ঠাকুরঘরে কে?

ঠাকুরঘরে কে?
অনিমেষ ভট্টাচার্য্য


“তার মানে তুই বলছিস, লোকটা দরজায় আওয়াজ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল?”

“হ্যাঁ। তারপর কাউকে না দেখতে পেয়ে এদিক ওদিক খুঁজতে গেছিল আর তখনই ব্যাস!”

“ধ্যার! তা কী করে হয়? লোকটার বডিটা আমরা পেয়েছিলাম দরজা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। কী রে মানিক, তাই তো?”

মানিক দুটো চায়ের গেলাস টেবিলে রেখে বলল, “আজ্ঞে, পঞ্চান্ন মিটার। বল খেলার মাঠ বরাবর।”

“তাহলেই দেখ, কিশোর। কাউকে খুঁজতে, যাকে সে চেনেই না, অত দূর কেন যাবে? তাও মাঝরাতে!”

“উম্-ম... এটা ধাপ্পা হতে পারে। মানে ধরেন, লোকটা খুন হল দরজার কাছাকাছিই। এই পাঁচ-দশ মিটারের মধ্যে। তারপর যাতে সন্দেহ না হয়, তাই ডেডবডিটা টেনে নিয়ে ওখানে রাখল। আর সেক্ষেত্রে আততায়ী সম্পূর্ণ অচেনা ঠেকছে না! বা এমনও হতে পারে আততায়ী খুবই চেনা। বাইরে গলা শুনে দরজা খুলল। সে বলল, ‘একটা জিনিস দেখবি, চল।’ তারপর কিছু দূর গিয়ে কুপিয়ে দিল! কী বলেন?” নিজের বুদ্ধিতে নিজেই গদগদ হয়ে চায়ের বদলে বোতল থেকে আরেকবার জল খেল কনস্টেবল কিশোর বর্মণ।

“তোর ধান্দাটা কী বল তো? আগে থেকেই একটা আইডিয়া বানিয়ে রেখে দিবি আর তারপর যা হোক করে সেখানে টেনে নিয়ে যাবি? মাঝ রাত্তিরে কেন কেউ কিছু দেখাতে নিয়ে যাবে? আর খুনির মোটিভ কী? ভিক্টিমের ঘর থেকে তো কিছুই চুরি যায় নি। দরজাটা ভেজানো ছিল মাত্র। ফ্যান লাইট সবই চলছিল। ছুরিটাও পাওয়া গেল না। ঠিক করে খুঁজেছিলি তো তোরা?” চা শেষ করে গেলাস নামিয়ে রাখলেন লাভপুর থানার ইন্সপেক্টর সমর্পণ শিকদার। মৃদু আওয়াজ হল— ঠক্‌। তাঁর চোখ চলে গেল সামনে খোলা কাগজের পাতায় বড় বড় করে লেখা হেডলাইনের দিকে—

সংকেত দত্ত হত্যা রহস্য। লহরগঞ্জের ইতিহাসে এক অদ্ভুত অধ্যায়। একই সঙ্গে লজ্জার!

“অ্যাই! হট! হুট হুট!... আরে কী মুশকিল! আগের দিন এলাম তো। তাও চিনে উঠতে পারেনি এরা।”

“এ গাঁয়ে তো পুলিশ-টুলিশ আসে না বাবু। তাই হয়তো আপনাদের পোশাক-আশাক দেখে ওরা একটু আমোদ পেয়েছে।” বলে মুখ টিপে হাসল চায়না বাগদি। পুকুর থেকে জল নিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় কুকুরের পাল্লায় অতিষ্ঠ সমর্পণবাবুকে দেখে তার এই উক্তি।

“এই শোনো, শোনো... কী নাম তোমার?”

“চায়না। হলুদপাড়ায় শ্বশুরবাড়ি। বিটির জ্বর, তাই ক'দিন বাপের ঘর এলাম। তা এসে থেকে ভালোই ছিলাম জানেন।” কলসি নামিয়ে শিশু গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কপালের ঘাম মুছল চায়না। “কোন ঝঞ্ঝাট নাই। হুজ্জোতি নাই। কোত্থেকে যে কী হয়ে যায়! শুনেছি মানুষটা ভালো ছিলেন।”

“হুম। ... তা মানুষটাকে চিনতে-টিনতে নাকি?”

