দ্বিতীয় অধ্যায় এক প্রাচীন ঘটনা এবং একটি আতঙ্ক

দ্বিতীয় অধ্যায়
এক প্রাচীন ঘটনা এবং একটি আতঙ্ক



দ্বিতীয় অধ্যায়- প্রথম পর্ব

মানুষটার সম্পর্কে প্রচলিত কিংবদন্তি, যেমনটা চার্লস শুনেছিল এবং যেসব তথ্য সে খুঁজে বার করে তার ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে জোসেফ কারওয়েন এক অত্যন্ত বিস্ময়কর, রহস্যময়, এবং ভীষণ রকমের ভয়ানক প্রকৃতির ব্যক্তি ছিলেন। এমন একটা সময়ে সালেম থেকে প্রভিডেন্সে পালিয়ে এসেছিলেন মানুষটা যখন ডাইনী চর্চার গুজব ওখানে ছড়াতে শুরু করেছিল ব্যাপকভাবে। কারওয়েনের চলে আসার প্রধান কারণ তার নানাবিধ উৎকট রাসায়নিক বা অপরসায়ন গবেষণা। যার জন্য চারদিক থেকে অভিযোগ উঠছিল। এদিকে প্রভিডেন্সের এলাকা ছিল সব রকম অদ্ভুত, উদ্ভট এবং অতিরিক্ত মাত্রায় স্বাধীন মানসিকতার মানুষদের আশ্রয়স্থল- মুক্তাঞ্চল। সে সময় তার বয়স দেখে মনে হতো মোটামুটি তিরিশ। গায়ের রঙ ফ্যাকাশে। বিদ্যেবুদ্ধির জোরে খুব শীঘ্রই একজন কেউকেটা রূপে নিজেকে সবার সমানে মেলে ধরেন এবং প্রভিডেন্সে বসবাস করার যোগ্যতা লাভ করেন। এরপরে ওলনি স্ট্রিটের পাদদেশে গ্রেগরি ডেক্সটারের বাড়ীর উত্তর দিকে একটি বাড়ি কিনে নেন। বাড়িটা ছিল টাউনস্ট্রিট এর স্ট্যাম্পারস হিলের পশ্চিমে। পরবর্তী সময়ে যা ওলনিকোর্টের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ১৭৬১ সালে উনি ওই একই জায়গায় আগের বাড়ীটাকে ভেঙে আর একটা বড় ভবন নির্মাণ করেন। যা এখনও দেখতে পাওয়া যায়।

জোসেফ কারওয়েন সম্পর্কে প্রথম যে অদ্ভুত ব্যাপারটা মানুষের চোখে পড়ে তা হলো তার প্রভিডেন্স আগমনের পর থেকে বেশ কয়েক বছর কেটে যাওয়ার গেলেও বয়ঃবৃদ্ধির কোনো ছাপ তার শরীরে দেখা যায় না।

শুরু করেন জাহাজি ব্যবসা। কিনে নিয়েছিলেন মাইল-এন্ড কোভের একটা জাহাজ ঘাটা। ১৭১৩ সালে গ্রেটব্রিজ পুনর্নির্মাণে সাহায্য করেন। ১৭২৩ সালে পাহাড়ের উপর কংগ্রেগ্রেসন্যাল চার্চ প্রতিষ্ঠাতাদের দলে থাকেন। এতোগুলো বছর কেটে যাওয়ার পরেও কিন্তু উনাকে দেখে ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ বছরের বেশী বয়স্ক বলে কখনোই মনে হয়নি। কয়েক দশক ধরে একই অবস্থা বজায় থাকায় নিশ্চিতভাবেই ব্যাপারটা মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। যার এর উত্তরে কারওয়েন সর্বদা একই কথা বলেছেন। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন খুব শক্ত পোক্ত কাঠামোর মানুষ এবং তিনি নিজেও খুব নিয়মনীতি মেনে জীবনযাপন করেন বলেই তার শরীরে বয়সের ছাপ পড়ে না। ঠিক কি ধরনের সরল এবং নিয়মে বাঁধা এই জাহাজি বণিকের জীবনযাত্রা তার অস্পষ্ট ছবিও শহরের কেউ কল্পনার চোখে আন্দাজ করতে পারতো না। যেমন বুঝতে পারতো না কেন সারা রাত ধরে কারওয়েন ভবনের সব জানালায় মিটমিট করে আলো জ্বলে। স্বাভাবিকভাবেই এইসব কারণেই তার দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকা এবং শারীরিক পরিবর্তন না হওয়া নানান গুজবের জন্ম দেয়। এইসব রটনার বেশীর ভাগ অংশে থাকতো কারওয়েনের অবিরাম রাসায়নিক পরীক্ষা নিরীক্ষার গল্প। গুজব অনুসারে উনি নাকি তার জাহাজে করে লন্ডন এবং ইন্ডিজ এলাকা থেকে বিভিন্ন অদ্ভুত পদার্থ আনাতেন। সেসব জিনিষ কেনা হতো নিউপোর্ট, বস্টন এবং নিউইয়র্কের নানান বন্দর থেকে। ইত্যবসরে রেহোবথ থেকে এসে বৃদ্ধ ডাঃ জ্যাবেজ বোয়েন গ্রেটব্রিজের কাছে ইউনিকর্ন এবং মর্টারের সাইনওয়ালা বোর্ড টাঙিয়ে তার ঔষধের দোকান খুলে বসেন। আর সেই দোকানে কারওয়েনের অত্যধিক আনাগোনা জনগণের নজরে পড়ে। সাথেই গাদা গাদা মাদকদ্রব্য, অ্যাসিড এবং জানা অজানা ধাতু অবাধে কেনেন এবং অর্ডার দিয়ে আনানোর ব্যবস্থা করেন। মানুষজন ধরেই নেয় কারওয়েন নিশ্চিতভাবেই বিশেষ কোনো অদ্ভুত এবং গোপন চিকিৎসা দক্ষতার অধিকারী। অতএব সাহায্য লাভের আশায় বিভিন্ন প্রকারের রোগগ্রস্থ মানুষ ধরনা দিতে শুরু করে তার প্রাসাদে। এসবে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে উনি আগতদের বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখার পথেই হাঁটেন এবং তাদের অনুরোধকে সম্মান দিয়ে সবসময় এক অদ্ভুত রঙের তরল ওদের দিতেন সেবন করার জন্য। যদিও সে পানীয় খেয়ে কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি হয়নি। এভাবেই কারওয়েনের আগমনের পর থেকে পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলো। বাকিদের বয়স বাড়লেও জোসেফ কারওয়েনের মুখাবয়ব এবং বাহ্যিক চেহারার বয়েস বাড়লো সাকুল্যে পাঁচবছর। এবার মানুষের আলোচনার ফিসফিসানি কল্পনার পাখা মেলে ক্রমশ অন্ধকার শয়তানি জগতের সাথে এর সম্পর্ক জুড়তে শুরু করলো। যার ফলেই উৎসাহী মানুষের অর্ধেকেরও বেশি ক্রমশ এক অজানা আতঙ্কে কারওয়েনের কাছ থেকে দূরে থাকাই সম্যক বোধ করলো। ঠিক এরকম একাকীত্বর বাসনাই কারওয়েন মনে মনে কামনা করতেন।

সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা নানান চিঠি এবং ডায়েরি থেকে বোঝা যায় যে, আরো অনেক কারণেই জোসেফ কারওয়েনকে দেখে মানুষ আশ্চর্য হয়ে যেতো ,ভয় পেতো এবং প্রায় প্লেগ রোগের মতো ঘৃণাও করতো। কবরস্থানের প্রতি মানুষটার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। যে কোনও দিনে যেকোনো সময়ে তাকে একবার না একবার কবরখানায় দেখা যেতই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এরকম জায়গায় কাটানোর কারণে তার নামটার সাথে একটা ভয় জাগানো কুখ্যাতির ছাপ পড়ে গিয়েছিল। যদিও কেউ এটা বলেনি যে কবরখানায় কোন রকম অদ্ভুত বা ভয়ানক প্রেতচর্চা জাতীয় কিছু ঘটাতে তারা দেখেছে কারওয়েনকে। পটুয়েক্সট রোডে তার একটা খামার ছিল। যেখানে সাধারণত গ্রীষ্মের সময় উনি বসবাস করতেন। ওই এলাকায় তাকে দিন বা রাতে যে কোন সময়ে প্রায়ই ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। এই খামারের দেখাশোনা করতো ন্যারাগ্র্যান্সেট ইন্ডিয়ান উপজাতির দুজন বয়স্ক মানুষ। স্বামী স্ত্রী। স্বামী মানুষটা বোকা ধরনের দেখতে, সাড়া মুখে অদ্ভুতভাবে কাটাকুটির দাগ এবং বোবা। স্ত্রী এর মুখাবয়ব ততোধিক হতকুৎসিত। হয়তো নিগ্রো রক্তের প্রভাব। এই বাড়ির সাথেই ছিল এক ল্যাবরেটরি। যেখানে বেশিরভাগ রাসায়নিক পরীক্ষাগুলো করা হতো। সেই সব মানুষ যারা এখানে বোতল, ব্যাগ বা বাক্স জাতীয় মালপত্র ডেলিভারি দিতে আসতো, তারা পেছনের ছোট দরজাগুলির ভেতর দিয়ে কৌতূহলী চোখে উঁকি মেরে দেখতে পেতো অদ্ভুত আকৃতির সব ফ্লাস্ক, ক্রুসিবল, অ্যালেম্বিক্স, এবং চিমনী দিয়ে সাজানো ল্যাবের ভেতরটা। ওরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে আলোচনা করতো ওই কাইমিস্ট [মানে অ্যালকেমিস্ট আর কি] খুব শীঘ্র ফিলোজফার স্টোন বানিয়ে ফেলবে।

এই খামারের নিকটতম প্রতিবেশী ছিল –ফেনার্সরা , কোয়ার্টার মাইল দূরে ছিল ওদের বাড়ী। রাতে কারওয়েনের খামার থেকে ভেসে আশা অদ্ভুত উদ্ভট কিছু শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিল। সেসব ছিল কান্নার মতো শব্দ বা একটানা পাশব হাউলিং। মাত্র তিনজন মানুষের জন্য বৃহৎ সংখ্যক গবাদিপশু পালন করাটাও, তাদের যেন কেমন কেমন লেগেছিল। তিনজন মানুষের কতটাই বা মাংস, দুধ এবং উল দরকার হতে পারে, এই প্রশ্ন তুলেছিল। কৌতূহলজনক আর একটা ব্যাপার এই যে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কিংস্টাউন কৃষকদের কাছ থেকে নতুন নতুন গবাদি পশু কিনতেন জোসেফ কারওয়েন। আগের দলের পশুগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যেত। এছাড়াও, ওই খামারে ছিল একটা বিরাট উঁচু পাথরের বাড়ী। যা নিচের দিকে জানলা বলতে কিছুই ছিল না। ওপরে কিছু ছোট ছোট গর্ত ছিল দেওয়ালের গায়ে জানলার পরিবর্তে।

শহরে ওলনিকোর্টের বাসভবন নিয়েও গ্রেটব্রিজের ভবঘুরেরা নানান কথা চালাচালি করতো। ১৭৬১ সালে নির্মিত নতুন বাসভবনের কথা নয়। ওরা কথা বলতো সেই বাড়িটার বিষয়ে যেখানে কারওয়েন প্রথমে বসবাস করতো। এই সময় মানুষটির বয়স প্রায় একশো ছুঁয়ে ফেলেছে। নিচু –ছাদের বাড়িটায় ছিল এক জানলাবিহীন চিলেকোঠা। যার ছাদ ছিল কাঠের। সেই সব কাঠ এক অজ্ঞাত কারণে কারওয়েন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পুড়িয়ে ছাই করে দেন। সেই অর্থে এই বাড়ীর আলোচনায় রহস্যর মাত্রা কমছিল। তবে এটাও সত্য যে ওই বাড়িতেও সময়ে অসময়ে জ্বলে থাকতো আলো। দুজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ পরিচারক ছিল সে বাড়ীতে যারা কারোর সাথে একটাও কথা বলতো না। অবিশ্বাস্য রকমের বয়স্ক ফরাসী গৃহকর্ত্রী বকরবকর করে অনেক কিছুই বলতো কিন্তু কিছুই বোঝা যেতনা। মাত্র চারজন লোক বাস করতো বাড়িটায় কিন্তু তাদের জন্য যে পরিমাণে খাবার আসতো তা মানুষের চোখ কপালে তুলে দেবার পক্ষে যথেষ্টই ছিল। অবরে সবরে বেশ কিছু অজানা মানুষের কণ্ঠস্বর এবং তাদের কথোপকথনের শব্দ শুনতে পাওয়া যেত। এসব মিলে মিশেই পটুয়েক্সট খামারের গায়ে লেপে দিয়েছিল যুগান্তকারী আতঙ্কের কালো দাগ।

চেনাশোনার গণ্ডিতেও কারওয়েনের বাড়ী নিয়ে আলোচনা খুব একটা কম হতো না। নবাগত অবস্থায় কারওয়েন ধীরে ধীরে শহরের গির্জা এবং চলমান জীবনের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। শিক্ষার মাত্রা ভালোই ছিল ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গ এবং কথোপকথন মানুষ উপভোগ করতো। তাঁর জন্ম ভালো বংশেই হয়েছিল বলে পরিচিত ছিল। কারওয়েন বা করউইন্স অফ সালেমদের আলাদা করে নিউ ইংল্যান্ডে নিজেদের পরিচয় যাচাই করে দেখানোর দরকার পড়েনি। একটু একটু করে এই ধারণা মানুষের মনে গেঁথে বসে যায় জোসেফ কারওয়েন প্রাথমিক জীবনে অনেক ভ্রমণ করেছেন। ইংল্যান্ডে কিছু সময়ের জন্য বসবাসও করেছেন এবং কমপক্ষে দু’বার প্রাচ্যভ্রমণ করেছেন। কথাবার্তা বলার সময় তিনি যে ভাষা ব্যবহার করতেন সেটা শুনেই বোঝা যেতো একজন মার্জিত শিক্ষিত ইংরেজের যা যা গুণ থাকা দরকার সবই তার আছে। কিন্তু কিছু বিশেষ কারণে কারওয়েন বর্তমান সমাজকে পাত্তা দিতেন না। যদিও কেউ দেখা সাক্ষাৎ করতে এলে প্রত্যাখ্যানও করতেন না। কিন্তু নিজের আচরণে সবসময় এমন এক গণ্ডি টেনে রাখতেন যে খুব বেশি কথা বলার সুযোগ কেউ পেতো না।

