ইউ ক্যান বাট ইউ মে নট - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

রবিঠাকুরের একটা ইন্টারেস্টিং ছড়া আছে—“পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসেন অন্তর্যামী।” এ ছড়াটা কিন্তু আমাদের আজকের সাহিত্যের আঙিনাতে সমানভাবে খেটে যায়। সাহিত্যের ভুবনে তিন শরিকের মালিকানা। একপক্ষে রয়েছেন প্রজাপতি ব্রহ্মা উর্ফ সাহিত্যস্রষ্টা। দ্বিতীয়জন বিষ্ণু—সাহিত্যের ধাত্রীদেবতা, এনার নাম প্রকাশক। আর তৃতীয়জন স্বয়ং দেবাদিদেব, রাখলে রাখবেন, মারলে মারবেন—সাহিত্যের মহাদেব—ইনি হলেন সমালোচক।

তা লেখক, প্রকাশক আর সমালোচক এই তিনে মিলে দিব্যি তো চালাচ্ছেন সাহিত্যের সৃজনপালনের দুনিয়াটি। প্রত্যেকেই ভাবেন ও দাবী করেন তিনিই মালিক, তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সাহিত্যরচনার পুরাো দুনিয়া। ওদিকে, অন্তর্যামী পাঠক আড়ালে বসে হাসেন। আসল কথা হল, সাহিত্যের দুনিয়ায় তিনিই হলেন গিয়ে পরমাত্মা। তার কৃপাদৃষ্টিতে পড়বার জন্যে অন্য তিন জীবাত্মার যত দৌড়োদৌড়ি।

জীবনযাপনের প্রত্যক্ষ অভিঘাতে মানুষের কল্পনায় যে কথকতার নিয়ত সৃজন হয়ে চলে তারই খানিকটা কখনও কখনও লিখিত চেহারায় অন্যের বোধগম্য দুনিয়ায় প্রকাশিত হয়। তাকেই সাহিত্য বলি। এই সৃষ্টি জীবনের সঙ্গে সঙ্গে চলে, এরই দর্পনে বিম্বিত হয় জীবন। দর্পনটি যেমনই হোক, জীবনের ছায়া তাতে পড়বেই, তা সে ছায়া ভাঙাচোরাই হোক অথবা সোজা সরলই হোক। কাজেকাজেই কোন এক বিশেষ কালখণ্ডের মানদণ্ডের নিরিখে উত্তম বা অধম যা-ই বিবেচিত হোক না কেন, বোধগম্য দুনিয়ায় প্রকাশিত জীবন আশ্লিষ্ট যে কোনও কথকতাকে সাহিত্য এই নামটি দিতেই হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ‘সাহিত্য’ শব্দটা বিশেষণ নয়। বিশেষ্যমাত্র—যদিচ প্রতিটি দেশকালেই সমকালীন উন্নাসিক স্রষ্টা ও সমালোচকরা এই তকমাটাকে তাঁদের পছন্দসই সৃষ্টিগুলির গায়ে বিশেষণরূপে ব্যবহার করেছেন ও তাঁদের অপছন্দের (অর্থাৎ তাঁদের মতে নিম্নস্তরের) কোনও লেখাকে এই মর্যাদা কেউ দিতে গেলে শিং বাগিয়ে তেড়ে এসেছেন।