“আ মরণ! আমি কেনে চিনতে যাব? ব্যাঙ্কে কাজ করত শুনিচি।ওই ব্যাঙ্কে-ট্যাঙ্কে যারা যেত, তাদের শুধান। আমাদের অত টাকাও নাই। মুরোদও নাই!” কলসি কোমরে উঠিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল চায়না, “যাই দারোগা বাবু। বিটিকে খেতে দিতে হবে। আপনি হরেন সান্যালরে জিগেস করেন। ওদের পোচুর পয়সা!”

সমর্পণবাবু কনস্টেবল কিশোরকে নিয়ে সান্যাল বাড়িতে ঢুকলেন।

“আপনি তো সংকেত দত্তকে চিনতেন?” ইন্সপেক্টর জিগেস করলেন।

“ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের সাইথিয়া ব্রাঞ্চের করণিক। মানুষ খুব ভালোই ছিল। বছর তিনেক আগে ট্রান্সফার হওয়ায় এখানেই টিনের চালের বাড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করে।” হরেনবাবু বললেন।

“আর পরিবার?”

“সে তো কাল এসেছিল দেখলেন। বউ বাচ্চা আর বুড়ো বাবা। বাগুইহাটিতে থাকে। এখানে নিয়ে আসেনি। গ্রামে সুযোগ-সুবিধা কম বলেই হয়তো। তবে, উৎসবে অনুষ্ঠানে বাড়ি চলে যেত। আমাকে কিংবা তারাচরণকে বলত বাড়িটা নজর রাখতে।”

“তারাচরণবাবু মানে সামনের ওই পুরোনো বাড়িটা?”

“হ্যাঁ। তারাচরণরা এই গাঁয়ের খুব পুরোনো বাসিন্দা। ওদের সঙ্গেও সংকেতের সদ্ভাব ছিল।”

“কিশোর, সব নোট করলি তো রে? তারাচরণ-এ মূর্ধন্য ণ কিন্তু!” বলে উঠে দাঁড়ালেন ইন্সপেক্টর শিকদার। কিশোর দরজায় হেলান দিয়ে টুকছিল। তড়িঘড়ি বানানটা ঠিক করল।

***

ওরা বাইরে এল। বল খেলার মাঠে ছেলেরা জড়ো হচ্ছে এক এক করে ব্যাট বল নিয়ে। একটা হলদে জামা পরা ছেলে, যাকে বাকিরা ‘লাড্ডু’ বলে ডাকছিল, সে কিছু একটা খুঁজছিল। কিন্তু পাচ্ছিল না। হতাশ হয়ে বলল, “এই পল্টু, উইকেটগুলো পুতব কী করে?”

“কেন, ওই তো ব্যাটটা পড়ে আছে। নিয়ে আয়।”, পল্টু বলটা এ হাত ও হাত ঘোরাতে ঘোরাতে বলল।

“ধুর। মাটিটা খুঁড়তে হবে একটু। নইলে হচ্ছে না। শিকটা তো এখানেই থাকার কথা।”

“হ্যাঁ, ওই রাস্তার ওখানে দেখ। পাচ্ছিস না?”

“না। তুই আয়!”

সমর্পণবাবু ওদের দিকেই আসছিলেন। তারাচরণের বাড়িতে তালা দেখে, কোথায় গেছে খোঁজ নিতে। এই কথোপকথন শুনে কী একটা খটকা লাগল তাঁর।

“অ্যাই, তোরা কী খুঁজছিস?”

“দারোগা বাবু! আমাদের একটা লোহার শিক ছিল। উইকেট পোঁতার সময় মাটি গর্ত করতে লাগে। এইখানেই থাকে। বাড়িতে রাখলে মা ঠাকুমারা উনুনে কয়লার ছাই বার করার কাজে লাগিয়ে দেবে, তাই!” পল্টু বলল।

সমর্পণবাবুও খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে লাগোয়া ঠাকুরতলায় চলে গেছিলেন। ছেলেরা জোর গলায় ডাকল, “ও দারোগা বাবু, ওদিকে জুতো পরে যাবেন না। মসণ্ডী মায়ের ঘর। পাপ দেবে।”

ততক্ষণে কিশোর অন্য একটা ছেলের থেকে তারাচরণের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিল। একটু ওস্তাদি করেই নিজে জেরা করছিল...

