রিমেইনস টু বি সিন


রিমেইনস টু বি সিন
জ্যাক রীচি
অনু. - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
অলংকরণ - প্রমিত নন্দী


“আমি নিয়মিত কর পরিশোধ করি।” জোরালো গলায় বললাম, “আর আপনারা আমার বাড়ি-বাগান লণ্ডভণ্ড করে ফেলেছেন? যাবার আগে যদি সব কিছু একেবারে আগের মত করে গুছিয়ে দিয়ে না যান, তবে আমি...”

“তা নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা করতে হবে না, মি. ওয়ারেন।” ডিটেকটিভ সার্জেন্ট লিটার বলল, “শহরের পক্ষ থেকেই কাজটা করে দেয়া হবে, নিয়ম।” সে হাসল, “তা আমরা কিছু পাই আর না পাই!”
কী পাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল? তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না— আমার স্ত্রীর লাশ।

এখন পর্যন্ত ওরা খুঁজে পায়নি।

“মেরামতের কাজটা আপনার জন্য খুব একটা সহজ হবে না, সার্জেন্ট। আপনার লোকেরা বাগান খুঁড়ে তছনছ করে ফেলেছে। সামনের আঙিনা দেখে তো মনে হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র! আর এখন দেখছি আপনার লোকেরা জ্যাক হ্যামার নিয়ে বেসমেন্টের দিকে যাচ্ছে। আমার বাড়িটাকে ছাড়বেন না নাকি!”

আমরা রান্নাঘরে বসে ছিলাম, গর্দভটা আমার কফি সাবাড় করছিল।

আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সার্জেন্ট মন্তব্য করল, “আমেরিকার মোট আয়তন কত জানেন? ত্রিশ লক্ষ ছাব্বিশ হাজার সাতশ উনআশি বর্গ মাইল।”

বলার ঢং-এ পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে, এধরনের পরিস্থিতির জন্যই গাধাটা আমেরিকার আয়তন বসে বসে মুখস্থ করেছে।

“হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ আর আলাস্কাকে হিসেবে ধরছিলেন তো?” ব্যঙ্গভরে জিজ্ঞাসা করলাম।

সার্জেন্ট লিটার পাত্তা দিল না, “নাহ, ওগুলোকে ধরিনি। যা বলছিলাম, আমেরিকার আয়তন মোট ত্রিশ লক্ষ ছাব্বিশ হাজার সাতশ উনআশি বর্গ মাইল। এরমধ্যে কী নেই? পাহাড় আছে, জলাভূমি আছে, স্থলভাগ আছে। মরুভূমি, শহর সবই আছে। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন? কেউ যখন তার স্ত্রীকে খুন করে, তখন সেই লাশ কোথায় লুকায়? নিজের সম্পত্তিতে!”

আর কোথায় লুকাবে? এরচেয়ে নিরাপদ জায়গা পাওয়া যাবে? আমি ভাবলাম। কেউ যদি নিজের বউয়ের লাশ বনে লুকায়, দেখা যাবে ওই খুদে বিচ্ছু বয় স্কাউটগুলো খুঁজে বের করে ফেলেছে!
লিটার আবার হাসল, “আপনার বাড়ি মোট কতটুকু জমি নিয়ে?”

“লম্বায় ষাট ফুট আর পাশে দেড়শো। শুধু বাগান সাজানোর পিছনে আমি কত সময় দিয়েছি, তা কল্পনাও করতে পারবেন না। আর আপনার লোকেরা পুরোটা তছনছ করে ফেলছে।”

দুই ঘণ্টা ধরে খোঁজাখুঁজি করেও গাধাটা কিছু পায়নি। অথচ দেখে মনে হচ্ছে, যে কোন মুহূর্তে চাইলেই আমাকে অ্যারেস্ট করতে পারে, “বাগানের পিছনে দুশ্চিন্তা না করে নিজের জন্য করুন, মি. ওয়ারেন।”

রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সহজেই পিছনের বাগান চোখে পড়ে। দেখলাম, আট দশ জন মিলে খুঁড়ে বাগানটা প্রায় শেষ করে ফেলেছে।

লিটার আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাল, “আমরা সবদিক পরীক্ষা করে দেখি, কিছুই বাদ দি না। আপনার চিমনীর ভিতরটাও ঝুলের জন্য দেখব, ফার্নেসের ছাইও বাদ পড়বে না।”

“চিমনীতে ঝুল পাবেন না, আমি তেল ব্যবহার করি।” নিজের জন্য কফি ঢেলে বললাম, “আমি আমার স্ত্রীকে খুন করিনি। এমনকি সে এখন কোথায় আছে, তাও আমার জানা নেই।”

লিটারও কফি নিল, “তাহলে তার অনুপস্থিতির কি ব্যাখ্যা দিবেন আপনি?”