লেখক যখন লেখেন, তখন তাঁর সচেতন নীতিবোধ ও বেঁচেবর্তে থাকবার জন্য প্রয়োজনীয় দোকানদারী যুক্তিবোধ তার কলমটাকে পাকড়ে ধরে বসে থাকে না (যাঁদের থাকে, তারা লেখক হন না। এ হল লেখকের দুনিয়ায় প্রকৃতিদেবীর NATURAL SELECTION)। ফলত যে কোনও লেখাই কিছু কিছু বিষয়ে আশ্চর্যরকম নীরব ও কিছু কিছু ব্যাপারে বৈপরিত্যযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠে—এবং সেটা ঘটে লেখকের অজান্তেই। লেখক সচেতনভাবে যে কথাগুলো বলছেন, তা তাঁর নিজের একক বা সমষ্টিগত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তাঁর লেখার মধ্যে যে দিকগুলো অকথিত থেকে যাচ্ছে, হয়তা বা তাঁর অজান্তেই, তা কিন্তু, যে সময়খণ্ডে এবং যে আর্থসামাজিক শ্রেণীতে তিনি অবস্থান করেন, তার গোষ্ঠীগত রুচি, প্রয়োজনবোধ, অচেতনতা কিংবা অননুধাবনতার ফসল। অতএব, কথাসাহিত্যিকের কোনও সৃষ্টি যদি একটা কোনও বিশেষ রঙ-য়ে (যথা হলুদ মলাটের রঙ, কিংবা বিপ্লবের অরুণাভা) তার পরিবেশিত জীবনবোধকে রঞ্জিত করে, অথচ জীবনের বাকি বর্ণগন্ধগুলির সম্পর্কে স্বল্পবাক কিংবা নীরব থেকে যায়, তবে তা তাঁর সেই গোষ্ঠীগত অচেতনতার ফল, লেখকের ব্যক্তিগত নৈতিক দায়বদ্ধতা তাতে নেই।

লেখক তাঁর বাস্তবকে গড়ে তোলেন, যে দৃষ্টিবিন্দু থেকে তিনি বিষয়টিকে দেখছেন তার ওপর নির্ভর করে। তার অবস্থান বা দৃষ্টিবিন্দু তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। কাল ও সমাজের বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে তাঁর স্থানাংকই নির্ধারণ করে দেয় তার দৃষ্টিবিন্দুকে। তার ফলে, চোখের একেবারে সামনে থাকা ক্লেদখণ্ডকে যদি অনেক দূরে দাড়ানো বিরাট বিষ্ণুমূর্তির চেয়ে তিনি বড় করে দেখেন ও দেখান (কিম্বা, ধরুন, দুটি মানুষের সম্পর্কের মধ্যে তিনি শারীরিক আমোদটাকেই বড় করে দেখলেন, কিন্তু চরিত্রগুলোর সামাজিক অবস্থান, তাদের সম্পর্কের ও ঘটনাপরম্পরার বাস্তবতা/ অবাস্তবতাগুলো গৌণ অথবা নিরুচ্চার রয়ে গেল), তাতে তাঁর সচেতন দায়বদ্ধতা নেই।

লেখকের লেখায় ‘অপ্রয়োজনীয়’ বৈপরিত্য, বাস্তব থেকে ‘নাহক’ প্রস্থান, ‘অনাবশ্যক’ চিৎকার অথবা নীরবতাগুলো খুঁজে বার করবার দায়িত্ব পালন করে থাকেন অভিজ্ঞ ও বিদগ্ধ সমালোচক। জীবন বা সমাজের নানাবিধ স্থানকালসাপেক্ষ সত্যগুলোকে ধ্রুব বলে ধরে নিয়ে তার থেকে কোনও লেখায় কতদূর বিচ্যুতি ঘটল সেইটি মেপে নিয়ে তাঁরা সাহিত্যের মূল্যায়ন করেন। এই সত্যগুলির ধ্রুবত্ব বা চিরন্তনত্বের নিরুপণও হয়ত তাঁরা করে থাকেন, কিন্তু, কিছু মহান ব্যতিক্রম ভিন্ন তা-ও সাধারণত ঘটে কোনও এক বিশেষ যুগে বিশেষ এক নরগোষ্ঠীর মূল্যবোধের নিরিখে। অতএব, দেশকালগত অবস্থান বদলালেই আকাশের ‘ধ্রুবতারা’টার মতই এই ধ্রুব সত্যগুলোও বদলে যায়। কালকের নিন্দিত সাহিত্য আজকের নন্দিত সাহিত্যের মর্যাদা পায়, অথবা তার উল্টোটা। যেমন ধরুন, ৭৪ বছর আগে, শনিবারের চিঠির ১৯৪৪ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যাতে ‘সংবাদ সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধে সমালোচনা বার হয়েছিল এইরকম—

