দ্বিতীয় অধ্যায় এক প্রাচীন ঘটনা এবং একটি আতঙ্ক

দ্বিতীয় অধ্যায়
এক প্রাচীন ঘটনা এবং একটি আতঙ্ক


দ্বিতীয় অধ্যায় – তৃতীয় পর্ব

১৭৬৬ সালে জোসেফ কারওয়েনের অভ্যাসে আসে সবিশেষ পরিবর্তন। আর সেটা এতোটাই আকস্মিক ছিল যে নগর অধিবাসীদের মধ্যে তা ব্যাপকভাবে উদ্দীপনার সূত্রপাত ঘটায়। মানুষের মনে জাগা কৌতুহল এবং উৎকণ্ঠাকে ঢেকে রাখার যে একটা পর্দা কারওয়েন টাঙিয়ে রেখে চলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেটা সহসাই যেন এক হাওয়ার ধাক্কায় পচে যাওয়া গাছের মতো ধসে পড়ে গেল। গোপন গা শিউরানো নারকীয়তার চোখ ধাঁধানো পতাকা এবার সকলের চোখের সামনে পতপত করে উড়তে শুরু করলো। সম্ভবত কারওয়েন যা আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন বা শিখেছিলেন বা তৈরি করেছিলেন তাকে জনগণের নজর থেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারছিলেন না। কিন্তু স্পষ্টতই আবিষ্কারের গোপনীয়তার প্রয়োজনটি ছিল অনেক বড় মাপের, মূল বিষয় ভাবনাকে মানুষের সাথে ভাগাভাগি করার তুলনায়। আর এই কারনেই তিনি কখনোই কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি। কিন্তু অকস্মাৎ এই পরিবর্তন দেখা যায়, যা জুলাইয়ের প্রথমদিকে এসেছিল বলে মনে করা হয়। শয়তানের প্রতিরূপ সেই পণ্ডিত মানুষটা মানুষদের চমকে দিতে শুরু করলেন তার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়ে। দেখা গেল উনি এমন এমন সব ব্যক্তিগত খবর নানা মানুষের সম্বন্ধে জানতে পেরে যাচ্ছেন যা কেবলমাত্র ওইসব মানুষদের মরে ভূত হয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষরা জানতো।

যদিও এসব ব্যাপার মানষের সামনে এসে যাওয়া সত্বেও কারওয়েনের রহস্যময় গোপনীয় কাজ কর্মের কোন পরিবর্তন হল না। বরং বলা যায় আরও যেন বেড়ে গেল। দিন কে দিন বাড়তে থাকলো তার জাহাজের ক্যাপ্টেনদের খাটনি। মুখ বুঁজে কাজ করতে বাধ্য ছিল তারা কারণ ধার নিয়ে নিয়ে তারা প্রায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। এই সময়ে ভালো লাভ হচ্ছে না এই অজুহাতে ক্রীতদাসের ব্যবসা বন্ধ করে দেন কারওয়েন। দিনরাতের বেশীর ভাগ সময়টাই পটুয়েক্সট খামার বাড়ীতেই থাকছিলেন। অতি বৃদ্ধ ব্যবসায়ীকে ইদানীং কবরস্থানের আশেপাশেও খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু এমন অনেক স্থানেই দেখা যায় যেখানের সাথে কবরস্থানের সম্পর্ক বিদ্যমান। সহসা কারওয়েনের এহেন অভ্যাসের পরিবর্তনের আসল কারণ কী এই ভাবনাও মানুষের বিস্ময়ের উদ্রেক করেছিল। ওদিকে এজরা উইডেন তার গুপ্তচরবৃত্তি বজায় রাখলেও নিজের কাজের কারণে সেভাবে সময় দিতে পারছিল না। তবুও মনের ভেতর জমে থাকা প্রতিহিংসার আগুনের কারণেই সে আর পাঁচ জনের থেকে অনেক বেশি পরিমাণে এ ব্যাপারে মেতে ছিল। কারওয়েনের প্রতিটা গতিবিধিকে জেনে বুঝে যাচিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তার ভেতর থেকে মুছে যায়নি।

রহস্যময় ওই মানুষটার অনেক অদ্ভুত সময়ের সমুদ্র যাত্রাকে তেমন ভাবে অন্যরা খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। কারণ সেই সময়ে চালু হয়েছিল সুগার অ্যাক্ট। যার কড়া নিয়ম উপনিবেশিক বণিকদের পছন্দ হয়নি। তারা এই আইন ভেঙে কাজ করবে ঠিক করে। ফলে যখন তখন সমুদ্র যাত্রা করাটাকে কেউ তেমন বাঁকা চোখে দেখেনি। কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধ চোরাচালান সে সময় নারাগানসেট উপসাগরে খুব সাধারন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু রাতের পর রাত এজরা উইডেন কারওয়েনের জাহাজঘাটা থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছোট জাহাজ বা নৌকাগুলির পিছু নিয়ে ভালোই বুঝতে পেরেছিল রাজকীয় বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার উদ্বিগ্নতা ওই সব জলপোতদের ভেতরে আদপেই ছিল না। চতুর শয়তান জোসেফ কারওয়েন অন্য একটা গোপন কিছু করছিলেন।

১৭৬৬ সালে কারওয়েনের আচরণের বাহ্যিক পরিবর্তনের আগে অবধি এইসব নৌকাগুলোতে করে সমুদ্রের পথ ধরে শিকল আবদ্ধ নিগ্রোদের নিয়ে আসা হতো পটুয়েক্সট এর উত্তরের উপকূলে একটি বিশেষ স্থানে। সেখান থেকে ওদের উবর খাবর পথে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো খামার বাড়ীতে। ঢুকিয়ে দেওয়া হতো জানালাবিহীন সেই পাথরের বিশাল ভবনটার ভেতরে। পরিবর্তন নজরে আসে যে সময়ে ঠিক সেই সময় থেকেই এই পদ্ধতিটা বদলে যায়। ক্রীতদাসের আমদানি একবারে বন্ধ হয়ে যায় এবং কারওয়েন তার মধ্যরাতের সমুদ্র ভ্রমণও বন্ধ করে দেন|

১৭৬৭ সালের বসন্তকাল থেকে দেখতে পাওয়া যায় এক নতুন নীতি চালু হয়েছে। আবার কালো রাতের অন্ধকারে কারওয়েনের জাহাজঘাটায় মাঝে মাঝেই জ্বলে উঠতে শুরু করলো আলোর শিখা। এবারেও ছোট জাহাজ বা নৌকাগুলো নিঃশব্দে ডক থেকে বেরিয়ে চলে যেতো। তবে খুব বেশি দূর যেতনা। বড় জোর নামকুইট পয়েন্ট। যেখানে অদ্ভুত আকারের বহিরাগত জাহাজ উপস্থিত হতো এবং সেই সব জাহাজ থেকে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন আকার আকৃতির মালপত্র উঠে যেত কারওয়েনের নৌকাগুলোতে। এরপর নৌকাগুলো চলে যেত সেই জায়গায় যেখানে আগে নামানো হতো নিগ্রোদের। ওখান থেকে মালবাহকেরা এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ধরে মাল কাঁধে করে নিয়ে হেঁটে পৌঁছে দিতো অতিকায় পাথর নির্মিত কুখ্যাত খামারবাড়ীতে। যে সব মালপত্র আসতো তার প্রায় সবই বড় বড় আয়তাকার বাক্স এবং প্যাকিং কেস। কিছুতো প্রায় অস্বস্তিকর ভাবের কফিনের মতো দেখতে। সবগুলোই যথেষ্ট ভারী হতো।

