নগণ্যের মৃত্যু - প্রমিত নন্দী

তার নাম ছিল দাশু।

অন্তত আমি কারো মুখে দাশু ছাড়া তার অন্য কোনো নাম শুনিনি। হয়তো তার পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল দশরথ কিংবা পদবী ছিল দাশ, সেটাই হয়তো লোকমুখে দাশু হয়ে গিয়েছিল। কিংবা হয়তো এর কোনোটাই নয়, অন্য কোনো কারণে সবার কাছে রাতারাতি সে দাশু হয়ে গিয়েছিল। আসলে পঞ্চাশোর্ধ জীবনে কুড়িয়ে পাওয়া বহু জিনিসের মত নাম জিনিসটাও তার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। তাই আমিও কোনোদিন জানতে চাইনি তার নামের উৎস। দাশুর পরিচয় সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানীরা বলবেন, সে ‘একজন মানুষ যে ঈশ্বর, মনুষ্যত্ব, এমনকি নিজের ওপরেও সবরকমের বিশ্বাস হারিয়ে মদ-গাঁজার নেশায় সব কিছু ভুলে থাকতে চায়।’ আর সমাজের চোখে সে একজন নেশাখোর ভবঘুরে মাতাল। সাধারণ মানুষের কাছে তার তাচ্ছিল্য ছাড়া আর কিছুই প্রাপ্য নয়।

ডিসেম্বরের এক কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে সে যখন আমার অফিসে এল, তখন ঘড়ির কাঁটা দশটাও ছোঁয়নি। সে এককালে চন্দননগরের কাছে ওকালতি করেছে। তার রুক্ষ হাড় জিরজিরে চেহারায় এখনো সেই বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষাদীক্ষার ছাপ স্পষ্ট। এমনকি পেটে মদ না থাকলে তার ভাবভঙ্গীর মধ্যে সেই সময়ের আদবকায়দা চোখে পড়ে। আমার সঙ্গে তার আলাপ প্রায় দশ বছর আগে—আমি তখন সুজিত নামে এক সাব ইন্সপেক্টরের সঙ্গে গভীর রাতে উত্তর কলকাতায় টহল দিতে বেরোতাম। কোন্ ভাগ্যবিপর্যয়ে চন্দননগরের সম্মানজনক ওকালতি ফেলে উত্তর কলকাতার রাস্তায় ঠাঁই নিয়েছে, সেটা সে আমায় কোনোদিন বলেনি, আর আমিও কোনোদিন তাকে জিজ্ঞেস করিনি।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে সন্ত্রস্তভাবে তার রোঁয়া ওঠা মাফলারটা গলা থেকে খুলছিল আর জড়াচ্ছিল। তার পরণে তালি দেওয়া একটা কালো শার্ট আর গোড়ালির কাছে ছেঁড়া ময়লা একটা প্যান্ট, যেটা কোনো এক দূর অতীতে বাদামী ছিল। তার চোখে একটা আবছা নীল ঘোলাটে ভাব, যা রাতের পর রাত বহু বোতল দিশি মদের সঙ্গে কাটানোর সাক্ষ্য বহন করছে। তবে আজ সকালে তাকে মাতাল বলে মনে হলো না—বরং তার গলায় এক শীতল যন্ত্রণাক্লিষ্ট শান্ত ভাব খেয়াল করলাম।

আমি বললাম, “আরে দাশু যে, অনেকদিন পর।”

“হ্যাঁ, দাদা, অনেকদিন পর,” সে নীচুগলায় সম্মতি জানাল।

“তা কফি খাবে নাকি?”

“না, না, ধন্যবাদ।”

ফাইলিং ক্যাবিনেটের ওপর আমার ইলেকট্রিক কেটলিটা থাকে। শীতকালে কফি কিংবা গরমকালে চা, যেকোনো একটার জন্য ওটা কাজে লেগেই যায়। একটু আগেই বানানো গরম কফির খানিকটা কাপে ঢেলে নিয়ে বললাম, “বলো, আমি কিভাবে তোমায় সাহায্য করতে পারি?”

সে গলা খাঁকরাল। তার ঠোঁটগুলো নড়ে উঠল। যেন সে কিছু মনে করে বলতে চেষ্টা করছে। কিন্তু তারপরেই মনে হল—সে তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছে। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে দরজার দিকে প্রায় ঘুরে গিয়ে বলল, “আমার বোধহয় এখানে আসাটা ঠিক হয়নি…” মেঝের দিকে মুখ নামিয়ে বলল, “আমি এখন আসি বুঝলেন…”

“আরে দাঁড়াও না! কী ব্যাপার বলো তো?”

“চসার”, সে বলল, “চসারের কথা বলার ছিল।”

নামটা আমি চিনতে পারলাম। চসার উত্তর কলকাতার আর এক ভবঘুরে বাসিন্দা। দাশুর মতই চসার একজন শিক্ষিত মানুষ, যে সব খুইয়েছে কোনোকালে, কোনোস্থানে, কোনোভাবে। সে একসময় মালদা বা মুশির্দাবাদের কোনো কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিল, আর সে জন্যই সবাই তাকে এ নামে ডাকে। দাশু ও চসার দুজনেই শ্যামবাজার এলাকায় রাস্তার ধারে ঝুপড়িতে থাকে। সে সুবাদে তাদের অনেকদিনের বন্ধুত্ব।

আমি বললাম, “কী হয়েছে তার?”

“সে মারা গেছে,” দাশু নিষ্প্রভভাবে বলল, “আমি কিছুক্ষণ আগে খবরটা পেলাম। আজ ভোরবেলা এসপ্ল্যানেড মেট্রোর কাছে এক গলিতে পুলিশ ওর লাশ খুঁজে পেয়েছে। ওকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে।”

“হে ভগবান! জানা গেছে কে খুন করেছে?”

দাশু মাথা নাড়ল। “তবে কেন ওকে খুন হতে হল সেটা হয়তো আমি জানি।”

“তুমি পুলিশের কাছে গেছ?”