“কবি জীবনানন্দ (জীবানন্দ নহে) দাশকে আর ঠেকাইয়া রাখা গেল না; রসের যে তুরীয় লোকে তিনি উত্তরোত্তর উত্তীর্ণ হইতেছেন বুদ্ধদেব বসু অথবা সমর সেনের প্রশংসা সেখানে আর পৌঁছিবে না। জলসিড়ি নদীর ধারে যেখানে ধানসিড়ি খেত তাহারই পাশে জাম-হিজলের বনে তাঁহার মন এতকাল পড়িয়া ছিল; নাটোরের বনলতা সেন সেখান হইতে তাঁহাকে উদ্ধার করিয়া কাঁচাগোল্লা খাওয়াইয়া অনেকটা দুরস্ত করিয়া আনিয়াছিলেন। কিন্তু

কতক্ষণ থাকে শিলা শূন্যেতে মারিলে।

কতক্ষণ জলের তিলক রহে ভালে।।

—জাল ছিঁড়িয়া তিনি আবার ভাগিয়াছেন—চিতাবাঘিনীর ঘ্রাণে ব্যাকুল ঘাইহরিণীর মত। আর তাঁহাকে ফিরিয়া পাওয়া যাইবে না।”

অথবা তার সেই অসাধারণ পংক্তিগুলি—

আকাশের আড়ালে আকাশে

মৃত্তিকার মত তুমি আজ

তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।

হৈমন্তিকী,

তোমার হৃদয়ে আজ ঘাস।

এ সম্বন্ধে ‘শনিবারের চিঠি’র সমালোচকের উক্তি—

“প্রেয়সীকে আমরা এতদিন হৃদয়ে লইতাম—ভালোবাসিতাম। এইবার প্রেয়সীর হৃদয়ে চরিবার দিন আসিল। একসঙ্গে দেহের আহার ও মনের ওষুধ—এ সম্ভাবনার কথা কে কল্পনা করিতে পারিয়াছিল?”

আবার এর মাত্রই বত্রিশ বছর পরে ১৩৭৬-এ ‘কবি জীবনানন্দ দাশ’ বইতে কোন এক প্রসঙ্গে দেখি সঞ্জয় ভট্টাচার্য বলছেন, “চল্লিশের দশকে বিপ্লব বিশ্বাসী কবিদের হট্টগোলে নির্জনতার সাধক জীবনানন্দ ভবিষ্যতের সুস্থ মানব-সমাজের পথেই চলেছেন কবিতার ভিন্ন আলো জ্বেলো।”

একই সমাজ, একই কবি, অথচ মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে তার ভিন্নধর্মী কাব্যসৃষ্টির প্রতি সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গীর কী আকাশ পাতাল ভেদ!

এহেন তরলচরিত্রতা সত্ত্বেও একজন যোগ্য সমালোচক কিন্তু তাঁর নিজস্ব স্থান-কালে একটি বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেন। কোন নির্দিষ্ট স্থান-কালে সৃষ্ট একটি সাহিত্য, তার সমালোচনা হচ্ছে যে সময়ে তার সমকালীন মূল্যবোধের নিরিখে কতটা প্রয়োজনীয় বা গ্রহণযোগ্য, অথবা সেই বিশেষ স্থান-কাল খণ্ডের জন্য কী প্রকার সাহিত্য উপযোগী হতে পারে সেই মূল্যায়নটি ঘটে বিদগ্ধ সমালোচকের কলমে। নিরপেক্ষতা, গভীর ও ব্যপ্ত পড়াশোনা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে মেগালোম্যানিয়ার অনুপস্থিতি, এই তিনটে গুণ তাঁর সমালোচকের চেয়ার অলঙ্কৃত করবার তিনটে প্রধান যোগ্যতা।

