জুলাই ২০১৯



প্রচ্ছদশিল্পী - প্রতিম দাস ও মিশন মন্ডল


(প্রতিটি লেখা Hyperlink করা আছে। লেখার ওপর ক্লিক করে পড়ুন।)


গল্প


লাভক্রফটিয়ান হরর


সাইকোলজিকাল হরর

আশ্রয়ের আঁধার তানজিরুল ইসলাম
নিশি-যাপন সম্বুদ্ধ সান্যাল
পুতুল বিভাবসু দে
কুয়াশার আড়ালে সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
বাতাসিয়ার পরীরা সায়নদীপা পলমল
দ্য ক্যাট ফ্রম হেল স্টিফেন কিং অপরেশ পাল
কালো বিড়াল এডগার অ্যালান পো প্রতিম দাস
পুতুল আগাথা ক্রিস্টি মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
খাদ ডরোথি কুইক কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রবন্ধ


অনুবাদ কমিকস




সম্পাদকের কথা

প্রিয় পাঠকবন্ধুরা,

প্রথমেই আপনাদের সবাইকে জানাই নতুন বাংলা বছরের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। শারদ সংখ্যার পর আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম সাহিত্যের আলাদা আলাদা গোত্র নিয়ে এক একটি সংখ্যা করার, যাতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার বিস্তর সুযোগ থাকে। সেই মত গত জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছিল কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি সংখ্যা, আর নতুন বাংলা বছরের শুরুতে আমাদের নিবেদন ছিল বিশেষ অপরাধ ও রহস্য সংখ্যা। বেশ কয়েকটি জনরা ফিকশনের ওপর সংখ্যা করার পর এবার আমাদের পরিকল্পনা বিভিন্ন সাবজনরা নিয়ে চর্চা করার। সেই মতো প্রকাশিত হলো ‘লাভক্রফটিয়ান হরর’ ও ‘সাইকোলজিকাল হরর’ নিয়ে ‘পরবাসিয়া পাঁচালী’র বর্ষা ২০১৯ সংখ্যা।

“মানুষের সবচেয়ে পুরাতন এবং শক্তিশালী আবেগ হলো ভয়।

আর, সবচেয়ে প্রাচীন এবং অদম্য ভয় হলো, অজানা-র থেকে আতঙ্ক।”

সাধারণত হরর বলতে আমরা বুঝি ভূত, রাক্ষস বা দানবের গল্প। কিন্তু লাভক্রাফটের দুনিয়াতে “অশুভ, বিকটদর্শন, ভয়ানক সব জীবেরা ঘোরাফেরা করে, অবহেলাভরে কৃমিকীটের মতো “উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে” চেয়ে থাকে মানুষের মতো নগণ্য জীবদের প্রতি। আর মানুষ সেখানে অসহায় – পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোই তার কাজ, এইসব অতি ভয়ানক বিভীষিকাকে এড়িয়ে কিভাবে বাঁচা যায়, সেই আতঙ্কেই সে আধখানা হয়ে আছে!” (সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, এইচ পি লাভক্র্যাফট - জীবন ও সাহিত্য) সেরকমই এক ভিন্নধর্মী হররের সাবজনরা হলো সাইকোলজিকাল হরর, যেখানে ভূতের অস্তিত্বের থেকে বড় হয়ে ওঠে ভয়। এমন এক আতঙ্কময় পরিবেশ তৈরী হয়, যা মানসিকভাবে পাঠকদের অবশ করে দেয়।

প্রতিটি লেখাকে ‘লাভক্রফটিয়ান হরর’ বা ‘সাইকোলজিকাল হরর’ আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে পাঠকের সুবিধার্থে। পাঠকদের মতামত এক্ষেত্রে যে খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা বলাই বাহুল্য। কাজেই ভালো লেগেছে, খারাপ লেগেছে বা মনে দাগ কাটেনি, যে কোনো ধরণের মতামত আমাদের জানাতে ভুলবেন না। আমরা ধন্যবাদ জানাই সমস্ত লেখক ও শিল্পীকে, যাঁদের একের পর এক অসাধারণ কাজে এই সংখ্যা সেজে উঠেছে।

তাহলে আর দেরি কীসের, আতঙ্কের সমুদ্রে ডুব দিন। যাত্রা শুভ হোক!

ধন্যবাদান্তে,

অ্যাপোক্যালিপ্স - লুৎফুল কায়সার

স্বপ্ন

ছোট্ট একটা নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ফারহান। চারদিকে অথৈ সাগর। কালো রাতের আকাশটাকে খুবই বিষণ্ণ লাগছে।

ফারহান জানে না সে এখানে কী করে এলো! আর এসব চিন্তা করার মতো শক্তিও ওর নেই।

শুধুই চেয়ে আছে সে। সামনের দিকে, নিঃসীম আকাশের দিকে...

ঠিক তখনই ওর সামনে এল ওটা। অন্ধকার চিরে বেরিয়ে যেন বেরিয়ে এল প্রাচীন কোন এক অভিশাপ!

ফারহানের মনে হচ্ছিল সে পাগল হয়ে যাবে। ওর জায়গাতে অন্য কেউ থাকলে তারও ঠিক তেমনটাই মনে হত!

পার্থিব পৃথিবীর কেউই ওটাকে দেখে সুস্থির থাকতে পারে না...

হুট করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ফারহানের। ধরফরিয়ে উঠে বসল সে। পুরো শরীর ঘেমে গেছে তার।

একটু ধাতস্থ হয়ে চারপাশে তাকাল সে। নাহ! সব ঠিকই আছে! তাদের সেই পুরনো ঘর, সেই বিছানা, টেবিল ল্যাম্পের সেই বিষণ্ণ আলো আর ওর পাশে শুয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে ইশরাত।

ইশরাতকে ডাকতে গিয়েও ডাকল না ফারহান। গত কয়েক মাসে ওদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব এতোটাই বেড়ে গেছে যে এখন নিজের বউকে ডাকতেও ওর আত্মসম্মানে লাগছে।

চুপচাপ ডাইনিং টেবিলে গিয়ে এক গ্লাস পানি খেল সে। তারপর ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়ল।

যদিও ফারহান জানে যে ওর আর ঘুম আসবে না! এই নিয়ে গোটা সপ্তাহে তৃতীয়বারের মতো সে দেখল স্বপ্নটা!

বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিলো ফারহান। চব্বিশে মে। জুন মাসের এক তারিখে ওদের বিবাহবার্ষিকী!

হেডফোনটা কানে লাগিয়ে ‘সিগারেটস আফটার সেক্স’ ব্যান্ডের ‘অ্যাপোক্যালিপ্স’ গানটা ছেড়ে দিলো সে।

‘মাই লিপস অ্যান্ড ইয়োর লিপস, অ্যাপোক্যালিপ্স!” কোরাসটা শুনতে শুনতে কখন যে ঘুম এসে গেল সেটা টের পেল না সে।

***

ভোরবেলাতে ইশরাতের ডাকে ঘুম ভাঙ্গল ফারহানের। আজকাল খুবই কম কথা বলে ওরা। প্রতিদিন সকালবেলা নাস্তা বানিয়ে ফারহানকে ডেকে অফিসে চলে যায় ইশরাত। রাতের বেলা ফারহানের আগেই চলে আসে সে তারপর খেয়েদেয়ে ফারহানের জন্য টেবিলে খাবার রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবেই চলছে।

কোন রকম আবেগই আর অবশিষ্ট নেই ওদের মধ্যে। তারপরেও কেন যে ওরা দুজন এখনও এক ছাদের নিচে থাকছে তা ওদেরও জানা নেই।

শুক্রবারের দিন একদম ভোর ছটা থেকে ইশরাতের ডিউটি। এজন্য সকাল সকালই নাস্তা বানিয়ে চলে যায় সে।

বেশ স্বচ্ছলই বলা যায় ওদের। তাই ফারহান বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে একজন কাজের মেয়ে রাখার। যাতে করে ইশরাতকে আর কষ্ট করে রান্না না করতে হয়।

কিন্তু প্রচণ্ড খুঁতখুঁতে ইশরাত ব্যাপারটাতে মত দেয়নি। পরের হাতের রান্না সে খেতে চায় না।

এইসবই ভাবছিল ফারহান ঠিক তখন ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল ইশরাত।

খুব বেশী লম্বা নয় ইশরাত, বাঙালি মেয়েদের মতোই মাঝারি উচ্চতার। গায়ের রঙ শ্যামলা আর মাথায় দীঘল কালো চুল। চেহারা আহামরি কিছু না হলেও কেমন যেন একটা অপার্থিব আকর্ষণ আছে ইশরাতের চোখ দুটোতে। ভার্সিটিতে পড়ার সময়ে ইশরাতের ওই চোখদুটো দেখেই প্রেমে পড়ে গেছিলো ফারহান। আজকে লাল একটা সালোয়ার কামিজ পরেছে সে, খুবই সুন্দর লাগছে দেখতে ওকে।

“টেবিলে খাবার রাখা আছে, দশ মিনিটের মধ্যে খেয়ে নিও, আমি যাচ্ছি।” ঠান্ডা গলায় বললো ইশরাত।

“আজ আমার ডিউটি নেই, পরে খাব।” মোবাইল টিপতে টিপতে উত্তর দিল ফারহান।

“খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে, ওভেনে গরম করে নিও।” এই বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল ইশরাত।

“ইশ...শোন...” নিজের অজান্তেই যেন বলে উঠল ফারহান।

অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। আজ বহুকাল পর পিছন থেকে ফারহান তাকে ডেকেছে! সবচেয়ে বড় কথা ফারহান তাকে ‘ইশ’ বলে ডেকেছে। ভার্সিটির প্রেমের সেই উদ্দাম দিনগুলোতে এই নামেই তাকে ডাকত ফারহান।

“হুম বল।” চশমাটা ঠিক করতে করতে বলল ইশরাত।

“তুমি খেয়েছ?”

“তোমার শরীর ভালো তো?”

“কেন?”

“নাহ! এতদিন পর আমি খেয়েছি না খাইনি সেই খবর নিচ্ছ!” ইশরাতের মুখে ব্যঙ্গের হাসি।

“যাও যাও, আমি খেয়ে নেব।” বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল ফারহান।

“তুমি চিরকালই এমন উদ্ধত একটা মানুষ।” এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ইশরাত।

কালো প্রভাত

সকাল সাড়ে সাতটার মতো বাজে।

চার্চরোডে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধীরে সুস্থে একটা গোল্ডলিফে টান দিচ্ছে ফারহান। চার্চরোডকে বলা হয় রাজশাহীর সবচেয়ে শান্ত রাস্তা। এমনিতেই রাজশাহী শান্ত শহর তার ওপর এই রাস্তাটা একটু বেশীই শান্ত।

রাস্তাটার ডানপাশে খ্রীষ্টানদের গির্জা। মূলত এইজন্যই রাস্তাটার নাম হয়েছে চার্চরোড। সেখান থেকে একটু এগিয়ে গেলে রাজশাহী চিড়িয়াখানা। গির্জার ঠিক সামনে রাস্তার বামপাশে একটা পরিত্যক্ত শপিং কমপ্লেক্স। রাতের বেলাতে তো রাস্তাটা একদম সুনসানই হয়ে যায়।

হাঁটতে হাঁটতে টি-বাধের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ফারহান। পদ্মার এই বাঁধটার আকৃতি অনেকটা ইংরেজী ‘টি’ অক্ষরের মতো। সেজন্যই এটার নাম টি-বাঁধ। সকাল সকাল জায়গাটা বলতে গেলে প্রায় নির্জনই থাকে।

***

একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বেশ আয়েশ করে সিগারেট টেনে চলেছে ফারহান। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছে ছাত্রজীবনের সেই দিনগুলো।

