নিশিপুরাণ


 

হাইরোডের ওপর বড় বড় লরিকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছে জিপটা। দুপাশের ইউক্যালিপটাস জঙ্গল থেকে ধেয়ে আসা বাতাস এলোমেলো করে দিচ্ছে মাথার চুলগুলো। চুলগুলোর সাথে এলোমেলো হয়ে ছুটছে তীর্থর মনের চিন্তা তরঙ্গও। পাশেই বসে আছে সাত্ত্বিক, মুখটা অসম্ভব গম্ভীর। একটু আগেই প্রীতি ফোন করে যা বলল তা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেনা তীর্থ। সাত্ত্বিক তাকে এতোটা ঘৃণা করে! এতোটা রাগ পুষে রেখেছে মনে! অথচ একসময় দুজনে এতো ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল যে নিজের একমাত্র বোন প্রীতির হাতটাও তীর্থ অবলীলায় তুলে দিয়েছিল সাত্ত্বিকের হাতে; আর আজ সেই সম্পর্কেই এমন ভাঙ্গন! সাত্ত্বিক ভাবে তীর্থ সব ক্রেডিট নিতে একলাই অভিযানে বেরোয় কিন্তু ওকে কে বোঝাবে যে ও যেটা ভাবছে তা সত্যি নয়। তীর্থ তো নিজের আদরের বোনের প্রিয় মানুষটার গায়ে কোনো আঁচড় লাগতে দেবেনা বলেই সব বিপদে আগে এগিয়ে যায়!

 

তীর্থর মনের চিন্তাগুলো আরও এলোমেলো হয়ে উঠছে যখনই ওর মনে পড়ে যাচ্ছে আজকে গন্তব্যের নামটা, “নিশিপুরা”।

 

একটা মাটির রাস্তায় গাড়ি ঘোরাতে যেতেই হল বিপত্তি, জিপটা সোজা গিয়ে ধাক্কা খেল একটা গাছে।

“ক্যায়া হুয়া বিহারী? আন্ধা হো গ্যায়া হ্যা ক্যায়া?” চিৎকার করে উঠলো সাত্ত্বিক। বিহারীর মুখ কাঁচুমাচু। ভাগ্যভালো জোরে ধাক্কা লাগেনি। বিহারী অনেক কসরৎ করে গাড়িটাকে ঠিক করে আবার চলতে শুরু করলো। যদিও রাস্তাটা অচেনা ঠেকছে তবুও তীর্থ অনুভব করতে পারল গন্তব্যে পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই।

 

নিশিপুরার মাটিতে পা রাখা মাত্রই মুহূর্তের জন্য হলেও কেঁপে উঠলো তীর্থর পা দুটো। জঙ্গলঘেরা খুব সাধারন একটা গ্রাম, তবে একাধিক পাকার বাড়ি আর টিনের ছাউনি দেওয়া ছিমছাম মাটির বাড়ি গুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে ক্রমশ ভেসে আসা শহুরেয়ানার। এদিকে জঙ্গল থেকে ভেসে আসা হাওয়ার স্রোতকে সঙ্গ দিচ্ছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। প্রথম দর্শনে বোঝার উপায় নেই যে এমন শান্তশিষ্ট একটা পরিবেশের মধ্যেও গ্রামের মানুষগুলোকে ওরকম আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে।

 

তীর্থদের জীপের ইঞ্জিনের শব্দ পেয়েই বোধহয় সব থেকে কাছের পাকা বাড়িটা থেকে ছুটে এলো একজন বয়স্ক লোক, পেছন পেছন এলো আরও কয়েকজন। প্রথম ঝলকেই লোকগুলোকে একবার ভালো করে মেপে নিলো তীর্থ, বিশেষ করে ওই বয়স্ক লোকটিকে।

“সার আপনারা কি ফরেস্ট ডিপাটমেন্ট থিকে আসচেন?”

“হ্যাঁ, আপনি?” তীর্থকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত পদে লোকটার দিকে এগিয়ে গেল সাত্ত্বিক। ওর এই অহেতুক ক্ষিপ্রতার কারণটা তীর্থ আঁচ করতে পারলো।

“আমি এ গ্রামের প্রধান সার, সনাতন পাল।” আত্মপরিচয় দেওয়ার সময় লোকটার প্রচ্ছন্ন অহংকার তীর্থর নজর এড়ালো না।

লোকটার পরিচয় পেয়ে সাত্ত্বিক বললো, “আচ্ছা। তাহলে কোথাও একটা বসে কথা বলা যাক।”

“সেই ভালো।” বললো তীর্থ। এতক্ষনে লোকটা তীর্থর মুখের দিকে ভালোভাবে তাকালো আর সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে মুখের একটা অস্বাভাবিক পরিবর্তন শুরু হলো।

“কি হলো? কিছু বলবেন?” প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো তীর্থ।

থতমত হয়ে লোকটা উত্তর দিলো, “না না। আচ্ছা স্যার আপনি কি আগে কখনো এই গ্রামে এসেছেন?”

“নাঃ। আমি বরাবরই শহরে মানুষ। কিন্তু কেন বলুন তো?”