তবে এ-প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, সে মূল্যায়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশ-কাল নিরপেক্ষ নয়। ফলস্বরূপ যেকোন একটা সাহিত্য যথেষ্টপরিমাণ সৃষ্টিধর্মীতার স্বাক্ষর বহন করলে, সমালোচকের হাজার মৃত্যুদণ্ডদানেও তা আউটডেটেড হয়ে যায় না। তার পক্ষে অনুপযুক্ত সময়ে তা হয়ত বিস্মৃতির গহ্বরে বিশ্রাম নিতে যায়, তবে উপযুক্ত সময় এলেই ফের তা শীতঘুম ভেঙে জেগে উঠে বের হয়ে আসে সেই গহ্বরের থেকে। অন্যদিকে, সমালোচনা কালনির্ভর। এক সময়বন্ধনীর সমালোচনা অন্য সময়বন্ধনীতে এসে প্রায়শই আউটডেটেড ও ফলত নিষ্প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

পেশাদার সমালোচকের এক্তিয়ার তাই অনেকটা অন্যের বাজারের নীরিখে সম্পত্তির মূল্যায়ন করে সম্মান দক্ষিণ প্রাপক ভ্যালুয়ারের মত। সমসময়ের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে একটি সাহিত্যকীর্তির মূল্যায়ন করেই তার কাজ শেষ। এর বাইরে সেই সম্পত্তির হত্যা বা ভোগদখল করার অধিকার তাঁর নেই।

এ-তো গেল মসীজিবি বেচারা সমলোচকপ্রবরের কথা। খবরের কাগজের কিংবা সাহিত্যপত্রিকার এক কোণে তাঁদের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর টিমটিম করে জলে টলি কিংবা বলিউডের পাত্রপাত্রীসম্বাদের বৃহদোজ্জ্বল ব্লো-আপের পাশে।

প্রকাশকের অবস্থান আবার আরেকরকম। তিনি ধাত্রীর কাজটা করেন। যে কোন সাহিত্যই অপরিচয়ের অন্ধকার থেকে পরিচিতির জগতে ভূমিষ্ট হয় তারই হাত ধরে। অনেক যত্নে অনেক সাবধানতায় এই কাজটি সারতে হয় তাকে। তারপর অর্থমূল্যটি গুণে নিয়ে মঞ্চ থেকে তার প্রস্থান। সাহিত্যকর্মটির খ্যাতি বা অখ্যাতি সেই দুয়েরই পরোক্ষ ভাগীদার তিনি থাকলেও জনমানসে তিনি বইয়ের নীচে এক লাইনে লেখা প্রকশনার নাম ও লোগোটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাহিত্যপ্রেমী পাঠক সেটিকে অবহেলায় উপেক্ষা করে ডুব দেয় সাহিত্যকীর্তিটির মধ্যেই। সেটাই স্বাভাবিক। নতুন প্রেমিকটি কি তার প্রেমিকাকে কখনো তার ধাত্রীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করবে?

উদাহরণস্বরূপ বলি, বিভূতিভূষণকে আমরা কে না জানি, কিন্তু তার সর্বজনপরিচিত প্রথম বড়মাপের উপন্যাস পথের পাঁচালী প্রথম প্রকাশ করেছিলেন কে এবং কোন পত্রিকায় সেই নামদুটো, গুটিকয় সাহিত্যের শিক্ষক, ছাত্র কিংবা অতি উৎসাহী সাহিত্যপ্রেমী ছাড়া ক’জন মনে রেখেছেন? না রাখাটা দোষার্হ নয়। সেটাই স্বাভাবিক। সুনীল গাভাসকার, উত্তমকুমারদের বুড়ি ধাইদের আর কে কবে কোথায় মনে করে রেখেছে?

