দুই চাকা

অনিন্দ্য রাউৎ



বিপ্রতীপের সাইকেলটা চলে ঘটাং ঘট, ঘটাং ঘট শব্দ করে। সকালে যখন ও বাড়ি থেকে সাইকেলটা নিয়ে বেরোয় তখন আশপাশের সবাই টের পায়, বিপ্রতীপ যাচ্ছে। এই মফঃস্বলে সব মানুষই প্রায় একে অপরকে চেনে। অদ্ভুতভাবে তাদের সকলেরই কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। কারোর কথা বলায়, কারোর হাঁটা চলায়, কারোর হাঁকডাকে, কারোর অঙ্গভঙ্গিতে। বিপ্রতীপের সেরকম কোনো বৈশিষ্ট্য নেই, তাই হয়তো এই সাইকেলটাই ওকে চিনিয়ে দেয় আলাদা করে। সাইকেলটা ওর বাবার ছোটবেলার। এত পুরনো সাইকেলটা পাল্টানোর কথা ভাবে ও প্রায়ই। কিন্তু অতটা টাকা তো ওর কোনো মাসেই জমে না। তাই মাঝে মাঝেই সারাতে পারে শুধু সাইকেলটা। কিন্তু সারিয়ে বিশেষ লাভ হয় না, ঘুরে ফিরে আবার খারাপ। এত বছরের খাটনিতে সাইকেলটাও খুব নড়বড়ে হয়ে গেছে। সারাতে গেলে হারান প্রায়ই বলে ওঠে, “বিপু এই সাইকেল আর আনিস না। তুই আমার দোকান থেকে একটা সাইকেল নিয়ে যা। ৫০০ কম করে দেব।”

বিপ্রতীপ হাসে। ও জানে ও পারবে না। হয়তো পারতোও কিন্তু বাড়িতে বুড়ো মানুষটার খেয়াল আর শখ রাখতে টাকা আর জমে না।

সকালে ও যখন বেরোয় আলতো করে দরজা ঠেলে তখন খুব সচেতন থাকতে হয় ওকে, যাতে বাবার ঘুম ভেঙে না যায়। বাবা প্রতিদিন অনেক রাত অব্দি পড়াশোনা করে। নানা রকমের বই পড়া বাবার নেশা। রাত জেগে জেগে একই বই বারবার পড়ে। তবু রাতটুকুতে বাবার বই চাই। কোনোসময় অতিষ্ঠ হয়ে গেলে গ্লাস ছুঁড়ে ফেলে মাটিতে। বোঝায় নতুন বই পড়তে চায়। বিপু তখন নিজের মাইনে থেকে জমানো টাকাগুলো দিয়ে বই কিনে আনে। লাইব্রেরি থেকে আনতে পারে না, কারণ কোনো বই বাবার হাতে গেলে ওটাকে তো বাবার কাছেই থাকতে হবে। আসলে কেন জানি মানুষটা রাতে আর ঘুমোতে পারে না চাকরি যাওয়ার পর থেকে। বিপ্রতীপ যখন ক্লাস ইলেভেনে তখন হঠাৎই ওর বাবার চাকরিটা চলে যায়। বেশ কিছু জায়গায় ঘোরাঘুরি করেও কিছুদিন পর যখন বাবা চাকরি জোটাতে পারেনি, তখন মানুষটা ভেতর থেকেই ভেঙে গেছিলো। তারপর হঠাৎ স্ট্রোক আর পক্ষাঘাত শারীরিকভাবেও মানুষটিকে বিপর্যস্ত করে দেয় আর তার থেকেও বেশি মানসিকভাবে। বিছানাই সঙ্গী হয়ে যায় বাবার। বাবা আর কথা বলে না তখন থেকে। আকার-ইঙ্গিত, ওটুকুই। এর কিছুদিনের মধ্যে ওর জীবনের সবচেয়ে বড় সঙ্গী মা’ও কলতলায় পড়ে গিয়ে মারা যায়। বাবা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল সেদিন মায়ের শোয়ানো দেহ। চোখ থেকে অবিরত জল গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিল বালিশ। বিপুও কোনো অভিযোগ করেনি। ভেঙেও পড়েনি। চুপ থেকে শান্ত হয়ে সব কাজ করেছিল এক এক করে।

