ধুলো থেকে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি কোনোরকম অপরাধমূলক প্রেত চর্চা না করেও তার মৃত পূর্বপুরুষের আকৃতি পুনঃনির্মাণ করতে পারে। মোদ্দা কথা মানব দেহাংশের ধুলো থেকে নতুন মানুষের সৃষ্টি করা সম্ভব।” —বোরিলাস


প্রথম অধ্যায়
ফলাফল এবং প্রাক কথন

প্রথম অধ্যায় – ১ম পর্ব

প্রভিডেন্স, রোড আইল্যান্ডের কাছে এক প্রাইভেট হাসপাতাল আছে। মূলত পাগলদের চিকিৎসা হয়। সেখানে থেকে একজন পালিয়ে গেছে। নাম চার্লস ডেক্সটার ওয়ার্ড। ওকে ওখানে ভর্তি করে দিয়ে গিয়েছিলেন ওর বাবা। দেখেই বোঝা গিয়েছিল এই কাজটা করার ফলে মানুষটিকে অসহনীয় দুঃখ একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। কিন্তু করারও কিছুই ছিল না। কারণ তার ছেলে এক অদ্ভুত রকমের পাগল। আর সে পাগলামোর মাত্রা এতোটাই বেড়ে গিয়েছিল... এতোটাই অন্ধকার রহস্যময় জগতের পথে হাঁটা দিয়েছিল যে চার্লসের মধ্যে ক্রমশ এক খুনীর প্রবণতা জন্ম নিচ্ছিল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে এক হিসাবকিতাববিহীন অদ্ভুত পরিবর্তন ছেলেটির চরিত্রে ছায়াপাত করছিল। ডাক্তাররাও স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে তারাও চার্লসের অন্ধকারাচ্ছন্ন মনের দিকটাকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন না। স্পষ্টতই বিব্রত বোধ করছিলেন ওরা। ওদের মতে একইসাথে ওর ঘটনাটি ছিল শারীরবৃত্তীয় এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যতিক্রমের এক চুড়ান্ত নিদর্শন।

সবার আগেই চার্লসের বিষয়ে যা বলা প্রয়োজন তা হলো ওর বাহ্যিক শারীরিক কাঠামোর অদ্ভুত দিকটা। বয়স ছাব্বিশ কিন্তু দেখে বিস্ময়করভাবে মনে হতো অনেক অনেক বেশি বয়সের মানুষ সে।। এটা ঠিক যে মানসিক বিপর্যয় অনেক সময়েই মানুষের মুখে চোখে দ্রুত বয়স বেড়ে যাওয়ার ছাপ ফেলে দেয়। কিন্তু এই যুবকটির মুখমণ্ডল এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যা সত্যি সত্যিই ভালো মতো বয়স না হলে দেখতে পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয় ব্যাপার হলো, চার্লসের শারীরিক জৈব প্রক্রিয়ায় সাহায্যকারী নানান অঙ্গ প্রত্যঙ্গের অদ্ভুত আচরণ। যা চিকিৎসাজগতের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে বানচাল করে দিয়েছিল। শ্বাসপ্রশ্বাস এবং হৃদস্পন্দনের মধ্যে ছিল সমঝোতার অভাব। জোরে শব্দ করে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে গিয়েছিল। কেবলমাত্র কিছু ফিসফিসে শব্দ করতে সক্ষম ছিল চার্লস। খাবার হজম করতে অবিশ্বাস্যরকম বেশী সময় লাগতো। সাথে সাথেই হজম করার ক্ষমতাও কমে গিয়েছিল। যেকোনো বিষয়ে স্নায়বিকউদ্দীপনাগত যে প্রতিক্রিয়া একজন সাধারন মানুষ দেখায় সেটাও ঠিকমতো কাজ করছিল না ওর ক্ষেত্রে। গায়ের চামড়া হয়ে গিয়েছিল শীতল এবং শুষ্ক। মরা শরীরের মতো। টিস্যুর অভ্যন্তরস্থ কোষগুলো যেন অতিরিক্ত পরিমাণে রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল। সাথেই ওদের ভেতরে যে নিয়মমাফিক বন্ধন থাকে তাও বোধহয় ঢিলে হয়ে গিয়েছিল। চমকপ্রদভাবে ডান পাছায় বড়সড় জলপাই রঙের জড়ুল চিহ্নটা বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। উল্টে বুকের উপর এক অদ্ভুত কালো আঁচিল জন্ম নেয়। যেটা এর আগে মোটেই ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই, সমস্ত চিকিত্সকরা একমত হন যে চার্লসের মেটাবলিজম প্রক্রিয়া এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যা ইতিপূর্বে কোথাও কখনো দেখা যায়নি।

মানসিকভাবেও চার্লস ওয়ার্ড ছিল অনন্য। তাঁর পাগলামির মাত্রা এমন এক পর্যায়ের ছিল যা এর আগে অবধি অনেক চিন্তা ভাবনা বিবেচনার সাথে লেখা বইগুলির মধ্যেও কোথাও কোনোদিন কেউ লিপিবদ্ধ করেনি। চার্লস এমনই এক উচ্চমাত্রার মানসিক শক্তির অধিকারী ছিল যে পাগলামোর কারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হলে একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি বা একজন বড়সড় নেতা হওয়া থেকে কেউ ওকে আটকাতে পারত না। কিন্তু মানসিকতার বিকৃতি সব কিছুকে ঢেকে দিয়ে ভীতিকর কিম্ভুত রূপে পরিণত করে ওকে। ওয়ার্ডের পারিবারিক চিকিত্সক ডঃ উইলেট বলেন, চার্লসের মানসিক ক্ষমতা পাগল হওয়ার আগের তুলনায় নাকি অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে। এটা সত্যি যে চার্লস চিরকালই একজন পণ্ডিত গোছের মানুষ এবং পুরাতত্ববিদ। শেষ পরীক্ষার সময় তার লেখায় যে অসাধারণ উপলব্ধি এবং অন্তর্দৃষ্টি প্রদর্শিত হয়েছিল। যার ছাপ অবশ্য প্রারম্ভিক কাজের ভেতরে দেখতে না পাওয়া গেলেও চার্লসের বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে কোন সন্দেহই ছিল না কারোর। যে কারণে আইনগত ভাবে এরকম একটি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা নিয়ে কর্মকর্তারা একটু চিন্তাতেই পড়েছিলেন। শুধুমাত্র অন্যদের সাক্ষ্য প্রমাণ এবং তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার প্রেক্ষিতে নানান অস্বাভাবিক আচরণ অবশেষে তাকে ওই উন্মাদ হাসপাতালে ভর্তি করানোর বাধা দূর করে। পালিয়ে যাওয়ার আগে অবধি তার বিষয়ে বলা যায় মানুষটা ছিল এক গোগ্রাসী পাঠক। কথা বলার অক্ষমতা সত্ত্বেও যে সমস্ত চিত্তাকর্ষক কথাবার্তা চার্লস বলতো তাতে যারা তাকে দিনের পর দিন দেখেছে তারা বলেছিল এরকম একটা মানুষকে বেশিদিন এখানে আটকে রাখা যাবে না।

