স্কুল শেষের দিনগুলো

স্কুল শেষের দিনগুলো
অনিন্দ্য রাউত



।। ১ ।।

আমার জীবনের দুটো জিনিসের প্রতি আমার অটুট ভালোবাসা। এক, বই পড়া এবং দুই, পেলুর বন্ধুত্ব। আমি বই পড়তে খুব ভালোবাসি। ক্লাসের পড়ার বই, গল্প, উপন্যাস, কমিকস, জিকে, আত্মজীবনী, ম্যাগাজিন সব বই-ই গোগ্রাসে পড়ে ফেলি। তিনটে লাইব্রেরিতে কার্ড করা আছে। সেখানেও প্রায় ২০% -৩০% বই পড়ে নিয়েছি। এত পড়ার জন্য দাদা, দিদি, বন্ধুরা সবাই প্যাঁক দেয়। অবশ্য তাতে আমার কিছু এসে যায় না। এত বই পড়ার ভালো এফেক্ট হিসাবে এই অবনীগড়ের অত্যন্ত ভালো ছেলে বলে আমার সুনামও আছে। একবার সারা বাংলার কৃতী ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এক ক্যুইজ কনটেস্টে আমি উইনার হই। আর আমাদের মফঃস্বল অবনীগড়ের এক প্রেস্টিজিয়াস ব্যাপারেরও আমি বরাবরের উইনার।

মোটামুটি ১৫০ বছর আগে অবনী রায় নামে এক জমিদার এই গড়ের পত্তন করেন। পুরো এলাকাটিকে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে অনেকটা দূর্গের মতো করে অবনীগড় তৈরি করেছিলেন তিনি। যাতে সহজে কেউ অনুপ্রবেশ না করতে পারে অনুমতি ছাড়া। তা এই গড়ের মধ্যেই জনবসতি। প্রজাদের কথা ভেবে একটি বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি - ‘অবনীগড় উচ্চ বিদ্যালয়’ । প্রতি বছর প্রতি ক্লাসে যারা প্রথম হয় তাদেরকে পুরস্কৃত করার প্রথা চালু করেন তিনি। কালে জমিদারি উঠে গেলেও এই প্রথা উঠে যায়নি। যারা প্রথম হয় তাদেরকে এখন ‘অবনী স্মারক’ প্রদান করা হয়। আজ পর্যন্ত এগারোটি ‘অবনী স্মারক’ আমার দ্বারা অর্জিত। আর যেহেতু উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্কুলের শেষ পরীক্ষা, সেহেতু ক্লাস টুয়েলভের প্রথম স্থানাধিকারীকে ‘অবনী স্মারক’ - এর পাশাপাশি জমিদার বাড়ি প্রদত্ত মেডেল দেওয়া হয়। তাই স্কুলের প্রতিটি ভালো ছাত্রই মুখিয়ে আছে এই সম্মান পাওয়ার জন্য, শুধু আমি আর পেলু ছাড়া । আমার ঠিক এই ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতা, নম্বর এইসব ভালো লাগে না। আমি ভালোবেসে বই পড়ি, প্রথম হওয়ার জন্য নয়।

পেলুও একইরকম ভাবে। তবে ও তত বই পড়ে না। ও খেলতে ভালোবাসে, মনপ্রাণ দিয়ে খেলে। স্কুলের নড়বড়ে ক্রিকেট টিমের একমাত্র পিলার ও। ও ভালো খেললে টিম জেতে, ও বাজে খেললে টিম হারে। এহেন মিস্টার ডিপেন্ডবল এর জন্য অবনীগড়ের প্রায় সব সমবয়সী, এমনকী ওর থেকে দু’চার বছরের বড় মেয়েও পেলু বলতে অজ্ঞান। এক, খেলোয়াড় পেলুর জন্য আর দ্বিতীয়ত ‘ব্র্যাড পিট’ পেলুর জন্য। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ, পেলু ব্র্যাড পিটের মতো অনেকটা দেখতে। ও মাঠে খেললে কোথা থেকে যে সারি সারি পাখির মতো মেয়েরা জড়ো হয় ওর খেলা দেখতে, তা আমি আজও ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। কত যে প্রেমে পড়ার প্রস্তাব পেয়েছে ও, তার ইয়ত্তা নেই। একবার ওর কোন এক দূরসম্পর্কের পিসতুতো দিদিও ওকে প্রেমপত্র দিয়েছিল। তাহলে বোঝো কান্ড! তবে ও কাউকেই বিশেষ পাত্তা দেয় না। কিন্তু এইরকম দুর্দান্ত পেলু দুইদিন ধরে স্কুলে আসেনি (আমাদের এখন এক্সট্রা ক্লাস চলছে টেস্ট পরীক্ষা হওয়ার পর)। স্কুলে আসেনি সেটা বড় কথা নয়, খেলতেও আসেনি ও। যে পেলু গত আট বছরে একদিনও খেলার মাঠে কামাই করেনি, সেই পেলু আসেনি। কিছুদিন পরে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা, তাই ঘুরতেও যাবে না কোথাও। শরীর খারাপ হলেও জানাতো, তাই শরীর খারাপও কারণ নয় আশা করি। যাইহোক, এই অষ্টম আশ্চর্যের কারণ জানার জন্যই ওর বাড়িতে ফোন করলাম।

