মণিময় দারোগা


অলংকরণ - সুমিত রায়
(১)

এলেম আছে বটে মণি দারোগার! আশেপাশের পাঁচ-সাতটা গাঁয়ের লোক একবাক্যে তাঁর নামে সেলাম ঠোকে। মণি দারোগা যাকে বলে এক্কেরে নয়নের মণি সকলের। হ’বেন নাই বা কেন! যবে থেকে তিনি বটুকপুর থানার অফিসার-ইন-চার্জ হয়েছেন তবে থেকে এ তল্লাটে আর একটাও চুরি ডাকাতি হয়েছে বলে দেখাতে পারবে কেউ? গেরস্ত মানুষেরা দরজা জানালা হাট করে খুলে নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমোন। একটা স্টিলের গেলাস কিংবা ছেঁড়া গামছাটুকুনও চুরি হয়না।

বটুকপুরের দোকানগুলোতেও আজকাল আর তালা চাবি বিক্রি হয় না। সেই সেবার মদন চাটুজ্জের সদ্য বিয়ে হওয়া ছোটোজামাই কী বিপদেই না পড়ল। অষ্টমঙ্গলায় মেয়ে বাপের বাড়ি এসেছে জোড়ে, সেখান থেকে সটান যাবে বর্ধমান। ফেরার দিন হ’ল চিত্তির। সাধারণত বড় বড় সুটকেস তো সব বাসের মাথাতেই তুলে দেয় কন্ডাকটার-রা। এদিকে সুটকেসের ছোট্ট পিচ্চি তালাটা গেছে ভেঙ্গে। দোকানে দোকানে ঘুরে মদন চাটুজ্জে তালা আর পায়না। শেষমেষ নতুন জামাইকে নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা সুটকেস নিয়েই বর্ধমান যেতে হ’ল।

নিন্দুকে অবশ্য বলে মণিময় দারোগা তন্ত্রমন্ত্র জানেন, তাঁর নাকি পোষা ভূত আছে একগণ্ডা। সেই ভূতেরাই তো সব চোর ডাকুদের শায়েস্তা করে রাখে। যেমন মণিময় মুকুজ্জে দারোগা হয়ে আসার মাস খানেক পরের কথাটাই ধরুন না। রামাপদ চোর তার সিঁধকাঠিটি নিয়ে হরনাথ মল্লিকের গোয়াল ঘরের মাটির দেওয়ালে ঝুরঝুর করে মাটি খুঁড়তে শুরু করেছিল সবে। হরনাথ সম্পন্ন কৃষক, সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ মানুষ। তিন চারটে জার্সি গরু পোষা রয়েছে, দাম কম নয় সেগুলোর। গোয়ালঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বাড়ির মধ্যে চলে যাওয়ার পথ রয়েছে। রামাপদ তাই সিঁধ দিয়ে ভেতরে ঢুকে তারপর গরু নিয়ে গোয়ালঘরের দরজা খুলে পালানোর মতলব ভেঁজেছিল। কিন্তু যেই না আদ্ধেকটা শরীর ফুটো দিয়ে গোয়ালের ভেতর গলিয়েছে ওমনি ওপাশ থেকে কে যেন কানের কাছে বলে উঠল,

-“ছ্যা ছ্যা রামাপদ শেষমেষ তুমি গরু চুরি করবে! তোমার বাবা কৃষ্ণপদ কত বড় চোর ছিলেন, জমিদারের গিন্নির গলার সীতাহার চুরি করে তোমার মা-কে উপহার দিয়েছিলেন। তোমার ঠাকুর্দা হরিপদ, ইংরেজ দারোগার কোমর থেকে পিস্তল চুরি করে শ্রীপতি ডাকাতকে দশটা মোহরের বিনিময়ে বেচে দিয়েছিলেন। এইসব নমস্য ব্যক্তিদের বংশধর হয়ে তুমি শেষটায় গরু চুরি করবে?”

আদ্ধেক শরীর নিয়ে ঝুলন্ত ত্রিশঙ্কু অবস্থায় কেউ যদি অমন কানের পাশে ফিসফিস করে, তাহলে অতি বড় ঠাণ্ডা মাথার চোরেরও পিলে চমকে যেতে বাধ্য! রামাপদ তো কোন ছার! ভয়ের চোটে চেঁচিয়ে উঠল,

-“ক্কে কে ওখানে? কে কথা কইল?”