“হ্যাঁ রে, তোর নাম কী?”

“পিলু প্রামাণিক। তোমার নাম?”

কিশোর থতমত খেয়ে সামলে নিয়ে বললে, “আমার নাম জেনে কাজ নেই তোর। এই তারাচরণবাবুরা কোথায় গেছেন রে?”

“তা জানি না। তবে, যাওয়ার আগে অংশু বলছিল দু’দিনের লেগে চলল। তার মানে ধরো এই আজকেই ফেরার কথা।”

“অংশু কে? ওঁর নাতি?”

“নাতি কেন হবে! তারা জ্যাঠার ছেলে অংশু। আমার সঙ্গেই পড়ে।”

এমন সময় ইন্সপেক্টর শিকদারের ডাক শোনা গেল, “এই কিশোর চল। থানায় ফিরে যাই। তারাচরণ বাড়িতে নেই। পরে আসব'খন। আজ আবার বাগুইহাটির খোঁজ নিতে হবে।”

“হ্যাঁ, তাই চলেন। বাগুইহাটি কেনে?” কিশোর প্রশ্ন করে।

“ওই যে শুনলি না, সংকেতের পরিবার বাগুইহাটিতে থাকে!”

লহরগঞ্জ থেকে লাভপুর থানায় যখন সমর্পণবাবু ফিরলেন, তখন বিকেল শেষ হয়ে এসেছে। গাঁয়ের ছেলেরাও খেলা ভেঙে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে। কোনও গোয়ালবাড়ির পিছনে আস্তে আস্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

মজুমদার পাড়ার রাস্তা দিয়ে একটা ট্রলি রিক্সায় প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন দিতে দিতে গাঁয়ে ঢুকল তারাচরণ, তার স্ত্রী রত্না আর ছেলে অংশু। গাঁয়ের পথ ঘাটে ঝুপ করে অন্ধকার নামে। বাড়ির দোরগোড়ায় এসে টর্চ বের করল বছর আটত্রিশের তারাচরণ। খুট করে তালা খুলে স্ত্রীকে বললেন, “এসো...”

মানিক আবার চা দিয়ে গেছে। চুমুক দিয়ে আরাম করে চোখ বুজে ছিলেন ইন্সপেক্টর। ক্রিং ক্রিং করে ফোনটা বেজে উঠল। সমর্পণবাবু ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে হরেন সান্যালের গলা— “ঘটনা ঘটে গেছে, ইন্সপেক্টর! কে বা কারা তারাচরণের সিন্দুক লুট করে পালিয়েছে।”

ধড়মড় করে উঠে বসলেন চল্লিশোর্ধ্ব ইন্সপেক্টর। তারপর একটু ভেবে বললেন, “কীভাবে জানা গেল?”

সেদিন আর লহরগঞ্জে যান নি তিনি। তাঁর অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক তখনই বুঝে ফেলেছিল এই খুন আর ডাকাতি একসূত্রে বাঁধা। কাজেই চুরিটাও পরশু রাতেই হয়েছে। এখনই রাত-বিরেতে গাড়ি ছুটিয়ে লহরগঞ্জ গিয়ে লাভ নেই। ফোনেই খানিকটা জানার চেষ্টা করলেন। তারাচরণের সঙ্গেও ফোনে মিনিট পনেরো জেরা হল। কিছুটা জানাও গেল। সেই নিয়েই রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত চলল কিশোরের সঙ্গে জোর আলোচনা।

“তাহলে, পারিবারিক সম্পত্তি বলছেন?” কিশোর শুধাল।

“তারাচরণরা দুই ভাই। ওদের বাবারা তিন ভাই এক বোন। গ্রামে এক তারাচরণই থাকে। বাকিরা বাইরে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কাজেই পৈতৃক সম্পত্তি বল আর এজমালি, সিন্দুকের ভাগীদার কিন্তু অনেকেই।” গম্ভীর ভাবে পায়চারিরত অবস্থায় ইন্সপেক্টর বললেন।

“সে সিন্দুক এল কোত্থেকে?”