তারপরেই বিপু হয়ে যায় বাড়ির একমাত্র খুঁটি, আশ্রয়, সেই ১৭ বছর বয়সেই। বিপু যখন নদীর পাড় বরাবর কাঁচা রাস্তায় ঢিমে গতিতে সাইকেলটা চালায়, তখন মাঝে মাঝে এমনিই ওর মনে হয়, অবাক লাগে ভেবে যে দুঃখ, কষ্টগুলো কী নির্লজ্জের মতো আসে ওদের জীবনে। যেন অনাহুত অতিথি। আবার একইভাবে এই দুর্ঘটনা, দুঃখ, ভীষণ কষ্টগুলোই কীরকম যেন বাংলার ঋতু পরিবর্তনের মতো। যেন খুবই অবশ্যম্ভাবী, খুবই নিয়মিত।

“কিরে তিতু, তুই রেডি তো? আমি কিন্তু রেডি। ওদিকে শ্রমণাকে বলে রাখ, ১ ঘন্টার মধ্যেই যেন চলে আসে। আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না।”

“মা, তুমি তো…”

তিতলির কথায় পাত্তা না দিয়ে রূপাদেবী বলতে থাকেন, “তোর বাবা আবার আমায় বলে রেখেছে, তোকে তাড়াতাড়ি নিয়ে আসতে। আজ আবার ধীমানবাবুরা আইবুড়ো ভাত দেবে, তারপর আমাদেরও দেওয়ার আছে। অনেক জোগাড় করে রাখতে হবে। মালতিকে বলে রাখি এইবেলা। তুই রেডি হ।”

“মা, তুমি শুনবে না! তুমি তো বোঝো।”

“ঐ দেখ, ডাকাডাকি শুরু করেছে নীচ থেকে। আমি যে কতদিকে আর যাই! সবাইকে বলে রেখেছি মেয়ের সঙ্গে বেরোতে হবে পার্লারের জন্য, কিন্তু কে মনে রাখে! আর বিপুটাই বা কোথায় গেল? এসেছে ও? ওকে দিয়ে অনেক কিছু আনাতে হবে যে।”

তিতলি উঠে আসে বিছানা থেকে, মায়ের দু হাত চেপে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “কেন এরকম করছো তুমি? কেন এড়িয়ে যাচ্ছ? আমি এই বিয়ে করতে চাই না। বলেছিলাম তোমাদের। কেউই গা করছো না। ছোটবেলা থেকে বন্ধু বলে বিয়ে করতে হবে? দীপ ভালো ছেলে। কিন্তু আমি তো চাই না ওকে। আর যাকে চাই তার মুখ অব্দি দেখতে চাও না! কেন? বাবা একবারও কিছু শুনলো না। আর তুমিও আমায় এখন সাহায্য করবে না?”

“কি বলবো আমি? দেখ তিতু, সম্ভব নয়। এই পাড়ায় তোর বাবার এক সম্মান আছে। তোর বাবার কথাকেই অনেকে শেষ কথা হিসাবে মানে। সেখানে কারোর কোনো ইচ্ছের জন্য সেই মানুষের সম্মানটাকে আমি খর্ব করতে পারবো না। বাবা যখন চেয়েছে দীপের সঙ্গে তোর বিয়ে, তাহলে তাই হবে। এটুকু বুঝে নে।”

তিতলির দু চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল ঝরতে থাকে। মায়ের দিকে হাজার প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকে ও।

রূপাদেবী বেশিক্ষণ দেখতে না পেরে বেরিয়ে যান। “রেডি হয়ে নে।”

তিতলি চোখ মুছতে মুছতে ব্যালকনিতে আসে। ওর সমস্ত চাওয়া পাওয়াই ছোট থেকে বাবা মা পূরণ করে এসেছে আর আজ যখন জীবনের সবচেয়ে বড় উপহারটা চাইলো ও, তখনই না করে দিলো! কি করবে ও? কাল বিয়ের পিঁড়িতে বসে বাবা মা আর সবাইকে খুশি করবে না নিজে খুশি হবে? শেষ অব্দি যাই করুক, ও যে নিজেকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে তা তিতলি বুঝতে পারে। হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মোছে ও।

ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট শব্দ করে বিপুর সাইকেল ঢোকে। শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তিতলি দেখে বিপুকে। বিপু সাইকেল স্ট্যান্ড করিয়ে হাঁক দেয়।

“সোনামা, ও সোনামা। এসে গেছি। কি কি আনতে হবে বলো। আজ সাইকেলটার দশা আবার খারাপ। রিকশা করে যেতে হবে।”

রূপা দেবী বেরিয়ে আসেন। ফর্দ দিয়ে কিছু যেন বলে বিপুকে। তিতলি দোতলা থেকে ঠিক শুনতে পায় না।

বিপু বলে, “ঠিক আছে, আমি দোকানে দিয়ে আসি তাহলে। এখন শুধু এগুলো আনলেই হবে?”

তিতলি দেখে মা ঘাড় নেড়ে বলে, “হ্যাঁ, এগুলোই। এলে পর তোকে একটা জিনিস দেখাবো।”

মা হাসে। মা খুব ভালোবাসে বিপুকে। তিতলি জানে, ছোটবেলায় বিপুর মা আর ওর মা খুব ভালো বন্ধু ছিল। তাই এখন বিপুকে আগলে রাখে। বাবা সবদিকে খেয়াল না করলে অনেক বেশিই মাইনে পেত বিপু। তবুও বাবাকে লুকিয়ে মাঝে মাঝে মা টাকা গুঁজে দেয় বিপুর হাতে। বিপু বেশিরভাগ সময় ফিরিয়ে দিলেও সবসময় পারে না ওর মায়ের জেদের কাছে।

বিপু বেরিয়ে যায় সাইকেল নিয়ে। ও সরে আসে ব্যালকনি থেকে। পুরনো এক সালোয়ার বের করে। রেডি হতে হবে। সাজতে যেতে হবে। কাল যে ওর বিয়ে!

ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং। নদীর পাড়ের রাস্তা প্রায় শুনশান। হবে নাই বা কেন। রাত তো কম হয়নি। জ্যোৎস্নার রূপোলি আলোয় ধুয়ে গেছে চরাচর। নদীর ওপর যেন কোটি কোটি রূপো ছড়ানো। চিকমিক চিকমিক করছে। অন্য দিন হলে বিপ্রতীপ একটু সাইকেলটা থামিয়ে বসতো। কিন্তু এখন না। আজ যে ওর সাইকেল থেকে নামতেই ইচ্ছে করছে না। ও জোরে প্যাডেল শুরু করে। বিপ্রতীপ বড় খুশি। ও ভাবতেই পারেনি ওর জন্য সোনামা এই চমক রেখেছে।

ও যখন আজ রাশি রাশি বাজার করে বড়বাড়িতে পৌঁছায়, তখনই ওর নজর গেছিলো উঠোনে রাখা সাইকেলটার দিকে। ঝকঝকে তকতকে একটা নতুন হিরো সাইকেল। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ফুল ফুল নরম কভার লাগানো। ওখান থেকে আবার নানা রঙের সরু সরু লম্বা লম্বা ঝুরঝুরে সেলোফেন পেপার ঝুলছে। যেগুলো সাইকেল চললেই উড়তে থাকবে। উঁচু স্পঞ্জের কুশনওয়ালা সিট। মাডগার্ড চকচক করছে। আর সর্বোপরি একটা বড় বেল। ওর সাইকেলে কোনো বেল ছিল না। ও টানে বিহ্বল হয়েই সাইকেলের কাছে পৌঁছে যায়। রূপাদেবী সেটা দেখতে পেয়েছিল। অল্প হেসে বললো, “কিরে বাজার করে আনলি, এগুলো কে তুলবে? আমি?”

ও চট করে জিভ কেটে বললো, “না, সোনামা। আমিই... আমি নিয়ে যাবো।”

বিপ্রতীপ সব ঘরে ঢুকিয়ে ঠিক ঠিক জায়গায় রেখে দেয়। এই ঘরের সব কোণ ওর নখের গোড়ায় চেনা। কোথায় কি থাকে সব জানা। আর এখন তো সব ঠিকঠাক করে রাখতেই হবে। কাল তিতুর বিয়ে। সব রাখা হলে ও সোনামার কাছে যায়।

“আজ কিন্তু অনেক কাজ। তিতু এখন পার্লারে। ও ফিরে আসার আগেই ঘরগুলো গুছিয়ে রাখতে হবে। তুই একটু নবারুণকে বলে রাখ। ওদিকে সাইকেলটা কোন দোকানে দিলি? আর হ্যাঁ, নাপিতকে বলেছিলিস তো?”

