স্বপ্নের স্টুডিয়ো - জয়িতা সাহা

তায়েকো ওকাজিমা। স্বনির্ভর ও স্বাধীন। টোকিয়োতে চাকরী করে কিন্তু সে চাকরীতে ওর মন নেই। তায়েকোর মা চিন্তিত উনত্রিশ বছরে এসেও তায়েকোর কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই অথবা সে বিয়ের কথা ভাবে না কেনো? তায়েকোর মন পড়ে থাকে গ্রামে। ছোটোবেলাতে গ্রীষ্মের ছুটিতে ঠাকুমার সাথে যেই গ্রামে ও যেতো! আজ এতো কাল পড়েও চাকরীতে ছুটির বাহানা করে সেই গ্রামীন জীবনের সাথে তায়েকো মিশে যায়। এই যাত্রাতে ওর সঙ্গী হয় সে নিজেই: দশ বছর বয়সী তায়েকো! যা ওর সমস্ত রঙিন স্বপ্ন, অমলিন স্মৃতি আর কল্পনার ফসল। অর্গ‍্যানিক ফার্মার তোশিওর সাহচর্য ওর এই যাত্রাপথকে সমৃদ্ধ করে। গ্রামের সরল জীবন আর সহজ মানুষদের স্পর্শে তায়েকো নিজেকে খুঁজে পায় নতুন করে। ছোট্টো তায়েকোর হাত ধরে জীবনের সব জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি হতে শিখে যায়। এই পর্যন্ত বললে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন জেনে এটি একটি অ্যানিমেটেড ছবির প্লট। ভারতীয় ছবির কথা মাথায় রাখলে দুর্ভাগ‍্যবশত অ্যানিমেশন ছবি কেবলমাত্র বাচ্ছাদের সাময়িক বিনোদন ছাড়া আর কিছু হতে পারেনি এখনো পর্যন্ত। কিন্ত অ্যানিমেশন ছবি আসলে কি? আমার মনে হয় যা আমরা ক‍্যামেরাতে ধরতে পারিনা কিন্তু ভাবতে পারি, কল্পনায় আঁকতে পারি সেই স্বপ্নকে পর্দায় আনার নামই অ্যানিমেশন। হাতের আঁকা থেকে কম্পিউটার গ্রাফিক্স বা সমসাময়িকের হিউম‍্যান লাইক মডেলিং : টেকনোলজিতে অ্যানিমেশন ফিল্ম অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। কিন্ত সৃজনের দিক থেকে হলিউডেও এখনো অবধি হাতে গোনা কিছু ব‍্যতিক্রম বাদ দিলে অ্যানিমেশন ছবি একটা চেনা ছকের মধ‍্যে দিয়েই চলে। সেইখানে আমাদের রোজনামচার গল্পকেই জাদুবাস্তবতায় ভরিয়ে তুলে একের পর এক কাজ করে চলেছে জাপানের অ্যানিমেশন স্টুডিয়ো, ‘স্টুডিয়ো ঘিবলি’।

তায়েকোর হাত ধরে দশ বছর বয়সী ছোট্টো তায়েকো || ছবি: ওনলি ইয়েস্টারডে (১৯৯১) পরিচালনা : ইসাও তাকাহাতা

প্রথমেই যে আলোচনা দিয়ে শুরু করলাম সেটা স্টুডিয়ো ঘিবলির ১৯৯১ সালের প্রযোজনা ‘ওনলি ইয়েস্টারডে’। হায়য়ো মিয়াজাকি এবং ইসাও তাকাহাতা, জাপানীজ সিনেমা আর মাংগা জগতের দুই দিকপাল ১৯৮৫ তে এই স্টুডিয়োর প্রতিষ্ঠা করেন। ‘ঘিবলি’ শব্দের ইতালীয় অনুবাদ এক নতুন বাতাস। মিয়াজাকির স্বপ্ন ছিলো স্টুডিয়ো ঘিবলি অ্যানিমেশন ছবির পালে এক নতুন হাওয়া নিয়ে আসবে এবং হলোও তাই। হলিউডের বিখ‍্যাত যেকোনো অ্যানিমেশন স্টুডিয়োর ছবির মূল উপজীব‍্য ছিলো রূপকথা বা উপকথা, মনভরানো গান, নয়তো পরিবার কেন্দ্রিক একগাদা অ্যাডভেঞ্চার এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিনেমার পুরোভাগে একটি দস‍্যি কিন্তু বেজায় ভালো পুঁচকে ‘ছেলে’। সেইসময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সমস‍্যা, দেশ কাল ব‍্যাপী যুদ্ধ বা সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই সমস্ত কিছু নিয়ে কাজ করেছে স্টুডিয়ো ঘিবলি।