কিন্তু ডঃ উইলেট, যিনি চার্লসকে এই জগতের আলো দেখিয়েছিলেন. তিনি একটু একটু করে দেখেছেন চার্লসের শরীর ও মনের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি। সেই চার্লস এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে ভবিষ্যতে কি করে বসবে সে চিন্তায় ভীত হয়ে ছিলেন। আসলে এমন এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার উনি সাক্ষী, এমন এক ভয়ঙ্কর তথ্য উনি জানেন যা সন্দেহপ্রবণ সহকর্মীদের কাছে প্রকাশ করার সাহস তার হয়নি। আর ভেঙে যদি বলা হয় ডঃ উইলেট নিজেই এক ছোটখাট রহস্যময় চরিত্র এই কাহিনীর ভেতরে তাও মিথ্যে বলা হবে না। পালিয়ে যাওয়ার আগে ডঃ উইলেট একমাত্র মানুষ যিনি রোগীর সাথে শেষ বারের মতো দেখা করেছিলেন। এর ঠিক তিন ঘণ্টা বাদে চার্লস অদৃশ্য হয়ে যায়। যারা তাকে চার্লসের সাথে দেখা করে আসার পর ফিরে আসতে দেখেছিল তাদের কথানুযায়ী ডঃ উইলেটের মুখে একই সাথে আতঙ্ক এবং স্বস্তির ছাপ মিশে ছিল।

ডঃ ওয়েটের হাসপাতাল থেকে চার্লসের এই পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল অপ্রত্যাশিত এবং অমীমাংসিত বিস্ময়কর ঘটনার মধ্যে অন্যতম। চার্লসকে যে ঘরে রাখা হয়েছিল সেই ঘরের জানলাটির অবস্থান ষাট ফুট ওপরে। সেটা খোলাই ছিল। কিন্তু ডঃ উইলেটের সাথে কথা বলার পর যুবকটির পলায়ন পর্ব বিষয়ে সেটা কোনও সমাধান ব্যাখ্যা করতে পারে না। মানুষকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করে বলার মতো কিছু সহজ তথ্য উইলেটের নিজের কাছেও ছিল না। যদিও মানুষের কথা অনুসারে আশ্চর্যজনক ভাবে চার্লসের পালিয়ে যাওয়ার আগের সময়ের তুলনায় পালিয়ে যাওয়ার পরে নাকি ডঃ উইলেটকে অনেক বেশী শান্ত দেখাচ্ছিল। অনেক মানুষ এটাও মনে করে যে প্রকৃতপক্ষে উইলেট আরো অনেক বেশি কিছু বলতে পারেন কিন্তু বলছেন না। হয়তো মনে করছেন মানুষ তার কথা বিশ্বাস করবেনা। উনি চার্লসকে তার ঘরের মধ্যেই দেখেছিলেন। তার প্রস্থানের কিছু সময় বাদে হাসপাতালের অ্যাটেন্ড্যান্টরা আর চার্লসের কোনো সাড়া শব্দ পায়নি অনেকক্ষণ ধরে। বার বার ডাকার পরেও যখন চার্লস কোনো সাড়া দিলো না তখন ওরা জোর জবরদস্তি করে দরজা খোলে এবং দেখে চার্লস ঘরের ভেতরে নেই। খোলা জানলাটা দিয়ে এপ্রিল মাসের ঠাণ্ডা বাতাস এসে ওদের ধাক্কা মারে। যে হাওয়ার ধাক্কায় ওরা দেখেছিল ঘরের ভেতর সূক্ষ্ম ধূসরনীল ধূলিকণার একটা মেঘ যেন ভাসছে। ওদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল ওই ধুলোর ভেতরে। ওই ঘটনার কিছু সময় আগে নাকি কুকুরদের বেদম কান্নার শব্দে চারদিক মথিত হয়েছিল । সে সময় অবশ্য ঘরের ভেতরে ডঃ উইলেট ছিলেন। যদিও কুকুরগুলো কাউকে তেড়েও যায়নি বা কামড়ায় নি। যেমন হঠাৎ করেই করুণ চিৎকার শুরু করে আকাশ বাতাস মাতিয়ে দিয়েছিল ঠিক তেমন ভাবেই হঠাৎ করেই থেমে যায়।

ব্যাপারটা চার্লসের বাবাকে টেলিফোন করে জানানো হলো। কিন্তু বিস্মিত হওয়ার চেয়ে ওনার কথা বলার সুরে মিশে ছিল দুঃখবোধ। ইতিমধ্যে ডঃ ওয়েট, ডঃ উইলেটকে ডেকে পাঠান ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করার জন্য। দুজনেই এবিষয়ে একমত হলেন যে ঘটনাটা কি ভাবে ঘটেছে সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারনা নেই। শুধু উইলেটের কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সিনিয়র মিঃ ওয়ার্ডের কাছ থেকে কিছু সূত্র পাওয়া গেলেও সেগুলো সাধারণ বিশ্বাসের পক্ষে এতোটাই উদ্ভট রকমের যে সেসব নিয়ে আলোচনা হলোই না। বর্তমান সময় অবধি কেবলমাত্র একটা কথাই এবিষয়ে বলা যায় যে পালিয়ে যাওয়া বা অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পাগল ব্যক্তিটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

