বাবা - এরশাদ বাদশা

অলংকরণ - পিয়াল চক্রবর্তী

ফ্রাইংপ্যানে গরম তেলে ডিমটা ঢেলে দিতেই ছ্যাঁত করে খানিকটা তেলের ছিটা রূপমের বাহুতে এসে পড়লো। ফুটন্ত তেলের গরম ছোবলে সাথে সাথে ফোসকা পড়ে গেলো। উফ্! যন্ত্রণায় অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এলো ওর মুখ দিয়ে।

‘আব্বু, তুমি আসলে জানো না কিভাবে ডিম ওমলেট করতে হয়।’ হেসে বললো আরিয়ান, রূপমের দশ বছর বয়সী ছেলে।

‘আচ্ছা! তাহলে এক সপ্তাহ ধরে কে তোকে ডিম ওমলেট করে খাওয়াচ্ছে?’ কপট রাগ দেখিয়ে বললো রূপম।

‘খাওয়াচ্ছো ঠিকই, তবে প্রতিদিনই একটা না একটা অঘটন ঘটাচ্ছো।’

‘কি রকম?’

‘প্রথম দিন কী করলে? তেল গরম না হতেই ডিম ঢেলে দিলে। পরদিন ডিম উল্টাতে গিয়ে পুরো ডিমেরই বারোটা বাজিয়ে দিলে। তার পরদিন ন্যাকড়া ছাড়া ফ্রাইংপ্যান নামাতে গিয়ে হাত থেকে ফেলে দিলে। তারপর....’

‘চুপ করবি এবার? তুই যে তোর মায়ের মতো আমার প্রতিদিনকার কাজের হিসাব রাখছিস, সেটা তো আমার জানা ছিলো না,’ হেসে বললো রূপম, খুব যত্নের সাথে ডিমটা উল্টে দিলো ও, যাতে অক্ষত থাকে ওটা।

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি শেষ করো, কাবার্ডে অয়েন্টমেন্ট আছে, আমি নিয়ে আসছি’ বলে ভেতরে চলে গেলো আরিয়ান। ওর গমনপথের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো রূপম।

শিখার যাবার পর আরিয়ানকে নিয়ে ওর চিন্তার অন্ত ছিলো না। এতোটকুন একটা ছেলেকে সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। তার উপর ওর বিজনেস। ছেলেকে দেবার মতো সময় বের করা ওর জন্য বেশ কঠিনই বটে। বেশিদিন হয়নি, তিনবন্ধু মিলে একটা গার্মেন্টসের দোকান খুলেছে। আগে একটা চাকরি করতো রূপম, কিন্তু ওর অ্যামবিশন বিজনেস, তাই নয়টা-পাঁচটার গতানুগতিক উপার্জনের ট্র্যাক থেকে সরে এসে স্বাবলম্বী হবার নিমিত্তে উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে। লক্ষ্য, নিজেকে একজন পারফেক্ট বিজনেসম্যান এবং ধনী হিসেবে গড়ে তোলা।

রূপমের মনে পড়ে ফেলে আসা সেইসব দিনগুলো। কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে। সেখানেই পরিচয় শিখার সাথে। রোড অ্যাকসিডেন্টে বাবা-মা এবং একমাত্র ছোটভাইকে হারানোর পর দূর সম্পর্কের এক কাকার কাছে মানুষ হয় ও। অনার্স পড়ছিলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রূপমের সাথে পরিচয় হয় ময়নামতিতে। বান্ধবীদের সাথে বেড়োতে গিয়েছিলো ও, একই উদ্দেশ্যে রূপমও। প্রথম দেখাতেই প্রণয়। রূপম মনের মতো কাউকে খুঁজছিলো জীবনসাথী করার জন্য। শিখাকে পেয়ে আর দেরি করেনি। কাকাও যেন তাকে বিদায় করতে পারলে বাঁচেন। রূপমের ধারণাটা পোক্ত হলো যখন বিয়ের এতোগুলো বছর পরেও শিখার খবর নেবার কোনো গরজ কাকাদের দিক থেকে দেখা যায়নি মোটেও।