চিহিরো আর রাজপুত্র হাকু || ছবি : স্পিরিটেড অ্যাওয়ে (২০০১) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

অ্যানিমেশন ফিল্মের সাথে আমার প্রেম লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বলা যায় এবং তা এখনো অটুট। কার্টুন ফিল্ম, ফিচার ছবি, অ্যানিমে যখন যা পেয়েছি চেটেপুটে তার স্বাদ নিয়েছি কোনো কিছুকেই ফেরাইনি। স্টুডিয়ো ঘিবলির সাথে আমার প্রথম আলাপ কলেজে পড়ার সময় ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ ছবির হাত ধরে। ২০০১ সালের এই ছবিকে অ্যানিমেশন সিনেমার ইতিহাসের একটি অন‍্যতম সেরা কাজ বললেও কমই বলা হবে। দশ বছরের একরত্তি মেয়ে চিহিরো স্পিরিট ওয়ার্ল্ডে আটকা পরে গিয়েও কিভাবে উদ্ধার করে নিজের বাবা মাকে এবং এক হারিয়ে যাওয়া এক রাজপুত্রকে: শুধু টানটান অ্যাডভেঞ্চার নয় প্রত‍্যেক চরিত্রের নানা রঙের অনুভূতিই এই ছবির সম্পদ। মিয়াজাকির এই ছবি সেরা অ্যানিমেশন ফিল্ম হিসেবে অস্কার জিতেছিলো। অনন‍্য আর্ট ওয়ার্ক এর সাথে সাথে স্পিরিটেড অ্যাওয়ের প্রধান আকর্ষণ তার নায়িকা চিহিরো। এবং এইখানেই ঘিবলির বিশেষত্ব। এই স্টুডিয়োর প্রায় প্রতিটি ছবিতেই আমরা প্রোটাগনিস্ট হিসেবে একজন মেয়েকে পাই। কখনো সে দুধের শিশু, কখনো দস‍্যি ছুঁড়ি, কিশোরী যাদুকরী বা প্রঞ্জা কলেজ পড়ুয়া, সুন্দরী গৃহবধু বা লাস‍্যময়ী প্রেমিকা কিংবা অশীতিপর ঠাকুমা এবং আরও কতশত ভূমিকায়।

পোস্টার : স্পিরিটেড অ্যাওয়ে (২০০১) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি
পোস্টার : প্রিন্সেস মোনোনকে (১৯৯৭) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি
পোস্টার : দ‍্য টেল অফ্ প্রিন্সেস কাগাউয়া’ (২০১১) পরিচালনা: ইসাও তাকাহাতা