সবসময় রহস্যময়, অপ্রচলিত অহংকারে ভারাক্রান্ত হয়ে কারওয়েন চলাফেরা করতেন। মনে হতো নিজেকে ছাড়া বাকি মানুষদের যেন মানুষ বলে গণ্যই করতেন না। যেন অচেনাদের মাঝে আরও উন্নতমানের কোনও শক্তিশালী নিখুঁত সত্তা খুঁজে বের করতে চাইছেন। ১৭৩৮ সালে বিখ্যাত বুদ্ধিবাদী ডঃ চেকলে বোস্টন থেকে কিংস চার্চের রেক্টর হয়ে আসেন। ইতিমধ্যেই জোসেফ কারওয়েনের কথা তার কানে গিয়েছিল। নিজে যেচে দেখা করতে আসেন। কিন্তু খুব বেশী সময় কারওয়েন বাসভবনে উনি থাকতে পারেন নি। কারণ গৃহকর্তার আচার আচরণে এক ছদ্ম পাশবিক হাবভাবের ঢেউ তিনি অনুভব করেন। এক শীতকালীন সন্ধ্যায় কারওয়েনকে নিয়ে আলোচনা করার সময় চার্লস ওয়ার্ড তার বাবাকে বলে ছিল, তার খুব জানতে ইচ্ছে করে রহস্যজনক বৃদ্ধ ব্যক্তিটি সেই ধার্মিক মানুষটিকে ঠিক কি বলেছিলেন। যদিও প্রাপ্ত সব ডায়েরীর লেখা থেকে এটাই জানা যায় যে ডঃ চেকলে তাদের কথোপকথন বিষয়ে কিছু বলতেই চাননি। যে নাগরিক খ্যাতি তিনি অর্জন করেছিলেন সেটা খোয়ানোর কোনও ইচ্ছেই তার ছিল না যে কারণে উনি আর কোনোদিন জোসেফ কারওয়েনের নাম স্মরণ পর্যন্ত করেন নি।

জোসেফ কারওয়েনকে অন্য পেশা ও পছন্দের মানুষেরা কেন এড়িয়ে চলতে চাইতো তার আরো কিছু কারণ ছিল। একটি উদাহরণ দিলেই সেটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। ১৭৪৬ সালে মিঃ জন মেরিট, বয়স্ক ইংরেজ সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিভাধর ভদ্রলোক, নিউপোর্ট থেকে প্রভিডেন্সে এসেছিলেন। ওই সময়ে শহরটি অতি দ্রুততার সাথে তৎকালীন সময়ে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ রাখছিল। সমাজের বুকে বানিয়ে দিচ্ছিলো মানুষদের জন্য সেরা বাসস্থানের ঠিকানা। সেখানেই এক অট্টালিকা নির্মাণ করে চাকরবাকর সহযোগে এক আভিজাত্যের গমক দেখিয়ে বসবাস শুরু করলেন মিঃ মেরিট। নিজের টেলিস্কোপ, মাইক্রোস্কোপ এবং ইংরেজি ও ল্যাটিন বইয়ের সম্ভারে সাজানো লাইব্রেরী নিয়ে প্রচুর গর্ব করতেন। প্রভিডেন্সের সেরা গ্রন্থাগারের মালিক হিসেবে কারওয়েনের নাম জানার পর ইনিও যেচে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কারওয়েন ভবনে এর আগে যারা দেখা করতে এসেছে তাদের তুলনায় আরো বেশি আন্তরিক ভাবে মিঃ মেরিটকে অভ্যর্থনা জানালেন অহংকারী গৃহকর্তা। গ্রীক, ল্যাটিন এবং ইংরেজি ক্লাসিক ছাড়াও নানা দার্শনিক, গাণিতিক এবং বৈজ্ঞানিক বই দিয়ে সাজানো ছিল কারওয়েনের লাইব্রেরী। প্যারাসেলসাস, এগ্রিকোলা, ভ্যানহেলমন্ট, সিললয়াস, গ্লবার, বয়েল, বোরহেভ, বেলচার, স্টাহল সহ বিভিন্ন নামীদামী মানুষের লেখনীর এক অমূল্য সহাবস্থান। সেসব দেখে যারপরনাই মোহিত হলেন মিঃ মেরিট এবং বারংবার সেকথা বলতেও কার্পণ্য করলেন না। এসব শুনেটুনে জোসেফ কারওয়েন এর আগে যে কাজ কখনো করেননি সেটা করলেন। মিঃ মেরিটকে আমন্ত্রণ জানালেন ফার্ম এবং ল্যাবরেটরি দেখার। কিচ্ছুক্ষণ বাদেই দুজনে মিঃ মেরিটের ঘোড়ার গাড়ী করে রওনা দিলেন ফার্ম হাউসের উদ্দেশ্যে।

