নিহত একজন - আনন্দ বাগচী

কলকাতা তখন এইরকমই, একটা কয়েন টস করার মত—কখন যে কোন্ পিঠ পড়বে কেউ জানে না।

ভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য এমনি ভাবে পিঠোপিঠি খেলছে। আলো এবং অন্ধকার, কিংবা বলা ভাল, স্বাভাবিকতা এবং অস্বাভাবিকতা। এই মুহূর্তে ঘরে ঘরে রেডিও, ঘরে ঘরে হাসি-হুল্লোড়, পথে রঙের শোভাযাত্রা মেয়ে-পুরুষ গায়ে গায়ে—দরকারে অদরকারে। ফুটপাথে হকার হাঁকছে, রকে বকে ছেলে-ছোকরাদের বেকার জটলা।

কিন্তু চোখের পলকে দৃশ্যপট উল্টে যাবে, যেন শহরের পাগলা ঘন্টি বেজে উঠবে। সঙ্গে সঙ্গে ছন্দ-তাল কেটে ফাটবে বোমা, আলো নিভবে, ধোঁয়ায় অন্ধকারে আর্তনাদে এলাকা জুড়ে এমার্জেন্সী শুরু হয়ে যাবে। তখন কোথাও কেউ স্থির নয়, স্থাণু নয়; সবাই ব্যস্ত ত্র্যস্ত ছুটন্ত। কেউ মারাত্মক, কেউ মরীয়া। সবাই তখন আশ্রয়-প্রার্থী, সবাই তখন অন্য মানুষ। অবশেষে আবার আলো জ্বলে উঠলে, কেউ জীবিত, কেউ মৃত। তাই বলছিলাম, কলকাতা তখন এইরকমই। একটা কয়েন টস করার মত—কখন যে কোন্ পিঠ পড়বে কেউ জানে না।

আমিও জানতাম না যখন রাখালদের বাড়ি গেছিলাম। রাখালরা থাকে সিঁথির দিকে। তখন সবে সন্ধ্যে হয়-হয়। সময়টা পুজোর মুখ-মুখ। মহালয়া পেরিয়েছে, অর্থাৎ পুজোর নোটিশ একেবারে ঘরের ভেতর পৌঁছে গেছে। ঘরে ঘরে পুজোয় কেনাকাটা প্রায় শেষ। প্রায় বললাম এই জন্যে যে, কলকাতার কোন জিনিসই কখনো শেষ নয়, পুজোর জামা-কাপড় অষ্টমীর দিনেও রীতিমত বিক্রি হতে দেখেছি। হয়তো তারপরেও বিক্রি হয়। কত ঘরের কত অবস্থা, কে জানে। অন্ন-বন্ত্রে সংস্থান কোন্ সংসারে যে কিভাবে হচ্ছে, পথে-ঘাটে ওপর-ওপর ঘুরে আমরা তার কতটুকু আঁচ করতে পারি? মুখের প্রসাধন সব সময় কি ঘামেই ধোয়? চোখের জলে কি ধোয় না?

রাখালদের ওখানে সন্ধ্যেটা ভালভাবেই কাটল। ওদের বিবাহের প্রথম বার্ষিকী ছিল, প্রায় পূজাবার্ষিকীই বলা যায়। গত বছর পুজোয় মুখোমুখিই ওদের বিয়ে হয়। খরচ-খরচা সহজ করার জন্যে এই ব্যবস্থা। ওদের বিয়েতে আমারও সই ছিল। একদিন সুযোগ-সুবিধে পেলে অটোগ্রাফের খাতায় সই মেরেছি, বিয়ের খাতায় এই প্রথম। কিন্তু সেদিনের সইকর্তা বন্ধুদের মধ্যে আমিই একমাত্র বর্তমান ছিলাম। খগেশ ক’মাস আগে রাজনৈতিক গুপ্তহত্যায় কোতল হয়েছে, হরেন বদলি হয়ে গেছে বোম্বাই—একমাত্র আমিই রাখালদের বন্ধুত্বের তলানির মত কলকাতায় পড়ে আছি।

সন্ধ্যেটা রাখাল-রঙ্গার সাহচর্যে ভালই কাটল। একে পুজো, তায় কলকাতা জুড়ে গোপন গৃহযুদ্ধ। তাই নিমন্ত্রিতদের মধ্যে দু-পাঁচজন যারা এসেছিলেন, সকালবেলাতেই লৌকিকতা সেরে তারা চলে গিয়েছিলেন। বিকেলবেলার অতিথি আমিই একা। রাখাল আমার বাল্যবন্ধু, ওকে আমি ঠাট্টা করে রাখাল-বালক বলে ডাকি। রাখাল বালিকার সঙ্গেও আমার কম করে পঞ্চবার্ষিক আলাপ-পরিচয়, অর্থাৎ ওদের বিবাহের আগে থেকেই। বলতে কি আমিই ওদের দুজনকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। সে-পরিচয় ওরা ঘনীভূত করে নিয়েছিল ওরা নিজ গুণে। তাই আমাকে দেখে ওরা বেজায় খুশি। ভাবতেই পারে নি, বিকেলের দিকে আমি সিঁথি অভিযানে বেরোব। কারণ সিঁথির রঙ এখন রীতিমত লাল। | ওঠার তাড়া ছিল না, একেবারে স্ট্রেট অফিসে চলে গেলেই হবে। আজ নাইট ডিউটি। খবরের কাগজের আপিসে ছুটিটাই বিরল, বিশেষ করে খাস বার্তাজীবি যারা তারা আবার নিশাচর। আমি সেই নিশাচরের দলে। রত্নার হাতে ঠাণ্ডা-গরম নানারকম খাবার খেয়ে শেষ পর্যন্ত যখন বিদায় নিলাম, তখন ঘড়িতে আটটা প্রায় তৈরি হচ্ছে। রাখাল আমাকে বাসস্টপ পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল, তাকে অনেক বচন ঝেড়ে নিরস্ত করলাম। আর সত্যিই, এগিয়ে দেবার মত কিছু ছিল না। চারপাশ একেবারে নৰ্মাল। ঘরে ঘরে কলরব, রেডিওর কণ্ঠস্বর, আলো, পথে লোকজন, গাড়ির শব্দ।

ওদের তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে পথে নামলাম। কিছু দূরে চৌমাথা—একটা বাঁক ঘুরলেই। রাস্তা সোজা হলে ফ্ল্যাটবাড়ির দোরগোড়া থেকেই দেখতে পাওয়া যেত। কিন্তু বড়জোর গজ দশেক এগিয়েছি, অমনি প্রথম বোমাটা ফাটল। তারপর সামনে বাঁকের ওদিকে একটা হল্লা উঠল। এই আকস্মিকতায় হকচকিয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। এমন সময় বিভিন্ন দূরত্ব থেকে দ্রুতলয়ে অনেকগুলো বিস্ফোরণের শব্দ। আওয়াজের গুরুত্বে আমি প্রায় বধির হবার দশা। মাটি কেঁপে উঠল, আশপাশের একতলার কাঁচের শার্সিগুলো ঝনঝন করে বেজে উঠল। আলো নিভে গেল, দরজা-জানলা রাতের সন্ত্রস্ত পায়রার মত পাখা ঝটপটিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিল অন্ধকারের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে পাড়া একেবারে নিশুতি। শুধু নিশুতি নয়, যেন তার নিশ্বাসও বন্ধ। বধির আমি, আলকাতরা-কালো অন্ধকারের মধ্যে স্রেফ কানার মত বেকায়দা দাঁড়িয়ে কি করব ভাবছি, এমন সময় কিছু লোক সামনের দিক থেকে হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসছে টের পেলাম। সেই সঙ্গে পিস্তল আর পাইপগানের শব্দ, আর গোটা দুই বুকের রক্ত জল-করা আর্তনাদ।

ভাবনা-চিন্তার সময় নেই, পৈতৃক প্রাণ হাতে করে আমিও ছুটলাম। একটা বোম ফাটল আমার খুব কাছেই, জনদুয়েক ছুটন্ত লোক আমার ঠিক পেছনেই নালার ধারে পড়ে গেল। সপ্লিন্টার কিংবা অ্যাাশফল্টের টুকরো আমার পায়েও এসে লাগল। আমি থামলাম না, পড়ে গেলাম না, অন্ধকারের মধ্যে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাখালের বাড়ির উদ্দেশে ছুটতে থাকলাম। গাঁ-দেশের অন্ধকার আর কলকাতার নিষ্প্রদীপ রাত্তিরের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এ একেবারে কার্বন-কালো, এ অন্ধকার গগলস নয়, এ ডিঙিয়ে এর ভেতর দিয়ে কিছু দেখা যায় না। তবু মৃত্যুভয় মানুষের গোটাকতক ইন্দ্রিয়কে প্রখর তীক্ষ্ণ করে দেয়, চাই কি একটা অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় চেতনা এনে দেয়—যার বলে চোখ-কান বুজেও অনেক কিছু এবং আগাম কিছু দেখতে-শুনতে পারা যায়। আমিও তার বলেই নালা ডিঙিয়ে, গলি-ঘুপচি দিয়ে শর্টকাট করে চোখবাঁধা ম্যাজিসিয়ানের মত যথাজায়গায় পৌঁছলাম। ফ্ল্যাটবাড়ির একতলা ফটকে পৌছে একটু নিরাপদ বোধ করলাম, কারণ বাড়িটা সদর রাস্তায় নয়। একটু থেমে দাঁড়ালাম, কয়েক নিশ্বাস দম নিলাম, তারপর ঢুকে পড়লাম ভেতরে।

ভেতরে ঢুকে বোধ হয় চার পা-ও এগোই নি, কিসে যেন পা বেধে হুড়মুড় করে কার গায়ের ওপর গিয়ে পড়লাম। যার গায়ের ওপর গিয়ে পড়লাম, সে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল, অত বড় আঘাতেও একটা উঃ আঃ করে উঠল না। পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি মিথ্যেই ‘স্যরি’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। অপর পক্ষের সাড়া নেই। আমার স্বাভাবিক চিন্তা-ক্ষমতা ফিরে এসেছিল ততক্ষণে। আমার হাতে গায়ে মুখে কবোষ্ণ কোন তরল গোছের পদার্থ মাখামাখি হয়ে গেছে, কেমন যেন আঠা-আঠা। হঠাৎ সর্বাঙ্গে বিদ্যুৎশিহরণ খেলে গেল। ঠোঁটে কেমন নোনতা স্বাদ পেলাম। হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে আমি উঠে দাড়ালাম, জামাকাপড় সামলালাম। হাতের চটচটে তরল পদার্থ পাশের দেওয়ালে মুছে, পকেট থেকে রুমাল বের করলাম।

পকেটে দেশলাই ছিল না, থাকলে একটা কাঠি জ্বললে অবস্থাটা পরিস্কার হত। যদিও, একতলায় এই সিড়ির মুখের জায়গাটায় ফ্ল্যাটের দরজার সামনে যে কেউ খুন হয়েছে অনুমান করতে আমার অসুবিধে হল না। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিহরণ কোমরের দিকে ঝাঁ করে নেমে গেল। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল। কেমন যেন মনে হল, হত্যাকাণ্ডটি এইমাত্র সম্পন্ন হয়েছে, হয়তো এই মুহূর্তে আততায়ীরা কাছেই দাড়িয়ে আছে, আমার গতিবিধি লক্ষ্য করছে। এই মুহূর্তে হয়তো অন্ধকারের মধ্যে গা মিশিয়ে দাঁড়িয়ে আমার বুক লক্ষ্য করে পাইপগান অথবা রিভলবারের নল উঁচিয়ে তাগ করছে। কপালে ফ্রীজে জমা বাষ্পবিন্দুর মত ফোঁটা ফোঁটা ঘাম দেখা দিল। গলা কাঠ হয়ে গেছে, মুখের ভেতরটাও শুকিয়ে আসছে। আমি যে মরতে অনিচ্ছুক এবং এতটা ভয় পাই, টের পাই নি আগে কখনো।

আমি পাগলের মত সিঁড়ি হাতড়ে ওপরতলায় ওঠবার চেষ্টা করলাম। যে কোন মুহূর্তে অন্ধকারের যে কোন দিক থেকে গুলি ছুটে এসে আমার বুকে কিংবা মাথায় লাগতে পারে এই অনুভূতিটা ভূতের ভয়ের থেকেও কি পরিমাণে মারাত্মক, তা কাউকে বোঝাতে পারব না। শত্রু যখন অদৃশ্য এবং শত্রু যখন নিকটেই মারণাস্ত্র উদ্যত করে দাড়িয়ে আছে টের পেয়ে যাওয়া যায়, তখন মনের অবস্থা সহজেই কল্পনীয়। চার হাত-পায়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে আমি অন্ধকার সিড়িগুলো দ্রুত অতিক্রম করতে গিয়ে আরো হেঁচট খাচ্ছিলাম, পিছিয়ে পড়ছিলাম। এই অবস্থায় তিনতলায় পোঁছে আমি রাখালদের ফ্ল্যাটের দরজা দেখতে পেয়ে যেন ধড়ে প্রাণ পেলাম। ভেতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েই আমি কম্পিত হাতে দরজা বন্ধ করে নিরাপদ হয়ে গেছি ভাবছি এমন সময় মুখের ওপর তীব্র একঝলক আলো এসে পড়ল । কেউ আমার মুখের ওপর টর্চ ফেলেছে বুঝতে পেরে হকচকিয়ে দাড়িয়ে পড়লাম, অমনি গম্ভীর গলায় আদেশ হলঃ ‘হাত দুটো মাথার ওপর তোল।’

গলার স্বর বাজখাই, রাখালের নয়। আর রাখাল এরকম তামাসাও করতে যেত না। অথচ কথাটি যে বলছে, সে রাখালদের ফ্ল্যাটের ভেতরেই রয়েছে এবং সে আমার সঙ্গে কিছু তামাসা করছে না। হাত তুলতে বিলম্ব হলে হয়তো আরেকটা ওয়ার্নিংও পাওয়া যাবে না, একটি নিরেট গুলি এসে মাথার খুলি ফুঁড়ে ঢুকবে। টর্চের তীব্র আলো আমার গোটা মুখমণ্ডলকেই স্পষ্টত টার্গেটের মধ্যে রেখেছে। আমি চোখের নিমেষে মাথার ওপর দুটো হাত উঁচু করে ধরলাম।

এমন সময় হঠাৎ ঘরের বিজলী বাতি জ্বলে উঠতেই আমার ধাঁধা কেটে গেল, কিন্তু আমি চমকে না উঠে পারলাম না। আমার থেকে হাত কয়েক তফাতে এক ভদ্রলোক বাঁ-হাতে টর্চ এবং ডান হাতে রিভলবার নিয়ে দাড়িয়ে আছেন। পরনে পা-জামা এবং ফতুয়া, বিচিত্র কম্বিনেশন, মাথায় কদমছাঁট শুভ্র কেশ। ভদ্রলোকের বয়স যাট পেরিয়েছে। কিন্তু যে ঘরে আমরা দুজনেই দাঁড়িয়ে আছি, সে-ঘর কস্মিনকালেও রাখালদের নয়। আলো জ্বলে উঠলে দর্শকরা যেমন থিয়েটারে নতুন সেট দেখতে পায়, নতুন সীন নতুন দৃশ্যপট। আমি ঘাবড়ে গেলাম। আমি তো গুণে গুণে তিনতলাতেই উঠছি। এবং উঠে ঠিক বাঁ-হাতি ফ্ল্যাটেই ঢুকেছি। তাহলে এই অসম্ভব ঘটনা কি করে সম্ভব!

