নয়-দীয়ার গপ্পো

তৃতীয় পর্ব
নয়-দীয়ার গপ্পো


মার্চ ১৫,২০১৫; রবিবার, রাত ১:১০

“হেমন্তের প্রভাত শিশিরে ছলছল করে গ্রাম চূর্ণী নদীতীরে”— কবির লেখা চেনা কয়েক লাইন মনে পড়ে যাচ্ছিল। তবুও পাড় ভাঙছিল। আছড়ে পড়ছিল এক, একাধিক বিক্ষিপ্ত ঢেউ। উন্মত্ত বিষের নিঃশ্বাস স্মৃতিবিজড়িত শ্যামল, সবুজ বাংলার মলাটে লাল কালির আঁচড় কেটে যাচ্ছিল। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। চাপ বাড়ে এক্সকেলেটরের। স্পিডের কাঁটা তিরতির করে হেলে পড়ে ৮০-র দিকে। শারীরিক উত্তেজনা, যান্ত্রিক যানে দাপট দেখাতে চায়।

সুবীরদার ফোন আসে সাড়ে ১২টা নাগাদ। অনলাইনে কয়েকটা লাস্ট আপডেট আপলোড করে সবে হালকা হচ্ছি তখনই। বাকিটা ঋক আর ঐশীর ঘাড়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ি। দ্রুত পিছিয়ে পড়া বসতি মুখে আঙ্গুল দিয়ে দাঁড়িয়ে। থমথমে বিষাদ লেগে ইঁটের পাঁজরে পাঁজরে। মাথায় দলা পাকাচ্ছিলো ফোনে শোনা কথাগুলো।
ছাপাখানার নৈশ প্রহরী রঘু জানায়, পায়ে হেঁটে ও মোটর সাইকেলে চেপে সাত-আটজন যুবক এসে সম্পাদকের খোঁজ করে। তাঁকে না পেয়ে ভাঙচুর শুরু করে। পরে রঘুকে আটকে রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালায়। ও কাউকেই চিনতে পারেনি।

এত বছর ধরে এতগুলো ভায়োলেন্ট ম্যাটার ঘটে চলেছে একের পর এক। কোনো প্রতিকার নেই। দপদপ করে উঠছিল মাথার দু-পাশের ধমনী। দূরত্ব ১২২ কিমির সামান্য বেশি। পৌঁছে যাবার কথা ৪ ঘন্টায়। সময় এগোতে থাকে। পূবদিকের আকাশে একমাথা লাল সিঁদুর মেখে উঁকি দেয় গোল লালথালা। গাড়ি থামিয়ে চা খেতে নামি। প্রায় ৬টা। শালিখের তীক্ষ্ণ শিষ বোঝায় নদীপাড়ের মানুষগুলো ভালো নেই। ক্যানসারের বীজ একটু একটু করে সাম্রাজ্য বিস্তার করছে কোষে কোষে। সুবীরদা বলেছে, শিকড় সমেত উবড়ে আনতে। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে উঠে পড়ি গাড়িতে। কোয়ারির প্রথম গন্তব্যর ম্যাপটা জেনেই নিয়েছিলাম। আরো ৫২ মিনিট। মেন শহর থেকে। নদীয়া থেকে মাঝদিয়া পৌঁছলাম ৭টার কিছু পরে।

চা জলখাবারের দু-তিনটে দোকানে জিজ্ঞেসের পর এসে পৌঁছই। কি সাংঘাতিক অবস্থা দপ্তরের। একপাল হাতির দাপটে দেহ থেকে ধড় মুন্ড আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে, দৈনিক “নগর দর্পণ” পত্রিকার দপ্তর। কংক্রিটের একতলা একটা বাড়ি। সামনের সোজা সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে। কাছে গিয়ে দেখলাম, দাঁত বের হওয়া দরজা, গালা দিয়ে আটকানো। পুলিশ সীল করে গেছে। জানলার অবশিষ্ট আর কিছু নেই। উঁকি দিয়ে চোখে পড়লো চারদিকে ছড়ানো আসবাব, বেসিনসহ বিভিন্ন ফিটিংস, টেলিফোনের টুকরো।