উইডেন কিন্তু অবিরাম নজর রেখে গেছে খামারের দিকে; প্রতিরাতে দীর্ঘসময় ধরে। তুষারপাত শুরু হলে একটা সপ্তাহ বিরাম দেয় কাছে গিয়ে নজর রাখার ব্যাপারে। কারণ পায়ের ছাপ পড়লে ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকা থাকবে। সেই সময়ে অন্যান্য দিক থেকে যতটা পেরেছে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। দরকারে বরফ জমা নদীর ওপর দিয়েও হেঁটে গেছে প্রাণ হাতে করে। এসব করতে গিয়ে তার নিজের কাজ ব্যাহত হচ্ছে দেখে এলিয়াজার স্মিথ নামে একজনকে ভাড়া করেছে তার অনুপস্থিতিতে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করার জন্য। এই কাজ করতে গিয়ে তারা কী জানতে পারছে এ ব্যাপারে একটা কথাও কাউকে জানায় নি। কারণ উইডেন ভালো করেই জানতো যে এরকম কিছু প্রচার হয়ে গেলে এ বিষয়ে তাদের অভিযানের অগ্রগতি ব্যাহত হবে। বদলে তারা চেষ্টা করেছে এ নিয়ে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে আরো শক্তপোক্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করার। নিশ্চিত ভাবেই তারা হৃদকম্প সৃষ্টি করার মতোই তথ্য সংগ্রহ করেছিল। তার প্রমাণ মেলে চার্লসের বাবার বলা কথায়।

উনি জানিয়েছিলেন চার্লস নাকি বলেছিল উইডেন পরে তার লেখায় অনুশোচনা প্রকাশ করেছিলেন। কারণ তথ্যপ্রমাণ সম্বলিত সেসব নোটবুক পুড়িয়ে ফেলা হয়। তবে যে সমস্ত গা শিউরানো বিষয় তারা জানতে পেরেছিলেন – সে সবের কিছু কিছু জানা যায় এলিয়াজার স্মিথের লেখা অসংবদ্ধ ডায়েরি-লিখন এবং অন্যান্য নানান ডায়েরি লেখকদের লেখনী ও চিঠি থেকে। ঘুরে ফিরে প্রায় সকলেই বারবার পুনরাবৃত্তি করে গেছেন একই ধরনের কথার - সেসব থেকে এটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, ওই কুখ্যাত খামার বাড়িটিকে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে ওর ভেতরে এক সীমাহীন নিরেট নিখাদ অতল ভয়ঙ্কর কাজ কারবার হয়ে চলেছে। ওটা এমন এক নারকীয় আশ্রয়স্থল যার অজ্ঞাত ছায়াময় গভীরতার তলাতলের হিসেব করা এবং ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব ।

প্রাথমিক ভাবে উইডেন এবং স্মিথ ভেবে নিয়েছিলেন ওই খামার বাড়ীর ভেতরে আছে অনেক সুড়ঙ্গ এবং ভূগর্ভস্থ ঘর । যেখানে বয়স্ক পরিচারক দম্পতি দুজন ছাড়াও আরও অনেক কর্মচারী বসবাস করে। পাথরের বাড়ীটি ছিল সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যে ধরনের পাথরের অট্টালিকা নির্মাণ করা হতো তার উদাহরণ। অনেকগুলো বড় বড় চিমনি মাথা উঁচিয়ে ছিল ছাদের ওপরে। জানালার বদলে থাকা গোল গর্তগুলোতে লাগানো ছিল হীরের মতো চকচকে কাঁচ। এর উত্তরের দিকে ছিল ল্যাবরেটরিটি। যার ছাদ প্রায় মাটির কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। এছাড়া আশেপাশে আর কিছু নেই। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন বিজড়িত কণ্ঠস্বর নানান সময়ে ভেসে আসতো। যারা শুনেছেন তাদের কথানুসারে ওই ভবনের মাটির তলার গোপনপথ থেকেই নাকি সে সব উঠে আসতো।

১৭৬৬ সালের আগে এইসব অস্পষ্ট কণ্ঠস্বরগুলো ছিল নিছক বকবকানি বা নিগ্রোদের ফিসফিস বা আর্তচিৎকার বা সমস্বরে অজ্ঞাত মন্ত্র উচ্চারণের মতো। পরবর্তী সময়ে সে আওয়াজ থামেনি কিন্তু বদলে গিয়েছিল তার রকম সকম। সমস্বরের বদলে চিৎকার আসতো কোন এক জনের গলা থেকে। মনে হতো কেউ যেন অসম্ভব যন্ত্রনা ভোগ করছে অথবা ভেসে আসতো কাতরানির করুণ শব্দ কিংবা ক্রুদ্ধগর্জন। আবার কখনো কখনো ইনিয়ে বিনিয়ে একঘেয়ে কথোপকথন বা গোঙ্গানি। কাকুতি মিনতি বা ঝগড়াঝাঁটির মতো শব্দও বাদ যেত না। উদ্দীপনাময় তীব্র প্রতিবাদের চিৎকারও ভেসে আসতো এক-আধবার। বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতো সেই সব অজানা অচেনা অজ্ঞাত কন্ঠস্বরের মালিকেরা। আর অবাক করা ব্যাপার এই যে, সেসব ভাষার প্রত্যেকটাই জানা ছিল শয়তান চূড়ামণি কারওয়েনের। যার প্রমাণ মিলতো কারওয়েনের তীব্র তীক্ষ্ণ উচ্চারণের উত্তর শুনে। সেগুলো বেশির ভাগ সময়েই তর্ক বা হুমকির মতো শোনাতো। আর এর থেকেই মনে হতো অনেক অনেক মানুষ থাকে ওই বাড়ীতে। কারওয়েন স্বয়ং, তার বন্দীর দল এবং বন্দীদের রক্ষীরা। বিদেশী ভাষার ব্যাপক জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও উইডেন বা স্মিথ কখনোই ওই সব কণ্ঠস্বর শুনে সব কথার মানে বুঝে উঠতে পারেননি । বুঝে উঠতে পারেননি মানুষগুলো কোন দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল। কথোপকথনের ধরণ শুনে দুই অনুসন্ধানকারীর মনে হতো যেন সবসময়ই কিছুর তদন্ত চলছে। কারওয়েন ভয় দেখিয়ে বা অত্যাচার করে ওই আতঙ্কিত বিদ্রোহী বন্দীদের কাছ থেকে যেন বিভিন্ন রকমের গোপন খবর সংগ্রহ করে চলেছেন।

