ফুটবল

সাজিদ রহমান


তাসিন আজকাল সারাদিন ফুটবল নিয়েই থাকে। যেখানে যাবে ফুটবল থাকবে তার সাথে। অথচ বয়স বেশি কিছু না। বারো হবে। এর জন্য তার আম্মির কাছে দু'একবার মারও খেয়েছে। পড়ালেখায় সে খুব ভালো, ভালো সে ফুটবল খেলায়ও। ওরা থাকে ময়মনসিংহে। ওরা মানে তাসিন, সাথে আম্মি। ওর বাবা নেই। মানে আছে, তবে ওদের সাথে থাকে না। কখনও তাসিন তাই দেখেনি বাবাকে। বন্ধুরা যদি এই নিয়ে যখন প্রশ্ন করে, সে তখন শুধু তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে। কেন নেই, এই প্রশ্ন করে না সে ওর আম্মিকে। তারচেয়ে ফুটবল নিয়ে থাকতে ভালবাসে সে। কম কথা বলা এই ছেলেটা মাঝে মাঝে একদম চুপ হয়ে যায়...শুধু ভাবে আর বলের দিকে তাকিয়ে থাকে। দূর থেকে ওর আম্মি সবকিছুই দেখে, কিন্তু কিছুই বলে না। সে জানে তার ছেলের এই চুপ হয়ে থাকার কারণ। মানুষটাকে সে ভালবেসে বিয়ে করে ছিল। কী দোষ ছিল তার, সে কিছুই জানেনা। হটাত করে হারিয়ে গেল নিজের জীবন থেকে। সে জানে যে মানুষটা বেঁচে আছে, কিন্তু কোনওদিন মন চায়নি তার খোঁজ নিতে! বড় অপমানিত হয়েছে সে নিজের কাছে, ছোট হয়ে গেছে ছেলের কাছে। তাই ছেলেকে কী বলবে, কিছু খুঁজে পায় না। সে নিজেও কম কথা বলে। তাই হয়তো ছেলেটা সারাদিন বল নিয়ে থাকে, বলের সাথে কথা বলে।

তবে যে যাই বলুক, তাসিন বল খেলে ভালো, এতো সুন্দর পাসিং এবং ডিবলিং এই বয়সে আর কেউ করে কিনা, জানা নেই আম্মির। তাই সবসময় সে চেষ্টা করে, ছেলেকে একটা ভালো দামী বল কিনে দিতে। আপনজন বলতে কেউই নেই ওর। আসলে, আছে অনেকেই, তবে কেউ খোঁজখবর নেয় না। যদি পাশে দায়িত্ব এসে ঘাড়ে চেপে বসে! এই ভেবে হয়তো এড়িয়ে চলে। সে নিজে তো তাদের বাড়ি যায়ই না, তাসিনও ওদের চেনেন! তাই ফুটবল নিয়েও ছেলেটাকে আর কিছু বলে না। আম্মি চায়, ফুটবলেই তার ছেলের শূন্যতা পূরণ হোক।

আজ তাসিনের জন্মদিন। ঘুম থেকে উঠেই সে আম্মিকে বলল, ‘আমাকে ডিম দিয়ে ভাত দাও।’

‘ডিম কেন খেতে চাও সবসময়? আজ অন্য কিছু খাও। আজ তো তোমার জন্মদিন, ভুলে গেছ? তোমার জন্য মজার কিছু রান্না করেছি আজ, খেয়ে তোমার ভালো লাগবে।’

‘হ্যাঁ, আমি ভুলে গেছি। আমি শুধু ফুটবল ম্যাচের কথা মনে রাখি। বাদবাকি সব ভুলে যাই। কিছু মনে রাখতে চাই না, আর মজার কিছুও চাই না। ডিম আর বল চাই...দুটোই চাই।’

‘এভাবে কথা বলতে হয় না, তুমি তো অনেক বড় খেলোয়াড় হবে। বড় মানুষ হবে। তাই ভালো করে কথা না বললে, সবাই তোমাকে কী বলবে জানো? আর বল এবং ডিম দুটো আলাদা জিনিষ। একসাথে মেলালে কিছুই হয় না।’ হাসতে থাকে আম্মি।

‘হাসবে না! জানো আম্মি , বলকে আমার পানকোঁড়ির মতো লাগে...পানকৌড়ি যেমন জলের মধ্যে ডুবে ভাসে আমিও বলের মাঝে ডুবি ভাসি... শুধু ভাসি আর ডুবি, ডুবি আর ভাসি...মজা না আম্মি?’

‘মানে বুঝলাম না।’

‘বুঝবে বুঝবে। একদিন সব বুঝবে...আমাকে ভাত দাও তাড়াতাড়ি।’

‘না আজ আমি তোমাকে নিজ হাতে খাওয়াবো, আমি যা যা রান্না করেছি সবকিছু দিয়ে খেতে হবে। তারপর তোমার যেখানে যাওয়ার যাবে। তবে অবশ্যই দুপুরে তোমাকে আমি বাসায় দেখতে চাই। এটা আমার হুকুম। আমার কথা না শুনলে আমি সব কিছু বন্ধ করে দিব তোমার। তখন কিন্তু কিছু বলতে পারবে না!’