ঘটনাটা ঘটেছে মাঝদিয়ার মাছের আড়ৎপট্টি আরামপাড়ায় অবস্থিত ‘রাই’ প্রিন্টার্স-এ। খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর নিত্যকর্ম সারতে আসা গ্রামবাসী দু-একজন নজরে পড়ে। আমার উপস্থিতিতে তাদের কৌতুহল বা আগ্রহ কোনোটাই দেখিনা। এলাকায় ভীতি এখনো।

রওনা দিই সম্পাদক রবীনবাবুর সাথে দেখা করতে। নাম্বারটা পেয়েছি সুবীরদার কাছে। তাই ওনার বাড়ি খুঁজতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। দপ্তরের ক্ষয়ক্ষতিতে ভেঙে পড়েছিলেন। বললেন হামলা কারা করেছে তা সকলেই জানলেও করার কিছুই নেই। পুলিশ শুধু ঘটনাস্থল ঘুরে ভেঙে যাওয়া জিনিসের তালিকা করেছে। আর একটু আধটু জিজ্ঞাসা করেছে রঘু গার্ডকে। আর কি! শ্লেষ টেনে আরো বললেন, “দু-দিন পরে দেখবেন বলে দেবে সোজাসুজি এরা আমার ব্যক্তিগত শত্রু।” থানা কোনো অভিযোগ নিতে চাইছেনা। ইনিয়ে বিনিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে। এমনটাই তো হয়ে থাকে। সমস্তটা যে ছক কষা বুঝেছেন। হামলার টেকনিক দেখলেই তা বোঝা যায়। অজ্ঞাত যুবকেরা লুকিয়ে ছিল কোনো এক সময় দপ্তরের গ্যারেজে। রবীনবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পরই হামলাটা হয়। আর তাঁর খোঁজ নেওয়াটা স্রেফ ভয় দেখানো। দপ্তরের পুঙ্খানুপুঙ্খ তারা জানতো। কার্যালয়ে ওঠার সিঁড়ির দরজা বন্ধ থাকায় সেখান থেকে হামলাকারীরা ওপরে উঠতে পারেনি। এরপর দপ্তরে হামলা করে, এক পর্যায়ে রাখা কিছু ছাপা কাগজে আগুন ধরিয়ে দেয়। কোনোরকমে বাঁধন আলগা করে, রঘু চিৎকার করে। আশেপাশের গ্রামবাসী ছুটে এসে আগুন নেভায়।

এটুকু তো পরিষ্কার, বিষয়ের গ্রোথিত মূল আরো গভীরে। রবীনবাবু দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে নিতে বলেছিলেন তাঁর বাড়িতে। শরীর আর মনের অস্থিরতা সায় দেয়নি। আরো কিছু জায়গায় যাওয়ার ছিল। মাঝদিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল), গৌতম রায়। থানাতেই পেয়ে যাই তাঁকে। তির্যক বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝায় আমার উপস্থিতি তাঁর খুব একটা অভিপ্রেত নয়। ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বলেন, কলকাতায় কি খবরের কমতি যে, রাতভর ড্রাইভ করে এ তল্লাটে খবর খুঁজতে এসেছি। টানা দুঘণ্টা খোঁচানোর সারমর্ম এটাই যে, পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তবেই তাঁরা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। ঘটনার তিনদিন কেটে গেছে কেউ নাকি লিখিত অভিযোগ জানায়নি। অথচ আমি তো উল্টোটাই শুনলাম। কথা আর বেশি বাড়ায়নি। মনের মধ্যে পাক খাচ্ছিল ঘিনঘিনে ভাবনাগুলো।
সন্ধ্যে ৭টা নাগাদ হাত পা টানটান করার একটা জায়গা পাই। খসে নগদ ১০০০ টাকা। হোটেল বলা ভুল। তেমনটা পাওয়ার আশাও করিনা। এক কামরার ঘর। চায়ের দোকানের পিছনে। মালিক সতীশ দলুই। দুটো রুটি আর খানিকটা খোসাসমেত আলুর তরকারি খাই। এইমাত্র সারাদিনের রেকর্ডিং কনভেরসেশনগুলো ফাইল বন্দি করলাম। চোখ টানছে। আজকের মত এটুকুই।