উইডেন তার নোটবুকে সেই সব কথোপকথনের অনেকগুলো লিপিবদ্ধ করেছিল; তার জানা ইংরেজি, ফরাসি, এবং স্প্যানিশ ভাষায় যখন যেমন পেরেছিলেন। কিন্তু সে নোট বই তিনি নিজের হাতেই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীকালে তার কথা থেকে জানা যায় সেই সব ঘৃণ্য কথোপকথনের ভেতরে প্রভিডেন্স পরিবারের অতীতের বিষয়গুলি নিয়েও যেমন কথা ছিল তেমনি ছিল অনেক প্রশ্ন-উত্তর। অধিকাংশ প্রশ্ন ও উত্তর ছিল ঐতিহাসিক বা বিজ্ঞান বিষয়ক। মাঝে মাঝে সেসব প্রশ্নের সাথে নানা দূরবর্তী স্থান এবং সময়ের সম্পর্কও দেখা যেতো। উদাহরণস্বরূপ, ১৩৭০ সালের লিমোজেসে ব্ল্যাক প্রিন্সেস ম্যাসাকার সম্পর্কে ফরাসীভাষায় একটি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। এক রাগী চিৎকার চ্যাঁচামেচি করতে থাকা বন্দীকে। সেই ম্যাসাকারের পেছনে গোপন কারণ কী ছিল এটাই জানার উদ্দেশ্য ছিল কারওয়েনের। উনি বন্দীকে জিজ্ঞাসা করলেন (আদতেই সে কোনও বন্দী কি-না তা অবশ্য জানা নেই) ক্যাথিড্রালের নীচে প্রাচীন রোমান ক্রিপ্টের বেদীতে পাওয়া ছাগলের চিহ্নের কারণেই কি হত্যার আদেশটি দেওয়া হয়েছিল নাকি বাহটভিয়েনেকোভেনের কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ সেই বিশেষ তিনটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন? আশানুব্যঞ্জক কোনো উত্তর পেতে ব্যর্থ হয়ে কারওয়েন চরম কিছু প্রয়োগ করেন। যার ফলস্বরূপ এক কর্ণভেদী চিৎকার ভেসে আসে। তারপর সব নীরব হয়ে যায় ...কিছুক্ষন বাদেই ভেসে আসে এক উৎকট বিড়বিড়ানি এবং সজোরে কিছুর আছড়ে পড়ার শব্দ।

এই কথোপকথনের কিছুই অবশ্য দেখা যায়নি। জানালায় ঝোলানো ছিল ভারী পর্দা। একবার এরকম এক অজানা কন্ঠস্বরের বক্তৃতার সময় একটি ছায়া উইডেন পরিষ্কার ভাবে দেখতে পেয়েছিলেন এবং দারুণ ভাবে চমকে গিয়েছিলেন। উইডেনের মনে পড়ে গিয়েছিল হ্যাকারস হলে ১৭৬৪ সালের শরত্কালে দেখা এক পাপেট শো এর কথা। যেখানে পেনসিলভানিয়া জার্মান টাউন থেকে আসা পুতুল নাচিয়ে লোকটি, "জেরুজালেমের বিখ্যাত শহর দেখুন" নামের শো দেখিয়েছিল। জেরুজালেম, টেম্পল অফ সলোমন, তার রাজকীয় সিংহাসন, বিখ্যাত টাওয়ার এবং পাহাড়গুলো, সাথেই গেথসেমানে গারডেন থেকে গলগথা পাহাড়ের উপর আমাদের ত্রাণকর্তার ক্রস বহন করার দুঃখভোগের প্রতিরূপ দেখিয়েছিল সেই শোয়ে। স্বীকার করতেই হবে মানুষকে ভালোই আনন্দ দিয়েছিল। এই ছায়া দেখে অতিরিক্ত কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে উইডেন জানলার দিকে এগিয়ে যায়। যেটা দেখতে পেয়ে সেই ইন্ডিয়ান দম্পতি ওদের দিকে কুকুর লেলিয়ে দেয়। এর পর থেকে আর কোনও কথোপকথন শোনা যায়নি বাড়ীটা থেকে। উইডেন এবং স্মিথ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কারওয়েন জিজ্ঞাসাবাদের স্থান বদলেছেন। নিশ্চিতভাবে চলে গেছেন বাড়ির মাটির নীচের এলাকায়।

মাটির নিচে এরকম একটা এলাকা যে এই অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল, অনেক জিনিস থেকেই সেটা স্পষ্টত বোঝা যেতো। অস্পষ্ট গোঙ্গানি,তরানির ক্ষীণ শব্দ মাঝে মাঝেই ভেসে আসতো মাটির নিচ থেকে। এমন এমন স্থানে যেখানে কাছে পিঠে কোথাও বাড়ি ঘরের চিহ্নমাত্র নেই, নদীর ধার বরাবর ঝোপঝাড়ের নিচ থেকে। যেখান থেকে ঢালু জমি খাড়া নেমে গেছে পটুয়েক্সট এর উপত্যকায়। সেখানেই দেখতে পাওয়া গিয়েছিল একটা ধনুকাকৃতির ওক কাঠের দরজা । মজবুত ভারী ফ্রেমের মধ্যে আটকানো ছিল দরজার পাল্লা দুটো। যা নিশ্চিত ভাবেই পাহাড়ের নিচের গুহায় পৌঁছানোর প্রবেশ পথ। কখন বা কিভাবে এই ভূগর্ভস্থ ঘরগুলো বানানো হয়েছিল সে বিষয়ে উইডেন কিছু বলতে পারেননি। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয়নি নদীপথে আগত অজ্ঞাতকর্মীদের জন্যই এই দরজাটিকে বানানো হয়েছিল। জোসেফ কারওয়েন তার সঙ্গী দো-আঁশলা নাবিকদের আসলে ব্যবহার করতেন মানুষকে বোকা বানানোর জন্য।

১৭৬৯ সালের প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের সময় দুই অনুসন্ধানকারী নদীর ওই অংশের দিকে নজর রাখছিলেন। বলা যায় না জলের তোড়ে মাটি ধসে গিয়ে ভূগর্ভস্থ গোপনীয়তা জনসমক্ষে বেরিয়ে আসে। তাদের পর্যবেক্ষণ বিফলে যায়নি। খাড়া নদী-তীর ধসে গিয়ে অগণিত মানুষ ও পশুর হাড়গোড় বেরিয়ে আসে ওদের চোখের সামনে। স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় মাপের গবাদি পশুর খামারের পিছন দিকে এইধরনের হাড় গোড়ের স্তূপের অনেক ব্যাখ্যা হতে পারে । তাছাড়া ওখানেই নাকি রেড ইন্ডিয়ানদের কবরখানাও ছিল। কিন্তু উইডেন এবং স্মিথ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নিজস্ব মতামত পোষণ করতেন।