কিন্তু আমার তখন একথা ঘুণাক্ষরেও মনে হয় নি যে আমি আদত বাড়িটাই ভুল করেছি। ভুল ঠিকানায় এসে পৌঁছেছি। হাউসিং এস্টেটের বাড়িগুলো সব এক ছাঁদের...এক ছাঁচের। আমি সম্পূর্ণ আলাদা নম্বরের বাড়িতে ঢুকে তিনতলায় উঠে এসেছি।

ভদ্রলোক এতক্ষণে টর্চ নেভালেন। তারপর কর্কশ গলায় ধমক লাগালেন : ‘এখানে কি মতলবে?’

আমার জামাকাপড়ের জায়গায় জায়গায় চাপ চাপ তাজা রক্ত লেগে আছে। লোকটি ভ্রূ কুঁচকে সেগুলো লক্ষ্য করলেন : ‘ক’টিকে সাবাড় করলে কমরেড?’

আমার গলা দিয়ে বেরোল : ‘বিশ্বাস করুন, আমি... একটু জল…’ গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, আর কথা বলতে পারলাম না।

‘ন্যাকামি হচ্ছে।’ হুঙ্কার ছাড়লেন ভদ্রলোক : ‘পিছন ফিরে দাঁড়াও।’

আমি বিনা বাক্যব্যয়ে পিছনে ফিরে দাঁড়ালাম। মাথার ওপরে হাত দু’খানা যেমন তোলা ছিল, তেমনিই থাকল। টের পেলাম উনি এগিয়ে এসে আমার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়েছেন। রিভলবারের নলটি আমার ঘাড় স্পর্শ করতেই আপাদমস্তক শিউরে উঠলাম আমি। ঠাণ্ডা নলটা ঘাড়ের খোলা অংশে ছ্যাক করে উঠার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে, অজানা আশঙ্কায়, বুকের ভেতরটা তপ্ত তৈলের কড়ায় জলের ছিটে পড়ার মত সশব্দে শিউরে উঠল। কিন্তু না, ভদ্রলোকের তেমন মারাত্মক কোন মতলব নেই। ঘাড়ের ওপর রিভলবারের নল ঠেকিয়ে রাখলেও আমাকে সম্ভবতঃ সাবাড় করার ইচ্ছা তাঁর নেই। একহাতে তিনি আমার দেহ তল্লাসী করলেন পিছনে দাঁড়িয়ে। ইংরেজি ছবিতে আমিও এরকম দেহ তল্লাসীর পদ্ধতি দেখেছি, এইটেই তল্লাসকারীর পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ। আমার তাৎক্ষণিক ভয়টা মরে যেতেই স্বাভাবিক বুদ্ধি ফিরে এল। মনে হল, লোকটি এইখানকারই বাসিন্দা, পাজামা ফতুয়া পরে বেপাড়ায় বেঘরে বেড়াতে আসেন না। লোকটির যা বয়স—তাতে উগ্রপন্থী হওয়া সম্ভব নয়। মুখের শ্রী দেখে তাঁকে শিক্ষিত এবং ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। হাতে রিভলবার দেখেই বুঝে নেওয়া উচিত ছিল, তদুপরি চুলের ছাঁট এবং এখন দেহতল্লাসীর কায়দা লক্ষ্য করে যে লোকটি অধ্যাপক কিংবা নিছক অফিসার বা ডাক্তার নন; উনি পুলিশের লোক। আলো নিভে যাওয়ায় এবং গণ্ডগোল শুরু হওয়ায় উনি হয়তো নিজের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েছিলেন, এমন সময় সিঁড়িতে আমার উন্মাদ পায়ের শব্দ শুনে সিঁড়ির বারান্দা থেকে সরে গিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আমার পিছনের ভদ্রলোক হঠাৎ হেসে উঠলেন : ‘তাই বলুন... তা মিস্টার চন্দ, আপনি এখানে কি করে? আরে ঘুরে দাঁড়ান, আর ঊর্ধ্ববাহু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না, বরুণবাবু।’

নিজের নাম অপরিচিত লোকের মুখে শুনলে সব সময়ই রোমাঞ্চ জাগে। তারপর এইরকম পরিবেশে, যখন মৃত্যুর সঙ্গে নিরস্ত্র দাঁড়িয়ে মোকাবিলা চলেছে, যখন সব কিছুই, মানুষের স্বাভাবিক ব্যবহার পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত, তখন আমি বরুণ চন্দ ফিরে দাঁড়ালাম নিজের নাম ভদ্রলোকের মুখে শুনে। মাথার ওপর মিনিট দুই-তিন হাত তুলে রেখেই অসাড় হয়ে এসেছিল, এখন নামিয়ে কি শান্তি। ভাবলাম ট্রাফিক পুলিশগুলোর সত্যিই কত না কষ্ট হয়, রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে।

‘আপনি?’ আমি বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করি, ‘আপনার পরিচয়টা?’

আমার চোখের ওপর থেকে পাঁচ শেলের টর্চের আলো নেমে গিয়েছিল, কিন্তু চোখের ঘোর তখনও কাটে নি। এমন সময় আলো জ্বলে ওঠায় সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

কদমছাঁট সাদা-মাথার বলিষ্ঠ পুরুষটি বললেন, বছরখানেক আগে লালবাজারে আলাপ হয়েছিল, বোধ হয় মনে নেই? শান্তিপ্রসাদ রায়।

স্মিতহাস্যে মাথা নেড়ে বললাম, ‘সত্যি আমি লজ্জিত, শান্তিবাবু। এখানে হঠাৎ দেখে চিনতে পারি নি। তা আপনি এখানে?’

‘হ্যাঁ, ছুটিতে আছি। এটা মেয়ের বাড়ি। বাড়ির সবাই অন্যত্র গিয়েছে, কাল ফিরবে। কিন্তু আপনার একি ব্যাপার, বুঝতে পারছি না তো?’ এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে ফের বললেন, ‘জখম-টখম হয়েছেন নিশ্চয়? কোথায় লেগেছে বলুন, আমি ফাস্ট এড দিয়ে দিচ্ছি।’

আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘না, সেসব কিছু না। আগে এক গ্লাস জল—’

শান্তিবাবু চাকরকে ডেকে জল আনালেন, আমি ততক্ষণে তার নির্দেশে সোফায় বসে পড়েছি। জল খেয়ে সুস্থ হয়ে আমি আগাগোড়া ঘটনাটা তাঁকে জানালাম। শান্তিবাবু সঙ্গে সঙ্গে থানায় ফোন করলেন। তারপর বললেন, আমি খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছি এবং পুলিশ না আসা পর্যন্ত আমার চলে যাওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া পাড়া ঠাণ্ডা হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এ অবস্থায় অচেনা মানুষ আমি পথে বেরিয়ে মারা পড়ে যেতে পারি। তার চেয়ে পুলিশ এলে পুলিশের গাড়িতে একটা ছোটখাটো লিফট নিশ্চয়ই পেতে পারি। মার্ডারটা যদিচ রাজনৈতিক এবং আমার সম্বন্ধে শান্তিবাবুর, শুধু শান্তিবাবুর কেন, সাবাদসাহিত্যে ওয়াকিবহাল মাত্রেরই ওয়াকিবহাল থাকার কথা। আমি যে কাগজে কাজ করি, সে কাগজ কোন রাজনৈতিক দলের নয়, দ্বিতীয়ত সাংবাদিক হিসেবে আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মতবাদ অনবগত নেই কারোরই। বাংলাদেশের পাঠক মাত্রেই আমার সম্প্রতি সাড়া-জাগানো বাংলাদেশের তথা ভারতের রাজনৈতিক সমীক্ষার বই ‘রাজা বদলের পালা’ পড়েছেন। তাই সেদিক থেকে পুলিশ নিশ্চিন্ত। আমাকে খুঁজবে না। কিন্তু পুলিশ তদন্তে আমি একজন উইটনেস হিসেবে জড়িয়ে থাকবই এবং আমার নৈতিক দায়িত্বও সত্য স্বীকার না করা পর্যন্ত চুকবে না। তাই শান্তিবাবুর কথাই যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করে, আমি অফিসে একটা টেলিফোন করে দিলাম। ডিটেলস জানালাম না, মার্ডারের কথাও না, শুধু কোন পাড়ায় যে গণ্ডগোলের জন্য আটকে পড়েছি, তাই জানিয়ে সময় চাইলাম। অর্থাৎ পৌঁছতে বিলম্ব হবে। নিউজ এডিটর, লাফিয়ে উঠলেন। তিনি অবস্থাটাকে কাগজের অনুকূলে ব্যবহার করতে চাইলেন। তাঁর অভিপ্রায়, অভিপ্রায় কেন নির্দেশ, সিঁথির এই পাড়ার গণ্ডগোলের একটা জীবন্ত কাহিনী চাই। সময় লাগুক যতটা প্রয়োজন, মালমশলা নিয়ে চাই কি এখান থেকেই কাহিনী ফেঁদে নিয়ে আমি যেন অফিসে পৌঁছই। টেলিফোন করলেই প্রেসভ্যান আমাকে তুলে নিয়ে যেতে ছুটে আসবে।

পুলিশ পৌঁছে গেল ইতিমধ্যেই। থানার অফিসার শান্তিবাবুর পরিচিত এবং রীতিমত স্নেহভাজন। বয়েসে তরুণ। নিচে গাড়ি এসে পৌঁছতেই শান্তিবাৰু নেমে গেলেন একতলায়। তাঁর অনুরোধ মত আমিও তাঁর পিছু পিছু গেলাম।

অন্ধকারে যে অকুস্থানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমি এত ভয় পেয়েছিলাম, এখন ইলেকট্রিক বাল্বের উজ্জ্বল আলোয় সে জায়গা অনেকখানি স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। অস্বাভাবিকতা শুধু রক্তের জন্যে। বলির জায়গা যেমন প্রচুর পরিমাণ রক্তে ভেসে যায়, তেমনি জায়গাটায় অনেকখানি রক্ত গড়িয়ে এসে চাপ বেঁধেছে। আর রক্তের জমাট বেঁধে আসা স্রোতের মধ্যে শুয়ে আছে একটি দেহ। গৌরবর্ণের সুশ্রী সুঠাম চেহারার সেই মৃত মানুষটি চিৎ হয়ে পড়ে আছেন, চোখ দুটি আধখোলা। পরনে শ্লেট রঙের টেরিলিন শুট। প্রচলিত রীতিতে দেহের অনেকগুলি জায়গায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ক্ষতস্থানগুলি রক্তে লাল হয়ে আছে, সেই স্থানগুলো থেকে গা-বেয়ে রক্তের ধারা নেমেছে, মাটিতে খানিকটা গড়িয়ে গিয়ে প্রশস্ত হয়েছে, পরিমাণে বেড়েছে এবং ঘন হয়েছে।

এত কিছু খুঁটিয়ে দেখার আগেই শান্তিবাবু অস্ফুট ভঙ্গিতে বিস্ময় প্রকাশ করলেন, ‘আরে! এ যে ডাক্তার কুশারী।’

তরুণ অফিসার বিমান গুপ্ত শান্তিবাবুর বিস্ময়োক্তি লুফে নিয়ে বললেন, ‘আপনি এঁকে চিনতেন, স্যার? ইনি কোন ফ্ল্যাটের—’

শান্তিবাবু জানালেন তিনি ডাঃ কুশারীকে ভাল করেই জানতেন। ডাঃ কুশারীর কাছেই তাঁর নাতনীর অ্যাপেণ্ডিসাইটিস অপারেশন করানো হয়েছিল। বউবাজারের কাছে তাঁর নার্সিংহোম আছে। ভদ্রলোক নিজে ভাল সার্জন ছিলেন; অকৃতদার। না, কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্ভবত কোন যোগাযোগ ছিল না। এ বাড়িতে একাধিক দিন হয় শান্তিবাবুর মেয়ের ফ্ল্যাটে, নয়তো ডাঃ কুশারীর ফ্ল্যাটেই দুজনের আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, পাড়ার অবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, দেশের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নিয়ে মন খুলে আলোচনা হয়েছে। ঢাকা-বিক্রমপুরের মানুষ জানার পর থেকে দুজনেই যেন দূরসম্পর্কে আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন মনে মনে। ফলে নিজের নিজের মত প্রকাশ করতে কোন দ্বিধা-সঙ্কোচ বা আড়ষ্টতা-কপটতা ছিল না। তাই থেকেই শান্তিবাবু জানেন, লোকটি কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগামী ছিলেন না। কিন্তু এখন যে দিনকাল পড়েছে, তাতে খুন হবার জন্যে বিশেষ কোন কারণ-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। কে যে কার দৃষ্টিতে প্রতিক্রিয়াশীল, পুঁজিপতি, মজুতদার কে যে কার অনুমানে কার দালাল, এবং কে যে কিভাবে বুর্জোয়া তার সঠিক হিসেব নেই। আসলে ছুরির ফলায় সব মানুষই এক মানুষ, সব মানুষকেই একা এবং অসাবধান পেলে লাশ বানানো যায়।

