দ্য লেপিজ লাজুলি

পারমিতা বণিক


বচসাটা বাঁধল সেইবার শীতকালে। অর্ক যে ফ্ল্যাটে থাকে, তার নীচের ফ্ল্যাটে থাকা ভদ্রলোক নাকি সকালবেলায় দরজা খোলেননি। গৃহ পরিচারিকা সকালবেলায় অনেকবার বেল বাজানোর পরও কোন সাড়া-শব্দ না পেলে ব্যাপারটা এপার্টমেন্টে জানাজানি হয়। জানানো হয় সোসাইটির সেক্রেটারি মহোদয়কে। সোসাইটিতে থাকা অর্কের খুব প্রিয় একজন মানুষ বছর সত্তরের সত্যেন্দ্র মল্লিক। দাদু বলে ডাকে অর্ক। বছর তিনেক উনি এখানে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। উনিই ফোন করে জানালেন অর্ককে। খবর পেয়ে অর্কও ছুটে আসে। দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে দেখা গেল বেডরুমের দরজাটা আংশিক খোলা। ড্রয়িং রুম পেরিয়ে বেডরুমে ঢুকে দেখা গেল ভদ্রলোক বিছানায় শুয়ে। বাম হাতটা বুকের বাঁ দিকে রাখা। এপার্টমেন্টে থাকা কয়েকজনই পেশায় ডাক্তার। এনাদের মধ্যে একজন খুব ভালভাবে চেক-আপ করলেন উনাকে। তারপর বললেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন আকস্মিক। বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে মারা গিয়েছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। পুলিশ না আসা পর্যন্ত কেউই উনাকে স্পর্শ করার সাহস করে উঠতে পারেনি। পেশায় ফটোগ্রাফার অর্কের চিরসাথী তার গলায় ঝুলানো ক্যামেরা। আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনাটির প্রত্যেকটি দিক সে খুঁটে খুঁটে ক্যামেরাবন্দী করল। সদলবলে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির পুলিশের কর্তাবাবু।

“তা এনার নিজের লোকেদের কোনও খবর দিয়েছেন আপনারা?” পুলিশের কর্তাবাবু জিজ্ঞাসা করলেন।

“আজ্ঞে উনার নিজের লোক বলতে নাকি কেউই নেই। বছর দেড়েক এই ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে কাজ করার কাগজপত্তর সোসাইটি ফাইলে জমা দিয়েছিলেন। বড্ড ভাল মানুষ। এই দেড় বছরে কারোর সাথে কোনদিন কোনকিছু নিয়েই ঝামেলা বাধেনি রমাকান্তদার।” সোসাইটির সেক্রেটারি খুব সাবলীলভাবে বললেন।

আইনানুগ যাবতীয় কাজকর্ম শেষ করে ফ্ল্যাটটি তালাবন্দী করে দিল পুলিশ। সারা এপার্টমেন্টে একটা থমথমে ভাব। গলা দিয়ে যেন খাবার নামছে না কারোর। সত্যেন্দ্রবাবুর কথায় সেই রাতটা উনার সাথে উনার ঘরেই কাটাল অর্ক।উনি জানতেন যে রমাকান্তবাবুকে অর্ক ইউ. সি. বলে ডাকতো। মানে আঙ্কেল চকলেট। অর্ককে প্রায়ই চকলেট দিতেন কিনা! তাই।অর্ক যেন একটা ধাক্কা গেল ব্যাপারটায়। সবসময়ের ছটফটে অর্ক একেবারে চুপ করে গেল। সত্যেন্দ্রবাবু সেই রাতটা তাই একা ছাড়লেন না অর্ককে।

পরের দিন সকালেও অর্কর ছটফটানির পারদ কিছুতেই নামছে না। কোথায় যেন কি যেন একটা হিসেবে গন্ডগোল। না মেলা অঙ্ক ভেবে ছেড়ে দেবার পাবলিক অর্ক নয়। কিন্তু মেলাতে পারছে না কিছুতেই। নিয়মানুবর্তিতার অনুশীলনকারী এমন একজন মানুষ খুব কমই দেখা যায়। অর্কের সাথে খুব কথা হতো ইউ.সি.-র। হঠাৎ অর্কের স্মৃতিপটে ভেসে উঠল একটি ছবি।দৌড়ে গিয়ে ফ্ল্যাশ হয়ে আসা ছবিগুলো থেকে একটা ছবি বের করল। এবারে অর্কের গোয়েন্দা দিমাগ মাথাচারা দিয়ে উঠল। ইউ.সি.-র পাশে রাখা একটি বই। শরদেন্দু বন্দোপাধ্যায়ের কাহিনী, ব্যোমকেশ বক্সীর ‘সত্যান্বেষী’।