১৭৭০ সালের জানুয়ারি মাসে ঘটলো ফোর্টালেজার ঘটনাটা। উইডেন এবং স্মিথ অনেক আলাপ আলোচনা করেও স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি যে সমস্ত বিষয় তারা জানতে পেরেছে সেসব নিয়ে কী করবে না করবে। আগের গ্রীষ্মকালে নিউপোর্টের রাজস্ব সংক্রান্ত ঝামেলায় লিবার্টি জাহাজে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটার পর থেকে অ্যাডমিরাল ওয়ালেসের অধীনস্থ কাস্টমস বিভাগ সন্দেহজনক জলপোত দেখলেই তল্লাসি চালানোর পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এরই ভিত্তিতে সিগ্নেট জাহাজের ক্যাপ্টেন চার্লস লেসলি, ক্যাপ্টেন ম্যানুয়েল আরুডার নির্দেশে গ্র্যান্ড কায়রো, মিশর থেকে সফর শুরু করা একটি ছোট জাহাজকে থামায় বার্সিলোনা স্পেনের তুষারাবৃত ফোর্টালেজায়, খানা তল্লাসীর জন্য। জাহাজটিতে নিষিদ্ধ বস্তু আছে কি-না এই অনুসন্ধান করার সময়, বিস্ময়করভাবে জানা যায় যে বেশ কিছু ইজিপশিয়ান মমি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জাহাজে করে । "সেলর এবিসি"–এর উদ্দেশ্য যাচ্ছে ওগুলো। নামকুইট পয়েন্টেরকাছে ওই সন্দেহজনক মানুষটি এগুলি নিয়ে নেবেন। মানুষটি আসলে কে তার পরিচয় ক্যাপ্টেন আরুডা দিতে রাজি নন। নিউপোর্টের ভাইস অ্যাডমিরালটি কোর্ট, বুঝে উঠতে পারছিলনা তারা ঠিক কী করবে। কারণ কোন বেআইনি জিনিষ ওখানে ছিল না কিন্তু সবকিছুর ভেতর কেমন একটা অবাঞ্ছিত প্রকৃতির গোপনীয় ব্যাপার স্যাপার জড়িয়ে আছে বলেও মনে হচ্ছে। কালেক্টর রবিনসনের সুপারিশে জাহাজটিকে ছেড়ে দেওয়া হলেও রোডআইল্যান্ড এর এলাকায় ওটার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। পরে বোস্টনের বন্দরে জাহাজটিকে দেখা গিয়েছিল বলে গুজব শোনা গিয়েছিল। যদিও পোর্ট অফ বোস্টনে জাহাজটি সরাসরি প্রবেশ করেনি।

এই অদ্ভুত ঘটনাটির প্রভাব প্রভিডেন্সেও ব্যাপকভাবে পড়েছিল। বেশীর ভাগ মানুষই ওই মমিগুলোর সাথে জোসেফ কারওয়েনের নিশ্চিতভাবেই কিছু সংযোগ আছে এব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেনি। মানুষটার অদ্ভুত বিষয়ের অধ্যয়ন এবং বিভিন্ন উদ্ভট রাসায়নিক জিনিষের আমদানি করার সাথে সাথেই কবরস্থানের প্রতি তার বিশেষ টান এবিষয়ে সন্দেহের কারণ হয়ে ছিল। ফলে সকলেই ভেবে নিয়েছিল ওই অদ্ভুত রকমের জিনিষগুলো যে এই শহরে ওই মানুষটা ছাড়া আর কেউ আমদানী করার চেষ্টা করবে এটা কল্পনা করাই ভুল। এই বিশ্বাসটা সম্পর্কে সচেতন হয়েই কারওয়েন কথাবার্তার সময় অকপটভাবে বলেছেন মমির ভেতর বালসাম নামের রাসায়নিক থাকে যা বিভিন্ন পরীক্ষা উপলক্ষ্যে খুব প্রয়োজনীয় একটা বস্তু। সম্ভবত এই সব কথা বলে তিনি মমি আমদানীর ব্যাপারটাকে কম অপ্রাকৃত বলে মনে করানোর একটা চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন। উইডেন এবং স্মিথ অবশ্য বালসামের বাস্তবিক কোন তাত্পর্য থাকুক বা না থাকুক সে নিয়ে মাথা ঘামায় নি। নিজেদের সন্দেহবোধ থেকেই কারওয়েন এবং ওর নারকীয় শ্রমিকদের উদ্ভট কাহিনীর ভাবনাকে খুঁজে বার করার প্রচেষ্টাতেই মেতে ছিল।

এরপর যে বসন্তকাল এলো সে সময়েও গত বছরের মতোই হলো ভারী বৃষ্টিপাত । যার ফলে কারওয়েনের খামারের পিছনে নদীর পাড়ে নজরদারি চালাতে গিয়ে ওরা আরো অনেক হাড় গোড় দেখতে পেলেন। কিন্তু প্রকৃত কোন ভূগর্ভস্থ চেম্বার বা সুড়ঙ্গপথের চিহ্ন দেখা গেল না। অবশ্য একটা বিষয় শোনা গেল হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে। প্রায় একমাইল দূরে পটুয়েক্সট গ্রাম। যেখানে মরচে ধরে যাওয়া সেতুর গা বেয়ে পাহাড়ী ঢালু পথে ওপরের দিকে উঠে গেছে একের পর এক পুরাতন কটেজ। মাছ ধরার জাহাজগুলো নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে ওই এলাকাতেই। নদী প্রবাহিত হয়ে গিয়ে জলপ্রপাতের মতো ঝরে পড়েছে পাহাড়ের ওপর থেকে, এক জলাশয়ে। সেই জলপ্রপাতের আগে জল ধারাতে মিনিট খানেকের জন্য কী সব ভেসে যেতে দেখা গিয়েছে। অবশ্য এটাও ঠিক যে পটুয়েক্সট বেশ দীর্ঘ নদী যা এমন অনেক অঞ্চলের পাশ দিয়ে এসেছে যেখানে কবরস্থান আছে। বসন্তের ভারী বৃষ্টিপাতে সেসব এলাকা ভেসেও গিয়েছিল। কিন্তু ব্রিজ এলাকায় বসবাসকারী মৎস্যজীবীরা ওই সব জিনিষগুলোর ভেসে যাওয়ার ব্যাপারটাকে সাধারণ মরা ভেসে যাওয়া বলে মেনে নিতে পারেনি। তাদের কথানুসারে সেসব জিনিষের কোনো কোনোটা নাকি ওদের দিকে ড্যাব ড্যাব করে চেয়েছিল। কিছুর কাছ থেকে শোনা গিয়ে ছিল ইনিয়ে বিনিয়ে কান্নার মতো শব্দ। এই সব উড়ো খবর শুনে স্মিথ (উইডেন সে সময়ে সমুদ্রযাত্রায় গিয়েছিল) খামারের পিছনের দিকের নদীর পাড়ে ছুটে গিয়েছিল। এই আশায় যে হয়তো কোনো লুকানো গুহামুখের দেখা মিলতে পারে। যদিও সেখানে সে অর্থে কোন সুড়ঙ্গ পথের দেখা মেলেনি। কিন্তু অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটি ধসে গিয়ে এক খাড়া প্রাচীরের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। স্মিথ একটা চেষ্টা চালায় যদি সেই দেওয়ালটার গায়ে একটা গর্ত খোঁড়া যায়। কিন্তু সফল হয়নি। নাকি ভয়ের তাড়নায় সে ভাবে চেষ্টা করেনি তাই বা কে জানে। তবে এটা বলা যেতেই পারে ওই সময় ওখানে থাকলে দৃঢ়প্রত্যয়ী প্রতিহিংসাকামী উইডেন এ সুযোগ হাতছাড়া করতেন না।