মিঃ মেরিট এটা সবসময় বলে এসেছেন যে ফার্মহাউসে তেমন কোনো ভয়ঙ্কর কিছু তিনি দেখতে পাননি। কিন্তু এটা স্বীকার করেছেন যে কারওয়েনের লাইব্রেরিতে একেবারে সামনের দিকে সাজিয়ে রাখা থ্যাউমেটারজিক্যাল, অপরসায়নবিদ্যা এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক বিশেষ ধরনের শিরোনামযুক্ত বইগুলি দেখে তার মোটেই ভালো লাগেনি। ঘৃণাই হয়েছিল বলা যায়। সম্ভবত, ওই ধরনের বইগুলো দেখানোর সময় আত্মম্ভরি গৃহকর্তার মুখের অভিব্যক্তি তার জন্য দায়ী ছিল। ঈর্ষা করার মতো ভালো মানের একাধিক পুস্তকের বিস্ময়কর সংগ্রহের পাশাপাশি এই সব জঘন্য ধরনের বইগুলো দেখে উনি চমকে গিয়েছিলেন। সাধারণত ওই ধরনের পুস্তক ডেমোনোলজিস্ট এবং ম্যাজিশিয়ানদের কাছেই বেশী দেখা যায়। সন্দেহজনক অপরসায়ন এবং জ্যোতিষশাস্ত্র বিষয়ক বইয়ের অসাধারণ সংগ্রহ যে কারওয়েনের ছিল সেটাও জানিয়েছিলেন মিঃ মেরিট। মেসনার্ডের সংস্করণে হার্মিস ট্রিসমেজিস্টাস, টারবা ফিলোস্ফোরাম, জিবারের লাইবার ইনভেস্টিগেশনিস, এবং আর্টিফিউস এর কি অফ উইজডম যেমন ছিল, তেমনই ছিল ক্যাবালিস্টিক জোহার, পিটারজ্যামির রচিত অ্যালবারটাস ম্যাগনাসএর সেট, রেমন্ড লাল্লির আর্সম্যাগনা এট আলটিমার জেটজনারের সংস্করণ, রজার বেকনের থিসরাস কেমিকাস, ফ্লাডের ক্লাভিস আলকিমিয়া এবং ট্রাইথেমিয়াসের ডি ল্যাপিদে ফিলোসফিকো। মধ্যযুগীয় ইহুদীও আরব লেখকদের একাধিক বই ছিল সেখানে। এদের ভেতরেই মিঃ মেরিট ফ্যাকাশে মেরে গিয়েছিলেন কানুন-ই-ইসলাম এর মতো লেবেল লাগানো একটি বই নিজের হাতে নিয়ে দেখার সাথে সাথেই। কারণ আসলে ওটা ছিল সেই পাগল আরব আব্দুল আলহাজরেদের লেখা নিষিদ্ধ নেক্রোনোমিকন। এর বিষয়ে উনি শুনেছিলেন ম্যাসাচুসেটস-বে প্রদেশের কিংস্টপোর্টে এক জেলেদের গ্রামে, অদ্ভুত কিম্ভুত আতঙ্ক জড়ানো নানান নামহীন ধর্মাচরণের বিষয় সামনে এসে যাওয়ার পর।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে, মিঃ মেরিট খুব সাধারণ একটা বিষয় দেখে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। ওখানে বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের উপর রাখা ছিল একটি অতি ব্যবহার জীর্ণ বই। যার লেখক বোরিলাস। বইটার পাতায় পাতায় নানা লাইন চিহ্নিত করা আছে দাগ দিয়ে দিয়ে। সাথেই মার্জিনে কারওয়েনের হাতের লেখায় ভর্তি। বইটি খোলা ছিল মাঝামাঝি অবস্থায়। সেই পাতার একটি অনুচ্ছেদের রহস্যময় কালো-অক্ষরে লেখা কিছু লাইন অতিরিক্ত মোটা দাগে এমন ভাবে চিহ্নিত করা ছিল যে সেটা পড়ে দেখার লোভ সামলাতে পারেন নি মিঃ মেরিট। বিশেষ ভাবে দাগানো ছিল বলে নাকি ওই লেখা কথাগুলির রহস্যময় ছন্দময়তা নাকি বিষয়টার অন্তর্নিহিত অর্থ তিনি বলতে পারেননি; কিন্তু এই সবকিছুই একসাথে মিলে মিশে সম্ভবত তাকে খুব বিশ্রী এবং অদ্ভুতভাবে প্রভাবিত করেছিল। কথাগুলো তার স্মৃতিতে গেঁথে বসে গিয়েছিল। ডায়েরিতে সেগুলো লিখেও রেখেছিলেন এবং সেই কথাগুলো একবার তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাঃ চেকলেকে পড়ে শোনানোর চেষ্টা করেন। যা শুনে রেক্টর মানুষটা অস্বস্তি বোধ করছেন তা বুঝতে পেরেছিলেন ভালো করেই।

মিঃ মেরিট যা পড়েছিলেন:
“প্রানীদেহাংশের সারবস্তু থেকে এমন এক বিশেষ ধুলো এতো ভালো ভাবে প্রস্তুত এবং সংরক্ষণ করা যেতে পারে, যার সাহায্যে যেকোনো একজন বুদ্ধিমান মানুষ তার নিজের পরীক্ষাগারে চাইলেই নোয়ার নৌকাতে যত জীবজন্তু ছিল সব কিছুকেই বানিয়ে নিতে পারে। পছন্দের যে কোনো পশুপাখির আকৃতি নিখুঁত রূপে নির্মাণ করাটা কোনো ব্যাপারই না। আর ঠিক এভাবেই মানুষের দেহাংশের ধুলো থেকে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি কোনরকম অপরাধমূলক প্রেতচর্চা না করেও তার মৃত পূর্বপুরুষের আকৃতি পুনর্নির্মাণ করতে পারে। মোদ্দা কথা মানব দেহাংশের ধুলো থেকে নতুন মানুষের সৃষ্টি করা সম্ভব।”

টাউনস্ট্রিটের দক্ষিণ উপকূলের বন্দরের কাছের এলাকায় জোসেফ কারওয়েন সম্বন্ধে সবচেয়ে খারাপ কথাগুলো উড়ে বেড়াতো। নাবিকেরা চিরকালই একটু অন্ধবিশ্বাসী ধরনের মানুষ এবং নানা অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া প্রকৃতির হয়। রামের নেশায় ডুবে থাকা পাঁড় মাতাল থেকে শুরু করে দীর্ঘদেহী ক্রীতদাস, ছোট সামুদ্রিক নৌকার মাঝি, যুদ্ধ জাহাজের সেনা, ব্রাউন, ক্রফোর্ডস, এবং টিলিংহাস্ট যে কোনও ধরনের মানুষ যখনই পাতলা চেহারার ফ্যাকাশে চামড়ার হলুদ চুলো কারওয়েনকে ডুবলুন স্ট্রিটের রাস্তা দিয়ে আসতে দেখতো তখন পারতপক্ষে কেউ চাইতো না মানুষটার মুখোমুখি হতে। অবশ্য কারওয়েনও তেমন কোনও নজর দিতেন না ওদের দিকে। দূরে জলে ভেসে থাকা বিশাল বিশাল জাহাজের ক্যাপ্টেনদের সাথে কথা বলার জন্য সোজা গটমট করে হেঁটে এসে ঢুকে যেতেন জাহাজ ঘাটার অফিসে। কারওয়েনের নিজস্ব ক্লার্ক ও ক্যাপ্টেন এবং মার্টিনিক, সেন্ট ইউসতেসিয়াস, হাভানা, বা পোর্টরয়্যাল থেকে খুঁজে আনা দোআঁশলা তার সমস্ত নাবিকরাও তাকে ঘৃণা ও ভয় করতো। বয়সের গাছপাথরহীন মানুষটার প্রতি সে ভয় আর ঘৃণার মাত্রা এতো বেশি ছিল যে ক্রমাগত নাবিকদের মুখের বদল হতে থাকতো। নাবিকের দল কিছু ঝামেলা করেছে জানতে পারলেই তাদের বিশেষ কাজ দিয়ে খামার বাড়ীতে পাঠিয়ে দিতেন কারওয়েন। আর তারপরেই দেখা যেত সেই দলের এক বা একাধিক মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেছে। যে কয়েকজন নাবিক পটুয়েক্সট এর খামার বাড়ী থেকে ফিরে আসতো তারা যে সব অভিজ্ঞতার কথা বলতো তাতে রহস্য আরো দানা বাঁধে। এর ফলে কারওয়েনের পক্ষে স্থানীয় কাজের লোক পাওয়াই সমস্যার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ কারণেই তাকে বাইরে নানা জায়গা থেকে নাবিক আমদানি করতে হতো। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে যায় দূরে দূরান্তরে ফলে এই এলাকাতে কাজ করতে আসবে এমন লোক পাওয়া মুস্কিল হয়ে দাঁড়ায়। যা অন্যান্য জাহাজ মালিকদের ক্ষেত্রে সমস্যার জন্ম দেয়।