“হ্যালো, কাকিমা, পেলু আছে?”

ওপাশ থেকে কাকিমা বলে উঠলো, “কে? অদ্বৈত?”

“হ্যাঁ, কাকিমা।”

“ধর, ডেকে দিচ্ছি।”

একমিনিট পরে পেলু এসে ফোনটা তুলে নির্জীব কণ্ঠে বললো, “বল”

“কিরে, দুদিন ধরে মাঠে এলি না, আমায় ফোন করলি না, এরপর তো কাল সূর্যই উঠবে না।”

“কাল সকালে বাড়ি আয়, সব বলবো।”, এই বলে আমায় কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলো।

সত্যিই কি পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে? প্রলয়ের আগের নীরবতা যেন ঘটে গেল। কাল সকালে কী বলবে সেই উৎকণ্ঠায় বসে রইলাম।

।। ২ ।।

এ কি আমার কাজ ! এর থেকে আমায় ফুটবল মাঠে পাঁচটা গোল আর ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি করতে বলতো, তাও করে দিতাম। কিন্তু এ কী করতে বললো আমায় ও। হ্যাঁ এটা ঠিক প্রহ্লাদ মুখার্জী মানে পেলুর জন্য আমি সব করতে পারি। কিন্তু তাই বলে ওর হয়ে প্রেমপত্র লেখা! আমার কাছে প্রেম, অ-প্রেম এসব গ্রীক শব্দ। আর আমি যে কিনা ক্লাসের কেমিক্যাল ইকুয়েশন, ম‍্যাথসের প্রবলেমের আনসার ছাড়া বিশেষ কিছু লিখি না সে লিখবে প্রেমপত্র! বাংলাতেও বানিয়ে কিছু লিখতে পারি না ; পরীক্ষার সময় যা পড়ি তা-ই লিখি। এখন নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে, কেন যে ইনফো দিতে গেলাম!

যাইহোক, আসল ব্যাপারটা গোড়া থেকে বলি।

***

আমার বাবা বাড়িতে ভূগোল পড়ান। মানে কোচিং ক্লাস। তার ফলে অনেক ছেলেমেয়েই পড়তে আসে এবং তার মধ্যে কিছুজনের সঙ্গে আমার আলাপও আছে।

তা একদিন স্কুলে এক্সট্রা ক্লাসের ফাঁকে হঠাৎ পেলু আমায় খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলো, “তোর বাবার কোচিংয়ে ভালো মেয়েরা পড়ে?”

আমি গলার স্বর নামিয়ে বললাম, “যারা পড়ে, তারা সবাই ভালো।”

“মানে ভালো দেখতে?”

“সবাই ভালো দেখতে।”

এবার একটা জোরে চিমটি কেটে বললো, “ভালোভাবে বল। মা বলছে ভূগোলের টিউশনিতে যেতে।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “মানে? কে ভালো দেখতে মেয়ে আছে সেই দেখে তুই বাবার কোচিংয়ে ভর্তি হবি! তাও এই টেস্ট পরীক্ষার দুদিন আগে!”

পেলু ব্যাজার মুখে বললো, “জানিসই তো, ভূগোলে কেমন লাট্টু খেয়ে যাই, তাই যদি তোর বাবার ভালো নোটস পড়ে ফাইনালটা ভালো দিতে পারি।”

“তাই বলে তার সঙ্গে ভালো দেখতে মেয়ের কী সম্পর্ক?”