“না-না, কিছু না। আসলে… কিছুনা।”

 

প্রধানের বাড়িতে বসে লেবুর শরবত খেতে খেতে প্রধানসহ উপস্থিত বাকি সকলের মুখ থেকে সমস্ত কিছু আরেকবার শুনলো তীর্থরা। যদিও এখানে আসার আগে ভালোভাবে কেস স্টাডি করে এসেছে, তাও এলাকাবাসীর মুখ থেকে প্রত্যক্ষ বিবরণ শোনার সময় কিছু না কিছু নতুন তথ্য পাওয়াই যায় প্রত্যেকবার; কিন্তু এবার সেরকমটা হলো না, আসার আগে যা শুনে এসেছিল এখানে এসেও সেই একই কথাই শুনতে পেলো। যেটুকু নতুন শুনতে পেল তা যে গ্রামবাসীদের অতিরিক্ত কল্পনার ফসল তা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলোনা তীর্থদের মতো অভিজ্ঞ কর্মীদের।

 

নিশিপুরা, জঙ্গলে ঘেরা শান্তশিষ্ট একটা গ্রাম। কিন্তু কিছুদিন যাবৎ এই শান্তি উধাও হয়েছে একটি চারপেয়ের উপদ্রবে। চারপেয়েটি যে সঠিক ভাবে কি জন্তু তা গ্রামবাসীরা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেনা, তবে যে কয়েকজন তাকে দেখেছিলো তাদের বর্ণনা অনুযায়ী সেটা একটা নেকড়ে।

“আগে কখনো নেকড়ের উপদ্রব হয়েছে এখানে?”

প্রশ্নটা শুনে একটু যেন চমকে উঠলো সনাতন পাল। তারপর আস্তে আস্তে জবাব দিলো, “হয়েছিল। কিন্তু তা প্রায় বছর কুড়ি পঁচিশ আগেকার কথা।”

 

 

রাতের অন্ধকারে জঙ্গল ভেদ করে ছুটে চলেছে একটা বছর এগারোর ছেলে, ওর নাম কুশান। ছুটতে ছুটতে শীতের রাতেও ঘেমে উঠেছে ছেলেটার শরীর। মাঝে মাঝে গাছপালার ঘনত্ব ভেদ করে পৃথিবীর বুকে নেমে আসা চাঁদের আলো জানান দিচ্ছে ছেলেটার হাতে শক্ত করে ধরা একটা কাপড়ের পুঁটলি, পুঁটলিটার ভেতরে কি আছে তা বোঝার উপায় নেই কিন্তু ছেলেটার অতিরিক্ত সতর্কতা জানান দিচ্ছে মধ্যেকার বস্তুটা ভীষণ দামী কিছু।

 

কতক্ষণ ছুটছে এভাবে ছেলেটা জানে না। চাঁদের আলো সরে পূব আকাশ থেকে ভোরের অস্তিত্ব প্রকট হতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে। ছেলেটার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নুনছাল উঠে দগদগ করছে জায়গাটা, পায়ের তলাগুলো ফেটে রক্তাক্ত। জঙ্গল আস্তে আস্তে শেষ হয়ে আসছে, সামনেই দেখা যাচ্ছে রাস্তা। আর পারছেনা ছেলেটা, যে কোনো মুহূর্তে উল্টে পড়বে সে। কিন্তু তাকে তো রাস্তা অবধি পৌঁছতেই হবে, নয়তো তার সব পরিশ্রম বিফলে যাবে। কোনোমতে রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছনো মাত্রই যেন ওর সব শক্তি শুষে নিলো কেউ। আর পারলোনা, পুঁটলিটা বুকে জড়িয়ে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।

 

যখন জ্ঞান ফিরল তখন কুশান দেখলো একটা সাদা বিছানায় শুয়ে আছে ও, আশেপাশে ওর মতো আরও রয়েছে আরও অনেকে। ওর জ্ঞান ফিরেছে দেখে বিশেষ পোশাক পরিহিতা একজন মহিলা ছুটে এলেন। কুশান জানে এদেরকেই নার্স বলে, বইতে ছবি দেখিয়েছিলেন মা। নার্সকে দেখেই কুশান কোনো মতে জড়ানো গলায় কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলো কিন্তু ওর গলার স্বর ফুটলো না ঠিক করে। ও কি বলতে চাইছে তা নার্সটি বোধহয় আন্দাজ করতে পেরেই জবাব দিলেন, “বাচ্চাটা ঠিকঠাক আছে। কে হয় তোর?”

অস্পষ্ট স্বরে কুশান উত্তর দিলো, “বোন।”

“তোর নাম কি?”

উত্তর দিতে গিয়েও চুপ করে যায় কুশান। নাম জানানোটা কি উচিৎ হবে তার!

 

ডাক্তারবাবু আসেন, পুলিশ আসেন কিন্তু কুশানের মুখ থেকে একটাও শব্দ বের করতে পারেনা। পুলিশ বলে ছেলেটা বোধহয় স্মৃতি হারিয়েছে, কিন্তু ডাক্তার তা মানতে চাননা। অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই একটা কথাও বলানো যায়না ছেলেটাকে। অবশেষে হাল ছেড়ে দেন সকলে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওদের ভাই বোনকে আপাতত কোনো অনাথ আশ্রমে রেখে দেওয়া হবে, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হবে।

 

 

“স্যার বুঝলেন তো সিনেমায় এরকম নেকড়ের কথা দেখেছি যারা পূর্ণিমার রাতে শিকার খুঁজতে বেরোয়। এরা না স্যার রূপ বদল করতে পারে, সকালে মানুষ থাকে তারপর রাত হলেই নেকড়ে হয়ে যায়। কি যেন একটা বলে এদের… উমম ঠিক মনে আসছে না…” জন্তুটার নাম মনে করতে গিয়ে বিহারীর কপালে ভাঁজ পড়লো।

“ওয়ারউলফ।” মনে করিয়ে দিল তীর্থ।

“হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার। ঠিক ঠিক।”

“বাবা বিহারী তোমার সিনেমার এতো নেশা আছে বলে জানতাম না তো!” বললো সাত্ত্বিক।

“হেঁ হেঁ হিরো হওয়ার খুব শখ ছিল স্যার কিন্তু এই চাকরিটাকেও খুব ভালোবাসি স্যার।”

“বাহ্ বাহ্।”

“তা স্যার আজ ক’টার দিকে বেরোবেন?”

