কামধেনু

কামধেনু
দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী
অলংকরণ - রুমেলা দাস


নন্দী শুয়ে শুয়ে আকাশপানে চেয়ে একমনে ঘাস চিবোচ্ছিলো। আহা কী স্বাদ। স্বর্গে এমন কচি কচি মিষ্টি ঘাস নেই। অমনি ভৃঙ্গী ছুটতে ছুটতে এসে বললো, “সব্বোনাশ হয়েছে। ঘোর সব্বোনাশ! কামধেনু খোওয়া গিয়েছে।”

নন্দী সেই কথায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললো, “ সে কী রে। এবারে বাবাকে মুখ দেখাবো কেমন করে? জমদগ্নি তো ভস্ম করে দেবেন। গোলকধামে শোরগোল পড়ে যাবে।”

ভৃঙ্গী কাঁদো কাঁদো মুখ ভেঙ্গিয়ে বললো, "তোর জন্যই তো হলো এমন। সক্কাল সক্কাল বাবা কে গিয়ে বললি কামধেনুর জিভে চড়া পড়ে গেছে তার একটু স্বাদবদল দরকার। যাই মর্ত্যে গিয়ে গরু চড়িয়ে আসি। বাবা তো সকাল সকাল ভাঙের মৌতাতে ত্রিনয়ন মুদে বসেছিলেন। অমনি তোকে পারমিশন দিয়ে দিলেন।”

চুক চুক চুক শব্দ করে নন্দী মাথা নাড়লো। তারপর কটমট করে ভৃঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বললো, “তা তুই কি করছিলিস। আটকাতে পারলিনা?”

“তোর যেমন বুদ্ধি, কামধেনুকে কেউ কোনোদিন আটকাতে পেরেছে। ও তো নিজের মর্জিতে চলে। তারপর মান অভিমান তিন লোকের মেয়েদের থেকেও বেশি। হঠাৎ করে চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি তারপর কত্ত ডাকলাম, ধেনু।..কাম কাম কাম। গোলা ভরা পান দেব, বাটা ভরা ধান দেব। কিছুতেই এলো না।”

নন্দী বললো, “বাবা জানতে পারলে ভস্ম করে দেবে তোকে আর আমাকে। গোলোকধাম থেকে লিজে এক মহাপদ্ম বৎসরের জন্য বাবার গোশালায় রাখার অনুমতি পাওয়া গিয়েছিলো। যাতে স্বর্গবাসী-রা মনোরম বিচিত্র মিষ্টান্নের স্বাদ পায়। এবারে যে কী হবে ! তবে বেশিদূর যায়নি মনে হয়। চল একটু এগিয়ে খুঁজে দেখি।”

“সামনেই একটা গ্রাম মতো দেখতে পাচ্ছি। বাজার বসেছে। বাঁধাকপি টপি দেখতে পেয়ে ঐদিকেই গেছে বোধহয়। আগে গ্রামবাসীদের মতো পোশাক চাই। তারপর এক কাজ কর তুইও ডাক আমিও ডাকি। ডাকতে ডাকতে পথ হাঁটি।”

দুজনে মিলে এইভাবে গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে লাগলো।

নন্দী ডাকে, “সুরভী”, ভৃঙ্গী ডাকে, “সুরভী”

তারপর দুজন একসঙ্গে গলা মিলিয়ে ডাকে, “ সুরভী ই ই ই ই”

হঠাৎ একটা লোক ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। বেশ লম্বা চওড়া অসুরসুলভ চেহারা। বেরিয়ে এসে নন্দী ভৃঙ্গীকে আপাদমস্তক দেখে বললো, “সুরভী ঘুমোচ্ছে। কী দরকার ?”

ভৃঙ্গী বললো, “এতো বেলা করে সুরভী কক্ষনো ঘুমোয় না। সুরভী কে নিজের ঘরে রাখার আপনার কোনো অধিকার নেই। ওকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি।”

নন্দী বললো, “ঠিক। একটু অভিমানী, কিন্তু ওকে ছাড়া আমাদের চলবে না। বাবা কে কথা দিয়ে এসেছি।”

লোকটা বললো, “আচ্ছা একটু দাঁড়ান। সুরভী কে ডাকি।” তারপর ভেতর থেকে একটা ইয়াবড় বাঁশের লাঠি নিয়ে এসে তাড়া করলো। নন্দী ভৃঙ্গী তো পালিয়ে পথ পায় না।

লোকটা একটু চোখের আড়াল হতেই হাঁপাতে হাঁপাতে নন্দী বললো, “কী হলো বলতো? লোকটা হঠাৎ এমন ক্ষেপে গেলো কেন?”