“রাজরাজড়ার আমলে তারাচরণের কোনও এক পূর্বপুরুষ নায়েব ছিলেন। সেই সূত্রে বেশ কিছু বাঁধানো গয়না, সোনাদানা জমা হয়েছিল সিন্দুকে। গাঁয়ের অনেকেই জানে সেটা। তবে সেই সঙ্গে ছিল গৃহদেবী মসণ্ডী মায়ের দায়িত্বও। যা জানতে পারলাম, জীবনে ভয়ানক অভাব না এলে, মানে ধরে নে এমন অভাব যে মায়ের পুজো হল না, একমাত্র তখনই ওই গয়নায় হাত পড়বে। পড়েওছে এর আগে দু’বার। একবার ওদের বাবা দ্বিজপদর আমলে আর একবার এই তারাচরণের ক্ষেত্রে।”

“বাব্বা! অনেক কেস তো! জিনিসটা থাকত কোথায়?”

“বলল তো মসণ্ডী মায়ের ঘরেই। ঠাকুর নাকি খুব জাগ্রত। তাই চুরির ভয় কেউ কোনওদিন করেনি। এমনিতেও ওদের পরিবারেও যদি গয়না বিক্রি করতে হয়, তো সবার থেকে আলোচনা করেই সেটা করতে হবে—”

“বুঝলাম। যা হোক। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে, তারাচরণ গাঁয়ে ছিল না আর চোর সেই সময় এসেছিল চুরি করতে। পালাবার সময় সামনে চলে আসে সংকেত দত্ত। আর খুন! খুবই সিম্পল!”

“তাই না? খুব সিম্পল। যদি ধরেও নি, যে চোর আর খুনি একই লোক, তাহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন চুরি করল কে? সংকেত অত রাত্রে ওখানে কী করছিল? চুরি হল, খুন হল... অথচ কেউ কিচ্ছু জানতে পর্যন্ত পারল না! অদ্ভুত না?”

“আচ্ছা, এই তারাচরণ নভেম্বর মাসে আবার কোথায় গেছিল?”

“আমার স্ত্রীর বাপের বাড়ি কাছেই। দক্ষিণমাঠ পেরিয়ে একটা গ্রামে। অংশুর মামার খুব জ্বর হল। তাই, একটু খোঁজ খবর করতে গেছিলাম মঙ্গলবার।” কাটা-কাটা ভাবে কথাগুলো বলল তারাচরণ। শনিবারের সকাল বেলা। ইন্সপেক্টর শিকদার জেরা করতে এসেছেন তারাচরণের বাড়িতে।

“অংশুর মামা এখন কেমন আছেন?” সমর্পণবাবু জিজ্ঞেস করলেন। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছেন তিনি। চৌকিতে উপবিষ্ট তারাচরণ, হরেন সান্যাল এবং তারাচরণের স্ত্রী রত্না। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব নথিবদ্ধ করছে কিশোর।

“বেটার। ভাইরাল জ্বর। সময় খারাপ তো। বুঝতেই পারছেন।”

“পরিবারের বাকিদের খবর দিয়েছেন?”

“ছোটকে কাল বলেছি। আজ বিকেল দিকে ঢুকবে।”

“ঠাকুর ঘরে থাকে বলছেন জিনিসটা। তা সেখানে ঢোকার রাস্তা কোনটা?”

“দুটো রাস্তা আছে। এক সদর দিয়ে ঢুকে এই বারান্দার শেষে একটা দরজা আছে। ওটা খুলে যাওয়া যায়। অথবা ঠাকুরতলার বাইরের যে দরজাটা আছে, ওই প্রাঙ্গণের লাগোয়া ওইটা দিয়ে—”

“একবার দেখানো যাবে দুটো রাস্তাই?”

“আসুন...”