অবশ্য প্রশ্নটা না করলেও চলত। কারণ উত্তরটা আমার জানা। কলকাতার ভবঘুরে বাসিন্দারা অলিখিতভাবে যে নিয়মগুলো মেনে চলে তার মধ্যে একটা হল আইনি ব্যাপারস্যাপার থেকে শত হস্ত দূরে থাকা—এমনকি যখন তাদের নিজেদের কেউ খুন হয়ে যায় তখনও। তা সত্ত্বেও আমি বললাম, “তুমি যদি চসারের খুনের ব্যাপারে কিছু জানো তাহলে সেটা সরাসরি পুলিশের কাছে খুলে বলাই ভালো।”

“তাতে কি লাভ হবে কোনো? পুলিশ চসারের ব্যাপারে মাথা ঘামবে কেন? ও তো একটা নেশাখোর ভবঘুরে মাতাল। আমাদের মতো নগণ্য কেউ মারা গেলে ওদের কি যায় আসে কোনো?”

“কেউ কেউ যে এরকম মনে করে, সেটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু সবাই তো এক নয়।”

“সংখ্যাটা কম নয়,” সে বলল, “হয়তো বেশিরভাগই।”

“আচ্ছা, তাহলে তুমি আমার কাছে কেন এলে? আমি তো এককালে পুলিশে ছিলাম, আর এখনো বলতে গেলে পুলিশের কাজই করছি। যদি তোমার মনে হয় পুলিশের কোনো মাথা ব্যথা নেই, তাহলে তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি এ ব্যাপারে নাক গলাব?”

“জানি না,” সে বলল, “আপনি সবসময় আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। আর আপনি তো এখন আর পুলিশের চাকরি করেন না। তাই আমি ভাবলাম… যাই হোক হয়তো আমি চলে গেলেই ভালো।”

“সেটা তোমার হাতে।”

সে ইতস্তত করল। বুঝতে পারলাম তার মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব কাজ করছে—তার প্রায়বিস্মৃত কর্তব্যবোধ আর ভবঘুরে জীবনে বেদবাক্য মেনে চলা নীতিগুলোর মধ্যে। শেষমেশ চসারের সঙ্গে তার দীর্ঘ সময়ের বন্ধুত্ব তার ভিতরের কর্তব্যবোধকে জিতিয়ে দিল। সে ভারী পায়ে এগিয়ে এসে মক্কেলদের জন্য রাখা একটা চেয়ারে বসল। মাফলারটা খুলে কোলের ওপর রেখে শিরাসর্বস্ব হাতের পিঠের দিকে চেয়ে রইল।

“তবে আমি আপনাকে কিছু দিতে পারব না, জানেন তো,” সে বলল।

“সেটা নিয়ে ভেবো না। দেখো তুমি আমায় যা বলবে সেটা পুলিশের কাছে পৌঁছে দেব, আর খেয়াল রাখব যেন সেটা কোনো উপযুক্ত লোকের হাতেই পৌঁছোয়। এমনিতেও এর বেশি তো আমি কিছু করতে পারব না।”

শুনে সে একটা লম্বা শ্বাস নিলো। তারপর একবার কাশল। লক্ষ্য করলাম, এই শীতকালেও তার কপালে ঘাম জমেছে। হাতের চেটো দিয়ে সে ঘাম মুছল। তারপর বেশ নীচু গলায়, প্রায় একঘেয়েভাবে সে বলতে শুরু করল। “তিন সপ্তাহ আগের কথা, রাজাবাজারের কাছে একটা বাড়ির দেওয়ালে ঠেস দিয়ে আমি আর চসার এক বোতল দিশি মদ গিলছিলাম। রাত বেশ গভীর হওয়ায় রাস্তায় গাড়ি খুব একটা চলাচল করছিল না। আচ্ছা, কমলা বুড়িকে আপনি চেনেন নাকি?”

আমি মাথা নাড়লাম।

“আমার ঝুপড়ির কাছেই থাকে। রাস্তায় পড়ে থাকা কাগজ কুড়োনোর কাজ করে। রাজাবাজারের মোড়ে সে রাস্তা পার হবে বলে দাঁড়িয়ে ছিল। সিগন্যাল লাল হওয়ার অপেক্ষা করছিল। সেটা হতেই সে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নেমেছিল। সে যখন প্রায় রাস্তার মাঝখানে, তখন একটা গাড়ি আচমকা এসে তাকে ধাক্কা দেয়। কেশব সেন স্ট্রিট দিয়ে গাড়িটা ঝড়ের বেগে আসছিল, লাল বাতিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে। গাড়ির ধাক্কায় বুড়ি ত্রিশ ফুট দূরে একটা বাড়ির দেওয়ালে আছড়ে পড়ে। আমি বা চসার চেঁচিয়ে ওঠার সময়টুকুও পাইনি। গাড়িটা ধাক্কা মেরে খানিকক্ষণের জন্য গতি কমিয়েছিল, তারপর আবার গতি বাড়িয়ে দীনেন্দ্র স্ট্রিটে ঢুকে পড়ে। বুড়ি যেভাবে দেওয়ালে আছড়ে পড়েছিল, তাতে এটুকু বুঝেছিলাম আমাদের কিছু করার নেই। তাই পুলিশ আসার আগেই আমরা সেখান থেকে কেটে পড়ি।”

সেই আইন বা আইনের রক্ষকের থেকে শত হস্ত দূরে থাকার নীতি। দাশু মুখে হাত ঘসল। যেন সেদিনের বিশদ বিবরণ মুহূর্তের জন্য তার সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে। আমি কিছু না বলে অপেক্ষা করতে লাগলাম। খানিক বাদেই সে আবার বলতে শুরু করল।

“গত সপ্তাহান্তে চসার বাগবাজারের কাছে ভিক্ষা করতে গিয়েছিল। তখন ও দেখতে পায়, গিরিশ ঘোষ স্ট্রিটে ওই খুনে গাড়িটা দাঁড় করানো। গাড়িটা ভালো করে সারাই করেছে। এমনকি নতুন করে রঙ করে সেদিনের কুকীর্তির সব চিহ্ন মুছে ফেলেছে। পরে ও আমায় এসব বলেছিল।”

আমি বললাম, “ও কী করে জানল ওটা একই গাড়ি?”

“কমলা বুড়িকে ধাক্কা মারার পর যখন গাড়িটা গতি কমায় তখন ও লাইসেন্স প্লেটের নম্বরটা পড়ে ফেলেছিল। পেটে দু বোতল দিশি পড়লেও চসারের চোখ ছিল ক্যামেরার মত, জানেন দাদা?”

“তা নম্বরটা ও তোমায় বলেছিল?”