ড: কুশারী সম্ভবত সাদামাটা, নির্বিরোধী মানুষ ছিলেন। অমায়িক, হাসিখুশি, সাতপাঁচশূন্য। অথচ তাঁকেই মরতে হল নিজের ফ্ল্যাটের দরজায়। দরজা তখনো বন্ধ, বাড়ির লোকেরা বোধ করি এখনো জানেই না তাদের দরজার গোড়াতেই গৃহকর্তা খুন হয়েছেন। এত কাছে থেকেও মরবার সময় মুখে একটুখানি জলও দিতে পারে নি কেউ।

থানা-অফিসার মিঃ গুপ্ত শান্তিবাবুকে বললেন, ‘নকশালী স্ট্যাবিং মনে হচ্ছে, স্যার। স্ট্যাবিংয়ের জায়গাগুলো দেখুন—’

শান্তিবাবু মৃতদেহের ওপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আগে থেকেই দেখছিলেন, কোন কথা বললেন না। গুপ্ত নিজের আবিষ্কারে উল্লসিত হয়ে তখনও বলে চলেছেন, ‘দেখুন, মোট ন’টি জায়গায় ছোরা মারা হয়েছে—হার্ট, লিভারে, কিডনী দুটোয়, নাভিবিন্দুতে, তলপেটে দু-জায়গায়, কুঁচকির কাছে দু-জায়গায়। এত ট্রেনড হাত, এমন অ্যানাটমি জ্ঞান অর্ডিনারি মার্ডারারের কিংবা গুণ্ডা-ফুণ্ডায় হবে না।’

শান্তিবাবু মুখ তুলে অন্যমনস্ক চিন্তাক্লিষ্ট চোখে কয়েক সেকেণ্ড গুপ্তের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। দৃষ্টির সঠিক অর্থ ধরতে না পেরে থানা-অফিসার থমকে থেমে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘স্যার, কিছু বলবেন?’

শান্তিবাবু ধীর গলায় বললেন, ‘ডক্টর কুশারীর ফ্ল্যাটে নক করো আর লালবাজারে খবর দাও। কেসটা কিরকম যেন জটিল মনে হচ্ছে।’

‘কেন স্যার, কি দেখে বুঝলেন?’ গুপ্ত কৌতূহলে উত্তেজিত গলায় প্রশ্ন করলেন।

শান্তিবাবু কোন জবাব না দিয়ে মৃতদেহ প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন। আমার হঠাৎ চোখে পড়ল, সিঁড়ির দিকের সাদা দেওয়ালের গায়ে একজোড়া রক্তাক্ত হাতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে রয়েছে। অন্ধকারে হাতের রক্ত মুছতে গিয়েছিলাম আমি, এ তারই সাক্ষ্য। মনের মধ্যে কেমন যেন শিহরণ অনুভব করলাম। হাতের ছাপের দিকে তাকিয়ে অকারণে মনে হল, একজোড়া হাতকড়া পরানো হাতের ছবি দেওয়ালে আঁকা রয়েছে। আমার নিয়তিও কি শেষ পর্যন্ত তাই। লালবাজার থেকে যদি পুলিশ-কুকুর আসে, তাহলে আমার জামাকাপড়ে—। এই পর্যন্ত ভেবেই চমকে তাকালাম নিজের দিকে, সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল। আমার পরনে আর এখন রক্তাক্ত জামাকাপড় নেই। শান্তিবাবুর সৌজন্যে নিচে নেমে আসার আগেই জামাকাপড় বদলে নিয়েছিলাম। শান্তিবাবু আমাকে জানেন, বিশ্বাস করেছেন, কিন্তু অন্য পুলিশ অফিসার কি আর তা করবেন? তবু সত্য গোপন করা চলবে না, শেষ পর্যন্ত হয়তো বলতেই হবে। তবে শান্তিবাবু আমাকে আগেই মুখ খুলতে বারণ। করেছেন। প্রয়োজন হলে তিনি যখন বলবেন, তখনই আমি কথা বলব, তার আগে নয়।

ফ্ল্যাটের দরজায় নক করে কোন সাড়া না পেয়ে শেষ পর্যন্ত জানা গেল, দরজা বাইরে থেকে লক করা। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা গেল ডাঃ কুশারী অকৃতদার। সংসারে এক অপগণ্ড ভাইপো ছাড়া আর কেউ নেই। অন্তত এই ফ্ল্যাটে আর কেউ বাস করে না। ঠিকে ঝি আর রাঁধুনি আসে, কাজ করে দিয়ে নিয়মমাফিক চলে যায়। বাকি সব কিছুতেই ডাক্তারবাবু ছিলেন স্বাবলম্বী। স্টোভ, কুকার, হিটার, ইলেকট্রিক কেটলি, হটপ্লেট-কুকিং ইউটেনসিলস যাবতীয় কিছু মজুত। সাহেৰীআনায় তিনি নিজের হাতেও এটা-সেটা মাঝে-মধ্যেই করেন। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে তিনি বেশ সৌখিন। তিন বছর বিলেতে ছিলেন, এসব তারই ফল।

যাই হোক, ভাইপেটিকে অপগণ্ড না বলে ভ্যাগাবন্ড বলাই ভাল। সে আবার নাকি আর্টিষ্ট মানুষ, বছর তিনেক আর্ট কলেজে রঙ-তুলি ঘষেছিল। তারপর সেসব ছেড়েছুড়ে এক আধা-সখের নাটকের দল গড়েছে। প্রায়ই রাত কাবার করে বাড়ি ফেরে বলে ডাক্তারবাবু তার ওপরে মোটেই সুপ্রসন্ন ছিলেন না। আই-এস-সি পাশ করে ছোকরা না করল আর পড়াশোনা, না দেখল চাকরি-বাকরির চেষ্টা। নিশ্চিন্ত মনে দিব্যি ফুর্তিতে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।

ডাক্তারের পকেট থেকেই ফ্ল্যাটের দরজার চাৰিটি পাওয়া গেল।

বাইরে থেকে ফিরে কুশারী দরজা খোলারও সময় পান নি বোঝা গেল। শত্রুরা তাঁকে চারপাশ থেকে আঘাতের পর আঘাত হেনে চিরদিনের মত নীরব করে দেয়। টেলিফোনে ইতি মধ্যে খবর পাওয়া গেল, লালবাজার থেকে এক্ষুণি ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কেউ এবং ফটোগ্রাফার আসতে পারছেন না। স্থানীয় পুলিশ অফিসারকেই তা চালিয়ে যেতে বলা হল। শান্তিবাবু এখানে আছেন জেনে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার খুশি হলেন, বিমান গুপ্তকে তিনি শান্তির পরামর্শ মত কাজ করতে বললেন। শান্তিবাবু লালবাজারের একটি পুরোন এবং নির্ভরযোগ্য মগজ, এর আগেও অনেক জটিলতার গিঁট তিনি ছাড়িয়েছেন।

পাড়া থেকেই একজন ষ্টুডিও ফটোগ্রাফারকে ডেকে আনা হল। মৃতদেহের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি, তারপর বিভিন্ন পাশ থেকে ক্লোজআপ, মৃতদেহকে উঁচু করে তুলে ধরে তার পড়ে থাকার জায়গাটার ছবি নেওয়া হল। খড়ির দাগ টেনে, মাপজোক করে বিবরণী লেখা হল মৃতদেহ একটু তফাতে সরিয়ে রাখার আগে।

শান্তিবাবু আমাকে বললেন, ‘রহস্যময় কিছু লক্ষ্য করলেন, মিস্টার চন্দ?’

‘কি ব্যাপারে?’

‘এই মৃতদেহের ব্যাপারে।’

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না, তেমন কিছু তো—’

আসলে এই সব বাস্তব খুন-জখমের সঙ্গে আমার চাক্ষুষ যোগাযোগ বলতে গেলে এই প্রথম। পুলিশী তদন্তও নিজের চোখে দেখা এই প্রথম। অবশ্য ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়ে পড়ে অনুসন্ধানের ধারা সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ ধারণা আছে। আর চাক্ষুষ মনুষ্যদেহে ছুরিচালনা সে শুধু ও-টিতে সার্জনের স্ক্যালপেল চালনা দেখে।

‘অতর্কিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ডাক্তার কুশারী, এত অতর্কিতে যে চিৎকার করার সুযোগও তিনি পান নি।’ শান্তিবাবু আমাকে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে লাগলেন, ‘শুধু তাই নয়, এমন মোক্ষম মার তিনি প্রথমেই খেয়েছিলেন, যার ফলে তার দেহ অসাড় হয়ে গিয়ে ছিল। দেহের ক্ষমতা সম্পূর্ণরকম লোপ পেয়েছিল, অথবা তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন, নইলে এতগুলি উপর্যুপরি মার খেয়েছেন, অথচ বিন্দুমাত্র বাধা দেন নি বা ধ্বস্তাধ্বস্তি করেন নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এমন অতর্কিতে সিঁড়ির প্যাসেজটুকুর মধ্যে কারো বা কাদের পক্ষে আক্রমণ করা সহজ ছিল কিনা। সম্ভব ছিল, যদি পুরো অন্ধকারের মধ্যে এই আক্রমণ করা হত। আর সম্ভব ছিল, যদি পিছন থেকে হঠাৎ কোন মারাত্মক জায়গায় ছুরি চালনা করা হত। কিন্তু ক্ষতচিহ্নগুলো লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন, কোন আঘাতটাই পিছন থেকে করা হয় নি, এমন নির্ভুল লক্ষ্যভেদ দেখে এটাও সহজেই অনুমান করা চলে যে, অন্ধকারের মধ্যে নির্ভুলভাবে প্রতিটি পয়েন্টে হিট করা অ্যানাটমির প্রফেসারের পক্ষেও সম্ভব নয়। সিমেন্টের ওপরে যেভাবে রক্ত গড়িয়েছে, যেভাবে জমাট বেঁধেছে সেটা লক্ষ্য করলে, মিস্টার চন্দ, আপনিও বলে দিতে পারতেন যে, শায়িত অবস্থায় ছাড়া দাঁড়ানো বা বসা কোন অবস্থাতেই মৃতের শরীরে স্ট্যাবিং করা হয় নি। হলে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছড়াতো, রক্ত ছেটকানোর দাগ থাকত। কিন্তু তার বদলে সমস্ত রক্তই শুধু গড়িয়ে গিয়েছে। মৃতদেহ এখন সরানো হয়েছে, আপনি স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছেন, জমাট রক্তের জায়গাগুলো একটা মানুষের শরীরের আউট লাইনটাই এঁকেছে। খড়ি দিয়ে কয়েকটা রেখা যোগ করে দিলে হাত-পা-মাথাঅলা একটা ছবি ফুটে উঠবে দেখতে পাবেন। তাহলে দাঁড়াচ্ছে এই, যখন ডাক্তার কুশারীকে স্ট্যাব করা হয়, তখন এ পাড়ার, অন্তত ৪ বাড়ির সিঁড়ির আলো জ্বলছিল। দ্বিতীয়, যখন তাঁকে স্ট্যাব করা হচ্ছিল, তখন তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। সুতরাং অনুমান হয়, প্রথমে কেউ পিছন থেকে তার মাথায় আঘাত করে। সেই প্রচণ্ড আঘাতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলে, একযোগে নয়, একের পর এক ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরে আঘাত করা হয়।’

শান্তিপ্রসাদবাবু থামতেই বিমান গুপ্ত কুশারীর মৃতদেহের ওপরে ঝুঁকে পড়ে কি যেন দেখলেন, তারপরে বললেন, ‘ইয়েস স্যার, ডাক্তার কুশারীর মাথার পেছন দিকে টাকের ওপর ডাণ্ডা বা হাতুড়ি জাতীয় কোন নিরেট কিছু দিয়ে খুব ভারী রকমের চোট দেওয়া হয়েছিল, তার স্পষ্ট চিহ্ন আছে।’