“ইমাজিনেশনের জগতে বিচরণ আমার কম্ম নয়। বিশেষ করে ডিটেকটিভ ফিকশন তো নয়ই।”, ইউ.সি.-র বলা কথাটি বার বার কানে বাজতে লাগল অর্কের।

ধোঁয়াশার ঘেরাটোপ থেকে যেন বেরিয়ে আসছিল জিনিসপত্র। তার মানে ব্যাপারটা এতো সরল নয়। সেই রাতে বিল্ডিং এর পেছনের পাইপ বেয়ে ব্যালকনি মাধ্যমে ইউ.সি.-র ঘরে ঢুকল অর্ক। টর্চের আলোয় দেখতে লাগল কোথাও কিচ্ছু যদি মেলে। বইয়ের তাকগুলো খুব সাজানো গোছানো। একেবারে পরিপাটি ঘরটাও। কোন কিচ্ছু পাচ্ছে না অর্ক। টেবিলের উপর রাখা ডাইরির ১৪ নম্বর পাতায় লেখা দেখল সি.বি.এল.। অর্কের মাথায় কিছুই ধরছিল না। কি হতে পারে এর মানে! একটু একটু করে পিছুতে পিছুতে আলমারিতে গিয়ে ঠেকে গেল অর্কের পিঠ। মিলে গেল সমীকরণ! কাপ-বোর্ড লকার। হুট করে ঘুরে কাপ-বোর্ডের দরজাটা খুলল। লকার খুলেই দেখে সেখানে রাখা নীল রঙের একটি ফাঁকা বাক্স। বাক্সের মুখটা খোলা। হয়তো কিছু একটা নেই সেখানে। ঘরে আর কিছু না পেয়ে ফাঁকা বাক্স নিয়ে নিজের ঘরে গেল অর্ক। ঘরে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। অর্কের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। কিছু দিন ধরে অর্কের ফোনে একটি সমস্যা হচ্ছে। সে কারোর সাথে কথা বলার সময় আরেকটি কল চলে যায় তার শেষবার কথা বলা নম্বরে। অনেকটা নিজে থেকে কনফারেন্স। ভাবতে ভাবতে আরও একটি সূত্র পেল অর্ক। খতিয়ে জানতে পারল শেষবার ইউ.সি.-র সঙ্গে কথা বলার সময় অর্কের বন্ধু আবিরের সাথে কলটা কনফারেন্সে কানেক্ট হয়েছিল। ছুটে গেল আবিরের বাড়ি। ঘরে ঢুকেই দেখে আবির একটি নীল রঙের পাথরের মতো কি একটা হাতে নিয়ে অবিরত হেসেই চলেছে।

ঘুরে তাকিয়ে আবির বলল- “তুই খুব বুদ্ধিমান। জানতাম কেসটা ধরে নিবি। কিন্তু ভাই এবার যে মালিকটা আমি।”

“মানে?”

“শোন। সেদিন ইউ.সি.-র সাথে কথা বলার সময় ফোনটা হঠাৎ কেটে গেছিল। মনে আছে?”

“হ্যাঁ। কিন্তু...”

“বলছি বলছি। ইউ. সি. সেদিন একটি বিশাল রহস্য উদঘাটন করেছিলেন। মানে এটা। যার নাম লেপিজ লাজুলি। যার কাছে এই লেপিজ থাকে, ব্রহ্মান্ডের মালিকানা তার। অপেক্ষা করতে হবে দু-দিন। দু-দিন আমার কাছে থাকলেই ব্যস! সারা ব্রহ্মান্ডের মালিকানা আমার। এই লেপিজ আমায় দেবে চন্দ্র-সূর্য কক্ষচ্যুত করার অসীম ক্ষমতা।”

“সৌরজগতের বাইরে নিয়ে যেতে পারে আমাকে এই লেপিজ। লেপিজের যা কিছু শক্তি সমপরিমাণ আমার হবে মাত্র আর কয়েক ঘন্টা বাদে। আমার গুলাম বানিয়ে রাখবো সবকিছুকে। বলতে বলতে আবিরের চোখ-দুটো লাল হয়ে এলো।