চার্লস ওয়ার্ড ছোটোবেলা থেকেই প্রাচীন জিনিষপত্র নেড়ে ঘেঁটে দেখতে ভালোবাসতো। ও যে শহরে বাস করতো সেই শহরটাও ছিল প্রাচীন। প্রস্পেক্ট স্ট্রীটের ওপর স্থিত পাহাড়ের গায়ে পৈত্রিক বাড়িটাও ছিল ততোধিক পুরোনো। সন্দেহের অবকাশ নেই যে এরকম একটা শহরে নানা রকম অতীতের নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। বছরের পর বছর এই সব প্রাচীন জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে এসবের প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমশই বৃদ্ধি পায়। যাতে ইন্ধন যোগায় ইতিহাস, বংশানুক্রমিকতা এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, নানান আসবাবপত্র এবং কারিগরি বিষয়ক দক্ষতার সম্পর্ক যুক্ত নানা পুস্তকের অধ্যয়ন। এই সব বিষয়গত চেতনা তার উন্মাদনার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেয় বলেই মনে করা হয়। যদিও এগুলো সেই অর্থে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে নি। কিন্তু অপ্রত্যক্ষ ভাবে চার্লসের অবচেতনায় একটি বিশিষ্ট ভুমিকা পালন করে। লক্ষ্যনীয় বিষয় এটাই যে চার্লস তার সময়ের আধুনিক বিষয়ের তথ্য সেভাবে যেন জানতো না বলেই মনে করেছেন এক সময় তার পরীক্ষকেরা। অথচ বহির্বিশ্বের নানান গোপন জ্ঞান এবং আক্ষরিক অর্থেই প্রাচীন দিনের প্রায় সমস্ত জ্ঞান তার মাথায় যেন সঞ্চিত ছিল । অথচ সেই সব বিষয়ে কথা বলার আগ্রহ তার ছিলনা। একমাত্র ধৈর্য ধরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেলে এক আচ্ছন্নতার ঘোরে আবিষ্ট হয়ে অতীতের বিভিন্ন জ্ঞান গর্ভ তথ্য বলে যেত সে।

অদ্ভুত ব্যাপার এটাই যে যে প্রত্নতত্ববিদ্যা ছিল চার্লসের প্রিয় বিষয় সেটার প্রতি ওর আগ্রহ কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল এসব বিষয়ে সে এতো জেনে গেছে যে আর এ নিয়ে ভাবতে চায় না। এখন সে আধুনিক বিশ্বের খুচখাচ সব ধরনের সাধারণ ঘটনাগুলিকে বুঝে নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আধুনিক জগতের সব জ্ঞান এবার সে পান করতে চায় এক গন্ডুষে। তার মাথা থেকে যে বর্তমান সময়ের জ্ঞান কোন এক অজানা কারণে যেন মুছে গেছে। আর সেটাই সে যেন ঢেকে রাখার চেষ্টা করতো। তার এই পাগলসম জ্ঞান আহরণের প্রচেষ্টা সকলের চোখেই ধরা পড়তো। ১৯০২ সালে জন্মেছিল চার্লস। তার পরবর্তী ছাব্বিশ বছরের পটভুমিতে বিংশ শতাব্দীর এক জন মানুষ যা যা জানতে সক্ষম সে সব কিছু জেনে বুঝে নেওয়ার এক অসম প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল সে। এমনকি সে সময় স্কুলে কি শেখানো হয়েছিল সেটা জানার আগ্রহ ও তার কম ছিল না কিছুমাত্র। এইসূত্রেই যারা চার্লসের ঘটনা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছিলেন সেই বিশেষজ্ঞদের সামনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল, বাস্তব জগতের সঠিক জ্ঞান ছাড়া কি ভাবে ওই পালিয়ে যাওয়া রোগী আজকের জটিল জগতের সাথে মোকাবিলা করবে? আর এর থেকেই একটা ধারনা করে নেওয়া হয় আসলে চার্লস লুকিয়ে আছে। বর্তমানের সমস্ত তথ্যাদিসংগ্রহ না করে সে জনসমক্ষে দেখা দেবে না।

চার্লস ওয়ার্ডের পাগলামির ঠিক কবে শুরু হয়েছিল এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ঐক্যমত্য নেই। বোস্টনের ডঃ লাইম্যানের মতে এর শুরু হয়েছিল ১৯১৯-১৯২০ সালে। সে সময়টা ছিল ওর মোসেস ব্রাউন স্কুলের শেষ বছর। হঠাৎ করেই চার্লস অতীত নিয়ে পড়াশোনা করা বন্ধ করে দিয়ে অকাল্ট বা অপ-রসায়ন নিয়ে মেতে ওঠে। এর জন্য সে কলেজের আর পড়াশোনা করতেও চায়নি। যুক্তি হিসাবে জানায় ওই শিক্ষার চেয়েও বড় কিছু নিয়ে ও এবার নাকি গবেষনা করছে। এই সময় থেকেই চার্লসের হাবভাবের প্রভুত পরিবর্তন দেখা যেতে থাকে। ১৭৭১ সালে একটি কবর খুঁড়ে ওঠানো হয়েছিল। সেটার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য শহরের আনাচে কানাচের কবরখানায় সে ছুটে বেড়ায়। কবরটা ছিল ওর এক পূর্ব পুরুষের। নাম জোসেফ কারওয়েন। ওই মানুষটার লেখা বেশ কিছু কাগজপত্র স্ট্যাম্পস হিলের ওলনি কোর্টের একটি পুরনো বাড়ির প্যানেলের পিছনে চার্লস খুঁজে পেয়েছিল বলে দাবি করেছিল। ওই বাড়ীটা কারওয়েন নির্মাণ করেছিলেন এবং বসবাস করতেন। ১৯২০ সালের শীতকালে ওয়ার্ডের চালচলনে যে এক বিরাট পরিবর্তন দেখা যায় এটা সকলেই মেনে নেয়। যার কারণেই সে অকস্মাৎ তার সাধারণ পুরাতাত্ত্বিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে দেশে এবং বিদেশে অকাল্ট বিদ্যার গোপন বিষয় নিয়ে পাগলের মতো অনুসন্ধান চালাতে থাকে। সাথেই বজায় ছিল তার অতি বৃদ্ধ পূর্বপুরুষের কবরের অন্বেষণ।