“হ্যাঁ, সোনামা। সাইকেলটা হারানের দোকানেই দিয়েছি।” বলে বিপ্রতীপ হাসে।

“হাসছিস কেন রে?”

“এত সবদিকে চিন্তা তোমার। সব ঠিক করে হয়ে যাবে ভেবো না।”

“বুঝতিস তুই পারুলটা বেঁচে থাকলে। মা’দের এমনিই অনেক চিন্তা হয়।”

বিপ্রতীপ শুনে চট করে মাথা নিচু করে ফেলে।

রূপাদেবী সেটা দেখতে পেয়ে বলেন, “আরে মায়ের কথা ভেবে সবসময় মন খারাপ করতে নেই। ভালোগুলো ভাববি। আর আমি তো আছি। এমন মন খারাপ করে রাখলে কিন্তু বাইরের সাইকেলটা পচাকে দিয়ে দেব।”

বিপ্রতীপ শুনে বোকার মতো তাকায় ওর সোনামার দিকে।

“হ্যাঁ রে, সাইকেলটা তোর। আমি আনিয়েছি আজ। পুরনো ওই ঘটাং ঘট সাইকেল তোকে আর চালাতে হবে না।”

বিপ্রতীপ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। “না সোনামা, আমি কি করে নেব?”

“দেখ পাকামি করিস না, তোকে সেভাবে কিছুই দিতে পারি না। সামান্যটুকু পড়াতেও পারলাম না তিতুর বাবার জন্য। আমি মরে গিয়ে ওপরে তোর মায়ের সঙ্গে দেখা হলে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হবে।” ও দেখে সোনামার চোখ ছলছল করে উঠেছে।

বিপু সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “সোনামা, তুমি না থাকলে আমরা বাবা ছেলে বাঁচতামই না হয়তো। কাকু যেটুকু দেয় মাসে তার ওপরেই তো বেঁচে আছি। আমি নেব সাইকেলটা। অনেক তাড়াতাড়ি কাজগুলো করতে পারবো। আর তুমি কেঁদো না। কাল না তিতুর বিয়ে। আমার জন্য তুমি...”

“তুই থাম। যে বিয়েতে মেয়ের মত নেই, সেই বিয়েতে কী আর ও খুশি হবে! কাল সব ভালোয় ভালোয় মিটলে হয়।”

বিপ্রতীপ জ্যোৎস্নাভরা নদী, ফাঁকা মাঠ, রায়দের বাগান পাশে রেখে এগোতে থাকে বাড়ির দিকে। ওর ইচ্ছে করছে সাইকেলটা নিয়ে অনেক জায়গায় পাড়ি দিতে। ও যেন একবার শুনেছিল কে যেন সাইকেল নিয়ে পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করেছে। এখন এই নতুন সাইকেল নিয়ে কী ও বেরিয়ে পড়তে পারে না সব দুঃখ, হতাশা, অতীত পেছনে ফেলে! পলকেই ভাবনা ভেঙে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও। না, ও পারে না। সাইকেলের গতি কমে যায়। রায়দের বাগানের পর বিশাল রায়দিঘি, এই হেমন্তেও জল টইটুম্বুর। দীঘির জলে লম্বা লম্বা গাছের ছায়া পড়েছে চাঁদের আলোয়। একটু দাঁড়ায় ও। জলের দিকে তাকায়। মা যখন বেঁচে ছিল তখন ওকে এই দীঘিতে নিয়ে আসতো, দুই পা দিয়ে ঝাপুস ঝুপুস করে সাঁতার কাটার চেষ্টা করতো ও আর মা ধরে রাখতো ওকে। ঐ হুল্লোড়ে ওর সঙ্গে মায়ের স্নানও হয়ে যেত। মা’র অবস্থা দেখে ও খুব হাসতো। মাও রাগ করে থাকতে পারতো না। ওর চোখটা জলে ভরে আসে। ভালোবাসার মানুষগুলো কেন চলে যায় একদিন? কেন এই নিয়ম? কেন এতটা অসহায় হয়ে কাটাতে হয় বাকি জীবনটা?