“মানুষতো ধূলিকণাসম মোটে। একেকটি গ্রহ, তথা ব্রহ্মান্ড আমার অঙ্গুলি নির্দেশনায় চলবে।”

হাঁ করে তাকিয়ে রইল অর্ক। “তার মানে এটা তুই চুরি করতে গিয়ে ইউ. সি.-কে মেরে ফেললি।”

“ঠিক তাই! তোর ইউ. সি. এখন স্বর্গ কিংবা নরক কোথাও একটা হবে। তোর ধম্মে সইছে না। তাই না? কিন্তু কিছু করার নেই আসলে। এবার থেকে আমার ইশারায় চলবে সব। মানে আর কয়েক ঘন্টা বাকী শুধু। একটা কাজ কর। একবার ধরে দেখ লেপিজকে। বন্ধু বলে কথা। এইটুকু তো তোর জন্য করতেই পারি।”

অর্ক লেপিজকে স্পর্শ করতেই লেপিজ থেকে বেরিয়ে এলো অজস্র নীলাভ রশ্মি। সারা ঘরে তখন নীল আলোর বন্যা। হঠাৎ একটি নীল রশ্মি যেন তেড়ে এলো আবিরের দিকে। ঝলসে গেল নিমেষে আবির। ঘরের সমস্ত রশ্মি ঘিরে ধরলো অর্ককে। চোখের পলকে রশ্মিজাল অর্ককে নিয়ে গেল ভূপৃষ্ঠের অনেকটা গভীরে। সেখানে গিয়ে অর্ক দেখল চারিদিকটা অন্ধকার। অন্ধকারের ব্যাপ্তি ছাড়া আর কিছুই ঠাহর করা যায় না। রশ্মিগুলো অর্ককে ছেড়ে একত্র হয়ে গেল। নিজে নিজেই ফর্মুলেট হল লেপিজ। লেপিজের আলো ঠিঁকড়ে পড়ছে চারিদিকে।

হঠাৎ একটা ঠক্ ঠক্ শব্দ কানে এলো অর্কের। মশাল হাতে কে যেন একটা এগিয়ে আসছে। চেহারাটা স্পষ্ট হতেই চক্ষু চরকগাছ অর্কের।

“কি নাতি! চোখগুলো দেখি একেবারে ফুটবল হয়ে গেল!”

“দাদু তুমি!”

“হ্যাঁ। আমি। বুঝতে পারছো না তো? ব্যাপারটা বলছি। শোনো।”

“তুমি যেখানে এখন আছো, সেটা ভু-পৃষ্ঠ থেকে দশ লক্ষ ফুট নীচে। কর্ডেক নামক এই জলমগ্ন পাতালের মাত্র এক বর্গ মিটার শুকনো। এটা আমার এলাকা। আর আমি হলাম ইউকোডা। এই ব্রহ্মাণ্ডের ভবিষ্যৎ অধিকর্তা! একদিন জানতে পারলাম আরও প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ ফুট নীচে রয়েছে এই লেপিজ। যা হাসিল করতে পারলে আমি রাজ করব গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। সেই লেপিজকে রক্ষা করে থাকে এক প্রহরী। তার মৃত্যু নেই। তাকে মারতে পারে কেবলমাত্র আর্গন এবং ক্রমিয়ামের সাথে ক্ল্যাসিয়ামের যুগলবন্দীতে তৈরী একটি কঠিন তিলসম পদার্থ। যা প্রহরীকে ছোঁয়ালেই সে অক্কা। ক্ল্যাসিয়াম আমি খুঁজে পাই এখান থেকে তিরিশ লক্ষ ফুট নীচে। তৈরী করলাম মারণাস্ত্র। এবার সেই লেপিজের কাছে পৌঁছাতে গেলে আমার চাই ব্লাকোডার তৈরী শিল্ড। সেটাও তৈরী করলাম রামধনুর সাতটি রঙ দিয়ে। পৌছে গেলাম সেখানে। প্রহরী তার রক্ষাকার্যে ব্যস্ত। আমার অস্ত্র তাকে ছোঁয়াতেই সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। লেপিজ আমার হাতে। কিন্তু নিয়মমাফিক এই লেপিজ নিয়ে আমাকে থাকতে হবে ভূ-পৃষ্ঠে পাঁচ বছর। একজন সাধারণ মানুষ হয়ে। সেখানে গিয়ে সত্যেন্দ্র মল্লিক হয়ে গেলাম। কিন্তু ঠিক বছর তিনেক পরেই হঠাৎ দেখি একদিন লেপিজ উধাও। কোনওমতেই কারোর কিছুই টের পাবার কথা নয়। ইউ.সি.-র কাছে লেপিজটা কি করে গেল সেটা আমার কাছে একটি রহস্য।”

পেছন ঘুরে জলন্ত মশালটা ঠক করে রাখল ইউকোডা।

“ভাবছো তো আবির এসবের মধ্যে কোথা থেকে এলো?”