“না,” দাশু বলল, “আমি তো এটাও জানতাম না, ওইদিনই ও কোনোভাবে গাড়ির মালিকের নাম ঠিকানা জোগাড় করেছিল। তবে আমার মনে হয় এরকমই কিছু হয়েছিল। আমি ওকে গতকাল সন্ধ্যার দিকে যখন দেখলাম, তখন ও ভীষণ উত্তেজিত। বলল, ওর নাকি কিছু কাজ আছে। সেটা যদি ঠিকঠাক উতরে যায়, তাহলে একসঙ্গে ফুর্তি করতে যাবে। তারপর আমি আর ওর কোনো দেখা পাইনি।”

“আচ্ছা। তাহলে তোমার মনে হয় ও গাড়ির মালিকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল। তাকে চাপ দিয়ে কিছু টাকাকড়ি হাতানোর তালে ছিল। উল্টে নিজেই খুন হয়ে গেল।”

সে মাথা দোলাল।

“চসার বলেছিল গাড়িটা কোন কোম্পানির?”

“না।”

“বা মালিক কোথায় থাকে?”

“না।”

“ও কী এমন কিছু বলেছিল যা থেকে গাড়িটা বা তার মালিককে শনাক্ত করা যেতে পারে?”

“না,” দাশু বলল, “ও আমাকে যা কিছু বলেছিল, তার সবটাই আপনাকে বললাম।”

আমি সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। দাশু আমার দিকে লোভী দৃষ্টিতে চেয়েছিল। আমি ভাবলাম, হাজার হোক, বেচারা এখানে তো নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে এসেছে তো, তাই না? তার দিকে আধাভর্তি প্যাকেটটা ছুঁড়ে দিলাম। প্রথমে সে লোফার চেষ্টা করল, না ধরতে পারায় প্যাকেটটা মাটিতে পড়ে গেল। তারপর সেটা কুড়িয়ে নিয়ে সে পকেটে পুরল। মুখে কিছু না বললেও তার চোখে মুখে কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল।

“ঠিক আছে,” আমি বললাম, “দেখছি কী করা যায়। কিছু জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে তোমায় জানাব।”

সে উদাসভাবে মাথা দুলিয়ে উঠে দাঁড়াল। চলে যাওয়ার সময় তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, এ কেসের সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা সে দেখছে না।

***

আগে পুলিশের চাকরি করতাম বলে লালবাজারে এখনো কিছু চেনা জানা আছে। সুজিতের কথা মনে আছে কি? সেইদিনের সাব ইন্সপেক্টর এখন কলকাতা পুলিশের বড়সড় পদে আছে। আমি যখন লালবাজারে পৌঁছলাম, তখন সুজিত কিছু লোকের সঙ্গে কথা বলছিল। দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। তাই স্কোয়াড রুমে গিয়ে বসলাম। সদ্য খোলা নতুন প্যাকেটের সিগারেট আর স্কোয়াড রুমের জোলো মিষ্টি চা ধ্বংস করতে করতে বরুণ নামে একজন ইন্সপেক্টরের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আড্ডা মারতে লাগলাম। আধ ঘন্টা বাদে, সুজিতের ঘর থেকে তিনজন ভীষণ গম্ভীর স্যুট বুট পরা লোক বেরিয়ে গেল, তাদের মধ্যে দুজনের হাতে আবার ব্রিফকেস। প্যারেড ফিল্ডে আর্মির লোকদের মতো তারা একযোগে সুন্দর কুচকাওয়াজ করে বেরিয়ে গেল।

বরুণ ইন্টারকমে আমার আগমনবার্তা জানিয়ে দিয়েছিল। তবে আরো মিনিট পাঁচেক পর আমার ডাক এল। ঘরে ঢুকে দেখি, সদ্য ধরানো সিগারেট হাতে সে খুব মনোযোগ দিয়ে একটা ফাইল পড়ছে। ছাইদানিতে অন্যমনষ্কভাবে সিগারেটের ছাই ফেলতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই ছাইয়ের গুঁড়ো কাগজপত্রের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে নোংরা করে দিচ্ছিল। আমায় ঢুকতে দেখে সামনের চেয়ারে বসতে বলল সে। খানিক বাদে মুখ না তুলেই বলল, “তা তোমার কী চাই ঝটপট বলে ফেলো দেখি।”

“যদি বলি তোমার মহামূল্যবান সময় থেকে পাঁচটা মিনিট?”

“তিনজন লোককে দেখলে, যারা এখুনি বেরিয়ে গেল?”

“তা দেখলাম বৈকি।”

“তারা স্টেট অ্যাডভোকেট জেনারেলের অফিস থেকে এখানে এসেছিল। গত এক সপ্তাহ ধরে একটা বিশেষ কাজে তারা ক্রমাগত আমায় চাপ দিয়েই চলেছে। আমি দু’দিন হল সুমনাকে দেখিনি, গতকাল রাত এগারোটার পর থেকে পেটে একটা দানা-পানিও পড়েনি। এদিকে ঠাণ্ডা লেগে দাঁতের গোড়া ফুলে গিয়েছে। কাজেই তুমি যে কাজেই এসে থাকো, পাঁচ মিনিট কেন, এক সেকেন্ড তার পিছনে নষ্ট করা সম্ভব নয়।”

আমি বললাম, “বেশ, ঠিক আছে, সুজিত। তবে কাল রাতে যে খুনটা হয়েছে সেটা নিয়েই কিছু বলার ছিল।”

সে ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কোন খুন?”

“ভবঘুরে একটা লোক, নাম চসার।”

“তুমি সে ব্যাপারে কী জানো?”

“যে ইন্সপেক্টর এই কেসটার দায়িত্বে আছে, তুমি যদি তার নামটা বলো, তাহলে আমি তাকেই পুরো ব্যাপারটা—” আমি উঠে পড়লাম।

“তুমি আমাকেই বলতে পারো,” সে বলল, “বসো।”

আমি বসে পড়লাম। তারপর সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা বের করে ধরালাম।

সুজিত বলল, “তুমি বড্ড বেশী স্মোক করো কিন্তু।”

“একদম ঠিক বলেছ,” আমি বললাম, “তোমার দাশুর কথা মনে পড়ছে? চসারের সঙ্গে এক জায়গায় থাকত?”

“বিলক্ষণ চিনি বটে।”

“সে আজ সকালে আমার কাছে এসেছিল,” বলে দাশু আমায় যা বলেছিল, তার পুরোটা তাকে জানালাম।

সুজিত সবটা শোনার পর খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটে টান দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে, বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে, ফিল্টারটা দুঠোঁটের ফাঁক থেকে বের করে, ব্যাজার মুখে সেটা ছাইদানিতে গুঁজতে গুঁজতে বলল, “হুম, কোনো যোগাযোগ থাকতেই পারে, সেটা ঠিকই। তা দাশু নিজে এসে একথা আমাদের জানাল না কেন?”