পেলু আমার থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে বললো, “তোর বাবা যা হিটলার! সেখানে সবসময় তোর বাবা বকবক করবে, তার মধ্যে দু-একটা ভালো মেয়ের মুখও যদি দেখতে না পাই, তাহলে কোচিংয়ে দেড় ঘন্টা কাটাবো কী করে?”

আমার বাবা একটু রাগী, তাই বলে এমন বলবে পেলু! বললাম, “যা ভাগ, বলবো না।”

পেলু তেল মাখানোর জন্য কাঁধে হাত রেখে বললো, “তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড না? এইটুকু হেল্প করবি না? প্লিজ।”

গলাটাকে যথাসাধ্য গম্ভীর রেখে বললাম, “থাক, অনেক মাখন লাগিয়েছিস। সবাই ভালো, তবে তনু বলে একটি মেয়ে পড়ে, খুব ভালো দেখতে। ভালো নাম তনুমধ্যা লাহিড়ি। জমিদার বাড়ির আত্মীয় হয় ওরা।”

“সে যে বাড়িরই আত্মীয় হোক, তাতে আমার কী? নেহাৎ তোর বাবার কোচিংয়ে আমি ব্যাটিংটা দেখাতে পারবো না, তাহলে তোকে এসব বলতে হতো না। তবে এই তনু কি আমার ক্রিকেট খেলা কোনোদিন দেখেনি?”

“তোর কনফিডেন্স তো এবার উপচে পড়ে যাচ্ছে রে। কেন তোর খেলা দেখতে এলেই ও তোর প্রেমে পড়ে তোর সঙ্গে আলাপ করতে চাইতো? ও ওরকম মেয়েই নয়।”

পেলু ঘ্যাম বজায় রেখে বললো, “মাঠে আসেনি, তাই ব্যাপারটা হয়নি, যাই হোক, কাল থেকে তোর বাবার কোচিংয়ে যাব আমি।”

“হ্যাঁ, তুই আসবি বলে বাবা আর আমি অভিনন্দন সভার আয়োজন করবো। তোকে ফুল, মালা দিয়ে পুজো করবো!”

***

তা সেই তনুর প্রেমে পেলু যে হাবুডুবু খাবে আর হাবুডুবু খেয়েও যে পেলু উঠতে চাইবে না এটা শুনে আমি ভাবলাম, ‘নবম আশ্চর্য’। কারণ পেলু যতই মুখে বলুক, ও খেলা ছাড়া আর কিছুতে তেমন ইন্টারেস্টেড-ই ছিল না। ও এসব প্রেম থেকে শত হস্ত দূরে থাকতে চাইতো।

পেলু বাবার কাছে চারদিন পড়তে এসেছে। তা এই চারদিনে কী এমন ঘটলো, যার ফল এই!

শুনে পেলু বললো, “প্রথম দিন তোর বাবার কোচিংয়ে গিয়ে তনুকে দেখে আমি ফ্ল্যাট, দ্বিতীয় দিন গিয়ে তনুকে দেখতেই আমার বুকে ব্যথা হতে শুরু করে, তৃতীয় দিন গিয়ে বুঝতে পারি তনুই আমার সারা শরীর ও মনে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে... “

আমি ওকে মাঝপথে আটকে দিয়েই বলেছিলাম, “তা তুই চতুর্থ দিন গিয়েও যে বেঁচে আছিস, সেটা দেখে আশ্চর্য হচ্ছি। তা ঐ তনু নামক রোগটিকে শরীর ও মন থেকে নির্মূল করে দে, আবার সুস্থ হয়ে যাবি।”

শুনে পেলু বললো, “না রে, চতুর্থ দিন যেতেই ফিল হল, তনুই আমার অক্সিজেন। ওকে গ্রহণ না করলে তো আর বাঁচবই না রে।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “যাঃ কেলো করেছে। যে তোর রোগের কারণ সেই তোর রোগ সারিয়ে তোকে বাঁচিয়ে রাখবে? আমি তো কিছু বুঝতেই পারছি না।”

“তোকে কিছু বুঝতে হবে না, তুই শুধু আমার জন্য একটা প্রেমপত্র মানে লাভ লেটার লিখে দে ।”

“কী!”