মার্চ ১৬, ২০১৫; সোমবার, রাত ৮টা

প্রতিবন্ধকতা! শব্দটা যেন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানীয় জলের চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক ক্রমবর্ধমান। এখনকার হিসাবে, শহরের তুলনায় গ্রামীণ মানুষের চাহিদা অনেক কম। মাত্র ৪০লিটার। জাতিসংঘের (UNO) হিসাব বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের দেশের জনসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর মানে, দেশের জল সঙ্কটাকীর্ণ এলাকার জনসংখ্যা বর্তমানের ৩২কোটির থেকে ২০৫০সালে বেড়ে দাঁড়াবে ৮৪কোটিতে। এটা সাধারণ হিসাব। যদি আরো গভীরে যাওয়া যায়, দেখা যাবে দেশের গৃহীত নীতি সমূহের কুফলগুলোর দিকে, তাহলে তো অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত অবস্থায় পড়বো আমরা। নাহ, রচনার বইগুলোর মত লাইন দিয়ে সুফল, কুফল বিস্তারিত আলোচনায় যাবার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই। তবে গোটা ২ দিনের নিরিখে বলি, আমরা প্রায় তলানিতে এসে পৌঁছেছি। যে ছারপোকাগুলো বসে বসে নিঃসাড়ে শুষে নিচ্ছে A টু Z সবটুকু। সেগুলোর সুতো গোটানো শুরু হলেই নির্মম, কদাকার যাপনচিত্রের ভয়াবহতা বেরিয়ে আসছে তার নখ, দাঁত সহ।

শুধুমাত্র দপ্তর, দপ্তরের ক্ষতির মোকাবিলা করতে আমি, শতরূপ সান্যাল মাঝদিয়ায় আসিনি। খাওয়া, দাওয়া, ঘুম আর বড়জোড় দু-চারটে না ঘটা ঘটনাকে, ঘটা করে ছাপতে পারলেই চলে, এমন মানসিকতাকে পেটের তাগিদে প্রশ্রয় দিতে হলেও আজ যখন বিলু আর রফিক মাঝির পরিবারকে দেখি একবাটি মুড়িকে জল দিয়ে ভিজিয়ে দু-বেলা কোনোমতে টেনে নেবার প্রয়াস। তখন তাবড় শহুরে মানসিকতা থেকে বেরিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে, কলম ছাড়া অন্য কোনো ভাবে কি আমি মানুষ হিসাবে এদেরকে মিনিমাম সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সাহসটুকু অন্ততঃ দিতে পারিনা।

অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় মাঝদিয়া, রানাঘাট ২নং ব্লকের উত্তরপাড়া, জাফরনগর, রঘুনাথপুর সীমানায় কিছু লোকদেখানো কাজ শুরু হয়েছে। উপজেলার হালালপুর, হিজুলী, বরেন্দ্রনগর, শান্তিনগর, আড়ংঘাটা, বাগানবাড়ি ইত্যাদি চূর্ণী নদী সংলগ্ন এলাকাতেও ইউনিয়নের ১৯০জন শ্রমিক অংশ নিচ্ছে। শোনা যাচ্ছে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলায় একই ধরণের অভিযান চালানো হবে। কিন্তু নদীপাড়ে গড়ে ওঠা এই জনপদ শ্রীহীন হয়ে পড়লো কিভাবে! এ উপলক্ষে আজ নদীয়ার মাঝদিয়া রবীন্দ্রভবনে কৃষ্ণগঞ্জের বিধায়ক অঞ্জন মাইতি ও রানাঘাটের সাংসদ আবির বসু একটি সাধারণ সভা করেন। নেহাৎ ছেলে ভোলানো ছড়া। বড় মাপের মানুষগুলোর হম্বি তম্বি ঘিরে ইউনিয়নের ঝান্ডা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল গরম মেজাজের জনাবিশেক। কথা হচ্ছিল ওদেরই একজনের সাথে-

“আপনি দেখি সবু জানোক বাবু। এটাক জানোক নাই, পরাণের লাগি সব প্রাণীই যা করে, আমরাও তাই করতাছি। ”