“দেরি আছে বিহারী চাইলে একটা লম্বা ঘুম দিতে পারো।”

“বলছেন স্যার!”

“একদম।”

কি তীর্থ তুমি ঘুমোবে না?” এখানে আসার পর থেকে এই প্রথম তীর্থর সাথে কোনো কথা বললো সাত্ত্বিক।

না বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো তীর্থ, মনে পড়ে গেল প্রীতির অনুরোধটা, “দাদা প্লিজ এইবারের অভিযানে তুমি কিছু কোরো না, ওকে একটা সুযোগ দিও নয়তো ও পাগল হয়ে যাবে।” সকালে ফোন করে এই কথাগুলোই বলেছিল প্রীতি। বোনের কোনো ইচ্ছেই আজ অবধি অপূর্ণ রাখেনি তীর্থ, এটাও রাখতে চায়না সে। কিন্তু তার মনের মধ্যে আজ এক অন্যরকম দ্বন্দ্ব। পকেটে একবার হাত দিয়ে ভালো করে অনুভব করার চেষ্টা করল জিনিসটা, মনের মধ্যেকার দোলাচলটা আরও তীব্র হল। আজ কি জিনিসটা সে ব্যবহার করবে!

 

বাইরে বেরিয়ে আসে তীর্থ। পশ্চিম আকাশে পূর্ণিমার চাঁদটা সবে উঁকি দিতে শুরু করেছে, জঙ্গলের ধার থেকে ভেসে আসছে একটা ঠান্ডা হাওয়া। শহরের বাসিন্দা তীর্থর শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে সেটা। বনদপ্তরে কাজ করার সূত্রে জঙ্গলের বাতাসের সাথে খুব একটা অপরিচিত যে সে তা নয়, কিন্তু আজকের বাতাসটা যেন অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা।

 

হঠাৎ নিচের দিকে জামায় টান লাগতে তীর্থ তাকিয়ে দেখলো একটা বছর দুয়েকের বাচ্চা ওর জামা ধরে টানছে।

“কাকু কাকু ঘলে চলো, একটা নেকলে বাঘ আছে, খুব আগি। তোমাকে ধলে নেবে।” আধো আধো গলায় উচ্চারিত শব্দ গুলো ভীষণ মিষ্টি লাগলো শুনতে, কিন্তু ঠিক খুশি হতে পারলনা তীর্থ। কারণ ওই মিষ্টি গলাটার থেকে ভেসে আসা আতঙ্কের বার্তা শুনে ওর মাথার রগ দুটো দপদপ করে উঠল।

“কি হলো কাকু তলো!”

“হুম যাচ্ছি। তোমার নাম কি?” বাচ্চাটার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে প্রশ্নটা করে তীর্থ।

“বিন্তি।”

সরল মুখটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকায় তীর্থ, মাথার দু’পাশটা আবার জোরে দপদপ করতে শুরু করল।

“বিন্তি… বিন্তি…” ভেতর থেকে এক মহিলা বেরিয়ে আসেন। তীর্থকে দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে জিজ্ঞেস করেন, “আপনাকে বিরক্ত করছিল খুব?”

“আরে না না, ও আমাকে নেকড়ের থেকে সাবধান করছিল।” হেসে জবাব দেয় তীর্থ, কিন্তু মহিলার মুখে যেন আঁধার নেমে এলো। বাচ্চাটার হাতটা ধরে বলেন, “এই কাকু নেকড়ে বাঘটাকে নিয়ে যেতে এসেছেন বিন্তি।” বিন্তি অবাক হয়ে তাকাল তার মায়ের দিকে কিন্তু সে কিছু বলার আগেই তার মা টানতে টানতে তাকে ভেতরে নিয়ে চলে গেল।

 

আরও কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পর আস্তে আস্তে ভেতরে আসে তীর্থ, ওর শিরায় শিরায় কেমন একটা আন্দোলন শুরু হয়েছে।

 

তাড়াতাড়ি এসে তীর্থদের রাতের খাবার দিয়ে গেল একটি ছেলে, তীর্থরাই বলেছিলো। মোটামুটিভাবে পাওয়া খবর অনুযায়ী রাত ন’টার পর থেকে নেকড়েটা হানা দেয়। জঙ্গলের সবথেকে কাছে প্রধানের বাড়ি তাই আতঙ্কের মাত্রাটাও এদের বেশি। দুদিন দুটো লোককেই প্রধানের বাড়ির কাছাকাছি অঞ্চল থেকেই ধরে নিয়ে গেছে নেকড়েটা, রাতে প্রধানের বাড়ির দাওয়ায় তাস খেলে বাড়ি ফিরছিলো, সেই সময়ই অতর্কিতে আক্রমণ চালায় জন্তুটা।

 

“আচ্ছা তীর্থ এরা তো কেউ সরাসরি দেখেনি তাহলে এতো নিশ্চিত হয়ে কি করে বলছে এটা নেকড়েই?”