এই প্রস্তাবের পর থেকে এখনও পর্যন্ত আমি ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। মনে হচ্ছে উল্কা হয়ে গেছি, যখন তখন যেখানে সেখানে আছড়ে পড়বো।

।। ৩ ।।

ফাইনাল এক্সাম শুরু হতে আর দু’সপ্তাহ মতো বাকি। তাই স্কুলে আর হৈ-হুল্লোড় নেই, মাঠে খেলাধুলো নেই, এমনকি সকালে পাখিরাও খুব কম কিচিরমিচির করছে। যেন বিশ্বযুদ্ধ ঘটার আগের শান্তি। আর এই সময়টাই আমার সবচেয়ে অপছন্দের। পরীক্ষা নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে! যে যেমন পারবে, তেমন করবে। সবাইকেই ফার্স্ট হতে হবে এমন কোনো মানে তো নেই। আর সব বাবা-মা’রাও দেখি এসময়ই ছেলেমেয়েদেরকে বেশি করে মনে করিয়ে দেয়, “ফার্স্ট হতেই হবে, নাহলে সেকেন্ড বা থার্ড তো একদমই।”

ভাগ্যিস আমার মা-বাবা এইরকম নয়, আমায় কোনোদিনও পড়তেই বলে না। উল্টে, আমি যদি পড়ি বেশিক্ষণ ধরে, তাহলে বলে, “বাইরে থেকে একটু ঘুরে আয় না।”

যাইহোক, যেটা বলার ছিল তোমাদের, এই একমাসে বেশকিছু উলটপুরাণ ঘটে গেছে, যার একটা হলো, পেলু একদিন হঠাৎ আমায় ফোন করে বলে, “আদি, আমায় একটু ভূগোল আর ইকোনমিক্সটা পড়িয়ে দিবি ভালো করে?”

আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, “তুই পড়তে চাইছিস?”

পেলু শান্তগলায় বললো, “হ্যাঁ রে, তোর যদি অসুবিধে না হয়, আমায় একটু পড়িয়ে দিয়ে যাস। মা’ও খুব খুশি হবে।”

তা আমি রাজি হয়েছিলাম। যদিও আমি সায়েন্স-এর ছাত্র আর পেলু আর্টস-এর। তবুও আমি ভূগোল, ইকোনমিক্স, ইতিহাস অনেক ছাত্রর থেকে বেশ ভালোই জানি। আর এখন আমি চলেছি পেলুকে পড়াতেই।

গড়ের বড় রাস্তা থেকে নেমে নদীর ধারের সরু রাস্তা ধরলাম। এই রাস্তা দিয়ে যেতে আমার খুব ভালো লাগে। একপাশে দিগন্ত বিস্তৃত ধীর গতিতে বয়ে চলা নদী, যার জলে সূর্যের আলো পড়লে মনে হয় জলের উপর কোটি কোটি হীরে ছড়ানো আর একদিকে আমাদের ঐতিহ্যশালী গড়ের অতিকায় এবং একমাত্র প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির। মন্দিরটি আজও ব্যবহৃত হয়। আর নতুনত্বের আভাস নেই বলেই এই প্রাচীন স্থাপত্য আমায় ভীষণ টানে।

এখন আকাশ গাঢ় নীল থেকে ধূসরে রূপান্তরিত। সূর্যও অস্ত যাওয়ার পথ ধরেছে। নদীর ওপর এক মোটা লাল সরলরেখা মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে বেঁকে গিয়ে আবার নিজের রূপে ফিরছে। মন্দিরের ভেতর থেকে ঘন্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মন্দিরের চারপাশটায় ছোপ ছোপ অন্ধকার পড়ে সন্ধ্যের আভাস দিচ্ছে। এইসময়, ঠিক এইসময় দূর থেকে একটি সাইকেল আমার দিকে এগিয়ে আসছে দেখতে পেলাম। এই সাইকেল এবং সাইকেল আরোহী আমার বেশ চেনা। সাইকেলটা আমার সাইকেলের কাছে এসে থেমে গেল আর সাইকেল আরোহী মিষ্টি অথচ দৃঢ়স্বরে ঘোষণার সুরে বলল, “অদ্বৈত তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।”

।। ৪ ।।

আমাদের পরীক্ষা হয়ে গেছে। পেলুর পরীক্ষা বেশ ভালোই হয়েছে আর এতেই আমি ভীষণ খুশি। ওকে পরীক্ষার আগের দিনগুলোও বেশ সময় নিয়ে পড়া বুঝিয়ে দিয়েছি। মনে হয়েছিল, এইসব ব্যর্থ যাবে না আর সেটাই সত্যি হলো। আমার পরীক্ষাও ঠিক হয়েছে। তবে পেলুরটা নিয়ে আমি বেশি খুশি।