উপরিউক্ত ওই চিন্তাভাবনার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন ডঃ উইলেট। রোগীকে উনি দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন এবং নজর রেখেছিলেন যে কারণেই শেষের দিকে তিনি বেশ কিছু শিহরণ উদ্রেককারী খোঁজ চালিয়ে অনেক তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন। ওই সব খোঁজ আর তার ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য স্বয়ং ডাক্তারের ওপরে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। এবিষয়ে কথা বলতে গেলেই ওনার কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে উঠতো। যখন ভাবতেন এসব বিষয়ে লিখবেন হাতের কাঁপুনি থামতেই চাইতো না। উইলেট স্বীকার করেন যে ১৯১৯-২০ সালে যে মানসিক পরিবর্তনের সূচনা চার্লসের আচরণে হয়েছিল তা ১৯২৮ সালে এসে চরম রুপ নেয়। যার ফল হয় ভয়ঙ্কর...অপ্রাকৃত। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে উনি বিশ্বাস করেন যে বিষয়টিকে একটু আলাদাভাবেও দেখা প্রয়োজন। এটা উনি মেনে নেন যে ছেলেটি প্রথম থেকেই মানসিকভাবে সবসময় সামঞ্জস্যহীনতায় ভুগতো। যেকোনো বিষয়েই তার প্রতিক্রিয়া ছিল আনুপাতিকভাবে সন্দেহজনক এবং সাথে সাথেই অতিরিক্ত পরিমাণে উত্সাহী ছিল আশেপাশের ঘটে যাওয়া নানান অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে চর্চা করার ব্যাপারে। কিন্তু উইলেট এটা স্বীকার করতে অস্বীকার করেন ওই সব কারণ থেকেই বর্তমান উন্মাদনার মূল পথটি খুলে যায়। এর প্রমান স্বরূপ উনি ওয়ার্ডের নিজস্ব মতামতের কথা জানান। চার্লস নাকি ওকে বলেছিল, সে এমন কিছু আবিষ্কার করেছে বা পুনরায় আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে যার কথা জানতে পারলে মানুষের আজ অবধি জানা সব সত্য উলট পালট হয়ে যাবে।

উনি নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করেন প্রকৃতপক্ষে চার্লসের পাগলামি শুরু হয় আরো কিছু সময় বাদে। যখন সে কারওয়েনের প্রতিকৃতি এবং প্রাচীন কাগজপত্রগুলো খুঁজে পায়, তারপর থেকে। অজ্ঞাত কিছু বিদেশী অঞ্চল চার্লস ভ্রমণ করে... কিছু ভয়ানক অদ্ভুত আচার প্রথা পালন করে ... উচ্চারণ করে অজানা শক্তি আহরণের মন্ত্রাদি। এসব করার ফলে যে অভিজ্ঞতা তার হয় সেসব বিষয় নিয়ে অতি গোপনীয় পরিস্থিতিতে উন্মাদনাগ্রস্ত অবস্থায় সে এক চিঠি লিখেছিল। এসবের সাথেই সে সময়ে শোনা গিয়েছিল বেশ কিছু ভ্যাম্পায়ার জনিত আক্রমণের কথা এবং অশুভ লক্ষণ যুক্ত নানান পটুয়েক্সট গুজব। এই সময় থেকেই তার রোগীর স্মৃতি বিভ্রাট হতে শুরু করে। কমে যেতে থাকে কথা বলার ক্ষমতা। সাথেই সারা দেহ জুড়ে শুরু হয় নানান শারীরিক সূক্ষ্ম পরিবর্তন।

এই সময় থেকেই যে চার্লসের দুঃস্বপ্ন দেখার সূচনাও হয় সেটা ডঃ উইলেট নিশ্চিত ভাবে জানান। চার্লস ওয়ার্ড যে অদ্ভুত রকমের কিছু একটা আবিষ্কার করেছিল সেটার সুনিশ্চিত প্রমাণ বিদ্যমান এটা বুঝতে পেরে ডাক্তার মনে মনে ঠকঠকিয়ে কেঁপে উঠেছিলেন। প্রথমত, উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন দু’জন মানুষ জোসেফ কারওয়েনের প্রাচীন কাগজপত্র যে সত্যিই পাওয়া গিয়েছিল সেটা নিজের চোখে দেখে ছিলেন। দ্বিতীয়ত, চার্লস নিজেই একবার ডঃ উইলেটকে সেই কাগজপত্রগুলো এবং কারওয়েনের লেখা ডায়েরির একটি পৃষ্ঠা দেখিয়েছিল। সেই সব কাগজপত্রর ভেতরে কোনো কারচুপি ছিল না। যে গর্তের ভেতর থেকে ওই কাগজপত্র পাওয়া গিয়েছিল বলে সেটারও বাস্তবে অস্তিত্ব ছিল। উইলেট সেসব এমন অবস্থায় দেখেছিলেন যা বিশ্বাস করার পক্ষে নাকি বেশ কঠিন। প্রমাণ করাতো দূরের কথা কোনোমতেই নাকি সম্ভব নয়।

এর সাথেই ছিল অরনে এবং হাচিনসন এর রহস্যময় এবং প্রায় কাকতালীয় ভাবে প্রাপ্ত চিঠিগুলো। জোসেফ কারওয়েনের দুর্বোধ্য লেখনী সমস্যার সমাধান করে গোয়েন্দারা ডক্টর অ্যালেন সম্পর্কে জানতে পারেন। এই সব জিনিসগুলো এবং মধ্যযুগীয় হস্তাক্ষরে লেখা এক চিরকুট পাওয়া যায় উইলেটের পকেটে। চরম হাড় কাঁপানো অভিজ্ঞতা লাভের পরে চেতনা ফিরে এলে তিনি বুঝতে পারেন ওই সব জিনিষগুলো কোন এক অজ্ঞাত পথে ওর পকেটে চলে এসেছে।

এছাড়াও ছিল দুটো অবিশ্বাস্য রকমের জঘন্য ফলাফলের প্রমাণ। শেষ বারের মতো খোঁজ খবর করার সময় ডাক্তার খুঁজে পেয়েছিলেন এক জোড়া ফর্মুলা। সেই ফরমুলার ভিত্তিতে পরীক্ষা চালিয়ে যে ফলাফল লাভ হয় তা প্রমাণ করে চার্লস কথিত কাগজপত্রর সত্যতা এবং সেসবের গায়ের লোমখাড়া করে দেওয়া প্রয়োগ পদ্ধতির কথা। একই সাথে এটাও বুঝিয়ে দেয় যে এসব কাগজপত্রর বিষয়বস্তু মানুষের চিরাচরিত জ্ঞানসীমা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।