“কোন ব্যাখ্যাই দিতে পারব না। এমিলি রাতে নিজের জামাকাপড় একটা সুটকেসে ভরে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আপনি দেখেননি যে ওর কিছু জামা কাপড় পাওয়া যাচ্ছে না?”

“আমি কিভাবে বুঝব সেগুলো উনার কাপড়, না অন্য কারও?” লিটার এমিলির ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু মনে করবেন না, আপনি উনাকে কেন বিয়ে করেছিলেন?”

“ভালবাসি, তাই!”

কিন্তু ব্যাপারটা এতই অবাস্তব যে, গাধা সার্জেন্টকেও তা বিশ্বাস করাতে পারলাম না।

“আপনার স্ত্রী দশ হাজার ডলারের জীবন বীমা করিয়েছেন, তাই না? আর উত্তরাধিকার তো আপনাকেই দিয়ে গিয়েছেন?”

“জি,” আমি স্বীকার করি যে ইনস্যুরেন্সের টাকাটাও ওর মৃত্যুর একটা কারণ। কিন্তু ওকে খুন করার প্রধান কারণ কিন্তু ভিন্ন। সত্যি কথা বলতে কি, এমিলিকে খুন করার কারণটা খুব সাধারণ— আমি আর ওকে সহ্য করতে পারছিলাম না।

মিথ্যা বলব না, অন্ধ প্রেমের মোহে আমি এমিলিকে বিয়ে করিনি। আমি সেরকম মানুষই না। আমার মনে হয়, বিয়ে করার পিছনে আমার একমাত্র কারণ হলো— ব্যাচেলর জীবনের ইতি টানা। আশেপাশের সবাই তো তাই করেছে এবং করছে।

এমিলি আমার সাথেই মার্শাল পেপার প্রোডাক্টসে কাজ করত। আমি ছিলাম সিনিয়র অ্যাকাউন্টেন্ট আর এমিলি টাইপিস্ট। এমিলিকে যে কেউ বিয়ে করবে - এমনটা বোধহয় সেও কল্পনা করত না।

কী করে করবে? একেবারে সাধারণ, চুপচাপ, নিরীহ। পোশাক পরিচ্ছদের দিকে কোন নজর ছিল না। ওর সাথে কারও আলোচনায় আবহাওয়ার বাইরে যেতে পারত না। বোকা একটা মেয়ে মানুষ, পরপর দুই ওকে কখনো খবরের কাগজও পড়তে দেখিনি।

এক কথায় - একমাত্র এমন কোন লোক, যে বিয়ে ব্যাপারটাকে একটা চুক্তি হিসেবে দেখে, কেবল সেই এমিলিকে বিয়ে করার কথা চিন্তা করতে পারে।

কিন্তু খুব আশ্চর্যের ব্যাপার— বিয়ে হওয়া মাত্রই, সাধারণ-চুপচাপ-নিরীহ মেয়েটাই কেমন করে যেন ডাইনী হয়ে গেল।

আরে বিয়ে যে করেছি এতেই খুশী আর কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত ছিল না?

“আপনার সাথে আপনার স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল?”

খুবই খারাপ— কিন্তু আমি মনের ভাব মনেই চেপে রেখে বললাম, “টুকটাক ঝগড়া হত। কিন্তু সে তো সবার মাঝেই হয়।”

কিন্তু সার্জেন্ট গাধা হলেও কিভাবে যেন গোপন কিছু তথ্য পেয়ে গিয়েছিল, “কিন্তু আপনার প্রতিবেশীদের মতে আপনারা সর্বদাই ঝগড়া-ঝাটি করতেন।”