স্মিতহাস্যে মাটি দুলিয়ে শান্তিবাবু পুনরায় বলেন, ‘ক্ষতস্থানগুলো ভাল করে লক্ষ্য করলে, গুপ্ত, তুমি এও দেখতে পাবে, অস্ত্রের আঘাতগুলো অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এবং ঠাণ্ডা হাতে করা হয়েছে। পোশাকের ওপরে মসৃণ কাট দেখেই আমি বলে দিতে পারি যে মৃতের দেহের স্কিন-টিসু-মাসল কিছুই থেঁতলে যায় নি, পরিষ্কার এবং সরাসরি কেটেছে, অস্ত্রের ফলাটা যতখানি চওড়া ঠিক প্রায় ততখানিই ক্ষতের পরিসর এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নিশ্চয়ই দেখতে পাবে, প্রায় নব্বই ডিগ্রী কোণ করে, অর্থাৎ একেবারে লম্ব আকৃতিতে অস্ত্রের ফলা দেহে প্রবেশ করেছে। হাতুড়ি ঠুকে সটান সোজা যেমন পেরেক বসানো হয়, তেমনি হাতের চাপে অস্ত্রটাকে দেহের মধ্যে প্রত্যেকবার প্রবেশ করানো হয়েছে। এবং সম্ভবত এক হাতেই প্রত্যেকটি ক্ষতছিদ্রের সৃষ্টি হয়েছিল। আগেই বলেছি, যে বা যারা হত্যা করেছে, মানুষের শরীর সম্বন্ধে নির্ভুল জ্ঞান তাদের আছে। অথচ তা থাকলে এতবার অস্ত্রাঘাত করার অর্থ কি? যে হার্ট পাংচার করেছে বলে জানে, অধিকন্তু লিভার ফুঁড়েছে–তার পক্ষে অন্যত্র অস্ত্রাঘাতের বাহুল্য নিষ্প্রয়োজন। যাই হোক, এর কারণ সম্পর্কে এখন কিছুই বলতে চাই না, সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। তবে ন’টি হিটিং পয়েন্ট আমি লক্ষ্য করতে বলব। চিবুকের হাড় যেখানে কানের লতি বরাবর শেষ হয়েছে, কণ্ঠনালীর দুপাশে ইন্টারন্যাল ক্যারোটিভ আর্টারি কাটা হয়েছে। বাঁ দিকের পাঁজরের ফোর্থ ও ফিফথ রিবস এর ফাঁকে কোস্টাল কার্টিলেজ বরাবর আঘাত করে হৃদপিণ্ডটি নির্ভুলভাবে টার্গেট করা হয়েছে। চতুর্থ আঘাত ডান দিকের পাঁজরের তলা ঘেঁষে সটান লিভারে। পাঁচ ও ছয়ের চোট দুটো কিডনীতে, এই আঘাত দুটোই বেশি গভীর, ছুরির সম্পূর্ণ ফলাটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল সম্ভবত। কারণ ক্ষতের প্রস্থ অপরগুলোর থেকে একটু বেশি। তারপর ঠিক নাভিমূলে। ওইখানেই অ্যাবডোমিন্যাল অ্যাওটা নামক রক্তবাহী প্রধান শিরাটা আছে। দুই কুঁচকির কাছে, তলপেট ছুঁয়ে শেষ দুটো স্ট্যাবিং নির্ভুলভাবে ফিমোরাল আর্টারি খতম করেছে। মানুষকে মারার পক্ষে এদের যে কোন একটিই যথেষ্ট। অন্তত ওপরের দিকের আঘাতগুলি সম্বন্ধে নিঃসন্দেহে বলা যায়। যাক, এবার কিছু তল্লাসী চালানো যাক। প্রথমে মৃতের প্যান্ট-কোটের পকেটগুলো কি বলে দেখি–’

লেকচারারের মত এতক্ষণ যেন থিওরিটিক্যাল বক্তৃতা দিচ্ছিলেন ডায়াসের ওপর দাড়িয়ে, এবার প্র্যাকটিকালে হাতে কলমে নামলেন শান্তিপ্রসাদবাবু।

ডাঃ কুশারীর পকেট থেকে বেরোল মানিব্যাগ, তাতে সামান্য কিছু টাকা আর খুচরো। একটি শ্যামবাজার সেকশানের ট্রামের মান্থলি এবং একটি টিকেট। টিকেটটি আঠারো পয়সার অর্থাৎ ফাস্ট ক্লাসের পুরো পথের ভাড়া। কাউন্টারের পাঞ্চ করার জায়গাটা থেকে বোঝা গেল টিকেটটি বৌবাজার থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত জায়গার জন্য চিহ্ন করা। এছাড়া তাঁর হাতঘড়ির তলায় দুখানা সরকারী বাসের টিকেট ভাঁজ করে গোঁজা ছিল। সম্ভবত শ্যামবাজার থেকে সিঁথি পর্যন্ত। শান্তিবাবু ভ্রূ কুঞ্চিত করে আমাদের দিকে তাকালেন। নিজের নোটবুকে টিকেট তিনখানার নম্বর লিখে নিলেন, তারপর একজন এ-এস-আইকে ডেকে টিকেট তিনখানা দিলেন। বললেন, ‘ট্রাম এবং বাস ডিপোয় ফোন করো। শ্যামবাজার ট্রাম ডিপোয় আর ডানলপ বাস ডিপোয়। এই টিকেটগুলো আজকের কিনা জেনে নাও।’

এ-এস-আই একটি দর্শনীয় স্যালুট দিয়ে পাশের ফ্ল্যাটে ফোন করতে ছুটল। শান্তিবাবু আবার কুশারীর দেহ নিয়ে পড়লেন। হাতঘড়িটার দিকে তাকালেন—ঘড়ি বন্ধ হয়ে আছে। ঘড়িতে আটটা বাজতে দশ মিনিট বেজে রয়েছে। কাচটা একপাশে ফেটে গেছে। শান্তিবাবুর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল কিন্তু কিছুই বললেন না। টেরিলিন কোটের বুকপকেটে একটা সাদা দামি টেরিলিন রুমাল কাগজের ফুলের মত কৌশলে ভাঁজ করে রাখা ছিল। সেটা সাবধানে বের করে নাকের কাছে আগে ধরলেন, তারপর ধীরে ধীরে ভাঁজ খুললেন। বুকপকেটে গুজে রাখা সৌখিন রুমালের মধ্যে কিছু থাকবার কথা নয়। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু কার্যত কিছুই যে বেরোল না তা নয়, অতি ক্ষুদ্র–প্রায় চোখে না পড়বার মত একটি রঙীন চাকতি সাদা রুমালের মধ্যে ভরে আছে দেখতে পাওয়া গেল।

ভ্রূ কুঁচকে জিনিসটা উল্টেপাল্টে দেখলেন হাতের তালুতে রেখে। তারপর আমার আর বিমান গুপ্তের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বস্তুটি কি মনে হয়?’

বিমান মাথা চুলকোলেন। আমার মুখ ফসকে গেল: ‘মেয়েদের কপালের টিপ নয় তো?’

‘হ্যাঁ, তাই। একপিঠে আঠা লাগানো আছে।’

আমরা দুজনেই বিস্মিত এবং জিজ্ঞাসু চোখে শান্তিবাবুর মুখের দিকে তাকালাম। কিন্তু তিনি আমাদের এই চাউনির কোন গুরুত্ব দিলেন না। ডাঃ কুশারীর পকেট থেকে আগেই যে চাবির রিংটা পাওয়া গিয়েছিল, সেটা দিয়ে ফ্ল্যাটের দরজার ইয়েল লক খুললেন। ফ্ল্যাটের ভেতরটা পুরো অন্ধকার হয়ে আছে।

টর্চের আলোয় সুইচবোর্ড দেখে আলো জ্বাললেন শান্তিবাবু। তারপর আমাদের দুজনকে বললেন, ‘আপনারা ভেতরে আসুন, কিন্তু কোন জিনিস ছোঁবেন না। একটা পিঁপড়েও পা দিয়ে না মাড়িয়ে ফেলেন, এমনি ভাবে সাবধানে চলাফেরা করবেন। কে জানে, হত্যা সম্পর্কে এই বন্ধ ফ্ল্যাটেরও কিছু বলবার আছে কিনা।’

আমরা শান্তিবাবুর উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চললাম। উনি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। প্যাসেজ পার হয়েই আমরা প্রথমে বসবার ঘরে এসে দাঁড়ালাম। মাঝারি আকারে এই ঘরখানায় একটি সুদৃশ্য সোফাসেট, একটি ভরা বুককেস, একটা কাচের গা-আলমারি এবং এককোণে টিপয়ের ওপর রাখা টেলিফোন ছাড়া আর দ্রষ্টব্য কিছু ছিল না। শান্তিবাবু ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শিকারের গন্ধ পাওয়া হুলো বেড়ালের মত যেন প্রথমে বাতাস শুঁকলেন, পরে ঘরের চারপাশে তাঁর চোখের সার্চলাইট ঘোরালেন। আমার নিজের অস্বাভাবিক কিছুই নজরে পড়ল না। যে জিনিস যেখানে থাকা উচিত তাই আছে, কিছুই এলোমেলো নয়–উচ্ছৃঙ্খল নয়। শান্তিবাবু সোফাসেটের মাঝখানে রাখা সেন্টার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। টেবিলটার ওপরে একটি সুদৃশ্য জাপানী সিল্কের ঢাকা, তার ওপরে খান দুই চিঠি; একখানা খাম আর অন্যটা ইনল্যাণ্ড, দুটোরই মুখ ছেঁড়া। একটা অ্যাশট্রে দিয়ে চাপা দেওয়া রয়েছে। অ্যাশট্রের মধ্যে একটু জল, তাতে একটি সিগারেটের আধখানা, একটা কাঠি, ছেঁড়া খামের সরু কাগজের ফালিটা। তীক্ষ্ণ চোখে সেদিকে একবার তাকিয়ে অ্যাশট্রের তলা থেকে চিঠি দু’খানা তুলে ঠিকানা পড়লেন, স্ট্যাম্প এবং শীলমোহর লক্ষ্য করলেন। খামের পনেরো পয়সার টিকেটটা আধখানা লাগানো, বাকি পাঁচ পয়সার টিকেটের জায়গা ফাঁকা, পোস্টমার্কের ভগ্নচিহ্ন দেখলে বোঝা যায় লাগানো হয়েছিল কিন্তু টিকেটটা খুলে পড়ে গেছে। পায়ের তলায় সুদৃশ্য গালচের ওপরে তাকালেন শান্তিবাবু, বোধ হয় খসে পড়া টিকেটটাই খুজলেন। আমি তাকালাম, কিন্তু পেলাম না; অবশ্য টিকেটটা যে এখানেই পড়েছে তার কোন মানে নেই, পোস্ট অফিসেও খুলে পড়ে গিয়ে থাকতে পারে।

টিকেটের বদলে হঠাৎ আমি সাদা একটা কি জিনিস পড়ে থাকতে দেখলাম সেন্টার টেবিলের পায়ের কাছে। শান্তিবাবুকে দেখাতেই তিনি কুড়িয়ে নিলেন। বুঝতে পারলাম জিনিসটা কি। শাঁখের আংটির একটা টুকরো। সযত্নে সেটা পকেটে রেখে দিয়ে শান্তিবাবু বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার চন্দ!’

হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সময় অতি তুচ্ছ বস্তু, এমন কি একটা চুল কিংবা একটুখানি ধুলোরও গুরুত্ব আছে, শার্লক হোমস প্রমুখ ছাপাখানার গোয়েন্দা সেকথা প্রমাণ করেছেন, জানতাম। কিন্তু আমার দেখতে পাওয়া শাঁখের আংটির টুকরোটা যে কি মূল্যে ধন্যবাদ অর্জন করল ঠিক বোধগম্য হল না। শান্তিবাবু নিচু হয়ে সেন্টার টেবিলের র‍্যাক থেকে একখানা ভাঁজকরা খবরের কাগজ টেনে বের করলেন। কাগজখানা চোখের সামনে মেলে ধরলেন : ‘কিছু মন্তব্য করুন, মিস্টার চন্দ।’

আমি একটু অপ্রতিভ হয়ে যা মুখে এল বলে ফেললাম, ‘কাগজখানা আজকের আনন্দবাজার পত্রিকা। কাগজখানার ওপরে চায়ের কাপের দাগ লেগে আছে। মনে হয়, এই কাগজ টেবিলে বিছিয়ে ডাক্তার কুশারী কিংবা তাঁর ভাইপো চা খেয়েছিলেন সকালবেলায়। তারপর ভাঁজ করে সেটার টেবিলের তলায় র‍্যাকের ওপরে সরিয়ে রেখেছিলেন।’

‘বাঃ, এই তো।’ শান্তিবাবু সপ্রশংস হাসি হাসলেন: ‘সেন্টার টেবিলের তলায় একবার তাকিয়ে দেখুন তো আর কিছু বলতে পারেন কিনা?’
সেন্টার টেবিলের তলায় একটা ইলাসট্রেটেড উইকলি এবং তার তলায় আরো বেশ কয়েক দিনের খবরের কাগজ জমানো রয়েছে। কাগজগুলো হাত দিয়ে উল্টে চকিতে একটা কথা আমার মাথায় এল। শান্তিবাবুর দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, ‘উনি কি ইংরিজি-বাংলা দু-রকমের কাগজ রাখতেন? এইখানা ছাড়া কিন্তু আর সবই ইংরেজি কাগজ, স্টেটসম্যান পত্রিকা।’

‘দ্যাটস দ্য পয়েন্ট।’ শান্তিবাবু তারিফ করার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, ‘উনি খুব সম্ভবত ইংরেজি খবরের কাগজই রাখতেন। আনন্দবাজারখানা বাইরের আমদানী। বিমান, তুমি ভাঁড়ার ঘরখানা একটু দেখে এসো তো, সেখানে পুরোন বইপত্র আর খবরের কাগজ রাখা আছে কিনা। যে বাড়িতে মহিলা নেই, সে বাড়িতে মাসকাবারে খবরের কাগজ বেচে দেওয়া রীতি নেই। দেখ, সম্ভবত আছে।’

ডাইনিং স্পেশের পাশে রান্না এবং ভাঁড়ার পাশাপাশি। আলো জ্বেলে বিমান গুপ্ত সেদিকে গিয়েই একটু পরে হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ফিরে এলেন।

‘দেখলে?’ শান্তিবাবু প্রশ্ন করলেন।

‘হ্যাঁ স্যার। আপনার কথাই ঠিক, কোন বাংলা কাগজ এ-বাড়িতে নেই। ভাঁড়ারের তাকের এককোণে ইলাসট্রেটেড উইলি আর নানারকমের মেডিক্যাল জার্নাল কয়েক থাক সাজানো রয়েছে। সেই সঙ্গে বোধ হয় কয়েক মাসের স্টেটসম্যানের স্তুপ।’

‘ভেরি গুড। এবার তাহলে আমি এই বাংলা কাগজটা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলি?’