প্রথম অধ্যায় – ২য় পর্ব

যে সময় চার্লস ওয়ার্ড প্রাচীন জিনিষপত্র এবং পুরাতত্ব নিয়ে মেতে ছিল সেই জীবনটার দিকে একটু ফিরে দেখা দরকার। ১৯১৮ সালের শরত্কাল, সেই সময়টায় সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার এক হুজুগ শুরু হয়েছিল। এই সময়েই চার্লস, মোজেস ব্রাউন স্কুলে তার জুনিয়র শিক্ষার বছর শুরু করে। স্কুলটা ওদের বাড়ির খুব কাছেই ছিল। ১৮১৯ সালে স্কুলের পুরানো প্রধান ভবনটির নির্মাণ করা হয়। সদ্য সদ্য পুরাতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মেতে যাওয়া চার্লসের মনে এই ভবন এক আলাদা অনুভূতির জন্ম দিতো। একাডেমী ভবনটির সাথে সংযুক্ত প্রশস্ত উদ্যান তার চোখকে দিতো এক স্বপ্নময় জগতের খোঁজ। আশেপাশের জগতের সাথে খুব একটা পরিচয় ছিল না ওর। বেশীরভাগ সময় কেটে যেত ঘরের ভেতরে। তার হাঁটাচলা সীমাবদ্ধ ছিল নিজের ক্লাস এবং ড্রিলস করার মাঠ, সিটি হল, স্টেট হাউস, পাবলিক লাইব্রেরী, অ্যাথেনিয়াম, হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন কার্টারব্রাউন অ্যান্ড জন হে লাইব্রেরীএবং বেনিফিট স্ট্রিটে সদ্য উদ্বোধন হওয়া শেপ্লে লাইব্রেরির এলাকায়। পুরাতাত্ত্বিক ও বংশগত তথ্য খোঁজার কাজেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতো চার্লস। এই সময়ে চার্লসের একটা ছবি যদি পাওয়া যায় তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে লম্বা, পাতলা, সোনালী চুল, অধ্যয়নশীল চোখ এবং সামান্য জুবুথুবু ধরনের একটি ছেলেকে। পোশাক আশাক বিষয়ে কোন যত্ন নেই। দেখলে মনে হতো অজ্ঞানতারই যেন এক প্রতিমূর্তি। আকর্ষণীয় বলতে কিছুই নেই।

চার্লস নিজের মনেই এই পুরানো শহরের এক গৌরবময় ছবি কল্পনা করে নিয়েছিল। পুরাতত্বের খোঁজ চালাতে চালাতে সে আসলে এক অভিযান করতো সেই শতাব্দী প্রাচীন শহরে। শহরে বুক চিরে প্রবাহিত নদীটির পূর্বদিকে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত ওর নিজের বাসভবনটা ছিল একটি চমৎকার জর্জিয়ান প্রাসাদসম। সেই বাড়ির পিছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে সে দূরবর্তী সন্নিহিত অঞ্চলের নিচু শহরগুলোর গম্বুজ, উঁচু নিচু ছাদ, বড় বড় তোরণ এবং বেগুনি পাহাড়ের ঝাপসা হয়ে থাকা দৃশ্য দেখতো এক মনে। এখানেই তার জন্ম। তার দেখাশোনা করতো যে আয়াটি সেই প্রথম ওকে গাড়ীতে চাপিয়ে এই সব দৃশ্য দেখিয়েছিল। এই শহর আক্রমণকারীরা দখল করে নেওয়ার অন্তত দুই শতাব্দী আগে নির্মিত ছোটো সাদা রঙের ফার্ম হাঊসের পাশ কাটিয়ে বেড়াতে যেত চার্লস। ছায়াময় রাস্তার এদিকে ওদিকে দেখা যেত পুরনোদিনের বর্গাকৃতি ইঁটের ঘর এবং সংকীর্ণ কাঠের কাঠামোগুলিকে যাদের সাথে যুক্ত ছিল ভারী-কলমযুক্ত ডোরিক বারান্দা। মাঝে মাঝেই খোলা উদ্যান এবং বাগান চার্লসকে নিয়ে যেত এক স্বপ্নের জগতে।