স্টুডিয়ো ঘিবলির মেয়েরা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে জানে, সাহসে ভর করে অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে জানে। প্রকৃতির সাথে তাদের প্রাণের নিবিড় যোগ। এই সব গুণাবলী নিয়ে অরণ‍্যের রাজকুমারী ‘প্রিন্সেস মোনোনকে’ আমাদের সামনে আসে ১৯৯৭ সালে মিয়াজাকির সৃজনে। এই পৃথিবীর জল, মাটি, আলো, বাতাস আর গাছপালা ও জীবজন্তুর মাঝেই মানুষের সহাবস্থান ও সাহচর্য স্টুডিয়ো ঘিবলির সিনেমার এক মূলমন্ত্র। অরণ‍্যের অধিকারে লড়াকু প্রিন্সেসকে যেমন আমরা পেয়েছি আবার অন‍্যদিকে আছে চির একাকিনী চাঁদের মেয়ে কাগাউয়া। জাপানের জনপ্রিয় উপকথার প্রেক্ষিতে তৈরী ইসাও তাকাহাতার ছবি ‘দ‍্য টেল অফ্ প্রিন্সেস কাগাউয়া’ বিষাদের এক অপূর্ব আখ‍্যান। রাজকুমারীর কারুর সাথে মিশতে না পারার, প্রাণ খুলে বাঁচতে না পারার দুঃখ পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মতোই নরম নীল। বিভিন্ন রূপকথা আর ফ‍্যান্টাসি- জাদু দুনিয়ার পাশাপাশি জাপানের সংস্কৃতি মেনে বার বার স্পিরিট ওয়ার্ল্ডের উল্লেখ ও ঘিবলির সিনেমাতে এসেছে। আত্মাদের দুনিয়া আমাদের জগতের একদম কাছেই, যাদের মনে সাহস আর সত‍্যি আছে তারা অনায়াসেই সেখানে যেতে পারে।

ততোরো এবং তার সাঙোপাঙোদের সাথে সাতসুকি আর মেই || ছবি: মাই নেবার ততোরো (১৯৮৮) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

স্পিরিটেড অ্যাওয়ের দুষ্টু স্পিরিট শুধু নয় আছে বেজায় ভালো পরোপকারী আত্মাদের দলও। এই উপকারী ভূতেদের সর্দার ‘ততোরো’র সাথে দুই বোন সেতসুকি আর মেই এর হাত ধরে আমাদের আলাপ হয় ১৯৮৮ সালের ‘মাই নেবার ততোরো’ সিনেমাতে। ততোরো হলো গিয়ে অনেকটা বনবিবির মতন। তার অজস্র চেলা। যেসব ছোট্ট ছেলেমেয়েদের মা খুব অসুস্থ অথবা বাবা কাজকর্মে ভীষণ ব‍্যস্ত তাদের ততোরো জোছনা রাতে ক‍্যাটবাসে চাপিয়ে বেড়াতে নিয়ে যায়। শিশুমনের কল্পনার স্ফূরণের মাপকাঠিতে মিয়াজাকির এই সিনেমা অ্যানিমেশনের ইতিহাসে তৈরী অন‍্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। এই সিনেমা যে একবার দেখবে তার ক‍্যাটবাসে চেপে নিরুদ্দেশে পাড়ি দিতে ইচ্ছে যাবেই। খাড়া কান আর বিশাল বপু ততোরো স্টুডিয়ো ঘিবলির ম‍্যাসকট ও বটে। ঘিবলির রাজ‍্যে একবার উঁকি দিলেই দেখবেন ছাতা মাথায় দিয়ে ততোরো আপনারই অপেক্ষাতে আছে!

ততোরোর ক্যাটবাস || ছবি: মাই নেবার ততোরো (১৯৮৮) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

স্টুডিয়ো ঘিবলির সিনেমার আরেকটি বিশেষ দিক সমসায়িক তথা যুদ্ধবিদ্ধস্ত জাপানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অসাধারণ উপস্থাপন। ইসাও তাকাহাতার ছবি ‘গ্রেভ অফ ফায়ারফ্লাইস’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বনাশের একটি জীবন্ত দলিল। নিষ্পাপ শিশু সেতসুকোর অবর্ণনীয় কষ্টের জীবন আর নিদারুণ পরিণতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ধ্বংসাত্মক অবস্থা আর সাধারণ মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণাকেই দর্শায়। ওয়ার ফিল্মের তালিকায় ‘গ্রেভ অফ ফায়ারফ্লাইস’ একদম উপরের দিকে থাকবে।