দ্বিতীয় অধ্যায় – চতুর্থ পর্ব

১৭৭০ সালের শরতকালে উইডেনের মনে হলো তিনি যা যা জানতে পেরেছেন সে সব কথা অন্যদের সামনে বলার সময় এসে গেছে। আপাতত তার কাছে অনেক প্রমাণ জমেছে একসাথে মিলিয়ে মিশিয়ে দেখানোর জন্য। সাথেই একজন মানুষকে সাথে পেয়েছিলেন তার ভাবনাকে সমর্থন করার জন্য। এটার দরকারও ছিল, না হলে মানুষ ভাবতে পারে এলিজার সাথে তার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঈর্ষা থেকে তিনি এসব গল্প বানাচ্ছেন। উইডেন দুটো কারণে এন্টারপ্রাইজের ক্যাপ্টেন জেমস ম্যাথুসনকে এ বিষয়ে বলার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। একদিকে মানুষটার সততা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ ছিল না এবং অন্যদিকে শহরের মানুষ ক্যাপ্টেন ম্যাথুসনের কথাকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতো। বন্দরের কাছেই অবস্থিত স্যাবিন ট্যাভারনের উপরের একটি কক্ষে উইডেন তার যাবতীয় বক্তব্য পেশ করেন। স্মিথও উপস্থিত ছিল কার্যত উইডেনের বিবৃতিকে সমর্থন করার জন্য। দেখা যায় যে ক্যাপ্টেন ম্যাথুসন অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েন সব কিছু শোনার পর। উনি নিজেও জোসেফের অধীনেই কাজ করতেন এবং শহরের প্রায় সবার মতোই জোসেফ কারওয়েনের তমসাচ্ছন্ন কাজকর্ম বিষয়ে তারও সন্দেহ ছিল। ফলে এইসব নিশ্চিত প্রমাণ স্বরূপ বিস্তৃত তথ্য শুনে তার সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হয়। সব কথা শুনে তিনি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে দুই যুবকের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং কথাগুলো পাঁচ কান করতে বারণ করেন। সাথেই তিনি এটাও বলেন, প্রভিডেন্সের জনা দশেক সর্বাধিক শিক্ষিত এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের কাছে তথ্যটি পৃথক পৃথকভাবে প্রেরণ করা দরকার। তাদের মতামত যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। তারপর তারা যে প্রস্তাব দেবেন এ বিষয়ে সেটাই অনুসরণ করতে হবে। গোপনীয়তা যতদূর সম্ভব বজায় রাখতে হবে, কারণ মনে হয় না এ ব্যাপারে শহরের আরক্ষা বাহিনী সেভাবে কোন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। সাথেই অযাচিত প্রশ্নের ধাক্কা এবং হুজুক সামলানোর জন্য বিষয়টাকে জনগনের অগোচরেই রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না প্রায় এক শতাব্দী আগে সালেমেও কিছু একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে ছিলেন ওই জোসেফ কারওয়েন এবং পালিয়ে আসেন এখানে। তার পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যায় না। এই বিষয়ে সঠিক স্তরে চিন্তা ভাবনা করতে সমর্থ বলে তিনি বিশ্বাস করতেন এমন ব্যক্তিদের নাম উনি ওদেরকে বলেন ।

ডাঃ বেঞ্জামিন ওয়েস্ট, যার শুক্রগ্রহের চলন পথ বিষয়ক গবেষণা তাকে একজন উচ্চমনা পণ্ডিত এবং গভীর চিন্তাশীল বলে প্রমাণিত করেছিল; রেভারেন্ড জেমস ম্যানিং, কলেজের প্রেসিডেন্ট। যিনি ওয়ারেন থেকে এখানে বসবাস করার জন্য চলে এসেছেন। সাময়িকভাবে নতুন কিংস্ট্রিট স্কুল হাউসে থাকছেন । প্রেস বাইটেরিয়ান লেনে পাহাড়ের উপর তার নতুন বাড়ি নির্মাণ হচ্ছে; প্রাক্তন গভর্নর স্টিফেন হপকিন্স, অত্যন্ত বুদ্ধিমান এই মানুষটা নিউপোর্টের ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির একজন সদস্য ছিলেন; জনকার্টার, গেজেট এর প্রকাশক; জন, জোসেফ, নিকোলাস এবং মোজেস, এই চার ব্রাউন ভাই মনে করেন জোসেফ কারওয়েন একজন শখের বিজ্ঞানী ছাড়া আর কিছুই নয়; বয়স্ক ডঃ জ্যাবেজ বোয়েন, যার মানসিক গঠন যথেষ্ট শক্তপোক্ত এবং সাথে সাথেই কারওয়েনের নানান অদ্ভুত জিনিষ কেনার খবরাখবর রাখেন। শেষ মানুষ, ক্যাপ্টেন আব্রাহাম হুইপ্পল, এক অসাধারণ নির্ভীকতা এবং শক্তির প্রতিমূর্তি স্বরূপ। যিনি যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সর্বদাই একপা এগিয়ে রাখেন।

যদি এইসব মানুষেরা এ বিষয়ে একমত হতে পারেন, এবিষয়ে কিছু করার ক্ষেত্রে, তাহলে খুবই ভালো হবে। এদের সাথে আলোচনা করেই ঠিক করা যাবে কলোনির গভর্নর, নিউপোর্টের জোসেফ ওয়ান্টনকে এ ব্যাপারে অবহিত করা হবে কি-না সে বিষয়ে।