প্রতিবেশী বলতে নিশ্চয়ই ফ্রেড আর উইলমা ট্রেবারকে বুঝাচ্ছে। আমাদের বাড়িটা একেবারে ধারে। একমাত্র ওদের বাড়িটাই আমাদের বাড়িটার সাথে লাগানো। আমার মনে হয় না এমিলির গলা বাগান পেরিয়ে ওদের বাড়ি পর্যন্ত যায়, তবে অসম্ভব কিছু না। ওজনের সাথে সাথে এমিলির গলাও দিন দিন বাড়ছিল।

“মি. এবং মিসেস ট্রেবারের মতে তারা প্রায়ই আপনাদের ঝগড়া ঝাঁটির আওয়াজ শুনতে পেতেন।”

“সবসময়? আপনি নিশ্চয়ই বলতে চাচ্ছেন, যখন তারা নিজেদের ঝগড়া বন্ধ করত, তখন শুনতে পেত?”

“শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টায় আপনার স্ত্রীকে শেষ বারের মত জীবিত দেখা গিয়েছে।”

এই তথ্যটুকু সঠিক। শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টায় এমিলি সুপারমার্কেট থেকে রেডিমেড ডিনার আর আইসক্রিম কিনে ঘরে ফেরে। নিজের নাস্তা আমি নিজেই বানাতাম, লাঞ্চ খেতাম কোম্পানির ক্যাফেটেরিয়ায়। আর ডিনার? হয় কিছু একটা নিজেই বানিয়ে নিতাম, না হয় গরম করা কোন খাবার খেতাম। এমিলি রেডিমেড খাবার খেত।

“অন্য কেউ দেখতে পেয়েছে।” আমি বললাম, “কিন্তু আমি ওকে যখন শেষবার দেখি, তখন সে ঘুমোতে যাচ্ছে। সকালে উঠে দেখি, সে জামা কাপড় নিয়ে চলে গিয়েছে।”

বেসমেন্টের যে দফারফা হচ্ছে, সেটা আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারলাম। এতক্ষণে বোধহয় কনক্রিটের ফ্লোর ভেঙ্গে ফেলেছে। এত বেশী আওয়াজ হচ্ছিল যে, বাধ্য হয়েই বেসমেন্টে যাবার দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। “কিন্তু কে দেখল এমিলিকে?”

“মি. এবং মিসেস ফ্রেড ট্রেবার।”

উইলমা ট্রেবার আর এমিলির মাঝে কিছুটা মিল আছে। বিয়ের পর দুইজনেরই স্বাস্থ্য ছেড়ে দিয়েছে। মেজাজ হয়ে গিয়েছে চড়া, মানসিকতা নীচু। ফ্রেড ট্রেবার ছোটখাটো মানুষ। স্বভাব পানির মত। আগে থেকেই ছিল না বিয়ের পর হয়েছে, তা জানি না। তবে একটা গুণ আছে— দাবাটা সে ভালই খেলতে পারে। ও আরেকটা গুণ— আমাকে বেশ শ্রদ্ধা ভক্তিও করে। সম্ভবত ওর মত বউয়ের কথায় উঠা বসা করি না বলেই।

“সেদিন মাঝ রাতে”, সার্জেন্ট লিটার বলল, “ফ্রেড ট্রেবার আমাদের জানিয়েছেন যে, ঠিক মাঝরাতে এই বাড়ি থেকে ভেসে আসা এক অপার্থিব চীৎকার তিনি শুনতে পেয়েছেন।”

“অপার্থিব?”

“এমনটাই তো বললেন।”

“ফ্রেড ট্রেবার একজন মিথ্যাবাদী।” আমি সরাসরি বললাম, “শুধু ফ্রেড কেন? ওর বউ শুনতে পায়নি?”

“না, উনার স্ত্রীর নাকি ঘুম খুব গাঢ়। কিন্তু চিৎকার শুনে মি. ফ্রেডের ঘুম ভেঙ্গে যায়।”

“সে বাদে আর কেউ শোনেনি?” গলায় পরিহাস এনে জিজ্ঞাসা করলাম, ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত।