পাহাড় থেকে এক ধাপ নিচে নেমে এসে চার্লস পৌঁছে যেতো প্রায় ঘুমন্ত কংডন স্ট্রীটে। যে রাস্তার পূর্ব দিকে ছিল এলাকার সমস্ত ঘরবাড়ি। এখান কার প্রায় সব ছোট ছোট কাঠের বাড়ীই বয়সে প্রাচীন। কারণ এটাই ছিল এই পাহাড়ে ক্রমবর্ধমান শহর জন্ম নেওয়ার প্রাথমিক সূচনা স্থান। এখানে ঘুরে বেড়ানোর সময় চার্লস আদিম ঔপনিবেশিক গ্রামের অস্তিত্ব টের পেতো। এখানে আসার পর নার্সরা একটু বিশ্রাম নিত। প্রসপেক্ট স্ট্রীটের বেঞ্চে বসে ওরা ওখানকার পুলিশদের সাথে গল্প করতো। এসব এলাকার প্রথম স্মৃতিগুলির মধ্যে একটি ছবি চার্লসের মনে গেঁথে বসে গিয়েছিল। এক শীতকালীন বিকালে পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্রের ছবি। যার সাথে মিশে ছিল ঝাপসা ছাদ, গম্বুজ, টানা বিশাল প্রাচীর এবং দূর পাহাড়ের এক বেগুনী আভাযুক্ত রহস্যময় ঝাপসা দৃশ্য পট। সে দৃশ্যকে আরো বিস্ময়কর করে দিয়েছিল অস্তগামী সূর্যের লাল ও সোনালী আলো এবং উদ্দীপ্ত এক সবুজের বিস্তার। এই প্রেক্ষাপটের স্টেটহাউসের বিশাল মার্বেল গম্বুজটি সিলুয়েট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওটার একেবারে ওপরে অবস্থিত মুকুট মূর্তিটি উজ্জ্বল রক্তাভ ছুঁয়ে মেঘেদের মাঝখানে নিজের অস্তিত্ব জাহির করছিল স্বমহিমায়।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে শুরু হয় তার চিরপরিচিত বিশেষ পদচারনা। প্রথম প্রথম তার সঙ্গে নার্সকে যেতে হতো। পরবর্তী সময়ে স্বপ্ন মাখা এক ধ্যানের ঘোরে একাই হেঁটে বেড়াতো সে। দূর থেকে দূরবর্তী পাহাড়ের গলিঘুঁজিতেপড়ে থাকা প্রাচীন শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতো চার্লস। সামান্য দ্বিধা না করেই খাড়া জেনেক্স স্ট্রিটের পথ ধরে ব্যাংকের দেয়াল এবং ঔপনিবেশিক বাড়িঘরের পাশ দিয়ে নেমে যেত ছায়ায় ঢাকা বেনিফিট স্ট্রিটে। ওখানেইছিল এক কাঠের বাড়ি যার দরজাটা ছিল অতীবসুন্দর কারুকাজের এক নিদর্শন। তার ঠিক পাশেই এক অতি প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক ছাদের খামারবাড়ি। জর্জিয়ান ঐতিহ্য গায়ে চাপিয়ে বিখ্যাত বিচারক ডারফির বাড়ীটার ধ্বংসাবশেষও ছিল এখানেই। এলাকাটিকে দেখে মনে হতো হত দরিদ্র বস্তির মতো। যদিও বিশাল বিশাল গাছের সারি স্থানটির প্রাচীনত্বর প্রমাণ দিতো নিজেদের ছায়া বিস্তার করে। চার্লস নামের ছেলেটি এই প্রাক-বিপ্লব যুগের বিরাট মাপের বাড়িগুলির পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতো দক্ষিন দিকে। পূর্বদিকে পাথরের ধাপে ধাপে অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছিল শহরটার বিস্তৃতি। চার্লস কল্পনার চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করতো সেই সময়ের ছবি যখন সদ্য এই সব রাস্তা তৈরি হয়েছিল। বাড়ীর দোতলায় অবস্থিত তেকোনা রঙ্গীন বারান্দায় দাঁড়য়ে থাকা মানুষদের পোশাক আশাক, লাল রঙের জুতো বা পরচুলাগুলোকেও কল্পনার দৃষ্টিতে স্পষ্ট দেখতে পেতো চার্লস।

পশ্চিম প্রান্তের পাহাড়টি প্রায় খাড়া নেমে গিয়েছিল পুরনো ‘টাউন স্ট্রিট’-এ। যা নির্মিত হয়েছিল ১৬৩৬ সালে নদী প্রান্ত ধরে। এই রাস্তার গা থেকে জন্ম নিয়েছিল অগণিত ছোটো ছোটো রাস্তা। সেই সময়ের অসংখ্য বাড়ীতে পরিপূর্ণ ছিল এলাকাটি। প্রাচীনতায় ভরপুর হয়ে থাকা এই অঞ্চল একই সাথে চার্লসকে যেমন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করতো. সাথে সাথেই এক অজানা অজ্ঞাতআতঙ্ক ময়স্বপ্ন জগতের দ্বার উন্মোচিত হতে পারে এমন আশঙ্কাতেও শিহরিত করে রাখতো। সে হেঁটে যেত বেনিফিট স্ট্রীটের সেই এলাকা দিয়ে যার একপাশে ছিল সেন্ট জন এর লুকানো গির্জা অভ্যন্তরস্থ কবরখানার লোহার রেলিং। দেখা যেত ১৭৬১ সালে নির্মিত কলোনি হাউসের পিছনের দিকটা এবং ভেঙে চুরে পড়ে থাকা গোল্ডেন বল ইন এর শেষ চিহ্নাদি। মিটিং স্ট্রিটের কোনো এক সময়ের গাওল লেন এবং কিং স্ট্রিটের পূর্ব দিকে তাকালে দেখতে পেতো ক্রমশই ওপরের দিকে ধাপে ধাপে উঠে গেছে পুরাতন হাইওয়ে। আর পশ্চিমে নিচের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল ইঁটের তৈরী ঔপনিবেশিক স্কুলঘরটি। তার সামনের রাস্তা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়তো শেকসপিয়ারের হাসিখুশি মুখের একটি ছবি। বিপ্লবের আগে ওখানেই প্রভিডেন্স গেজেট এবং কাউন্ট্রি-জার্নাল মুদ্রিত হতো। এর পরেই ছিল ১৭৭৫ সালে নির্মিত প্রথম ব্যাপটিস্ট চার্চ। অনিন্দ্য সুন্দর শিল্প কর্মের এক বিলাসবহুল নিদর্শন। এখান থেকে দক্ষিণ দিকে এগোলে আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যেত। কিন্তু তার মাঝেই এখনও সামান্য প্রাচীন রাস্তাঘাট ওখান থেকে পশ্চিমের দিকে নিচে নেমে গিয়েছে। সে সব রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে যেতে চার্লস দেখতে পেতো ভূতাত্ত্বিক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করেও টিঁকে আছে ঐতিহ্যময় ইষ্ট ইন্ডিয়া শাসনের নানা চিহ্ন। যেখানে কোন এক সময়ে সুপ্রাচীন জল পথে নানা ভাষাভাষি মানুষের আনাগোনা ছিল। এখনো দেখা যায় সেই বন্দরগাহর ক্ষয়ে যাওয়া রুপ। এখানে ওখানে ঝুলে আছে স্মৃতি উস্কে দেওয়ার মতো সব জাহাজী ঝাড় লণ্ঠন। প্যাকেট, বুলিওন, গোল্ড, সিলভার, কয়েন, ডাবলুন, সোভারিন, গিলডার, ডলার, ডাইম এবং সেন্টের মতো নানা শব্দ আজও যেন ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে বাতাসে এরকমটাই মনে হতো চার্লসের।

