শূন্য প্রহর - নীলাভ বিশ্বাস

অলংকরণ - নীলাভ বিশ্বাস
এক : ক্ষয়

কালো স্ক্রিনের উপর ঢেউয়ের মতো এঁকেবেঁকে চলা অক্ষর, ডেক্সের উপর এসে বসা খয়েরী মথ, সিগারেটের প্যাকেট, ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া বাসি কফি, মাথার মধ্যে একটা তীব্র যন্ত্রণা। সমস্ত পুরোনো এবং নতুন অস্তিত্বদের সাথে নিয়ে দশতলার অফিস ডেস্ক থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে সৌম্যজিৎ। একফালি নীলের চারপাশে হালকা সবুজ মেঘ, তারপর ভেঙে পড়া স্কাইস্ক্রাপার, একটানা কালো ধোঁয়ার রেখা। বাইরে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির মতো, দুপুরের দিকে হয়ত অ্যাসিড রেন হতে পারে। সৌম্যজিৎ মোটা প্লাসটিকের কোটটা গায়ে চাপিয়ে নেয়।

 

বিকেল সাড়ে চারটে। কলেজ মোড়ের কাছে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায় সৌম্যজিৎ। আকাশের রঙ গাঢ় সবুজ। ফুটপাথে রোগা রোগা মানুষ, বমি, পায়খানা, কণ্ডোম, সিরিন্জের প্যাকেট। হাজার হাজার মানুষের ঠিকানা এখন সেক্টর ফাইভের ফুটপাথ, ’৩৪ সালের ইকোনোমিক সাটডাউন, রাশিয়ার যুদ্ধ, ডিজিটাল ক্রাইসিস এর পর আসতে আসতে এই ভীড়টা বাড়তে থাকে। সমস্ত রকম কারেন্সি ব্যানড্, তাই ব্যাঙ্ক আর অন্যান্য কোম্পানিগুলোর একমাত্র ভরসা সৌম্যজিৎের মতো কিছু মানুষ। মেনফ্রেম সার্ভার থেকে ডাটা রিকোভারির কাজটা মন্দ নয় এই সময়ে। মাস গেলে 0.0125 বিটকয়েনে পেট চলে যায় কোন মতে। এদিকে আগুন জ্বলছে রাস্তায় রাস্তায়, জ্বলছে কলেজ, স্কুল, অফিস। উগ্র বিপ্লবীরা উন্মুক্ত হয়ে ঢিল ছুঁড়ে মারছে মিলিটারি ভ্যানে, গুলিবিদ্ধ যুবকের দেহ পিষে দিচ্ছে ট্যাঙ্ক। এই সমস্ত সাদাকালো ছবির পাশ কাটিয়ে জ্বলতে থাকা কলেজটার পাশের লেকটার ধারে এসে দাঁড়ায় সৌম্যজিৎ। অন্ধকার নেমে আসে, এলোমেলো ভাবনা নিয়ে পকেট থেকে বের করে সিরিন্জ। হলদে আলোয় নীল তরলটা চকমক করে ওঠে।

 

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মৃত। আমরা জানি, সৌম্যজিৎ জানে, মায়ানমার থেকে সেক্টর ফাইভে আসা ৫ বছরের যে বাচ্চাটা পুলিশের গুলিতে মারা গেল সেও জানত। কিন্তু সত্যিই কি স্বপ্নগুলো এমন ছিল, বিপ্লব শেষের আগুন নেভানোর চেষ্টা কেউ করেনি। মৃত্যু, অন্ধকার আর সবুজ আকাশের নিচে সবাই নির্বাক অথবা উন্মাদ।

 