কিন্তু শুকনো গলা দিয়ে ‘কে’-এর পর বাকিটা শুধু ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বেরলো। তারপর শুরু হ’ল বেদম কাশি। এদিকে রাতদুপুরে ওরকম কাশি আর ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে ভড়কে গিয়ে গোয়ালঘরের কোমলি ধবলি আর হেবলি, তিন জার্সি গাই মিলে গলার ঘন্টা প্রবল বেগে নাড়িয়ে, পা দাপিয়ে সে এক মহা শোরগোল শুরু করল। তাদের ক্ষুরের ঠোকায় গোয়ালঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা গোবর খানিক ছিটকে এসে পড়ল রামাপদর মাথায়। রামাপদ কোনওমতে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে সিঁধের গর্তটা থেকে গোয়ালঘরের বেরোতে চেষ্টা করতে গেল। গা ভর্তি তেলের গুণে পিছলে খানিকটা বেরলেও মাটি লেগে গিয়ে তেলতেলে ভাবটা উবে গেল আর হেথাহোথা বেশ ভালোরকমই ছড়ে গেল, ছাল চামড়া উঠে গেল। সেই অবস্থাতেই কোনওমতে ছুটতে শুরু করল রামাপদ। যতই ছুটুক না কেন একটা বিটকেল ‘হাঃ হাঃ হাঃ’ করে অট্টহাসিও যেন ওর পেছন পেছন ছুটতে লাগল। বাড়িতে ঢুকেই দরজায় খিল এঁটে, কান অব্দি কাঁথামুড়ি দিয়ে, শুয়ে পড়ল। তারপর তো দিন আষ্টেক আর কাজেই বেরোতে পারেনি বেচারা। খালি মনে হত যেন সেই অট্টহাসিটা পেছনে তেড়ে আসছে।

(২)

শুধু কি রামাপদ চোর? মাধব ডাকাতও কি ভুক্তভোগী নয় নাকি? এমনিতে মাধব বেচারা ডাকাতির বিজনেসে বড় একটা নাম করতে পারেনি। তবে মাধবের ওপর পূর্বপুরুষদের নামের বোঝা ছিলনা, রামাপদ চোরের মত। মাধবের পূর্বপুরুষরা আবার কলকাতা শহরের সব এক একটা আস্ত গাঁটকাটা, পকেটমার। মাধবেরও হাতে খড়ি হয়েছিল পকেট কাটাতেই। হাতের আঙুলের ফাঁকে আধখানা ব্লেড রেখে নরম লাউয়ের ওপর কাপড় জড়িয়ে, তাইতে দিনের পর দিন প্র্যাকটিস করেছিল মাধব। লাউয়ের খোলায় একটা আঁচড়ও পড়ত না এমনই নিপুণ হাত হয়েছিল মাধবের।

তা একদিন শ্যালদা স্টেশনে মাধব গেল পৈতৃক ব্যবসায় হাতেখড়ি করতে। সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু নির্জনে লাউয়ের খোলায় মকশো করা আর ওই ভিড়ে ঠাসা স্টেশনে, হকারের ঠেলা, ঠেলাগাড়ির গুঁতো, কুলির ধাক্কা খেয়ে ব্লেড চালানো আরেক জিনিস। একজন নাদুসনুদুস শেঠজি টাইপের লোকের হাতের আঙ্গুলে বেশ চকমকে পাথর বসানো সোনার আংটি, গলায় হার দেখে, পকেটে মোটা মানিব্যাগ থাকবে এই আশায়, আঙুলের ফাঁকে ব্লেডটা বাগিয়ে ধরে এগিয়েছিল পা টিপে টিপে। এমন সময় পেছন থেকে এক কুলি এসে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ঘাড়ে, মাধবও ওমনি ছিটকে শেঠজীর বদলে পাশের মুশকোমত ষণ্ডামার্কা একটা লোকের ঘাড়ে পড়ল। হাতের ব্লেডটায় খোঁচা লেগে লোকটার সার্টিনের শার্টটা “ফ্যাঁঅ্যাঁসস্” করে আর্তনাদ করে অনেকটা ফেঁসে গেল। জামা তো ফাঁসলই, সেই সাথে ফেঁসে গেল বেচারা মাধব। লোকটা ঘুরে কপাৎ করে চেপে ধরল মাধবকে। তারপর যা হওয়ার তাই হ’ল, জনতা জনার্দন উত্তম মধ্যম পিটিয়ে, হাতের সুখ করে নিল।

কোনওমতে পকেটমারদের আড্ডায় ফিরে আসার পর মাধবের জীবিকাতুতো ভাই বেরাদররা তো বটেই, এমনকি মাধবের নিজের বাপ-কাকা অব্দি বেজায় হাসি ঠাট্টা করল ওকে নিয়ে। ওর নামই দিয়ে দিল সবাই “তালকানা মেধো”। তখনই মেধো মানে মাধব প্রতিজ্ঞা করেছিল এই পকেটমারীর অপমানের লাইনে থাকবে না মোট্টে আর। না না তাই বলে সৎ পথে করে কম্মে খাবে এতটাও বড় শপথ করেনি। কথায় বলে না ‘মারি তো গণ্ডার/ লুটি তো ভাণ্ডার’, তাই মেধো ঠিক করল ডাকাতির দল খুলবে। হ্যাঁ! ওইটে ভারি সম্মানের কাজ, লোকের পিটুনি খাওয়ার চেয়ে লোককে পিটুনি দেওয়ার সুযোগ বেশি। রণ-পা পরে হাঁটাটাও বেশ জম্পেশ হবে। আর ওই ‘হারে রেরে রেরে’ করে মশাল বল্লম নিয়ে তেড়ে যাওয়াটার মধ্যেও একটা বেশ ইয়ে মানে বীর বীর ব্যাপার আছে।