“ব্যাপারটা আমারও মনে দাগ কেটেছে সাত্ত্বিক; এরা বারবার করে স্পষ্ট বলছে ওটা নেকড়ে অথচ বলছে কেউই তাকে চোখে দেখেনি ঠিক করে।”

“হুম।”

“হয়তো কোনো ব্যাপার আছে যে কারণে এরা নিশ্চিত ওটা নেকড়েই কিন্তু সেটা আমাদের বলতে চায় না!”

“মানে?”

“কিছু না। এমনি একটা ওয়াইল্ড গেস আর কি।”

“আর ওই পূর্ণিমার ব্যাপারটা?”

“স্যার আমি বলছি কি ওটা ওয়ারউলফ নয় তো?”

“শাট আপ বিহারী, এটা ইয়ার্কির সময় না।”

“ইয়ার্কি নয় স্যার, আমি তো…”

“বিহারী ওসব ওয়ারউলফ জাস্ট মিথ, নট রিয়েল।”

“তীর্থ স্যার আপনি চুপ করে গেলেন কেন?”

“কিছু না বিহারী। এমনি।

তোমার তো হাই উঠছে দেখছি এখনই!”

“কি করি বলুন স্যার, ছোটো থেকেই পেটে দুটো ভাত পড়ে গেলেই এমন ঘুম পায়। কিন্তু আজ আমি ঘুমোব না স্যার।”

“আরে না না তুমি ঘুমোতে চাইলে ঘুমাও, কি বলো তীর্থ দা?”

“হুম শিওর। আমরা তোমায় ঠিক ডাকবো।”

“বলছেন স্যার?”

“হুম।”

 

বিহারীর নাসিকা গর্জনের শব্দ ছাড়া এখন চারিপাশ এক আশ্চর্য রকমের নিস্তব্ধ, গোটা গ্রাম শুধু কাঁপছে আতঙ্কে। সাত্ত্বিক জানলার ধারে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখছে। ওর দিকে তাকাতেই অবাক লাগল তীর্থর, এখন এই মানুষটাকে দেখে সকালে প্রীতির বলা কথাগুলো ভীষণ ভাবে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে।

“এবার বেরোবে নাকি সাত্ত্বিক?”

“হুম বেরোলেই হয়। তুমি রেডি হও, আমি একটু আসছি।” মুচকি হেসে কড়ে আঙুলে ইশারা করে দেখায় সাত্ত্বিক।

বোতল থেকে জল খেতে খেতে হাসে তীর্থ।

 

“কি হলো তীর্থ?”

“জানি না, মাথাটা কেমন যেন…”

“ঝিমঝিম করছে তাই না?”

“হ্যাঁ কিন্তু…”

“চিন্তা কোরো না, প্রত্যেকবার আমারও হয়। কিন্তু আজ হচ্ছে না।”

“মানে?”

“মানেটা আমার থেকে তুমি ভালো জানো তীর্থ।”

আর কথা বলতে পারেনা তীর্থ, চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে ওর, সেই সাথে সমস্ত চেতনাও যেন লোপ পাচ্ছে… সম্পূর্ণ চেতনা হারানোর আগে শুধু অস্পষ্ট ভাবে ওর কানে ভেসে এলো, “কংগ্রাচুলেসনস তীর্থ, তোমার ট্রিকটা এখন আমিও শিখে গেছি…”

 

 

“কুশ… কুশ… তাড়াতাড়ি ওঠো।”

বাবার ডাকে ধড়পড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে কুশান, “কি হয়েছে বাবা? তুমি এতো হাঁপাচ্ছ কেন?”

“বলছি, সব বলছি। মন দিয়ে শোনো সব।”

“বাইরে এতো গোলমাল কিসের বাবা? নেকড়েটা কি আবার কাউকে টেনে নিয়ে গেছে?”

“না বাবা। নেকড়েটা আর কোনদিনও কাউকে নিয়ে যেতে পারবে না।”

“ওকে কি কেউ মেরে ফেললো?”

“কুশ, এখন কোনো প্রশ্ন নয়। এখন তুমি শুধু আমার কথা শুনবে, হাতে বেশি সময় নেই।”

“কেন বাবা কি হয়েছে?”

“কুশ, বিন্তি ঘুমোচ্ছে পাশের ঘরে, ওকে নিয়ে তুমি পেছনের রাস্তা দিয়ে পালাও। জঙ্গলের পথ ধরবে, কেউ যেন তোমায় দেখতে না পায়।”

“পালাবো! কিন্তু কেন?”

“আহ… কোনো প্রশ্ন নয়। যা বলছি করো। আর কোনোদিনও ভুলেও এ গ্রামে ফিরে আসবে না।”

“কিন্তু বাবা তোমাকে আর মাকে ছেড়ে…!” কেঁদে ফেলে কুশান।

“কাঁদতে নেই বাবা, আমি আর তোমার মা তোমার হাতে বিন্তির সব দায়িত্ব তুলে দিলাম। সেই দায়িত্ব তুমি পালন কর এই আমাদের শেষ ইচ্ছে। ওর চোখে কোনোদিনও যেন জল না আসে।”

“বাবা! শেষ ইচ্ছে বলছো কেন?”