‘আমি জানি আম্মি তুমি কিছুই বন্ধ করতে পারবে না, তবে আমি দুপুরে চলে আসব। পাক্কা প্রমিজ।’

‘আর যদি না আস...’

‘আসব আম্মি, আসব, ইন শা আল্লাহ্।’

ভাত খেয়ে বল নিয়ে দিল ছুট তাসিন, আম্মি এতো ডাকল পানি খাওয়ার জন্য, কিন্তু কে শুনে কার কথা!

এখন আর সে কারও কথা শুনবে না। কথা হবে শুধু বলের সাথে, শুধু বল।

দুপুরে ওদের বাসায় কিছু মেহমান এলো, আম্মি তাদের দাওয়াত করেছে তাসিনের জন্মদিন উপলক্ষে কিন্তু এদিকে তাসিনের দেখা নাই। মাঝে মাঝেই এমন করে তাসিন। তখন খুব ভয় পায়ে আম্মি। প্রিয় মানুষটি তার জীবন থেকে হারিয়ে যাবার পর থেকে এই রকম এক ভয় লাগা কাজ করে সবসময়।

তাসিন সেটা বুঝে না। ছোট মানুষ, বুঝবেই বা কীভাবে! আম্মি চিন্তা করে রেখেছে, আজ বাসায় ঢোকামাত্রই ছেলেকে অনেক বকাঝকা করবে। আবার এ-ও ভাবে, পারবে কি তাকে বকতে ?

বিকেলে বাসায় ঢোকা মাত্র আম্মি কোনও কথা না বলে তাকে বাথরুমে নিয়ে গোসল করাল। গোসল শেষ হতেই সে আম্মিকে জড়িয়ে ধরল, ‘জানো আজ কি হইছে?’

‘আমি তোমার কোনও কথা শুনব না, তুমি কথা দিয়ে কথা রাখ নাই। আমারই ভুল হয়েছে তোমাকে আজ বাহিরে যেতে দেওয়া। ঘরের আটকে রাখলে ভালো হতো। আর আমী তোমাকে এখন ভাত খাইয়ে দিব। খাওয়া দাওয়া শেষ করে একদম ঘরে বসে থাকবে। কোনওখানে যাবে না। তুমি মাঝে মাঝে খুব বেশী বাড়াবাড়ি করো, যা আমার একদম পছন্দ না।’

‘আম্মি কথাটা কী বলবো? যা আজ হইছে!’

‘না, এখন তুমি খাও, খাওয়ার সময় কোনও কথা না।’

‘বলি না, বললে কি হবে?’

‘আচ্ছা বলো।’

‘শুনো, প্রথমে বলটা নিয়ে দিলাম ছুট, দুজনকে কাটিয়ে সামনে দেখি আর একজন! কিন্তু তাকে আর কাটাতে ভাল লাগলো না, বলটাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে আমিও ভেসে গেলাম, পাখির মতো করে...তার মানে গোল, জানো আম্মি, উড়তে ভাল লাগে আমার... ডুবতে ভাল লাগে আমার...পাখি হয়ে ওপর থেকে সবকিছু দেখতে মন চায়। তাই গোল দেয়ার পর বন্ধুরা যখন উপরে তুলে ধরে ভালো লাগে, অনেক ভালো লাগে!

আম্মি জানো কাল একটা জটিল খেলা আছে...’

‘জটিল মানে?’

‘জটিল হলো, বড় দলের সাথে খেলা। খেলাটাতে আমাদের জিততে হবে। আমি কি পারব আম্মি? আমি জানি পারব। জিতেই আনন্দমোহন কলেজের পুকুরে ডুব দিব। ডুব দিব আর ভাসব, ভাসব আর ডুব দিব। বলের সাথে আমি...হা...হা...হা...’

‘না তুমি আনন্দমোহন কলেজের পুকুরে যাবে না, আমার একদম পছন্দ না। তাছাড়া ভর দুপুরে ওই পুকুরে যাওয়ার কোনও দরকার নাই। খেলা শেষ করে সোজা বাসায় চলে আসবে। না হলে আমি তোমার এই বাইরে গিয়ে ফুটবল খেলা একদম বন্ধ করে দিব। কথাটা কিন্তু মনে রাখবে।

‘আম্মি তুমি আজ এরকম রেগে আছো কেন? ’

‘তুমি বুঝবে না’। আম্মি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।’

***

আম্মি এখন বসে আছে আনন্দমোহন কলেজের পুকুর ঘাটে। কতক্ষণ এভাবে বসে আছে সে জানেনা। সব কিছুর জানার বাইরে চলে গেছে সে। এখন আর কিছু জানতে এবং মানতে চায় না এই মন। সে দেখতে পাচ্ছে তাসিনের প্রিয় বল ভাসছে, তার ছেলের অনেক শখের বল! এমন তো হওয়ার কথা ছিল না, শুধু তার বেলায় কেন এমন হয়?

ডুবুরিরা, বন্ধুরা ডুবছে ভাসছে কিন্তু তাসিন! আম্মির কষ্ট হচ্ছে বলটি দেখে, প্রিয় বলটি তাসিন বিহীন ভাসছে, কোনদিন হয়নি এমন, কি জানি, এইভাবেই মনে হয় একা পথ চলা শুরু প্রিয় ফুটবলের!

অলংকরণ : প্রমিত নন্দী

পাঠকেরা যা পড়ছেন