পোস্টার : গ্রেভ অফ ফায়ারফ্লাইস (১৯৮৮) পরিচালনা: ইসাও তাকাহাতা
পোস্টার : পোর্কো রোসো (১৯৯২) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফাইটার প্লেন পাইলটদের নিয়ে তৈরী মিয়াজাকির ‘পোর্কো রোসো’ আমার আরেকটি ভীষণ প্রিয় ছবি। ইতালীয় পাইলট মার্কো নিজের প্রায় সমস্ত সতীর্থদের যুদ্ধে হারিয়ে এক হৃদয়হীন না-মানুষে পরিণত হয়। প্রেমিকা জিনা চিরকাল অপেক্ষা করে আছে, কুশলী ইঞ্জিনিয়ার ফিয়ো নিজের জীবনকে বাজী রেখে মার্কোর প্লেন সারিয়ে দেয় কিন্তু মার্কোর চোখে শুধু এক অদ্ভুত স্বপ্ন! পৃথিবীর পরে গ্রহ তারার মধ‍্যে মহাকাশে সে হারিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে বিস্তীর্ণ ছায়াপথ। কিন্ত একেমন ছায়াপথ! এ তো জ‍্যোতিষ্ক দিয়ে তৈরী নয়। সার সার ফাইটার প্লেন যেগুলো সব যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেছিলো তাই দিয়ে তৈরী! অপলক এই দৃশ‍্য দেখতে দেখতে মার্কোর চোখে ধাঁধা লেগে যায়। তরুণ অজেয় পাইলট মার্কো অনুভূতিহীন লাল শূকর ‘পোর্কো রোসো’ তে বদলে যায়! যুদ্ধ যে মানবজীবনের এক অভিশাপ আর তার প্রভাব যে কতটা মারাত্মক সেটা এই ভাবে ফুটিয়ে তুলতে বোধহয় কেবল মিয়াজাকিই পারেন। ঘিবলির এই প্রাণপুরুষ নিজের সমস্ত কাজেই দুনিয়াব‍্যাপী অরাজক রাজনীতির তীব্র নিন্দা করে গেছেন।

সোফি আর রাজপুত্র হাউরু || ছবি : হাউল্’স মুভিং ক‍্যাসেল (২০০৪) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

মিয়াজাকির ২০০৪ সালের ছবি ‘হাউল্’স মুভিং ক‍্যাসেল’ আমেরিকার ইরাক আক্রমণ ও তদ্ সংলগ্ন অনাচারের প্রতিবাদে তৈরী। রাষ্ট্রের অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে রাজকুমার হাউরু তার প্রাণভোমরা বাজী রেখে দেয় এক ডাইনি যাদুকরীর কাছে। ফ‍্যান্টাসি আর বাস্তবের দারুণ মেলবন্ধন এই ছবি কিন্ত শুধু যুদ্ধ নয় এক অসামান‍্য প্রেমের গল্প বলে। বয়স ও পরিস্থিতির সব বাঁধা কাটিয়ে সোফি আর রাজপুত্র হাউরুর প্রেম ডানা মেলে। এইটা মিয়াজাকির এক আশ্চর্য ম‍্যাজিক! নিদারুণ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতে প্রাণভরানো প্রেমের গল্প তিনি ‘দ‍্য উইন্ড রাইসেস’ ছবিতেও বলেছেন। কবি ততসিও হোরি আর অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ার জিরো হোরিকোশির জীবনের উপর আধারিত ২০১৩ সালের এই ছবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান যেসব মিৎসুবিশি ফাইটার প্লেনগুলি ব‍্যবহার করেছিলো জিরো ছিলেন তাদের চীফ ইঞ্জিনিয়ার। যুদ্ধের অন্ধকারের মধ‍্যেও জিরো আর নাহোকোর প্রেম, জিরোর এক যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর আকাশে প্লেন ওড়াবার স্বপ্ন আমাদের স্বপ্নের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

জিরো আর নাহোকো || ছবি: দ‍্য উইন্ড রাইসেস (২০১৩) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