আমরা এখন বিষ্ণুমন্দিরের সিঁড়ির নীচের ধাপে বসে আছি। এইসময় পেলু হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বললো, “এবারের ক্রিকেট টুর্নামেন্টটায় নামবো না।”

আমার শরীরের ভেতরে ধপ করে একটা আওয়াজ হলো, বুঝলাম হৃৎপিন্ডটা খুলে পড়ে গেছে। আমি মন্দির চত্বরের সমস্ত শান্তিকে চিরবিদায়ের প্রস্তুতি দিতে চিৎকার করে উঠলাম, “কী! তুই... খেলবি না?”

পেলু গলার ভার আলগা করে নরম গলায় বললো, “না রে, ইচ্ছে নেই।”

আমি আরও অবাক, “মানে? তোর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের থেকে তুই দূরে থাকতে চাইছিস? আমায় বলবি কী হয়েছে?”

পেলু কেমনভাবে একটা হেসে বললো, “প্রিয় জিনিস? হুমম, বুঝলাম। জানিস, আমার মনে হয়, আমি খেলতে পারবো না। তনু কি খেলা ভালোবাসে?”

আমি ধমকের সুরে বললাম, “তনুই কী সব? তুই খেলবি, ব্যস। আর তনুও চাইবে যে তুই খেলিস।”

শুনে পেলু আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললো, “তাই? তাহলে খেলবো।”

আমার মনে হলো আমি পেলুকে সব বলে দিই, সেদিন তনু সাইকেল দাঁড় করিয়ে যা যা বলেছে আমায়। কিন্তু সেইসব শুনলে পেলু হয়তো আরওই ঠিক থাকবে না। আচ্ছা একটু আগে থেকেই বলি তোমাদের।

***

আমি পেলুর আবদার পূরণ করে প্রেমপত্র লিখেছিলাম। হ্যাঁ, আমি লিখেছিলাম। কিটস এবং রবীন্দ্রনাথের কবিপ্রতিভা মিলিয়ে, আইনস্টাইনের ইকুয়েশন থেকে ‘লাভ থিওরি’ বের করে, মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান যে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আর পতন যে ভালোবাসা হারানোর জন্য তা প্রমাণ করে, উল্কাপাত যে আসলে পৃথিবীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার একান্ত ইচ্ছা তা বুঝিয়ে প্রেমপত্র লিখেছিলাম।

পেলু পরেরদিন হাঁটু কাঁপিয়ে, গলা শুকিয়ে, আমাদের অবনীগড়ের সমস্ত অক্সিজেন বুকে টেনে নিয়ে তনুকে প্রেমপত্র দিয়েছিল আর কোনোমতে অস্ফুটস্বরে বলেছিল, “জানাস।”

তা তনু কিছু জানায়নি, প্রথম দু’দিন না জানানোয় পেলু আমায় ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, “ও কি বুঝেছে? উত্তর দিচ্ছে না কেন? তুই ঠিকভাবে লিখেছিলিস তো?”

আমিও বলেছিলাম, “এর থেকে ভালো লিখতে পারলে একটা বুকার বা নোবেল জুটে যেত এতদিনে।”

তো একসপ্তাহ কেটে যাওয়াতেও তনু কিছু জানায়নি, তারপর দুসপ্তাহ, তিন সপ্তাহ, একমাস, দু’মাস... তনু এখনো কিছু জানায়নি পেলুকে। তনু নাকি শুধু করুণ ভাবে তাকিয়ে থাকে পেলুর দিকে। আর সেটা দেখে পেলুর মনে হয়েছে, তনুর পেলুকে কিছু না জানানোর কারণ পেলু পড়াশোনায় ভালো নয়। তাই প্রেমপত্র দিবসের কিছুদিন পরেই পেলু আমায় ফোন করে আর পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার আর্জি জানায়।

তবে সেদিন তনু হঠাৎ করে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাওয়ায় আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম, মনে হচ্ছিল গ্যাস বেলুনের মতো উড়ে যাই। তবে আমার মধ্যে গ্যাস কম, তাই মাটিতে থেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কেন কি হয়েছে?”