***

ঝুমঝুম শব্দে চাবিগাছা নিয়ে রত্না দেবী আগে আগে চললেন। সমর্পণবাবু দেখলেন খিড়কি দরজার সঙ্গে এই বারান্দার কোনও সম্পর্ক নেই। মাঝখানে উঠোন আর উঠোনের পর কোলাপসিবল্ গেট। মানে খিড়কি দিয়ে ঢুকতে হলে এই গেট খুলতে হবে! গেট নাকি বন্ধই পেয়েছিল তারাচরণ। তার মানে বাকি থাকে সদর আর প্রাঙ্গণের দরজা। রত্না দেবী ভেতরের দরজা খুলতেই ঠাকুরঘরটা সামনে এল—

সব দেখে শুনে বাইরে এলেন ইন্সপেক্টর আর তারাচরণ। মাঠের পাশেই একটা গোঁজ পোঁতা ছিল। পায়ে লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন সমর্পণবাবু আর তখনই মাটিতে আধখানা ঢুকে থাকা জং ধরা বাঁকা শিকটা চোখে পড়ল তাঁর! তড়িঘড়ি সামলে নিয়ে বললেন, “আমার ঘড়িটা বোধহয় ঘরেই ফেলে এসছি। একটু কাইন্ডলি এনে দেবেন, তারাবাবু?”

“কী হল স্যার! কিছু তো বলেন!”

“আঃ! কিশোর। থাম, থাম। ভাবতে দে। তুই ওই শিকটা ফরেন্সিকে পাঠিয়েছিস তো?”

“হ্যাঁ তো। কালকের মধ্যে রিপোর্ট এসে যাবে। আচ্ছা, স্যার, কালকে সংকেত দত্তর ব্যাপারে কিছু জানতে পারলেন?”

“ওঁর স্ত্রী রেশমি খুবই ভেঙে পড়েছেন। ভালো করে কথা হয়নি। তবে একটা অদ্ভুত জিনিস জানা গেছে।”

“কী? কী?”

“বলছি, তার আগে তোকে একটা কাজ করতে হবে। একবার দক্ষিণমাঠ যেতে হবে। অংশুর মামার কেসটা যাচাই করা দরকার! ওখানেই খটকা লাগছে। সামান্য ভাইরাল ফিভারের জন্য মামাবাড়ি! উঁহু... আমি ততক্ষণে দেখি তারাচরণের ছোটভাইয়ের সঙ্গে কোনও ভাবে কথা বলা যায় কি না!”

“আবার লহরগঞ্জ যাবেন?”

“হ্যাঁ। তুই গাড়ি নিয়েই যা। আমি বাইকে চলে যাচ্ছি। রত্না দেবীর ভাইয়ের নাম সমীরণ। খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না। ছোটগ্রাম। খোঁজ নিয়ে রেখেছি আমি।”

দুপুর তিনটে বাজছে। দু’জনেই আবার থানা থেকে বেরিয়ে গেল। রহস্য ক্রমেই শেষের দিকে। মানিক বিকেলের চা এনে দেখে টেবিলে কেউ নেই। নিজেই দু’কাপ চা খেল বসে বসে!

তারাচরণ চক্রবর্তীর বৈঠকখানায় ঘর ভর্তি লোক। তারাচরণ ছাড়াও আছে রত্না দেবী, তারাচরণের ভাই শংকর, হরেন সান্যাল, লাড্ডু, অংশু, কিশোর ও মানিক। এছাড়া, বাড়ির বাইরে পুলিশের গাড়িতে আরও দু’জন কনস্টেবল বসে। “যাক, তাহলে সবাই এসে গেছেন! শুরু করা যাক।” বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ইন্সপেক্টর সমর্পণ শিকদার।

“ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়ানো অর্থাৎ স্লিপ ওয়াকিং একটা রোগ। এই অবস্থায় মানুষ ফ্রিজ খুলে খাবার পর্যন্ত খাওয়ার নজির আছে। আর ঘটনাটা আধঘন্টা-চল্লিশ মিনিট অবধি স্টে করতে পারে। সংকেত দত্তর স্লিপ ওয়াকিং-এর রোগ ছিল।” চকিতে একবার চারদিক চোখ বুলিয়ে নিলেন সমর্পণবাবু।

