অকুস্থল এড়ানো যায় না


হনহন করে পা চালিয়ে হেঁটে চলেছেন সমরেশ। সমরেশ বর্মণ। মুকুন্দনগর থানার ওসি। সামান্য স্থূলকায় চেহারা। লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুটের একটু বেশি।তাঁর চেহারা নিয়ে আড়ালে আবডালে হাসাহাসি করে অনেকেই। “এই বপু নিয়ে পুলিশের চাকরি? ছোঃ!” ওসব নিয়ে যদিও বিশেষ মাথা ঘামাননি তিনি কখনও। কাজটাই আসল, তার চাকচিক্য বরং বেশ সাময়িক - এ মতেই তিনি ছোট থেকেই যে দীক্ষিত।

একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে যান যেই মানুষটা, সেই তিনিই আজ খুব দ্রুত হাঁটছেন। অকুস্থলে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি পৌছে যাওয়ার আগে অন্তত তাঁর পৌছে যাওয়াটা খুব দরকার এই মুহূর্তে।

এখনও ভোর হয়নি। তবে পাখিদের ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে যেন রাতের কালচে পর্দা সরিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই। তবে ওরাও কি টের পেয়ে গেছে কাল রাতে ঘটে যাওয়া কুকর্মটির কথা? তাই সভয়ে একে অপরকে চিৎকার করে জানান দিচ্ছে সব? নাকি রোজ এমন সময়ই জেগে যায় তারা? সমরেশ জানেন না। আসলে, এত ভোরে তাঁর ঘুম ভাঙেনা কোনোদিনই!

চলতে চলতেই সামান্য থমকে একজায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি। কতক্ষণ ধরে যেন পথ চলছেন তিনি?কুড়ি মিনিট, আধ ঘণ্টা, নাকি আরও বেশি? হয়তো বা এমনও হতে পারে, তিনি কাল রাত থেকেই হাঁটছেন— বা আজন্মকাল!

আচ্ছা, কাল কি এতটা হাঁটতে হয়েছিল? জিপগাড়ি এই জঙ্গলের রাস্তায় ঢোকেনা। স্পষ্ট মনে আছে সমরেশের,বড় রাস্তার মুখেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে পায়ে চলা সরু পথ ধরে সামান্য হেঁটে একটা বাঁক ঘুরতেই চোখে পরেছিল সব। অথচ আজ এতটা পথ হাঁটা হয়ে গেল, কই তবু তো সেই বাঁকের হদিস পাওয়া গেলনা কিছুতেই! তবে কি পথ ভূল হল?নাকি নজর এড়িয়ে গেল কালকের ওই চিহ্ন দিয়ে রাখা বজ্রাহত শুকনো কঙ্কালসার গাছটাই?

অবশ্য, তা কিকরে সম্ভব? রাস্তার তো ঠিক মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ছিল ওই প্রেতাত্মারূপী মহীরুহ।রাতে পর্যাপ্ত আলো হয়তো ছিলনা, তবু চিনে নেওয়া অতটা কঠিনও নয় জায়গাটা একেবারেই! নাঃ থামলে চলবেনা। এগোতে থাকতে হবে। মাটিতে পরে থাকা রিভলভরটা এখনও লোডেড। এই জঙ্গলের পথেই গ্রামের ছেলেগুলো একটু পরে বেড়িয়ে পরবে। কেউ যাবে স্কুল, কেউ বা নদীতে জাল ফেলতে। ওদের এখনও বয়স অল্প। বয়সের দোষে যদি আবারও কোনো বেঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় ওরা? নাঃ,তা ঠিক হবেনা তা। কিছুতেই না।

ওই, ওই তো রাস্তার একধারে হেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে পোড়া শুকনো গাছটা! ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সে, কাল যেখানে সমরেশ তাকে রেখে গিয়েছিল। অথচ ওকে খুঁজে পেতেই এক বৃত্তাকার চক্রব্যূহে ক্রমশঃ জড়িয়ে পড়েছেন সমরেশ আজ নিজেই। তাতে যদিও হেলদোল নেই মৃত ওই শুষ্ক শরীরটার।