“না। তবে আর কেউ শোনার কথাও না। আপনার বাড়ি থেকে একমাত্র মি. আর মিসেস ট্রেবারের বাড়িই কাছে। মাত্র পনেরো ফুট।” লিটার তার পাইপটায় তামাক ভরে বলল, “ফ্রেড ট্রেবার তার স্ত্রীকে জাগাবেন কিনা বুঝতে পারছিলেন না। সম্ভবত স্ত্রীর মেজাজকে খুব ভয় পান। কিন্তু একবার ঘুম ভেঙ্গে যাবার কারণে, আবার ঘুমাতে তার কষ্ট হচ্ছিল। রাত দুটোর দিকে তিনি আপনার বাগান থেকে আসা একটা আওয়াজ শুনতে পান। তিনি জানালার কাছে গিয়ে চাঁদের আলোয় দেখতে পান, আপনি বাগানে একটি গর্ত খুঁড়ছেন। তিনি ভয়ে ভয়ে তার স্ত্রীকে ডেকে তোলেন। তিনি আর তার স্ত্রী, দুইজনই আপনাকে গর্ত খুঁড়তে দেখেছেন।”

“শালা গুপ্তচর। এগুলোই তাহলে আপনাকে বলেছে?”

“জি। আপনি রাত-বিরাতে বড় একটা বাক্স নিয়ে পিছনের বাগানে কি করছিলেন?”

“কফিন নিয়ে তো যাইনি। নাকি ওরা বলেনি যে, বাক্সটি বড় হলেও লাশ লুকিয়ে রাখার মত তো আর না।”

“তা বলেছেন। কিন্তু তিনি এটাও বলেছেন যে, আপনাকে যখন মিসেস এমিলির কথা তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তখন বলেছিলেন যে, তিনি বেড়াতে গিয়েছেন। বেশ কিছুদিন পর ফিরবেন।”

নিজের জন্য আরও কফি ঢেলে বললাম, “তো? তাতে কি হয়েছে? বাক্স খুলে দেখেননি ভিতরে কী আছে?”

সার্জেন্ট লিটারকে দেখে মনে হল কিছুটা বিব্রত, “বিড়ালের লাশ।”

আমি মাথা নাড়লাম, “তার মানে কী? আমি একটা বিড়ালকে দাফন করার দোষে দোষী?”

সে হাসল, “আপনি বার বার এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছেন। প্রথমে তো কিছু স্বীকারই করতে চাননি।”

“তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করিনি।”

“বিড়ালটাকে পাবার পর আপনি বলেছিলেন যে সেটি স্বাভাবিকভাবে মারা গিয়েছে।”

“আমার কাছে তেমনটিই মনে হয়েছে।”

“বিড়ালটা ছিল আপনার স্ত্রীর। আর কেউ আঘাত করে বিড়ালটির মাথার খুলি গুড়িয়ে দিয়েছে।”

“আমার মরা বিড়ালকে পরীক্ষা করে দেখার অভ্যাস নেই।”

সার্জেন্ট লিটার পাইপে টান দিয়ে বলল, “আমার মনে হয়, স্ত্রীকে খুন করার পর আপনি বিড়ালটাকেও মেরে ফেলেছেন। হয়ত বিড়ালটাকে দেখলে স্ত্রীর কথা মনে পড়ত, অথবা হয়ত বিড়ালটা আপনাকে লাশের গতি করতে দেখে ফেলেছিল। এমন সব পরিস্থিতিতে দেখা যায়, বিড়াল আমাদেরকে...”

“কল্পনার লাগাম টেনে ধরা দরকার না, সার্জেন্ট?”

গর্দভটা লাল হয়ে গেল, “খুব অসম্ভব কোন ব্যাপার না। কুকুর করতে পারলে, বিড়াল কী দোষ করল?”

তাই তো, বিড়াল কী দোষ করল?

লিটার খানিকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে নীচতলার ধ্বংসযজ্ঞের আওয়াজ শুনল, “সাধারণত আমরা যখন কোন নিখোঁজ সংবাদ পাই, তখন আমরা মিসিং পারসন্স ব্যুরোতে খোঁজ নেই। এরপর অপেক্ষা করি। এক দুই সপ্তাহের মাঝে নিখোঁজ ব্যক্তি ঘরে ফিরে আসে।”

“তাহলে, এমিলির ব্যাপারে এত তাড়াহুড়ো করলেন কেন? আমি নিশ্চিত এমিলি দুই চার দিনের মাঝে ফিরে আসবে। ওর কাছে বড়জোর শ’খানেক ডলার আছে।”

লিটারের দাঁত দেখা গেল, “নিখোঁজ স্ত্রী, অপার্থিব চীৎকার, দুই সাক্ষীর মতে আপনার গর্ত খোঁড়া— আপনিই বলুন সন্দেহ হবে না কেন? এই ব্যাপারে অপেক্ষার অবকাশ আছে?”