১৭৬০ সালের সময়ে জোসেফ কারওয়েনের নামটা একটা আতঙ্কস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। নাম উচ্চারণ করতেই ভয় পেত মানুষ। প্রায় একঘরে করে দেওয়া হয় ওকে। ধরেই নেওয়া হয় মানুষটার সাথে শয়তানের একটা যোগসাজশ আছে। মানুষ এমনটাও মনে করতো যে সেই সত্তা যার নাম উচ্চারণ করাই পাপ, যাকে বোঝা বুদ্ধি দিয়ে সম্ভব নয় বা যার অস্তিত্ব প্রমাণ করাও সম্ভব হয়নি সেই অজ্ঞাত সত্তাদের সাথে কারওয়েনের সম্পর্ক আছে।। এই সব গুজবের সাথেই যুক্ত হয় আরো বড় এক ঘটনার কথা। ১৭৫৮ সালের মার্চ এপ্রিল মাসে নিউফ্রান্সে যাওয়ার পথে দুটি রাজকীয় রেজিমেন্ট প্রভিডেন্সে এসে উপস্থিত হয়। আর তাদের ভেতর থেকে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে দেখা যায় দিনের পর দিন ধরে বেশ কিছু সংখ্যক করে সৈন্য নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। নাবিকদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার কারণে গুজবের মাত্রা এতোটাই মানুষকে প্রভাবিত করে রেখেছিল যে কারওয়েনকে ঐ লাল উর্দিধারি সেনাদলের ধারে কাছে দেখতে পাওয়া না গেলেও জনগণ ধরেই নিয়েছিল এর সাথেও ওই পৈশাচিক মানুষটার সম্পর্ক আছে। কিছুদিনের ভেতরে ওখান থেকে পাততাড়ি গুটানোর অর্ডার যদি ওপর মহল থেকে না আসতো তাহলে বাকি সেনাদের কি হতো কে জানে।

এদিকে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দিন কে দিন কারওয়েনের উন্নতি হয়েই চলেছিল। সোরা, গোলমরিচ এবং দারুচিনি ব্যবসায়ের অপ্রত্যক্ষভাবে একচেটিয়া অধিকারী হয়ে বসেছিলেন। ব্রাসওয়ার, নীল, তুলো, উল, লবণ,লোহা, কাগজ এবং ব্রোঞ্জ সহ সবধরনের ইংরেজি পণ্য আমদানির ব্যবসাতেও নিজের থাবা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। চিপ সাইডের সাইনইন দ্য এলিফ্যান্ট এর মালিক জেমস গ্রিন, ব্রিজ এলাকা জুড়ে ব্যবসা করতে থাকা সাইনইন দ্য গোল্ডেন ঈগল এর মালিক রাসেলস রা অথবা নিউ কফি-হাউসের কাছের ফ্রাইং-প্যান এবং ফিস দোকানের ক্লার্ক এবং নাইটিংগেল এর মতো দোকানদারেরা প্রায় সকলকেই সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে হতো কারওয়েনের আমদানির ওপর। স্থানীয় মদ পরিবেশক থেকে শুরু করে নারাংগ্যান্সেটের গোয়ালা এবং ঘোড়া-বিক্রেতার দল বা নিউপোর্ট এর মোমবাতি প্রস্তুতকারকদের জন্য কারওয়েন পরিণত হয়েছিলেন কলোনীর প্রধান রপ্তানিকারক।

তার সম্বন্ধে নানান গুজব চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল তবু সামাজিক ভদ্রতাকে মোটেই বিসর্জন দেন নি কারওয়েন। যখন কলোনি হাউস পুড়ে গেল তখন তাকে নতুন করে বানানোর জন্য যে লটারির আয়োজন করা হয় তার অনেক টিকিটই তিনি নিজে কিনে নেন। পুরাতন মেইন স্ট্রিটে, ১৭৬১ সালে নতুন ইট দিয়ে নির্মাণ করা সেই কলোনি হাউস আজও দণ্ডায়মান। একই বছরে উনি আবারও ভালো আর্থিক সাহায্য দান করেন অক্টোবর মাসের ঝড়ে ভেঙেচুরে যাওয়া গ্রেট ব্রিজ পুনর্নির্মাণ করার কাজে। কলোনি হাউসে লাগা আগুনের গ্রাসে পাবলিক লাইব্রেরির অনেক বই পুড়ে যায়। উনি সেখানেও মোটা অর্থ ব্যয় করেন নতুন বই কেনার জন্য। প্রচুর পরিমাণে লটারি কেনা শুরু করেন যাতে সেই টাকায় কাদায় ভর্তি থাকা মার্কেট প্যারেড এবং খানাখন্দে ভরা টাউনস্ট্রীটের সংস্কার করা যায়। একই সময়ে কারওয়েন নিজের জন্য একটা সাদাসিধে কিন্তু চমৎকার নতুন এক অট্টালিকা নির্মাণ করান। যার দরজার খোদাইয়ের কাজ আজও মানুষ দেখে মুগ্ধ হয়ে দেখে। ১৭৪৩ সালে হোয়াইটফিল্ডের সমর্থকরা ডঃ কটন এর হিল চার্চ ছেড়ে বেরিয়ে আসে তখন তাদের সাথে কারওয়েনও যোগ দিয়ে ছিলেন। এই সময়েই ব্রিজ এলাকায় ডিকন স্নো চার্চ এর প্রতিষ্ঠা হয়। যদিও কারওয়েনের উদ্যোগ এবং উপস্থিতি বেশিদিন দেখা যায়নি এ বিষয়ে। তবে খুব শীঘ্রই তিনি ভুলটা শুধরে নেন। কারণ বুঝতে পারছিলেন সেটা না করলে ওকে একঘরে করে দেওয়া হবে এবং যার আঁচ গিয়ে পড়বে তার ব্যবসার ওপরে।