আমরা দুজনেই সোৎসাহে বললাম, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমরা অনুরোধ করব ভেবেছিলাম। বলুন–’

‘কাগজটা কোন অফিস কিংবা ডাক্তারের চেম্বার থেকে এখানে এসেছে। সম্ভবত বিকেলে এসেছে। এই কাগজের ওপরে যে চাপান করা হয়েছে, তা প্রভাতী চা নয়; বিকেলবেলায় এই চা হয়েছে। চায়ের কাপের এবং ডিশের, স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট দুটো ছাপ পড়েছে। ছাপ দুটো বেশ খানিকটা তফাতে। এ থেকে বোঝা যায়, দু-কাপ চা এসেছিল টেবিলে এবং যে কারণেই হোক, এক কাপ চা কিছু সময়ের জন্যে ডিশ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল–যাতে ঠাণ্ডা হয়ে না যায় কিংবা–’ সিলিংয়ের কাচের গোল ঢাকা পরানো আলোর দিকে তাকিয়ে নিয়ে ফের বললেন, ‘পুজোর এই মুখোমুখি দেওয়ালী পোকার বড় উৎপাত। পাছে যার চা তার অনুপস্থিতিতে কাপে পোকা পড়ে, সেই জন্যে ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন। চা-চলকে পড়া ডিশের ওপর থেকে কাপটাকে কাগজের ওপর নামানো হয়েছিল বলে ছাপটা স্পষ্ট। এবং কাপের তলার রিংয়ের ছাপ, তাই আকারে ছোট। অপর ডিশের সামান্য চা লেগেছিল তলায়, তাই বড় বৃত্ত ছাপটা অস্পষ্ট। কাগজ বিছিয়ে দিলে স্পষ্টই বোঝা যাবে লোক দুটো সেন্টার টেবিলে মুখোমুখি বসেছিলেন। অর্থাৎ একজন বড় লম্বা আসনটায় আর অন্যজন সিঙ্গল সীটে। কিন্তু—কিন্তু—’

কথা থামিয়ে শান্তিবাবু ঘরের চারপাশটা ঘুরে তাকিয়ে কি যেন খুঁজলেন। তারপর টিপয়ে রাখা টেলিফোনটার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু টেলিফোনে হাত না দিয়ে, এমনকি সেদিকে না তাকিয়ে দেওয়ালের গায়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেখে আমরাও সেদিকে এগিয়ে গেলাম। দেওয়াল ঘেঁষে যেখানটায় টেলিফোনটা রাখা ছিল, সেখানে ফুট চারেক উঁচুতে দেওয়ালের নীলাভ ডিসটেম্পার কে যেন আঁচড়ে তুলে নিয়েছে। আঁচড়ের দাগটা স্পষ্ট এবং গভীর। আঁচড়ের ব্যাপারটা নিয়েই যে শান্তিবাবু ভাবিত হয়েছেন,—মানে তখনো ভাবছেন, আমরা বুঝতে পারলাম।

একটু পরেই হঠাৎ রুমাল দিয়ে ধরে টেলিফোনটা তুলে নিলেন স্ট্যাণ্ড থেকে, তারপর সেটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটু দেখে আবার রেখে দিতে দিতে দিতে শুধু বললেন, ‘আই সী!’

ঘর থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বাইরে চলে গেলেন হঠাৎ। কৌতূহলবশত আমরাও বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে তখন আশপাশের ফ্ল্যাটের জনাকয়েক এসে দাড়িয়েছেন, কনস্টেবল ভিড় ঠেকাতে ব্যস্ত। সিঁড়ির ছেলেমেয়ের জঙ্গল এক-একবার উঁকি মেরেই পালিয়ে যাচ্ছে বাড়ির অভিভাবকদের তাড়া খেয়ে। সিঁড়ির একপাশে প্যাসেজের ওপর ডাঃ কুশারীর মৃতদেহটা সাদা চাদর টেনে ঢেকে রাখা হয়েছে। শান্তিবাবু এগিয়ে গিয়ে চাদরটা তুলে কুশারীর বাঁ-হাতের কব্জিটা তুলে ধরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন। আমার দৃষ্টিও ততক্ষণে খুলে গিয়েছে। দেখলাম, বাঁ-হাতের তালুর পিছনে—মানে কড়ে আঙুলের তলায় নীলচে রঙ লেগে আছে। ঘড়ির ডায়ালের কাচের কিনারেও ময়লার আকারে সামান্য রং লেগে আছে। দেওয়ালের ডিসটেম্পার তাতে কোন সন্দেহ নেই। তারপর মৃতদেহের দু-পায়ের জুতো এবং মোজা খুলে কি যেন দেখলেন। ফটোগ্রাফারকে কানে কানে কি বললেন, পরে আবার ফ্ল্যাটে সেই বসবার ঘরে ফিরে এলেন। এসে ঘরের চারপাশটায় ঘুরপাক খেলেন বার দুই, তারপর দেওয়াল আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আলমারির পাল্লা দুটোয় স্বচ্ছ কাচ বসানো। ভেতরের তাকগুলো দেখা যায়। রাবার ক্লথের ওপরে ধবধবে কাপড় পাতা। তার ওপরে সারি সারি অপারেশনের যন্ত্রপাতি। স্ক্যালপেল, নাইফ, সিজার্স, ক্যাম্প, ফরসেপস, রিট্রাকটার আরো কত কি সারি সারি মৃত সৈনিকের মত শুয়ে আছে। একেবারে নিচের তাকটায় কি চোখে পড়তেই তাড়াতাড়ি আলমারির পাল্লা খুলে ফেললেন শান্তি বাবু। রুমাল দিয়ে সাবধানে মাঝবরাবর ধরে একটা রুলকাঠ তুলে নিয়ে আমাদের দেখালেন।

‘কি এটা?’

আমি বললাম, ‘খাতায় কষি টানার রুলকাঠ।’

বিমান গুপ্তও আমার কথায় সায় দিয়ে মাথা হেলালেন।

‘স্টেইনলেস স্টিলের রুল, সলিড ব্যাপার,’ কথাটা বলতে বলতে একহাতে পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করে দু-পাশ পরীক্ষা করে মন্তব্য করলেন আগের কথার জের টেনে। ‘সাদা বাংলায় ডাণ্ডা।’ নাকের কাছে নিয়ে সেই সলিড ব্যাপারটির ঘ্রাণ নিলেন।

আমি রসিকতা করার লোভ সামলাতে পারলাম না। বললাম, ‘ঘ্রাণেও কিন্তু অর্ধেক খাওয়া হয়, শাস্ত্রে বলেছে। এটা যদি ডাণ্ডাই হয় আপনার কথামত—’

কৃত্রিম কোপ কটাক্ষ ছুঁড়ে শান্তিবাবু হঠাৎ গুপ্তকে ফলস ধমক দিলেন, ‘ওহে ছোকরা, ডাক্তার কুশারী মাথায় কি তেল মাখতেন বলতে পারো?’

গুপ্ত অমনি ‘বলছি স্যার,’ বলেই বাথরুমের উদ্দেশে ছুটলেন।

‘আর বলেছ!’ শান্তিবাবু মুচকি হেসে বললেন, ‘আমি বলছি মিলিয়ে নাও গে। মহাভৃঙ্গরাজ, অনেক টাকবাজ পুরুষ যা ব্যবহার করে থাকেন।’

বাথরুম থেকে ছুটতে ছুটতে ফিরে এসে বিমান গুপ্ত বললেন, ‘দু-রকম তেলের শিশি দেখলাম স্যার, বাথরুমে। নারকেল তেল আর মহাভৃঙ্গরাজ।’

‘ও-কে।’ শান্তিবাবু বললেন, ‘দেখো, এই ডাণ্ডা দিয়ে ডাক্তার কুশারীকে প্রথমে মাথায় আঘাত করা হয়। তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলে—বাই দি বাই, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি—ডাক্তার কুশারীকে ঘরের মধ্যে প্রথম আক্রমণ করা হয়। তারপর বাইরে টেনে নিয়ে গিয়ে স্ট্যাব করা হয়। আটটা বাজতে দশে প্রথম ওর মাথায় আঘাত করা হয়, তারপর বাইরে টেনে এনে ন’জায়গায় ছুরি দিয়ে আঘাত করতে খুব বেশি হলে দু’মিনিট সময় লেগেছে। তার মানে তখনও পাড়ার আলোগুলো জ্বলছিল। হত্যাকারী অথবা হত্যাকারীরা ফ্ল্যাটের মধ্যে কিছু টুকিটাকি কাজ সেরেছে তারপরে। এবং দরজায় চাবি দিয়ে সরে পড়েছে নিজের আস্তানায়।’

শান্তিবাবুর একটি অদ্ভুত চার্মিং পার্সোনালিটি আছে, সেটা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থেকে বুঝতে পেরেছি। হত্যাকাণ্ডের মত একটা নৃশংস ব্যাপার এবং তার পুলিশী তদন্তের মত কাটখোট্টা রুটিন ওয়ার্ক এই প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেও ক্লান্তি এবং বিরক্ত বোধ করি নি। এবং এমন জমে গিয়েছিলাম, যেন এক ম্যাজিশিয়ানের সাকরেদী করে চলেছি, কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেছে খেয়ালই করি নি। লালবাজার থেকে লোক এসে পড়তে তবে আমার চমক ভাঙল।

তারা এসে শান্তিবাবুর নির্দেশ মত নানা জায়গা থেকে হাতের ছাপ নিল, ঘরের ভেতরের আরও দু-চারটে ছবি নিল, তারপর ডেডবডি পুলিশ হাসপাতালে চালান দেবার জন্যে ব্যবস্থা করে দিয়ে চলে গেল। বিমান গুপ্ত তাঁর খাতা খুলে রিপোর্ট লিখলেন, আমার জবানবন্দীও তাতে থাকল। অবশ্য শান্তিবাবু, আমার কাহিনী বলায় কিছুটা সাহায্য করলেন। আমি অফিসে ইতিমধ্যেই আর একটা টেলিফোন করে দিয়েছিলাম থানায় গাড়ি পাঠানোর জন্যে। শান্তিবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিমান গুপ্তের সঙ্গে পুলিশী-জীপে উঠবার আগে আমি শান্তিবাবুকে আরও গোটা দুই প্রশ্ন করলাম ডাক্তার কুশারীর মার্ডার কেস সম্বন্ধে। শান্তিবাবুর বিবৃতিটা আসলে আমার বুদ্ধিতে খুব স্পষ্ট হয় নি, তাঁর ব্যাখ্যাটার পিছনে কি কি প্রমাণ আছে, অর্থাৎ কি কি পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে তিনি হত্যার নেপথ্য কাহিনীটা গড়ে তুলেছেন, তা না জানা পর্যন্ত ব্যাপারটা আমার কাছে কিছুটা ধাঁধার মত মনে হচ্ছিল। কয়েকটি প্রমাণ উপকরণ অবশ্য তিনি দেখিয়েছেন হাতে নাতে, কিন্তু তাঁর বাকি অনুমান, বাকি দেখা আমাদের কাছে খোলসা করেন নি । আমি প্রশ্ন করতেই বিমান গুপ্তকেও উৎসাহিত দেখাল। বুঝলাম, পুলিশে কাজ করলেও, গুপ্তের মগজেও খানিকটা ধোঁয়া ঢুকেছে। ব্যাপারটা স্পষ্ট করে বোঝা তার পক্ষে আরও জরুরি প্রয়োজন।

শান্তিবাবু হেসে বললেন, ‘আমি জানি ব্যাপারটা ভাল করে ব্যাখ্যা করি নি, অবশ্য করলেও,... আমি তো লেখক নই, আপনাদের মত সুন্দর করে বোঝাতে পারতাম না। প্রথমে কি করে ব্যাপারটা মাথায় এসেছিল, তা তো বলেছি। আমার তখনই মনে হয়েছিল, হত্যাকাণ্ডটা প্রচলিত ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নাও হতে পারে। হত্যাকারী নিজেকে আড়াল করার জন্যে হয়তো ব্যাপারটা বাটোয়ারী হত্যার মতন করে সাজিয়েছে। তবে আমি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত সরকারীভাবে বলতে পারছি না। যাক সেকথা—’