আমারও অপেক্ষা করার অবকাশ নেই। কেন না, এমিলির লাশ খুঁজে পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। খুব দ্রুতই গন্ধ ছড়াতে শুরু করবে।

আমি বললাম, “সেই জন্য কি হাতে শাবল কোদাল নিয়ে আরেকজনের সম্পত্তি ধ্বংস করতে হবে? আমি আবারও আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, যদি একটা ঘাসও এদিক ওদিক হয় তাহলে...”

লিটারকে দেখে মনে হচ্ছিল সে কিছু শুনতেই পায়নি, “বসার ঘরের কার্পেটের ব্যাপারে কী বলবেন?”

“আমার নিজের রক্ত, আগেই বলেছি। হাত থেকে পরে গ্লাস ভেঙ্গে গেলে সেটা পরিষ্কার করতে গিয়ে হাত কেটে যায়।” আমি তাকে হাত তুলে ক্ষতটা দেখালাম।

তাকে দেখে মনে হল না আমার গল্প বিশ্বাস করেছে, “নিজের হাত নিজেই কেটেছেন, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।”

বুঝে ফেলেছে! অবশ্য ইচ্ছা করেই কাজটা করেছি, পুলিশের নজর ভুল পথে ফেরাবার জন্য।

হঠাৎ আমার নজর ফ্রেড ট্রেবারের দিকে পড়ল, বেড়ার উপর দিয়ে ঘাড় বাকিয়ে লিটারের লোকদের কর্ম-কান্ড দেখছে।

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম, “আমি ওই জীবটার সাথে কথা বলতে চাই।”

লিটার আমার পিছে পিছে এল।

আমি গা বাঁচিয়ে কোন ক্রমে বেড়ার কাছে গেলাম, “এটা কি কোন ভাল প্রতিবেশীর কাজ হলো?”

ফ্রেড ট্রেবার ঢোক গিলল, “অ্যালবার্ট, আমি কখনোই তোমাকে খুনি মনে করিনি। কিন্তু তুমি তো জানই, উইলমা কেমন।”

আমি চোখ গরম করে ওর দিকে তাকালাম, “তোমার আমার দাবা খেলার এখানেই ইতি।” লিটারের দিকে ফিরে বললাম, “আপনি কীভাবে নিঃসন্দেহ হলেন যে আমি আমার স্ত্রীর লাশ এখানে পুঁতে রেখেছি?”

লিটার মুখ থেকে পাইপ বের করে বললেন, “আপনার গাড়ি। আপনি গাড়িতে করে মারে স্ট্রীটের ঈগল ফিলিং স্টেশনে যান। শুক্রবার ঠিক পাঁচটা ত্রিশে। সেখানে আপনি গাড়ির মোবিল চেঞ্জ করেন আর ট্যাংক ভর্তি করেন। ফিলিং স্টেশনের ছেলেটা আপনার গাড়ির ভিতরে স্টিকার লাগিয়ে দেয়। সেখানে লেখা ছিল কয়টার সময় কী কী কাজ করা হয়েছে, আর সেই সময় অডোমিটারের মাইলেজ কত ছিল। অডোমিটার অনুসারে এরপর আপনি আটশো মিটার গাড়ি চালিয়েছেন— আপনার গ্যারেজ থেকে ফিলিং স্টেশনের দূরত্বও ঠিক ততটুকু।”
সে হাসল, “অন্যভাবে বললে, আপনি গাড়ি নিয়ে সরাসরি বাড়িতে ফিরে আসেন। আপনি শনিবারে অফিসে যান না। আর আজ রবিবার। আপনার গাড়ি শুক্রবার থেকে নড়েনি।”

আমি আশা করেছিলাম যে পুলিশের নজরে স্টিকারটি পড়বে। কোনভাবে যদি গর্দভটার নজরে নাও আসত, আমার কোন না কোনভাবে ওর নজর সেদিকে ফেরাতে হত। আমি দুর্বলভাবে হাসলাম, “আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে, আমি এমিলির লাশ কাঁধে করে কাছাকাছি কোন ফাঁকা জমিতে পুঁতে রেখেছি?”