হঠাৎই সামনের অন্ধকার ফুঁড়ে আসা এক তীব্র আলোয় বিপ্রতীপের চোখ কুঁকড়ে যায়। আলোয় ধাঁধানো আর জলে ভরে থাকা চোখ কিছু দেখতে পেলো না, কিন্তু বুঝতে পারলো একটা গাড়ি ওর সামনে থেকে এসে ওকে পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। গাড়ি চলে যেতে ও চট করে পেছন ঘুরলো।

এই রাতে বড়বাবুর গাড়ি এখানে? কে ছিল?

বিপু বাড়ির বাকি কাজের লোকদের সঙ্গে নিয়ে এই বিশাল বাড়ি সাজালেও ও যখন সন্ধ্যেবেলা এই বড়বাড়িতে আসে, জমকালো আলোর বাহার দেখে ওর নিজেরই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সারা বাড়ি আজ সোনালী আলোয় মোড়া। কোথাও একটুকু অন্ধকার নেই, একটুকু দুঃখের ছায়া নেই যেন। আর হবে নাই বা কেন? বাড়ির একমাত্র মেয়ের বিয়ে। তিতুকে নিশ্চয়ই খুব সাজাবে আজ। ওর অনেক কাজ থাকলেও একবার সময় করে দেখতে হবে তিতুকে। তিতু আর ও যখন ছোট তখন ও মাঝে মাঝে তিতুর সঙ্গে খেলতো। বড়বাবু পছন্দ করতো না বিশেষ, তাই সীমারেখায় আটকে সেই খেলাও বন্ধ হয়ে গেছিলো। তবু স্মৃতি থেকে গেছে। তিতুর কিছু কী মনে আছে?

গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুনে বর্তমানে ফেরে ও। বিপু দেখে, সামনের বড় গেট আজ খোলা। কত গাড়ি ঢুকছে একের পর এক। ওকে আর বাড়ির কাজের লোকদের নির্দেশ দেওয়া আছে, যাতায়াত বাড়ির পেছনে সরু গেট দিয়ে করতে। বিপু সব ভাবনা সরিয়ে ভেতরের দিকে যায়।

সময় কিছুটা অতিক্রান্ত, বর এসে বসেছে পিঁড়িতে। দেখতে বেশ গোলগাল। তিতুর সঙ্গে ঠিক মানায় না। যাইহোক, তিতু ভালো থাকলেই হলো। তবে কাল যেন সোনামা কিসব বলছিল। তিতুর মত নেই নাকি। ভাবনাটা আসতেই ও সরিয়ে দেয়। না, ওকে এসব ভাবতে নেই। ওর এতটা অধিকার নেই। এসময় হরিকাকা কিসের জন্য যেন ডাকে ওকে। ও পিছু পিছু যায়। পাশের পাড়ায় বৃদ্ধ কিরণ নাপিতের বাড়ি। ওর বাড়ি থেকে কিছু জিনিস আনতে হবে। ও নতুন সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। সাইকেলে যেতে ১৫ মিনিটের পথ। ও কিরণ নাপিতের বাড়ি থেকে জিনিসগুলো নেয়। মনে মনে ভাবে, ধুস এসময়ই এসবের দরকার পড়লো? তিতু নিশ্চয়ই নেমে এসেছে। দেখতে পাবে কি একবার? দেখতে পাবে না কি ছোট্ট ভীতু মুখ করে থাকা তিতুকে আজ কনের সাজে কেমন লাগছে? তবে ভেতরের দিকে গেলে যদি আবার কোনো কাজ ধরিয়ে দেয়! না, একটু সময় চেয়ে নেবে। জীবনে তো বেশি কেউ নেই, যারা ওর কথা একটু হলেও ভাবে। তিতু সেই গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে একজন। অন্তত বিয়েটা ও দাঁড়িয়ে দেখতে চায়, হয়তো আর কোনোদিন দেখাই হবে না তিতুর সঙ্গে। সাইকেলের গতি বাড়ায়। বেশ তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। ছোট গেটটা পেরিয়ে সাইকেলটা স্ট্যান্ড করতে করতেই ও বুঝতে পারে কিছু ভুলভাল ঘটে গেছে। ও এগিয়ে যায়। দেখে চারিদিকে বেশ কিছুজন ছোটাছুটি করছে। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে। গুঞ্জন উঠেছে। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারে না ও এই ২০-২৫ মিনিটে কী হয়ে গেল? বাড়ির সবাই ঠিক আছে তো? ও এগোতে গিয়ে দেখে বড় গেটের বাইরে থেকে বড়বাবু আর দু চারজন ছুটে আসছে। ও মনে প্রশ্ন নিয়ে একটু এগিয়ে যায়।