ওদের বাসায়ই অনাড়ম্বরে বিয়েটা সারা হয়। রূপমের দিক থেকে ওর বন্ধুরা উপস্থিত ছিলো। তারপর অপার সুখের দিনগুলোতে শুধুই রূপম আর শিখা, শিখা আর রূপম। কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হলো না সেই সুখ। কেন যে শিখা... থাক, ওসব কথা ভেবে নিজেকে কষ্ট দেয়ার কোন মানে হয় না। কিন্তু আরিয়ানের ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। রুপা চলে গেছে আজ আটদিন। রূপম উদ্বিগ্ন ছিলো, আরিয়ান কিভাবে রিঅ্যাক্ট করে তাই নিয়ে। কারণ, মার খুব ন্যাওটা ছিলো ছেলেটা। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে সম্পূর্ণ শান্ত থাকলো আরিয়ান। এমনকি, একবার জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না, মা কোথায় গেছে। তবুও রূপম নিজ থেকে ওকে একটা ব্যখ্যা দিয়েছে। বলেছে- ওর আম্মু ওদের ছেড়ে চলে গেছে। কারণ, আব্বুর সাথে ওর মনোমালিন্য চলছিলো অনেকদিন থেকে। তাই ওরা সেপারেট হয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ব্যাখ্যাটা দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো। কারণ, রূপম চায় না মার অনুপস্থিতি ওর কোমল মনে নেতিবাচক কোন প্রভাব ফেলুক। ব্যাখ্যাটা মেনে নিয়েছে আরিয়ান। ওর প্রতিক্রিয়ায় যতোটা না অবাক হয়েছে রূপম, তারচেয়ে ঢের বেশি স্বস্তিবোধ করেছে। এমনিতে ওর ছেলে আর দশটা সমবয়সী ছেলের থেকে ব্যতিক্রম। রাগ, চিৎকার, চেঁচামেচি এসব ওর মধ্যে দেখা যায় না বললেই চলে। বাড়তি আহ্লাদ করতে কোনদিনই দেখেনি ওকে রূপম। কেন যেন মনে হয়, ওর ছেলেটা বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্ক। এই জিনিসটা ওর মনে ভাবনার উদ্রেক করতো। তবে বলা বাহুল্য, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাপারটা দূর্ভাবনার চেয়ে স্বস্তিই যোগাচ্ছে বেশি।

ঠিকই বলেছে আরিয়ান; ওমলেটটা টিফিন বক্সে ভরতে ভরতে ভাবলো রূপম। আসলেই ওকে দিয়ে এসব কাজ হবার নয়। চিন্তা করে অবাক হতে হয়। শিখা কেমন করে সব কাজ একা হাতে সামাল দিতো! একটা বুয়া রেখে দিতে হবে, এটাই সবদিক থেকে ভালো হয়।

‘আব্বু, তোমার হলো?’ ভেতরে ঢুকেই প্রশ্ন করলো আরিয়ান।

‘হ্যাঁ, বাবা। তুই এখনো কাপড় পরিসনি?’

‘পরবো। আগে তোমার হাতে মলম লাগিয়ে দেই। কই, দেখি- হাতটা দাও।’

হাতে যখন মলম লাগাচ্ছিলো আরিয়ান, রূপম তখন নিকট অতীতে ফিরে গিয়েছিলো। মনে হচ্ছিলো আরিয়ান নয়, শিখাই যেন ওর সেবা করছে। মা-ছেলের মধ্যে এতো মিল।

‘আরি,’ ছেলেকে ডাকলো রূপম।

‘জি, বাবা।’

‘তোর মার কথা মনে পড়ে না?’

‘পড়বে না কেন, পড়ে তো’, মৃদু স্বরে উত্তর দিলো আরিয়ান।

‘মার কাছে যেতে ইচ্ছে করে না?’

‘হ্যাঁ, তবে আমি জানি, মার কাছে চাইলেও যাওয়া যাবে না। মা তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, তাই না আব্বু?’

‘হ্যাঁ, বাবা। ওকে আমাদের ভুলে যাওয়াই ভালো, কি বলিস?’ ছলছল চোখে বললো রূপম।

‘হ্যাঁ, আচ্ছা চলো তো, আমাকে কাপড় পরিয়ে দাও। স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর তুমি তো এখনো শেভ করোনি। আমাকে দিয়ে আসবে না?’