“এর উত্তর তো তোমার ভালোভাবেই জানা আছে, সুজিত।”

“হুঁ, তা ঠিক।” সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি খানিক আগেই প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্ট দেখছিলাম, ওই জোকারগুলো আসার আগে। আমি চসারের নামটা চিনতে পেরেছিলাম। তবে বিশেষ কিছুই জানা যায়নি।”

“দাশু বলল ওকে নাকি পিটিয়ে খুন করা হয়েছে।”

“ঠিকই জানো। ল্যাবের ছেলেমেয়েগুলো গলির মধ্যে একটা বিল্ডিংয়ের গায়ে রক্তের দাগ পেয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, তার মাথাটা ফেটে চৌচির না হওয়া অব্দি দেওয়ালের গায়ে বারবার মারা হয়েছে। তার শরীরে ও মুখেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।”

“মোটামুটি কখন খুনটা হয়েছে?”

“পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাত বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে।”

“গলিতে কিছু পাওয়া গেছে কি?”

“কোনো এভিডেন্সের কথা বলছ? না। আর কেউ কিছু দেখেনি বা শোনেনি। ধর্মতলার ওদিকটা আবার রাত বাড়লে কবরখানার মতো শুনশান হয়ে যায়।”

“চসারের পকেটে কিছু পাওয়া গেছে?”

“স্কচের একটা ছোট বোতল, আঠাশশো টাকা, আর কিছু খুচরো কয়েন।”

“সে তো অনেক টাকা। আর মদটাও তো বেশ শৌখিন। অন্তত চসারের মতো ভবঘুরে মাতালের কাছে তো বটেই।”

“হুঁ।”

“দাশুর থিওরিটা তাহলে ঠিকও হতে পারে, কি বলো?”

“হতে পারে। কিন্তু এই হিট অ্যান্ড রানের লোকটা যদি চসারকে খুন করে থাকে, তাহলে আগে খামোকা টাকা দিল কেন?”

“সম্ভবত চসারের পকেটে যা পাওয়া গেছে, তার থেকে অনেক বেশি সে দাবি করেছিল,” আমি বললাম, “লোকটা তাকে তখনকার মত কিছু টাকা দিয়ে বিদেয় করেছিল। কাল রাতে দেখা করে বাকি পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।”

“আর তার সব কিছুর সাধ চিরকালের মতো মিটিয়ে দিল,” সুজিত বলল, “হ্যাঁ, এরকম হতেই পারে।”

“দেখো, সুজিত, যদি কিছু মনে না করো, আমি নিজে ব্যাপারটা নিয়ে একটু নাড়াঘাঁটা করে দেখতে চাই।”

“আমি তো ভাবছিলাম তুমি কখন কথাটা পাড়বে। চসারের মৃত্যু নিয়ে তোমার এত আগ্রহ কিসের বলো তো?”

“আমি তোমায় বললাম না, আজকে দাশু আমার কাছে এসেছিল।”

“তোমায় তদন্তের ভার দিতে নিশ্চয়ই নয়। সেটা তুমি বললেও আমি বিশ্বাস করব না।”

“না,” আমি স্বীকার করলাম।

“তাহলে তোমার দক্ষিণা কে দেবে শুনি?”

“হয়তো আমি মাগনায় কাজটা করব। এমনিও আমার হাতে এখন তেমন কোনো কাজ নেই।”

“দাশুর জন্য খারাপ লাগছে তোমার, তাই না?”

“খানিকটা তো বটেই। তুমি কি জানো সে কী মনে করে? সে মনে করে পুলিশের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, চসারের খুনিকে খুঁজে বের করা নিয়ে। চসার তো নগণ্য মাত্র, রাস্তার আর একটা ভবঘুরে। দাশুর কথায়, কার কী আসে যায়, যদি একটা ভবঘুরে মাতালকে কেউ পৃথিবীর বুক থেকে চিরকালের মতো সরিয়ে দেয়!”

সুজিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়াল। “মনে হয় মিনিটদুয়েক সময় বের করতে পারব,” সে বলল, “চলো। ট্রাফিকে যাওয়া যাক। ওরা কী বলে দেখা যাক কমলা বুড়ির হিট অ্যান্ড রানের ব্যাপারে।”

লিফটে করে ট্রাফিক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে নেমে এলাম। সেখানে অতনু নামে একজন ইন্সপেক্টরের সঙ্গে দেখা হলো। হিট অ্যান্ড রানের কেসগুলো সাধারণত সেই দেখভাল করে। অতনু একজন বড়সড়, লম্বাচুলওয়ালা লোক, তার হাতে মুখে অজস্র মেচেতার দাগ। সুজিত তাকে কেসের কথা বললে সে কম্পিউটার ঘেঁটে কেস ফাইল নম্বরটা দেখে নিলো। তারপর অনেকগুলো ফাইল ক্যাবিনেটের মধ্যে একটা হাতড়ে একখানা পাতলা ফোল্ডার বের করল। সে তার ডেস্কের ওপর সব কাগজ আর ছবি ছড়িয়ে রাখল। তার বারবার চোখ কুঁচকে তাকানো দেখে মনে হল, অবিলম্বে চশমার প্রয়োজন। হয় সে চশমার ব্যাপারে ভীষণ একগুঁয়ে না হয় নিজের দৃষ্টিশক্তির ব্যাপারে ভীষণ অহংকারী, তাই চশমার প্রয়োজনটা স্বীকার করে না।

সে গড়গড়িয়ে বলে গেল, “মহিলার নাম কমলা মন্ডল, তেষট্টি বছর বয়স, তিন সপ্তাহ আগে রাজাবাজারের মোড়ে হিট অ্যান্ড রান। স্পট ডেড। এই কেসটার কথাই বলছেন?”

“ওটাই,” সুজিত বলল।

“আমরা প্রায় কিছুই জানতে পারিনি,” অতনু বলল, “মোটামুটি সাড়ে বারোটার সময় ঘটনাটা হয়। ফলে কোনো সাক্ষীও ছিল না।”

“না, ছিল সাক্ষী,” আমি বললাম, “তাও আবার দুজন।”

“তাই?”

আমি তাকে জানালাম দাশু আমায় যা বলেছিল। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “ঘটনাস্থলে কোনো ভাঙা কাঁচের টুকরো পাওয়া গেছে?”