“কিন্তু নদীর জলে কোমড়বাঁধে তো ক্ষতি হচ্ছে। ”

“আপনি কে কহেন দেখি, সামনে দিয়ে দেখে সরে আসেন। হাত দিবেন না, আর যদি যান এমন টুসকি দিবো যে... আকাশের শকুন ছাড়া কারো নজড়ে পড়বেক নাই। ”

রক্তচক্ষু দেখিয়েছিল ভারী চেহারার তামাটে গড়নের লোকটা। হাতখানেক দূরে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েক মাথা হেঁট করে। কেউ কেউ ফিচেল হাসি দিচ্ছিল এমন তামাশা দেখে। জেদটা চেপে বসছিল ক্রমশঃ। এরা হচ্ছে মাজদিয়ার রাজনীতিক মদতপুষ্ট একদল ইউনিয়ন গোষ্ঠী। হুমকি, দলবাজি, দাদাগিরি এদের বাঁ-হাতের খেল। ভারী চেহারার লোকটা হয়তো দলের লীডার। ওদের কথাবার্তায় বুঝলাম, নাম খুব সম্ভব অজয়।

ব্যাপারটা আরেকটু স্পষ্ট করে বলি, বৈশাখ মাস আসতে এখনো ৬০দিন বাকি। এখনই কবিগুরুর কবিতার ছোট নদীর মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে নদীয়া জেলার মাঝদিয়ায় একমাত্র জীবিকাবাহক নদী চূর্ণী। এই নদীকে ঘিরেই একসময় নদীতীরবর্তী এক বিশাল জনপদ তাদের জীবন জীবিকা চালাতো। আজ সমস্ত মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির পথে। বেকার হয়ে মানবেতর দিনযাপন করছে এখনকার জেলে পরিবারগুলো। চূর্ণী এখন তাদের কাছে দূর আত্মীয়ের মত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ১৯৬৮-৬৯ সালে ভারত গঙ্গার উপর ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে ও বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৫ সালের ২১শে এপ্রিল ভারত, ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। এরপর থেকেই মৌসুমী-বায়ূ প্রত্যাহারের পর অব্যাহতভাবে পদ্মার জল কমতে থাকে। ফলে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে মাথাভাঙ্গা ও চূর্ণীর উপরেও। সেই থেকেই এই দুই নদীতে ক্রমান্বয়ে জলের প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় স্রোত কমে গিয়ে পলি পড়ে ভরাট হতে থাকে নদীর তলদেশ। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলার কারণে বর্তমানে চূর্ণী নদী মৃতপ্রায় হয়ে প্রায় খালের আকার ধারণ করেছে। চোখেও পড়লো তেমনটাই। কোথাও জল কমে হাঁটু সমান, কোথাও আবার সামান্য। জট পাকিয়ে আরো কয়েকটা জায়গায়।

হাঁসখালি গ্রামের বাসিন্দা বিলুকে রাজি করিয়ে ডিঙি নিয়ে গেছিলাম নদীর প্রায় মাঝ বরাবর। ভয়াবহ চিত্রগুলো চোখে পড়ে ওখানেই। নদীর স্বচ্ছতা কোথায় যেন হারিয়েছে। চূর্ণী প্রায় ৬০ কিলোমিটার বয়ে হুগলিতে পড়েছে। তবে বয়ে চলার স্বাভাবিক ছন্দ বিলীন। পচা দুর্গন্ধে টিকে থাকা দায়। মনে হচ্ছিল আমি কোনো ভ্যাটে এসে পড়েছি। চারপাশে কালো কালো কীসব ভেসে বেড়াচ্ছে। বিলু বললো, কারখানার বর্জ্য। জলে ভাসা কালো বস্তুগুলো জলের পোকা। আবর্জনায় জন্ম হয়েছে। বিলু বলেই চললো, আগে রুই, কাতলা, চিংড়ি, বেলে, পুঁটি, চিতলের মত মাছ পাওয়া গেলেও এখন কেবল লাটা, ফলুই, জিওলের মত কয়েকটা মাছ রয়েছে। তাইই ধরতে হচ্ছে। সে সবও দুর্গন্ধে ভরা। বিক্রি হয়না। তার উপর এই বাঁধ।