ভার্সিটিতে পড়ার সময়ে এই টি-বাঁধে কতোবার ইশরাতকে নিয়ে ঘুরতে আসত সে। মাঝে মাঝে নৌকাতে করে ঘুরতেও যেত ওরা। ঢেউয়ের কবলে পড়ে নৌকা কেঁপে উঠলে ভয় পেয়ে ওকে আঁকড়ে ধরত ইশরাত।

সেই দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি! ওরা দুজনেই আজ অবসাদগ্রস্থ দুজন স্বামী-স্ত্রী ছাড়া আর কিছু না।

ফারহানের থেকে বেশ দূরে কলেজের ইউনিফর্ম পরা দুজন ছেলে-মেয়েকে দেখা যাচ্ছিল। সকাল সকাল টি-বাঁধ এলাকাতে লোকজন বলতে গেলে থাকেই না! সেই সুযোগেই হয়ত প্রেমালাপ সেরে নিতে এসেছে ওরা।

একটু পরে নিচে দিকে নেমে গেল সেই যুগল।

মৃদু হাসল ফারহান। বাঁধ থেকে নিচে বিরাট আকৃতির সেই পাথরগুলোতে বসে পদ্মার ঢেউ দেখতে দেখতে প্রেম করার মজাই আলাদা। ইশরাতকে নিয়ে সে নিজেই কতবার এমনটা করেছে।

ঘড়ির দিকে তাকাল ফারহান। কেবল সোয়া নয়টা বাজে! সময় কি খোঁড়া হয়ে গেছে নাকি? সারাটা দিন কী করে পার করবে সে? বন্ধু-বান্ধবরাও তেমন কেউই রাজশাহীতে নেই! এই পিছিয়ে পড়া শহরটাতে কেউ থাকতে চায় না। ভাগ্যক্রমে ওর আর ইশরাত দুজনেরই পোস্টিং এখানে হয়েছে বলেই ওরা থাকছে। ওর সাথে যদি ইশরাতের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তবে সেও আর এখানে থাকবে না। বাড়িতে ফিরে গিয়ে মোবাইল-ইন্টারনেটে সময় কাটানোর কথাটাও একবার ভেবে দেখল ফারহান। নাহ! ওসব তো রোজই করা হয়!

হঠাৎই নারীকণ্ঠের একটা আর্তচিৎকারে ঘোর কাটল ওর। ধড়ফড় করে দৌড়ে গেল সে। চিৎকার আসছে বাঁধের নিচ থেকে।

আরেকটু এগিয়ে গিয়ে ফারহান দেখতে পেল যে চিৎকার করছে সেই মেয়েটা যাকে একটু আগেই সে দেখেছে, পাশে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে ওর সাথে থাকা ছেলেটা।

তাড়াতাড়ি করে নিচের দিকে নামতে লাগল ফারহান।

পিছনে কিছু মানুষের গলা শুনতে পেল সে। একবার ঘুরে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে মেয়েটার চিৎকারে আশে-পাশের কিছু বাড়ি থেকেও মানুষ বেরিয়ে এসেছে।

প্রায় দুই-তিন মিনিট পর ফারহান পৌঁছে গেল সেই ছেলে-মেয়েদুটোর কাছে।

“কী হয়েছে? এভাবে চিৎকার করছেন কেন?” অবাক কণ্ঠে বলে উঠলো সে।

মেয়েটার চিৎকার ততক্ষণে থেমে গেছে। হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা হাত বাড়িয়ে ডান দিকে নির্দেশ করল।

সেদিকে তাকিয়েই গায়ের রক্ত হিম হয়ে এল ফারহানের! একজন মধ্যবয়স্ক লোকের দেহ পড়ে আছে! চোখদুটো ভীষণ বাজেভাবে থেঁতলে দেওয়া লোকটার আর লোকটার বুকের ওপর পড়ে আছে পাঁচ-ছয় বছর বয়স্ক একটা বাচ্চা মেয়ে।

কোনমতে এগিয়ে গিয়ে লোকটার নাড়ি পরীক্ষা করল ফারহান। নাহ! নাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। লোকটা মারা গেছে! বাচ্চা মেয়েটার নাকের কাছে হাত দিয়েই সে বুঝতে পারল যে মেয়েটা তখনও জীবিত!

“এই যে ভাই! লাশ-টাশ নাকি ওগুলো? আপনি কেন হাত দিচ্ছেন? পুলিশ এসে হাত দিবে!” পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল।

ফারহান ফিরে তাকিয়ে দেখল তার পিছনে জনা-পাঁচেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে কে কথাটা বলেছে সে বুঝতে পারল না।

“এই যে ভাই, কথা শুনেন না? সরেন ওইখান থেকে! থানাতে ফোন দিয়েছি আমি!” মোটা লম্বামতো একজন লোক বলে উঠল। ফারহান বুঝতে পারল যে এই লোকটাই আগে কথাগুলো বলেছিল।

“আপনার পরিচয়?” ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করল ফারহান।

“আমি আবুল হোসেন! এই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর! এইখানে পাশেই বাড়ি। চিৎকার-চেচামেচি শুনে বাইরে এলাম। আপনে কে ভাই? আদব কায়দা কি কিছুই জানেন না?” রাগী কণ্ঠে বলে উঠল লোকটা।

“ইন্সপেক্টর কাজি ফারহান জারিফ, ডিবি।” নিজের আইডি কার্ডটা লোকগুলোর সামনে মেলে ধরে বললো ফারহান।

“স্যার! সরি আমি বুঝতে পারিনি।” এই বলে পিছিয়ে গেল আবুল হোসেন। ভদ্রলোক যে বেশ ভয় পেয়েছে বোঝাই যায়।

“কোন সমস্যা নেই কাউন্সিলর সাহেব। থানায় ফোন দেওয়া হয়েছে না? আসুক ওরা। ওদের সাথে প্রথমে আমিই কথা বলব। আর শুনুন বাচ্চা মেয়েটা বেঁচে আছে। ওকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। তাড়াতাড়ি কিছু একটা ব্যবস্থা করুন।” বলে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল ফারহান।

“স্যার বলছিলাম কী, হাসপাতাল তো দূর হয়ে যায়। তার চেয়ে ওকে পর্যটন মোটেলের ওদিককার ক্লিনিকটায় নিলে ভালো হয় না? ওখানকার ডাক্তার আপা খুবই ভালো!” মাথা নিচু করে বলল আবুল হোসেন।

বিরক্ত লাগছে ফারহানের! জানত এই কথাটাই শুনতে হবে তাকে। তবে মেয়েটার শরীর কাঁপছে! এখনই ওকে ডাক্তারের কাছে না নিতে পারলে খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে হাসপাতাল একটু দূরই হয়ে যায়।

“আপনি আমার সাথে আসুন কাউন্সিলর সাহেব, আর আপনার লোকদের বলে দিন যে পুলিশ আসার পর ওরা যেন অপেক্ষা করে। আমি না আসা পর্যন্ত যেন মৃতদেহে হাত না দেয়।” বাচ্চা মেয়েটাকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলল ফারহান।

ওরা এগিয়ে চলল সেই ক্লিনিকটার দিকে।

***

“আরে ভাই ঢুকতে দেন, আফা আমারে চিনে! আর রুগীর অবস্থাও ভালা না! সাথে ডিবি অফিসার আছে ওই দেখ!” গার্ডকে বললেন আবুল হোসেন।

“আফা অনেক বড় ডাক্তার। আপনার মতো কাউন্সিলররে পরোয়া করার সময় উনার নাই! আর ডিবি? উনি যে ডিবির লোক তার কী প্রমাণ? বসেন। আফা রোগী দেখতেছে। শেষ হলে এমনেই আপনাদের ঢুকতে দেওয়া হবে।” গার্ডের কণ্ঠ দিয়ে যেন ব্যঙ্গ ঝরে পড়ছিল।

ওদিকে ডাক্তারের ঘরের ওপর লাগান নেমপ্লেটটা দেখে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে ফারহান। ওখানে লেখা রয়েছে

ডা. ইশরাত খানম

এমবিবিএস, এমপিএইচ,

সিসিডি, এমপিএইচসি

আজ কতদিন পর এই ক্লিনিকে এসেছে ফারহান! শুরুর দিকে মাঝে মাঝে ইশরাতের চেম্বারে আসত সে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সবকিছুই বদলে গেছে!

“স্যার! ও স্যার! এই ছোড়া তো বিশ্বাসই করে না আপনি ডিবির লোক।” ফারহানের কানের কাছে এসে বলল আবুল হোসেন।

বাস্তবে ফিরে এল ফারহান। আর সাথে সাথে যেন রক্ত চড়ে গেল তার মাথা। এক হাতে বাচ্চাটাকে শক্ত করে ধরে অপর হাত দিয়ে খপ করে গার্ডের কলারটা চেপে ধরল সে। ছয়ফুট লম্বা ফারহানের সামনে ইঁদুরের মতো অবস্থা হল গার্ডের। ভয়ে চিৎকার শুরু করল সে।

রাগের মাথায় আর কোন হুশই ছিল না ফারহানের।

“ফারহান! এসব কী!” ইশরাতের কণ্ঠে শুনতে পেল ফারহান। সম্ভবত গার্ডের চিৎকার শুনতে পেয়ে বের হয়ে এসেছে সে।

“এখানে কী করছ ফারহান? তোমার কোলে ওই বাচ্চাটা কে?” প্রায় চিৎকার করে উঠল ইশরাত।

বলার মতো কিছুই পেল না ফারহান। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে।

“কাউন্সিলর সাহেব? কী হয়েছে এখানে?” আবুল হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল ইশরাত।

“আফা! আপনি স্যারকে চেনেন? উনি ডিবি অফিসার!” কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল আবুল হোসেন।

“হুম! ডিবি ইন্সপেক্টর কাজি ফারহান জারিফ! আমার স্বামী! আমার চেয়ে ভালো আর ওকে কে চেনে?” ঠান্ডা গলাতে বলল ইশরাত।

ওর উত্তর শুনে বোবা হয়ে গেল আবুল হোসেন।

ছায়া

ইশরাতের চেম্বারে চুপচাপ বসে আছে ফারহান আর আবুল হোসেন।

পাশে একটা বেডে বাচ্চা মেয়েটাকে শুইয়ে তাকে দেখছে ইশরাত। সবকিছু বোঝানোর পর ইশরাতের রাগ আর নেই।

“স্যার! এই আফা যে আপনের বউ সেইটা কন নাই কেন?” ফিসফিস করে বলল আবুল হোসেন।

“জানি না।” এইটুকু বলেই থেমে গেল ফারহান। আবুল হোসেন বুঝতে পারল যে এসব নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছে না ফারহান।

মেয়েটাকে একটা ইনজেকশন দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওদের সামনের চেয়ারটায় এসে বসল ইশরাত। তারপর একগ্লাস পানি খেয়ে ফারহানের দিকে তাকাল।

“ভয়ের কিছু আছে কী?” যান্ত্রিক কণ্ঠে বলল ফারহান।

“নাহ! মেয়েটা কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে! সম্ভবত ওর বাবাকে খুন করার দৃশ্য দেখে ফেলেছে ও। অজ্ঞান হয়ে আছে এখনও। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরবে। সমস্যা নেই।” বলল ইশরাত।

“তোমাকে যদি ডিসটার্ব করে থাকি সেজন্য আমি সরি।” বলল ফারহান।

“আরে না না। বাচ্চা মেয়েটার জীবনের প্রশ্ন! তোমাদের জায়গাতে আমি থাকলেও এমনটাই করতাম। তো, চা খাবে তুমি?”