সিনেমার চরিত্র গঠন এবং বিষয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্টুডিয়ো ঘিবলির বিশেষ বিশেষত্ব আর্ট ওয়ার্ক। অ্যানিমেশনের কারিগরীর উল্লেখযোগ‍্য উন্নতি হওয়া সত্বেও স্টুডিয়ো ঘিবলি এখনো পর্যন্ত সাবেকী হাতে আঁকাকে পর্দাতে পরিবেশনের পদ্ধতিই ব‍্যবহার করে আসছে। এর একটি কারণ হতে পারে প্রতিটি সিনেমাই মাংগা বা হাতে আঁকা জাপানী কমিক্সের উপর আধারিত। এই মাংগা জাপানের সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সিনেমার প্রত‍্যেকটি মুভমেন্ট হাতে আঁকার কারণে অত‍্যন্ত ব‍্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ কিন্ত শেষ পর্যন্ত যে আর্ট ওয়ার্ক আমাদের কাছে আসে তা নৈসর্গিক ও নয়নাভিরাম।

স্টুডিয়ো ঘিবলির ক‍্যারেক্টার আর্ট ডেভেলপমেন্টের পেটেন্ট একেবারেই অন‍্যধরনের এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন অ্যানিমেশন স্টুডিয়ো ঘিবলির অনুপ্রেরণায় নিজেদের আর্ট ওয়ার্কের বিন‍্যাস করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের একটি অ্যানিমেশন স্টুডিয়ো ঘিবলির অনুপ্রেরণায় একটি শর্টফিল্ম এনেছিলো যা দেখে আমরা আশা রাখি অদূর ভবিষ‍্যতে আমাদের অ্যানিমেটররাও ঘিবলির অনুপ্রেরণাকে পাথেয় করবেন।

ঘিবলির ছবিতে ফুল আর প্রকৃতি

ঘিবলি আর্ট ওয়ার্কের বৈশিষ্ট কেবল মাত্র চরিত্রচিত্রণ নয় ফ‍্যান্টাসির সাতরঙা জগৎ থেকে গ্রামের সবুজ প্রকৃতি বা শহরের ইঁট কাঠ পাথরের ছবিকে যেইভাবে পর্দায় জীবন্ত করা হয় তাই নিয়ে লিখে শেষ করা যাবে না। সব কটি সিনেমার ব‍্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মায়াবী। ঘিবলির কোনো ছবিতেই গানের ব‍্যবহার সেই অর্থে নেই। অথচ প্রিন্সেস কাগাউয়া ছবিতে কিছু জাপানীজ লোকগানের ব‍্যবহার অপার্থিব। ‘ওনলি ইয়েস্টারডে’ শেষ হয় একটি অসামান‍্য গান দিয়ে। স্কুলজীবনের প্রেম আর ভবিষ‍্যত অনিশ্চয়তা ও স্বপ্নপূরণের গল্প ‘হুইস্পার অফ্ দ‍্য হার্ট’ ছবিতে জন ডেনভারের ‘কান্ট্রি রোডস্’ গানটির ব‍্যবহার আলাদা মাত্রা আনে। সেই সূত্র ধরেই অন‍্যান‍্য ছবিতেও গান ব‍্যবহারের দাবী রাখা যায়। স্টুডিয়ো ঘিবলির সিনেমার গতি অথবা এডিটিং নিয়ে অনেকের অভিযোগ থাকতে পারে কারণ প্রায় প্রতিটি সিনেমাই ঘটনার ঘনঘটার থেকে অনুভূতি কথনের উপরই বেশী নির্ভরশীল। যারা স্বপ্নের রামধনু রঙে জীবনকে দেখেন না তাদের কাছে স্টুডিয়ো ঘিবলির সিনেমা সেই মর্মে ধরা দেবেনা।

সেইজি আর সিজুকু || ছবি: হুইস্পার অফ্ দ‍্য হার্ট (১৯৯৫)পরিচালনা: ইয়োসিফুমি কোন্দো