সময়ের সাথে সাথে ওয়ার্ড উচ্চতায় যেমন বাড়লো তেমনি বাড়লো তার সাহসের মাত্রা। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর সাথে সাথেই যে ঢুকে পড়তো ভাঙা চোরা ঘরবাড়ীর ভেতরে... ভাঙ্গা জাহাজের অভ্যন্তরে ... উঠে যেত বা নেমে পড়তো ভগ্ন দশাপ্রাপ্ত সিঁড়ির ধাপ ধরে ... গিয়ে দাঁড়াতো ছাদের গায়ে অবস্থিত দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া রেলিং-এ... দেখে বেড়াতো বলিরেখাগ্রস্থ মানুষের মুখ এবং আঘ্রাণ করতো অজ্ঞাত নামহীন সব গন্ধদের যা ভেসে আসতো দক্ষিনের বাতাসে। ঘুরে বেড়াতো সেই সব প্রাচীন বন্দরে যেখানে আজও ছুঁয়ে যায় উপসাগরের জল। ভেসে আসে নানা প্রান্তের জলযান। আবার ফিরেও যায় উত্তরের দিকে। পেছনে ফেলে যায় গ্রেট ব্রীজের বিস্তৃত বর্গক্ষেত্র আকারের এলাকা এবং ঢালু ছাদওয়ালা ১৮১৬ সালের গুদামঘর। ওদের কাছেই দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ১৭৭৩ সালের মার্কেট হাউস তার প্রাচীন খিলানগুলোকে নিয়ে । গ্রেট ব্রিজের এই বর্গাকার স্থানটিতে দাঁড়িয়ে চার্লস প্রাচীন শহরের বিস্ময়কর সৌন্দর্য পান করতো মন প্রাণ ভরে। দূরে পূর্ব দিকে শহরের গায়ে আপন মহিমায় অবস্থান করতো দুটো জর্জিয়ান ত্রিভুজাকৃতি চুড়া। যার সাথে ছিল সুবিশাল নতুন খৃস্টান সায়েন্সডোম। এ যেন সেন্ট পল লন্ডনকে মুকুট দ্বারা ভূষিত করেছেন। বেশিরভাগ সময়ে বিকেলের শেষ ভাগে এখানে আসতে পছন্দ করতো চার্লস। দিনের শেষ ভাগের তির্যক সূর্যালোক মার্কেট হাউসকে স্পর্শ করতো। সোনালী আভা মেখে আভিজাত্যের সাথে বসে থাকতো প্রাচীন পাহাড়, অট্টালিকার ছাদসমূহ এবং ঘণ্টাঘরগুলো। স্বপ্নের এক ঘূর্ণিঝড় যেন বয়ে যেত এলাকা জুড়ে। এই সেই সময় যখন প্রভিডেন্স বন্দরে ভারতীয় নাবিকেরা অজানা সুর তুলে জলে নামিয়ে দিতো নোঙর। যতক্ষন না চোখে সব কিছু ঝাপসা হতে শুরু করতো চার্লস ওখানেই থাকতো। তারপর ফিরে যেতো বাড়ির দিকে ঢালু পথ ধরে পুরানো সাদা গির্জা পেছনে ফেলে। দূরে অন্ধকারে তখন জানলায় জানলায় ঝিক মিক করে উঠতে শুরু করেছে হলদে আলোর ঝলক। আর উঁচুতে ঘুলঘুলির ফাঁকগুলো দিয়েও মিটমিটে আলোরা তাদের দৃষ্টি মেলছে। সে সব আলোর ছটা অদ্ভুত রকমের সব রট আয়রনের রেলিং-এ প্রতিফলিত হচ্ছে পাহাড়ের নানান ধাপে।

এর পরবর্তী সময়ে এবং পরের বছর গুলোতে চার্লস অজানা অচেনা আরও অনেক কিছুর খোঁজ করে বেরিয়েছে নিজের খেয়ালে। কখনো সে হেঁটে চলে গেছে তার বাড়ির উত্তরপশ্চিমের ভাঙা ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলির মধ্যে, যেখানে পাহাড় নেমে গেছে স্ট্যাম্পার হিলের নীচু এলাকায়। ওখানে যত রাজ্যের নিম্ন শ্রেনীর মানুষের বস্তী এবং নিগ্রোদের বসবাস। বিপ্লবের আগে এখান থেকেও বোস্টন স্টেজ কোচগুলো তাদের যাত্রা শুরু করতো। আবার কখনো সে চলে যেতো দক্ষিণপূর্ব প্রান্তের জর্জ, বেনিভোলেন্ট, পাওয়ার এবং উইলিয়ামস স্ট্রিটের দিকে। যেখানে প্রাচীন ঢালের গায়ে প্রাচীন অট্টালিকার সারি, প্রাচীর ঘেরা বাগান এবং সবুজ ঘাসে রাস্তা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে আগের মতোই। অনেক স্মৃতির সুগন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে এই এলাকায়। এই বাধাবন্ধনহীন খামখেয়ালী পদচারনা, তারই সাথে অবশ্যই প্রাচীনকালের সাথে সম্পর্ক যুক্ত বিভিন্ন লোক কথার মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ই সম্ভবত একটা বড় কারণ যা চার্লস ওয়ার্ড এর মন থেকে আধুনিক বিশ্বের খবরাখবরকে মুছে দিয়েছিল। ১৯১৯-২০ সালের শীতকালে চার্লসের মনের মধ্যে প্রাচীন কালের বীজ প্রোথিত হয়ে যায়। আর তার থেকে যে মহীরুহের জন্ম হয় তা বড়ই অদ্ভুত এবং ভয়ানক ফল প্রদান করে । প্রাচীনকালের ধ্বংসাবশেষের প্রভাবে সেও যেন এক প্রাচীন মানুষে পরিণত হয়।

ডঃ উইলেট নিশ্চিত যে, এই অদ্ভুত শীতকালের আগে অবধি চার্লস ওয়ার্ডের প্রত্নতাত্ত্বিকতা বিষয়ে অন্বেষন সব রকম ঊন্মাদনা থেকে মুক্ত ছিল। এর আগে পর্যন্ত ঐতিহাসিক মূল্য ছাড়া কবরস্থানের সেই অর্থে কোন বিশেষ আকর্ষণ ওর কাছে ছিল না কোন রকম হিংস্র বা বর্বর প্রবৃত্তির আচরণের চিহ্ন মাত্র এর আগে কোনও দিন ওর ভেতরে দেখা যায়নি। অথচ ওই শীতকালের পরেই চার্লসের কুত্সিত আচরণের সূচনা হয়। আর এসবই শুরু হয়েছিল এক প্রাচীন পূর্বপুরুষের খোঁজ পাওয়ার পর পরই। তাঁর মায়ের পূর্বপুরুষদের মধ্যে জোসেফ কারওয়েন নামে এক জনের কথা জানতে পারে চার্লস। যিনি এক দীর্ঘজীবী মানুষ ছিলেন। ১৬৯২ সালের মার্চে সালেম থেকে তার আগমন হয়েছিল। মানুষটার সাথেই এসেছিল তার সম্বন্ধে প্রচলিত অনেক অদ্ভুত অবিশ্বাস্য পিলে চমকানো কাহিনী। গুজব না সত্যি তা জানা না থাকলেও মানুষ সে সব নিয়ে প্রায়শই কথা বলতো।