কিন্তু কলকাতা শহরের বুকে ডাকাতদল করাটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যাবে, মাধব ভুলবশতঃ মার খেলেও বুদ্ধি যে একেবারেই নেই তা নয়। তাই চলে এল পিসির বাড়ি বটুকপুরে। এখানে দু’চারটে ছিঁচকে চোরের সাথে দোস্তি করল। তাদের একটু কলকাত্তাইয়া চুরি ডাকাতি পকেটমারির গল্প শুনিয়ে বেশ একটু সমীহ আদায় করল। তারপর জনা চারেক চ্যালা হ’তেই ডাকাতদল খুলল। এদিকে ডাকাতদল খোলায় পিসি ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে মাধবকে দিল ঘর থেকে বার করে। তা ভালোই হয়েছে, ডাকাতদলের সর্দার পিসির বাড়িতে থাকে, পিসির পান সেজে দেয়, পুকুর থেকে জল বয়ে এনে দেয়, প্রয়োজনে আলু পটল ঝিঙে কেটে দেয় এমনটা কেউ শুনেছে কখনও? তার চে’ জঙ্গলের মধ্যে পোড়ো মন্দিরে বাস করা বেশি ভালো।

(৩)

তা দলবল গড়ার পর মন্দ ডাকাতি হচ্ছিল না। বিশু গাইনের যাত্রাদলের তাঁবুতে হামলা করে বেশ কিছু জরি চুমকি বসানো রাজা মন্ত্রীর পোশাক বাগিয়েছিল। সেগুলো মাঝেসাঝেই অঙ্গে গলিয়ে বসে থাকে মাধব। বেশ কেষ্টবিষ্টু লাগে নিজেকে। তারপর সেবার দুর্গাপুজোর ভাসানের পরেরদিন চণ্ডীমণ্ডপে হামলা করে প্যাণ্ডেলের বাঁশ কাপড় ত্রিপল সব খুলে এনেছিল। যদিও মাধবের ডানহাত ভেনো একবার বলার চেষ্টা করেছিল, এইসব ডাকাতিগুলোর সাথে ছিঁচকে চুরির আর পার্থক্যটা কোথায়! কিন্তু মাধব তাকে এক হুঙ্কার দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল।

এতবড় মূর্খ যে ডাকাতি আর ছিঁচকে চুরির মধ্যে তফাৎ বোঝে না হতভাগা। ইচ্ছে করে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দল থেকে বার করে দেয়, কিন্তু নেহাতই দলের সবচেয়ে করিৎকর্মা ডাকাত ওই ভেনোটাই কিনা। আরে বাবা এই যে ডাকাতি করতে বেরনোর আগে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে মা কালীর ছ’ইঞ্চির বাঁধানো পটের সামনে যে বলি দেয়, এটা কোনও ছিঁচকে চোর করে? বলির ব্যাপারেও কত ফ্যাঁকড়া ভেনোর, বলে কিনা নরবলি না হোক নিদেনপক্ষে একটা পাঁঠাবলি হোক। মাধব কি মাংসের দোকানের কসাই নাকি যে পাঁঠা কাটবে। মাধব বিশুদ্ধ বৈষ্ণবমতে ডাকাত তাই সব্জি বলি দেয়। ঝিঙে চিচিঙে কুমড়ো আখ সব ওর হাতের কাঠারির এক কোপে দু’টুকরো হয়ে যায়।

যাকগে এভাবে মাধব আর মাধবের দলের বৈষ্ণবমতে নিরামিষ ডাকাতি ভালোই চলছিল কিন্তু গোল বাঁধল মণিময় দারোগা এখানে আসার কিছুদিন পরেই। অনেকদিন ধরেই মাধব ডাকাতির প্ল্যান ছকে রেখেছিল কালুরাম কলুর তেলের ঘানিতে। বেশ ক’টা জারিকেন ভর্তি সর্ষের তেল ডাকাতি করে আনতে পারলে কাজে দেবে। যদিও ভেনো এখানেও বাগড়া দিয়ে বলেছিল যে,

-“সর্ষের তেল কি ডাকাতি করার মত বস্তু?”

মাধবও খেঁকিয়ে উত্তর দিয়েছিল,

-“কেন সর্ষের তেল কোন কাজে লাগেনা শুনি? রান্না করতে, গায়ে মাখতে, প্রদীপ জ্বালাতে...”

-“নাকে দিয়ে ঘুমোতে...” মাধবের কথার মাঝেই ফোড়ন কেটেছিল ভেনো।

মাধব এইসব ছোটোখাটো বাধাতে পাত্তা না দিয়ে বলির কাজে মন দিয়েছিল। স্নান টান সেরে শুদ্ধ পট্টবস্ত্র পরে কপালে ইয়া লম্বা সিঁদুরের তিলক কেটে বলির কাঠারি নিয়ে রেডি হয়েছে। সামনের বেদীতে একটা একটা করে সব সব্জী সাজানো।

‘ওম হুম হ্রিং ক্রিং ট্রিং’ বলে কাঠারিটা তুলেছে, ওমনি কে যেন বলে উঠল,

-“দেখিস মাধব, লাউ কাটতে গিয়ে যেন আবার কারোর জামা কেটে ফেলিসনি!”