বলে অর্কের দিকে ঘুরতেই অর্কের চক্ষু ছানাবড়া।

চেহারাটা আবিরের।

“আবির অন্য কেউ নয়। আমিই আবির। আমি একই সময়ে ভিন্ন রূপে দুই জায়গায় থাকতে পারি। আবির শুধু ভূ-পৃষ্ঠে থাকতে পারে। সে এখানে থাকার জন্যে নয়।

“অনেক তো শুনলে গল্প। তোমার দিমাগটা একটু বেশীই চলে। নাও! এবার তোমার ইউ.সি.-র কাছে যাও দেখি।”

বলেই মশালটা ছুঁড়ে মারল অর্কের শরীরে। দাউ দাউ করে আগুন ঘিরে ধরল অর্ককে। সারা শরীর আগুনের কবলে। নোনা হাসি ইউকোডার ঠোঁটে।

কিন্তু এবার যে ইউকোডার অবাক হবার পালা। জ্বলছে না অর্কের দেহ। সেই আগুনের ভিতর থেকে অগ্নিসম ক্রোধে অর্ক তাকিয়ে আছে ইউকোডার দিকে। আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল আগুনের লেলিহান শিখা থেকে। বেরিয়ে আসতে আসতে অর্কের দেহটা দুটো ভাগ হয়ে গেল। একটি চেহারা অর্ক, অন্যটি ইউ.সি। ইউকোডার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে।

অর্ক বজ্রকন্ঠে বলল, “এই যে ইউকোডা, শোন তোমায় এবার আমি পুরো ঘটনা বলি। লেপিজ তার নিয়মমাফিক ভূ-পৃষ্ঠে যাবার ঠিক তিন বছর পরে তৈরী করে নিয়েছিল সেখানে তার দুই রক্ষক। ইউ.সি. এবং অর্ক। আর লেপিজের এক রক্ষীর কাছে ঠিক তখনই সে পৌঁছে যায়। সাধারণ মানুষ হয়ে থাকতে হতো সেখানে দু-বছর। তারপরেই ছিল নিজের জায়গায় ফিরে যাবার পালা। এই দেহে কার্বন নেই। তাই জ্বালাতে তুমি পারলে না।”

বলতে বলতেই লেপিজ থেকে বের হয়ে এলো লক্ষ লক্ষ নীল রশ্মি। সেই নীলরশ্মির স্রোতে অর্ক এবং ইউ.সি.-র দেহ দুটো মিশে গেল। একটি নতুন নীলাভ দেহ তৈরী হল। এবারের চেহারাটা সম্পূর্ণ আলাদা।

ইউকোডার আকাশ-পাতাল এবার উলটে গেল।

ইউকোডা গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না যেন। “প্র-হ-রী!”

“হ্যাঁ। যে কিছুটা সময়ের জন্য বেহুঁশ হয়েছিল মাত্র।”

ইউকোডা কাঁপতে কাঁপতে বলল- “মানে তুমি ব্রহ্মান্ডের...”

প্রহরী গম্ভীরগলায় বলল, “না। আমি লেপিজের পাহারাদার। আর এটাই আমার কাজ।”

ইউকোডা কিছু ভাবতে পারার আগেই প্রহরীর হাতের তালুতে রাখা লেপিজ থেকে বেরিয়ে এল নীলাভ রশ্মির বন্যা। রশ্মিজালে আবদ্ধ করে ফেলল ইউকোডাকে।
ইউকোডা চিৎকার করে বলল, “আমি লেপিজের দিকে নজর দেব না। আমায়...”

বলতে বলতেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল ইউকোডার দেহ। উর্দ্ধমুখী শিখার সাথে অবসান হল এক লুসিফারের।

প্রহরী আবারও রক্ষাকার্যে ব্যস্ত।

পাঠকেরা যা পড়ছেন