ক্যাপ্টেন ম্যাথুসনের ভাবনা চিন্তা আশাতীত সাফল্য লাভ করলো। এর ভেতর দু-একজন পুরো ব্যাপারটাকে সন্দেহের চোখে দেখে উইডেনের কাহিনী নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বাকি সকলেই জানালেন এ নিয়ে গোপন করে রাখার কিছুই নেই এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিষ্কার বোঝা গেল কারওয়েন বিষয়ে শহর এবং কলোনীতে অস্পষ্ট এক ভয়ঙ্কর বিপদের বাতাবরণ জন্ম নিয়েছিল। আর সেটাকে যেনতেন প্রকারে নির্মূল করতে চাইছিলেন সকলেই।

১৭৭০ সালে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি দল স্টিফেন হপকিনসের বাড়িতে মিলিত হন এবং তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। উইডেন যে সমস্ত তথ্য নোট করেছিলেন, তার সবই তিনি ক্যাপ্টেন ম্যাথুসনকে দিয়ে দেন। সেগুলো ওই আলোচনা সভায় পাঠ করা হয়। উইডেন এবং স্মিথকেও ডাকা হয় সেই সব বিবরণ বিষয়ে সাক্ষ্যদান করার জন্য। আলোচনা সভা শেষ হওয়ার পর বোঝাই যাচ্ছিলো এক ভাষাহীন আতঙ্ক উপস্থিত সকলের মনের ওপরেই প্রভাব বিস্তার করেছে। যদিও এই ভীতির মধ্যে থেকেই একটি দৃঢ় সংকল্পের জন্মও হয়েছিল যা ক্যাপ্টেন হুইপ্পল এর মুখ থেকে উচ্চারিত অশ্রাব্য কিছু শপথের শব্দ উচ্চারিত হওয়াতেই বোঝা গিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এ ব্যাপারে তারা গভর্নরকে অবহিত করবেন না। কারণ আইন মেনে এগোনোর চেয়ে আরো বেশি কিছু কাজ এক্ষেত্রে করার দরকার হতে পারে। স্পষ্টতই অজ্ঞাত কিছু অসাধারণ মাত্রার গোপন ক্ষমতা কারওয়েনের আছে। ফলে এরকম একটা মানুষকে অতি সহজে এ শহর ছেড়ে চলে যেতে দেওয়া যেতে পারে না। ওই ভয়ানক প্রাণীটিকে কিছু না করে ছেড়ে দেওয়াটা মোটেই ঠিক হবে না। কারণ তার একটাই অর্থ হবে – নতুন করে সুযোগ দেওয়া - ওই ভয়ঙ্কর পিশাচকে আবার অন্য কোনো স্থানে গিয়ে রাজত্ব করতে দেওয়ার। সময় কোন আইনের বাধা বন্ধন মানে না। বছরের পর বছর রাজকীয় রাজস্ববাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে মানুষটা অনেক কিছু করে চলেছে তার শাস্তি দিতে হবে। কারওয়েন নিশ্চিত ভাবে তার পটুয়েক্সট খামারে তল্লাসকারীদের হঠাৎ উপস্থিত হতে দেখে চমকে যাবেন। তবে তাকে একটা সুযোগ অবশ্যই দেওয়া হবে নিজের স্বপক্ষে কিছু বলার। যদি তিনি নিজেকে পাগল প্রমাণিত করতে পারেন... যদি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হন যে উনি নিজেই বিভিন্ন কণ্ঠস্বরে কথা বলে কল্পিত কথোপকথন চালিয়ে যান নিজের সাথে তাহলে ওকে ওই খামার বাড়ীতেই নজর বন্দী করে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। আর যদি এর বদলে অন্য সাঙ্ঘাতিক কিছু বিষয় সামনে আসে এবং ভূগর্ভস্থ আতঙ্কের প্রকৃতপক্ষেই বাস্তবরূপ উন্মোচিত হয় তাহলে কারওয়েন এবং তার সহকারীদের হত্যা করা হবে। কাজটা করা হবে হইচই না করে শান্তিপূর্ণভাবে গোপনে । এমনকি ওর বিধবা স্ত্রী এবং তার বাবার কাছেও খুলে বলা হবে না এসবের কারণ কী ছিল ।

আগামীদিনে কিভাবে কী রকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে এইসব আলোচনা যখন চলছে গোপনে গোপনে, ঠিক সেই সময় এমন এক ভয়ঙ্কর অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেল যে দূরদূরান্তে তার খবর ছড়িয়ে পড়লো । জানুয়ারি মাসের শুক্লপক্ষের মাঝামাঝি সময় সেটা । চারদিকে দারুণ তুষার পাত হচ্ছে । এমনই এক সময়ে এক রাতে নদী এবং পাহাড়ের এলাকা কাঁপিয়ে এক টানা কিছু আর্ত চিৎকার মানুষদের বাধ্য করলো ঘুম ভেঙে উঠে জানালা খুলে দেখার জন্য। উইবসেট পয়েন্ট এলাকায় যারা বসবাস করেন তারা দেখতে পেলেন টার্কসহেড এর সামনের খোলা প্রান্তরে একটা বিশাল মাপের সাদা কিছু ছটফট করে বেড়াচ্ছে এদিকে ওদিকে। দূর থেকে ভেসে আসছিল কুকুরের উৎকট চিৎকার। অবশ্য সে আওয়াজ থেমে গেল শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসার পর পরই। লণ্ঠন এবং বন্দুক হাতে দলকে দল মানুষ শুরু করলো খোঁজাখুজি। যদিও কিছুই দেখা গেল না আর। পরেরদিন সকালে, একটি দৈত্যাকার, পেশীবহুল নগ্ন শরীর গ্রেটব্রীজের দক্ষিণে, যেদিকটায় লম্বা জাহাজঘাটা চলে গেছে অ্যাবটের মদের কারখানার পাশ দিয়ে, সেখানে বরফের স্তূপের ভেতর পড়ে থাকতে দেখা গেল। অবিশ্বাস্য এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে লোম খাড়া হয়ে গেল মানুষের। চলতে থাকলো ফিসফিস করে নানান আজব কল্পনার আলোচনা। বয়স্ক মানুষেরা যতটা বলে থাকেন সেই ভয়ঙ্কর দেহধারী তত কম বয়সের মোটেই ছিল না। তবে বিস্ফারিত চোখে এর বর্ণনা দিতে গিয়ে অনিমেষ আতঙ্কে প্রায় সকলের মুখই ফ্যাকাশে হয়ে যেত। শরীর জুড়ে অজানা এক ভয়মিশ্রিত অদ্ভুত কাঁপুনির জন্ম হতো এ নিয়ে কথা বলতে গেলেই। কারণ যে বৈশিষ্ট্যগুলো ওই দেহধারীর ছিল সেগুলো এমন একজন মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয় যে মারা গিয়েছে অন্তত পঞ্চাশ বছর আগে।