“হ্যাঁ। সম্ভবত কোনো একটা হেডলাইটের। তবে সেটা থেকে কোন কোম্পানির গাড়ি সেটা জানার উপায় নেই।”

“কোনো রঙের দাগ?”

“হুঁ। ঘন সবুজ। অনেক জঙ্গলের মতো। রংটা একটু অন্যরকম হলেও একদম রেয়ার নয়। মারুতি থেকে টয়োটা—অনেক গাড়িতেই সেই রং দেখা যায়। কোন সালে তৈরী সেটাও জানার উপায় নেই। আবার কেউ যদি শখে রং করিয়ে থাকে তাহলে তো কথাই নেই।”

“গাড়ির ফেন্ডার বা গ্রিল থেকে ঝরে পড়া কোনো ধুলো-কাদা জাতীয় কিছু পাওয়া গেছে?”

অতনু মাথা দোলাল। “ল্যাবে কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করে দেখা হয়েছে, অফ কোর্স। রাস্তার সাধারণ ধুলো-কাদা, অল্প খানিকটা বালি, সাধারণ নুড়ি-কাঁকর, আর টুকটাক কিছু। কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নেই যা দিয়ে তদন্তের কাজ এগোনো যায়।”

সুজিত জানতে চাইল, “আর কিছু?”

“আর কিছু কাঠের গুঁড়ো,” অতনু বলল।

“কাঠের গুঁড়ো?”

“কিছুটা কাঠের মিহি গুঁড়ো পাওয়া গেছে ঘটনাস্থলের কাছেই। সাদা পাইন, সেগুন, চন্দন কাঠ। এর থেকে আপনারা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন কি? আমরা পারিনি।”

আমি আর সুজিত দুজনেই মাথা নাড়লাম।

“কলকাতার সমস্ত কার রিপেয়ারিং অ্যান্ড সার্ভিসিংয়ের দোকান আর গ্যারাজে আমরা খবর নিয়েছিলাম,” অতনু বলল, “স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর। সবুজ রংয়ের হন্ডা আর টয়োটার গাড়ির খবর পাওয়া গেছিল। একটা গাড়ি পার্কিং লট থেকে বেরোনোর সময় অন্য গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে পেছনে তুবড়ে গেছিল। আর একটার বাঁ দিকের দরজাটা টোল খেয়েছিল। আমরা দুটো গাড়িরই অ্যাক্সিডেন্ট রিপোর্ট দেখেছি। সন্দেহ করার কিচ্ছু নেই। আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।” সে দু হাত ছড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকাল, “ডেড এন্ড।”

আমরা অতনুকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিফটের দিকে এগোলাম। সুজিত ওপরে ওঠার বোতাম টিপে বলল, “আমি এখনই আর এর পেছনে সময় দিতে পারব না। তুমি চাইলে বিষয়টা খতিয়ে দেখতে পারো। তবে কিছু জানতে পারলে অবশ্যই আমায় ফোন করতে ভুলো না।”

“তুমি তো জানোই এর অন্যথা হবে না।”

“হ্যাঁ,” সে বলল, “তাও আর একবার মনে করিয়ে দিলে ক্ষতি তো নেই।”

লিফটের দরজা খুলে গেল। সে ভিতরে ঢুকে চার তলার বোতাম টিপল। আমি লবি পার হয়ে লালবাজার স্ট্রিটে বেরিয়ে পড়লাম। সকাল থেকেই সূর্যের দেখা মেলেনি খুব একটা। তাই কুয়াশা এখনো ভালো করে কাটেনি। জোরে হাওয়া দিচ্ছিল। ফলে শহর জুড়ে ঠাণ্ডাটাও জাঁকিয়ে পড়েছে আজ। জ্যাকেটের চেনটা গলা অব্দি টেনে, আমার পার্ক করা গাড়িটার দিকে এগোলাম।

কিছুক্ষণ গাড়ির ইঞ্জিন চালু না করে খালি হিটার চালিয়ে বসে রইলাম। ভাবতে লাগলাম এরপর কী করা উচিত। দাশু বলেছিল, সে চসারকে শেষ দেখেছিল গতকাল দুপুরবেলা, সম্ভবত শ্যামবাজার চত্বর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগেই। আর সুজিত বলছিল, রিপোর্ট অনুযায়ী, চসার মারা গেছে বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে। তাহলে তার জীবনের শেষ বারো ঘন্টার কোনো হদিস মিলছে না। এদিকে চসারের পকেটে বেশ কিছু টাকা পাওয়া গেছে। তার মানে এই টাকাটা খুন হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই তার কাছে ছিল। আমি চসারকে যতটুকু চিনি, সে নিশ্চয়ই এর মধ্যে ওই টাকাটা নিয়ে শ্যামবাজার এলাকায় ফিরে এসেছিল, তবে হয়তো কোনোভাবে দাশুর সঙ্গে তার দেখা হয়নি। যদি তাই হয়, তাহলে এই এলাকারই অন্য কোনো মাতাল বা ভবঘুরে তাকে দেখে থাকতে পারে।

মিনিট পনেরোর মধ্যে শ্যামবাজার পৌঁছলাম। বাটার পাশের গলিতে গাড়িটা রেখে বেরিয়ে পড়লাম। কারণ জিজ্ঞাসাবাদের কাজে বারবার গাড়ি থামাতে হবে। তার চেয়ে একটা জায়গায় রেখে হেঁটে যাওয়াই ভালো। তাছাড়া গাড়ি থেকে নামলে লোকেরা একটু সন্ত্রস্ত বোধ করতে পারে যা আমার তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। শ্যামবাজারে পাঁচ মাথার মোড়ে নেতাজির মূর্তির পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম, কোথা থেকে শুরু করলে ভালো হয়। নেতাজিকে পাঁচ দিক থেকে ঘিরে রয়েছে পাঁচটা রাস্তা, সম্ভাবনা অসংখ্য। সদুত্তরের খোঁজে হেদো, মানিকতলা, দেশবন্ধু পার্ক, পাইকপাড়া, বাগবাজার চষে ফেললাম পরবর্তী চার-পাঁচ ঘণ্টায়।