“নাহ।” জানালার দিকে তাকিয়ে বলল ফারহান।

“আপনি চা খাবেন কাউন্সিলর সাহেব?” আবুল হোসেনকে বলল ইশরাত।

“খাওয়া যায় ম্যাডাম। হেহে... আপনাদের সোনায়-সোহাগা জুটি একেবারে! পুলিশ আর ডাক্তার।” দাঁত বের করে হেসে ফেলল আবুল হোসেন।

“সে আর বলতে ! আচ্ছা আমি চা আনাচ্ছি।” এই বলে গার্ডকে ডাকল ইশরাত।

ঘরে ঢুকেই গার্ড এদিকে ওদিক তাকিয়ে ফারহানের পা-টা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।

“আরে! কাঁদছেন কেন?” অবাক হয়ে বলল ফারহান।

“স্যার! আপনি ম্যাডামের হাফপ্যান্ট! জানতাম না! তার উপরে আবার ডিবি অফিসার!” মাফ কইরা দেন কাঁদতে কাঁদতেই বলল গার্ড।

“হাফপ্যান্ট!” অবাক হয়ে বলল ফারহান।

“ও আসলে বলতে চেয়েছে হাজব্যান্ড!” এই বলে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে হাসি চাপল ইশরাত।

কতদিন পর ওর সামনে এইভাবে হাসল ইশরাত! গার্ডের ওপর খুশি হয়ে উঠল ফারহানের মন।

“পা ছাড়েন। কোন সমস্যা নেই।” এই বলে উঠে দাঁড়াল ফারহান।

তখনই বেজে উঠল আবুল হোসেনের ফোন। ফোন ধরে কিছুক্ষণ হা-হু করে ফোনটা নামিয়ে রাখল সে।

“আফা! আর চা খাওয়া হইতেসে না, স্যার পুলিশ আইসা পড়সে চলেন।” বলে উঠল লোকটা।

“তুমি এই কেসে কাজ করছ নাকি? আজ না তোমার ছুটির দিন?” অবাক হয়ে ফারহানের দিকে তাকিয়ে বলল ইশরাত।

“হুম, কিছু ব্যাপার আছে। সেজন্যই আমি আগ্রহী। ছুটির দিন আর ভালো লাগছে না, দেখি কী হয়।” এই বলে উঠে পড়ল ফারহান তারপর বলল, “ইশরাত! বাচ্চাটাকে দেখে রেখ, ও সম্ভবত হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। আমি একটু পরই আসছি।”

মাথা নাড়ল ইশরাত।

***

“তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে আশপাশে আর কেউ ছিল না?” অবাক কণ্ঠে রাজপাড়া থানার সাবইন্সপেক্টর অজিতের দিকে তাকিয়ে বলল ফারহান।

“সেটাই মনে হচ্ছে স্যার, আপনি মানা করেছেন শুনে আমরা লাশে হাত দিইনি, তবে আশেপাশের পরিবেশ দেখেশুনে তাই মনে হয়েছে আর স্থানীয় একজন লোকও বলেছে যে খুব সকালে তিনি এই লোককে মেয়েটাকে নিয়ে টি-বাঁধে আসতে দেখেছে।” বলল অজিত।

“হুম, ভদ্রলোকের পরিচয় জানা গেছে?”

“জানা গেছে স্যার, উনার নাম মোঃ ফরহাদ হোসেন। একটা কলেজে বাংলার অধ্যাপক। বামপাটা কয়েক বছর আগে একটা অ্যাকসিডেন্টে নাকি নষ্ট হয়ে গেছে।”

“বাহ! এতোকিছু এতো তাড়াতাড়ি জেনে ফেললেন?”

“উনার পকেটে একটা আইডিকার্ড পেয়েছিলাম স্যার। সেখান থেকেই উনার কলেজের নম্বর নিয়ে ফোন করে সবকিছু জেনেছি।”

“আচ্ছা, উনার মেয়ের নাম কী?”

“ওহ আচ্ছা! হুম, শুনলাম আপনি নাকি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলেন বাচ্চাটাকে। কেমন আছে ও? বাচ্চাটার নাম ক্রান্তি। বিয়ের পর দীর্ঘকাল সন্তানহীন ছিলেন জনাব ফরহাদ আর তার স্ত্রী। কয়েক বছর আগেই ক্রান্তির জন্ম হয়েছে।”

“উনার স্ত্রী কোথায়?”

“ভদ্রমহিলাকে সব জানান হয়েছে। খবর শুনে নাকি উনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন। আমরা লাশ নিয়ে যাই? কী বলেন স্যার? পোস্ট মর্টেমের পর মর্গে এসে ইনাকে দেখে নেবেন ইনার স্ত্রী আর আপনি বাচ্চাটাকে আনুন।”

“পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আমার দ্রুত চাই মি. অজিত।”

“স্যার এই কেসটা কি ডিবি তদন্ত করছে?” সাহস করে প্রশ্নটা করেই ফেলল অজিত।

“এই প্রশ্ন কেন?”

“না মানে আপনাদের হেডকোয়ার্টার থেকে তো থানাতে কিছুই জানান হয়নি।”

“হেডকোয়ার্টারে আমি কথা বলে নেব, আপনি পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করুন।”

“আচ্ছা স্যার।”

ভয়

“জাহাজের শোপিসটা দেখে ভয় পেয়েছে? কী বলছ!” অবিশ্বাস্য গলাতে বলে উঠল ফারহান।

“সেটাই! একটু আগেই জ্ঞান ফিরেছে, তারপর আমার টেবিলের ওপর ওই জাহাজের শোপিসটা দেখে খুবই জোরে চিৎকার করেছে বাচ্চাটা। আমিও অবাক!” বলল ইশরাত।

কিছুক্ষণ আগেই ইশরাতের চেম্বারে ফিরে এসেছে ফারহান। ক্রান্তিকে নিয়ে যেতে হবে।

“তো, ক্রান্তি কোথায়?” ইশরাতের চোখে চোখ রেখে বলল ফারহান।

“ক্রান্তি?”

“ওই বাচ্চা মেয়েটার নাম ক্রান্তি।”

“ওহ! বাথরুমে গেছে আয়ার সাথে, আসছে। তুমি ওকে নিয়ে যাচ্ছ, নাকি?”

“হুম তা তো যেতেই হবে। ওর মা আসবেন, ভদ্রমহিলার হাতে ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে। আর তদন্তের ব্যাপার তো আছে!”

“বাচ্চাটা অনেক মিষ্টি! আমাদের যদি...” বলতে বলতে থেমে গেল ইশরাত, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল “আচ্ছা ফারহান, এই কেসের তদন্ত তুমি করছ?”

“অফিশিয়ালি না, তবে আমার ইচ্ছা আছে। হেড অফিসে জানিয়েছি, দেখা যাক কী হয়।”

ততক্ষণে আয়ার হাত ধরে চলে এসেছে ক্রান্তি।

“মা, ইনি তোমার আংকেল, ইনি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাবেন।” ক্রান্তির থুতনি ধরে আদর করে বলল ইশরাত।

“তুমি নিয়ে চল ডাক্তার আন্টি! আমার ভয় করছে! ওটা যদি আবার আসে...” ক্রান্তির গলা তখনও কাঁপছে।

“ওটা! ওটা কী মা?” ফারহান জিজ্ঞাসা করল।

হাত দিয়ে ইশরাতের টেবিলের ওপর রাখা সেই জাহাজের শোপিসটা দেখাল ক্রান্তি।

“জাহাজ? কেমন জাহাজ? টি-বাঁধে জাহাজ? কেমন ছিল জাহাজটা?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল ফারহান।

“আমি জানি না! কিচ্ছু জানি না!” এই বলে ডুকরে কেঁদে উঠল ক্রান্তি।

“শোন ফারহান! এ কেবল একটা মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠেছে। তুমি সবসময় জোর দিয়ে মানুষের পেট থেকে কথা বের করতে চাও। কিন্তু এ তেমন অবস্থায় নেই!” বেশ রাগী কণ্ঠে বলল ইশরাত।

“এখানে এসব না বললে হয় না? আয়া দাঁড়িয়ে আছে!” ইশরাতের দিকে তাকিয়ে বলল ফারহান।

লজ্জা পেয়ে সেখান থেকে চলে গেল আয়াটি।

কিছুক্ষণের নীরবতা।

তারপর ক্রান্তিকে কোলে নিল ফারহান। তারপর দরজার দিকে হাঁটা দিল সে।

“আমি যাচ্ছি, ধন্যবাদ সাহায্য করার জন্য।” ইশরাতের দিকে ঘুরে বলল ও।

“কোন সাহায্য লাগলে ফোন দিও।”

“আর কিছুই দরকার হবে না। পোস্টমর্টেম করার জন্য আলাদা ডাক্তার আছে। তারাই সব দেখবে।” বলে গটগট করে হেঁটে চলে গেল ফারহান।

জাহাজের সেই শোপিসটার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল ইশরাত! আজ কেন যেন তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে! বিয়ের এতগুলো বছরেও তাদের কোন সন্তান হয়নি! একটা সন্তান হলে হয়ত ফারহানের সাথে ওর দূরত্ব কমে যেত।

মনে মনে কয়েকবার ফারহানকে ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তাও করেছে সে। কিন্তু কেন যেন পারেনি।

শুধু এক ছাদের নিচেই থাকছে ওরা। কিন্তু গত ছয়-সাত মাস একবারের জন্যও ঘনিষ্ট হওয়া হয়নি তাদের!

অচেনা

মিসেস ফরহাদ হোসেনের চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। কাঁদতে কাঁদতে চোখদুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে তার।

রাজপাড়া থানার ওসির সামনে ক্রান্তিকে কোলে নিয়ে বসে আছেন তিনি। পাশের চেয়ারটায় বসে আছে ফারহান।

“ফারহান সাহেব, আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন, আর আপনার ডিপার্টমেন্ট থেকে কিছু জানান হয়েছে কি আপনাকে?” বললেন ওসি আলি মুনতাসির।

“ডিবি এই কেসে সরাসরি জড়াতে চাচ্ছে না, তবে আমাকে বলা হয়েছে আমি চাইলে আপনাদের সাথে কাজ করতে পারি, তবে সেক্ষেত্রে আপনাদের সাহায্যের ওপরেই নির্ভর করতে হবে আমাকে। আমার বড়কর্তারা এই কেসকে ডিবির জন্য শুধুই সময় নষ্ট হিসাবে দেখছেন।” হতাশ কণ্ঠে বললো ফারহান।

“অবশ্যই সাহায্য করবো! কিন্তু কেন যেন এই কেসটা আমার কাছে আত্মহত্যার কেসই মনে হচ্ছে! দেখলেন না ক্রান্তি কী বললো? ওর বাবা নিজেই নিজের দুই চোখে লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরেছেন।”

“ও কিন্তু একটা বড় জাহাজ আর তার ওপরের কিছু কামানের কথাও বলেছে, আর ওর মতে ওসব দেখেই ওর বাবা এমন করেছেন!”

“এসব ওর কল্পনা। পদ্মায় অমন জাহাজ আসবে কী করে?”

“মিসেস হোসেন, আপনার হাজবেন্ডের কি কারও সাথে কোন শত্রুতা ছিলো?” পাশে বসা ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললো ফারহান।

“না না! ওর মতো সহজ-সরল মানুষের সাথে কার সমস্যা থাকবে? প্রতিদিন সকালে ক্রান্তিকে নিয়ে মর্নিং ওয়াক করতে যেতো! আর আজ... আমি বুঝতে পারছি না কী থেকে কী হয়ে গেলো!” কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মহিলা।

“আচ্ছা আপনি বাড়ি যান, ওসি সাহেব গাড়িতে করে আপনাদের বাড়ি পৌঁছে দেবেন। কাল হয়তো একবার আমি আপনার বাড়িতে এসে ক্রান্তিকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বের হবো। ঘুরবো ফিরবো! ভয় পাবেন না! ও আমাকে পছন্দ করে! কেমন জাহাজ ও দেখেছে তার একটা ছবি না দেখলে আমার চলছে না! স্কেচ আর্টিস্টকে দিয়ে একটা ছবি আঁকাতে হবে।”

“আমার মেয়েকে না টানলেই কী নয়?”

“আপনি কি চান না আপনার স্বামীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন হোক?”

“তা চাই!”