ভৃঙ্গী বললো, “ ওর কাছে আমাদের সুরভী নেই। এরকম বদখত লোকের কাছে সুরভী থাকতেই পারে না।”

“তাহলে এবার কী করা যায়?” ভৃঙ্গী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো। নন্দীও আকাশ পাতাল ভাবতে শুরু করলো। তারপর বললো, “একটা কাজ করলে হয়না ? থানায় একটা খবর দিলে হয়না ?”

ভৃঙ্গী বললো, “ তোর যেমন বুদ্ধি! চোর ডাকাত অব্দি এরা ধরতে পারেনা। তখন বাবার কাছে মানত করে। আর সুরভীকে খুঁজে দেবে?”

নন্দী বললো “তবুও, একটা চেষ্টা তো করা যেতেই পারে। আজ সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে সুরভীকে যদি স্বর্গের গোশালায় পৌঁছে দিতে না পারি অনর্থ হয়ে যাবে।”

গ্রামের লোকেদের জিজ্ঞেস করে করে ঠিক দুক্কুর বেলায় ওরা থানা এসে পৌঁছলো।

ছোটবাবু বললেন, "বড়বাবুকে এখন বিরক্ত করা যাবে না। মাথা হেব্বি গরম।"

"কেন, কেন, কী হয়েছে ?"

"চল্লিশ জন ডাকাত বহু কষ্ট করে ধরেছিলেন। জেল থেকে পালিয়েছে। তারপর থেকেই মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে।"

"আহা গো " ভৃঙ্গী চুক চুক আওয়াজ করলো মুখে।

" তোমরা তোমাদের বয়ান লিখে দিয়ে যাও। বড়বাবু ডাকলে এস।"

নন্দী-ভৃঙ্গী সেইমতো কাজ করলো। গ্রামের একটা লোককে ধরে বয়ান লেখালো।

কিছুক্ষন পরে বড়বাবু ডাকলেন," মুখার্জী, মুখার্জী "

ছোটবাবু দৌড়ে গেলেন।

বড়োবাবু চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, "এসব গরুর রচনা কে লিখেছে? ডাকো তাদের।"

বড়বাবুর ঘরে দুজনকে ডাকা হলে নন্দী আমতা আমতা করে বললো," আমাদের সুরভী গরু নয়।"

বড়বাবু বিস্ফারিত চোখে বললেন, “তবে কী ?”

নন্দী চাপা গলায় বললো , "কামধেনু। "

“হোয়াট !!!”

ভৃঙ্গী নন্দীকে একটা কনুই এর গুঁতো মেরে বললো। “না, আজ্ঞে ও গরুর মতোই দেখতে কিন্তু ঠিক গরু নয়। মানে যে-সে গরু নয়।”
বড়বাবু এবার দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “গরুর মতোই দেখতে কিন্তু গরু নয়। আমিও পুলিশের মতো দেখতে কিন্তু পুলিশ নই। আমি আলিবাবা চল্লিশ চোর যাত্রাপালার আলিবাবা। পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেব। ….মুখার্জী … মুখার্জী, এদের লকআপে ঢোকাও ।”

গোবর্ধন আর গোপীচাঁদ দুই ভাই। গ্রামে তাদের দুজনেরই মিষ্টির দোকান। এক দোকানের উল্টোমুখে আরেকটা দোকান। গোপীচাঁদের মিষ্টির দোকান রমরম করে চলে। ভালো ব্যবসা করে সে প্রচুর অর্থের মালিক। গোবর্ধন সিধেসাধা সরলমতি। তাকে ঠকিয়ে তার ভাই পৈতৃক বাড়িটাও হাতিয়ে নিয়েছে। কোনো মতে কষ্টেসৃষ্টে গোবর্ধনের সংসার চলে। তার মিষ্টির দোকানে বেশির ভাগ সময়েই বসে বসে মাছি তাড়াতে হয়। বেশির ভাগ খদ্দেরই ঢোকে গোপীচাঁদের প্রাসাদের মতো ঝলমলে দোকানে।