বড়বাবু ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখ দিয়ে যেন জ্বলন্ত লাভা গলে গলে পড়ছে।

“তুই কোথায় ছিলি?”

“একটু বাইরে, ঐ কিরণ...”

বিপ্রতীপ কথা শেষ করতে পারে না, তার আগেই এক দুর্দান্ত আঘাত এসে পড়ে পেটে, ও মাটিতে পড়ে যায়। পেট ধরে ছটফট করতে থাকে। বুঝতে পারে না ঠিক কিভাবে ব্যাপারটা হলো। কে মারলো? পেট আর বুকের মাঝে শুধু তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। আর কোনো অনুভূতিই টের পাচ্ছে না। শ্বাসরোধ হয়ে আসছে যেন। এই কষ্ট কিছু ফিকে হওয়ার আগেই আরও কিল, লাথি, লাঠির প্রহার শুরু হয় ওর ওপর। অশ্রুসিক্ত চোখে ঠিক ঠাহর করতে পারে না তবে বোঝে বড় বাবু আর দুই তিনজন ওকে এলোপাথাড়ি ভাবে মারছে। এক দুটো কথা যন্ত্রণার বোধকে উপেক্ষা করে ওর মাথায় স্পন্দিত হয়।

“কোথায় তিতু… হারামজাদা? কোথায় রেখে এসেছিস? না বললে… মেরেই ফেলবো।”

একের পর এক আঘাতে বিপ্রতীপের শরীরের সমস্ত স্নায়ু যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। ও কথা বলতে চায়, জানাতে চায় চিৎকার করে যে ও কিছু জানে না, থেমে যেতে, ওকে আর মারতে না। কিন্তু কন্ঠ থেকে গোঙানি ছাড়া আর কিছুই বেরোয় না। এক মহিলার কন্ঠস্বরও ভেসে আসে। কান্নাযুক্ত আর্তি যেন। কিন্তু কি বলছে ওর বোধগম্য হয় না। ওর দেহের ছটফটানি ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। আর প্রতিটা মার তেমন গায়ে লাগছে না। একই তীব্রতা সৃষ্টি করতে পারছে না। সোনালী আলোয় মোড়া চারিদিক আবছা হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। কেন মারছে এরা? মানুষ নয় তাই কী? না, মারতেই থাকুক। ও আর বাধা দেবে না। সমস্ত প্রতিরোধ ছেড়ে দেয়। মারুক, আরো মারুক। ঘুম আসবে তারপর? বিপ্রতীপ ছেঁড়া জামা প্যান্টে বিধ্বস্ত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে। আজ রাতের ক্ষিদে আর পাবে না। ঘুমিয়ে পড়বে এবার ও। মা আসবে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে।

বিপ্রতীপ টের পায় আর ধস্তাধস্তি হচ্ছে না। কে যেন ওর মাথাটা তুলে নিচ্ছে হাতে করে। নরম কিছুতে শোয়ালো। কোল কী? হয়তো।

বিপু অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে, “মা, একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে?”

“বিপু, ও বিপু, আছিস নাকি বাড়ি? একটু বাইরে আসবি?”

বিপ্রতীপ খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাইরে আসে। এখনো কিছুক্ষণ বসে থেকে হাঁটলে পায়ে আবার ব্যথা হয়।

“আয়, বস হারান।”

বারান্দায় রাখা দুটো মোড়ায় বসে ওরা।

“কেমন আছিস তুই এখন?”