তনু কোনোরকম ভণিতা না করে বলেছিল, “আদি, তুমি পেলুর হয়ে চিঠি না লিখলেই পারতে।”

শুনেই মনে হয়েছিল মাটিতে গর্ত খুঁড়ে ঢুকে যাই। আমতা আমতা করে বলেছিলাম, “তুমি... মানে তুমি কিভাবে...”

আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই, “কাকুর কাছে তোমার অনেক খাতা আছে। সেগুলো দেখে।”

আমি যথাসম্ভব সাহস এনে বলেছিলাম, “তার মানে এই নয় যে পেলু তোমায় সিরিয়াসলি ভালোবাসে না। ও তোমায় খুব ভালোবাসে। ও তোমার জন্য পড়াশোনায় ভালো হওয়ার ভীষণ চেষ্টা করছে।”

“কেন? আমি বলেছি? ও তো ক্রিকেট ভালোই খেলে। সবাইকে সব বিষয়ে যে ভালো হতে হবে তার কোনো মানে নেই।”

“তার মানে? তুমি হ্যাঁ বলছো?”, আমি উৎসুক হয়ে উঠেছিলাম।

“আমি পেলুকে কিছু জানাইনি। সময় এলে ঠিকই জানাবো। তবে অনুভূতিটুকু পেয়ে ভালো লেগেছে।”

“মানে? তুমি তার মানে ওকে ভালোবাসো?”, উৎকণ্ঠা দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু তনু কোনোরকম মানে না বুঝিয়েই সাইকেল চালিয়ে বড় রাস্তার দিকে চলে গেছিলো।

***

আমিও তাই পেলুকে কোনো মানে বোঝালাম না। আমি শুধু চাই পেলু খেলুক। আমি চাই, পেলু খুব খুশি থাকুক।

।। ৫ ।।

গ্যালারিতে আবার বল এসে পড়লো। ঠিক যেন আকাশ থেকে ভগবানের শ্রীফল এসে পড়ছে। যে পারবে লুফে নাও। কিন্তু আমি এইসব লোফালুফিতে নেই। টেনশনে আমার পা থেকে গলা পর্যন্ত বরফ হয়ে গেছে। তবু সব বরফ ভেঙে চিৎকার করছি, “জিও পেলু, আর মোটে চোদ্দ রান। তুই পারবিইইই।” পেলু ব্যাটিং করছে। ফাইনাল ওভার। ৪ বল, আর ১৪ রান।

হ্যাঁ পেলু খেলেছে, অবনীগড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নড়বড়ে ক্রিকেট টিমের মৃতদেহে সঞ্জীবনী দিয়েছে। আজ বরানগর হাই স্কুলের সঙ্গে ফাইনাল। গ্যালারি ভর্তি লোক। সবাই পেলুর আশায় এসেছে। ক্রিকেটে আয়রন ম্যান হওয়ার জন্য ওকে অবনীগড়ের সবাই ভালোবাসে আর আজ সেই ভালোবাসা সবাই দেখাচ্ছে। পেলুও নিজের সবটুকু দিয়ে তার মর্যাদা রাখতে ব্যস্ত। যাইহোক, ২০ ওভারে ১৮৫ তোলে বরানগর। জবাবে অবনীগড়ের ছেলেরা মাটি কামড়ে, মাটি খেয়ে ১৯.২ ওভারে ১৭২, এর মধ্যে পেলুর একারই ১২৪। ও খেলছে, খেলবেও, জিতবেও।

বরানগরের আব্বাস বলটা ইয়র্ক দিলো। পেলু কোনোমতে ওটাকে রিস্ট এর সাহায্যে ফ্লিক করে থার্ডম্যান এরিয়া তে পাঠালো। ২ রান নিতেই হবে। পেলু ছুটছে। গ্যালারির সবাই উৎকণ্ঠায় উঠে দাঁড়িয়েছে, দরকার হলে যেন সবাই পেলুর হয়ে ছুটে দেয়। যাইহোক, ২ রান নিতে পারলো, কোনোমতে। ৩ বল, ১২ রান।