“নিজেরও খেয়াল রেখো কুশ। তোমার মা আর আমি তোমাদের দুই ভাই বোনকে খুব ভালোবাসি কুশ, আমাদের আশীর্বাদ সবসময় তোমাদের সাথে থাকবে।

এখন পালাও কুশ, পালাও। ভুলেও পেছন ফিরে দেখবে না। তোমাদের সামনে খুব বড় বিপদ।”

“আমার খুব ভয় করছে বাবা, মা কোথায়?”

“কুশ, মনে রাখবে তুমি কোনো সাধারণ মানুষের সন্তান নও, তোমার শিরায় বইছে এক বিলুপ্ত প্রায় জাতির রক্ত, যে জাতি স্বেচ্ছায় নিজেদের রক্ত নিশ্চিহ্ন করতে উদ্যোগ নিয়েছে…”

“এসব তুমি কি বলছো বাবা?”

“কিছু না… কিছু না… সঠিক সময় এলে নিজেই সব জানতে পারবে। এখন যাও বলছি।”

“কিন্তু বাবা! নেকড়েটা যদি…”

“ও আর বেঁচে নেই কুশ।”

“কে মারলো ওকে!”

“তোমার মা।”

 

বাবা বলেছিল পেছন ফিরে না তাকাতে কিন্তু কুশ পারলো না কথা রাখতে। সাদা একটা কাপড়ের পুঁটলিতে নিজের দু বছরের ছোটো বোনটাকে জড়িয়ে নিয়ে পালানোর ঠিক আগে মুহূর্তে জঙ্গলের আড়াল থেকে নিজের গ্রামটার দিকে পেছন ফিরে তাকালো কুশ। আর তখনই দেখতে পেলো একটা বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা আছেন এক মহিলা, শরীরের নিচের অংশটা তার জ্বলছে দাউদাউ করে। অথচ মহিলা নির্বিকার, এক ফোঁটা প্রতিবাদ নেই সারা শরীরে, যন্ত্রণার এক কণা চিৎকার নেই ঠোঁটে, যেন এমনটা হতে পারে তিনি জানতেন। কুশান চিৎকার করে ফেলে অস্ফুটে, “মা…”

পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়, বাবার সাবধান বাণীটা মনে পড়ে যায়। ওরা বাবাকেও টানতে টানতে আনছে, বাবা কিন্তু মায়ের মতো নির্বিকার নয়। বাবা প্রানপনে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে। পুঁটলির ভেতর থেকে বিন্তি হঠাৎ কেঁদে ওঠে, চমকে যায় কুশান। তাকে তো পালাতে হবে বিন্তিকে নিয়ে, মা বাবার শেষ ইচ্ছের মান তাকে রাখতেই হবে।

 

সামনে তাকায় কুশান, তারপর জঙ্গল ভেদ করে ছুটতে শুরু করে… ছুটতেই থাকে, পেছন ফিরে আর তাকায় না। ও জানে ওর বাবা মাকে নিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠা গ্রামবাসী এরপর খোঁজ শুরু করবে ওর আর বিন্তিরও, তাই ওর থামলে চলবে না। কেন ছুটছে জানে না কুশান, তবে বাবা মায়ের ডায়েরিটা সঙ্গে দিয়েছেন আজ, বলেছেন ওতেই নাকি আছে কুশানের সব প্রশ্নের উত্তর। বাবা ডায়েরীটা একটা বিশেষ জায়গায় লুকিয়ে দিয়েছেন আর বলেছেন অন্য কারুর হাতে ওটা পড়লে নাকি সমূহ সর্বনাশ...

 

 

সন্তর্পণে এগিয়ে চলছে সাত্ত্বিক। কোনো একটা জুতসই গাছ খুঁজতে হবে, তারপর শুরু হবে তার অপেক্ষা। বুকের মধ্যে এখনও কাঁটাটা খচখচ করে চলেছে, তীর্থর সাথে ও ঠিক করল তো! কিন্তু তীর্থ তো প্রত্যেকবার ওর সাথে তাই করত নয়তো কাজের জায়গায় এসে এমন মরণ ঘুম কে ঘুমোয়! প্রীতির সাথে বিয়ের আগে অবধিও তো সাত্ত্বিক যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছে কিন্তু তারপর সব কেমন যেন পাল্টে গেল… ইদানিং প্রায়শই কোনো অভিযানে যেতে হলে ওকে আর তীর্থকে একসাথে পাঠানো হত কিন্তু… তীর্থ একলাই সব কিছু করে নিয়ে পরের দিন ভালো মানুষ সেজে বলতো কাউকে যেন সাত্ত্বিক না বলে যে তীর্থ একাই সব কিছু করেছে; কেন সাত্ত্বিক কি কাপুরুষ নাকি যে অন্যের ক্রেডিটে ভাগ বসাবে! প্রীতি আবার বলে কিনা তীর্থ নাকি ওর ভালো চায়! রাবিশ… আজ হঠাৎ করে তীর্থর পকেটে লাইটার খুঁজতে যেতেই জিনিসটা আবিষ্কার করে সাত্ত্বিক আর তখনই ওর কাছে ওই মরণ ঘুমের রহস্যটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। আচ্ছা তীর্থকে কি ওভারডোজ দেওয়া হয়ে গেছে নয়তো ওর মাথা ঝিমঝিম করছিল কেন! সাত্ত্বিক তো এমনি এমনি বলে দিল যে ওরও মাথা ঝিমঝিম করে কিন্তু আদপে সেভাবে কিছু ও কোনোদিনও বুঝতেই পারেনি। নয়তো ওরকম রেগুলার মাথা ঝিমঝিম করলে তো সাত্ত্বিক আগেই সন্দেহ করতে পারতো যে কিছু গন্ডগোল আছে।