“লহরগঞ্জে কুকুর নেহাত কম নয়। খুন হল, ডাকাতিও হল। কিন্তু একটা কুকুরেরও ঘেউ ঘেউ কেউ শোনে নি। তার মানে একটাই! শুধু সংকেত দত্তই নয়, খুনিও এই পাড়ার!”, একটু থেমে আবার শুরু করলেন তিনি— “চক্রবর্তী বাড়ির সিন্দুক আর মসণ্ডী মায়ের মন্দির দুইই একই যোগসূত্রে বাঁধা। তাই, সিন্দুক থেকে গয়না হাতিয়ে নেওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। সিন্দুকে কী কী আছে, সবকিছুর তালিকা পরিবারের সবার কাছেই থাকে। শংকরবাবুই কাল বলছিলেন। কাজেই, কোনও একজনের অভাবে সিন্দুকে হাত পড়বে না, এটাই নিয়ম। চোর জানত সিন্দুক বোঝাই আছে মণি-মানিক্যে। ঠাকুরঘরে একবার ঢুকতে পারলে কেল্লা ফতে। কারণ, সিন্দুকের তালা ভাঙার আওয়াজ বাইরে কেউ শুনতে পাবে না। ব্যাপারটা এতটাই ভেতরে। সুতরাং, ঠাকুরঘরের তালা খোলাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। যা করার রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে করতে হবে।”

“গ্রামবাসী তালা ভাঙার আওয়াজ পায়নি। তালা ভাঙাই হয়নি। শুক্রবার বিকেলে লাড্ডুদের সঙ্গে শিক খোঁজার সময়েই দেখেছিলাম ওই তালায় ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন নেই। অথচ, সিন্দুকের তালা ভাঙা ছিল। ব্যাপারটা অসম্ভব নয়। ঠাকুরঘরের তালা সবাই দেখতে পায়। যে কেউ তার চাবি বানিয়ে রাখতে পারে। সেটা কে, পরে আসছি।”

“চোর রাতের অন্ধকারে এল, তার কাছে থাকা চাবি দিয়ে তালা খুলল, ভেতরে গিয়ে সিন্দুকের তালা ভেঙে মালপত্র হাতিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল আর সামনে এল সংকেত দত্ত! ভূত দেখার মতো অবস্থা! বারোটার পর গ্রাম ঘুমিয়ে যায়। তাই, এই আশঙ্কাটা চোর আশা করেনি। সংকেত যে আদতে ঘুমের ঘোরে হাঁটছে, সেটা খুনির জানা ছিল না! তবে, তার সঙ্গে তো তালা ভাঙার হাতিয়ার থাকার কথা! অথচ সংকেত দত্ত খুন হয় একটা লোহার শিকে! যেটা লাড্ডুরা উইকেট পোঁতার কাজে লাগায় আর যে জিনিসটা কৌশল করে গোঁজের পাশে মাটিতে ভরে রাখা হয়েছিল! কেন?”

গোটা ঘর থমথম করছে। পিনপতনের নিঃশব্দতা। অংশু আর লাড্ডুর পলক পড়ছে না! ইন্সপেক্টর গ্লাস থেকে ঢকঢক করে জল খেলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “অর্থাৎ, চোর তালা ভাঙে নি। সিন্দুকের চাবিও তার কাছেই ছিল। কোনওরকম লোহা-লক্কর-শাবল-গাইতি তার কাছে ছিলই না! ভাঙা তালা, যেটা হরেন বাবু দেখেছিলেন, সেটা একটা সাজানো ব্যাপার ছাড়া কিছুই না! ব্যাপারটা একদম দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল শংকরবাবুর পায়ের জুতো দেখে। জুতোটা দে তো মানিক।”

মানিক জুতোটা এগিয়ে দিল।

“কী শংকরবাবু, এটাই কাল পরেছিলেন না? যখন চায়ের দোকানে আপনার সঙ্গে কথা বলছিলাম!”

“হ্যাঁ তো। কিন্তু এটা তো এই বাড়িতেই থাকে। আমি তো আপনাকে কালকেই বললাম। আমি শু পড়ে এসেছি। হাঁটতে যাওয়ার জুতো ছিল না। তাই, এইটা পরে বেরিয়েছিলাম। দাদার জুতো এটা! খাদিমের পুরনো মডেল। এখন আর পাওয়া যায় না।”

এক ধাক্কায় সব্বার চোখ ঘুরে গেল তারাচরণের দিকে। সে সদর্পে বলল, “তাতে হয়েছেটা কী!”