স্পিরিটেড অ্যাওয়ের জগৎজোড়া সাফল‍্যের পরেই বিশ্বের দরবারে স্টুডিয়ো ঘিবলি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলো। ততকালীন ডিজ্নির বুয়েনা ভিস্তা স্টুডিয়ো সমস্ত ছবি হলিউডে পরিবেশনার দায়িত্ব নেয়। ইংরেজী সংলাপ অনুবাদকেরা চরিত্রদের ফেসিয়াল মুভমেন্টের সাথে তারতম‍্য রেখে সংলাপ লেখেন। সমস্ত ইংরেজী অনুবাদেই স্টুডিয়ো ঘিবলি নো কাট পলিসি অবলম্বন করে থাকে অর্থাৎ মূল কনটেন্টের অকৃত্রিম পরিবেশন। ২০১৪ সালে কিশোরী মনের দোটানায় টলমল দুই অভিন্নহৃদয় বান্ধবী অ্যান আর মার্নির গল্প ‘হোয়েন মার্নি ওয়াস দেয়ার’ ছবির মুক্তির পর স্টুডিয়ো তাদের কাজে সাময়িক স্থগিতাদেশ আনে। কারণ তাকাহাতার অসুস্থতা এবং মিয়াজাকির অবসর গ্রহণ। ইসাও তাকাহাতার প্রয়াণে এবছরই পৃথিবীর আপামর অ্যানিমেশনপ্রেমী দর্শককুল শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। উনার কালজয়ী সৃষ্টি গ্রেভ অফ ফায়ারফ্লাইস এর জন‍্য উনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আনন্দের কথা হলো মিয়াজাকি আবার অবসর ভেঙে ফিরে আসছেন নতুন ছবির কাজে। ২০২০ সালে দীর্ঘ ছয় বছর পর আমরা আবার ঘিবলি ম‍্যাজিকে আবিষ্ট হতে পারবো।

অ্যান আর মার্নি || ছবি: হোয়েন মার্নি ওয়াস দেয়ার পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

পূর্ণ দৈর্ঘ‍্যের ফিচার ছবি ছাড়াও স্টুডিয়ো ঘিবলির অন‍্যান‍্য কাজের মধ‍্যে উল্লেখযোগ‍্য কিছু শর্ট ফিল্ম এবং ২০১৫ তে আত্মপ্রকাশিত টিভি সিরিজ ‘রন্জা, দ‍্য রবার্স ড‍্যটার’। মিয়াজাকির পুত্র গোরো মিয়াজাকির তৈরী এই সিরিজ শুধু রন্জার শৈশব থেকে কৈশোরে বেড়ে ওঠার গল্প নয়, একটি মেয়ের জীবনে তার পরিবার ও বন্ধুদের ভূমিকা আর সম্পর্ক নিয়ে তৈরী পুরোদস্তুর কামিং অফ্ এজ কাহিনী। এইরকমই এক কামিং অফ্ এজ গল্প হায়ায়ো মিয়াজাকি আমাদের বলেছিলেন সেই ১৯৮৯ সালে টিনেজ উইচ্ কিকির মধ‍্যে দিয়ে। বছর তেরোর ট্রেইনি উইচ্ কিকি অচেনা শহরে নিজের ডেলিভারি বিজনেস খুলে বসে। নতুন শহরের হরেক রকম বিপদ কাটিয়ে, নতুন জীবনের সাথে মানিয়ে , নতুন বন্ধুত্ব পাতিয়ে কিকি ঠিক টিকে যায়। ‘কিকি’জ্ ডেলিভারি সার্ভিসেস্’ দেখলে কিকি আর তার মিশকালো কথাবলা বিড়াল জিজি আপনাকে মুগ্ধ করবেই। কিকির মতোই ভীষণ মিষ্টি গভীর সমুদ্রের ‘মাছমেয়ে’ ‘পনয়ো’।