দুপুরবেলা প্রাণহীন মদের দোকানের টেবিলে টেবিলে গেলাসটা বোতলটা চাটটা এগিয়ে দেয় যে নিস্তেজ শীতল চোখের ছেলেগুলো, ফুটপাথে আধশুকনো ফুলের পাহাড় নিয়ে বসে থাকা তামাটে, সাদাটে কিংবা ফ্যাকাশে চামড়ার ফুলওয়ালি, দুপুরের খাওয়া সেরে ভাতঘুম দেওয়ার তালে থাকা আধা ঘুমন্ত দোকানদার, ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত নিয়ে কান-এঁটো-করা হাসি মুখে পান-সিগারেটের দোকানদার, মদের দোকানের হিসাবরক্ষক যারা মুখ ব্যাজার করে গুনে গুনে প্রতিটি নয়া পয়সা ফেরত দেয়, সোনাগাছির হিন্দি সিনেমার লাস্য থেকে লাস্যতর নামের বেশ্যা, মদের দোকানের ভেতরে ও বাইরে জট পাকিয়ে পড়ে থাকা মাতালের দল, মাঝ রাস্তার ট্রাফিক পুলিশ থেকে বড় বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি গার্ড সবার সঙ্গেই কথা বললাম।

কিন্তু নিট ফল শূন্য।

যখন আবার বাটার সামনে এসে দাঁড়ালাম তখন আমি ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলাম। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল, পায়েও ব্যথা। একবার ভাবলাম, গাড়িটা কাছেই রয়েছে, অফিসেই ফিরে যাই। কিন্তু তখনই হাল ছাড়ার ইচ্ছে ছিল না। খালি মনে পড়ছিল দাশুর কথাগুলো, আর ও যেভাবে আশাহতের মতো আমার অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাই আমি এগিয়ে গেলাম আর একটা মদের দোকানের দিকে।

সন্ধ্যে হতে তখনও ঢের দেরী বলে ভিড় শুরু হয়নি। টুলের ওপর একটা লোক বসেছিল যাকে দেখে মনে হচ্ছিল, ছাই রঙে তাকে চোবানো হয়েছে—নোংরা তামাটে ছাই চুল, আবছা ঘোলাটে ছাই রঙের চোখ, ফ্যাকাশে ছাই রঙের শিরা উপশিরা দৃশ্যমান হাত, ধুলোমাখা ছাই রঙের জ্যাকেট যেটা বোধহয় বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন নতুন ছিল। তার নাম স্বপনবুড়ো, সে অনেকদিন ধরেই দাশু আর চসারের সঙ্গে ভবঘুরের জীবন কাটাচ্ছে। ও যখন কথা বলে, মনে হয় যেন কোনো স্বপ্নের ঘোরে আছে। সে জন্য লোকে তার এই নাম দিয়েছে। তার কাছে গিয়ে বললাম আমি কী জন্য এসেছি, আর সে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করলাম যেগুলো আজকে হয়ত একশবার করেছি।

সে নামের সঙ্গে মানানসই স্বপ্নালু গলায় বলতে শুরু করল, “কালকে চসারকে দেখেছিলাম বটে। ভাবা যায় না ওর যা হলো… সত্যি ভাবা যায় না।”

“কখন দেখেছিলে, স্বপন?”

“ছটার দিকে। সে তখন স্টারের কাছে একটা বাস থেকে নামছিল।”

“চসার… বাসে? কোন রুটের বাস?”

সে কাঁধ ঝাঁকাল। “কে জানে?”

“একটু ভাবো, স্বপন। মিনি বাস? সরকারী নাকি বেসরকারী?”

“হাওড়া,” স্বপনবুড়ো বলল, “হ্যাঁ, ও বলছিল হাওড়া থেকে আসছে।”

আমি বললাম, “সে ওখানে কী করছিল তোমায় কিছু বলেছিল?”

“নাহ।” স্বপনবুড়ো ফোকলা দাঁত বের করে একগাল হাসল, “আমরা তারপর ফুর্তি করলাম,” সে বলল, “স্কচ। বুড়ো স্বপনের হাতে এক গেলাস ভর্তি স্কচ! ভাবতে পারেন?”

“চসার কিনে দিয়েছিল?”

“ও একগোছা টাকার বাণ্ডিল নিয়ে ঘুরছিল। আমরা স্কচ কিনে নিয়ে সামবাজারে আমার ঝুপড়িতে ফিরে এলাম।”

“সে কোথা থেকে ওই টাকা পেয়েছিল?”

“চসার ভীষণ মজাদার লোক ছিল, জানেন তো? অত বড় বড় সব ডিগ্রি থাকলে কি হবে, মজা করার সুযোগ পেলে কিছুতেই ছাড়ত না। আমি জিগ্যেস করলাম, কোথায় পেলে ও টাকা? কাকে ছিনতাই করে এলে? শুনে সে হো হো করে হেসে বলল, ওকে নাকি রবিন হুড টাকাটা দিয়েছে।”

“রবিন হুড?”

“ও তো তাই বলেছিল।”

“আর কিছু বলেনি?”

“নাহ। এইটুকুই।”

“গত রাতে তোমার ঝুপড়ি থেকে ও কখন বেরিয়েছিল?”

“কে জানে!” স্বপনবুড়ো বলল, “গেলাস ভর্তি আসলি স্কচ নিয়ে বসলে কেই বা কার খবর রাখে বলুন?”

“তুমি জানতে ও কোথায় যাচ্ছিল?”

“রবিন হুডের সঙ্গে দেখা করতে।”

“ও তোমাকে তাই বলেছিল?”

“ও ভীষণ মজাদার লোক ছিল, জানেনই তো! ভীষণ মজাদার লোক…”

“হ্যাঁ।”

“বুড়ো চসার বড় ভালো লোক ছিল,” স্বপনবুড়ো স্বপ্নালুভাবে বলল, “জিভে এখনো যেন সেই স্কচ লেগে আছে।”

আমি ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বাটার দিকে হাঁটতে হাঁটতে রবিন হুডের কথা ভাবছিলাম। এর কোনো মানে থাকতে পারে, আবার নাও পারে। ঠিক যেমন অতনুর কাঠের গুঁড়োর কোনো মানে থাকতে পারে, আবার নাও পারে। আমি খালি একটা জিনিসই নিশ্চিতভাবে জানতে পারলাম, গতকাল চসার হাওড়া গিয়েছিল। কিন্তু হাওড়ার কোথায়, সেটা জানা না গেলে এ তথ্যেরও কোনো দাম নেই।