এজরা উইডেন ওই খোঁজাখুঁজির সময় ওখানে উপস্থিত ছিলেন। ভালোই মনে ছিল গত রাতের ঘটনা। শব্দটা শুনে একাই উইবসেট স্ট্রিট ধরে হেঁটে গিয়েছিলেন কাদা মাখা ডক ব্রিজের ওপরে। কিছু একটা দেখতে পাওয়ার প্রত্যাশা তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ওই স্থানে। ফলে মোটেই বিস্মিত হননি, যখন উনি উইবসেট স্ট্রিট আর পটুয়েক্সট রোডের সংযোগ স্থলে উপস্থিত হলেন। পড়ে থাকা তুষারের ওপর দেখতে পেলেন কিছু অদ্ভুত ধরনের পায়ের ছাপ। নগ্ন দৈত্যাকার শরীরটাকে কিছু কুকুর এবং অনেকগুলো বুট পড়া মানুষ তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। সাথেই মানুষ ও কুকুরদের ফিরতি পদক্ষেপের ছাপও দেখা যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে শহরের কাছাকাছি এসে যেতেই ওরা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফিরে যাওয়া পায়ের ছাপ অনুসরণ করে যখন উইডেন, জোসেফ কারওয়েনের পটুয়েক্সট খামারের কাছে পৌঁছালেন তখন উনার মুখে ফুটে উঠলো চাপা হাসি। কারন তিনি জানতেন এরকম কিছু হতে চলেছে। রাতের অন্ধকার বলেই বেশ কিছুক্ষণ খামারের এপাশে ওপাশে ঘুরে ফিরে দেখলেন যদি কিছু সাড়াশব্দ মেলে। দিনের বেলায় যেটা করার সাহস ওর হতো না।

ডঃ বোয়েনের কাছে এবিষয়ে জানানোর জন্য গেল উইডেন। উনি তখন ওই অদ্ভুত মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন । অবাক হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত যাকে বলে সেই অবস্থা হয়েছিল ডঃ বোয়েনের। সম্পূর্ণভাবে বিভ্রান্ত বোধ করেছিলেন। বিশাল মানুষটার দেহের পরিপাক যন্ত্র দেখে মনে হয়নি ওটা কোনোদিন কাজ করেছে। গায়ের চামড়া বিকট রকমের মোটা এবং খসখসে। ঠিকঠাক জমাট বেঁধে নেই এরকমটাই মনে হচ্ছিল। শহরের বয়স্ক মানুষদের কথানু্যায়ী এই শরীরের অনুরূপ দেখতে ছিল স্থানীয় কামার ড্যানিয়েল গ্রিন। যার প্রনাতি অ্যারন হপিন, কারওয়েনেরই এক বড় জাহাজের কর্মী । তাকেই জিজ্ঞাসাবাদ করে উইডেন জেনে নেয় ড্যানিয়েল গ্রিনকে ঠিক কোথায় কবর দেওয়া হয়েছিল। সেইদিন রাতে দশজনের একটি দল হেরেন্ডেন লেনের বিপরীতে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এক পুরানোকবর খানায় যায় এবং বিশেষ একটি কবর খুঁড়ে দেখে। যা ভেবেছিল তাই, প্রত্যাশিতভাবে সেটাই দেখতে পাওয়া যায়। ওটা খালি ছিল। কোন মৃতদেহ ছিল না ওখানে।

এদিকে জোসেফ কারওয়েনের কাছে যে সমস্ত চিঠিপত্র আসে সে সব গোপনে খুলে দেখার একটা ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। নগ্ন দৈত্যাকার দেহ পাওয়ার ঘটনার কিছুদিন আগেই একটা চিঠি পাওয়া যায়। যেটি এসেছিল সালেমের জনৈক জেডেদিয়া অরনে নামক ব্যক্তির কাছ থেকে। যা কারওয়েন বিষয়ে মাথা ঘামাতে থাকা নাগরিকদের গভীরভাবে চিন্তায় ফেলে দেয়। এটির কিছু অংশ, স্মিথ পরিবারের ব্যক্তিগত আর্কাইভে কপি করে রাখা ছিল। চার্লস ওয়ার্ড সেটা দেখার সুযোগ পায় ।
ওটায় লেখা ছিল :

"আমি এটা জানতে পেরে খুশি হয়েছি যে, আপনি আপনার পুরাতন পথেই হেঁটে চলেছেন আগের মতোই। সালেমের গ্রামে মিঃ হাচিনসন এর সাথে ওর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারতো না। স্বাভাবিক ভাবেই এইচ এর ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল সে এক জীবন্ত বিভীষিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে আপনি যা করতে চেয়েছিলেন তার কণিকা মাত্র ছিল ওটা, ফলে ঠিক মতো কাজ করেনি। নিশ্চিতভাবেই কিছু বাদ পড়েছিল বা আমাদের কথাবার্তায় বা লেখায় যার ফলে ঠিক মতো ব্যাপারটা ঘটানো যায়নি। মাঝখান থেকে ক্ষতিটা হয়েছে আমার। আমার কাছে বোরিলাসকে অনুসরণ করার মতো রাসায়নিক মশলাপাতি নেই। নেক্রোনমিকনের সপ্তম পুস্তক খণ্ড যা আপনি আমাকে সুপারিশ করেছিলেন সেটাও তেমন সাহায্য করতে পারেনি। যতটুকু যা বুঝেছি তাতে মনে হচ্ছে, আমাদেরকে যে বিষয়ে সব সময় সজাগ সতর্ক থাকতে হবে তা হলো কাকে আমরা বাঁচিয়ে তুলবো। আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান নিশ্চিত বুঝতে পেরেছেন মিঃ মাথার ম্যাগনালিয়াতে কী লিখে ---, এবং বুঝতে অসুবিধা হয় না সত্যিই সেটা কী পরিমাণ অদ্ভুত বিষয়। যাই হোক আমি আপনাকে একটাই কথা বলতে চাই আবার ... এমন কাউকে বাঁচিয়ে তুলবেন না যাকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি আপনার নেই। মানে এটাই বলতে চাইছি যে যাকে জাগালেন সে এতোটাই শক্তিশালী যেন না হয় যাকে আপনার অতি শক্তিমান যন্ত্রের দ্বারাও কিছু করা যাবে না। যা জানার ইচ্ছে হবে কম ক্ষমতাবানদের ডেকে জেনে নিন। বেশি শক্তিমানদের উপস্থিতি ঘটলে হয়তো সে উলটে আপনার ওপরেই কর্তৃত্ব করতে চাইবে। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যখন জানতে পারি আপনি বেনজারিয়াত নাটমিকের আবলুষ কাঠের বাক্সে কী আছে সেটার বিষয়ে জানতে পেরেছেন। তখনই মনে হয় এ নিয়ে দুচার কথা যা আমি বুঝতে পেরেছি সেটা আপনাকে অবশ্যই বলা দরকার। আর একটা কথা দয়া করে আপনি আমাকে জেডেডিয়া নামে চিঠি লিখবেন, সাইমন সম্বোধন করবেন না। আমাদের এই সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন মানুষ খুব বেশি দিন বেঁচে থাকে না। ফলে আমার পরিকল্পনা অনুসারে আমি আমার পুত্ররূপে নিজেকে লোকের সামনে পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করে থাকি। আমি অপেক্ষা করে আছি রোমান দেওয়ালের নিচে প্রোথিত থাকা সিল্ভেনাস কোসিডিয়াস এর ভল্টের তথ্য বিষয়ে আপনাকে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষটা কী বলেছে সেটা জানার জন্য। সাথেই কৃতজ্ঞ থাকবো যদি এমএস-এর লিজেন্ড বিষয়ে, যার কথা একবার বলেছিলেন, দু চার কথা জানান।"

