শতরূপ সান্যালের DIARY ২


দ্বিতীয় পর্ব
ফাঁদ

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৫; রাত ২টো

ঘটনাটাই এমন না লিখতে পারা অবধি আমার গলাধঃকরণ করা প্রায় মুশকিল হয়ে উঠেছে। অফিস থেকে ফেরার পথে, চক্রবেড়িয়া লেনের বাঁকটা নিতেই কমলকাকুর বাড়ির সামনে অসম্ভব জটলা দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম। এ তল্লাটে চুপচাপ, শান্ত মানুষ বলতে তিনিই। পা চালিয়ে একটু দ্রুতই এগিয়ে গেছিলাম। সৌরভ আর মন্টু দাঁড়িয়ে ছিল কিছুটা দূরে। আমার দিকে চোখ পড়তেই ওরা মাথা নিচু করে নেয়। পাশ কাটিয়ে জটলা সরিয়ে এগোতেই দেখি- দুটো লোক ধরাধরি করে, কাপড়ে মোড়া একটা মানুষকে এম্বুলেন্সে তুলছে। অসম্ভব উৎকণ্ঠায় সদর দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকি। কাকু মাথায় হাত দিয়ে বসে। বিছানায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাকিমা, আমারই দিকে।

দীপ্র..?

সর্বনাশ! কিভাবে?

পরশুই তো কথা হলো ওর সাথে। অলিতে গলিতে ইঁট পেতে ক্রিকেট খেলা থেকে পাড়ায় রূপম আসার চরম উত্তেজনা সবেতেই শতরূপদা বলতে অস্থির। কি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে বলেছিলো, আমার প্রফেশনটা ওর দারুণ ইন্টারেস্টিং লাগে। ওরও এমন কিছু করার ইচ্ছে। মানে কোনো চার্মফুল জব। দশটা পাঁচটা ব্যাগ হাতে ছুটতে চায়না। কান মূলে দিয়ে বলেছিলাম আগে গ্র্যাজুয়েশন দে, তারপর ভাববি।

সাথে গেছিলাম। সবাই বলছিল, প্রেম ঘটিত কোনো কিছু হয়তো। দীপ্রকে দেখে কোনোদিন এতটা দুর্বল মনে হয়নি।

গলায় দড়ি?

ভাবতে পারছি না। মর্গের ডঃ অমল ভৌমিকের সাথে পরিচয় ছিল। বললেন, কোথাও আঘাত নেই। স্টমাকেও কোনো খাবার পাওয়া যায়নি। বাকিটা রিপোর্টে ডিটেলস-এ আছে। আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হবার পর তবেই কাল সকালে বডি পাওয়া যাবে। ভালো লাগছে না কিচ্ছু। কেমন একটা শিথিলভাব পেয়ে বসছে আমায়।


ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৫; রাত ১২টা বেজে ৩০মিনিট

বাড়ি হোক কিংবা পরিচিত বন্ধু কেউই বিশ্বাস করতে পারছেনা দীপ্র, দীপ্র চ্যাটার্জী এমন একটা কাজ করতে পারে। ম্যাথস্ অনার্স সেকেন্ড ইয়ার। যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত, মিশুকে মনোভাব। একমাত্র সন্তান। কাকু রেলে আছেন। তাই আর্থিক অসচ্ছলতা আছে একথাও বলা যাবে না। তবে? কারণটা কি! এই মুহূর্তে কাকিমাকে খোলামেলা যে কোনো কথা জিজ্ঞেস করবো এমন পরিস্থিতি বা অবস্থা কোনোটাই নেই।

তাবড় তাবড় ঘটনার মাঝে দীপ্র-র ঘটনাটা হয়তো কারো কাছে খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে তা নয়। এভাবে একটা জলজ্যান্ত মানুষ, কি করে! খটকা একটা লাগছে।

কাল মনে করছি, দীপ্র-র কলেজে যাবো।


ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৫; রাত ১১টা

তিস্তার নামটা, শুভ্র-র কাছে শুনেছিলাম। শুভ্র, দীপ্র-র ছোটবেলার বন্ধু। আমাদের পাড়াতেই থাকে। কলেজে তিস্তার সাথে দেখা করে যেটুকু জানলাম, তিস্তা আর দীপ্র-র বন্ধুত্ব খুব বেশিদিনের নয়। একসাথে একটা বছর। বন্ধুত্বটা স্বাভাবিকই ছিল। তবে লাস্ট ইয়ার শেষের দিকে, ডুয়ার্স বেড়াতে যাওয়ার পর থেকে দীপ্র, তিস্তাকে এড়িয়ে যেতে থাকে। সবসময় কেমন যেন আনমনা থাকতো। কলেজের অনেকের মুখেই তিস্তা শুনেছে দীপ্র নেশা করতো। অনেকবার জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কিছুই বলেনি দীপ্র।

স্ট্রেঞ্জ!