শান্তিবাবু দম নেবার জন্যে একটু থামলেন, থেমে একটা সিগারেট নিজে ধরালেন এবং আমাকে একটা অফার করলেন। আমি নিলাম, উনি হাত বাড়িয়ে আগুন দিলেন; তারপরে বললেন, ‘আপনারা কেউ খেয়াল করেছিলেন কিনা জানি না, ফ্ল্যাটের দরজায় আমি প্রথম ডাক্তার কুশারীর নেমপ্লেটের পাশে ‘ইন’ শব্দটা দেখেছিলাম, তারপর পকেটে এবং ঘড়ির তলায় টিকেট দেখে বুঝলাম উনি একা ফেরেন নি, চেম্বার থেকে ফেরার পথে আর কেউ সঙ্গী হয়েছিল। হয়েছিল এমন কেউ, যিনি ওঁর বিশেষ পরিচিত। কারণ একবার বৌবাজার থেকে শ্যামবাজার, পরে শ্যামবাজার থেকে সিথি, দুবারই কুশারী নিজে তাঁর টিকেট কেটেছেন। এবং তিনি দৈবক্রমে সহযাত্রী হন নি, তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওঁর বাড়ি পর্যন্ত আসছিলেন। না হলে অমন ভাবে ডাক্তার তাঁর টিকেট নিজের কাছে জমা রাখতেন না। দ্বিতীয়ত নির্ভুল হত্যাকাণ্ডটি দেখেই আমার মনে হয়েছিল হত্যাকারী একজন এবং সে আলোয় হত্যা করেছে এবং হত্যা করার আগে অজ্ঞান করে নিয়েছিল। ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে আনন্দবাজার কাগজখানা আমার সন্দেহকে সমর্থন করল, দুটি মানুষের চা-পানের চিহ্ন মিলল। অ্যাশট্রেতে সিগারেটের একটা টুকরো এবং তার তলায় খামের ছেঁড়া কাগজের ফালিটুকু। কুশারীর সঙ্গে আমার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি ধূমপান করতেন না আমি ভাল করেই জানি। তাহলে তার অতিথি সিগারেটটি ধরিয়েছিল এবং সম্পূর্ণ খাবার আগেই আশট্রেতে ফেলে দিয়েছিল। সঙ্গে যে এসেছিল, সে তাহলে তাঁর ভাইপো অন্তত নয়। খামটি খোলার আগে কেউ যে সিগারেট অ্যাশট্রেতে ফেলে নি, খামের ছেঁড়া কাগজ তলায় থাকায় তা স্পষ্ট। খাম এবং ইনল্যাণ্ডখানা আজই এসেছে। এবং বিকেল সাড়ে চারটেয় ডেলিভারী ছাপ মারা আছে। অতএব অন্তত পাঁচটার আগে চিঠি দুখানা বিলি হয় নি এবং খোলাও হয় নি। অতিথির সঙ্গে চা খেতে বসেছিলেন ডাক্তার, নিজের হাতে চা তৈরি করেও এনেছিলেন তিনি, কিন্তু খাবার আগেই তাঁকে হঠাৎ উঠে যেতে হয়েছিল সোফা থেকে। কোথায় গিয়েছিলেন তিনি, হঠাৎ কি এমন প্রয়োজন হয়েছিল, যার ফলে চায়ের কাপে ডিশ চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল? টেলিফোন ধরতে উঠে গিয়েছিলেন পরে বুঝতে পারলাম। টেলিফোনে কথাবার্তা হবার পর তিনি নিজে কোন নম্বরে ডায়াল করছিলেন সামান্য ঝুঁকে দাঁড়িয়ে, অতিথির দিকে সম্পূর্ণ পিছন ফিরে। অতিথি সেই সময়টার সদ্ব্যবহার করেছিলেন ভারী লোহার রুল দিয়ে মাথার পেছন দিকে একটি মোক্ষম ঘা বসিয়ে। কাটা কলাগাছের মত পড়ে গিয়েছিলেন কুশারী, টেলিফোন রিসিভার লেগে দেওয়ালের ডিসটেম্পার আচড়ে গিয়েছিল। বাঁ হাতে বাঁধা ঘড়ি দেওয়ালে প্রচণ্ড চোট পেয়েছিল, ফলে ঘড়ির ব্যালান্স স্প্রিং ভেঙে কাঁটা তিনটে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কুশারীর হাতঘড়ি অনুযায়ী সময় আটটা বাজতে দশ । আমাদের মাননীয় অতিথি তখন ডাক্তারের সংজ্ঞাহীন দেহটাকে সিঁড়ির চত্বরে নিয়ে গিয়ে খতম করেন। তারপর ফিরে এসে চায়ের কাপ দুটো সরান, ধুয়ে মুছে কাবার্ডে রেখে দেন। রুলটাতে হাতের ছাপ মুছে দেওয়াল আলমারির তলায় তাকে ফেলে রাখেন, কিন্তু কয়েকটি চুল এবং চুলের তেল যে তার গায়ে লেগে থাকল, তাড়াতাড়িতে খেয়াল করেন না। খবরের কাগজটি পর্যন্ত সেন্টার টেবিলের র‍্যাকে ভরে ফেলেন। উল্টে-পড়া টিপয় এবং টেলিফোন ঠিক করে যান। কিন্তু নিজের হাতের ভাঙা আংটির একটা টুকরো যে কখন খসে পড়ল খেয়াল করেন নি। আলমারি থেকেই তিনি ছুরিখানা সংগ্রহ করেছিলেন, আবার ধুয়ে-মুছে সেখানা সেখানেই রেখে গিয়েছেন। ডাক্তারী অস্ত্রগুলির দিকে চোখ পড়তেই আমার প্রথমে ছন্দপতনটা চোখে পড়ে। সুবিন্যস্ত ইনস্ট্রুমেন্টগুলোর মধ্যে একখানা ছুরি নড়া দাঁতটির মত সারির মধ্যে বাঁকা ভাবে যেন ঠেলে বেরিয়ে আছে দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। ভাল করে নজর করতেই বাটের ফাঁকে একবিন্দু জল চিকচিক করছে দেখতে পেয়ে গেলাম। ব্যস, সব ব্যাপারখানাই জলের মত স্পষ্ট হয়ে গেল। হত্যাকারী জানতে দিতে চান না, ডাক্তার কুশারী মৃত্যুর আগে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলেন। জানতে দিতে চান না, তাঁর সঙ্গে তখন আরো কেউ উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু অতি সাবধানীও ব্যস্ততার মুহূর্তে কিছু কিছু ভুল করে থাকে। এই ভুল আকারে ছোট হলেও প্রকারে মারাত্মক। ডাক্তার কুশারী নিজের চেম্বার থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসেন। তেমনি আজও ফিরে আসছিলেন, এসে নিজের ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, হত্যাকারীর প্রমাণ করার বিষয় ছিল এইটুকুই। নিজের ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে কয়েকজন গুপ্তঘাতকের হাতে নির্মম ভাবে নিহত হয়েছেন অস্ত্রাঘাত দেখে তাই প্রমাণ হবে। কিন্তু হত্যাকারী দুটো মারাত্মক ভুল করলেন এইখানে। এক, শেষ বিকেলের ডাকে আসা চিঠি দুটো সরিয়ে ফেলার কথা ভাবতে পারলেন না। দু’ নম্বর, ডাক্তার কুশারীর পায়ে ভুল জুতো পরালেন।’

আমি আর বিমান গুপ্ত দুজনেই একসঙ্গে বিস্ময়োক্তি করলাম, ‘ভুল জুতো?’

‘হ্যাঁ, ভুল জুতা এবং মোজা। প্রথম মৃতদেহ দেখতে গিয়েই আমি চমকে উঠেছিলাম, ডাক্তারের পায়ে দু-রকমের শু দেখে। দেখতে হুবহু এক, কিন্তু একটি চামড়ার সোল, অন্যটির রবারের। মোজাও কালো, কিন্তু নক্সা আলাদা। একজন ডাক্তার এতখানি কালার ব্লাইণ্ড নিশ্চয় হবেন না। বিশেষ করে এক-একটা জুতোর কম্ফোর্ট অ্যাকোমোডেশান এক এক রকমের। ব্যবহারের জুতো চোখ বুজে পায়ে গলিয়েও বুঝতে পারা যায়। তখনই আমার মনে খটকা লেগে যায়। তারপর ফ্ল্যাটে ঢুকে, তোমরা লক্ষ্য করেছিলে কিনা জানি না, আমি ওঁর জুতোর শেলফের কাছে গিয়ে একটু দাঁড়িয়েছিলাম। জুতোর শেলফে জুতো রাখার বদলে, মাটিতে অনেক জোড়া নানা আকৃতির নানা রঙের জুতো এলোমেলো করে রাখা আছে। বুঝলাম, উনি ছিলেন সেই ধরনের মানুষ—যাঁরা ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেকক্ষণ জুতো পরে থাকতে বাধ্য হন। ফলে জুতো-অসহিষ্ণু যাকে বলে। ওঁর অনেক জোড়া জুতো ওঁর জুতোর শখ বা সৌখিনতা প্রকাশ করছে না, উনি জুতো-বিলাসী ছিলেন না, আসলে জুতো পাল্টে পাল্টে উনি মুখ বদলানোর মতই পায়ের স্বাদ বদলাতেন। ঘরে এসেই সর্বপ্রথমের কাজ ছিল পা থেকে জুতো খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। এ ধরনের মানুষ আপনারা সবাই কখনো না কখনো প্রত্যক্ষ করেছেন। যাঁরা সব ব্যাপারে বেজায় গোছালো একমাত্র জুতোর ব্যাপারে ছাড়া। তাই হত্যাকারী পাশাপাশি পড়ে থাকা দু-জোড়া কালো রঙের শু সংগ্রহ করে এনে কুশারীর পায়ে পরিয়েছিলেন, কিন্তু দুটো পাটি যাচিয়ে দেখেন নি। অ্যাক্সিডেন্ট ব্যাপারটা হয়তো কাকতালীয়, কিন্তু ভাগ্য যখন বিরূপ হয়, তখন সবই বিপক্ষে যায়। সুতোর জট তখন ফাঁসের রূপ নেয়। এই জুতো বদলের তলায় আর একটি মোক্ষম সুত্র সেঁটে গেল। কুশারীর পায়ের তলায় ছোট্ট একটুখানি ছাপা কাগজ কখন লেপটে গিয়েছিল। সম্ভবত বাথরুম থেকে ভিজে পায়ে বসবার ঘরে ফিরে আসার সময় খসে পড়া সেই পাঁচ পয়সার টিকেটটার আঠালো দিকটা মাড়িয়েছিলেন কুশারী। ফলে সেঁটে গিয়েছিল টিকেটটা। টিকেটের ওপরে তারিখ এবং সময়ের সীল আছে। সুতরাং সব ব্যাপারগুলো কেমন লেখা নাটকের মতন জমে উঠেছে বুঝতেই পারছেন।’

‘বুঝলাম। আমি সমীহ ভরা গলায় বলি, কিন্তু আনন্দবাজার কাগজখানা যে কোন অফিসের টেবিল থেকে এনেছিল, সেটা কি করে জানা গেল?’

‘অতি সাধারণ উপায়ে।’ শান্তিবাবু ঈষৎ লজ্জিত হাসি হাসলেন যেন, ‘খবরের কাগজের পৃষ্ঠার এককোণে রাখার স্ট্যাম্পের বেগুনি রঙের কালি লেগে আছে। স্ট্যাম্পপ্যাডের টিনের বাক্সটা বোধ হয় খোলা অবস্থায় ছিল এবং তার ওপর কাগজ এবং কাগজের ওপর কনুই কিংবা হাতের চাপ পড়েছিল।’

আমি বললাম, ‘আশ্চর্য! আপনায় সূক্ষ্ম দৃষ্টি রীতিমত উপন্যাস, মশাই।’

‘কিন্তু সেই সঙ্গে কি বাস্তবও নয়?’ বিমান গুপ্ত উৎফুল্ল কণ্ঠে জানালেন।

‘একশোবার।’ আমি বলাম, ‘একটু লিফট দেবেন কি? থানা অবধি আপনার সঙ্গে?’

‘একশোবার।’ গুপ্ত আমার কথার প্রতিধ্বনি করে হাসলেন।

 

পরদিনের কাগজেই আমার ‘নিহত একজন’ নাম দিয়ে ক্রমশ প্রকাশ্য রচনাটির প্রথম কিস্তি বেরিয়ে যাবার পর রীতিমত সাড়া গেল। নিউজ এডিটার আমাকে তার কামরায় ডেকে পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘সাবাস বরুণ। তুমি সার্কুলেশনের চটকা ভেঙে দিয়েছ? আজ কাগজ খুব টেনেছে বাজারে। আরো কয়েক হাজার বেশি ইম্প্রেশান দিলে ভাল হয়। বাই-উইকলিতে তোমার স্টোরি রিপ্রিন্ট হচ্ছে—পরের কিস্তির জন্যে তৈরি হও—’

নিউজ এডিটার ধুরন্ধর মানুষ, এর বেশি আমাকে কিছুই বললেন না । কিন্তু আমার পরিচিত দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটারের মুখ থেকে বিস্তৃত বিবরণ পেলাম। আজ সকাল থেকেই নাকি টেলিফোনে কোয়ারি এবং কনগ্রাচুলেশান শুরু হয়ে গেছে। নিজের বাড়িতে বসেই নিউজ এডিটার প্রায় ডজনখানেক ব্রেকফাস্ট কল পেয়েছেন। খবরের কাগজের প্রভাতী প্রতিক্রিয়াকে সব নিউজ এডিটারই আশঙ্কা এবং আগ্রহভরে প্রত্যাশা করে থাকেন। সহকর্মী এবং বন্ধুর দেখা হতেই হৈ হৈ করে তাঁদের আন্তরিক প্রশংসা জানালেন। এমন জ্যান্ত লেখা, এমন সাসপেন্স নাকি অনেককাল পড়েন নি।

আমি নিজে চিন্তিত হলাম। আমার এক স্বর্গত জার্নালিস্ট গুরুর সাবধান-বাক্য স্মরণ হল : পেন, পয়জন অ্যাণ্ড পেনালটি। খবরের কাগজের কলমের এই দুমুখী বিপদ। স্লো পয়জনিং এবং সুইফট পয়জনিং-এর কবলে পড়ার আশঙ্কা অনেক সুস্থ ও সবল কলমচীরও থাকে, তেমনি উল্টো দিকেও একটু বেকায়দা হলেই হেভী পেনালটি। কলমের স্টিল নিবও গুঁড়িয়ে যেতে বিলম্ব হয় না! পরবর্তী কিস্তির জন্যে তাই আমি এবার দুশ্চিন্তিত হলাম।

গল্পের বাকি কাঁচা মশলার ধান্ধায় আমাকে অগত্যা ব্যস্ত হতেই হল। থানায় টেলিফোন করে জানতে পারলাম, পুলিশ যথারীতি তার রুটিন মাফিক কাজ এগিয়েছে। পুলিশ মোটা রেখায় চলে। ডাক্তার কুশারীর ভাইপো শ্রীমান তরুণকুমারকে শহরের এক হোটেল থেকে মাঝরাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কাক ডাঃ কুশারীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তরুণকুমার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত—পুলিশ এরকম সন্দেহ করছে। তরুণকুমার ডাঃ কুশারীর হত্যার খবর পুলিশের মুখ থেকেই প্রথম শুনছে, এরকম বললেও পুলিশ স্বভাবতই বিশ্বাস করে নি। তাদের ধারণা, হত্যার সন্দেহ থেকে গা বাঁচানোর জন্যেই তরুণকুমার বাইরে রাত কাটাচ্ছিল। কিন্তু সে যাই কেন না হোক, তরুণকুমারকে হোটেলের ঘরে যে অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার জন্যেও অন্তত পুলিশ কেস হবে। তরুণকুমারের কাছে প্রায় হাজারখানেক টাকা পাওয়া গেছে এবং পাওয়া গেছে ‘বারো ইয়ারী’ নামক নাট্য সংস্থার নায়িকা বুলবুলি সেনকে। শ্রীমতী বুলবুলিকেও পুলিশ হাজতে পুরেছিল, পরে সকালবেলা মুচলেখার শর্তে ছেড়ে দেয়।

পুলিশ-লক-আপে তরুণকুমারকে পত্রিকার তরফে ইনটারোগেট করতে তক্ষুণি ছুটলাম লালবাজারে। অভাবিত ভাবে সেখানে দেখা হয়ে গেল শান্তিবাবুর সঙ্গে। আমাকে দেখেই একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘এই হচ্ছে সাহিত্যিক। আমাদের বলায় আর আপনাদের লেখায় এইখানেই তফাৎ। লেখাটা সেন্সেশনাল হয়েছে মশাই—’

আমি লজ্জিত হেসে বললাম, ‘আপনার জামাকাপড় কাচিয়ে দিয়ে আসব, দু-একদিন হয়তো—’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে শান্তিবাবু বললেন, ‘ওসব কাপড়চোপড় এখন রাখুন, মশাই। পরের কিস্তিটার কথা ভাবুন। মাল-মশলা কিছু জুটল? তরুণ-প্রতিভার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল?’