নদীর পাড় ও নদীসংলগ্ন রাস্তা ২০ কিলোমিটারের বেশী। ১০-১২টির ও বেশি স্থানে বাঁশের সাঁকোসহ আড়াআড়িভাবে বাঁধ। কোমড়বাঁধ, জংলা। কোমড়বাঁধ হলো, মাছ শিকারের জন্য গাছের ডাল ও কাটা বাঁশ পুঁতে খানিকটা জায়গা ঘিরে রাখা আর খুঁটির সাথে লাগোয়া জাল পাতা হলো জংলা। নষ্ট হচ্ছে মাছের বংশ। রেহাই নেই চারা মাছ এমনকি মাছের ডিমেরও। শুধু এতেই থেমে নেই।

চূর্ণীর দুইধারের মাটি কেটে নানারকম ফসলের আবাদ চলছে। ফলে নদীর পাশের আলগা মাটি বৃষ্টির জল ধুয়ে তলদেশ ভরাট হচ্ছে। তাজ্জব বনে গেছিলাম। বিলুকে বলেছিলাম, “তোমরা চুপ করে আছো কিসের জন্য? এমন দিনের পর দিন চলতে থাকলে তোমরা তো ভেসে যাবে। ”

-ও বলেছিলো- “পরাণটুকু যা রইছে, বাকি তো সব গ্যাছে। নালিশ শুনবার কেউ লাই।” অর্থাৎ বাঁধ তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক দলের পরিচয় বহন করে। অভিযোগ করেও কোনো লাভ নেই। কিছু একটা করার তাগিদ ভিতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।

ডিঙি থেকে নেমে সোজা হাঁটা লাগিয়েছিলাম রানাঘাটের সাংসদ আবীর বসুর দপ্তরে। বললেন, “কি মশাই, এটুকুও খবর রাখেন না। বিকেল পর্যন্ত প্রায় গোটা পাঁচেক কোমড়বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে।”

এমনকী অভিযানে বাধা দেওয়ায় সামসুল বলে এক ব্যক্তিকে ভ্রাম্যমান আদালত জরিমানা পর্যন্ত করেছে। আর তাছাড়া কিছুদিন পরেই মাছের প্রজনন ঋতু। তাই বাকি যে কটা বাঁধ আছে তা মাছেদের বংশ বৃদ্ধির জন্যই। মুখের উপর বলে দিতে ইচ্ছে করছিলো আমি পাক্কা ২টো ঘণ্টা ওখানেই ছিলাম। অর্থাৎ আপনার এই মনগড়া গপ্পো আমাকে শোনাবেন না। মাছের বংশবৃদ্ধিতে কোমড়বাঁধ কতটা সহায়ক তা ভালোমতেই বুঝেছি। ঘূণি জাল দিয়ে এমনভাবে কোমড়বাঁধ রয়েছে যাতে মাছের ডিমও উঠে আসে। ফলে এ অবস্থায় মাছের বৃদ্ধিতো দূরের কথা প্রকৃতপক্ষে দিনান্তে একটা মাছ পাওয়া গেলেও তা গরীব ঘরে মোহর পাওয়ার সমান হবে। কিছু ভালো লাগছেনা। চোখ বুজে শুধু বিলুর একটা কথাই মনে পড়ছে বারবার-

“চূর্ণী না বাঁচিলে আমরাও বাঁচবোক লাই। গোটা চৌহদ্দি শ্যাষ হইয়ে যাবেক। ”

মার্চ ২০, ২০১৫; শুক্রবার, রাত ১:২০

আজ নিয়ে চারদিন। রফিক জেলে লা-পাতা। কেউই কোনো খোঁজ দিতে পারছেনা। সকাল থেকে সন্ধ্যে শুধু চরকি পাকের মত ঘুরে চলেছি। তল পাচ্ছি না। ১৭ তারিখ ভোর রাতের দিকে রোজের মত মাছের আশায় বেরিয়েছিল রফিক। আলো ফোটার সাথে সাথে বেলা বাড়তে শুরু করলে রফিকের ভাই নিজাম নদীর পাড় ধরে খানিকটা গিয়েও যখন দেখা পায় না, তখন গ্রামবাসী কয়েকজনকে নিয়ে কাছাকাছি আড়ৎপট্টিতেও খোঁজ করে। কোথাও পাওয়া যায়নি জলজ্যান্ত মানুষটাকে।