চার্লস ওয়ার্ডের অতি অতি বৃদ্ধ মাতামহ ওয়েলকাম পটার ১৭৮৫ সালে জেমস টিলিংঘাস্ট এবং মিসেস এলিজার কন্যা জনৈকা অ্যান টিলিংঘাস্টকে বিবাহ করেন। যদিও জেমসের পিতৃত্বের কোন প্রমাণ নাকি ছিল না পারিবারিক রেকর্ডে। ১৯১৮ সালের শেষের দিকে শহরের তথ্য নথিভুক্ত করনের এক পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করার সময় তরুণ চার্লস একটি বিষয় আবিষ্কার করে। দেখতে পাওয়া যায় পাণ্ডুলিপির ভেতরে পাওয়া যায় দুটো পাতা ইচ্ছাকৃত ভাবে আঠা দিয়ে আটকে রাখা আছে। শুধু তাই নয় পৃষ্ঠা সংখ্যাও বদলে দেওয়া হয়েছিল সুচতুর ভাবে। সাবধানে তাকে খোলার ব্যবস্থা করে সে। এর থেকে জানা যায় ১৭৭২ সালে একটি আইনসম্মত বৈধ নাম পরিবর্তন করার ঘটনা ঘটেছিল। মিসেস এলিজা কারওয়েন, জোসেফ কারওয়েনের বিধবা স্ত্রী তার সাতবছর বয়সী কন্যা অ্যান, কারওয়েন পদবী ত্যাগ করে টিলিংঘাস্ট পদবী গ্রহণ করছেন। কারণ হিসাবে জানানো হয়েছে যে মিসেস এলিজার স্বামীর নামের সাথে এমন এক অপমানজনক খবর ছড়িয়ে পড়েছে যা তার মৃত্যুর পর জানা গেছে। যা নিশ্চিতভাবেই একটি অদ্ভুত রকমের প্রচলিত গুজব, তবুও এই সন্দেহের সম্পূর্ণভাবে নিরসন না হওয়া পর্যন্ত উনি নিজেকে কারওয়েনের বৈধ স্ত্রী রূপে বিবেচনা করবেন না।

এর সাথে সাথেই চার্লস ওয়ার্ড স্পষ্ট বুঝতে পারে যে সে প্রকৃতপক্ষে তাদের বংশের এমন এক অজানা মানুষের খোঁজ পেয়েছে যে তার অতি অতি বৃদ্ধ মাতামহ। এই আবিষ্কার চার্লসকে দারুন ভাবে উত্তেজিত করে দেয়। কারণ সে ইতিমধ্যেই নানান অস্পষ্ট রহস্যময় কথা বার্তা শুনেছিল এই ব্যক্তিটির সম্পর্কে। মানুষটার সম্পর্কে এত কম তথ্য পাওয়া যায় যে চার্লসের মনে হয় কোন বিশেষ কারণে জনসাধারণের মন থেকে মানুষটার নাম মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যেন এক ষড়যন্ত্র। পুরো বিষয়টার এমন এক চরিত্র উদ্ঘাটিত হয় যেখানে যে কোনও মানুষ একটু কৌতূহলী হয়ে পড়বেই। জানার ইচ্ছে জাগবে কি এমন কারণ ছিল যাতে তৎকালীন উপনিবেশিক নথিকার লেখকেরা একে গোপন করার এবং ভুলে যাবার জন্য এতটাই উদগ্রীব ছিলেন। বা সন্দেহ জাগবে এসব করার পেছনের বৈধ কারণ কি ছিল।

এর আগে অবধি, ওয়ার্ড প্রাচীন কালের মানুষ জোসেফ কারওয়েন বিষয়ে তত গুরুত্ব দিয়ে কিছু ভেবে দেখেনি। কিন্তু যখন জানতে পারলো রোমাঞ্চকর চরিত্রটির সাথে তার একটা সম্পর্ক আছে তখন যেভাবে সম্ভব সেই গোপন ইতিহাস খুঁজে বার করার জন্য মেতে উঠলো। আর এই উত্তেজনাকর প্রচেষ্টায় তার প্রাপ্তির মাত্র হলো দারুন রকমের। পুরাতন চিঠিপত্র, ডায়েরি, এবং অপ্রকাশিত স্মৃতিচারন কাহিনীর নানা সম্ভার সে খুঁজে পেলো মাকড়শার জালে ঢেকে থাকা প্রভিডেন্স এর বেশ কিছু পুরনো চিলেকোঠায় এবং অনেক গোপন স্থানে। যে সব নষ্ট করে দেওয়ার কথা তৎকালীন সময়ে সেগুলো যারা লিখেছিলেন তারা চিন্তা করেননি। আরো এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগৃহীত চার্লস পেয়ে যায় দূরবর্তী নিউ ইয়র্ক এর এক প্রান্তিক এলাকা থেকে। ওখানে ফ্রন্সেস ট্যাভারন এর মিউজিয়ামে রোড আইল্যান্ডের ঔপনিবেশিক যোগাযোগ বিষয়ক কিছু তথ্যাদি সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কারণ ডঃ উইলেটের মতানুসারে ওয়ার্ড এখান থেকেই সুনির্দিষ্ট উৎসরূপে জানতে পারে যে ওলনি কোর্টের ভাঙা বাড়িটির প্যানেলের পিছনে কিছু আছে। যা সে খুঁজে বার করে অগাস্ট ১৯১৯ সালে। আর এটাই হয়ে দাঁড়ায় হিসাববিহীন অন্ধকার জগতের রাস্তায় প্রবেশ পথের দিশা।


(ক্রমশঃ)

অলংকরণ : নীলাদ্রি ভট্টাচার্য্য

পাঠকেরা যা পড়ছেন