যে ছেলেটার কলেজের স্যার, বাড়ি এমনকি পাড়ার কারুর কাছে কোনোদিন নালিশের নোটিশ যায়নি। সে একটা এমন অপরিণত কাজ কি করে করে! কিছুই মাথায় ঢুকছে না আমার। সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

সেদিন কাকিমা আমার হাতটা ধরে বলেছিল, শতরূপ জানতে পারবে কেন তোমার ভাইটা এমন করলো? ও শুধু বলতো আমি শতরূপদার মতো হবো।


ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৫; রাত ৮টা

‘স্নো’, ‘ফ্লেক’, ‘ব্লও’ বিক্রির জন্য ধরা পড়েছে চারটি ছেলে। আপাতত ভবানীপুর থানার আন্ডারে। সবকটারই বয়স ২০ থেকে ২৩-এর মধ্যে। এজেন্ট মারফত ঢুকে পড়েছে ছাত্র চত্বরে। ও.সি. সৌম্যদীপ সরকার জাঁদরেল মানুষ। জয়েন করেছেন গত সপ্তাহে। ধরপাকড় তাই ঘন ঘন হচ্ছে। কিন্তু এদের নেটওয়ার্ক জবরদস্ত। মামা, কাকা, মেসোর ফোনে ছুটকারা পেতেই পারে। সৌম্যদীপ স্যার বলেছেন এমনটা হবার নয়। বাপ, ঠাকুরদাদা যে যেখানেই থাকুক বেল পাওয়া মুশকিল।


২রা মার্চ, ২০১৫; রাত ১০টা ১৫মিনিট

দীপ্র বাজার থেকে প্রায় লাখ-খানেক টাকা ধার করেছিল। প্রাইভেট টিউটরের আগাম মাইনা নিয়েছিল ৬ মাসের, কাকিমার কাছ থেকে। ধারণার বাইরে ছিল বিষয়টা। চারদিক থেকে পাওনাদারের চাপ আস্তে শুরু করেছিল, এদিকে নেশার জেদ শরীরে গেঁথে বসেছিল।

প্রতুল নামে একটা ছেলে ধরা পড়েছে। উগড়েছে অনেক কথাই।

ড্রাগস্ দালাল ব্যবসায়ীরা প্রথমেই ভদ্র ঘরের ছাত্র-ছাত্রীদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে এবং এর জন্য তারা কোনো কোনো সময়, মেন ডিলারদের কাছ থেকে অনেক বেশি টাকার মুনাফাও পায়-এমন করে তারা। সাধারণ যুবক-যুবতীদের প্রথমে অন্যান্য সুখকর দুর্বল বিষয় সমূহের প্রতি আকর্ষণ করে উপকারী ঔষধ বলে খুবই অল্পদামে বিক্রি করে (যাকে ক্র্যাক কোকেন বলে এবং বেশিরভাগ ধূমপানের মতোই) পরে চড়া দামে দিয়ে উক্ত আসক্তকারী ওদের কাছ থেকে ড্রাগ কিনে নেয়। এভাবেই পৃথিবীর সেরা শহরগুলোতে বিশাল একটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ওরা দখল করে নিয়েছে।

কথাগুলো লিখতে লিখতে, নিজের উপরই নিজের একটা ঘৃণা জন্মাচ্ছে। আমি বা আমরা বাস করছি এমন একটা সমাজে যেখানে দীপ্র-র মত ভদ্র পরিবারের ভালো ছেলের জীবন, কিভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে? শহুরে স্মার্ট মানসিকতায় কিভাবে ঢুকে পড়েছে বিষ। যা আমাদের তিল তিল করে খৈয়ে দিচ্ছে। পচন ধরাচ্ছে গোটা ভিতকে। রেজাল্ট, নম্বর, শতাংশের সেখানে কোনো ভূমিকা থাকে না। নাহলে পাওনাদারদের তাগিদ থেকে বাঁচতে, শুধু নেশার জন্য মরে যেতে হলো দীপ্র-কে। একবারও ভাবলো না কাকু, কাকিমা কোন মুখ নিয়ে সমাজে দাঁড়াবে!

পুলিশ কাস্টডিতে ধরা পড়া ওই চারটি ছেলে কিংবা প্রতুলের মতো ছেলেগুলোর কি শাস্তি হবে বা হতে পারে তা হয়তো রাজনীতির আড়ালে। বড়জোর একবছর থেকে দশ বছর জেল। তার বেশি কি? আবার অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হঠাৎ বেলও হয়ে যেতে পারে। কতটা ঠেকাবেন সৌম্যদীপ সরকার?

কিন্তু আমি কি কখনো কাকিমার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারবো, ‘কাকিমা, দীপ্র অন্যায় করেনি? কোনো দোষ করেনি?’ হয়ত মাথা নিচু করে চলে যাবো পাশ কাটিয়ে। দীপ্র, নিজের সঙ্গে সঙ্গে আমাকে এমন একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন করলো, যার থেকে একটা কথাই উঠে আসে, ‘লজ্জা’!

কারুর মত হয়ে উঠতে না পেরে দীপ্র পারতো না নিজের মত করে সত্যিকারের মানুষ হতে? অন্তত তেমনটাই তো ওর অভিভাবক চেয়েছিল।


(নাহ, কোনো টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার দৃশ্যপট নয়, বিষয়ের সামগ্রিক মিল বাস্তবের সাথে। কিছু কাল্পনিক। কলম আপাতদৃষ্টিতে সেটাই বলছে, তাই শতরূপ সান্যালের পরবর্তী কলমকথার অপেক্ষা করতেই হচ্ছে)

(ক্রমশঃ)

অলংকরণ - মৈনাক দাশ

পাঠকেরা যা পড়ছেন