“আচ্ছা, আপনি যান। ওসি সাহেব উনাদের বাড়ি যাবার ব্যবস্থা করুন।

***

“পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কখন আসবে ওসি সাহেব?” বিরক্ত স্বরে বললো ফারহান।

“কালকের মধ্যেই।” ওসি মুনতাসিরের কণ্ঠটা কেমন যেন ঠান্ডা। তাঁর থানাতে তাঁর ওপর কেউ খবরদারি করছে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া সহজ হচ্ছে না তাঁর পক্ষে। কিন্তু একজন ডিবি অফিসারকে কিছুই বলতে পারছেন না তিনি!

“হুম, কাল সকালে আমার একটা গাড়ি চাই, ক্রান্তিকে নিয়ে বের হবো।” চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো ফারহান।

“অবশ্যই।”

“আর অজিত সাহেবকেও বলে দিন উনি যেন আমার সাথে যান।”

“আচ্ছা, তাই হবে।”

“আর জাহাজের ব্যাপারে অনেক ইনফর্মেশন রাখেন এমন কাউকে চাই আমার।”

“এমন কেউ...উমম...আছেন একজন! তবে উনি কি...”

“কে উনি, নামটা বলুন শুধু।”

“ভদ্রমহিলার নাম অনিন্দিতা কাদের, রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের প্রভাষক। কিছুদিন আগেই জয়েন করেছেন শিক্ষক হিসাবে। ন্যাভাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর বিশেষ ডিগ্রী আছে নাকি উনার। জাহাজ নিয়ে নাকি অনেক গবেষণাও করেন উনি।”

“আপনি উনাকে কী করে চেনেন?”

“আমার মেয়ে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ে। মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেই। সেখান থেকেই মহিলার সাথে পরিচয়। অমায়িক একজন মহিলা তবে একটু জেদি আর একরোখা।”

“ডিবির সামনে ওসব জেদ টেদ খাটবে না। উনার নাম্বার দিন।”

“উনার কার্ডই আছে। এই নিন, আর আমি উনাকে ফোন করে আপনার কথা বলে দেব।” এই বলে ফারহানের হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিলেন ওসি সাহেব।

আড়চোখে কার্ডটা দেখলো ফারহান।

‘ড. অনিন্দিতা কাদের

বি.এস.সি ইঞ্জিনিয়ারিং(যন্ত্রকৌশল), এম.এস.সি ইঞ্জিনিয়ারিং(নৌ প্রকৌশল)

পি.এই.ডি(জাপান)

প্রভাষক(যন্ত্রকৌশল বিভাগ)

রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।’

মনে মনে হাসলো ফারহান। এ ধরনের কার্ডগুলো দেখে আজকাল হাসি পায় তার। ওর নিজের স্ত্রীরও এমন কার্ড রয়েছে।

আসলে আজকাল নামের পাশে একগাদা ডিগ্রী না থাকলে কেউ পাত্তা দেয় না! তাই এই মানুষগুলোকেও খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না।

***

বাড়িতে ঢুকে অবাক হয়ে গেলো ফারহান। ওর জন্য টেবিলে খাবার সাজিয়ে অপেক্ষা করছে ইশরাত!

অনেক চেষ্টা করেও ফারহান মনে করতে পারলো না যে শেষ কবে ও ইশরাতকে এইভাবে অপেক্ষা করতে দেখেছিলো।

“হাতমুখ ধুয়ে এসো, খেয়ে নেবে।” বললো ইশরাত।

“তুমি খেয়েছ?”

“নাহ, এসো একসাথে খাবো।”

আর কিছু না বলে হাত-মুখ ধুয়ে জামা-কাপড় পাল্টে এলো ফারহান।

“ওই বাবুটার কী খবর?” ফারহানের প্লেটে ভাত তুলে দিয়ে বললো ইশরাত।

“ওকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে এলাম। কাল আবার ওকে নিয়ে বের হবো। ওর দেখা ওই জাহাজটার একটা স্কেচ বানাতে হবে।” খেতে খেতে বললো ফারহান। মাছভাজা করেছে ইশরাত। ফারহানের খুবই প্রিয় খাবার!

“জাহাজ! আচ্ছা শোনো! আজকে নেটে চিকিৎসা সংক্রান্ত ওয়েবসাইটগুলো ঘাঁটছিলাম আর একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম জানো!”

“কী?”

“গত কয়েক মাস ধরে না পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তেই অনেক মানুষ মনোচিকিৎসকদের কাছে অভিযোগ করেছে যে তারা স্বপ্নে নাকি একটা বিকট জাহাজ দেখে। আরও আজব ব্যাপার কী জানো?”

“কী?”

“তাদের মধ্যে অনেকেই আত্মহত্যা করেছে!”

“ইশরাত...”

“কী?”

“থাক পরে বলছি।” এই বলে চুপচাপ খেতে লাগলো ফারহান।

খাওয়া শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো ফারহান। আজকাল ফেসবুকের বাইরে ইন্টারনেট খুব একটা ঘাটে না সে। কিন্তু একজন ডাক্তার হিসাবে ইশরাতকে নতুন নতুন অসুখ সম্পর্কে বেশ ভালোই খবর রাখতে হয়।

বেশ অনেকক্ষণ পর বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো ফারহান।

অদ্ভুত ব্যাপার! ইশরাত জেগে রয়েছে!

“ঘুমাবে না? সকালে ডিউটি নেই?” অবাক হয়ে বললো ফারহান।

“ফারহান! শোনো! আজকে ওই মেয়েটাকে দেখার পর আমার কেমন যেন লাগছে!”

“কেমন?”

“একটা বাচ্চা! কত্তো সুন্দর একটা বাচ্চা! আমাদের যদি...”

“ঘুমাও ইশরাত।”

“আচ্ছা ঠিকাছে, এসো বিছানায়।”

ফারহান বিছানায় ওঠার সাথে সাথে ওর ওপর ঝাপিয়ে পড়ল ইশরাত। নিজের ঠোঁটদুটোকে চেপে ধরলো ফারহানের ঠোঁটে!

প্রথমে কিছুটা ইতঃস্তত করলেও পরে ইশরাতকে জাপটে ধরলো ফারহান! ওর কানে ভেসে বেড়াতে লাগলো ‘অ্যাপোক্যালিপ্স’ গানটার সেই লাইনটা, “মাই লিপস, অ্যান্ড ইয়োর লিপস! অ্যাপোক্যালিপ্স!”

***

রাত তিনটা বাজে। চুপচাপ বারান্দাতে দাঁড়িয়ে ধূমপান করে চলেছে ফারহান। ইশরাত ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত দুটো পর্যন্ত উদ্দাম ভালোবাসার ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মেয়েটা। ফারহান নিজেও ক্লান্ত।

পাঁচ বছর হলো বিয়ে হয়েছে ওদের। শুরুর দিকের রাতগুলোতে ঠিক এভাবেই একে অপরকে ভালোবাসত ওরা!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে প্রেম ওদের। ফারহান পড়ত রাজশাহী ভার্সিটিতে আর ইশরাত রাজশাহী মেডিকেলে। ওদের দুজনের পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটা হয়েছিল।

কিন্তু বিয়ের কয়েকমাস পর হুট করেই যেন সবকিছু বদলে যেতে লাগলো। নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ওরা।

এমনও দিন গেছে যে অনেক রাতে অফিস থেকে ফিরে ফারহান দেখেছে যে ইশরাত ঘুমিয়ে আছে আবার সকালে ডিউটিতে যাওয়ার সময়ে ইশরাত দেখেছে যে ফারহান ঘুমিয়ে আছে। এমনও সময় গেছে যে পুরো সপ্তাহ জুড়েই ওদের একটা কথাও হয়নি।

ধীরে ধীরে বেড়ে গেছে দূরত্ব। রাতের বেলা ঘনিষ্ট হতেও কেমন যেন অস্বস্তি হতো ওদের। এতো বছরেও বাচ্চা-কাচ্চার কথা তাই কেউই তোলেনি।

মাঝে মাঝে কাছের আত্মীয়রা ব্যাপারটা তুললে দুজনেই কৌশলে এড়িয়ে যেত।

কারণ সম্ভবত দুজনের মনের মধ্যেই একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছিল, যে অপরজন হয়ত আর বেশীদিন তার সাথে থাকবে না!

এই সন্দেহটাই একটা সম্পর্ককে শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আঁধার

“তো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে যে ভদ্রলোক নিজেই নিজের চোখে লাঠিয়ে দিয়ে গুঁতো মেরেছিলেন?” অবাক হয়ে বলল ফারহান।

“সেটাই।” গম্ভীর কণ্ঠে বললেন ওসি মুনতাসির।

রাজপাড়া থানার ওসির কক্ষে বসে আছে ফারহান। ওর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাব ইন্সপেক্টর অজিত।

“স্যার! উনার বাচ্চা মেয়েটাও কিন্তু এটাই বলেছিল।” বলে উঠলো অজিত।

“মেয়েটা তো একটা বড় জাহাজের কথা বলেছিলো? সেটার কী হবে?” কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠলো ফারহান।

“জাহাজের অস্তিত্ব তো আর পোস্টমর্টেমে প্রমাণ করা যাবে না, তাই না?" বলে উঠলেন ওসি।

“যে ডাক্তার পোস্টমর্টেম করেছে তার সাথে দেখা করতে চাই আমি।”

“জানতাম আপনি এটাই বলবেন। অজিত উনাকে ওই ডাক্তারের সাথে দেখা করাও, আর আজ সারাদিন তুমি উনার সাথেই থাকবে।” নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন ওসি।

***

“আরে ফারহান যে!” এই বলে উৎফুল্লভাবে এসে ফারহানকে জড়িয়ে ধরল শুভ।

“শুভ একটুও বদলায়নি! এখনও সেই আগের মতোই উৎফুল্ল থাকে সবসময়।” মনে মনে ভাবল ফারহান।

“তুই রাজশাহীতে?” একটু ধাতস্থ হয়ে বলল ফারহান।

“এই গতমাসে জয়েন করলাম। কেমন আছিস তুই? কেমন আছে...ইশরাত?”

“ভালোই আছি আমরা। তুই কেমন আছিস? বিয়ে থা করেছিস?”

“আর বিয়ে দোস্ত! নাহ ওসব আর আমাকে দিয়ে হবে না। এই জীবন নিয়েই ভালো আছি। তো আমার কাছে কী মনে করে? সাথে দেখি অজিত সাহেবকেও এনেছিস। ওহ! আচ্ছা, তবে তুইই সে ডিবি অফিসার? তোর কথা বলেছিলেন আমাকে ওসি সাহেব।”

“সেটাই। তুই নাকি রিপোর্ট দিয়েছিস যে ভিক্টিম ভদ্রলোক আত্মহত্যা করেছেন?”

“সেটাই! লাঠিতে শুধুই উনার আঙ্গুলের ছাপ।”

“এমনও তো হতে পারে যে খুনি গ্লাভস পরে ছিল?”

“উনার মেয়ে নাকি কাউকে দেখেনি! আর ভদ্রলোক শেষমুহূর্তে বেশ উত্তেজিত ছিলেন।”

“অ্যালকোহল পাওয়া গেছে উনার রক্তে?”

“আরে না না! তেমন কিছু না। কিছু দেখে সম্ভবত উনি ভয় পেয়েছিলেন। সে কারণেই...”

“সে কারণে আত্মহত্যা? তাও নদীর ধারে এসে? তাও এইভাবে নিজের চোখে লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে? নিজের মেয়ের সামনে?”

“দোস্ত! আমি যা রিপোর্ট দিয়েছি তা ঠিকই দিয়েছি। লোকটা আত্মহত্যাই করেছেন।”

“টাকা খেয়েছিস নাকি কারও কাছে?”