 

উ উ… উ… উ… প্রচণ্ড উত্তেজনা আর হৃদয়ের দোলাচলে সাময়িক বেসামাল হয়ে যাওয়া সাত্ত্বিকের হঠাৎ স্তম্ভিত ফেরে ওই রক্ত জল করা ডাকটা শুনে। গাছে চড়ে বসে তার জন্য অপেক্ষা করার আর দরকার পড়ল না, সাত্ত্বিক দেখল জঙ্গলের দক্ষিণ পশ্চিমের থাকা উঁচু টিলাটার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাণীটা, মুখটা ওপরের দিকে তুলে যেন অদৃশ্য কারুর উদ্দেশ্যে ডাক ছাড়ছে সে। ওটার ঠিক পেছনেই পূর্ণিমার চাঁদটা, সোনালী নয়, রুপোলি। সাত্ত্বিক অবাক হয়ে দেখে; এতো বড় চাঁদ সে আজ অবধি কখনো দেখেনি, এমন সাদাও হয় চাঁদের রং! আর এই জন্তুটা! এটা নেকড়ে? খানিকটা নেকড়ের মতো দেখতে হলেও এটা যে নেকড়ে নয় সে ব্যাপারে সাত্ত্বিক নিশ্চিত! পা দুটো কেঁপে ওঠে সাত্ত্বিকের। কিন্তু হার মানার লোক তো ও নয়, যতটা সম্ভব নিঃশব্দে এগোতে থাকে ও। কালো পোশাক ওর গায়ে, পূর্ণিমা হলেও এই রুপোলি চাঁদ বিশেষ আলো ছড়াচ্ছেনা তাই গোপনীয়তা বজায় রাখতে বিশেষ অসুবিধা হয়না। বন্দুকটা হাতে নিয়ে টিলাটার নীচে পৌঁছে গেল সাত্ত্বিক, এবার শুধু গুলি ছোঁড়ার পালা।

 

নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দের মধ্যে আচমকাই সাত্ত্বিকের দিকে ঘুরে তাকায় জন্তুটা, ওর চোখ দুটোয় যেন আগুন… আতঙ্কে পা হড়কে পড়ে সাত্ত্বিক। জন্তুটা লাফ মারল ওকে লক্ষ্য করে…

এক… দুই...তিন… সাত্ত্বিক আর জন্তুটার মাঝে যখন ইঞ্চি ছয়েকের ব্যবধান তখনই হঠাৎ করে পাশ থেকে কেউ যেন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল জন্তুটার ওপর। এক পৈশাচিক আর্তনাদের মুখরিত হয়ে উঠল আকাশ বাতাস। জ্ঞান হারানোর আগে শুধু সাত্ত্বিক দেখতে পেল একটা কালো পোশাক পরা রোমশ জীবের সাথে ওই নেকড়ের মতো জন্তুটার শুরু হয়েছে লড়াই...

 

 

“কোথায় যাচ্ছ রেশমি?”

“ক্ক… কোথাও না তো…”

“তোমার মুখে মিথ্যে মানায় না।”

“স্বপ্নময়!”

“আমি জানি তুমি ওই নেকড়েটার কাছে যাচ্ছ তাই না?”

“তুমি জান!”

“হুম জানি। তুমি কে রেশমি?”

“কিসব বলছো তুমি? আমি তোমার স্ত্রী, কুশ আর বিন্তির মা।”

“তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আমি বলছি তুমি কোথাও যাবে না। আজ সারারাত এখানেই আমরা দুজন বসে কাটাবো।”

“কি বলছো কি তুমি? পাগল হয়ে গেলে?”

“না তো।”

“প্লিজ ঘুমাবে যাও।”

“আর তুমি?”

“আমিও যাচ্ছি।”

“মিথ্যে তোমায় মানায় না রেশমি। বলো তুমি আসলে কে?”

“বললে তুমি আমায় ঘৃণা করবে…”

“তাই? একটুও বিশ্বাস নেই আমার ওপর?”

“স্বপ্নময়!”

“বলো আমায় সব, আজ তোমায় বলতেই হবে।”

“যদি বলি আমি মানুষ নই তোমাদের মতো! যদি বলি আমি মানুষের মতোই দেখতে অন্য কোনো জীব!”

“কি?”

“আমি জানতাম তুমি বিশ্বাস করবে না…”

“অন্য কোনো জীব মানে?”

“মানে আমি এক বিলুপ্তপ্রায় জাতির উত্তরসূরী, মানুষের মতো দেখতে কিন্তু মানুষ নই। মানুষের থেকে অনেক বেশি কিছু ক্ষমতা রয়েছে আমাদের মধ্যে।”

“যেমন?”

“যেমন মানুষের বৈশিষ্ট্যের সাথে কিছু পাশবিক বৈশিষ্ট্যও আমার মধ্যে বিদ্যমান, পশুর মতো শক্তি, ওদের মতো ঘ্রাণ শক্তি, ওদের মত শ্রবণ শক্তি আর…”

“মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে যে পশু বা মুরগি উধাও হয়… রেশমি তুমি?”

“আমায় ক্ষমা করো স্বপ্নময়। একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর টাটকা রক্ত না পেলে আমি ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ি; তবে আমাদের সন্তানরা এ অভিশাপ থেকে মুক্ত কারণ ওরা আমার সাথে তোমারও সন্তান।”

“সত্যি কি তাই?”