আমি গাড়ি চালিয়ে ধর্মতলায় এলাম। একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে কিছু খাবার অর্ডার দিলাম। কিন্তু কিছুই মুখে রুচল না। তবে রাঁধুনির কোনো কসুর নেই তাতে। আসলে মনটা বেশ ভারী লাগছিল। আগে যখন রাতে শ্যামবাজার চত্বরে টহল দিতে যেতাম, তখন মাঝে মাঝে এরকম লাগত। মনে হচ্ছিল, দাশুর জন্য কিছুই করতে পারব না। একটাও কাজে লাগানোর মতো সূত্র পেলাম না, যেটা চসারের খুনীকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে।

যখন স্ট্রান্ড রোডে আমার অফিসে ফিরলাম, তখন লেটারবক্সে একটা চিঠি পেলাম। সেটা হাতে করে উপরে উঠে গেলাম। ঘরে ঢুকে রুম হিটারটা চালিয়ে দিলাম—ঘরটা শীতকালে ভীষণ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তারপর বসে চিঠিটা খুললাম। একটা সাময়িকপত্রের তরফ থেকে আসা আরেকটা বিল। কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে কোনো এক হরিণী নয়নের বঙ্গললনার কথায় ভুলে গ্রাহক হয়ে গিয়েছিলাম, যদিও আজ অব্দি একটা সংখ্যাও ভাগ্যে জোটেনি। তবে সময়মত বিলগুলো ঠিকই চলে আসে। কম্পিউটারে সুন্দরভাবে টাইপ করা বিলের নীচে লেখা, “আপনি যদি বিলের টাকা না দেন তাহলে আমরা আইনের রাস্তা নিতে বাধ্য হব। যার ফলে আপনার ক্রেডিট রেটিং খারাপ হয়ে যাবে। তাই আজই বিলের টাকা মিটিয়ে দিন!”

আমি বিল আর খাম দুটোই দুমড়ে মুচড়ে ডাস্টবিনে ফেলে চেঁচিয়ে উঠলাম, “শালা! কিসের ক্রেডিট রেটিং?” একটা সিগারেট ধরিয়ে দেওয়ালের দিকে চেয়ে রইলাম, আর হিটারের পাখার শব্দ এক মনে শুনতে লাগলাম। ঘরটা আস্তে আস্তে গরম হচ্ছিল।

রবিন হুড, মাথায় ঘুরছিল।

কাঠের গুঁড়ো।

খানিক বাদে উঠে পড়লাম। ইলেকট্রিক কেটলির ঢাকনি খুলে দেখলাম, সকালের কফির বেশ খানিকটা পড়ে আছে। কিন্তু ওপরে একটা পাতলা সর জমেছে। আবার নতুন করে বানাতে ইচ্ছে করছিল না, তাই সেটাই আবার সুইচ টিপে গরম করতে বসিয়ে দিলাম। মোবাইলে দেখলাম কোনো মিসড কল বা নতুন কোনো মেসেজ আছে কিনা। কিছুই নেই। আমার ডেস্কের একটা ড্রয়ারে সাধারণত কিছু পত্রিকা রাখা থাকে, তারই একটা বের করলাম সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু মন বসল না দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসে। পত্রিকাটা সরিয়ে রেখে আর একটা সিগারেট ধরালাম।

কাঠের গুঁড়ো, মাথায় ঘুরছিল।

রবিন হুড।

আর হাওড়া...

ধুর শালা! ভাবলাম, পুলিশ হয়তো এই তিনের মধ্যে কোনো যোগসূত্র খুঁজে বের করতে পারবে। ঘড়িতে তখন সওয়া পাঁচটা বাজে। আমি ঠিক করলাম, ছটার সময় অফিস থেকে বেরোনোর আগে সুজিতকে ফোন করে বলে দেব কী কী জানতে পেরেছি স্বপনবুড়োর কাছ থেকে। তারপর—ইচ্ছে থাকুক আর না থাকুক, বিষয়টা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেব।

কেটলি জানান দিলো, কফি গরম হয়ে গেছে। কাপে খানিকটা ঢেলে নিয়ে আমি ডেস্কের পেছনে জানলার কাছে এসে দাঁড়ালাম। সারাদিন তেমন রোদ না ওঠায় শহরটা ধূসর আর ঠাণ্ডা মনে হচ্ছিল। আমি স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে তাকালাম, রোজকার মতো অফিসফেরত সময়ের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে। রাস্তায় একগাদা গাড়ি এখনই ট্রাফিক জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে। একটা বিশাল বড় ট্রাক যাওয়া-আসার দুটো লেনই আটকে ফেলেছে। সেটাকে পিছিয়ে এনে একটা গলির মধ্যে ঢোকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্লাইউড শিটভর্তি ট্রাকটা গলির মুখে ঢোকাতে হিমশিম খাচ্ছিল ড্রাইভার।

আমি সেদিকে খানিকক্ষণ দেখলাম। মাথায় তখনো কাঠের গুঁড়ো, রবিন হুড আর হাওড়া ঘুরপাক খাচ্ছিল। আটকে যাওয়া গাড়িদের রাগত হর্নের শব্দ শুনতে শুনতে হঠাৎ বিস্মৃতপ্রায় একটা স্মৃতি মনের অবচেতন থেকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। হাওড়ার একটা জায়গা, যেখানে একবার বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলাম। তাড়াহুড়ো করে কাপটা রাখতে গিয়ে খানিকটা কফি চলকে পড়ে আমার ডেস্ক ভিজিয়ে দিল। ল্যাপটপটা চালিয়ে গুগল খুললাম। একটা জিনিস লিখে সার্চ করলাম। যেটা খুঁজছিলাম, সেটা মিনিট দশেক পর শেষমেশ পেলাম। আমি তখন ভাবছিলাম, স্বপনবুড়ো ঠিকই বলেছিল, ইংরেজি সাহিত্যের প্রাক্তন অধ্যাপক চসার সত্যিই ভীষণ মজাদার লোক ছিল।

আমি মোবাইলটা তুলে সুজিতের নম্বরটা ডায়াল করলাম। সুজিত দুবার বাজার পর ফোনটা তুলল।

“কে চসারকে খুন করেছে সেটা বোধহয় ধরতে পেরেছি,” আমি বললাম, “আমার ধারণা সে হাওড়াতে মন্দিরতলায় একটা কাঠের দোকানে কাজ করে।”

“কোন কাঠের দোকান?”