গোবর্ধনের দুটো হাড় জিরজিরে গরু আছে। গরুদুটোর নাম শ্যামলী আর ধবলী। পৈতৃক সম্পত্তি বলতে সে ঐটুকুই পেয়েছে। আর একটুকরো ধানজমি আছে। তাতে ভালো ফসল ফলে না। এ হেন গোবর্ধন যে মাঠে একটা স্বাস্থ্যবান ধবধবে সুন্দর গাই চড়তে দেখে বাড়ি নিয়ে আসবে তা বলাই বাহুল্য।

গোবর্ধনের আদর সৎকারে সন্তুষ্ট হয়ে সেও থেকে গেছে গোবর্ধনের বাড়িতে। কিন্তু তার আশ্চর্য ক্ষমতা সম্পর্কে গোবর্ধন জানতো না যদি না তার ছেলে সকাল সকাল ক্ষীর সন্দেশ খাওয়ার বায়না ধরতো। তার দোকানে পুঁচকে সাইজের রসগোল্লা আর চমচম ছাড়া এখন আর কিছুই হয় না পুঁজির অভাবে । দাদার দোকানে বিভিন্ন রকমের দেশি বিদেশী মিষ্টি, ছানার পায়েস, ছানার কেক কত্ত কী পাওয়া যায়। তাই দেখে তার একমাত্র ছেলে আনন্দ বায়না ধরেছিলো যে সে ক্ষীর সন্দেশ খাবে। জেঠুর দোকানের কর্মচারীরা তাকে গালিগালাজ দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ায় সে কাঁদতে কাঁদতে এসে মায়ের কোলের কাছটিতে বসেছিল। তার মা অমনি গোয়াল ঘরে গিয়ে দ্যাখে থালা ভর্তি ক্ষীরের সন্দেশ সাজানো। ছেলে তাই দেখে মহানন্দে গপগপ করে সন্দেশ খেয়ে জেঠুর ছেলে সুনন্দ দাদা কেও মিষ্টি দিতে গেলো। সুনন্দ আর আনন্দ এই দুই ভাইয়ের ভারী ভাব। গোপীচাঁদও দ্যাখে বেশ কয়েকদিন ধরে ভাইয়ের দোকানে কতরকম মিষ্টির আমদানি। সেই মিষ্টি যারাই একবার খাচ্ছে তারাই নেশাগ্রস্তের মতো বারবার খেতে চাইছে। আনন্দে তাদের চোখদিয়ে জল পড়ছে। কামধেনুর ক্ষীরের মতো দুধ থেকে তৈরী এই মিষ্টির নাম গোবর্ধন তার ছেলের নামে রেখেছে আনন্দমোহন।

ওদিকে স্বর্গে হুলস্থূল পড়ে গেছে। সাত দিন হয়ে গেলো কামধেনুর কোনো খবর নেই। নন্দী আর ভৃঙ্গী কোনো মতে থানা থেকে ছাড়া পেয়ে বিষ্ণুলোকের পথে রওনা দিলো। সাধ্যি কী মহাদেবের সামনে যাবে। নন্দী কেঁদে কেটে বিষ্ণুর পায়ে পড়ে বলে, “ আপনি তো ভগবান, আপনার কিছুই অজানা নয়। আমাদের সাহায্য করুন। নইলে অভিশাপের হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।”

বিষ্ণু অর্ধনিমীলিত নেত্রে মৃদু হেসে বললেন, “আমার সব কিছুই সম্যক রূপে জ্ঞাত। বিশ্ব বৈকুন্ঠ চ্যানেলে সারাদিন তো এই একটাই সংবাদ। আর তাছাড়াও আমার চোখের দৃষ্টি স্বর্গ মর্ত্য পাতাল সব জায়গায়। আমি জানি কামধেনু কোথায়। কিন্তু ভুলটা যেহেতু তোমাদের, সংশোধনও তোমাদেরই করতে হবে। জমদগ্নি তোমাদের খুঁজে পেলেই মর্ত্যের গরু, ছাগল কিছু একটা বানিয়ে দেবেন। তখন অখাদ্য, কুখাদ্য খেয়ে থাকতে হবে।”

“প্রভু !!” ভৃঙ্গী ডুকরে কেঁদে উঠলো।

“চিন্তা কোরোনা । যার কাছে কামধেনু আছে সে ভালো, সরলমতি। তোমরা একটু ভালো করে বোঝালেই সে কামধেনু ফিরিয়ে দেবে।”