“কুশ আমার এনিম্যাল ইন্সটিংকট গুলো পেয়েছে জানি কিন্তু বিশ্বাস করো ও রক্ত পিপাসু নয়।”

“রেশমি!”

“আমায় তুমি ঘৃণা করতে পারো স্বপ্নময় কিন্তু আমাদের সন্তানদের ঘৃণা কোরো না প্লিজ। তুমি কতটা মহান হৃদয়ের মানুষ আমি জানি, নয়তো কেউ শুধু তার বাবার কথা রাখতে ডাক্তারি পাশ করে এরকম একটা গ্রামে পড়ে থাকতো না।”

“আর তুমি? তুমি কেন পড়ে আছো এখানে?”

“উত্তরটা তোমার জানা, মানুষ না হলেও হৃদয় কিন্তু আমারও আছে।”

“তাহলে বললে কি করে তোমায় ঘৃণা করব আমি?”

“সরি।

কিন্তু আমায় প্লিজ যেতে দাও, আমি না গেলে ওই ধূর্ত শয়তানটা এক এক করে গোটা গ্রাম উজাড় করে দেবে, আসলে ও কোনো নেকড়ে নয়। ও অন্য একটা প্রজাতি কিছুটা নেকড়ের মতো কিন্তু নেকড়ে নয়। ওকে তোমরা মানুষেরা কিচ্ছু করতে পারবেনা।”

“কিন্তু তোমার কিছু হয়ে গেলে?”

“কুশ আর বিন্তির খেয়াল রেখো। আমি আসছি।”

 

বাড়ি থেকে ছুট্টে বেরিয়ে আসে রেশমি। দূর থেকে দেখতে পায় টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে ডেকে চলেছে জন্তুটা, ওদের জাত শত্রু। ওর পেছনে দেখা যাচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদটা। সেও কেমন যেন ফ্যাকাশে। রেশমি চোখ বন্ধ করে নিজের শরীরটাকে টানটান করে মেলে ধরে… এক এক করে চোয়ালের দুপাশ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে দুটো ক্যানাইন, হাতে পায়ের আঙুলের নখগুলো সূঁচালো হয়ে বেড়ে ওঠে, সারা শরীর জুড়ে লোমের আধিক্য দেখা যায়।

 

চিতার মতো ক্ষিপ্রতা নিয়ে ও পৌঁছে যায় জন্তুটার কাছে। সেটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আক্রমণ চালায় রেশমা, নিজেকে মুহূর্তের মধ্যে সামলে নিয়েই পাল্টা আক্রমণ চালায় জন্তুটাও। কিছুক্ষন সমানে সমানে লড়াই চালিয়েও অবশেষে হার মানতে বাধ্য হয় সেটা। একটা তৃপ্তির হাসি হেসে নিজের আগের রূপে ফিরে আসে রেশমা; এবার তবে বাড়ি ফেরার পালা।

 

কিন্তু সামনে ঘোরা মাত্রই একসাথে অনেকগুলো আলোর ঝলকানি এসে ধাঁধিয়ে দেয় রেশমার চোখ। কানে ভেসে আসে টুকরো টুকরো কিছু চিৎকার....

 

“আরে এ যে ডাক্তারবাবুর বউ!”

“আরে এ তো ডাইন!”

“বিশ্বাস করতে পারছি না!”

“ডাক্তারের বউ ডাইন!”

“ডাক্তারের বউ ডাইন!”

“ওরে বাবা ভয় লাগছে!”

“জ্বালিয়ে দাও…”

শেষের গলাটা স্পষ্ট ভাবে চিনতে পারে রেশমা; গ্রামের প্রধানের ছেলে, সনাতন পাল।

 

 

ঘুমটা ভাঙতেই চমকে উঠে বসল তীর্থ। ঘড়িতে দেখলো সাড়ে ন’টা বাজে প্রায়। মেঝেতে পড়ে আছে ওর পকেটে রাখা ঘুমের ওষুধের স্ট্র্যাপটা, দুটো ওষুধ নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তীর্থ। ও বলেই ওষুধের ডোজটা হজম করে ফেললো, অন্য কেউ হলে সকালের আগে ঘুমই ভাঙত না। সাত্ত্বিক!

 

বাইরে বেরিয়ে এসে ছুটতে শুরু করল তীর্থ, আন্দাজ করে নিতে অসুবিধা হলো না যে সাত্ত্বিক কোন পথে গেছে। ছুটতে ছুটতে মাথাটা একবার টলে গেল তীর্থর, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে ও ছুটতে থাকল।

 

একি! সাত্ত্বিক এভাবে মাটিতে পড়ে কেন! ওই তো নেকড়েটা! কিন্তু নেকড়েটার সাথে কে লড়ছে ওটা! চমকে উঠলো তীর্থ, এ কাকে দেখছে ও! “বিন্তি! তুই এখানে!”

“দাদাভাই তুই এসেছিস!” লড়াই চালিয়ে যেতে যেতেই জবাব দেয় প্রীতি; নাহ ঠিক যে রূপে ওকে দেখতে অভ্যস্ত তীর্থ ঠিক সেই রূপ নয়, অন্যরূপে লড়ছে প্রীতি।

“তুই এখানে কি করছিস বিন্তি! আর তুই…!”