নেশা কেটে গেছে। কোথাও যেন একটা সুর বাজছে।

মুখ থেকে গ্যাসমুখোশটা খুলে নিয়ে সৌম্যজিৎ ঝলসানো রোদের মধ্যে উঠে দাঁড়ায়। ইকোস্পেসের ভেঙে পড়া, মানুষবিহীন বিল্ডিং, মনিটর, সিপিইউ-এর স্তুপের মধ্যে থেকে রোগা, বেঁকে যাওয়া সৌম্যজিতের শরীরটা এগিয়ে যায় অজানা সুরটার খোঁজে। মাথার মধ্যে মারাত্মক যন্ত্রণা। সমস্ত স্নায়বিক অস্তিত্ব অস্বীকার করে এগিয়ে যায় সৌম্যজিৎ। কিছুদূর গিয়ে চোখে পড়ে একটা রেডিও টেবিলের উপর, পাশে একটা চিঠি। খুব পুরোনো একটা চিঠি। রিনির লেখা, ওর মৃত্যুর দুদিন আগের। রেডিওতে শুরু হয় ফোর্থ মুভমেন্ট, বেঠোভেনের ‘ওড টু জয়’, বৃষ্টি নেমে আসে ফাঁকা কমপ্লেক্সের স্কাইস্ক্রাপারগুলোতে। মহাকাশের কোনো দিকভ্রান্ত স্যাটেলাইট পৃথিবীর দিকে ফেরত পাঠায় শেষ বেতার তরঙ্গ। গ্যাসমুখোশটা পরে নেয় সৌম্যজিৎ। বাড়ি ফিরতে সৌম্যজিতের ভরসা স্বয়ংক্রিয় অটো, বছর পাঁচেক আগে রাস্তায় নামায় বিটা গর্ভমেন্ট। তখন এগুলো দেখে সাম্যবাদের শুরু মনে হয়েছিলো সবার! সৌম্যজিৎ আজকাল থাকে একটা ghetto-তে। বছর দুয়েক আগে এখানেই ভেঙে পড়েছিল চাইনিজ স্পেশ স্টেশনটা। ওই ধ্বংসস্তুপের মধ্যেই একটা ছোট ক্যাপসুলের মধ্যে থাকে সৌম্যজিৎ। দূরে স্কাইস্ক্রাপারগুলোতে জোনাকির মতো জ্বলছে ছোট ছোট আলো। আকাশের এক কোনায় সাপের মত উঠে যাচ্ছে ধোঁয়া, উদ্বাস্তু বস্তি জ্বলছে। রোজকার মতোই ঘুমের ওষুধটা খেয়ে নেয় সৌম্যজিৎ। কিন্তু আজ ঘুম আসবে না ওর। কাল একটা বড় কাজ করতে হবে ওকে, শুধু ও নয় ওর মত আরো কয়েক হাজার লোক সারা পৃথিবীতে বিটা গর্ভমেন্টের নেটওয়ার্কে ছেড়ে দেবে একটা ম্যালওয়্যার, লক্ষ্য হচ্ছে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লব। যান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রথম দিন।

দুই : আগুন

মাফলারটা জড়িয়ে নেয় সৌম্যজিৎ। বিকেলের পর ঠাণ্ডা আর ঝোড়ো বাতাসের জন্য রাস্তায় বেরোনো যে কোন মানুষের পক্ষেই অস্বাভাবিক। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হাইওয়ের ধারে রিফিউজি দের তাঁবু, টায়ার পোড়া আগুন, হপ্তা পুরোনো লাশের স্তুপ সবকিছু ছাড়িয়ে সৌম্যজিৎ পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের পাশের অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়ে।

“দুটো লিকুইড, আর এক প্লেট পর্ক।” অর্ডার দেয় সৌম্যজিৎ।
চ্যাঙ-এর দোকান টা বেআইনি। বিভিন্ন লোকজন আসে। পাচার, খুন সব কিছুর হিসাব হয় চ্যাঙ এর ঠেকে। সাথে লিকুইড।

 

সময়টা ২০৫৬ সাল, ২১-এ ডিসেম্বর। সেক্টর সিক্স, কলকাতা। শহরের বেশ খানিকটা সমুদ্রের তলায়। একসস্ট ফ্যানের দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে সৌম্যজিৎ। স্যাটেলাইট ফোনটা একটানা বাজতে থাকে।
ফোনটা ধরে সে।

—“কাজটা হয়েছে?”

—“হ্যাঁ। ভয় করছে?”

—“সেটা স্বাভাবিক নয় কি?”

—“না।”

—“বাজে বোকো না। তুমি শুধু একা নও আরও অনেক অনেক লোক আছে জড়িত। ভুল হলে সবাই শেষ।”

 

রাত বারোটার বাসটা ধরে সৌম্যজিৎ। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকে “আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও...” পুলিশ আর প্রাইভেট কোম্পানির সেনাবাহিনী পুড়িয়ে দেয় রাস্তার দু’পাশের বস্তি। আগুন আর রক্তের মধ্যে দিয়ে অন্ধকার কাটিয়ে এগিয়ে চলে বাসটা।

মাথাটা ঘুরতে থাকে সৌম্যজিতের। ভেঙে পড়া স্পেস স্টেশনের ঘরের মধ্যে ঢোকে সে। বৃষ্টি নেমে আসে, ঘুম পাচ্ছে তার আজ।

২২ শে ডিসেম্বর, ২০৫৬। সারা পৃথিবীতে মৃত দু কোটির বেশি মানুষ। ওয়াল স্ট্রিট থেকে টেক ফেজ সবেতেই জ্বলছে আগুন। সমস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তথ্য লোপাট। রাস্তায় নেমে এসেছে মানুষ। বিশ্বাস সৌম্যজিতের অফিস কলিগ, ও যুক্ত ছিল এই প্রোজেক্টটায়। বিশ্বাসের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো তার। বিশ্বাসের হাতে একটা মড কালাশনিকভ, কোমরের বেল্টে আটকানো গ্রেনেড।