বিষ্ণুর কথামতো নন্দী ভৃঙ্গী উপস্থিত হলো গোবর্ধনের বাড়ি। কামধেনুর কথা জিজ্ঞেস করতেই সে তো কেঁদে কেটে একসা। গোপীচাঁদের মারফৎ জমিদারের কানে কামধেনুর খবর যায়। জমিদার জানতেন লোক পাঠিয়ে এই দৈবশক্তি সম্পন্ন কামধেনু ধরে আনা সম্ভব হবে না। তাই তিনি গোবর্ধনের একমাত্র ছেলে আনন্দ কে লোক পাঠিয়ে ধরে আনার ব্যবস্থা করলেন। আনন্দ তখন ভাই সুনন্দর সঙ্গে খেলছিল। পরে জমিদারের পেয়াদা গিয়ে গোবর্ধনকে বলে এলো, “ এক্ষুনি তোমার কামধেনু নিয়ে জমিদারের বাড়ি দিয়ে এস। নইলে ছেলে ছাড়া পাবেনা। আর থানা পুলিশ করলে কিন্তু ছেলের হদিশই পাবে না।”

গোবর্ধন শুনেছিলো জমিদার ভবেশ মজুমদার খুব একটা সুবিধের লোক নন। থানা পুলিশ সব তার হাতের মুঠোয়। চোখের জল মুছতে মুছতে সে তার কামধেনুটিকে জমিদারের গোয়ালে রেখে এসেছে।

“বড় ভালো গাই ছিল গো দাদারা। নাম রেখেছিলাম নন্দিনী। ধবলী আর শ্যামলীর সঙ্গে খুব ভাব হয়েছিল। আমার ছেলেটাও ওকে চোখে হারাতো। সে আমাদের সোনা দানা, খাবার দাবার সব দিয়েছে। এখন কোনো অভাব নেই। কিন্তু নন্দিনীর কথা ভাবলেই মন বড় খারাপ করে। গোবর্ধন চোখ মুছলো।”

ভৃঙ্গী বললো, “যাচ্চলে! এবার উপায়! আমাদের সুরভী এখন জমিদারের গোশালায়। সে তো খুব খারাপ লোক শুনলাম।” নন্দী বললো, “ খারাপ লোক হোক আর যাই হোক। আমাদের সুরভীকে আমরা চাইবো না? চলো ভাই এক্ষুনি চলো সেখানে। আর সময় নষ্ট করা ঠিক নয়।”

তিনটে মাঠ, ধানক্ষেত, মন্দির আর বিশাল দীঘি পেরিয়ে তারা উপস্থিত হলো জমিদার বাড়ি। জমিদার ভবেশ মজুমদার তখন দুপুরের ঘুম দিচ্ছিলেন। নন্দী আর ভৃঙ্গী তার মাথার কাছে বসে কানে সুড়সুড়ি দিতে আরম্ভ করলো। চমকে জেগে উঠে তিনি বললেন – “ক কে কে তোমরা? এখানে কী করে এলে। পেয়াদারা সব কোথায় ?”

নন্দী হেসে বললো, “ কিছু চিন্তা করবেন না। সে ব্যাটাদের কায়দা করে মহাদেবের স্পেশাল ওষুধ খাইয়ে দিয়েছি। তিন ঘন্টার আগে তাদের ঘুম ভাঙবে না।”

“কী...কী চাও তোমরা?” বলে তিনি আঁতকে উঠলেন।

ভৃঙ্গী বললো, “কী চাই তুমি জানোনা ? ওই যাকে জোর করে গোবর্ধনের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসেছো, আমাদের স্বর্গের কামধেনু সুরভী। ফেরত দিয়ে দাও নয়তো মহাদেবের দিব্যি এমন কাতুকুতু দেব যে হাসতে হাসতে হার্টফেল করবে।”

“ না না কিছুতেই দেবোনা। গোবর্ধন ওকে নিজের হাতে আমার গোশালায় রেখে গেছে। আমি তো কেড়ে নিই নি। আর তোমাদের জিনিস তার প্রমান কী ?”