লিটার মুচকি হাসল, “একদম কাছের ফাঁকা জমিটা এখান থেকে চার ব্লক দূরে। রাতে হলেও আপনি এত দূরে কারও নজর এড়িয়ে লাশ বয়ে নিতে পারবেন বলে মনে হয় না।”

আমি আর কথা না বলে বাড়িতে ফিরে এলাম।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল এল। একে একে লিটারের লোকেরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা শুরু করল। লিটারের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, সে আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।

রাত নেমে এলে বেসমেন্ট থেকে জ্যাক হ্যামারের আওয়াজ আসা বন্ধ হয়ে গেল।

সার্জেন্ট চিলটন নামে একজন কিচেনে ঢুকল। দেখে মনে হচ্ছিল বিধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত, হতাশ। সারা গায়ে কাদামাখা, “কিছুই পেলাম না, একেবারে কিচ্ছু না।”

লিটার দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি শিয়োর? সবকিছু দেখেছ?”

“পুরোপুরি নিশ্চিত।” চিলটন বলল, “এখানে কোথাও লাশ থাকলে এতক্ষণে আমরা খুঁজে পেতাম।”

লিটার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি জানি তুমি তোমার স্ত্রীকে খুন করেছ, আমার অনুভূতি আমাকে বলছে।” ভদ্রতা ভুলে গিয়েছে।

“আজকে রাতে কলিজা ভাজা খাব।” আমি হাসি-খুশিভাবে বললাম, “বহুদিন হল খাওয়া হয়নি।”

বাগান থেকে একজন পেট্রলম্যান আমার রান্নাঘরে এসে বলল, “সার্জেন্ট, আমি কেবলই পাশের বাড়ির ট্রেবার লোকটার সাথে কথা বলছিলাম।”

“তো?” লিটার অধৈর্যস্বরে বলল।

“লোকটা বলল যে মি. ওয়ারেনের ব্রাইটন কাউন্টিতে একটা কটেজ আছে।”

আমার হাত থেকে কলিজার প্যাকেটটা পড়ে গেল। ট্রেবার গাধাটা ডোবাবে দেখছি।

লিটার চোখ বড়বড় হয়ে গেল। সে মুচকি হাসি হেসে বলল, “বলেছিলাম না, তারা সবসময় নিজের সম্পত্তির কোথাও না কোথাও লাশ লুকায়?”

আমার চেহারা বোধহয় সাদা হয়ে গিয়েছিল, তাই লিটার আমাকে পাত্তা দিল না। ভয় দেখাবার জন্য বললাম, “আমার জমির এক ঘাসও যদি এদিক ওদিক হয় তাহলে আপনার খবর আছে। আমি কেনার পর ওই জমিতে দুই হাজার ডলার খাটিয়েছি। আমি আপনাদের কাউকে ওটার ধারে কাছেও দেখতে চাই না।”

লিটার হাসল, বিজয়ীর হাসি। “চিলটন, ফ্লাডলাইট জোগাড় করে তোমার লোকদের নিয়ে ব্রাইটন চল।” সে আমার দিকে ফিরে বলল, “আর আপনার এই জমিটা কোথায়?”

“অসম্ভব, আমি বলব না। আপনি জানেন আমার পক্ষে এত অল্প সময়ের মাঝে সেখানে যাওয়া সম্ভব না। আপনিই তো বললেন আমার গাড়ি গত দুই দিন গ্যারাজেই ছিল।”

“অডোমিটারের কাঁটা খুব সহজেই পরিবর্তন করা যায়। আপনার জমিটা কোথায় বললেন?”

আমি হাতের উপর হাত রেখে বললাম, “জীবনেও বলব না।”

লিটার বলল, “লাভ নেই। নাকি আপনি ভাবছেন আজ রাতেই তার লাশ খুঁড়ে অন্য কোথাও পুঁতে ফেলবেন?”