“তোর আমাকে অমন মনে হয়?” ঠান্ডা গলায় বলল শুভ।

ফারহান বুঝতে পারল যে প্রশ্নটা করা ঠিক হয়নি। স্কুল থেকেই শুভকে চেনে ও। প্রচণ্ড আদর্শবান ছেলে সে। কারও এক পয়সাও কখনও এদিক সেদিক করার ইতিহাস নেই তার।

“তা কোথায় থাকিস এখন?” কথার মোড় ঘোরাতে বলল ফারহান।

“সরকারী কোয়ার্টারে। ওই যে ঘুষ খাই না, তাই বাড়ি করাটা এখনও হয়ে ওঠেনি।” মুচকি হেসে বলল শুভ।

চুপ করে রইলো ফারহান।

“তোরা কোথায় আছিস আজকাল? ইশরাতের কথা তো কিছুই বললি না?” বলল শুভ।

“ইশরাত অনেক ডিগ্রী নিয়ে নিয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়াচ্ছে আজকাল, আর প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখে, এইতো।”

“বাচ্চা-কাচ্চা কটা হল তোদের?”

“একটাও না।”

“থাকিস কোথায়?”

“এই নে আমার কার্ড। বাড়ির ঠিকানা দেওয়া আছে, রাত আটটার পর যাবি, তখন গেলেই ইশরাতকে পেয়ে যাবি।” এই বলে একটা কার্ড শুভ’র হাতে ধরিয়ে পিছন ঘুরে হাঁটতে লাগল ফারহান।

হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল শুভ।

***

এতদিন পর এইভাবে শুভ’র সাথে দেখা হবে ভাবতে পারেনি ফারহান। ফারহানের স্কুল আর কলেজ জীবনের বন্ধু ছিল সে।

কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় ইশরাতকে নিয়ে।

ইশরাতের সাথেই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় শুভ। ইশরাতের প্রতি খুবই দুর্বল ছিল ব্যাটা। ইশরাতকে খুশি রাখার জন্য কী না করত! এমনকি নোটগুলোও ইশরাতকে ফটোকপি করতে হত না। সবকিছু শুভই করে দিত।

স্বভাবতই ব্যাপারটা ভালোভাবে নিতে পারেনি ফারহান। ইশরাতের সাথে এই নিয়ে মনোমালিন্য হয়ে যায় তার।

এরপর থেকে ইশরাত এড়িয়ে চলত শুভকে।

শুভ’র সাথে ফারহানও আর কথা বলত না। মাঝে মাঝে দুয়েকবার রাস্তাঘাটে দেখা হলে কথা বলতে এগিয়ে এসেছিল শুভ, কিন্তু ফারহান দেখেও না দেখার ভান করত ওকে।

এম.বি.বি.এস পাশ করার পর দেশের বাইরে চলে যায় শুভ।

এরপর আজই ওকে প্রথম দেখল ফারহান।

***

ক্রান্তির বর্ণনা শুনে একমনে জাহাজের ছবিটা এঁকে চলেছে রতন। ব্যাপারটা তার জন্য নতুনই বটে। এর আগেও বিবরণ শুনে বহু মানুষের ছবি এঁকেছে সে। কিন্তু কোন জাহাজের ছবি, এই প্রথম আঁকছে সে।

প্রায় আধাঘন্টা পর রতন স্কেচটা দিল ফারহানের হাতে।

ছবিতে বেশ বিরাট আকৃতির একটা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ জাহাজ বলেই মনে হচ্ছে সেটাকে।

“ভালো কাজ করেছ রতন, এখন যাচ্ছি দরকার পড়লে আবার আসব।” এই বলে একহাতে ক্রান্তির হাত ধরে আরেকহাতে স্কেচটা নিয়ে বেরিয়ে এলো ফারহান।

“স্যার এবার কোথায় যাব?” গাড়িতে ওঠার পর জিজ্ঞাসা করল অজিত।

“ড. অনিন্দিতার সাথে দেখা করতে হবে। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে চল, উনার চেম্বারে বসেই কথা হবে।”

বেলা সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্রান্তিকে ওর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে ফারহানকে। ভদ্রমহিলা একদমই ভেঙ্গে পড়েছেন।

***

“এই আঁকা ছবি দেখে কী করে বলব জাহাজের ব্যাপারে? তবে জাহাজটা বেশ পুরনো মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এমন জাহাজ ছিল।” স্কেচটা হাতে নিয়ে বললেন ড. অনিন্দিতা।

ড. অনিন্দিতা চেহারায় কেমন যেন একটা স্নিগ্ধতা রয়েছে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুখে যে কঠোরতার ভাব থাকে এই মহিলার মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও নেই। উনার চেম্বারেই বসে আছে ফারহান আর তার পাশে বসে একটা পেপারওয়েট নিয়ে খেলছে ক্রান্তি।

“আপনি হয়ত গতকাল টি-বাঁধে ঘটে যাওয়া সেই রহস্যময় আত্মহত্যা কেসের ব্যাপারে শুনেছেন?” ড. অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলল ফারহান।

“হ্যাঁ! এক ভদ্রলোক নাকি নিজের চোখদুটো লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন! এটি তো তারই মেয়ে, তাই না? ওসি সাহেব আমাকে বলেছেন সব।”

“হুম, এই মেয়ে বলছে যে পদ্মার বুকে নাকি এমন আকৃতির একটা জাহাজ দেখা গেছিল আর সেটা দেখেই তার বাবা এমন করেছে!”

“আপনি এটা বিশ্বাস করেন?”

“আমি শুধু জানতে চাই এমন কোন জাহাজ কি সত্যিই আছে?”

“আচ্ছা, মা এদিকে এসো তো।” এই বলে ক্রান্তিকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন ড. অনিন্দিতা। তারপর কম্পিউটারের মনিটরে তাকে একের পর এক জাহাজের ছবি দেখিয়ে যেতে লাগলেন।

পাঁচ মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার পরই হুট করে একটা বিরাট জাহাজ দেখে ভয় পেয়ে গেল ক্রান্তি। এতোটাই ভয় পেল যে সে চোখ ঢেকে ফেলল।

“কী হলো মা?” বললেন ড. অনিন্দিতা।

“এটাই ওই জাহাজ!” চোখ ঢেকেই বলল ক্রান্তি!

“বিসমার্ক!” অবাক হয়ে বললেন ড. অনিন্দিতা।

“কোন সমস্যা?” বলল ফারহান।

“আমি ভাবলাম মেয়েটাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু উল্লেখযোগ্য জাহাজ দেখাই। যাতে করে মেয়েটা বলতে পারে যে জাহাজটা কেমন ধরনের ছিল। কিন্তু এ তো বলছে...”

“এ কী বলছে?”

“এ বলছে যে এ ‘বিসমার্ক’কে দেখেছে!”

“বিসমার্ক?”

“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান নৌবাহিনীর জলদানব বিসমার্ক! অটো ফন বিসমার্কের নামে রাখা হয়েছিল জাহাজটার নাম! মিত্রবাহিনীর আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল জাহাজটা।”

“সেই জাহাজটা কি এখনও আছে?”

“নাহ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই ডুবে গেছে ওটা!”

“কীহ!”

“হ্যাঁ। লম্বাতে আটশো পঁচিশ ফুট ছিল সেই জাহাজ। প্রচণ্ড গতিতে সাগর কাঁপিয়ে চলত সে! ব্রিটিশ জাহাজ এইচএমএস হুডকে পাঠানো হয় এই জাহাজকে ডোবানোর জন্য... কিন্তু...”

“কিন্তু কী?”

“১৯৪১ সালের ২৪শে মে সকালে হুড আক্রমণ করে বিসমার্ককে। আর এক ভয়াবহ জলযুদ্ধের পরে হুড নিজেই বিসমার্কের শিকারে পরিণত হয়!”

“তারপর?”

“ব্রিটিশ আর সুইডিশ নৌবাহিনী ছয়টি ব্যাটলশিপ, দুইটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এবং আরো কিছু জাহাজ নিয়ে যৌথভাবে আক্রমণ করে বিসমার্ককে। বিসমার্কের নাবিকেরাও বীরের মতোই যুদ্ধ করে। কিন্তু একটা সময়ে এতকিছুর সাথে আর পেরে ওঠে না বিসমার্ক! বিসমার্ককে ডুবিয়ে দেয় ব্রিটিশ নৌবাহিনী!”

“ইন্টারেস্টিং!”

“হুম আপনি নেট ঘাটলেই অনেক কিছুই পেয়ে যাবেন!”

“আচ্ছা।”

“আবার সাবাটন ব্যান্ডের বিসমার্ক গানটাও শুনতে পারেন। কিছুদিন আগেই বেরিয়েছে গানটা। বিসমার্ককে নিয়েই গানটা করেছে ওরা। এখন পর্যন্ত এটাই বছরের সবচেয়ে সফল হেভিমেটাল গান।”

“সাবাটন পাওয়ার মেটাল।”

“তা হেভিমেটালের মধ্যেই তো। যে মেটালই বলুন না কেন। সবই তো হেভিমেটালের অংশ।”

“আমার পাওয়ার মেটাল ভালো লাগে না। ব্ল্যাক মেটাল শুনি!”

“আমারও ব্ল্যাক মেটাল ভালো লাগে না। যাইহোক, গানটা শুনতে পারেন। সংক্ষেপে বিসমার্ক সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাবেন। এখন একটু উঠতে হবে, আমার ক্লাস আছে।”

“আচ্ছা আচ্ছা।”

ফারহান বুঝতে পারল যে পাওয়ার মেটালকে খারাপ বলাতে ভদ্রমহিলা বেশ রাগই করেছেন। আজকাল ব্ল্যাক মেটালও শোনে না ফারহান। ইন্ডি আর শোগেজই বেশী শোনা হয় তার।

***

বাড়িতে ফিরে বেশ মনোযোগ দিয়ে সাবাটনের বিসমার্ক মিউজিক ভিডিওটা দেখল ফারহান।

বেশ ভালোই। অন্য পাওয়ার মেটাল গানগুলোর মতো নয় এটা। সাধারণত পাওয়ার মেটালে এত্তো বেশী হারমোনিক গিটার পার্ট থাকে যেগুলো একটা সময়ে বোরিং লাগতে থাকে এক্সট্রিম মেটাল ফ্যানদের কাছে। তবে এই গানটাতে সবকিছু বেশ ভালোভাবেই করা হয়েছে।

বিসমার্ক সম্পর্কে আসলেই বেশ ভালো ধারণা পেয়ে গেল সে। যে লাইনদুটো ফারহানের সবচেয়ে ভালো লাগল সে দুটো হলো-

“The flagship of the navy, the terror of the seas

His guns have gone silent at last”

যদিও কেসের সাথে এসবের কোন সম্পর্কই খুঁজে পেল না সে।

অবশেষে ড. অনিন্দিতাকে ফোন দিল সে।

“হ্যালো।” কিছুক্ষণ বাজার পরেই ফোনটা ধরলেন ড. অনিন্দিতা।

“আমি ইন্সপেক্টর ফারহান বলছিলাম।”

“বলুন ইন্সপেক্টর সাহেব।”

“গানটা শুনলাম!”

“হুম।”

“বেশ ভালো লাগল।”

“পচা পাওয়ার মেটাল আপনার ভালো লাগে? ওয়াও!”

“আহ! আমি সরি।”

“ব্যাপার না। এই শোনেন, ডা. ইশরাত আপনার স্ত্রী এটা আমি জানতাম না! আজ এক কলিগের কাছ থেকে জানলাম। এত বিখ্যাত একজন ডাক্তারের হাজবেন্ড আপনি! বাবারে বাবা!”

“ওকে চেনেন আপনি?”

“গোটা শহরেই সবাই চেনে উনাকে।”

“হুম, আপনার হাজবেন্ড কী করেন?”

“সরি, আমি অবিবাহিত।”

“মাই গড! আচ্ছা শোনেন, কাল দেখা করতে চাচ্ছিলাম আপনার সাথে।”

“কাল তো সন্ধ্যার আগে সময় হবে না। সন্ধ্যার দিকে ‘অলটাইম কফি শপ’এ চলে আসেন, ওখানকার কফি আমার প্রিয়।”

“আচ্ছা!”