সাহিত্যস্বর্গের এই ত্রিদেব—-লেখক, প্রকাশক ও সমালোচক, এই তিনজনকে ছেড়ে এবারে আসা যাক সাহিত্যের পরমাত্মা পাঠকের কথায়। ইনি সর্বভূতে বিরজমান। লেখক, প্রকাশক বা বিদগ্ধ সমালোচক হতে পারেন কেবল মুষ্টিমেয় মানুষ। তার জন্য হয় ঈশ্বরদত্ত, পিতৃদত্ত বা স্বোপার্জিত অর্থ এবং/অথবা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ মেধার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, পাঠক হতে পারেন আপামর শিক্ষিত জনসাধারণ। খুব বেশি অর্থ অথবা মেধার প্রয়োজন এখানে তত নেই। আর এই ওমনিপ্রেজেন্ট পাঠককে উদ্দেশ্য করেই লেখকের লেখা, তাঁর জন্যই প্রকাশকের প্রকাশনা, সমালোচকের সমালোচনা। তাঁর দরবারে হাত পেতে দাঁড়ান এঁরা সকলেই। কেউ হন যশোপ্রার্থী, কারো চাহিদা রুজিরটি, কারো বা আবার দুটোই চাই।

তবে কিনা প্রশ্ন হল কোন মানুষ পড়তে জানলেই তিনি যেকোনো সাহিত্যকীর্তির পাঠক পদবাচ্য হবেন কি? নতুন ইংরিজি শেখা এক ভদ্রলোক লর্ডসে খেলা দেখতে গিয়ে কম্পটন স্ট্যাণ্ডে বসেছেন। সেখান থেকে পাশেই ইনভেস্টেক মিডিয়া সেন্টারের দিকে চোখ পড়তে ইচ্ছে গেল ওইখানটাতে সুন্দর ফাঁকাফাঁকায় গিয়ে বসলে কেমন হয়? পাশে দাঁড়ানো নিরাপত্তাকর্মীকে ডেকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ক্যান আই গো অ্যাণ্ড সিট দেয়ার? উত্তরে বৃটিশ নিরাপত্তাকর্মী মুচকে হেসে জবাব দিলে, ইয়েস স্যার ইউ ক্যান বাট ইউ মে নট।

পাঠকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তাই। সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই একটা লেখা কিনে ফেলে বা ইনটারনেট থেকে ডাউনলোড করে নেবার পর, ‘ইউ ক্যান’। কিন্তু আপনার জ্ঞান ও রুচির পরিসীমা অনুযায়ী কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘ইউ মে নট’। কাগজের বা পর্দার গায়ে অক্ষরগুলো হয়ত প্রত্যেকেই পড়তে পারেন, যেমন পারেন পয়সা থাকলে যেকোনো ক্রিকেটের মাঠে ঢুকতে, একটি টিকিট কেটে। কিন্তু সেটি পারলেও মাঠে ও পাঠে প্রত্যেকেরই কিছু আঙিনা নির্দিষ্ট থাকে। ক্রীড়ারসিকের ক্ষেত্রে টিকিটের চরিত্র বা পাঠকের ক্ষেত্রে তার জ্ঞানের ক্ষেত্র, গভীরতা ও বিস্তারের মাপ অনুযায়ী তাঁর সেখানে আসন মেলে। যেমন ধরুন এই অধম যদি পয়সা দিয়ে থিওরি অব রিলেটিভিটির মূল বইটা কিনেও ফেলেন তাহলেও তার সেটি পড়বার অধিকার জন্মায় কি? আর পড়লেও তারপর সমালোচকের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ে, “কী ফালতু বই। একেবারে দুর্বোধ্য। এসব লোক কেন যে লিখতে আসে!” এমন মন্তব্য ঘোষণার অধিকার জন্মায় কি? এবং তা করলে নিজেকে কিঞ্চিৎ উপহাস্পদ করা ছাড়া আর কিছুই লাভ হবে না।