তীর্থর হঠাৎ আগমনে খানিক অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল প্রীতি, আর সেই সুযোগটাই নেয় এই জন্তুটা। মুহূর্তের মধ্যে প্রীতিকে উল্টে দিয়ে চেপে বসে ওর বুকের ওপর, নখের আঁচড়ে ছিঁড়ে নেয় ওর রোমশ বুকের চামড়া, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। আর দেরী করে না তীর্থ, নিজের আসল রূপে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে জন্তুটার ওপর। শুরু হয় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, কেউ কাউকে এক চুল জমি ছাড়তে রাজি নয়।

 

দু’রকম বীভৎস আর্তনাদে কেঁপে ওঠে টিলাটা। দরজা জানালা বন্ধ করে বসে থাকা গ্রামের মানুষগুলো আরও সেঁধিয়ে যায় ঘরে, বাচ্চাগুলো ঘুম থেকে উঠে ডুকরে কেঁদে ওঠে। তাদের মায়েরা তাদের মুখ টিপে ধরে চুপ করাতে চায়।

 

ঘুমের ওষুধের প্রভাবেই হয়তো তীর্থ যেন খানিকটা দুর্বল, ঠিক মতো এঁটে উঠতে পারছেনা জন্তুটার সাথে। নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় প্রীতি, এ তার প্রথম লড়াই কিন্তু মায়ের আদর্শকে সামনে রেখে কিছুতেই সে হেরে যেতে পারেনা, তার হারলে যে চলবে না। চরম আক্রোশে নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার, তীর্থ তাকে সরে যেতে বলে কিন্তু সে শোনে না। অবশেষে সম্মিলিত আক্রমণের সামনে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে থাকে জন্তুটা। প্রীতি চিৎকার করে ওঠে, “একে মারিস না দাদা।”

“কেন!” বিস্মিত তীর্থ।

“আজ নিশিপুরায় বন্যা বইবে, রক্তের বন্যা। আর তাতে আমাদের সাহায্য করবে এই জন্তুটা।”

“কি বলছিস কি তুই?” প্রীতির মুখে তীর্থ লক্ষ্য করে এক পৈশাচিক খিদে, ওর মুখে যেন জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা।

“এই নিশিপুরাই আমাদের মা বাবাকে শেষ করেছিল না? বেইমান এই গ্রামের লোক, এদের আমি ছাড়বো না।”

“কিন্তু তুই…”

“মায়ের ইন্সটিংক্টগুলো আমারও আছে দাদা, শুধু প্রকাশ পেতে দেরি হয়েছে। মায়ের লুকোনো ডায়েরীটা আগেই আমি পড়েছিলাম, তারপর একদিন তোর ছোটবেলার ডায়েরীটা হাতে পাই যেটায় তুই লিখে রেখেছিলি সেই পৈশাচিক রাতের বর্ণনা। আর তখন থেকেই জানতাম এর বদলা আমাকে নিতেই হবে।” চোখ দুটো বন্ধ করলো তীর্থ, ছোটবেলায় এক নিদারুণ মানসিক কষ্টে ছারখার হয়ে যেত ও, সেই রাতের কথা মনে পড়লেই ওর মধ্যে শুরু এক অমানুষিক যন্ত্রণা। তখনই নিজেকে শান্ত করতে ডায়েরী লিখতো ও। পরে অনেকবার ভেবেছে পুড়িয়ে দেবে ডায়েরীটা কিন্তু কেন কে জানে শেষ অবধি আর তা করে উঠতে পারেনি। ও তো ডায়েরী দুটো খুব সন্তর্পণে লুকিয়ে রেখেছিল তাহলে বিন্তি পেলো কিভাবে! অবশ্য ওরই তো বোন…

 

“কি হলো দাদা, তোর ইচ্ছে করে না বদলা নিতে, শিরায় শিরায় জ্বালা ধরে না তোর?”

“ধরে। এখানে আসার আগে অবধি আমিও তোরই মতো রক্তের বন্যা বইয়ে দিতে চেয়েছিলাম এখানে। বাবা বলেছিল এখানে কোনোদিনও ফিরে না আসতে, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে দেখ সেই এসে পড়তেই হলো…”

“হুম রে। যখন থেকে আমিও জেনেছিলাম আজ তোদের গন্তব্য নিশিপুরা, তখন থেকে আমিও জানতাম তোদের সঙ্গে আমাকেও আসতে হবে, কিন্তু তোদের বললে তো সাথে নিতিস না তাই পিছু নিয়েছিলাম।”

“এখন আর আমি বদলা নিতে চাইনা রে, কি হবে বদলা নিয়ে?”

“মানে! ওই বুড়ো সনাতন পালকে তুই শাস্তি দিতে চাস না?”

“চাইতাম কিন্তু জানিস তো সনাতন পালের নাতনিটাকে আজ দেখলাম, ওর নামও না বিন্তি।”

“তো?”

“ওই শিশুটার কি দোষ বল?”

“আমি এতো কিছু বুঝি না দাদা, আমি…”

“বিন্তি, মা ছোটবেলায় একটা কথা খুব বলতেন আমাদের, তোর হয়তো মনে নেই কিন্তু আমার আছে।”

“কি কথা?”

“তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন!” চমকে উঠলো বিন্তি, হয়তো আবছা হলেও ওর স্মৃতিতেও ভেসে উঠলো কিছু। ভরা পূর্ণিমার আলোয় অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো তীর্থর জান্তব মুখটার মধ্য থেকেই যেন ছড়িয়ে পড়ছে এক আশ্চর্য দ্যুতি যা আকাশ বাতাসের কাছে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিশোধ নয় ভালোবাসাই হোক জীবনের দিশারি...


পাঠকেরা যা পড়ছেন