***

“শুনছো, শুভ ফোন দিয়েছিল, তোমার সাথে নাকি ওর দেখা হয়েছিল?” বাড়িতে ঢুকেই বলল ইশরাত।

“হ্যাঁ, ও তো ওই কেসের পোস্টমর্টেম করছে।”

“আমাদের বাড়িতেও নাকি আসবে।”

“তোমাকে দেখতে আসবে।”

“উফফ! ফারহান! এই শোন চল তাড়াতাড়ি খেয়ে নেই!” এই বলে চোখ টিপল ইশরাত।

মনে মনে হাসল ফারহান। আজকেও রাতে ভালোমত ঘুম হবে না।

হতাশা

ছাব্বিশ তারিখের শুরুটা প্রচণ্ড হতাশার সাথে শুরু হলো ফারহানের জন্য।

ওকে ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন দেওয়া হয়েছে। একটা আত্মহত্যার কেস নিয়ে ও কেন এত মাথা ঘামাচ্ছে সেই ব্যাপারে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে। সম্ভবত এটা ওসি মুনতাসিরেরই কেরামতি।

শুধু তাই নয়, ক্রান্তির মা আর ক্রান্তিকে ওর সাথে দিতে চাচ্ছেন না। মেয়েকে নাকি হারাতে চান না তিনি।

বাংলাদেশের মানুষের সমস্যাই এটা! সবসময় ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায় তারা।

কিন্তু এটাকে আসলে বেঁচে থাকা বলে না।

***

“এই ইশরাত!” বলে ডেকে উঠল শুভ।

“আরে শুভ যে!” শুভকে চিনতে পেরে অবাক হয়ে বলল ইশরাত।

পড়ন্ত বিকালে বাজার করে বাড়ি ফিরছিল ইশরাত আর সেখানেই শুভ তাকে দেখে ফেলে।

“কেমন আছিস রে ইশরাত?” বলে উঠল শুভ।

“এইত, তুই?”

“যেমন দেখছিস। তোর হাজবেন্ড শালা তো এখনও আমাকে সহ্য করতে পারে না!”

“বাদ দে! চল, বাসায় চল।”

“আরে ধুর! আমাকে জেলে ভরবে তোর বর! তার চেয়ে চল কোথাও কফি খাই।”

“আচ্ছা, অলটাইম কফি শপ তো কাছেই, ওখানেই চল।”

***

“তাহলে ব্যাপারটাকে আপনি অলৌকিক হিসাবে নিচ্ছেন?” কফির কাফে চুমুক দিয়ে বললেন ড. অনিন্দিতা।

“তাছাড়া আর কী? এত মানুষ স্বপ্নে কী দেখল? আমি কী দেখলাম?”

“হুমম.. আচ্ছা আপনি কি নাস্টিসিজমের ব্যাপারে শুনেছেন?”

“নাহ।”

“একটা অদ্ভুত ধর্ম এটা। এরা বলে যে পৃথিবীর মানুষ বা ধর্মগুলো যাকে ঈশ্বর বলে মানে সে আসলে ঈশ্বর নয়! সে ডেমাইয়ার্জ নামের একটা ডিমন!”

“মানে?”

“আচ্ছা! নাস্টিসিজম অনুসারে এই জগৎ সংসারে অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। এর মধ্যে কিছু সত্যিকারের মহাবিশ্ব আর বাকিগুলো নকল! প্রতিবিম্ব মহাবিশ্ব! সবকিছু সৃষ্টি করেছেন একজন মহান ঈশ্বর আর প্রতিটি আসল মহাবিশ্বের দায়িত্বে রয়েছে তার মনোনীত একজন করে প্রতিনিধি আর নকলগুলো শাসন করে ডিমনেরা!”

“আচ্ছা!”

“নাস্টিসিজম আরও বলে যে সবকিছুর মধ্যেই আত্মা আছে! সে জীব হোক আর জড় হোক! মৃত্যুর পর এই আত্মা সৃষ্টিকর্তার কাছে চলে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু আত্মাকে ডেমাইয়ার্জ আটকে ফেলে! ওরাই প্রেত হয়ে এই জগতে থাকে! মানে মৃত্যুর পরেও ফিরে আসে!”

“আজব!”

“শুধু তাই নয়! ডেমাইয়ার্জ শক্তি পায় এই মহাবিশ্বের প্রাণীদের চিন্তা থেকে। অনেক মানুষ যদি একটা কিছু নিয়ে চিন্তা করে তবে সেটাকে ডেমাইয়ার্জ সত্যি করে ফেলে।”

“কী বলতে চান?”

“সম্ভবত বিসমার্ক মিউজিক ভিডিওটি অনেক মানুষ দেখার ফলে তাদের মনে জাহাজটি নিয়ে চিন্তা এসেছে! তারা ভেবেছে! আর সেই চিন্তা থেকেই...”

“ডেমাইয়ার্জ বিসমার্ককে ফেরত এনেছে?”

“বিসমার্কের আত্মাকে!”

“ধুর! এগুলো বুজরুকি! ডেমাইয়ার্জ বলে কেউ নেই!”

“হতে পারে! তবে এর চাইতে ভালো ব্যাখ্যা আর পাচ্ছি না!”

***

“আরে ইশরাত দেখ! তোর স্বামী এক সুন্দরীর সাথে বসে রয়েছে!” কফি শপে ঢুকেই বলে উঠলো শুভ।

ইশরাত বহু আগেই ফারহানকে দেখেছে। ফারহানদের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল ইশরাত।

“ডিসটার্ব করছি নাকি আপনাকে মি. ফারহান?” ফারহানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল ইশরাত।

“ইশরাত! তুমি এখানে!” অবাক হয়ে বলল ফারহান।

“কেন? তোমাদের রোমান্টিক আলাপে বাঁধা দিলাম নাকি?”

“তা তুমিও কি এখানে রোমান্টিক আলাপ করতেই এসেছ নাকি?” ততক্ষণে ইশরাতের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শুভকে নজরে পড়ে গেছে ফারহানের।

থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেল ইশরাত।

“হাই! ডা. ইশরাত, আমি অনিন্দিতা, রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়াই, আপনার স্বামীর সাথে একটু আড্ডা দিচ্ছিলাম আরকি, কিছু মনে করবেন না।” এই বলে ইশরাতের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন ড. অনিন্দিতা।

“নাইস টু মিট ইউ মিসেস...” হাত মিলাল ইশরাত।

“মিসেস না! মিস! আমি অবিবাহিত!”

“বিয়ে করার কথা ভাবছেন কী?” পেছন থেকে বলে উঠল শুভ।

“না! এখনও ভাবছি না!” মৃদু হেসে বললেন ড. অনিন্দিতা।

প্রলয়

“ফারহান চল কাল সকাল সকাল টি-বাঁধে যাই, সেই আগের দিনগুলোর মতো!” খাবার টেবিলে ফারহানের পাতে মাছ দিতে দিতে বলল ইশরাত।

“বলছ? আচ্ছা! তুমি নটার মধ্যে পৌঁছে যেও। আমি একটু রাজপাড়া থানা হয়ে তারপর আসব।”

“তোমার কেসের কাজ?”

“আত্মহত্যাই সম্ভবত, ওপর থেকেও আমাকে পুলিশের কাজে মাথা গলাতে মানা করা হচ্ছে!”

“বাদ দাও! কাল কিন্তু সময়মত এসো!”

“অবশ্যই!”

“ডা. অনিন্দিতাকে আমার বেশ ভালো লেগেছে! চমৎকার মহিলা!”

“শুভ’র সম্ভবত আরও বেশী ভালো লেগেছে!”

“এটা কেমন কথা?”

“শুভ’র সব মেয়েকেই ভালো লাগে!”

“ধুস বাদ দাও তো!”

“আচ্ছা।”

“আর একটা কথা...”

“কী?”

“চল আমরা আবার সব নতুন করে শুরু করি!”

“আমিও সেটাই চাই ইশরাত।” ইশরাতের হাত ধরে বলল ফারহান।

“আই লাভ ইউ ফারহান।”

“আই লাভ ইউ টু ইশ!”

***

রাজপাড়া থানা থেকে বের হয়ে ফারহান দেখতে পেল তার মোবাইলে দুটো মিসকল দিয়েছে ডা. অনিন্দিতা। ঘড়িতে সময় দেখল ফারহান। সাড়ে আটটা বাজে।

ফোন করল সে ড. অনিন্দিতাকে।

“হ্যালো! ফারহান সাহেব! ফোন ধরলেন না কেন?” ড. অনিন্দিতা কণ্ঠে উদ্বেগ।

“ফোন সাইলেন্ট ছিল। কোন সমস্যা?”

“শুনুন! একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি কালকে ধরতে পেরেছি। ওই ভদ্রলোক আত্মহত্যা করেছিলেন ২৪ তারিখে, তাই না?”

“হ্যাঁ!”

“২৪শে মে-তেই বিসমার্ককে আক্রমণ করেছিল ব্রিটিশ নৌবহর! আপনাকে বলেছিলাম, মনে আছে?”

“হ্যাঁ!”

“আর বিসমার্কের ডুবে যাওয়ার দিনটা মনে আছে?”

“হ্যাঁ! ২৭শে মে!” বলতে বলতেই চমকে উঠল ফারহান!”

“হ্যাঁ! মানে আজ! ২৪ শে মে সকাল নটার দিকে ডুবেছিল বিসমার্ক! মানে নটায় আজ সম্ভবত আবার...”

আর কিছু শুনতে পায়নি ফারহান! ফোনটা তার হাত থেকে পড়ে গেল।

***

টি-বাঁধে ঢুকেই ইশরাতকে জড়িয়ে ধরল ফারহান। ঘড়ির কাটা নটা ছুঁইছুঁই! আশেপাশে মানুষও আছে বেশ কজন। বেশ উদ্ভট দৃষ্টিতেই ওদেরকে দেখছিল তারা। এভাবে জনসমক্ষে তথাকথিত ‘ঢলাঢলি’ বলে কথা!

“এই কী কর! মানুষ দেখছে!” বিব্রত হয়ে বলল ইশরাত।

“দেখুক! আমার বউকে আমি জড়িয়ে ধরব!”

লাল শাড়ি পরে এসেছে ইশরাত! অপূর্ব লাগছে ওকে।

নদীর দিকে পিছন ফিরে ফারহানকে দেখছে সে। আর ফারহান তাকিয়ে আছে নদীর দিকে।

ডানপাশে কয়েকজন লোক গরু নিয়ে যাচ্ছে, একটা কিশোর ছেলে দা দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে আর দুজন শ্রমিক কোদাল দিয়ে কী যেন করছে।

ব্যাপারটা শুরু হল হঠাৎ করেই!

হুট করেই যে দৃশ্যপটে আর্বিভূত হলো ওটা!

বিসমার্ক! পদ্মাতে আবার ফিরে এসেছে সেটা! ফারহানের চোখজোড়া যেন কোটর ছেড়ে বের হয়ে আসতে লাগল! সেই রণসজ্জায় সজ্জিত সাগরদানব! প্রচণ্ড চাপ পড়তে লাগল ওর স্নায়ুতে!

আশেপাশের সবাইই দেখছে জাহাজটাকে! নাহ ইশরাতকে ওটা দেখতে দেওয়া যাবে না! ওকে জড়িয়ে ধরল ফারহান!

“আরে! কী কর!” আবার লজ্জায় বলল ইশরাত!

আশেপাশে ততক্ষণে নীরব প্রলয় শুরু হয়ে গেছে। যে লোকগুলো গরু নিয়ে যাচ্ছিল তারা নিজেদের চোখগুলো গেঁথে ফেলতে লাগল গরুগুলোর শিংয়ের সাথে! প্রতিটা গরুই শিং ঢুকিয়ে দিতে লাগল একে অপরের পেটে!