তবে হ্যাঁ, উপহাস্পদ হবার ঝুঁকি নিয়েও, নিজের পাঠসীমার বাইরের কোনো লেখা পড়ে মতামত জানানোটা পাঠকের অধিকারের মধ্যে পড়ে বইকি। ইন্ডাস্ট্রিটাই তো চলছে তাঁর পয়সায়। যেমন তাঁর অধিকার রয়েছে কিনে আনা একটা লেখা পড়ে তাতে ভুল তথ্য থাকলে তা ধরিয়ে দেবার, বা ভাল না লাগলে সেটা জানাবার। কিন্তু, পয়সা খরচ করে (বা না করে) একটা লেখা পড়বার পর যেটা তাঁর অধিকারের মধ্যে পড়ে না তা হল তাকে গলা টিপে মারবার জন্য সংঘবদ্ধ ‘পবিত্র যুদ্ধ’ শুরু করা। যেটা সদ্যই ঘটে গেল এস হরিশের মালয়ালাম উপন্যাস ‘মিশা’ নিয়ে।

একটা রসালো উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন গিয়ে আদিরসের সাহিত্য। কামসূত্র। লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার। রাতভোর বৃষ্টি। প্রজাপতি। কামসূত্র অন্যকালের কাজ। সে-সময় রানি ভিক্টোরিয়ার মূল্যবোধের ভাইরাস পাঠকের রক্তে ঢোকেনি। কিন্তু অন্যগুলো প্রকাশিত হতে পাঠককূলের একটি অংশ তো সোচ্চার হয়ে তারস্বরে গর্জন জুড়েছিলেন। তাঁদের নীতিবোধ এই সাহিত্যগুলো স্থান দিতে চেয়েছিল সাধারণের পাঠযোগ্যতার সীমার বাইরে। এই প্রতিবাদী দল ক্ষমতাশালী ছিলেন সমাজে। ফলস্বরূপ জনগণেশের নেতৃকূলের তর্জনে বইগুলোকে সরকারী নির্দেশে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল।

একদিক থেকে দেখলে, তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবাদীরা একেবারে ঠিক ছিলেন। তার কারণ এই নয় যে সাহিত্যকীর্তিগুলো একেবারেই সভ্যতা ও মানবতাবিরোধী। তার কারণ, যাঁরা সোচ্চার হয়েছিলেন, সাহিত্যপাঠের অঙ্গনে তাঁদের টিকেট ওই সাহিত্যের গ্যালারির জন্য নয়।

কিন্তু সমস্যাটা এই প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়াটা না। সমস্যা হল তার কণ্ঠরোধ করবার চেষ্টা। যেমন অশ্লীলতার দায়ে লেডি চ্যাটার্লি কিংবা লোলিটাকে ব্যান করানো, কিংবা একেবারে ঘটমান বর্তমানে এস হরিশের মালয়ালাম উপন্যাস ‘মিশা’কে ব্যান করবার চেষ্টা (যে চেষ্টাকে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি একটা অসামান্য রায় ব্যর্থ করে দিয়েছেন)।

হ্যাঁ। কোনো পাঠকের কাছে কোনো সাহিত্য নিম্নমানের বা নিম্নরুচির অথবা তা অন্য যেকোনো সামাজিক/রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক/আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক মনে হলে তার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ জানাবার অধিকার আছে। অধিকার আছে তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে তা দেখিয়ে দেবার। কিন্তু যাকে কুরুচিকর বা ক্ষতিকর বা অপটু সাহিত্য বলে পাঠকের কোনো শ্রেণী মনে করছেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হোক যাকে আপনারা সৎ সাহিত্য বলে মনে করেন তার সৃজন করে, তারপর এই দুই ধরণের সাহিত্যকে খোলা ময়দানে লড়তে দিয়ে। ও বাড়ির রাখালটা পাজির পা’ঝাড়া বলে তার গলা টিপে মেরে ফেলে ভালো ছেলে গোপালকে দিয়ে তাকে ‘প্রতিস্থাপন’ করবার অধিকারটা গোপালের সমর্থকদের দিল কে? রাখালের সমালোচনা করুন, কিন্তু তাকেও বেঁচে থাকবার ও বেড়ে ওঠবার অধিকার দিন। দেখা যাবে, হয় তো পরবর্তী কোনও এক সময়ে সে একজন কেউকেটা হবে! আমরা বরং আমাদের গোপালকেই মনযোগ দিয়ে মানুষের মত মানুষ করবার চেষ্টা করে যাই। রাখালের সাথে লড়াইতে গোপাল যদি হেরে যায় তবে তাকে রাখালের বদমায়েশি হিসেবে না দেখে বরং গোপালের দুর্বলতা হিসেবে দেখা যাক ও তাকে সবল করে গড়ে তোলবার চেষ্টা করা যাক। তাতে সবার মঙ্গল।