মাধব তো ভয়ানক রকমের হতভম্ব হয়ে ইতিউতি দেখতে লাগল, সব্বার আগে দেখল ভেনোর দিকে। নাহ্! সে ব্যাটা তো চুপটি করে বসে বসে নখ কামড়াচ্ছে। বাকি দুই মক্কেল গজা আর ভজা বসে বসে ঝিমোচ্ছে সব্জির ঝুড়ি নিয়ে। এক একটা করে সব্জি এগিয়ে বেদীতে রাখে, আর মাধব ঘ্যাঁচ করে কাটে। বেদীতে একটা কুমড়ো রেখে বসেছিল দু’জন। মাধবের কাঠারি মাঝ আকাশে থেমে যেতে গজা-ভজা বলে উঠল,

-“কী হ’ল সদ্দার! কী হ’ল সদ্দার!”

মাধব নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবল নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে, বলল,

-“কিছু নয়! লাউটা সরিয়ে একটা আখ বসা দেখি।”

গজা-ভজা বলে উঠল,

-“লাউ কোথা সদ্দার? কুমড়ো তো! তোমার পিসির বাড়ির মাচা থেকেই তো তুলে আনলুম।”

-“অ্যাঁ কী সব্বোনাশ করেছিস! পিসি তো এবার আমাকেই কুমড়োর ছক্কা বানিয়ে ছেড়ে দেবে রে!”

মাধব দাঁত কিড়মিড় করে ফের কাঠারি তোলে, সামনে চেয়ে দেখে কুমড়ো কই? সবুজ চকচকে একটা লাউ সামনের বেদীতে। আর কানের কাছে ফিসফিসিনি আওয়াজ,

-“কাঠারি দিয়ে কাটবি মেধো নাকি আধখানা ব্লেড আনব?”

এইবার মাধব কাঠারি ফেলে এক লাফে বেদী থেকে তিন হাত দূরে সরে গেল। সেবারের মত বলি ক্যানসেল হয়ে গেল। মাধব ঘামতে ঘামতে পিসির বাড়ি গিয়ে জ্বর এসেছে বলে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল, পিসির চ্যাঁচানি শুনতে শুনতে।

-“কোন অলপ্পেয়ে হতচ্ছাড়া ড্যাকরা অমন নধর কুমড়োখানা মাচা থেকে তুলে নিয়ে গেল! পোড়ারমুকো! ওই কুমড়ো তোর পেটে সইবে না অনামুখো!”

তারপর থেকেই আর ডাকাতি করতে বেরোতে সাহস হয় না মাধবের। মাধবের দলের আরেক চ্যালা বগলা হ’ল গিয়ে গুপ্তচর। বগলা খবর আনল নতুন দারোগা মণিময় নাকি ভূত পোষেন। আর সেই ভূত বগলদাবা করে নিয়েই নাকি তিনি বটুকপুরে এসেছেন। এই ভূতই নাকি বটুকপুরের সব চোর ডাকাতদের অবস্থা টাইট করে রেখেছে।এই খবর পাওয়ার পর ভেনো ভজা গজা অনেক করে বললেও খুব একটা লাভ হয়নি। মাধব কিছুতেই আর বলিও দেয়নি, ডাকাতিও করতে বেরোয়নি।

(৪)

রামাপদ, মাধব, মাধবের স্যাঙাতরা, আরও এদিক ওদিকে গাঁয়ের চোরেরা সব বেজায় নাজেহাল অবস্থায় দিন কাটাতে লাগল। যেই কেউ চুরিচামারি বা অন্যায় কোনও কাজ করতে যায় ওমনি কানের কাছে সেই ফিসফিস। ওদিকে মণিময় দারোগা দিনদিন একটার পর একটা পদক বাগাচ্ছেন পুলিশ বিভাগ থেকে ওঁর অসামান্য কর্মকাণ্ডর জন্য, আর ভুঁড়িটিও সেই সাথে বাগাচ্ছেন। একেই বলে ‘ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে।”

এই চোর ডাকাতদের দলবলের মধ্যে ভেনো বেশ বুদ্ধি ধরে, আট ক্লাস অব্দি পড়ালেখা করেছে। ভেনো চুপিচুপি বগলাকে ডেকে বলল,

-“হ্যাঁরে ব্যাটা বগলা! তোর হঠাৎ কেন মনে হল যে মণিময় দারোগা ভূত পোষে? ভূত কি গরু না ছাগল? ভূত দুধ দেয় গোবর দেয় যে লোকে পুষবে? আর পুষবে বললেই হ’ল? ভূত পাবে কোথায়? সে কি হাটে বাজারে পাঁচ হাজারটাকায় জোড়া কিনতে মেলে? যদিও বা মেলে, সে ভূত মানুষের পোষ মানবে কেন? উল্টে মানুষেরই ঘাড় মটকে মেরে ফেলবে।”

ভেনোর এত প্রশ্নে বগলা বেজায় রেগে গিয়ে বলল,

-“ত্ ত্ তবে কী আমি মিছে বলচি? ওই তো সেদিন থ্ থ্ থানার হাবিলদার ম্ ম্ মাণিকলাল আর প্ প্ প্ পুরন্দর হাটে এসেছিল। আমিও তখন ঘুরঘুর করছিলুম হাটের এদিক ওদিক, যদি কিছু হ্ হ্ হাতসাফাই করতে পারি সেই মতলবে। এমন সময় দেখলুম ওরা নিজেদের মধ্যে ব্ ব্ বলাবলি করছে। ‘বড়সাহেবের পোষা ভ্ ভ্ ভূত আছে।’ আমি নিজের কানে আ আ আড়ি পেতে শুনলুম।”