দ্বিতীয় অধ্যায়-দ্বিতীয় পর্ব

প্রায় এক শতাব্দীর সমান বয়সের এই অদ্ভুত, শীর্ণকায়, মধ্যবয়স্ক দর্শনধারী মানুষটা চেষ্টা চালাচ্ছিলেন সমস্ত রকম নিন্দামন্দ, অপ্রীতিকর বিশ্লেষণ,অবজ্ঞা ভয় এবং ঘৃণার মেঘকে দূরে ঠেলে দিয়ে সমাজে একটা স্থান খুঁজে নেওয়ার। এই ধরনের কাজ একমাত্র সম্ভব হয় অঢেল সম্পদ বিতরণের দ্বারা। অর্থের শক্তিতে এসব থেকে সামান্য সময়ের জন্য অব্যাহতিও মেলে। নাবিকদের দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনাও অকস্মাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কবরস্থানে ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রেও অনেক গোপনীয়তার আশ্রয় নেন। বোঝাই যাচ্ছিলো উনি চাইছেন না অহেতুক গুজব তাকে নিয়ে চলতেই থাকুক। পটুয়েক্সট খামার থেকে আগত অস্পষ্ট গা শিউরানো শব্দগুলোও সহসাই আনুপাতিক হারে অনেক কমে গিয়েছিল। যদিও অস্বাভাবিকভাবে খাবারের খরচ এবং গবাদি পশুর বদলে যাওয়ার পরিমাণে কোন হেরফের ঘটেনি। তবে এসব খবর যতদিন না চার্লস ওয়ার্ড শেপলি লাইব্রেরিতে কারওয়েনের অ্যাকাউন্ট এবং ইনভয়েসগুলি পরীক্ষা করে, ততদিন অবধি অজানাই ছিল। এসব দেখতে দেখতেই একটা খবর চার্লসের নজরে আসে। ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত গায়না থেকে প্রচুর কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ আমদানি করেছিলেন জোসেফ কারওয়েন। যার ভেতর থেকে খুব অল্পকেই উনি বিক্রি করেছিলেন স্থানীয় ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের কাছে। বাকিদের কি হলো? বুঝতে পারা যাচ্ছে আপাত চকচকে অসাধারণ দানী মানুষটার পেছনে একটা ঘৃণিত চরিত্রের ধুরন্ধর বাস করতো। কিভাবে চতুরতা অবলম্বন করে সব দিক সামলাতে হয় সে জ্ঞান তার ভালোই ছিল।

নানান রকম সংস্কারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রভাব অবশ্য সামান্যই দেখা যায়। কারওয়েনের থেকে দূরে দূরে থাকা এবং অসন্তোষ অব্যাহত ছিল। আসলে এতো বয়েস হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তার অর্ধেকেরও কম বয়সের মতো যদি কাউকে দেখতে লাগে তা যথেষ্টই সন্দেহের জন্ম দেয়। উনি বুঝতেও পারেন এর প্রভাব আগামী দিনে তার ভাগ্যের ওপরেও পড়বে। যে বিস্তৃত অধ্যয়ন ও পরীক্ষানিরীক্ষা তিনি করে চলেছেন , তা সে যাই হোক না কেন, তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর আয়ের প্রয়োজন। পরিবেশ যেভাবে পরিবর্তন হচ্ছে তাতে যে ব্যবসায়িক সুবিধাগুলি তিনি লাভ করেছেন সে সব ধরে রাখা বেশ কঠিন হবে আগামী দিনে। এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে ব্যবসা শুরু করা যেতেই পারে কিন্তু তার জন্য অনেক সময় লাগবে। সাথেই এতদিনের খাটনি বৃথা নষ্ট হবে। সব দিক চিন্তা করে কারওয়েন সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি প্রভিডেন্সের অধিবাসীদের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কটা মজবুত করার চেষ্টা করবেন সবার আগে। যাতে তার উপস্থিতি অহেতুক বাজে কথোপকথনের বিষয় হতে না পারে। মাঝে মধ্যে এদিকে ওদিকে ভ্রমণ নিয়ে অজুহাত দিতে না হয়। তাকে দেখলে যেন যে অস্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয় সেটা কেটে যায়। ব্যবসা ক্ষেত্রে তার ক্লার্কদের সংখ্যা এখন অনেক কমে গেছে। নতুন করে কেউ কাজের জন্য আসেও না। এটা একটা চিন্তার বিষয়। জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং বাকি কর্মীদের বিভিন্ন রকম প্রলোভনের লোভ দেখিয়ে আটকে রেখেছিলেন। যেরকম ভাবে পারতেন তাদের সাহায্য করতেন বা করার প্রতিশ্রুতি দিতে পিছপা হতেন না। অনেকক্ষেত্রেই দেখা গেছে ডায়েরী লেখকেরা আশ্চর্য হয়ে গেছেন এটা ভেবে যে কি করে কারওয়েন তার কর্মচারীদের পরিবারের নানা গোপনীয় খবরাখবর যোগাড় করতেন। এসব অনুসন্ধানের ব্যাপারে মানুষটার প্রায় অলৌকিক জাদুকরী শক্তি ছিল। তার জীবনের শেষ পাঁচবছরের কাজকর্ম দেখলে মনে হয় উনি বোধহয় সরাসরি মৃত মানুষদের সাথে কথা বলার পদ্ধতি জানতেন। যারা ওকে বিভিন্ন বিষয়ের খুঁটিনাটি দিক জানিয়ে দিতো।

ঠিক এই সময়েই অতি বুদ্ধিমান মানুষটা সমাজে নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার অভিলাষে চূড়ান্ত একটা পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এতদিন একাকী জীবনযাপনের পর ঠিক করলেন সুবিধাজনক চুক্তিতে বিয়ে করবেন। একজন মহিলার দরকার যে তার স্ত্রী হিসাবে এ বাড়ীতে আসবে এবং এ বাড়ী নিয়ে চলতে থাকা সব রকম গুজবের অবসান ঘটাবে। হয়তো এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ ছিল; এমন কারণ যা নিয়ে তার মৃত্যুর সার্ধশতবর্ষ পরে কাগজপত্র ঘেঁটে যে কেউ বুঝতে পারবে সেটা ছিল এক চরম সন্দেহজনক বিষয়। যদিও সেই অর্থে কিছুই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়নি। কারওয়েন ভাল করেই জানতেন তার সম্বন্ধে চলতে থাকা ভয়াবহ গুজবগুলোর কারণে মোটেই সহজ হবেনা তার পক্ষে এই ভাবনাকে বাস্তবায়ন করা। তাকে খুঁজে বার করতে হবে এমন পরিবার যাদের ওপর উনি চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন। যাতে ওই পরিবারের অভিভাবকেরা তাদের মেয়েকে এ বিয়েতে রাজি করাতে পারে। এইধরনের মেয়ে খুঁজে পাওয়া সহজ কাজ ছিল না। একই সাথে মেয়ের সৌন্দর্য, নম্রতা এবং পারিবারিক সামাজিক স্বীকৃতির ব্যাপারেও কারওয়েনের বিশেষ নজর ছিল। কিছুদিন খোঁজখবর চালাতেই তার দেখাও পেলেন। তারই কোম্পানিতে কাজ করে মেয়েটির বাবা। তার জাহাজগুলির ক্যাপ্টেনদের মধ্যে সব সেরা এবং বয়স্ক মানুষ। উচ্চ বংশজাত। স্ত্রী গত হয়েছেন অনেকদিন আগে। নাম ডুটি টিলিংঘাস্ট। যার একমাত্র মেয়ে এলিজা। মেয়েটি সব দিক থেকে সুযোগ্যা। ক্যাপ্টেন টিলিংঘাস্ট নানা সময়ে এতো অর্থ ধার করেছিলেন কারওয়েনের কাছে যে প্রায় তার বাঁধা চাকরে পরিণত হয়েছিলেন। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে কারওয়েন গেলেন হবু শ্বশুরের পাহাড় সংলগ্ন পাওয়ার লেনের বাড়ীতে। সেখানেই চুক্তি সম্পাদন হয়ে গেল এক অমানবিক ঘৃণ্যতম ভাবনাচিন্তার।