“আমার সে ধরনের কোন ইচ্ছা নেই। কিন্তু কিছু বলা না বলা আমার সাংবিধানিক অধিকার।”

লিটার আমার ফোন ব্যবহার করে ব্রাইটনের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করল। এক ঘণ্টা পেরোবার আগেই সে আমার জমির ঠিকানা জেনে ফেলল।

“দেখুন!” আমি বললাম, “আপনি এখানে যে ধ্বংস-যোগ্য চালিয়েছেন, সেখানেও যদি একই কাণ্ড ঘটান... আমি এখনই মেয়রকে ফোন করছি।”

লিটারকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল, “চিলটন, কালকে সকালে লোক পাঠিয়ে সবকিছু গুছিয়ে দিয়ো।”

আমি লিটারের পিছু পিছু দরজা পর্যন্ত গেলাম, “প্রতিটা ফুল, প্রতিটা ঘাস যেন আগের মত হয়। না হলে আমার উকিলের ফোনের জন্য তৈরি থাকুন।”

রাত এগারটা ত্রিশের দিকে আমার পিছনের দরজায় টোকার আওয়াজ শুনলাম, খুলে দেখি ফ্রেড দাঁড়িয়ে আছে।

ফ্রেড ট্রেবার ইতস্তত করে বলল, “আমি দুঃখিত।”

“কোন দুঃখে তুমি ব্রাইটনের কথা বলতে গেলে?”

“আসলে গল্প করতে করতে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।”

রাগ চাপতে আমার খুব কষ্ট হল, “ওরা জায়গাটা পুরো তছনছ করে ফেলবে। এত কষ্ট করে বাগানটা সাজিয়ে ছিলাম।”

আরও কিছুক্ষণ চালাতে পারতাম, কিন্তু নিজেকে থামিয়ে বললাম, “তোমার বউ কি ঘুমিয়ে পড়েছে? উঠে পড়বে না তো আবার?”

ফ্রেড সায় জানাল, “সকালের আগে আর ঘুম ভাঙবে না। কখনোই ভাঙ্গে না।”

আমি হ্যাট আর কোট পরে ফ্রেডের বেসমেন্টে গেলাম।

এমিলির লাশ ক্যানভাসের দিয়ে ঢেকে ফ্রেডের বেসমেন্টে একটা ঠাণ্ডা জায়গায় রেখে দিয়েছিলাম।

আপাতত লুকাবার জন্য এর চেয়ে ভাল জায়গা আমার মাথায় আসেনি। উইলমা কাপড় ধোবার সময় ছাড়া কখনোই নিচে যায় না।

ফ্রেড আর আমি মিলে এমিলির লাশ আমার বেসমেন্টে নিয়ে এলাম। দেখে মনে হচ্ছিল এখানে যুদ্ধ হয়ে গেছে!

আমরা এমিলি লাশকে সবচেয়ে গভীর গর্তটার মধ্যে ফেলে দিয়ে চাপা দিলাম। আমাদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

ফ্রেডকে দেখে চিন্তিত মনে হচ্ছিল, “যদি বুঝে ফেলে?”

“অবশ্যই না। কোন কিছু লুকাবার জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা কোনটা জান? যেখানে এরই মধ্যে খোঁজা হয়ে গেছে। আগামীকাল পুলিশের লোকেরা এসে সব কিছু গুছিয়ে দিয়ে যাবে।”
আমরা উপরে উঠে কিচেনে গেলাম।

“পুরো এক বছরই কি অপেক্ষা করতে হবে?” ফ্রেড অনুযোগভরে জিজ্ঞাসা করল।

“কমপক্ষে এক বছর। আমরা নিজেদের উপর সন্দেহ ফেলতে চাই না। বছরখানেক পর, তুমি তোমার স্ত্রীকে খুন করবে। আর তোমার বাড়িতে পুলিশের খোঁজ শেষ হওয়া পর্যন্ত লাশ আমার বেসমেন্টে লুকিয়ে রাখব। “

ফ্রেড দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “উইলমাকে এক বছর ধরে সহ্য করা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু কী আর করা। তুমি টস জিতেছ।” ফ্রেড নিজের গলা পরিষ্কার করল, “তুমি নিশ্চয়ই কথাটা মন থেকে বলনি, তাই না?”

“কী মন থেকে বলিনি?”

“এই যে, আমাদের দাবা খেলার ইতি?”

আমার ব্রাইটনের জমির কথা মনে পড়তেই আবার রাগ উঠে গেল।

কিন্তু ফ্রেডকে এমন দুর্বল আর হতাশ দেখাচ্ছিল যে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “নাহ।”

ফ্রেডের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “আমি বোর্ড নিয়ে আসছি।”


পাঠকেরা যা পড়ছেন