বগলা তোতলাতে তোতলাতে যা বলল সেটা সবাই একবাক্যে বিশ্বাস করলেও ভেনোর মনে সন্দেহ জাগল। ভেনো স্থির করল সরেজমিনে তদন্ত করেই দেখবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সন্ধেবেলায় সূয্যিমামা পাটে যেতেই একটা কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ভেনো চলল মণিময় দারোগার বাড়ির দিকে। বেশ বড়সড় সাদা বাড়ি, সরকার বাহাদুরের টাকায় তৈরি, বটুকপুরের দারোগার জন্য। বাড়ির চারদিকে উঁচু বেড়া দেওয়া। তবে বেড়ার গায়ে একটা বাবলাগাছ রয়েছে, তার ডালপালাগুলো বেড়া টপকে বেশ ভেতরে বাড়ির জানালার সামনে অব্দি চলে গেছে। ভেনো বহুকষ্টে কাঁটা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে একটা ডাল বেয়ে জানলার কাছে গিয়ে উঁকি মারল ঘরের ভেতর।

এই ঘরটা মনে হয় বৈঠকখানাই হবে। একটা মেহগনি কাঠের গোল টেবিলের ওপর ফুলদানি রাখা। একটা চেয়ার টেনে বসে আছেন মণিময় দারোগা। দারোগাগিন্নি একটা ট্রে-তে করে দু’কাপ চা এনে টেবলে রেখে, আরেকটা চেয়ার টেনে বসেন।

চা-টা খেতে গিয়ে দারোগাগিন্নি বলে ওঠেন,

-“এই যাহ্! বিস্কুটের কৌটাটা আনতে ভুলে গেলুম।”

মণিময় দারোগা হাঁকলেন,

-“সুখো, ওরে সুখময়! দে না বাবা বিস্কুটের কৌটোটা তাক থেকে পেড়ে এনে একটু।”

চোখ দুটো ছানাবড়ার মত করে ভেনো বাবলা গাছের ডালে বসে দেখল, একটা কৌটো হাওয়ায় উড়তে উড়তে এসে থামল মণি দারোগার মাথার কাছে, শূন্যে ভাসতে লাগল। আপনা আপনিই কৌটোর ঢাকনার প্যাঁচটা ঘুরে ঘুরে খুলে গেল। দুটো বিস্কুট বেরিয়ে এল কৌটোর ভেতর থেকে। সোজা ভেসে ভেসে দুলে দুলে ল্যান্ড করল মণি দারোগার প্লেটে। ফের দু’টো বিস্কুট একইভাবে উড়ে এসে জাঁকিয়ে বসল দারোগাগিন্নির প্লেটে। তারপর কৌটোর ঢাকনা বন্ধ হয়ে নিজে থেকেই যথাস্থানে চলে গেল। শুধু তাই নয়, ঘর ঝাড়ু দেওয়াও নিজে নিজেই করছে একটা মুড়ো ঝাঁটা। চা খাওয়া হ’তে টেবলের ওপরের কাপ প্লেটগুলোও ওই বিস্কুটের মত ভেসে ভেসে চলে গেল, রান্নাঘরের দিকে বোধ হয়।

কিন্তু এমন অশৈলী কাণ্ড দেখে ভেনো আর যথাস্থানে থাকতে পারল না। বাবলা গাছের কাঁটাভরা ডালে হাত পা ছিঁড়ে স্থানচ্যূত হয়ে পড়ল নিচের ঝোপে। ঝোপে পড়ামাত্র সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল, ভেনো হাড়ে হাড়ে মানে চামড়ায় চামড়ায় বুঝতে পারল বিছুটির ঝোপে পড়েছে। কিন্তু ঝড়ঝড় করে শব্দ হওয়াতে মণি দারোগা উঠে এসে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাজখাঁই হাঁক ছেড়েছেন,

-“কে রে ওখানে?”

তাই বিছুটির ঝোপের মধ্যেই চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে রইল ভেনো। কিছুক্ষণ পরে মণি দারোগা জানালার কাছ থেকে সরে যেতে, কোনওক্রমে উঠে গা চুলকোতে চুলকোতে দৌড় লাগাল কষে।

(৫)

পৈতৃক প্রাণটা হাতে নিয়ে ফিরে তো এল ভেনো কিন্তু বুঝতে পারল যে সুখো ভূতের জন্যই ওদের এই দুরবস্থা। কাজেই ওদের চুরি ডাকাতির ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালাতে গেলে মণিময় দারোগার পোষা সুখময় ভূতের একটা গতি করতে হবে। মাধবের একার দ্বারা কিছু হবে বলে মনে হয় না। এলাকার সমস্ত চোর ডাকাতকে এক করতে হবে। এত সহজে ঘাবড়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ভেনো মস্তান নয়।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ, চারপাশের এলাকার সব চোর ডাকাতদের জড়ো করে নিজের মতলবের কথা বলল ভেনো। মাধব দলের লিডার হ’লেও ভূতে বড্ড ভয় পায় তাই এ ব্যাপারে ভেনোর কর্তৃত্বই নির্বিবাদে মেনে নিল।