পরপর দু’বলে দুটো চার। যেন কোনো ব্যাপারই নয়। আসলে কঠিন জিনিসটা পেলুকে করতে হচ্ছে, আর এতই সহজভাবে করছে যে আমাদের সবার বিশ্বাস ও পারবেই। লাস্ট বলে চার রান বাকি। ‘এ কী মামারবাড়ি? পেলু ছাড়া বাদবাকি সবাই কি করছিল প্রথমে? ‘ না সব দুশ্চিন্তা দূরে সরাতে একটু এদিক ওদিক তাকালাম। তনু একটু দূরে ওর বন্ধুদের সঙ্গে এসেছে। এই প্রথমবার মনে হয়।

আব্বাস রানআপ নেওয়া শুরু করলো। ভাবলাম টাইম মেশিন এ করে বল করার পরের মুহূর্তে চলে যাই। চোখ বন্ধ করলাম। ‘পেলু তুই পারবি না? তুই তো সব অসম্ভবকে সম্ভব করছিস। তনুও এসেছে, তোর পড়াশোনায় আগ্রহ বেড়েছে, অবনীগড়ের সবাইকে ভালোবাসা দিয়েছিস, হয়তো আজকের পর তনুও তোর হবে। প্লিজ পেলু আরেকবার, একটা চার।’

হঠাৎ গ্যালারি শুদ্ধু চুপ। আমি হঠাৎ একটা ধাক্কা খেলাম, পড়ে গেলাম সিট থেকে, চোখ খুলে দেখি আমার সিটেই কাঙ্খিত শ্রীফল। পেলু ৬ মেরেছে। উপহারটা আমাকেই দিলো। নাঃ এটা আমার কাছে না, তনুর কাছে যেতে পারতো, যাকে পেলু সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। কী দিলি রে পেলু আমায়? উফফফ, আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে। চোখে জল চলে এলো। আমাদের সবাইকে, অবনীগড়কে পেলু জিতিয়ে দিয়েছে। পেলু এবার সবার কাঁধ থেকে নেমে গ্যালারির দিকে আসছে। ঐ তো পেলুর মা, বাবা জড়িয়ে ধরলো ওকে। পেলু গ্যালারিতে ওঠার আগেই তনু ওর সামনে দাঁড়ালো। তনুর মুখে হাসি, পেলুও হাসছে। তনু কিছু বললো, পেলুর হাসিটা একটু সরে আবার হাসিটা চওড়া হলো। এবার পেলুও কিছু বললো হাসতে হাসতে। তনু ভীষণ খুশি হয়ে পেলুকে প্রায় জড়িয়ে ধরে। পেলু একটু অপ্রস্তুত হয়ে পেছনে সরে গেল।

‘আরে পাগলা, পারতিস তো ধরতে!’, ও কাকু কাকিমা আছে মাঠে। যাক, পেলু তুই সব পেয়ে গেলি। ‘এবার খুশি তো তুই?’ এবার থেকে প্রতিটা দিন যেন পেলুরই হয় আজকের মতো।

।। ৬ ।।
।। পেলু ।।

কি ভাবছো? শুধু আদিই বলে যাবে আর আমি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে চুপ করে থাকবো? আসলে শেষটুকু শুধুই আমার। আদিরও না, তনুরও না। আজ উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। কিন্তু অদ্বৈত রায় গত ১১ বারের মতো এবার ফার্স্ট হয়নি। হ্যাঁ ও এসব নিয়ে চিন্তা করে না ঠিকই, তবে আমার কষ্ট হয়েছে। ‘অবনী স্মারক’, মেডেল সব আদিরই প্রাপ্য ছিল। ও ওর মতো করে পড়লে পেতই। কিন্তু ও ওর সমস্ত সময় আমায় দিয়েছে, যাতে আমার রেজাল্ট ভালো হয়। আমি একবারে বুঝতে না পারলে বারবার আমার বাড়ি এসে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। না, এর জন্য আমি আক্ষেপে মরে যাচ্ছি না, ওর আর আমার বন্ধুত্ব এত পলক নয় যে এই কারণে দুজনের মধ্যে আক্ষেপ জন্ম নেবে। ও আমার জন্য যা করেছে সব মনের আনন্দ নিয়ে। আমি জানি, আমার রেজাল্ট ভালো হওয়ায় ও যা খুশি হয়েছে, তা ও নিজে ফার্স্ট হলেও হতো না।

আর আজ আমি যতটা খুশি, ততটা হয়তো আদিও নয়। আমি আদির জীবনে সবচেয়ে বড় গিফ্টটা দিতে পেরেছি। কারণ আদি তনুকে নতুনভাবে চিনতে পারছে। না কোনো রহস্যের দরকার নেই।