“ঠিক আছি। তোর দোকান কেমন? শুনলাম, বড় শোরুম খুলেছিস বাজারে?”

হারান মাথা নিচু করে। “না রে, তেমন কিছু না, গলির দোকানটাকেই বাজারে নিয়ে গিয়ে একটু সাজিয়েছি।”

“বাহ, ভালো।” বলে বিপ্রতীপ চুপ করে যায়। বাইরের দিকে তাকায়। দুদিন আকাশের মুখ গোমড়ার পর আজ একটু হাসি দেখা যাচ্ছে, পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়েছে ওর বারান্দায়।

“তুই এমন চুপ করে যাস কেন?”

“আমি তো কোনোদিনই তেমন কথা বলতাম না হারান। শুধু শুনতাম। শুনেছিলাম বোবাদের বেশি শত্রু নেই, তাও দেখ।” বিপ্রতীপ ওর পায়ের কালসিটে দেখায়।

“দেখ, কেউই তোর শত্রু নই। শুধু ঐ দিন...”

“আমি তো জানতে চাইনি, হারান। বল কি দরকারে এসেছিস?”

“না, তুই শুনতে না চাইলেও আমাদের বলতে হবে। নিজেকে এইভাবে সরিয়ে নিয়েছিস, যে আমরা ভেতরে মরে যাচ্ছি। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাড়িতে এলি, তারপর আর একবারও এলি না।”

বিপু মোড়ায় দুহাত ভর দিয়ে মাথা নিচু করে সামান্য। হারান বলে যায়।

“দেখ, তোর ক্ষতি কেউ চায়নি। তিতলি, বড়মা তো নয়ই, আমি বা হরিকাকাও নয়। তিতলি বিয়েতে রাজি ছিল না। কলকাতায় পড়াকালীন ওর ওখানে একজনের সঙ্গে ভাব ভালোবাসা হয়। নিচুবর্ণের ছেলে। তাই যেদিন বড়বাবু জানতে পারেন সেদিনই ওনার ছোটবেলার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করিয়ে দেন। ছেলেটিকে একবারও চোখেও দেখতে চাননি। বড়মা বড়বাবুর জেদের কাছে চুপ করে গেছিলেন। কিন্তু শেষ অব্দি তিতলির খারাপ অবস্থা দেখে আর থাকতে পারেননি। স্বামীকে বোঝাতে পারতেন না। তাই ঠিক করলেন, মেয়েকে পালাতে সাহায্য করবেন। কিন্তু নজর এড়িয়ে বের করা সহজ না। বড়গেট দিয়ে বের করা যাবে না। একমাত্র পথ গলির সরু গেট। একটু আলো আঁধারি থাকে। সেইখানে সাইকেলে করে বেরোলে অতটাও সন্দেহ থাকে না। কিন্তু পুরোপুরি সন্দেহ নিরসন করার জন্য বড়মা বলেন, তোর পুরনো সাইকেলটা ব্যবহার করতে। ঘটাং ঘটাং শব্দ শুনে সবাই ভাববে, তুইই যাচ্ছিস। কেউ আর অত নজর করবে না। তাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বড়মা বিয়ের আগের রাতে। তোর পুরনো সাইকেলটা আমার জিম্মায় ছিল। আমি যেন ওটাই সময়মতো পৌঁছে দিই। তারপর হরিকাকা তিতলিকে তোর সাইকেলে বসিয়ে ছেড়ে আসে স্টেশনে তুই ঐ সন্ধ্যেবেলা ঠিক বেরোনোর পরেই। ওখানে অপেক্ষা করছিল তিতলির প্রেমিক। সে তিতলিকে নিয়ে কলকাতায় যায়। ওদের বিয়েও হয়ে যায় তারপরের দিনই।”

হারান চুপ করতেই বিপু হোহো করে হেসে ওঠে। হাসির বেগ একটু থামতে ও জিজ্ঞেস করলো, “তোকে বড়মা এত গুছিয়ে বলেছে আমায় বলতে? আর কেন? সবাই খুব ক্ষমাপ্রার্থী?”