নির্দিষ্ট দিনে, বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে মাধব ডাকাতের আস্তানায় এসে হাজির হ’ল তান্ত্রিক ঘুটঘুটেশ্বর। অন্ধকারের মত কালো ঘুটঘুটে রঙ বলে তাঁর নাম ঘুটঘুটেশ্বর। তাঁর গুরু হ’লেন ফটফটেশ্বর, তিনি খড়ম ফটফটিয়ে হাঁটতেন কিনা। তাঁর গুরু হ’লেন কুটকুটেশ্বর। শোনা যায় যে তাঁর দাড়ি আর জটার এমন জঙ্গল ছিল মুখ আর মাথাময় যে সেখানে উকুন তো নস্যি, ছারপোকা, তেলেপোকাও বাস করত নাকি!

ভালোমত খোঁজখবর করেই তান্ত্রিক জোগাড় করেছে ভেনো। তান্ত্রিক এসেই হুঙ্কার ছেড়ে ডাকল,

-“নমোঃ গুরু ফটফটেশ্বর! নমোঃ তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর! কোথায় তোদের দারোগার পোষা ভূত। এক্ষুনি তার দফা শেষ করব। বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, ঘুটঘুটেশ্বর ছুঁলে ঘায়ের ওপর ঘা! মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! গোদের ওপর বিষফোঁড়া!”

বলতে বলতে উত্তেজনায় পোড়ো মন্দিরের গায়ের বুড়ো অশ্বত্থগাছের শেকড়ে প্রায় হুমড়ি খেয়েই পড়ে যাচ্ছিলেন তান্ত্রিক মহাশয়। বগলা ছুটে গিয়ে ধরল তান্ত্রিকমহাশয়কে।

-“ঘ্ ঘ্ ঘ্ ঘুট্ ঘুট্...”

বগলার জিভের এই ঘ্যাচাং করে ব্রেক লেগে ঘটঘটাং চিৎকারে তান্ত্রিক মহাশয় আর্তনাদ করে উঠলেন,

-“ওগো মাগো ঘ্যাঁঘা ভূতে ধরলো গো...”

ভেনো জলদি ছুটে এসে সামাল দেয়,

-“তান্ত্রিক ঠাকুর, ও ঘ্যাঁঘা ভূত হ’তে যাবে কেন! ও তো বগলা!”

তান্ত্রিক নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,

-“জানি হে ছোকরা! আমি আবার ভূত চিনব না?! কোথায় তোদের সুখো ভূত? তাকে ঝেড়ে যদি দুখোভূত না করে দিয়েছি, তবে আমার নামটাই বদলে দিস।”

এই বলে নানারকম বিটকেল বিটকেল জিনিস ঝোলা থেকে বার করে যজ্ঞের আয়োজন করতে থাকেন ঘুটঘুটেশ্বর। গিরগিটির চোখ, কাকের পালক, শেয়ালের লেজ, ব্যাঙের ঘিলু, দেখে গা গুলিয়ে ওঠে সকলের। ‘হ্রিম ক্লিম ফট্ ফটাস’ করে মন্ত্র পড়তে থাকে ঘুটঘুটেশ্বর।

ওদিকে ভেনোর প্ল্যানমতো ভজা আর গজা দৌড়ে যায় থানায়। ভর দুপুরবেলায় ভুঁড়ির ওপর চেপে বসে থাকা বেল্টটা আলগা করে, চেয়ারে পা তুলে মিহি সুরে নাকটা ডাকতে শুরু করেছিলেন মণিময়। দুপুরে গিন্নি চারতলা টিফিন ক্যারিয়ারে চর্ব্য চোষ্য ভরে সুখময়ের হাতে করে আকাশপথে পাঠিয়েছিলেন। খাওয়াটা একটু অপরিমিতই হয়ে গেছে। ঠিক এমন সময় হাঁউ মাঁউ করে ভজা আর গজা এসে আছড়ে পড়ল মণি দারোগার দুই হাঁটুর ওপর। মণিময় চমকে বিষম খেয়ে মাথা চাপড়াতে লাগলেন।

ভেনোর দেওয়া ট্রেনিং অনুযায়ী ভজা আর গজা পালা করে করে বলে চলল,

-“হুজুর মাই বাপ!”

-“হুজুর ধর্মাবতার!”

-“বটুকপুরের জঙ্গলে...”

-“পোড়ো মন্দিরে...”

-“এক বিটকেল কাপালিক এসেছে...”

-“নরবলি দেবে বলে আয়োজন করেছে...”

-“হুজুর আপনি বাঁচান!”

-“হুজুর আপনি রক্ষা করুন!”

‘কাপালিক’, ‘নরবলি’, এসব শুনে তো বেজায় ভড়কে গেলেন মণিময় দারোগা। বিড়বিড় করে জপতে থাকলেন,

-“বাবা সুখময়! বাছা একটু দ্যাখো দিকিনি! কীসব নরবলি কাপালিক বলছে! ওগুলো তো তোমার ডিপার্টমেন্ট কিনা।”

এদিকে জোরে জোরে ভজা আর গজাকে বললেন

-“ঠিক আছে ঠিক আছে! তোরা যা আমি এক্ষুনি ফোর্স নিয়ে যাচ্ছি।

পুরন্দর! মাণিকলাল! বন্দুক লে আও!”