যে ছেলেটা দা দিয়ে মাটি কোপাচ্ছিল সে হঠাৎ করে দা চালিয়ে দিল নিজের গলাতেই!

আর কোদালওয়ালা দুজন কোদালগুলো দিয়ে নিজেদের পেটে আঘাত করে চলল ক্রমাগত!

রক্তের বন্যা বইতে শুরু করল পুরো এলাকাতে।

ইশরাতকে তখনও জড়িয়ে ধরে আছে ফারহান। কিন্তু ওর নজর বিসমার্কের দিকে!

কিচ্ছু শুনতে পারছে না সে কারণ তার কানদুটো অচল হয়ে গেছে! দুটো চোখের একটাও হুট করেই অন্ধকার হয়ে গেল! ফারহান বুঝতে পারল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর আরেকটাও চোখও অন্ধ হয়ে যাবে।

নিজের শরীরের সব শক্তি একত্রিত করে ঠোঁটদুটোকে ইশরাতের ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল ফারহান। ইশরাত তখনও কিছু বুঝতে পারেনি! কারণ সে তো বিসমার্ককে দেখেইনি!

“মাই লিপস অ্যান্ড ইউর লিপস, অ্যাপোক্যালিপ্স!” নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে এলো ফারহানের...

গাছপাথর - দেবলীনা চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ - প্রতিম দাস

বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসেছিলেন অনন্তবাবু, “আরে মশাই হয় হয়! এ দুনিয়ায় সবই হয়।” আর ঝট করে আমার মনে পড়ে গেছিল ঝুরিদিদার কথা।

আমার ঝুরিদিদা। বাতাসের গায়ে আঁকিবুকি কেটে,কখনো বা খলখল করে হেসে গড়িয়ে পড়ত,কখনো বা মেয়েদের ইস্কুলের বড়দিদিমণির মতো কোমরে হাত দিয়ে কাদের যেন বকাঝকাও করত। আশেপাশের যত অদেখা, অজানা জিনিসের হদিশ ছিল ঝুরিদিদার কাছে। লোকে অবশ্য আড়ালে পাগলী বলত। ছোটটি ছিলুম তখন। চোখ দুটোকে যতদূর সম্ভব গোল্লা গোল্লা করে প্রাণপণে সেসব দেখার চেষ্টা করতুম আমিও। কিন্তু কিছুই ছাই চোখে পড়ত না! এক বাদলা-বিকেলে দেখেছিলুম মিত্তিরদের পানা পুকুরটায় পা ডুবিয়ে বসে আপনমনে আবোলতাবোল বকছে ঝুরিদিদা, আমি কাছে যেতেই সড়সড় করে এক মানুষ লম্বা কী এক কদাকার জীব যেন জলে নেমে গেল। ঠিক যেন কুমির আর পেঁচার শরীর মিলেমিশে তৈরী এক উদ্ভট জিনিস! “ওটা কী গো?” জিজ্ঞাসা করতেই নিশ্চিন্ত গলায় বলেছিল, “ও ডুগডুগি। সেই কবে যেন পথ ভুলে পিথিবিতে এয়েছিল, তাপ্পর থেকে এই মিত্তিরদের পুকুরেই রয়ে গেছে। এট্টু বিষ্টির জল নে গেল। আসলে ওদের ওখানে তো বিষ্টি হয় না!”

—“পথ ভুলে পৃথিবীতে এসেছিল! মানে? ওর বাড়ি তবে কোথায়?” চোখ কপালে তুলেছিলাম আমি।

—“কী যেন নামটা বলেছিল... বড্ড খটোমটো। এই আমাদের পিথিবির মতনই ওদেরও আলাদা একখান পিথিবি আছে গো বুতুবাবু।”

—“যাহ! আরেকটা পৃথিবী! তাও আবার হয় নাকি!” স্পষ্ট অবিশ্বাসের সুর ছিল আমার গলায়।

প্রায় দন্তহীন মাড়ির মধ্যে ঝুলে থাকা এক দুটো পানখাওয়া কালচে দাঁত বের করে হেসেছিল ঝুরি দিদা, “হয় লো হয়। শোন বুতু। মনে রাখবি, আসলে হয় না বলে কিছু হয় না।”

সেই প্রথম। আমাদের রোজকার একঘেয়ে দেখাশোনার বাইরে যে আরো একটা দেখার আর শোনার জায়গা আছে, সেই দরজাটুকু আমার সামনে খোলে ঝুরিদিদার হাত ধরে। আজও মাঝেমধ্যে মনে হয়, সত্যিই কি পাগল ছিল ঝুরিদিদা? নিজের মতো করে আজগুবি অলীক কল্পনার জগৎ বানিয়ে হয়ত তাতেই নিশ্চিন্ত ছিল! কিন্তু তারপরেই মাথার ভেতর ভুস করে ডুবসাঁতার দিয়ে উঠে আসে সেই সমস্ত স্নায়ু অবশ করা ভয়াল কদর্য ঘটনাগুলো, যা ঘটেছিল আমার নিজের চোখের সামনে! সেই সমস্ত কল্পনাতীত অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে আতঙ্কে হিম হয়ে গেছিল ডাকাবুকো এই বিতংস খাসনবীশের রক্তও! সেই সমস্ত অবিশ্বাস্য অদ্ভুতুড়ে ঘটনা, যার কোনোরকম ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না আজও। তখনি মনে হয়, হয়তো সত্যিই হয় না বলে কিছু হয় না। এখন পঁয়ষট্টি বছর বয়সে জীবনের এই শেষবেলায় এসে ইচ্ছে জাগে, কোথাও লিখে রাখি সেসব। হয়তো কোনোদিন কেউ পড়বে না, জানবে না... তাও,আমার সঙ্গে সঙ্গেই চিরতরে হারিয়ে যাবে এই অভিজ্ঞতাগুলো, এ যেন মানতে মন চায় না। সারাটা জীবন খবরের পেছনে দৌড়ে দৌড়ে বিয়ে-থাও করে ওঠা হয়নি। এখন আছে শুধু গড়িয়ার এই দু কামরার ফ্ল্যাটে একা একা বসে পুরোনো দিনের কথা মনে করা, আর নিজের সঙ্গে কথা বলা আমার এই খসড়া খাতার পাতায়। এটুকুই।

কিন্তু হঠাৎ করে আজ অনন্ত বাবুর কথাই কেন মনে পড়ল আমার? এর জন্য দায়ী অবশ্য রাণুর মা। ক’দিন ধরে কেমন যেন পেটটা ভুটভাট করছিল, রাণুর মা-কে বলেওছিলুম সে কথা। আজ সক্কাল সক্কাল এসে ঘরের কাজ শুরু করার আগেই আমার মুখের সামনে ধরল এক গ্লাস ঘন সবুজ তরল। কেমন যেন ঘাস ঘাস গন্ধ। “কী এটা?” জিজ্ঞাসা করতেই সহর্ষ উত্তর এল, “এ হইল গিয়া পাতরকুচি গাছের রস গো দাদাবাবু! খেইয়ে দ্যাকো দিকিনি, শরীল একদম তর হই যাবে!”

পাথরকুচি গাছ! এই একটা শব্দ... আর এক ধাক্কায় আমার মনে পড়ে গেল বছর কুড়ি আগের একটা ঘটনা।

সাতানব্বই বা আটানব্বই সাল। আনন্দবাজারের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে চরম বাউন্ডুলে জীবনযাপন করছি তখন। কাজের জগতে বরাবরই আমার নাম ছিল উদ্যমী হিসেবে। আর এই শেকড়হীনভাবে ভেসে বেড়ানো, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অভিজ্ঞতা চেখে দেখাটা খুব প্রিয় ছিল বলে নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ নিউজ কভার করার জন্য এডিটর সবার আগে বেছে নিতেন আমাকেই। তেমনি একটা কাজের জন্য ডাক এল বোলপুরে যাওয়ার। বিরোধী দলের এক সর্বভারতীয় নেতার বিরাট জনসভা হবে বোলপুরে, তাই নিয়ে রাজ্যরাজনীতি সরগরম। বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লুম বোলপুরের উদ্দেশে। জনসভার রিপোর্ট দেওয়া তো বটেই, সঙ্গে একটা সুপ্ত ইচ্ছেও ছিল। ভোরবেলা ওখানে স্টেশনে নামামাত্র বুঝলাম বোলপুর এখন লালে লাল। না, আমি রাজনৈতিক রং এর কথা বলছি না... এ হল প্রকৃতির রং। সময়টা ছিল মোটামুটি মার্চের প্রথম, যেদিকেই তাকাই কৃষ্ণচূড়া, শিমূল, পলাশের মনভোলানো লাল-কমলা রঙের আগুন লেগেছে! মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনাটা আরো একবার ঘুরপাক খেয়ে নেচে উঠল। যাই হোক, প্রকৃতি থেকে তখনকার মতো মনটা সরিয়ে কাজে নেমে পড়লাম আমি আর ক্যামেরাম্যান সৌমিক। স্থানীয় নেতৃত্বের ইন্টারভিউ নেওয়া, পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য নোট করে-টরে সভার মাঠে পৌঁছতে পৌঁছতে বুঝলাম পেটের ভেতর ছুঁচোর ডনবৈঠক শুরু হয়ে গেছে। সকাল থেকে কয়েক কাপ চা আর বিস্কুট ছাড়া তো তেমন কিছু পেটে পড়েওনি। আমার মনের কথাটাই বলে উঠল সৌমিক, “চলুন দাদা, আগে পেটে চাট্টি দানাপানি ফেলার ব্যবস্থা করি। সারাদিন আবার কখন কী জোটে তার ঠিক নেই।” অতি উত্তম প্রস্তাব! মাঠের উল্টোদিকেই একটা দোতলা বাড়ির একতলায় বড় বড় করে লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল... ‘মা ভবতারিণী পাইস হোটেল’। গুটি গুটি পায়ে ঢুকে পড়লাম। নামে পাইস হোটেল হলেও চা-বিস্কুট, ডিমটোস্ট, ঘুঘনি-মুড়ি... এমনকি রাতে রুটি-তড়কাও পাওয়া যায়। দুটো মাছ-ভাত বলে দিয়ে কাঠের বেঞ্চিতে বসে কথা বলছি এমন সময় প্রথম দেখলাম অনন্তবাবুকে।

হোটেলটায় মোটামুটি ভিড়। পার্টির লোকেরা অনেকেই ভাত খাচ্ছে, কেউ কেউ আবার চা-ডিমটোস্ট নিয়ে বসেছে। আমরা বসেছিলাম বিল কাউন্টারের কাছেই একটা টেবিলে। একটু পরেই দু হাতে ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, আলুভাজা, মাছের ঝোল সমেত থালা ব্যালেন্স করতে করতে এল হাফপ্যান্ট পরা একটা ছেলে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই “কী দাদারা, কলকাতা থেকে এলেন নাকি?” বলতে বলতে লেংচে লেংচে পাশে এসে বসলেন এক ফর্সা সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক। বয়স মেরেকেটে বছর চল্লিশেক হবে, সুন্দর সুঠাম চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ। অবাক হয়ে চোখ চাওয়াচাওয়ি করছি আমরা, বিগলিত হেসে প্লেটের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, “পারশে মাছটা খেয়ে দেখবেন, সব কটা ডিমভরা! আমি নিজে বাজারে গিয়ে এনেছি! হেঁ হেঁ!" মনে পড়ল একটু আগেই কাউন্টারে দেখেছিলাম এনাকে। সম্ভবত হোটেলের ম্যানেজার। ভদ্রলোক নিজেই পরিচয় দিলেন। অনন্ত চৌধুরী, হোটেলের মালিক। বেশ হাসিখুশি দিলখোলা টাইপের লোক অনন্তবাবু, কিছুক্ষণেই আড্ডা জমে উঠল। হয়তো কাউন্টার থেকে আমাদের কথা টুকরো টুকরো শুনেছিলেন, তারপর রিপোর্টার শুনে আরো উত্তেজিত হয়ে বললেন, “বাহ্! জীবন তো আপনাদের মতো হতে হয় মশাই! খবরের টানে কত কত জায়গা ছুটে বেড়ান... কত গা গরম করা ঘটনা! অ্যাডভেঞ্চারাস লাইফ একেবারে!”