সত্যি বলতে কী, একটা প্রশ্ন জাগে মনে সবসময়। সুস্থ সংস্কৃতি বা সৎ সাহিত্যের চিরায়ত পথটা কী? সংস্কৃতিতে চিরায়ত বলে কিছু হয় কি? দেশকালনিরপেক্ষ চিরায়ত সত্য জীবনে পাওয়া দুষ্কর, অতএব সাহিত্যেও তা মিলবে না। কারণ সাহিত্য জীবনেরই দর্পন এবং জীবন অংকের সূত্রকে থোড়াই কেয়ার করে চলে। চিরায়ত কোনও কিছু খুঁজতে হলে তাকে অংকের বইয়ের পাতায় খুঁজলেই হয়। সেখানে সর্বদাই দুয়ে দুয়ে চার হয়ে থাকে, সে অশোকের যুগেই হোক, কিংবা হিটলারের যুগে।

মিশা একটা বিপজ্জনক উদাহরণ। ছাপা সাহিত্যের ক্ষেত্রে লেখকের কণ্ঠরোধ আটকাতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ অবধি হতে হয়েছে সেখানে। আর, একবার যখন হয়েছে তখন বারবারই সে পথে আক্রমণ আসবে।

কিন্তু সে ছাড়াও আরো একটা নতুন ক্ষেত্রে এই বিপজ্জনক প্রবৃত্তিটা অধুনা দেখা দিচ্ছে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। সেটা হল সোশ্যাল মিডিয়া। সাহিত্য নিয়ে সমালোচনার এ এক শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু সমস্যা হল, পাঠকের ব্যক্তিগত ভালোমন্দের বোধকে জনতার দরবারে মুহূর্তে হাজির করে তা পাঠক ও প্রকৃত সমালোচকের মধ্যেকার তফাৎটাকে দ্রুত ঘুচিয়ে দিচ্ছে।

বাংলা ও ইংরিজি এই দুটো ভাষাতেই দেখতে পাচ্ছি সোশ্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য যোগ্য ও ধী-যুক্ত সমালোচনার পাশাপাশি, মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, কোনো একটা লেখা কোন পাঠকের পছন্দ না হলে তিনি একবার থমকে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটা কখনো নিজেকে করছেন না যে ‘এ-লেখাটা আমার অঙ্গনের কি? একবার জানতে চাইব কি কেন এমনটা লেখা হল?’ সে পথে না হেঁটে, তিনি সরাসরি সমালোচকের চেয়ারটায় গিয়ে বসে পড়ে, ব্যক্তিগত অপছন্দটাকে সরাসরি লেখাটার বিরুদ্ধে অ্যাবসলিউট টার্মে উগরে দিচ্ছেন। তারপর লেখার পাশাপাশি লেখককেও আক্রমণ করে বসছেন, নিজের দৃষ্টিকোণকেই একমাত্র ধ্রুব ও নির্ভুল বলে ধরে নিয়ে।