ভজা আর গজা মুখ টিপে হাসতে হাসতে থানা থেকে বিদেয় হ’ল।

ওদিকে সুখময় তখন গিন্নিমার আজ্ঞামত আসনে ফোঁড় তোলা, শুকনো জামা কাপড় তুলে এনে ইস্ত্রি করা, ভাঁজ করা, বিকেলের জলখাবারের লুচির ময়দা মাখা, জল তোলা, সুপুরী কাটা, সব কাজ একসাথে করছিল। অবশ্য সুখময়ের এসব বাম হাতের তর্জনীর কাজ। শুধু ইশারা করলেই কাজ হ’তে থাকে আপনা আপনি। হাত লাগাতে হয়না, যন্ত্রপাতি এমনিই চলে নিজে থেকে। তাই গিন্নিমা ওকেই সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে দুপুরবেলায় একটু গড়িয়ে নেন। দারোগা মশাই স্মরণ করতেই সুখময়ের ধোঁয়ার টিকি খাড়া হয়ে উঠল! ছুটল... ইয়ে মানে উড়ল বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরের কাপালিকের সন্ধানে।

(৬)

পোড়ো মন্দিরে ততক্ষণে বিশাল এক আগুন জ্বেলেছে ঘুটঘুটেশ্বর। তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নেত্য করে চলেছে আর মন্ত্র পড়ছে,

-“ওম দুম ফটাস! হিং ক্লিং চটাস! ফটফটায় পিড়িং! কুটকুটায় কিড়িং! ফট ফটাস! চট চটাস!”

ওই ফটাস আর চটাসগুলো অবশ্য মশা মারার শব্দ। কাপালিকের চারপাশে রামাপদ চোর, মাধব ডাকাত, ভেনো শাগরেদ, বগলা গুপ্তচর, ভজা-গজা, আশপাশের গাঁয়ের আরও খানক’তক চোর ডাকু, সব উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তান্ত্রিক কেমন করে মণি দারোগার পোষা ভূতটাকে ধরে সেটা দেখবে বলে।

হঠাৎ একটা জোরে ঝড় উঠল মন্দিরকে ঘিরে। চারপাশের গাছের পাতা উড়ে এসে পড়তে লাগল যজ্ঞের আগুনের ওপর। ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। চারপাশের ভিড় নিমেষে পাতলা হয়ে এল। সবাই পোড়ো মন্দিরের ভেতরে গিয়ে ঢুকল এক লাফে। ভাঙ্গা দেউলের মধ্যে যদি ঠাকুর আগলায় ভূতের হাত থেকে। ওদিকে ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক মনে মনে বেজায় ভয় পেলেও মুখের জোরটা বহাল রাখে,

-“কে রে হতচ্ছাড়া মর্কট ভূত! শিগগির দেখা দে। নাহলে এক্ষুনি মন্তর পড়ে তোকে নিকেশ করে যমের দক্ষিণ দোরে পাঠাব। জানিস আমি কে? আমি ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক, আমার গুরু ফটফটেশ্বর তান্ত্রিক, তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর ... ”

উড়ন্ত ধুলোগুলো আস্তে আস্তে একটা জমাট অবয়ব ধরে। সেই ধুলোর মূর্তি হা হা করে হেসে বলে ওঠে,

-“ও ঘুটঘুটে তান্ত্রিক! সে সব তো বুঝলুম তুমি বিশাল তান্ত্রিক।

কিন্তু আমি ভূত না মর্কট সেটা তো ঠিক করে দ্যাখো আগে। আর মরা ভূতকে মেরে যমের বাড়ি পাঠাবে! আমার বোধ হচ্ছে তোমার মাথায় ঘিলুর কিঞ্চিৎ অভাব ঘটেছে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। দাঁড়াও আমিই তোমার ব্যবস্থা করি।”

এই বলে সেই ধুলোর মূর্তি মানে সুখো ভূত জোরসে ফুঁ দিল। ওমনি মাটিতে রাখা ব্যাঙের ঘিলু, গিরগিটির চোখগুলো সব উড়ে গিয়ে পড়ল ঘুটঘুটেশ্বরের মাথায়। সেসব মাখামাখি হয়ে একসা কাণ্ড! তান্ত্রিক তো রেগে লাল হয়ে আরও জোরে মন্ত্র পড়তে লাগল আর তাণ্ডব নৃত্য করতে লাগল। তখন সেই ধুলোর মূর্তি বেশটি করে গা ঝাড়া দিল। সব ধুলো ঝরে গিয়ে একটা ছাইরঙা ধোঁয়ায় গড়া মূর্তি বেরিয়ে এল। তার আবার মাথায় ধোঁয়ার টিকি, এটাই সুখময়ের আসল রূপ।

এবার সুখময় টিকটা টিং টিং করে নাড়াতেই কাকের পালকগুলো আর শেয়ালের লেজ উড়ে গিয়ে বেদম কাতুকুতু লাগাতে শুরু করল তান্ত্রিককে। সে ব্যাটা তো,

-“তবে রে! হা হা হি হি! দেখাচ্ছি মজা! উহুহু! ভুঁড়িতে নয় ভুঁড়িতে নয়! নচ্ছার ভূত! হো হো হো!”