আসলে তনু আদিকে খুব ভালবাসে। আদির জন্যই ও আদির বাবার টিউশনিতে ভর্তি হয়েছিল। আদির যা যা খাতা ওর বাবা স্যাম্পল হিসাবে জেরক্স এর জন্য দিত, সব তনু নিজের জন্য কপি করিয়ে নিত। মাঝেমাঝে আদি সাইকেল নিয়ে একা নদীর ধারে বা বিষ্ণুমন্দিরে এলে তনুও ওকে দূর থেকে ফলো করতো, দেখতো। তাই আমি যখন তনুকে আদির লেখা চিঠিটা দিই, তখন ও সহজেই হাতের লেখা চিনেছিলো আর আদির ঐ লেখাটাকে গ্রহণ করেছিল, শুধু আমার নামটাকে নয়। তনু আমায় প্রথমদিনই জানিয়ে দিতে পারতো, কিন্তু আমি কষ্ট পেলে সেই কষ্টে যদি আদিও মনখারাপ করতো, তাই কিছু বলেনি। তনু একটা ভালো দিন, ভালো সুযোগ চাইছিল, যেদিন ও আমায় সব বুঝিয়ে বলতে পারবে। আর খেলার শেষে মাঠে ও সেই সুযোগটা পেল। আমি শুনলাম, কষ্ট হয়েছিল। ফুসফুস দুটোকে কেউ চেপে ধরছে মনে হয়েছিল এক লহমায়। কিন্তু আদির কথা মাথায় আসতেই অনেক বেশি খুশি হয়ে গেলাম। কারণ আমি আদিকে তনুর থেকে অনেকটা বেশি ভালোবাসি। বেশি আর সেটা ঐ দিন আরো ভালোভাবে বুঝলাম। এটা কোনো মহান হওয়ার আনন্দ নয়, এই আনন্দ প্রতিটা বন্ধু বুঝতে পারবে যারা তাদের বন্ধুকে সবচেয়ে বড় খুশিটা দিতে পেরেছে।

আদি এখনই সব ফিল করেনি, ওর কাছে এখনো এই ভালোবাসা বিনা অক্সিজেন মাস্কে এভারেস্ট চড়ার মতো। তবে সবকিছুরই তো শুরু আছে। আর ও সেই শুরুতেই দাঁড়িয়ে। কারণ আদি তনুকে পছন্দ করে বন্ধু হিসাবে, এখন ভালো না বাসলেও। আর আমিও আদিকে বুঝিয়েছি, আমি কষ্টে নেই, আমি সত্যিই কষ্টে নেই।

হ্যাঁ, সবকিছু পারফেক্ট হলো না, মিললো না। আর সত্যিই পারফেক্ট তো কিছু হয় না। এই অতৃপ্তি, অসম্পূর্ণতার মধ্যে খুশিগুলো আমরা পেয়েছি একে অপরের আনন্দে।

এই বাস্তবের চিত্রনাট্যটি হয়তো অতি সাধারণ - গল্পটাও তেমনই রসকষহীন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি যা দেখছি তা আর অন্য কেউ দেখছে না।
সূর্য এখন তার শেষ আলো পৌঁছে দিচ্ছে এই অবনীগড়ে, বিশাল নদীটি নিঝুম হয়ে সেই আলো গ্রহণ করছে, আকাশে দুই পাখি গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছে আর আমার সামনের এই দৃশ্যপটের মাঝখানে বসে অদ্বৈত আর তনু পৃথিবীতে নেমে আসা অন্ধকারে চিরকালের মতো আলো আনছে ওদের সহজ সরল সম্পর্ক দিয়ে।

আর তাই আদির সবকিছু বলার পর শেষে আমারও কিছু বলার দরকার হয়ে পড়ে। আমার আনন্দ দিয়ে গল্প শেষ করার দরকার হয়ে পড়ে। তবে বাস্তবিকই এখানে কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে না। নতুন সম্ভাবনার শুরু হয়, আদির আর আমার বন্ধুত্বও আরো জমাট হয়। তাই গল্পটা তোমাদের কাছে শেষ হয়ে গেলেও আমাদের কাছে হচ্ছে না, এখন চলছে, চলবেও।

(সমাপ্ত)

পাঠকেরা যা পড়ছেন