হারান কিছু বলে না। বিপু কিছু সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বলে, “জানিস, ভাবতাম কিছু মানুষ মন থেকে ভালো চায় আমার।”

“ভালো চাই রে আমরা, বিশ্বাস কর। তাই তোকে জানানো হয়নি। যাতে তুই যে তিতলিকে নিয়ে পালাসনি, তার সাক্ষী থাকে। বড়বাবু অব্দি কিরণ জেঠুকে সম্মান করে। আর সত্যিই তুই কিরণ জেঠুর কাছে গেছিলিস। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমরা বুঝতে পারিনি বড়বাবু অত তাড়াতাড়ি বুঝে যাবে তিতলির যাওয়াটা আর তোকেই সন্দেহ করে ওরকমভাবে মারবে। একটু বিশ্বাস কর আমাদের।”

“আচ্ছা।” বলে বিপু চুপ করে থাকে। ওর গলাটা বুজে আসছে। কান্না পাচ্ছে। বুকে একটা পাথর ভেঙে যেতে চাইছে।

“বড়মা আমায় অনেকবার বলেছেন যাতে তোকে নিয়ে যাই বা যাতে তুই যাস।”

এইসময় বাইরে কিছু কচিকাচা হাঁক দেয়, “বিপুদা আজ পড়াবে না?”

“তুই আজকাল পড়াচ্ছিস?” হারান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

বিপু ঢোঁকের সঙ্গে কান্নাটা গিলে কষ্ট করে বলে, “হ্যাঁ।”

“তাহলে, আমি উঠি। তোকে একটা জিনিস দেওয়ার ছিল। বাইরে একটা বাইক দাঁড় করানো আছে। ওটা তোর জন্য। পায়ের এই অবস্থায় বেশি সাইকেল চালাস না।”

বিপু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। “না, হারান তুই ওটা নিয়ে যা। স্টেশন থেকে যে পুরনো সাইকেলটা ঐদিন নিয়ে এসেছিলিস, এটাই অনেক। আর কিছু চাই না। তুই বাইকটা নিয়ে যা।”

“তুই এখনো ক্ষমা করিসনি আমাদের? প্লিজ রাখ এটা। বড়মা খুব কষ্ট পাবে না নিলে। আমরা সবাই। প্লিজ।”

“ক্ষমা করার অধিকার নেই আমার। অনেক দিয়েছিস তোরা সবাই।”

“তাহলে প্লিজ বাইকটা রাখ।”

বাচ্চাগুলো ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। বিপ্রতীপ কথা না বাড়িয়ে বলে, “আচ্ছা, বাইকটা রেখে যা।”

হারান খুশি হয়। মনে এক শান্তি পায়। “কোনো দরকার হলে আমায় বলিস বিপু।” বলে বারান্দা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়।

বিপ্রতীপ দেখে কচিকাচার দল বাইকটার চারপাশে ভিড় করেছে। ছোট্ট সুবীর বলে, “বিপুদা, বাইকটা তোমার?”

বিপু হাসে। “না রে। আমার না। শোন, আজ তোদের পড়াতে পারবো না। ঐ সেন্টারে যেতে হবে। কাল আসিস, কেমন?”

ছাত্রছাত্রীরা চলে গেলে ও কষ্ট করে বাইকটা বারান্দায় তুলে দেয়। ওকে এখুনি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে যেতে হবে। বিকেলের শিফটের ছেলেটা থাকবে না। ওকেই সামলাতে হবে। ভাগ্যিস রাজ্য সরকার এই সেন্টার খুলে নতুন ছেলে খুঁজছিল। আর সৌভাগ্যক্রমে ও পেয়েও যায় এই ছোট্ট চাকরিটা। না, বিপু আর দাঁড়ায় না। ভেতরে গিয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা বাবার পাটা ছুঁয়ে বেরোয়। বাইকটার পাশে রাখা ওর পুরনো সাইকেলটা বের করে ও। ও এই বাইকটা ততদিন চালাবে না যতদিন এর দাম বড়মাকে দিতে পারে।

সাইকেলের সিটে বসে ও। প্যাডেল ঘোরায়। হাঁটুতে ব্যথা হচ্ছে অল্প। একটা কটকট আওয়াজ হয় কেন জানি হাঁটুতে চলতে ফিরতে। সাইকেল চলতে শুরু করে, ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট।


অলংকরণ : প্রমিত নন্দী

পাঠকেরা যা পড়ছেন