এলিজা টিলিংঘাস্ট এর সেই সময়ে বয়স আঠারো বছর। বাবার আর্থিক অবস্থা বুঝে সে সহজ সরল ভাবেই দিন কাটাতো। শান্ত মেয়েটির তেমন কোন চাহিদা ছিল না। কোর্ট-হাউসপ্যারেডের বিপরীতে অবস্থিত স্টিফেন জ্যাকসন স্কুলে সে পড়াশোনা করেছে। ১৭৫৭ সালে স্মল পক্সে মায়ের মৃত্যু হয়। তার আগেই অবশ্য তিনি যতটা পেরেছিলেন মেয়েকে গার্হস্থ্যজীবনে প্রয়োজন নানান কাজ কর্মের শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছিলেন। ১৭৫৩ সালে ৯ বছর বয়সে এলিজার করা একটি সূচিশিল্প আজ ও রোড আইল্যান্ড হিস্টোরিয়াল সোসাইটির ভবনে দেখতে পাওয়া যায়। মায়ের মৃত্যুর পর মেয়েটির বাড়ি থেকে বেড়ানো বন্ধই হয়ে যায়। ওর দেখাশোনা করতো এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। কারওয়েনের সাথে বিয়ের ব্যাপারে বাবার সাথে তার ভালোই কথা কাটাকাটি হয়েছিল ধরে নেওয়া যেতেই পারে। যদিও সে বিষয়ে কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি। কথা কাটাকাটির অন্যতম কারণ, এলিজার সাথে ক্রফোর্ড প্যাকেট এন্টারপ্রাইজের দ্বিতীয় মেট তরুণ এজরা উইডেনের বিয়ের দিন কয়েক আগেই পাকা হয়েছিল। কিন্তু সে সম্পর্ক ভেঙ্গে দেওয়া হলো এবং জোসেফ কারওয়েনের সাথে ১৭৬৩ সালের ৭ই মার্চ তারিখে ব্যাপটিস্ট গির্জায় এলিজার বিবাহ সম্পন্ন হলো। শহরটি গর্ব করতে পারে এমন যেসব বিশিষ্ট সমাবেশগুলি এতদিন হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমকদার ছিল এই অনুষ্ঠানটি। তরুণ যাজক স্যামুয়েল উইন্সর এই বিয়ের পৌরহিত্য করলেন। গেজেটে খুব সংক্ষিপ্তভাবে এই ঘটনাটির উল্লেখ করা হয়েছিল এবং যে সমস্ত কপি খুঁজে পাওয়া যায় সেই গেজেটটির তার সবগুলোতেই দেখা যায় বিয়ের খবরের স্থানটি কে বা কারা সযত্নে কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। অনেক খুঁজে পেতে ওয়ার্ড এক সংগ্রাহকের ব্যক্তিগত আর্কাইভ থেকে সেই খবরটা নিজের চোখে দেখার সুযোগ পায়। অবাক হয়ে যায় অর্থহীন ভাষার সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনটি পড়ে:

“গত সোমবার সন্ধ্যায়,এই শহরের একজন ব্যবসায়ী মিঃ জোসেফ কারওয়েন, ক্যাপ্টেন ডুটি টিলিংঘাস্টের কন্যা মিস এলিজা টিলিংঘাস্টকে বিবাহ করেছেন। কন্যাটি একজন যুবতী মহিলা যিনি সত্যিকারের শিক্ষিত, তার সাথে এক সুন্দর ব্যক্তির যোগসূত্র গঠিত হয়েছিল। আশা করা যায় এই বিবাহ বন্ধন চিরস্থায়ী হবে।”
উন্মাদ হয়ে যাওয়ার আগে চার্লস জর্জ স্ট্রীটের মেল্ভিল এফ পিটারসের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ডারফি-আরনোল্ডদের লেখা বেশ কিছু চিঠি খুঁজে পায়। ওখান থেকেই জানা যায় এই অসাধারণ প্রকৃতির বিবাহ অনুষ্ঠান জনসাধারণের ভেতর কি মাত্রায় ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

টিলিংঘাস্টদের সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল ভালো মতোই। আর সেই সূত্র ধরেই জোসেফ কারওয়েন দেখতে পান সেই সমস্ত লোকের আনাগোনা ঘটছে তার বাড়ীতে যারা তার বাড়ীর ছায়াও মাড়াত না। স্বীকৃতি পাওয়ার দিকটা এর ফলে অনেকটাই সুসম্পন্ন হয়। অবশ্য নববধূকে সামাজিকভাবে কারওয়েনের এই জবরদস্তি উদ্যোগে ভালোই কষ্ট ভোগ করতে বাধ্য হয়। তবে সব মিলিয়ে যে অনীহার প্রাচীর জন্ম নিয়ে ছিল সেটা অনেকটাই অপসারিত হয়। স্ত্রীর প্রতি কারওয়েনের অতি সদাশয় আচার আচরণ দেখে এলিজা নিজে এবং সমাজের মানুষ যৎপরোনাস্তি অবাক হয়ে যায়। কিছু সময় কেটে যেতেই ওলনিকোর্টের নতুন বাড়িটাকে ঘিরে থাকা রহস্যময়তার বাতাবরণ প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কারওয়েনও পটুয়েক্সট খামারে যাওয়া বন্ধ করে দেন। স্ত্রীকেও কোনদিন সেখানে নিয়ে যাননি। এতবছর এই শহরে বাস করার পর মানুষের মনে হচ্ছিল এবার জোসেফ কারওয়েন যেন প্রকৃতই সাধারণ নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। কেবলমাত্র একজন মানুষ কিন্তু তার সাথে খোলা শত্রুতা বজায় রেখেছিল। ক্রফোর্ড প্যাকেট এন্টারপ্রাইজের দ্বিতীয় মেট তরুণ এজরা উইডেন। যার সাথে এলিজা টিলিংঘাস্টের বিবাহ প্রতিশ্রুতি ভেঙে দেওয়া হয়। এজরা এমনিতে শান্ত এবং স্বাভাবিক প্রকৃতির হালকা স্বভাবের মানুষ ছিল। কিন্তু কারওয়েনের জবরদস্তিভাবে স্বামীতে পরিণত হয়ে যাওয়াটা তার মনে একরাশ ঘৃণার জন্ম দেয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে স্পষ্টভাবে প্রতিহিংসা যে সে নেবে সেটা জানিয়েও দেয় শপথ করে।