ইদানিং মাছ পাবার আশা অনেকটা কমে গেলেও ভোরের দিকে অনেকেই নদীপাড়ের তীরবর্তী অঞ্চলে নিজেদের ডিঙি ভেড়ায়। কেউ কি দ্যাখেনি ওকে! বিলু? হ্যাঁ বিলু-তো ওর সাথে প্রায়ই থাকে। সেরকমই দেখেছি। এক চিলতে আশা নিয়ে গিয়েছিলাম বিলুর বাড়ী।

“মেইয়ার বিয়া বৈশ্যাখে। সদর গেল। আজ ফিরবেক লাই।” দায়সারা উত্তর। অথবা একেবারেই অজুহাত।

পরপর দুদিন বিলুর বাড়ী গিয়েও ফেরত এসেছি। কি করবো, কি করবো করতে করতে হটাৎ একটা বিষয় আবছা ছায়ার মতো আমার গুরুমস্তিষ্ক জুড়ে হানা দিলো। ঠিক করলাম কালই রাঘববোয়ালের খোঁজে বেরোবো।

মার্চ ২২, ২০১৫; রবিবার, সকাল ১১টা ২২মিনিট

মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে নিতেই আবছা শরীরটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল হ্যারিকেনের আলোয়।

বিলু!!!

যন্ত্রনায় কুঁকড়ে চিৎকার করে উঠতেই আবারো সবল হাতটা মুখের উপর গেঁথে বসেছিলো। ঝাঁঝালো গন্ধটায় মাথা তুলতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কোনো অতলে হারিয়ে যাচ্ছি। গভীর, খুব গভীর, অতল, কালো অন্ধকার আর একটা গন্ধ... ঠিক এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানা নেই। চোখ খুলতেই একটার পর একটা শব্দ স্পষ্ট হচ্ছিল শব্দকোষে। ভারী শরীরটাকে কোনোমতে সোজা করে উঠবার চেষ্টা করতে, পায়ের ব্যথা নড়েচড়ে ওঠে। ডানপায়ের হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত মোটা কাপড়ের ব্যান্ডেজ। কোমরে অসহ্য যন্ত্রণা। শরীরের শিরায় শিরায় বিষ দাঁতের অণুরা মনে করিয়ে দেয়, কালরাতের সমস্ত। খাটের লাগোয়া টেবিলের তলা থেকে খুব ঝুঁকে ব্যাগ থেকে বার করি ডায়েরিটা।

যে ছকটা কষে নিয়েছিলাম মনে মনে, সেই মতোই বেরিয়েছিলাম কাল সন্ধ্যের দিকে। জীবনও, আমার পায়ে পায়ে এগিয়েছিল। সামনের দোকানটায় টুকটাক কাজ করে মালিকের হাতে হাতে। মাসোহারা ৫০০ টাকা। শিবনিবাসের মালোপাড়ায় মা আর ছেলের সংসার। আসা যাওয়ায় মোট ৬কিমি পথ। বাবা পেশায় মৎস্যজীবী ছিলেন। ব্যবসা মন্দ যাওয়ায় সুন্দরবনের মংলায় কখনো মাছ ধরতে যায়। তারপর থেকে আজও কোনো সংবাদ নেই। তিন বছর কেটে গেছে। ওরা ধরেই নিয়েছে হয়তো বাবা বেঁচে নেই। মা এদিক ওদিক সবজি বিক্রি করে, কিন্তু ৬ মাস হলো হাতে অসহ্য চুলকানি হওয়ায় কাজ করতে পারেনা। তাই ক্লাস ৫-এর পর, আর পড়া হয়নি জীবনের। গল্পগাছা করতে করতে এগিয়ে যাই চূর্ণীর পাড় ধরে। পাড়ের পচা বিশ্রী গন্ধ আর রাতের কালো মাঝদিয়ার চেহারাটা করে তুলেছে শ্বাপদের মত।
কিছুদূর এগোতেই মালোপাড়া ঢোকবার ঠিক আগের মুহূর্তে কিছু কথা কাটাকাটি কানে আসে। সামনের জমাট অন্ধকারে মিশে আছে আরো কয়েকটা কালো মাথা। চাপা গলায় কারা যেন রুষ্টভাবে কীসব বলাবলি করছে। আমি জীবনকে জোরে হেঁটে এগিয়ে যেতে বলি। মোবাইলে দেখি, রাত প্রায় ৯টা। কেমন একটা খটকা লাগছিলো। আশেপাশের দোকানগুলোর ঝাঁপ বন্ধ। মফস্বল এলাকায় রাত খুব তাড়াতাড়ি হয়। তার উপর এযাবৎ অরাজকতার দরুন মানুষজনও কম রাস্তায়। একটা মুদির দোকানের পাশে দাঁড় করানো বাঁশের আড়ালে নিজেকে আড়াল করি। বোঝার চেষ্টা করি ব্যাপারটা কি!