‘তোকে নামিয়ে দিয়ে এসে, তারপর আমি রেডি হবো।’

‘তাহলে চলো।’

‘হ্যাঁ, চল।’

স্কুল ছুটির পর প্লে-গ্রাউন্ডে এককোনায় বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করছে আরিয়ান। আম্মু যখন ছিলো তখন অপেক্ষা করতে হতো না। বরং আম্মুই ওর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতো আগেভাগে এসে। আব্বুর অনেক কাজ, আরিয়ান জানে। সবকিছু ম্যানেজ করে আসতে তার প্রতিদিনই বিশ মিনিট বা আধঘন্টার মতো লেট হয়ে যায়। আর এ সময়টাই ভাবনার জন্য কাজে লাগায় সে। হ্যাঁ, আরিয়ান ভাবে অনেককিছুই। ওদের সুখের দিনগুলো; আব্বু-আম্মু আর সে। কেমন করে যে আব্বু-আম্মুর মধ্যে খুব খারাপ একটা ভাইরাস ঢুকে পড়লো, ভেবে পায় না আরিয়ান।

ওর মনে পড়ে বাব-মার ঝগড়ার দিনগুলো। ওইক্ষণগুলোতে দারুণ অস্বস্তি বোধ করতো সে। ইচ্ছে করতো তাদের দুজনের কাছে আগের সেই সুখের দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ওর কাছে নেই কোন টাইম মেশিন, যেটাতে চড়ে অতীতে ফিরে যাওয়া যায়। কোনো কোনো দিন ঝগড়া মারাত্মক আকার ধারণ করতো। সেই কদাচিৎ আব্বু গায়ে হাত তুলতো আম্মুর। আরিয়ান আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁদতো। কখনও ঝগড়ার মাঝখানে যেতো না। আম্মুকে সান্ত্বনা দিতো সে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। চোখের অশ্রু মুছিয়ে দিতো। আম্মু ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো।

বাবা-মার মধ্যে ঝগড়া কি নিয়ে ও জানতো। একদিন আম্মুকে বলতে শুনেছে।

প্রায়শই ওর স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে সেই দিনটির কথা। সেদিন স্কুল থেকে তাড়াতাড়িই চলে এসেছিলো ও। স্কুলের এক টিচারের আকস্মিক মৃত্যুতে ছুটি দেওয়া হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ সব স্টুডেন্টদের অভিভাবকদের ফোন করে জানিয়ে দেয় তাদের সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। আরিয়ানদের ওখানেও করা হয়। কিন্তু ওদের বাসার ফোন রিসিভ না হওয়ায় তারা আরিয়ানকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

ট্যাক্সি ক্যাবে করে স্কুলের পিয়ন ওকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। আরিয়ান ঢুকেই বুঝে নেয় বাসার অবস্থা থমথমে। পায়ে পায়ে আব্বু-আম্মুর রুমের দরোজায় গিয়ে দাঁড়ায়, আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে দারুণ উত্তেজিত দুটি মানুষের উত্তপ্ত বাক্যালাপ।

তারপর অপ্রত্যাশিতভাবেই ঘটে যায় ভয়ানক ঘটনাটা। আরিয়ান বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে দৃশ্যটা অবলোকন করে। ও দেখে, আব্বু আম্মুর মাথা দেয়ালের সাথে প্রচন্ড জোরে জোরে ঠুকতে থাকে। আম্মু অনেক চেষ্টা করেও তার হাত থেকে নিস্তার পায়নি। এভাবেই আব্বু মেরে ফেলে আম্মুকে। ও জানে, আব্বুর সাথে এক মহিলার সম্পর্ক আছে। যার জন্য মরতে হলো আম্মুকে।