“শুনতে পাচ্ছো সৌম্য? রাস্তায় রায়ট চলছে। বট আর্মির সেক্টর ১-এর কন্ট্রোল এখন মানুষের হাতে।”

সৌম্যজিৎ উঠে বসে।

“কুইক বিশ্বাস! এখুনি আমাদের বিটা সেক্টর যেতে হবে। ওই শুয়োরের খোঁয়াড় না ভাঙ্গলে যুদ্ধ জেতা যাবে না।”

ওরা দুজনে বেড়িয়ে আসে রাস্তায়। সঙ্গে জোগাড় করে আরো মানুষ। গুলির শব্দ, ধোঁয়ার পাশ কাটিয়ে ওরা এগিয়ে যায়।

তিন : মেঘ

আলোর ছোট ছোট কণায় ভরে গেছে গোটা ক্যাফেটা। দুটো চোখে মুগ্ধতা নিয়ে হিয়া তাকিয়ে। নরম ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠছে অল্প। মেঘ ফোনের স্ক্রিনে দাগ কেটে চলে। কালকেই প্রেসেন্টেশন। মেঘ আর হিয়া, বিয়ে হয়েছে ওদের তিন বছর হলো। টেবিলে দুটো কফি কাপ, আধখানা স্যান্ডউইচ, ওষুধের পাতা আর একটা সিরিন্জ। ৩৪ তলার এই ক্যাফেটা ফাঁকা থাকে বিকেলের দিকে। হিয়া এরকম কন্ডিশনে থাকবে নেক্সট থার্টি মিনিট, মেঘ মোবাইলটা নিয়ে ব্যালকনিতে আসে, প্রভাস সাহাকে কল করাটা দরকার।

—“ইঁদুরের মত গর্তে সেঁধিয়ে থেকো না প্রভাসদা! আমার কোম্পানি তোমার জন্য গত বছর যে বড় অ্যাকাউন্টটা খরচা করেছে সেটা এমনি এমনি নয়! শ্যুট দোজ্ বাস্টার্ডস! পুলিশ, বটস্ যা পারো লেলিয়ে দাও...”

—“ওরা সংখ্যায় অনেক মিস্টার সেন। আর সব কিছু ট্রাই করেছি... কিছুই হয় নি... বিটা গর্ভমেন্ট ও চোখ রাখছে, আগের মতো মেরে ফেলা যাবে না...”

—“ফাকিং শিট! আমি কিছু শুনতে চাই না... মার্কেট ডাউন... সব কটা শুয়োরের বাচ্চা অফলাইন... ডু সামথিং... গ্যাস দেম্!”

—“মিস্টার সেন! পালিয়ে যান আপনি, ওরা খুঁজছে আপনাকেও! এই মুহূর্তে খবর এল অ্যাটমসফিয়ার কমপ্লেক্সে ঢুকে পড়েছে কিছু লোক... গুলি চলছে, শুনতে পাচ্ছেন না আপনি!”

মেঘ ব্যালকনি থেকে দৌড়ে আসে টেবিলে বসা হিয়ার কাছে। হিয়ার ট্রিপ চলছে। ওষুধটা খাইয়ে দেয় মেঘ। ড্রিম সিকোয়েন্সটা শেষ হয়, যেখানে মেঘ পাহাড়ের গায়ে হিয়ার কাছে এসে বলছে…

—“এভরিথিং উইল বি অলরাইট, হিয়া। চল পালিয়ে যাই।”

—“হিয়া! চল... যেতে হবে... কুইক!”

—“ওহ মেঘ! কি হয়েছে তোমার… ডোন্ট বি অ্যান অ্যাসহোল! আমি কুড়ি বিটসি খরচ করেছি এই স্টাফ টার জন্য। সব নষ্ট করলে...”

মেঘ রেগে গিয়ে চুল টেনে ধরে হিয়ার।

—“ফালতু বকার সময় এটা নয়। ইউ ফিলদি...”

ঘরে হঠাৎ একটা শব্দ। সম্ভবত দুটো গুলির আওয়াজ। প্রেক্ষাপটে আসে আরও দুই মানুষ। মেঘের খুলি ফুটো করে চলে গেছে প্রথম গুলিটা, হিয়ার আঘাতটা বুকে। একটানা হেসে চলেছে সে।

সৌম্যজিৎ বন্দুকটা টেবিলে রেখে হিয়ার চোখটা খুলে দেখে।

—“ফেটমিন উইথ এলোসিন। সুন্দর স্বপ্ন দেখার জন্য। কিহে বিশ্বাস নেবে নাকি এটা?”

বিশ্বাস আরও দুটো গুলি ভরে দেয় মেঘ সেন আলফার খুলিতে। সব শুনশান। বিল্ডিং-এর সামনে সাইনবোর্ডে ভেসে ওঠে...

Welcome to Kolkata Beta, 2056
Your shortcut to paradise.

পাঠকেরা যা পড়ছেন