প্রকৃত শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ সমালোচকের সঙ্গে এঁদের তফাৎটা হল, কোনো লেখা এঁদের মনঃপূত না হলে সেটা যে তাঁর নিজের বোঝবার ত্রুটি বা জ্ঞানের খামতির জন্যও হতে পারে, সেইটে এঁরা স্বীকার করবেন না। এবং অবিলম্বে লগ ইন করে লেখা ও লেখকের তুলো ধোনা শুরু করে দেবেন।

আক্রমণগুলো এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাঠকের নৈতিক না হলেও অন্তত গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমার মধ্যে। তাতে বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীকে খানিক প্রভাবিত করে লেখাটার পাঠক সংখ্যায় সাময়িক বাধা তৈরি করা ছাড়া কারো কোনও বড়ো ক্ষতি হয় না। কিন্তু এরই মধ্যে লুকিয়ে আছে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সাহিত্যের ওপর মরাল পোলিসিং এর বিপজ্জনক বীজ। সাবধান না হলে একদিন তার অঙ্কুরোদ্গম হয়ে, তারপর মহীরুহে বদলে গিয়ে এই নতুন মাধ্যমকেও সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গীর শক্তিমান পাঠকবাহিনীর দখলে এনে ফেলতে পারে। কোন লেখাটা পড়া উচিত আর কোন লেখাটা তার লেখকের মতই জঘন্য সেই ফতোয়া ঘোষণা করেন যে পাঠক-টার্নড-সমালোচক(রা), তিনি(তাঁরা) তখন হয়ে উঠতে পারেন এই বৈদ্যুতিন খাপ পঞ্চায়েতের প্রধান। আর, এরপর আমাদের সাম্প্রদায়িক ও বাজারনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমে বা খুব সহজেই এই প্রধানরা হয়ে উঠতে পারেন ক্ষমাতাশালী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেক্সাসের হাতের পুতুল। (বেশি কিছু নয়, একটা বার্ষিক মোটা টাকার সরকারি/বেসরকারি পুরস্কার আর খবরের কাগজে ছবি, ওইটুকুই এখনকার একজন মানুষের আত্মার বিক্রয়মূল্য হবার জন্য প্রায়শ যথেষ্ট।) এবং তা যদি হয় তাহলে এই শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, কিছু সুনির্দিষ্ট পথের বাইরে সাহিত্যচর্চার সর্বশক্তিমান মারণাস্ত্র।

নাহক ভয় পাচ্ছি, তাই কি? তাই হলে তো বাঁচা যেত। প্রার্থনাও করি তাই যেন হয়। কিন্তু কথা হল, ভয় লাগে। এ-দেশের বুকে শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতির পালাবদলের অনেক সশব্দ ও নিঃশব্দে আন্দোলন তো হয়ে গেল। কিন্তু বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে, বহু আশার জন্ম দিয়ে অন্তিমে কেউ কথা রাখেনি। কে, কেন কথা রাখেনি সে হিসেব করবেন পণ্ডিতেরা। কিন্তু, আমরা যারা ঘরপোড়া গরু, যারা বহু- বহুবার বিশ্বাস করে ঠকেছি, স্বপ্ন দেখে ঠকেছি, দেখেছি কেমন ভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের রক্তিম প্রতিশ্রুতি বদলে যায় তোলাবাজের রক্তচক্ষুর ধমকানিতে, তাদের কাছে ওপরে বিবৃত এই সামান্য ইঙ্গিতগুলোও ভবিষ্যতের কোনো মারণব্যাধির সংকেত বহন করে আনে। বৈদ্যুতিন মিডিয়ায় কদাচিত কোনো অনভিজ্ঞ পাঠক-কাম সমালোচকের অপটু কিন্তু বিষাক্ত কাদা ছোঁড়া ও তাতে লাইক ও কমেন্টের বহর দেখে তাই ওতে সিঁদুরে মেঘের দুঃস্বপ্ন দেখি। আসুন সতর্ক থাকা যাক।

পাঠকেরা যা পড়ছেন