আরিয়ানের কোমল হৃদয় ভেঙ্গে চুর হয়ে যায় এই নির্মমতা দেখে। তারপরও কোন এক অদৃশ্য শক্তির বলে সে ওখানে থেকে সরে আসতে পারে না। লুকিয়ে দেখতে থাকে আব্বু নামের সেই পাষন্ডের বর্বরতা। পরীক্ষা করে আব্বু বুঝতে পারে মারা গেছে আম্মু। তারপর খুব ঠান্ডা মাথায় ডেডবডিটা ঢুকিয়ে দেয় ফ্রিজের মধ্যে। ওদের ফ্রিজটা অনেক বড়ো; অনায়াসে আম্মুর হালকা শরীরটা জায়গা করে নেয় সেখানে। তারপর স্পঞ্জ দিয়ে মেঝে থেকে রক্ত মুছে ফেলে। এরপর তোয়ালের সাহায্যে পুরোপুরি রক্তমাখা মেঝেকে পরিষ্কার করে মুছে ফেলে খুনের চিহ্ন। আরিয়ান লুকিয়ে প্রত্যক্ষ করে সব। বুঝতে পারে না কী করা উচিত। তারপর দৌড়ে বেরিয়ে যায়।

নিজেকে সাহস যুগিয়ে, মনকে শক্ত করে ও সিদ্ধান্ত নেয়, কোনমতেই আব্বুকে বুঝতে দেয়া চলবে না, ও আম্মুর খুনের প্রত্যক্ষদর্শী। নাহলে হয়তো ওকেও আম্মুর পরিণতি বরণ করতে হবে।

সারাটা দিন আব্বু ওর কাছেই থেকেছে। মার কথা জিজ্ঞেস করেনি ও, নিজে থেকেই ব্যাখ্যা দিয়েছে আব্বু, ‘ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে।’ আরিয়ান মৌনব্রত পালন করেছে।

রাতে ওকে ঘুম পাড়ায় আব্বু। ও ঘুমের অভিনয় করে। তারপর গভীর রাতে আম্মুর ডেডবডিটা ফ্রিজ থেকে বের করে, চাদরে মুড়িয়ে বেঁধে গাড়িতে করে নিয়ে বেরিয়ে যায়। আরিয়ান লুকিয়ে দেখে সব, অনুমান করে হয়তো কোন খালে বা নর্দমায় ফেলে দিয়ে ফেরত আসে আব্বু।

এরপর আব্বু যতোবারই ওকে আদর করেছে, ততোবারই ঘৃণায় রি রি করে উঠেছে ওর ছোট্ট শরীরটা। কিন্তু কখনও বুঝতে দেয়নি ওর ঘৃণা। প্রায়ই ও ভাবে কি করে সে ঘটনাটা ঘটাবে। স্কুল ছুটির পর এই সাতদিনের অপেক্ষার প্রতিটি প্রহর তার মাথায় ঘুরেফিরে ওই চিন্তাই এসেছে। কি করে খুন করবে বাবাকে। হ্যাঁ, প্রতিশোধ নেবে সে, অবশ্যই।

বাবা ইদানিং ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে এখান থেকে। ‘‘আমরা চলে যাবো এখান থেকে বাবা, তোর মা যেখানে নেই, সেখানে আমরাও থাকবো না।’’ এক রাতে আরিয়ানকে বলে আব্বু। ও জানে, ধরা পড়ার আগেই পালাতে চাইছে আব্বু।

কাজটা কিভাবে করবে ভেবে রেখেছে সে। ইঁদুর মারার বিষ এনেছিলো আম্মু একবার। ওটা কোথায় আছে সে জানে। খাবার বা চায়ের সাথে কায়দামতো মিশিয়ে দিলেই হলো। কেউ ওকে সন্দেহ করবে না, জানে সে। ওর মতো ছোট্ট বাচ্চার পক্ষে এ ধরনের কিছু চিন্তা করাও কল্পনাতীত।

পারবে সে, আব্বু যেমন কাউকে কিছু জানতে দেয়নি। ঠিক তেমনি আব্বুর মৃত্যুর পিছনে কার হাত আছে কেউ জানবে না।

ওই যে, আব্বু আসছে। অভিনয়ের জন্য প্রস্তুত হলো আরিয়ান। এখন ওই পাষন্ডটাকে চুমু খেতে হবে।

পাঠকেরা যা পড়ছেন