আমার বানানো কিকি আর জিজির প্রতিকৃতি
ইন্টারনেট থেকে পাওয়া পনয়োর ফ্যান আর্ট

মারমেড না বলে মাছমেয়ে বললাম কারণ পনয়ো সত‍্যিই এক মাছ যে ইচ্ছেশক্তির জোরে মেয়ে হতে চায়, খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে চায়। দুপায়ে হেঁটে,দৌড়ে,খেলে বেড়াতে চায়। ২০০৮ সালের মিয়াজাকির ছবি ‘পনয়ো’ আমাদের ডিজ্নি প্রিন্সেস এরিয়েলের কথা মনে করিয়ে দেয়। তফাৎ শুধু মায়াপুরীর রাজকুমারী নয় পনয়ো একদম আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ে তাই ওর গল্প আরো বেশী করে মন ছোঁয়। ঘিবলির মেয়েদের অভিনবত্বের কাহিনী বলে শেষ করা যাবে না। কিন্ত যার কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে এবারে তার কথাই বলবো। রাজকুমারী ‘লুশিটা’। ঘিবলির প্রথম নায়িকা।

রাজকুমারী লুশিটা || ছবি: লাপুতা: কাসল ইন দ‍্য স্কাই (১৯৮৬) পরিচালনা: হায়য়ো মিয়াজাকি

স্টুডিয়ো ঘিবলির যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯৮৬ সালে মিয়াজাকির ‘লাপুতা : কাসল ইন দ‍্য স্কাই’ ছবির হাত ধরে। হ‍্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, জোনাথন সুইফ্টের ‘গালিভার্স ট্রাভেল্স’ এর লাপুতার মতোই এক বিস্মৃত দুনিয়ার গল্প। অন‍্য কোনো এক সৌরমন্ডলে সবার চোখের আড়ালে মহাকাশে সেই দুনিয়া লুকিয়ে আছে। লাপুতার শক্তির সমস্ত রহস‍্যের উত্তরাধিকারী প্রিন্সেস লুশিটা। তাই ওকে পালাতে হয় এক পৃথিবী ক্ষমতা লোভী মানুষের থেকে, চোর-জলদস‍্যুর থেকে, রাষ্ট্রের থেকে। আকাশে ভাসমান দুর্গের ঠিকানা সবাই চায় কিন্ত লাপুতার শক্তির আসল মর্ম জানে শুধু লুশিটা। লাপুতার অধিবাসীরা প্রযুক্তি আর কারিগরীর উন্নতি আর অহংকে সম্বল করে এক যন্ত্র পরিচালিত দুর্গের মধ‍্যে ভেসে বেড়াতো সবার থেকে আলাদা হয়ে। কিন্তু পৃথিবীর মানুষজন, গাছ, পাখি, আলো হাওয়া ছেড়ে যন্ত্র অরণ‍্যে বাঁচতে বাঁচতে লাপুতাবাসী হাঁফিয়ে ওঠে।

লাপুতা: কাসল ইন দ‍্য স্কাই

অজস্র ধনসম্পদের থেকেও মূল‍্যবান সম্পদ ভালোবাসা এই সারসত‍্য বুঝে তারা পৃথিবীতে চলে আসতে চায়। প্রহরী রোবটদের হাতে এই যন্ত্রপুরীর ভার আর এক টুকরো সবুজ স্বপ্ন তারা রেখে আসেন এই বিশ্বাসে একদিন সবুজে ছেয়ে যাবে তাদের দুর্গ, লাপুতার প্রাণকেন্দ্র হবে এক বিশাল মহীরূহ কারণ যন্ত্রে শান্তি নেই আছে শুধু ধ্বংস! খুব চেনা চেনা লাগছে? অদূর ভবিষ‍্যতের কোনো এক পোস্ট অ্যাপোক‍্যালিপ্টিক সময়ে আমাদেরও এই ভাবে পৃথিবী ছাড়তে হবে হয়তো, তাই না? তখন কোথায় পাবেন সবুজ একটুকরো লাপুতা! তার চেয়ে এখন থেকেই খোঁজ শুরু করে দিন। পুজোর ছুটিতে যাবেন নাকি লাপুতা? সঙ্গে তো থাকবেই লুশিটা : প্রিন্সেস অফ্ লাপুতা!

পাঠকেরা যা পড়ছেন