“সেখানেই তো কাণ্ড ঘটেছে তারাবাবু। ঠাকুরতলায় জুতো পরে যাওয়া নিষেধ। আর শুক্রবার বিকেলে আমি সেখানেই কামিনী গাছের গোড়ায় জুতোর ছাপ পেয়েছিলাম। খুব সম্ভবত চোর ঢোকার সময় তাড়াহুড়োতে জুতো খুলতে ভুলে গেলেও ঘরে ঢোকার আগে গাছতলায় জুতো খোলে, এবং ফেরার পথে সেটা পরার সময় হালকা ছাপ রেখে যায় যে ছাপ চায়ের দোকানের মাটির মেঝেতে গতকাল খুঁজে পাই। কী, তারাবাবু, এখনও বলবেন কী হয়েছে!”

“দারোগাবাবু, এসব গাঁজাখুরি গপ্প শুনিয়ে কী লাভ হচ্ছে? বেস্পতিবার আমি সস্ত্রীক দক্ষিণমাঠে। অংশুর মামার—”

“সমীরণবাবুর জ্বর হয় নি, তারাবাবু!” গর্জে উঠলেন ইন্সপেক্টর! “তিনি আর আপনি এসেছিলেন সেদিন লহরগঞ্জে। যাতে লোকে সন্দেহ না করে সেজন্য অ্যালিবাই সাজিয়েই কাজটা করেছেন!”

“কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?”

“প্রমাণ? হা, হা, হা! হাসালেন তারাবাবু!”,তারপর লাড্ডুর দিকে ঘুরে বললেন, “কোথায় মাটি খুঁড়ছিল রে?”

“ওই তো উঠোনে। নারকেল গাছের ওখানে- সেদিন প্রসাদ খেতে এসে দেখেছিলাম।”

সমর্পণবাবু বললেন, “প্ল্যান আপনার ভালোই ছিল তারাবাবু। বাড়িতে না থাকাকালীন সিন্দুকের তালা ভেঙে চুরি। তারপর সেটা সটান নিয়ে যাবেন শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে সমীরণকে তার ভাগ দিয়ে বাড়ি ফিরে বাকিটা উঠোনের গর্তে ভরে রাখবেন। কারণ, আপনি আন্দাজ করেছিলেন বাড়ি খানাতল্লাশি হতে পারে। সন্দেহের তীর যে আপনার দিকে যাবে, সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিত ছিলেন। বাধ সাধল ব্যাঙ্কার সংকেত! আচ্ছা, কতদিন ধরে অভাব চলছে, হ্যাঁ?”

রত্নাদেবী ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “আমি বলেছিলাম, এসব করতে যেও না। দারোগাবাবু, গেল বছরের আগের বছর থেকে একটাও জমিতে ভালো করে ফসল হচ্ছে না। এজমালি সম্পত্তি- জমি বিক্রি, বন্ধক কিচ্ছু করার জো নেই। যাও বা পয়সা আসে তাও ভাগ করতে হয় সবার সঙ্গে। আমাদের কপালে খুব কিছু জোটে না। কত বলেছি ভাইদের, পিসিদের... কেউ মুখ তুলে চায় নি, দারোগাবাবু!”

“মানিক, লোক লাগিয়ে উঠোন খোঁড়ার ব্যাবস্থা কর। কিশোর, দক্ষিণমাঠের খবর কী?”

“থানায় ফোন করেছিলাম। সমীরণ ভীতু লোক। দু’চার ঘা পড়তেই সব বলে দিয়েছে। মাল পাওয়া গেছে। সে এখন থানায় হাওয়া খাচ্ছে!”

***

মাথা নীচু করে বসে আছে তারাচরণ। চুপ করে গেছে। অংশু আর লাড্ডু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শংকর কাকে একটা ফোন করার জন্য বারান্দায় দাঁড়াল। হরেন সান্যাল এতক্ষণ কিচ্ছু বলেননি। মাথা নেড়ে চুক চুক শব্দ করে বললেন, “আমাকে তো জানাতে পারতিস। না হয় কিছু ধার দিতাম। সংকেতকে এভাবে মরতে হত না। ভালো ছেলে ছিল। লহরগঞ্জ এ ঘটনা কোনওদিন ভুলবে না। কোনওদিন না!”

তারাচরণকে হাতকড়া বেঁধে গাড়িতে তুলল কিশোর। চক্রবর্তী বাড়ির চারপাশে তখন একগাদা ভিড়। চাপা গুঞ্জনের মধ্যে ধুলো উড়িয়ে মিলিয়ে গেল পুলিশের গাড়িটা।

পাঠকেরা যা পড়ছেন