আমি মাথা নাড়তেই বললেন, ‘বাদ দিন তাহলে। ওখানে কিছু নেই। চলুন, যাবেন একটা ইন্টারেস্টিং জায়গায়?’

আমি আগেই সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে পরে জানতে চাইলাম, ‘কোথায়?’

‘বারো ইয়ারের ইয়ারণী, হিরোইন সন্দর্শনে।’

বুঝলাম বুলবুলি সেনের কথা বলছেন শান্তাপ্রসাদ। বললাম, ‘পুলিশ তো তাকে ছেড়ে দিয়েছে।’

‘সেই জন্যেই তো আমরা তাকে একেবারে ছেড়ে দিতে পারছি না। আমি যাচ্ছি, আপনি যদি যাবেন, চলুন।’

পথে যেতে যেতে আমি বললাম, ‘আপনি কাল থানার ও-সি’র সামনে হত্যার যে ব্যাখা দিলেন, কই, পুলিশ তো আপনার কথা কানে নিল না! আপনি নিজেও তো পুলিশেরই লোক।’

শান্তিবাবু হেসে বললেন, ‘পুলিশ আমার অনুমান সিদ্ধান্ত কান নেয় নি, ঠিক না। নিয়েছে। খতিয়ে দেখছে, হাতে-কলমে প্রমাণ মিলিয়ে দেখছে। কিন্তু বাইরের দিকে, পুলিশ অনুশাসনের যান্ত্রিক একটা দিক আছে। তার একটা কঠোর কঠিন ক্রুড মেথড আছে। সেই মেথডিক্যাল ওয়ার্ক তাকে করতেই হয়। সমস্ত স্টেজগুলোর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, ফলে দেশের সাধারণ লোক ভাবে পুলিশ হৃদয়হীন তত বটেই, মস্তিষ্কহীনও সেই সঙ্গে। সে কাকে ধরতে কাকে ধরে, কাকে ছুঁতে কাকে ছোঁয়। বাই দি বাই—’ পকেট থেকে মুখরোচক চুরুটের খাপ বের করে একটা চলবে কিনা ভঙ্গিতে ভুরু নাচালেন। আমি ওঁর হাত থেকে একটি চুরুট নিলাম। চুরুটের খাপ পকেটে রেখে দিয়ে শান্তিবাবু নিজের চুরুটটিকে প্রথমে দুরুস্ত করে নিয়ে মুখস্থ করতে করতে বললেন, ‘পোস্টমর্টেম আর ফরেনসিক রিপোর্ট যা পাওয়া গিয়েছে, তাতে আমাদের কালকের অনুমান সত্যি। এই স্টিলের ডাণ্ডা দিয়েই ডাক্তারকে প্রথম কাবু করা হয়, তারপর ন’টি ভাইটাল পয়েন্টে সার্জনস নাইফ দিয়েই স্ট্যাব করা হয়। জামাকাপড়ের ওপর থেকেও তারা নির্ভুলভাবে টার্গেট হিট করেছিল। তবে প্রথম স্ট্যাবিং একেবারে হার্ট, এবং সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু ঘটে। আঘাতগুলো শায়িত এবং অনড় অবস্থায় করা হয়েছিল। মৃত্যুর সময়টা সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে যে কোন সময়ে। মৃত্যুর ঠিক আগেই তিনি চা-পান করেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, স্টম্যাক স্টাডি করে। টেলিফোন রিসিভারে আর দরজার হাতলে একই হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছে, যে-ছাপ ডাক্তার কুশারী কিংবা তরুণ কুশারীর নয়।’

‘আচ্ছা শান্তিবাবু, এই হত্যা যদি রাজনৈতিক নয়, তাহলে এর পেছনের উদ্দেশ্যটা কি বলতে পারেন। কাল বিকেলের ইনল্যাণ্ডখানা তো লাল কালিতে লেখা নকশাল অ্যাকশান স্কোয়াডের শাসানি চিঠি ছিল শুনলাম। আপনি আমাকে কাল কিন্তু বলেন নি।’

চুপ করে চুরুটের নীল ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে শান্তিবাবু বললেন, ‘বলি নি তার কারণ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই।’

‘আপনি কিন্তু আবার ধোঁয়া ছড়াচ্ছেন।’

‘না, না, ধোঁয়া তো কিছু নয়। আমি ‘সরাসরি সম্পর্ক নেই’ বলে এই বোঝাতে চাইছি, যে বা যারা ওই চিঠিতে ডাক্তার কুশারীর মুণ্ডু নেবে বলে শাসিয়েছে, তাঁরা কক্ষণো কাল ওঁর গায়ে হাত দেয় নি। তবে ওই চিঠি যে হত্যাকারীকে হঠাৎ উৎসাহিত করে নি, এ-কথা হলফ করে বলা শক্ত। কারণ দেখা যাচ্ছে, চিঠিতে তিনি আগন্তুক অর্থাৎ হত্যাকারীর সামনেই খুলে পড়েছেন।’

‘এই হত্যার তাহলে উদ্দেশ্য?’

‘উদ্দেশ্য?’ শান্তিবাবু হাসলেন, ‘খুনের ওইটিই তো চাবিকাঠি । মোটিভ। ওটা হাতে পেলে তো হত্যাকারীকেও প্রায় হাতে পাওয়া গেল। উঁহু মশাই, উদ্দেশ্য এখনই বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অর্থ অথবা ঈর্ষা… আর হ্যাঁ, একটা কথা বলা যায় বোধ হয়, এই হত্যাকাণ্ডটি রমণীঘটিতও হতে পারে।’

‘মানে?’

‘মানে নারী এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে জড়িত থাকতে পারে। আপনি অ্যাশট্রের মধ্যে সিগারেটের টুকরোটা ভাল করে লক্ষ্য করেছিলেন কি? জানি, তেমন করে লক্ষ্য করেন নি। করলে একটা রেড সিগন্যাল দেখতে পেতেন।’

‘রেড সিগন্যাল।’ আমি হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকি।

‘হ্যাঁ, রেড তো বটেই, সিগন্যালও বৈকি। সিগারেটের গায়ে লিপস্টিকের দাগ। আমি প্রথমে পান ভেবেছিলাম, কি আর একটি শৃঙ্গার চিহ্ন—আই মীন রঙীন টিপ বুকপকেটে, চোখে পড়ায় ( সরি টু আটার সাচ ওয়ার্ড) পরে মত পরিবর্তন করি। ফরেনসিক আরো পরে আমাকে কনফার্মড করে।’

‘ডাক্তার কুশারী সম্বন্ধে তাহলে—’

‘হ্যাঁ, তার জীবন শিশুনাট্য ছিল না। তিনি স্ত্রী ভূমিকা বর্জিত ছিলেন, একথা ভাবার কারণ নেই। তাঁর ফ্ল্যাটে অনেক সময়ই নানাবিধ মহিলারা আনাগোনা করতেন, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানা গেছে। তরুণকুমার কিন্তু আমাকে মুগ্ধ করেছে, মশাই। ছেলেটির সম্বন্ধে খুড়োর মুখে এবং লোকমুখে যেসব বিশ্লেষণ শুনেছিলাম, তা ঠিক নয়। খুড়োর সম্পর্কে কিন্তু সে একটিও বিরূপ মন্তব্য করে নি, এমন কি ডাক্তারের এই জীবনের সম্বন্ধে একটি অক্ষরও উচ্চারণ করে নি।’

‘ডাক্তার কুশারীর উত্তরাধিকারী বলতে তো ওই একজনই? প্রপার্টি বলতে যা কিছু মৃত্যুর পর তরুণকুমারই তাহলে পাচ্ছে?’

চুরুটের ধোঁয়ার ফাক দিয়ে জুলজুল করে তাকালেন শান্তিবাবু : ‘বুঝেছি আপনি কি বলতে চাইছেন। শুধু লাভ-ক্ষতিয়ান দিয়ে সব বিচার চলে না, প্রমাণ চাই। অ্যালিবি জিনিসটা উড়িয়ে দেবার নয়। খুনের সময় তরুণকুমার স্টেজে, পুরোদস্তুর অভিনয় চলে। এই নাটকে নায়ক স্বয়ং তরুণ, নায়িকা বুলবুল। সপ্তাহে তিন দিন অভিনয়, নাম করেছে বইটি!’

আর বেশি কথা হল না। হরীতকী বাগান শেখ যেখানে একটা মোচড় খেয়ে অন্য রাস্তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, সেখানে ট্যাক্সি থেকে নামলাম আমরা। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে শান্তিবাবু চোখের ইশারায় একটি দোতলা বাড়ির একটি বিশেষ জানলা দেখালেন। জানলার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, একটি মেয়েলি হাত জানলার পর্দা টেনে দিচ্ছে। হাতের মালিকাকে দেখতে পেলাম না, তবে সে যে তরুণী হবে তাতে সন্দেহ নেই।

হয়তো জানলা থেকেই লক্ষ্য করেছিল, না করার কারণ নেই, হরীতকী বাগান লেনের এই টাই-নটের মধ্যে ট্যাক্সি কমই চোকে, ঢুকলেও বিকেল ঘেঁষা শেষ দুপুরে, এখন প্রায় ঘুঘু ডাকা নির্জনতা। সারা দুপুর ক্রিকেট-পেটা ছেলেগুলোও এই সময় ঘরে ঢোকে। চৌবাচ্চায় কলের জলের শব্দ ছাড়া ইস্কুল-কলেজ ছুটির দুপুরে, এই শেষ প্রহরে অন্য শব্দ নেই। তাই ট্যাক্সির শব্দ, এবং পরিশেষে সিঁড়িতে জুতোর মসমস ধ্বনি বুলবুলি সেনকে কৌতূহলে আকৃষ্ট করেছিল। দরজার পর্দা সামান্য সরিয়ে অর্ধাঙ্গিনী হয়ে দাঁড়ালে। তার পাঁচ ফুট সাত-আট ইঞ্চি দুরন্ত ফিগারের দিকে তাকিয়ে আমি থ হয়ে গেলাম। খবরের কাগজে মঞ্চকথা বিভাগে যে ছবি দেখেছি শ্রীমতীর তার সঙ্গে এর দিনে-রাতের ফারাক। গানের কথাগুলোর লিখিত চেহারার সঙ্গে সুরে-তালে-কণ্ঠে বেজে ওঠা রূপের যে তফাৎ।

সেই মঞ্চসফল রূপশ্রী তখন দ্রুত সমাপ্তির পথে, আবৃত অনাবৃত দেহে তখনো কিছু কিছু ফিনিশিং টাচ বাকি। শরীরে একটা বাটিক প্রিন্ট ফার্স্ট রাউণ্ডে জড়ানো, খোঁচখাঁজ এখনো দ্রুত হস্তক্ষেপের অপেক্ষায়। মাথায় চুলের তাল যেন দোমেটে অবস্থায়, মুখের ফাউণ্ডেশনে এখনো কি যেন, না, ধরেছি, চোখের কাজ বাকি। আইলাইনার তার রুট ঠিক করে নি এখনো। ভ্রূ তৈরি, ঠোঁটে পলাশ কলির মত রং ধরেছে, কিন্তু জামা এখনো বাছাই করা হয় নি, আঁচলে গা ঢাকা দেওয়া ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বুলবুলি জানালো, ‘কোত্থেকে আসছেন?’

হাড়ের ছড়িটার মাথায় ঢাউস ঢাউস পাথুরে আংটিবহুল হাতের মুঠোটি বিশেষ দ্রষ্টব্যের মত সামনে বাড়িয়ে রেখে শান্তিবাবু অম্লান বদনে বললেন, ‘কোন্নগর থেকে, কিন্তু ইয়ে… সেকথা কোন পয়েন্ট নয়… আমরা এসেছি আপনার সঙ্গে—’

‘বুঝেছি। পাশের ঘরে বসুন, আমি আসছি—’

‘আপনিই তাহলে?’ শান্তিবাবু মফস্বলী পয়সাওয়ালা প্রৌঢ়ের মত বিস্ময়ে মুখব্যাদন করলেন।

অদ্ভুত সুরেলা গলায় হেসে উঠল বুলবুলি, ‘কেন, পছন্দ হল না?’

বিষম খাওয়ার মত গলায় হাসি এবং কাশি মিলিয়ে শান্তিবাবু বললেন, ‘না, না, হতেই হবে।’

পাশের দরজার পর্দা সরিয়ে আমরা একটি অপরিসর স্বল্পালোকিত বৈঠকখানায় ঢুকে একটি সস্তা সোফাসেটের ওপর বসলাম। আমাকে চোখ টিপে শান্তিবাবু মশার মত গলায় কানে কানে বললেন, ‘গ্রীনরুম বিউটি কেমন লাগল?’