“দোকানের নাম শের উড ইন্ডাস্ট্রি।”

***

“দোকান মালিকের ছেলেই খুনটা করেছে। নাম সামশের আলী,” সুজিত বলল, “গাড়িটা একটা সবুজ রঙের জিপ, ২০১৫ সালের মডেল, দোকানের কাছেই একটা পার্কিং লটে দাঁড়িয়েছিল, যখন অতনু তোমার কথামতো সেখানে যায়। গাড়িটা সামশেরের নামেই রেজিস্ট্রার্ড। তাই তাকেই প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ছেলেটা নার্ভাস হয়ে গিয়ে ভুলভাল বকছিল। ফলে অতনুর সন্দেহ হওয়াতে তাকে স্টেশনে তুলে আনে।”

আমি মাথা দুলিয়ে বিয়ারে চুমুক দিলাম। আমরা লালবাজারের কাছেই ক্যাফে মন্টেকার্লো নামে একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছি। বিকেল পাঁচটা বাজে। সুজিত সবেমাত্র ডিউটি শেষ হয়েছে। গতকাল কথা হওয়ার পর, আজকে মিনিট চল্লিশেক আগে সে ফোন করে এখানে আসতে বলে। আর আমি তার জন্য মিনিট পনেরো মতন অপেক্ষা করছি। আমি বললাম, “দোষ স্বীকার করেছে?”

“তখনই করেনি। ছেলের বাবা অনুরোধ করেছিল উকিলের উপস্থিতি ছাড়া ছেলে কথা বলবে না। তাই খানিকটা দেরি হয়ে যায়। আর উকিলটাও বুদ্ধিমান ছিল। সে প্রথমেই সামশেরকে বলেছে সব সোজাসুজি বলতে। পুলিশের সহযোগিতা করলে সে দুটোই অনিচ্ছাকৃত খুন বলে কেস সাজাবে, তাহলে ছেলেটার অনেক কম শাস্তি হবে। বোধহয় সে এটা বলে পারও পেয়ে যাবে।”

“সামশের তাহলে সব সোজাসুজি বলল?”

“তা বলল। যে রাতে সে কমলা বুড়িকে গাড়ি চাপা দেয়, সে রাতে নাকি সে তার গার্লফ্রেণ্ডের সঙ্গে ফুর্তি করছিল। গার্লফ্রেণ্ডকে সল্টলেকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সে ফিরছিল। আমাদের ধারণা, সে মদ বা গাঁজা বা দুটোরই নেশা করেছিল, যদিও এটা সে স্বীকার করবে না। যাই হোক, সে হলফ করে বলছে, রাস্তার মোড়ে সিগন্যাল সবুজ ছিল। কিন্তু কাগজ-কুড়োনি সেটা খেয়াল না করেই রাস্তা পার হচ্ছিল। ধাক্কা লাগার আগে অব্দিও নাকি সে বুড়িকে দেখতে পায়নি। তারপর সে ভয় পেয়ে গাড়ি না থামিয়ে পালিয়ে যায়।”

“কাঠের গুঁড়ো সম্ভবত ঝাঁকুনি খেয়ে তার গাড়ির পেছন থেকে ঝরে পড়েছিল,” আমি বললাম, “যদি খুব ভুল কিছু না বলি তাহলে সে ওই গাড়িটা করে দোকানের ছোটখাট ডেলিভারি দিতে যেত।”

“সে আমাদের সেরকমই জানিয়েছে।”

“গাড়ির টোল সিধে করল কীভাবে?”

“তার কিছু বন্ধু গ্যারেজে কাজ করে। তাদেরই দুজন রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি কাজটা সারে। সে জন্যই ট্রাফিকের লোকেরা কোনো হদিস পায়নি। গাড়ি নতুন করে রং করার তিন সপ্তাহ পরেও কিছু না হওয়ায় সে ধরে নেয়, এ যাত্রায় বেঁচে গেছে।”

“আর তারপরই চসারের আবির্ভাব হয়।”

“হ্যাঁ। হতভাগ্য চসার পঞ্চাশ হাজার টাকা চেয়েছিল মুখ বন্ধ রাখার জন্য। সামশের তাকে হাজার পাঁচেক দিয়ে তখনকার মতো ভাগিয়ে দেয়। বাকিটার জন্য পরদিন রাতে শেয়ালদায় আসতে বলে। সেখানে চসারকে তুলে নিয়ে সে ধর্মতলায় চলে আসে। সামশের হলফ করে বলছে, তার খুন করার কোনো অভিপ্রায় ছিল না। সে শুধু চেয়েছিল খানিকটা রগড়ানি দিয়ে তাকে ভয় দেখাতে। কিন্তু সে বড়সড় চেহারার পুরুষ মানুষ, তাই একটু হাতাহাতি হতেই তার মাথা গরম হয়ে যায়, আর খুব তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যায়। কিছুক্ষণ বাদে সে যখন দেখে চসারকে মেরে ফেলেছে, তখন সে আগের মতোই ভয় পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।”

“সে জন্য চসারের লাশে পাঁচ হাজারের বাকি টাকাটা পাওয়া গেছিল।”

“হুঁ।” সুজিত আমার বিয়ার শেষ করা দেখছিল। “শোনো,” খানিক বাদে সে বলল, “আমি সুমনাকে ফোন করে বলেছি ডিনারের জন্য চিকেন বিরিয়ানী বানাতে। তুমি আসবে নাকি?”

“সে অন্যদিন হবে না হয়,” আমি বললাম, “আজ আর একটা কাজ রয়েছে।”

“আবার কী?”

“দাশুকে খুঁজে বের করব। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম, যখনই কিছু জানতে পারব ওকে সঙ্গে সঙ্গে জানাব। যখন ও সামশেরের কথা শুনবে, হয়তো ওর মানুষের ওপর হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস কিছুটা হলেও ফিরে আসবে, অন্তত আইনের রক্ষাকর্তাদের ওপর।”

“পনেরো বছর শ্যামবাজারের ঝুপড়িতে থাকার পর? চাপ আছে।”

“কিছুই বলা যায় না হে।”

সুজিত তার গ্লাসটা তুলে একটা সেলাম ঠোকার ভান করে বলল, “বিদায় তবে, সমাজকর্মী।”

“বিদায় তবে, পুলিশ।”

আমি স্যাঁতস্যাঁতে ঠাণ্ডা রাতে বেরিয়ে পড়লাম।

বিল প্রোন্‌যিনির ‘Death of a nobody’ অবলম্বনে
বিশেষ কৃতজ্ঞতা - ইমামুল ইসলাম

পাঠকেরা যা পড়ছেন