সব মিলিয়ে গোটা দশেক লোক। অন্ধকারে ঠিক মত ঠাওর করতে পারছিনা ঠিক কথাই তবু স্পষ্ট হচ্ছে ধীরে ধীরে। সয়ে আসছে অন্ধকার। চারটে বেশ বড় আকারের বাক্সের উপর পা দিয়ে আন্দাজ বছর চল্লিশের একজন দাঁতচাপা রাগ প্রকাশ করছে। সামনে মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে। আরে! এটাতো.... আর একটু কাছে এগোতে যাবো কি....তীক্ষ্ণ ছুরি যেন কেটে বসলো ডান পায়ের পাতায়। মনে হচ্ছে শরীর থেকে এক ঝটকায় ছিঁড়ে গেল যেন শিরা-উপশিরাগুলো। মুখ দিয়ে না চাইতেই বেরিয়ে এলো আর্ত, আতঙ্কের চিৎকার। সজোরে পা ছাড়াতেই দেখি, কুকুরটা তখনও কামড়ে ধরে রয়েছে জিন্সের খানিকটা। আমার চিৎকার ততক্ষণে নদীপাড়ের নিস্তব্ধতা ছিন্নভিন্ন করে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কানেও পৌঁছে গেছে।

হ্যারিকেন হাতে একটা লোক এগিয়ে আসছে। আমার মস্তিস্ক বললো, শতরূপ তুমি নিরাপদ নও। এমন পরিস্থিতি জীবনে নতুন নয়। কিন্তু যন্ত্রণা আর পায়ের অসাড়তা কনফিডেন্স-এ কিছুটা ঘাটতি আনছিল। আমাকে ফিরতে হবে। পিছনের শব্দ এগোচ্ছিল ক্রমশঃ। হাত দুয়েক দূরত্ব। কান, মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। অবশ হয়ে যাচ্ছে পা, পায়ের পাতা। টেনে চলছি, ছুটছি। ছুটতে পারছি কৈ! অশ্রাব্য গালিগুলো আমাকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে। হটাৎ একটা প্রবল টান সজোরে আমার শরীরকে হিঁচড়ে টেনে আনলো অন্ধকারের গভীরে।

আমি কি ধরা পড়ে গেলাম!!

পায়ের যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা শরীরে। কুঁকড়ে কঁকিয়ে উঠছিলো ধমনীগুলো। এ আমি কোথায় এলাম! খসখসে বিছানার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো সমস্ত শরীর। ঘরের কোণের ক্ষীণ আলোটা স্পষ্ট হচ্ছে....এ আমি কাকে.. .দেখলাম... এ তো...

আর তারপর আজ! এই ঘরে! জানলা খোলা! সকালের আলো রোদের প্রকোপ বাড়াচ্ছে... ওই লোকগুলো... ঝাঁঝালো গন্ধ... পায়ের আড়ষ্টতা... গলা শুকিয়ে আসছে... আর হয়তো কিচ্ছু লিখতে পারবোনা তাই... জীবননন..


(ক্রমশঃ)
অলংকরণ - মৈনাক দাশ

পাঠকেরা যা পড়ছেন