আমি লজ্জা পেলাম। বুলবুলির দিকে আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম, হয়তো সেইটে লক্ষ্য করেই কথাটা বলা হল। আমি শুধু অপ্রস্তুত হাসি হাসলাম।

একটু পরেই বুলবুলি এল, বুলবুলি পাখির মতই রঙীন এবং স্মার্ট চেহারায়। হাতে দু পেয়ালা চা। আমাদের দুজনের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, ‘হ্যাঁ, এবার বলুন কী ব্যাপার।’

‘তার আগে পরিচয় করিয়ে দিই, ইনি একজন নাটক লেখক—নাম বরুণ চন্দ। আর আমি কোন্নগর নাট্যপরিষদের সেক্রেটারী । আমরা এসেছিলাম আপনার সঙ্গে কোন এগ্রিমেন্ট করা যায় কিনা… কিন্তু আপনি বোধ হয় এক্ষুণি বেরোচ্ছিলেন—’

‘না, ব্যস্ত হবার কিছু নেই, একটু পরেই না হয় বেরোব, কিন্তু—’

‘আজ্ঞে?’

‘বারো-ইয়ায়ীর নাটক ছাড়া তো অন্য কোথাও আমার অভিনয় করার স্বাধীনতা নেই।’

‘আপনাদের পরিচালকের পারমিশন যদি আমরা যোগাড় করি —মানে আমাদের তো একটা দিনের ব্যাপার—আপনাকে অবশ্য যথাযোগ্য সম্মানদক্ষিণাই দেব। আসলে কি জানেন, হিরোইন আমাদের ঠিকই ছিল, কিন্তু গত রাতে হঠাই দুমহলায় আপনার অভিনয় দেখে আমাদের দুজনেরই তাক লেগে গেছে একেবারে—বিশেষ করে প্রথম দুটো সীনে—’

কথাটা শেষ না করে গদগদ চোখে শান্তিবাবু তাকিয়ে রইলেন বুলবুলির দিকে। অকপট একটা গ্রাম্য ভঙ্গি ফুটিয়ে। কিন্তু আমার মনে হল শ্ৰীমতী যেন হঠাৎ নড়ে বসল, তার চোখের অ্যাপারচার ছোট হয়ে কিছু বিদ্ধ করতে চেষ্টা করল এমন মনে হল। মুহূর্ত কয়েকের অস্বস্তি ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিয়ে কেমন শিথিল গলায় সে কথা বলল, ‘বিশেষ করে প্রথম দুটো সীনে—’

কথাটা যেন প্রশ্নও নয়, বিস্ময়ও নয়, বুঝি শান্তিবাবুর উচ্চারিত কথাটিরই ঈষৎ স্থগিত পুনরুক্তি। শান্তিবাবুও সঙ্গে সঙ্গে লজ্জিত গলায় মাফ চাইলেন, ‘অবশ্যি, বলতে সঙ্কোচ বোধ করছি—আপনার পুরো অভিনয় দেখার সৌভাগ্য কাল হয় নি—আমার হঠাৎ শরীরটা অসুস্থ হওয়ায়—বোঝেনই তো বয়স হয়েছে-ইস, ওকি, আপনার হাতে কি হল?’

বুলবুলি চমকে নিজের হাতের স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো আঙুলটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, ‘ও কিছু না, কাল আঙুলটা একটু কেটে গিয়েছিল—’

শান্তিবাবু মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘না, না, আমি—’ তারপর হাত বাড়িয়ে বুলবুলির বাঁ হাতের কাছটায় একটা আঙুল ছুঁইয়ে আমাদের দুজনকেই অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আমি এই কোলাটার কথা, আসলে—’ হাসলেন একটু সরল বোকা-বোকা গলায় : ‘আঙুলের স্টিকিংটা আমি লক্ষ্যই করি নি, এমন ভাবে লাগিয়েছেন আমি ভেবেছিলাম শাঁখের আংটি হবে।’

বুলবুলির মুখে দু’তিন রকমের রঙ বদল হল, ভেতরে ভেতরে সে কেমন একটা অস্বস্তিতে ভুগছে বুঝতে পারা গেল।

সে ফ্যাকাশে হেসে বলল, ‘ও, এটা ইঞ্জেশানের দাগ, একটু আগে—’

শান্তিবাবু বেজায় ব্যস্ত হয়ে শুধোলেন, ‘আপনার শরীর খারাপ? অসুস্থ। ইস, আমরা তাহলে… নিশ্চয় ডাক্তারবাড়ি বেরোচ্ছিলেন, এঃ, আসুন বরুণবাবুমশাই, ভদ্রমহিলাকে—’

ব্যস্তবাগীশের মত উঠতে গিয়ে চায়ের কাপ-ডিশ সেন্টার টেবিলের ওপর উল্টে পড়তে পড়তে যদি বা বেঁচে গেল, কিন্তু টেবিলের কিনারে রাখা শান্তিবাবুর সোনার সিগারেট কেস আর রুমালটা ধাক্কা লেগে বুলবুলি সেনের পায়ের ওপর গিয়ে পড়ল। বুলবুলি নিচু হয়ে সেটা কুড়িয়ে আবার যথাস্থানে রাখতে রাখতে বলল, ‘আঃ, আপনি বড্ড বেশি ব্যস্ত হন, বসুন, ও কিছু না। আমার শরীর ভালই আছে—সামান্য একটা ইঞ্জেকশান, আমি নিজেই নিয়েছি একটু আগে—আপনারা ব্যস্ত হবেন না।’

‘ইঞ্জেকশন আপনি নিজে হাতে নিয়েছেন!’ হাঁ করে বিশ্বের অষ্টম বিস্ময় দেখছেন এমন মুখভাব করে বললেন, ‘আপনি শুধু একজন ব্রাইট স্টারই নন, বিদুষী মহিলা, চিকিৎসা শাস্ত্রেও আপনার ব্যুৎপত্তি—সত্যি, যত দেখছি আপনাকে—’ হাতজোড় করে মুগ্ধ ভক্তের মত এই প্রায়-বৃদ্ধ ভদ্রলোক নমস্কার করলেন। ‘আপনার সত্যিকারের অ্যাপ্রিসিয়েশন এখনো হয় নি—মিস সেন, আপনি স্টেজ থেকে বেরিয়ে আসুন—ফিল্মে জয়েন করুন, আপনি মত প্রতিভা—’

বুলবুলি স্বচ্ছন্দ হাসল এতক্ষণে, ‘অত প্রশংসা আমাদের বরাতে নেই কিন্তু… তাছাড়া আপনার মত প্রবীণ লোকের মুখ থেকে শুনলে লজ্জাই পাই—তাছাড়া প্রতিভা-টতিভা কিছু নয়—পেটের দায়ে একসময় নার্সিং শিখেছিলাম—ইঞ্জেকশান দিয়েই হাতেখড়ি হয়েছিল—’

একটু পরে হরীতকী বাগান লেনের সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে শান্তিবাবু আবার, মশার মত সরু গলায় বললেন, ‘ছুঁচ দিয়ে শুরু, ফাল দিয়ে শেষ। হাতেখড়ি দিয়ে শুরু হয়েছিল, হাতেকড়ি পরিয়ে তোমায় বরণ করে অন্তঃপুরে নিয়ে যাওয়া হবে—বিলম্ব বেশি নেই।’

আমি নিজের কানকে যেন বিশ্বাসই করতে পারলাম না।

গল্পটা শেষ করার দায়িত্ব লেখক হিসেবে আমার, তাই এই হরীতকী বাগানের এপিসোডের পরেও আরও কয়েক ছত্র যোগ করতেই হল।
বুলবুলি সেনের আসল নাম বন্দনা সেন। বছরখানেক আগে, তখনো সে নীলরতন সরকার হাসপাতালে স্টাফ নার্স, এসেছিল কুশারীর নার্সিং হোমে রোগিণী হিসেবে। এই নার্সিং হোমের একটা গোপন সুনাম ছিল। তাই বন্দনা অ্যাবর্সন করাতে ওইখানেই এসেছিল। কিন্তু কুশারীর হাত থেকে ফিরে যেতে আর পারে নি। চেহারায় বেঁটেখাটো রোগাপটকা মানুষ হলে কি হবে, ডাক্তার স্বভাবে ছিলেন বঁড়শির মতই, মজবুত রকমে বাঁকা এবং তীক্ষ্ণ। ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার হতে হল তাকে। সেই থেকে ফিজিক্যাল এক্সপ্লয়টেশান, এবং নিয়মিত যাতায়াত। হাসপাতালের কাজ ছেড়ে দিয়েছিল বন্দনা, নাম পাল্টিয়ে বুলবুলি হয়েছিল, এবং পেশাদারী মঞ্চে নেমে নামও করেছিল।

দিন চলছিল এইভাবে, কিন্তু মনে সুখ ছিল না বুলবুলির। অপমানের জ্বালা এবং ঘৃণা জিঘাংসার বাষ্প রূপ নিত মনের মধ্যে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজে দানা বাঁধতো না। এমন সময় হঠাৎ করে বারো-ইয়ারী দলের সঙ্গে তার কনট্রাক্ট হয় এবং সুদর্শণ শিল্পী তরুণ কুশারীর সঙ্গে প্রণয়ের পর্ব শুরু হয়ে যায়। গোল বাধলে এইখান থেকেই। বুলবুলির সঙ্গে গুপ্তপ্রণয় কথা জানতে পেরে গেলেন ডাক্তার, রীতিমত শাসিয়ে দিলেন এবং অবিলম্বে বারো ইয়ারীর কনট্রাক্ট নাকচ করতে নির্দেশ দিলেন।

ধৈর্যের শেষ সীমায় এসে পৌছেছিল বুলবুলি। জীবনে অনেক ঠেকে ঠকে বা খেয়ে শক্ত হয়ে ওঠা মেয়ে সে। বুঝেছিল ডাক্তার বেঁচে থাকতে তার আর নিস্তার নেই। অথচ মনেপ্রাণে সে তখন ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছিল, এবং সে স্বপ্ন ডাক্তারের ভাইপোকে নিয়েই। এই রকম মানসিক অবস্থায় সেদিন সিঁথির ফ্ল্যাটে এসেছিল সে, অবশ্য তখনো হত্যার কোন পরিকল্পনা তার মাথায় ছিল না। মাথায় এল, ডাক্তারের সদ্য পাওয়া চিঠিখানা দেখে। সেই চিঠিতে হত্যার ভয় দেখানো হয়েছিল এবং ডাক্তার রীতিমত ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বুলবুলির পরামর্শও চেয়েছিলেন। সিগারেট টানতে টানতে বুলবুলি চিন্তা করছিল, তবে সে চিন্তা ডাক্তারের বাঁচার উপায় খুঁজতে নয়! মৃত্যুটাকে কিভাবে বারোয়ায়ী রূপ দেওয়া যায় তারই দ্রুত খসড়া তৈরি করছিল সে মনে মনে।

তারপর বুলবুলির পরামর্শ মত লালবাজারে টেলিফোন করায় পর যখন বরানগর থানার নম্বর ডায়াল করতে পিছু ফিরে ঝুঁকেছিলেন ডাক্তার কুশারী, ঠিক তখনই স্টিলের ভাণ্ডার প্রচণ্ড আঘাতে তাঁকে ধরাশায়ী করে ফেলে বুলবুলি। মাত্র তেতাল্লিশ কেজি ওজনের দেহটাকে ফ্ল্যাটের বাইরে টেনে নিয়ে যেতে বুলবুলির মত বলিষ্ঠদেহ মেয়ের খুব অসুবিধে হয় নি। পরবর্তী কার্যক্রম আপনার আগেই শুনেছেন। শুধু ক্লু সম্বন্ধে একটু বলা দরকার।

শান্তিবাবু প্রথম ক্লু পেয়েছিলেন ডাক্তারের বুক পকেটে। আলিঙ্গন কালে খসে পড়া কপালের টিপ। দ্বিতীয় ক্লু শাঁখের আংটি কোন পুরুষের আঙুলের নয় বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। তৃতীয় সঙ্কেত লিপস্টিক আঁকা সিগারেট-টুকরো। চতুর্থ পয়েন্ট বুলবুলির অ্যালিবির বিরুদ্ধে একটি মারাত্মক সূত্র। হত্যাকালে তিনি স্টেজে অভিনয় চালাচ্ছিলেন একথা সত্যি নয়, এক্সট্রা অভিনেত্রী সে সময় প্রক্সি দিচ্ছিল। থার্ড অ্যাক্টে অবশ্য বুলবুলি স্টেজে নেমেছিল। মেয়েরা সত্যিই বড় অ্যাকট্রেস। কোল্ড ব্লাডের ক্রীচার তারা, স্বভাবতই নার্ভ শক্ত হয়। ডাক্তারের হত্যার কথা ভাইপোকে পর্যন্ত সে ঘুণাক্ষরে জানতে দেয় নি। কিন্তু শান্তিবাবুর নাতনী দৈবক্রমে সে-রাতে ওই থিয়েটার দেখতে গিয়েছিল। মজা করে সে নায়িকা বদলের গোঁজামিলের কাহিনী বলছিল, শান্তিবাবু শুনতে পেয়ে গিয়ে অনুসন্ধান করেন। থিয়েটার হল থেকে ফটোগ্রাফ নিয়ে তিনি নার্সিং হোমের কেরানীর কাছে খোঁজ করেন। ফলে নীলরতনের চাকরির ইতিহাস ইস্তক বেরিয়ে পড়ে।

অনুমানগুলোকে জুড়ে একটা সম্পূর্ণ কেসহিস্ট্রি তখন স্বভাবতই তৈরি হয়ে যায়। আমার গল্প এবং নটেগাছও এইখানেই খতম।

‘রোমাঞ্চ’ পত্রিকার ‘শারদীয়া ১৯৮৯’ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এই নভেলেটটি। ‘ধুলোখেলা’র সৌজন্যে লেখাটি এবারের সংখ্যায় পাঠকের সামনে আবার নিয়ে এল ‘পরবাসিয়া পাঁচালী’।

পাঠকেরা যা পড়ছেন