১৭৬৫ সালের সাতই মে তারিখে, কারওয়েনের একমাত্র সন্তানঅ্যান জন্মগ্রহণ করে। কিংস চার্চের রেভারেন্ড জন গ্রেভস ওদের মেয়ের নামকরণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। বিরোধী মতবাদ থাকা সত্ত্বেও বিবাহের সূত্রে এই চার্চের সাথে স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ের যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছিল। অ্যানের জন্মের রেকর্ড এবং দুবছর আগে হওয়া বিয়ের নথিভুক্তির সবরকম রেকর্ড গির্জার এবং শহরের যেখানে যেখানে থাকার কথা, সে সব জায়গায় চার্লস গিয়েছিল। সব জায়গাতেই ও দেখতে পায় একই ব্যাপার, রেকর্ড গায়েব করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে এলিজার পদবী পরিবর্তন খবর জানার পর উনার সাথে নিজের পারিবারিক সম্পর্কর সূত্র খুঁজে বার করার একটা নেশা ওকে পেয়ে বসে। একটা ঘোরের ভেতর সে এখানে ওখানে ছুটে বেড়ায় প্রমাণ সংগ্রহের তাড়নায়। যা পরবর্তীতে পাগলামির রূপ পরিগ্রহ করে। এভাবেই তার যোগাযোগ সাধিত হয় ডঃ গ্রেভসের উত্তরাধিকারীদের সাথে। যাদের কাছে পাওয়া যায় সেই সময়ের ডাক্তারি রেকর্ডের একটি ডুপ্লিকেট সেট। যা বিপ্লবের সূচনাকালে সঙ্গে করে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন ডঃ গ্রেভস। ওয়ার্ড এই উত্সটাকে খুঁজে বার করার সম্ভাব্য সব রকমের চেষ্টা চালিয়েছিল কেন না সে জানত পেরেছিল তার অতি অতি বৃদ্ধা ঠাকুমা অ্যান টিলিংঘাস্ট পটার একজন এপিস্কোপালিয়ান বা চার্চ পরিচালনা কমিটির সদস্যা ছিলেন।

কন্যার জন্মের অল্প কিছুদিন পর থেকেই জোসেফ কারওয়েন নিজের ওপর চাপিয়ে রাখা কাঠিন্যের খোলস ভেঙে স্বাভাবিক মানুষের মতো মেলামেশা শুরু করেন। ইচ্ছে জাগে একটি প্রতিকৃতি আঁকানোর। আর সেই দায়িত্ব উনি ন্যস্ত করেন খুব প্রতিভাধর স্কট শিল্পী কস্মো আলেকজান্ডারের ওপর। যিনি নিউপোর্টএর বাসিন্দা এবং গিলবার্ট স্টুয়ার্ট এর প্রথম দিকের শিক্ষক হিসাবে বিখ্যাত। ওলনিকোর্টের বাড়ির লাইব্রেরির দেয়াল-প্যানেলে এই ছবি টাঙানো ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু দুটি পুরাতন ডায়েরি ঘেঁটেও এই প্রতিকৃতি কোথায় গেল তার কোনও উল্লেখ খুঁজে পায়নি চার্লস।

এরপর থেকে অতিমাত্রার পণ্ডিত জোসেফ কারওয়েনকে কোন এক অজানা কারণে অস্বাভাবিকরকমের উৎকণ্ঠিত বলে মনে হতো। দিনের বেশির ভাগ সময়টা পটূয়েক্সট রোডের খামারে থাকতেন। দেখে মনে হতো চাপা কোনও উত্তেজনা বা রোমাঞ্চর অনুভূতি যেন তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল। মনে হতো অসাধারণ অস্বাভাবিক অদ্ভুত কিছু আবিষ্কারের দোরগোড়ায় যেন তিনি অবস্থান করছেন। যার সাথে ব্যাপকভাবে সম্পর্ক আছে অপরসায়নএবং প্রচলিত রসায়ন বিদ্যার। এই সব বিষয়ের সিংহভাগ বই নিজের বাসস্থান থেকে খামার বাড়ীতে নিয়ে চলে যান।

অবশ্য এসব করতে গিয়ে সামাজিক স্তরে সাহায্য করার ব্যাপারটা থেকে একটুও সরে আসেন নি। শহরের সাংস্কৃতিক স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের প্রচেষ্টায় যারা কাজ করছিলেন সেই স্টিফেন হপকিন্স, জোসেফ ব্রাউন এবং বেঞ্জামিন ওয়েস্টের মতো নেতাদের সাহায্য করার জন্য যে কোনও সুযোগ তিনি দু হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরছিলেন। সে সময় নিউপোর্টের তুলনায় তার শহরের শৈল্পিক মান নিচের দিকেই ছিল। ১৭৬৩ সালে ড্যানিয়েল জেঙ্ককেসকে তার বইয়ের দোকানটি স্থাপন করায় সাহায্য করেন এবং নিজে ছিলেন সেখানকার এক নম্বর ক্রেতা। শেকসপিয়ারের মস্তক চিহ্ন সম্বলিত ধুঁকতে থাকা গেজেটকে নিজের পায়ে খাড়া হওয়ার জন্য নানাভাবে সাহায্য করেন। রাজনীতির জগতে তিনি ওয়ার্ডপার্টির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো গভর্নর হপকিন্সকে সমর্থনকরেন। ওয়ার্ড পার্টির প্রধান ঘাঁটি ছিল নিউপোর্ট। ১৭৬৫ সালে হ্যাকার হলের নর্থ প্রভিডেন্সকে একটি পৃথক শহর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ানোর জন্য যে বক্তৃতা দেন তাতে তার বিরুদ্ধে হাওয়ায় ভেসে থাকা গুজবগুলো প্রায় ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। কিন্তু এজরা উইডেন, যে তার দিকে সব সময় নজর রেখেছিল, এসব কাজকে যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। সাথে সাথেই এইসব বাহ্যিক কার্যকলাপ যে আসলে জোসেফ কারওয়েনের ঘৃণ্য চরিত্রকে চাপা দেওয়ার একটা মুখোশ ছাড়া আর কিছু নয় এই বলে প্রকাশ্য নিন্দা করে চলেছিল। প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতায় জারিত এজরা নিয়ম করে কারওয়েনের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কার্যকলাপ দেখে যেতে থাকে। রাতের পর রাত অপেক্ষায় থেকেছে বন্দরে। কারওয়েনের জাহাজ ঘাটায় আলো জ্বলতে দেখলেই ছুটে গেছে কি ঘটছে দেখার জন্য। পিছু নিয়েছে সেই ছোট নৌকাটির যা মাঝে মধ্যেই চুপিসারে চলে যায় সমুদ্রের দিকে। পটুয়েক্সট খামারের দিকেও ছিল এজরার সতর্ক নজর। আর সেটা করতে গিয়ে খামারের দায়িত্বে থাকা ইন্ডিয়ান দম্পতিদের লেলিয়ে দেওয়া কুকুরের কামড়ও খেতে হয়েছে ওকে।

[ক্রমশঃ]

পাঠকেরা যা পড়ছেন