এই বলে পরিত্রাহী চিৎকার করতে করতে তাণ্ডবনৃত্য ছেড়ে বাঁদরনাচ শুরু করল।

পোড়ো মন্দিরের ভেতর থেকে যত সব চোর ডাকাতের দল তো ভয়ে আধমরা হয়ে সুখো ভূতের হাতে ঘুটঘুটেশ্বরের এই দুর্দশা দেখতে লাগল। সুখো ওদের ভয় দেখানোর জন্য যেই একটু বিকট মূর্তি ধরে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে গেল, ওমনি সবক’টা মিলে ‘বাবা গো মা গো’ করে পালাতে গিয়ে এমন ধাক্কাধাক্কি শুরু করল যে সেই পুরনো নড়বড়ে দেউলের দেওয়াল ভেঙ্গে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ওদের ঘাড়ে।

ওদিকে মণি দারোগা সুখো ভূতকে স্মরণ করার খানিকক্ষণ পর ভাবল,

-“এতক্ষণে সুখো নিশ্চয়ই কাপালিক ব্যাটাকে জব্দ করে ফেলেছে। এবার তবে আমি নিশ্চিন্তে অকুস্থলে যেতে পারি।”

এই ভেবে পুরন্দর আর মাণিকলাল হাবিলদারকে সঙ্গে নিয়ে, ক’টা জংধরা গাদা বন্দুক নিয়ে রওয়ানা দিলেন।

বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে পৌঁছে দেখলেন এক বিকটদর্শন কাপালিক চিৎকার করে পাগলের মত নাচছে। শুধু তাই নয়, পোড়ো মন্দিরের দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে আর তার তলায় একগাদা লোক চাপা পড়েছে। যে সে লোক নয়, এলাকার সব নাম করা চোর ডাকু। আর দেখলেন সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরটা পাশের অশ্বত্থ গাছের ডালে বসে ধোঁয়ার ঠ্যাংদুটো দোলাচ্ছে।

তড়িঘড়ি চোর ডাকুগুলোকে আর সেই সাথে ফেরেব্বাজ তান্ত্রিককেও বেঁধে, থানায় নিয়ে গিয়ে সোওওজা হাজতে পুরলেন মণি দারোগা। সুখো ভূতের ভয়ে তাদের আর ট্যাঁ ফোঁ করারও ক্ষমতা ছিল না।

(৭)

এই ঘটনার পর বটুকপুর তো বটেই পুলিশের ওপর মহলেও সুখময় ভূতের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল। পুলিশের বড়কর্তারা ভাবলেন এবারে তো তবে মেডেল সুখময়কে দিতে হয়, মণিময় দারোগা কেন মিছে নাম কামাবেন। কিন্তু সমস্যা একটাই সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরের হাওয়ার গলায় মেডেলটা ঝোলাবেন কীকরে। কেউ কেউ সমাধান জানাল, সুখময়ের জীবদ্দশার কোনও ছবি জোগাড় করে তাইতেই মেডেল ঝোলালে হয়। কিন্তু সে উপায়েও সমাধান হ’লনা। কারণ সুখময়ের মনেই নেই তার জীবদ্দশার কথা। মণিময় দারোগার বাড়ির বাগানে হঠাতই নিজেকে প্রেতদশাপ্রাপ্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেছিল সুখময়, আর কিছুই মনে ছিলনা। কীভাবে মারা গেল, কী হয়েছিল, কোথায় বাড়ি, কিচ্ছু না! চোর ডাকাতের মুখ দেখে তাদের অতীত জেনে নিতে পারলেও সুখময় নিজের অতীত মনে করতে পারত না। কেজানে হয়ত নিজের মুখটা ধোঁয়াশা হয়ে গিয়ে, দেখতে পেত না, তাই হয়ত। গিন্নিমা প্রথমে বাড়িতে ভূতের আবির্ভাবে ভির্মি খেলেও পরে বেশ পোষা বেড়ালটির মত পোষ মানিয়ে নিয়েছিলেন সুখময়কে। ‘সুখময়’ নামটাও গিন্নিমারই দেওয়া, মণিময়ের সাথে মিলিয়ে।

অবশ্য যাকে মেডেল দেওয়ার জন্য এত চিন্তাভাবনা তার এই বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। সুখো ভূত মাধবের পিসির বাড়ির খড়ের চালে বসে গান শুনতে ব্যস্ত। মাধবের পিসি ভাইপোর ডাকাতির জন্য ভিটেয় যে পাপ লেগেছে তাই শুদ্ধি করতে হরিনামের আসর বসিয়েছে। পিসির আবার ভূতে ভারী ভয় কি না।

“হরি দিন তো গেল ... সন্ধে হ’ল... পার করো আমারে!”

সুখময় চালে বসে তাল দিয়ে হরিনাম সংকীর্তন শুনতে থাকে আর ভাবতে থাকে নামগানের গুনে যদি প্রেতদশা থেকে উদ্ধার পায়। ব্যাটাচ্ছেলের এটাও মনে নেই যে ভূতেদের ‘হরিনাম’ শোনা মানা!


পাঠকেরা যা পড়ছেন