ফিলাডেলফিয়া থেকে আসা আরেকটি স্বাক্ষরবিহীন চিঠিও চিন্তার মাত্রাটাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি:

"আমি আপনার যানবাহনের সাথে উল্লেখিত বিষয়গুলির পর বিশেষভাবে নজর রাখবো, কিন্তু সবসময় নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না কবে সব কিছু সুসম্পন্ন হবে। এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জানিয়ে রাখা ভালো, আমি আর মাত্র একটি জিনিস চাই; কিন্তু তার আগে আপনাকে বুঝে নিতে হবে আমি ঠিক কী বলতে চাইছি। আপনি বলেছেন একটা টুকরোও যেন বাদ না যায়। যদি সঠিক ভাবে কাজ করে তবেই এমন জিনিষ আমি পেতে চাই। কিন্তু আপনি নিজে ভালো করেই জানেননা কী করে সেটা বোঝা যাবে। ফলে এ এক কঠিন কাজ। দারুণ ঝামেলার ব্যাপার পুরো বাক্সটিকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া। শহরের (সেন্টপিটার্স, সেন্টপল, সেন্টমেরিবাক্রাইস্টচার্চ) ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া তো প্রায় অসম্ভব। যদিও আমি জানি গত অক্টোবরে যাকে আমি জাগিয়েছিলাম তার ভেতর কী কী গণ্ডগোল ছিল। এটাও জানি তার জন্য আপনি কী পরিমাণ জীবন্ত বস্তু বলি দিয়ে তবেই ১৭৬৬ সালে চূড়ান্ত ফলাফল আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর সেই জন্যই এবার সব কিছু একেবারে আপনার কথা মতোই কাজ করা হবে। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি এবং মিঃ বিডেলের জাহাজঘাটায় প্রত্যেকদিন খবর নিচ্ছি।"

তৃতীয় আরো একটি সন্দেহজনক চিঠি পাওয়া যায় যা লেখা ছিল অজানা ভাষা এবং অজানা অজ্ঞাত বর্ণমালাতে। চার্লস ওয়ার্ড, স্মিথের একটি ডায়েরিতে অপটু হাতে অনুলিপিকরা এই ধরনের অক্ষর দিয়ে লেখা বেশ কিছু লেখা দেখতে পায়। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ওই অক্ষরগুলিকে অ্যামহারিক বা অ্যাবসিনিয়ান বর্ণমালা বলে মত প্রকাশ করেন। যদিও তারা বলতে পারেননি কী শব্দাবলী ওখানে লেখা আছে। এই চিঠিগুলির কোনোটিই কারওয়েনের হাতে পৌঁছায় নি। সালেমের জেডেডিয়া অরনের অন্তর্ধানের খবর পাওয়া যায় এর কিছুদিনের ভেতরেই। সম্ভবত প্রভিডেন্সের নাগরিকেরা তল্লাসী শুরু করেছে এ খবর তার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। পেনসিলভানিয়ার হিস্টরিক্যাল সোসাইটির ডঃ শিপ্পেনের কাছেও কিছু অদ্ভুত ধরনের চিঠি এসে পৌঁছায়। যেখানে এক রহস্যময় ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে।
এসবের ভেতরেই আরো জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল জোর কদমে। রাতের বেলায় ব্রাউনের গুদামঘরে গোপনীয়তার শপথ গ্রহণকারী এবং পোড় খাওয়া নাবিক ও বিশ্বস্ত পুরোনো সেনাসদস্যদের গোপন সমাবেশ হচ্ছিল উইডেনের উদ্দেশ্য সফল করার প্রয়াসে। ধীরে ধীরে নিশ্চিতভাবে একটি পরিকল্পনা দানা বাঁধছিল যা জোসেফ কারওয়েনের রহস্যময় পিশাচবিদ্যার সমস্ত রকম চিহ্নকে মুছে দেওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছিল।

ওদিকে কারওয়েন, সমস্ত রকম সতর্কতা নিয়ে কাজ করে চলা সত্ত্বেও মোটামুটি বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে। আর সেই অস্থিরতা তার আচার আচরণের ভেতরে ধরা পড়ছিল। তার ঘোড়ার গাড়ী শহর এবং পটুয়েক্সট রোডের মধ্যে একধিকবার যাতায়াত করছিল। মনে হচ্ছিল তিনিও যেন শহরটির কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছেন।

একদিন রাতে তার খামারের নিকটতম প্রতিবেশী, ফেনার্সরা, অত্যধিক সংকীর্ণ জানালাওয়ালা সেই রহস্যময় পাথুরে ভবনের ছাদ থেকে একটা জোরালো আলোর রেখা আকাশের দিকে উঠে গেছে দেখতে পেলেন। সাথে সাথেই ওরা এ বিষয়ে খবর পাঠিয়ে দিলেন প্রভিডেন্সের জন ব্রাউনের কাছে। মিঃ ব্রাউনকে নির্বাচিত করা হয়েছে জোসেফ কারওয়েন এর বিরুদ্ধে লড়াই এর নেতা রূপে। উনি খবরটা পেয়েই জানিয়ে দিলেন দ্রুত কিছু করা হবে এ বিষয়ে। চূড়ান্ত অভিযান বিষয়ে অবশ্য ফেনার্সদেরকে কিছু বলা হয়নি । শুধু জানানো হয়েছিল কারওয়েন নিউপোর্টের কাস্টম অফিসারদের গুপ্তচর হিসাবে কাজ করছে। যার বিরুদ্ধে প্রভিডেন্সের সমস্ত জাহাজমালিক, ব্যবসায়ী এবং চাষীরা একজোট বেঁধেছে। তবে ফেনার্সরা এই কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিল কি-না তা জানা যায়নি। কারণ নিকটতম প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে কারওয়েন ফার্মের অনেক উদ্ভট কাণ্ডকারখানার সাক্ষী তো ওরাও। কারওয়েনের সাথে বদমায়েশী বা শয়তানি কাজের যোগাযোগ আছে সেটা ফেনার্সদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এটা আন্দাজ করেই মিঃ ব্রাউন, কারওয়েনের ফার্মহাউসের দিকে নজর রাখা এবং নিয়মিত প্রতিটি ঘটনাটির রিপোর্ট দেওয়ার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন ফেনার্সদের ওপর।

[ক্রমশঃ]

পাঠকেরা যা পড়ছেন