লাশটার কথা মনে পড়তেই কেমন নিস্তেজ হয়ে আসে সমরেশের সমস্ত শরীর।এত বছর হয়ে গেল এই পেশায়, তবু মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার মনের জোর এখনও ‘জোর’ করেই আনতে হয় তাঁকে। পরপর দুটো গুলি ঠিক বুক বরাবর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছিল দুষ্কৃতিরা। আর দু পা গেলেই দেখা মিলবে বডিটার। গুলি খেয়ে চিতপাত হয়ে ওই গাছের গুঁড়ির উপরেই পরে ফেটে গেছে মাথার ডানদিকটাও! সমরেশের অনুমান, গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়নি পরে থাকা লোকটা। বেশ খানিক্ষণ রক্তক্ষরণের ফলেই ধীরে ধীরে হয়তো নেমে এসেছিল যবনিকা। ইশ, শেষ সময়ে বেচারা কি কষ্টই না পেয়ে থাকবে! ওই মাহেন্দ্রক্ষণ যে সততই কঠিন অবশ্য আবহমানকাল ধরে।

কাল রাতেই কলটা এসেছিল থানায়। মুকুন্দনগরের এই জঙ্গল এলাকা দিয়ে বেশ কিছু মাদকদ্রব্য পাচার করা হবে রাতের অন্ধকারে— গ্রামের কিছু পুরোনো অপরাধীদের সাথে মিশে রয়েছে বেশ কিছু পুলিশও — এমনই দাবী ছিল উক্ত উড়োফোন কর্তাটির। স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন সমরেশ। টানা দুবছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে এই অঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকার পর এমন এক অভিযোগ ভীষণভাবে গাত্রস্পর্শ করেছিল তাঁর। তাই আর দেরি করেননি সমরেশ। রাতের অন্ধকারে জিপ নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলেন একাই, যাতে কোনোরকম সতর্কীকরণমূলক উপদেশ না পৌঁছে যায় দুষ্কৃতিদের কাছে।

ভুল করেছিলেন।মস্ত বড় ভুল! অবশ্য, সে মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আর তেমন কোনো উপায়ও তো নজরে পড়েনি তাঁর! ডিপার্টমেন্টের কে ভরসাযোগ্য, বুঝবেন বা কি করে তিনি? এমন হঠকারিতা তাই করতেই হয় প্রায়শ। ও নিয়ে খেদ পুষে লাভ নেই আর।

লাশের এলিয়ে পরা হাতের পাশ থেকে বন্দুকটা কুড়িয়ে নেন তিনি। এখনও পুরো লোডেড।ব্যবহার করার কোনো সময় পাওয়ার আগেই ধেয়ে এসেছিল অতর্কিতে আক্রমণ। লক্ষ্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার মাতামাতির মাঝে ওটার কথা হয়তো খেয়ালও করেনি আততায়ীরা। কার্যসিদ্ধি করেই চম্পট দিয়েছে হযতো দুজনেই ধরা পড়ার ভয়ে।ভাগ্যিস! ওদের ধরার দায় হয়তো আর সমরেশকে দেবেননা বড়কর্তারা, তবু আরও কোনো ছোট ছেলেমেয়ে অপরাধচক্রের পাঁকে নতুন করে নাম লেখাক, একথা কখনই অন্তত আর মেনে নেওয়ার কথা ভাববেন না তিনি।

দেহটাই শুধু পুড়ে যাবে কাল ময়নাতদন্তের পর নিয়তির বিধানে, তবু মননশীলতার কি অত সহজে আর মৃত্যু ঘটে?

হেসে ওঠেন হঠাৎ দুঁদে এই পুলিস অফিসারটি - নিজের কায়াহীন অবয়বের অন্তস্থলেই।


পাঠকেরা যা পড়ছেন