ভৃঙ্গী বললো, “ নন্দী বুড়োটার হাত দুটো একবার ভালো করে ধরতো। রামকাতুকুতু না দিলেই নয়।”

নন্দী ধরার উদ্যোগ করতে যাবে। অমনি চারিদিকে বোমা, গুলি চিৎকারের শব্দ।

জেল পালানো সেই চল্লিশ জন ডাকাত হানা দিয়েছে জমিদার বাড়িতে।

নন্দী বললো, “ এখন জমিদারকে ছেড়ে আমাদের সুরভী কে খোঁজা উচিত। গোশালাটা কোনদিকে চল সেটা দেখি গিয়ে।”

জমিদার বাড়ির বিশাল বড় গোশালা। কত রঙের যে গরু আছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কামধেনু একটিই হয়। তার গা থেকে আলো বেরোচ্ছিল আর আতপ চালের মতো গন্ধ। ডাকাতরা কামধেনুর কথা রাস্তাতেই শুনেছিলো। তাদের জমিদারবাড়ি আসার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল কামধেনু। গোশালাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল বন্দুক কাটারি বিভিন্ন অস্ত্র হাতে প্রায় কুড়ি জন। কামধেনুর দিকে এগোতেই কামধেনু একটা অদ্ভুত ডাক ছাড়লো। চারদিক কেঁপে উঠলো। কামধেনুর গা থেকে বেরিয়ে এলো শয়ে শয়ে অস্ত্র হাতে লোক। ডাকাতদের সঙ্গে তাদের ভয়ঙ্কর লড়াই হলো। ধুলোয় ঢেকে গেলো চারদিক। নন্দী আর ভৃঙ্গী চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিল। লড়াই থামতেই তারা দেখলো ডাকাতরা সব এখানে ওখানে পড়ে আছে ছিটকে। তাদের নড়ার ও ক্ষমতা নেই। কিন্তু কামধেনু কোথায় গেলো? সে তো নেই। নন্দী আর ভৃঙ্গী দৌড়োতে দৌড়োতে নন্দিনী, সুরভী, আরও কতরকম নামে কামধেনুকে ডাকতে লাগলো। তবু তার পাত্তা নেই। মাঠের মধ্যে এদিক ওদিক খোঁজার পর তারা দেখলো দূরে দীঘির ধারে একটা লম্বা কালো মতন ছেলে বসে বসে আখ চিবোচ্ছে। কামধেনুর গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। তারা হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেটার দিকে দৌড়োলো।

“এই ছেলে শুনছো ?”

ছেলেটা আখ চিবোতে চিবোতে তাকাল।

“এই যে এটা আমাদের গরু। আমাদের দিয়ে দাও।”

ছেলেটা অবাক হয়ে বললো, “বা রে ওকে আমি পেয়েছি। মাঠের মধ্যে একা একা চরছিলো।”

নন্দী মুখ ভেঙ্গিয়ে বললো, “মোটেও না। বেশি পাকামি কোরো না।”

ছেলেটা বললো, “ ঠিক আছে তবে এক দান পাঞ্জা লড়ে দেখাও। যে জিতবে গরু তার।”

ছেলেটার যা রোগা-পটকা না খেতে পাওয়া চেহারা, এক্ষুনি হেরে যাবে।

ভৃঙ্গী বললো, “বেশ তো চলে এস”। ওমা ছেলেটার হাত তো নয় যেন লোহা। এক চুলও নড়ানো গেলো না। বদলে সে ভৃঙ্গীর হাতটা এমন ভাবে ফেলে দিলো যেন শোলার তৈরী।

নন্দী বললো, “কী খাও ভাই ? গায়ে এতো জোর !”

ছেলেটা সাদা সাদা দাঁত বের করে হেসে বললো, “ফ্যান খাই ভাতের।”

তিন বার, চার বার, পাঁচবারেও যখন ছেলেটাকে হারানো গেলোনা তখন ছেলেটা বললো, “চু কিত্ কিত্ খেলবে?”

নন্দী বললো, “থাক ঢের হয়েছে।”

ছেলেটা এবারে আকাশ ফাটিয়ে হা হা হা করে হাসতে শুরু করলো। তারপর বললো, “ মূর্খের দল। বৈকুন্ঠ চললাম। কাল সুরভীকে কৈলাসে দিয়ে এস মনে করে।” বলে নন্দী-ভৃঙ্গীর হাঁ করা মুখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

পাঠকেরা যা পড়ছেন