—“বিতংসদা মানুষটাই তো পুরো অ্যাডভেঞ্চারাস”, ভাতে ঝোল মাখতে মাখতে ফুট কাটল সৌমিক, “যেখানে যত আজব উদ্ভট স্টোরি পাবে, সবার আগে দৌড়ে চলে যাবে!”

—“তাই! বাহ্,বেশ বেশ”,বলতে বলতে প্লেটের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বললেন, “দেখেছো কাণ্ড!” পরক্ষণেই বাজখাঁই হাঁক পাড়লেন, “অ্যাই বাচ্চু! মাছের তেলের ছ্যাঁচড়াটা দিসনি তো এনাদের! নিয়ে আয় শিগ্গির!” পড়িমরি করে বাটি হাতে তুরন্ত দৌড়ে এল হাফপ্যান্ট, সযত্নে পাতের পাশে ঢেলে দিল তেল চপচপে কালচে সবুজ ছ্যাঁচড়া। “আপনারা খান... যা লাগবে বলবেন, বাচ্চু দিয়ে দেবে... আমি ওদিকটা যাই গিয়ে...”, বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেলেন কাউন্টারের দিকে। তখনি দেখতে পেলাম একটু উঠে থাকা ঢলঢলে পাতলুনের নীচ দিয়ে তাঁর ডান পা-টা। অস্বাভাবিক রকম সরু লিকলিকে আর পায়ের পাতাটা প্রায় নাইন্টি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে বাঁকা।

এরপর সারাটা দিন যেন ঝড় বয়ে গেল। না, কোনো গোলমাল হয়নি। নেতাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতা আর তার সঙ্গে সঙ্গে জনতার সোল্লাস গর্জন ও হাততালি আকাশ বাতাস কাঁপাতে লাগল। সভার শেষে মাঠের এক কোণে বসে সবিস্তারে গুছিয়ে লিখে ফেললাম রিপোর্ট। কথা ছিল সৌমিক রিপোর্ট নিয়ে রওনা হয়ে যাবে কলকাতা, আর আমি রয়ে যাব দিনদুয়েক... বসন্তোৎসব কভার করার জন্য। হ্যাঁ, এ আমার বহুদিনের স্বপ্ন... দোলের শান্তিনিকেতন দেখব, লালে লাল পলাশে ছাওয়া পথে হাঁটব খোয়াইয়ের ধার ধরে, বাউলের গান শুনব। তাই আসার আগেই এডিটরকে পটিয়েপাটিয়ে এসেছিলাম, বসন্তোৎসব কাটিয়ে ফিরব। তবে শর্ত একটাই ছিল, শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব নিয়ে একটা লেখা দিতে হবে রবিবারের পাতার জন্য। সৌমিকের ট্রেন সন্ধ্যে নাগাদ। গল্প করতে করতে স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগালাম দুজন। সৌমিকটা বরাবরের ছেলেমানুষ, একজন 'হরেক মাল' ফেরিওয়ালাকে ধরে দরাদরি করে একটা হুঁকো ডিজাইনের লাইটার কিনে ফেলল। আমার জন্য কিনল একটা চাবির রিং, তার পেছনে আবার ফোল্ডিং পেপার নাইফ। তারপর "খোয়াইয়ের মেলা থেকে আমার জন্য কিছু কিনতে ভুলো না যেন" বলে হাত নেড়ে ট্রেনে উঠে গেল। আমিও আগামী দুদিনের কথা ভেবে আনন্দে প্রায় উড়তে উড়তে স্টেশন থেকে পা বাড়ালাম শহরের দিকে। কিন্তু শহরের ভেতর লজ খোঁজ করতে গিয়ে বুঝলাম কী গভীর গাড্ডায় পড়েছি! বসন্ত উৎসব উপলক্ষে বোধহয় পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালি দল বেঁধে এসে পড়েছে বোলপুরে, শহরের লজগুলোর একেবারে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ দশা। মাথায় হাত আমার! খানদশেক লজ, কটেজ, বাংলো ইত্যাদি ঘুরে-টুরে যখন কী করি কী করি ভাবছি, ততক্ষণে পেট জানান দিতে শুরু করেছে ভাত খাওয়ার পর সভার মাঠে ঝালমুড়ি আর কয়েক কাপ চা ছাড়া তেমন কিছুই ঢোকেনি তার অন্দরে।

সামনে তাকিয়ে দেখলাম কখন যেন হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়িয়েছি ‘মা ভবতারিণী’-এর সামনে। গুটি গুটি ঢুকে একটা চা আর ডিমটোস্ট অর্ডার দিয়ে ব্যাগটা পাশে রাখলাম। সন্ধ্যে নেমে গেছে অনেকক্ষণ, বসন্তের ফুরফুরে একটা বাতাসও বইছিল... কিন্তু দুশ্চিন্তাটা আমার মাথা থেকে যাচ্ছিল না কিছুতেই। শেষমেষ স্টেশনে কোনোমতে রাতটা কাটিয়ে কাল সকালেই ফেরার ট্রেন ধরবো ভাবছি, খোঁড়াতে খোঁড়াতে পাশে এসে বসলেন অনন্তবাবু। হাতের চায়ের গ্লাসটা টেবিলে রেখে বললেন, “কী মশাই? একা কেন? আরেকজন কই?”

—“উঁ?”,স্টেশনের মশাদের কথা ভাবতে ভাবতে বেজার মুখে বললাম, “সৌমিক? সে তো ফিরে গেছে। আমার দুদিন থাকার কথা ছিল... কিন্তু কোত্থাও রুম পাচ্ছি না... কী মুশকিলে পড়লুম বলুন তো!”

—“হুম্”, চিন্তিত মুখে চায়ে চুমুক দিলেন অনন্তবাবু, “সত্যি চিন্তার কথা বটে। এই সময় এখানে ঘর পাওয়া...”, তারপর কী যেন ভেবে একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “উপায় একটা আছে অবশ্য... কিন্তু আপনার অসুবিধে হবে হয়তো...”

ডিমটোস্ট চিবোনো বন্ধ করে উৎসুক হয়ে চাইলাম, “আছে? কী উপায় বলুন তো? স্টেশনের চেয়ে ভালো?”

হেসে ফেললেন অনন্তবাবু। তারপর কাঁধে হাত দিয়ে স্মিত কণ্ঠে বললেন, “অত ভাববেন না। আর কিছু না হোক এই গরীবের কুটিরখানি আছে। ছোট বাড়ি, তিনটি প্রাণীতে থাকি। কষ্টসৃষ্ট করে থাকলে কি আর একটা মানুষের জায়গা হবে না? তবে কলঘরটা বাড়ির বাইরে... চলবে তো আপনার?”

—“চলবে মানে!”, দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম অনন্তবাবুর হাত, “দৌড়বে মশাই, দৌড়বে! কথায় বলে যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন!”

—“আসুন তবে”, উঠে পড়লেন অনন্তবাবু। খোঁড়া পা-টা টেনে টেনে সামনে হাঁটতে লাগলেন, আমি ব্যাগটা কাঁধে তুলে পেছন নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, ভাগ্যিস সকালে এই হোটেলটাতেই ঢুকেছিলাম! নাহলে এই বিপদের মধ্যে এমন সহৃদয় একজন মানুষের সাহায্য পেতাম কি?

হোটেলের পাশ দিয়ে একটা সরু পায়ে চলা পথ চলে গেছে। সেটা ধরে দু'মিনিট হাঁটলেই অনন্তবাবুর একতলা বাড়ি। বাড়িটার অবস্থা সত্যিই খুব একটা ভালো না। বাইরের দেওয়ালে রং নেই, শুধু পলেস্তারা... তাও যেখানে সেখানে ঝরে পড়েছে। বাড়ির সামনে কম পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে, তাতে যতদূর বুঝতে পারলাম সামনে ছোটো উঠোনের পরে একটা সবুজ রঙের নীচু দরজা। অনন্ত বাবু দরজার সামনে গিয়ে “কই গো?” বলে হাঁক পাড়তেই আটপৌরে শাড়ি পরা এক গ্রাম্য মহিলা মাথায় ঘোমটা টেনে দরজা খুললেন। সম্ভবত অনন্তবাবুর স্ত্রী। দরজা পেরিয়ে ঢুকলে কলতলা, তারপরে দুটো ছোটো ছোটো ঘর। “ইনি হচ্ছেন খাসনবীশ বাবু, আনন্দবাজারের রিপোর্টার, বুঝলে?”,বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন অনন্তবাবু, “আর ইনি আমার অর্ধাঙ্গিনী।” জলভরা স্টিলের গ্লাস হাতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ভদ্রমহিলা, আমার নমস্কারের উত্তরে মাথা নত করে সলজ্জ হেসে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলেন। ঢকঢক করে জলটা খেয়ে পরিতৃপ্তি হল। না, তৃষ্ণা নিবারণের জন্য নয়, দুশ্চিন্তার পর্ব মিটে শেষমেষ মাথার ওপর একটা ছাদ আর অনন্তবাবুর অন্তরঙ্গ আতিথেয়তায় তখন একটা শান্তির বাতাস সত্যিই বয়ে যাচ্ছে মনের ভেতর দিয়ে। ওদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনন্তবাবু, আমাকে একটা ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, “আপনি জামাকাপড় পালটে নিন। তারপর কলঘরটা দেখিয়ে দিচ্ছি, মুখ হাত ধুয়ে নেবেন। রাতে কী খাবেন, ভাত না রুটি?” হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে দাওয়ায় এসে বসেছি, কাঁচের গ্লাসে করে চা আর খানকতক বিস্কুট রেখে গেলেন অনন্তবাবুর স্ত্রী। অন্য ঘরটা থেকে গরম ভাত ফোটার গন্ধ ভেসে আসছে, সঙ্গে ফোড়নের ছ্যাঁকছোঁক শব্দ। বুঝলাম ওটাই রান্নাঘর। চা খেতে খেতে অনন্তবাবু বলছিলেন নিজের কথা। “বাংলায় এম.এ করেছি মশাই। কিন্তু চাকরি জুটল না। আর এই যে পা দেখছেন, জন্ম থেকেই এরকম। মানে কুলিগিরি করেও যে খাবো, তারও উপায় নেই। হে হে হে।” হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেও তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণাটা ভালোমতই টের পাচ্ছিলাম আমি। মনটা ভার হয়ে যাচ্ছিল। সাংবাদিকতার খাতিরে প্রতিদিনই নানারকম মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়, তাই খুব কাছ থেকে দেখেছি এই শিক্ষিত বেকারদের জ্বালা কী! তার ওপর সে যদি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়। তাও তো অনন্তবাবু সৎ পথে থেকে সৎভাবে রোজগার করছেন, অনেকেই ক্ষোভে-দুঃখে ভুল রাস্তা ধরে। পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরালেন অনন্তবাবু, “ক’দিন একটা নাটকের দলে থিয়েটার করলাম। খোঁড়া লোক, ওই এক দুটো সাইড রোল দিত। তাও খুব ভালো লাগত জানেন, অনেক স্বপ্নও দেখতাম... কিন্তু টাকা? থিয়েটার করে পেট চালানো মুশকিল হয়ে পড়ছিল, অগত্যা এই হোটেল। অনেক কষ্ট করে দাঁড় করিয়েছি হোটেলটা। এখন মোটামুটি চলে যায় আর কী!" হাসলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে বললাম, “তা আপনার বাড়ির তৃতীয় সদস্যটি কোথায়? আলাপ করালেন না তো?"

-"কে, টুনি?", আধো অন্ধকার বারান্দাটার দিকে তাকালেন অনন্তবাবু,তারপর হাত তুলে বললেন, "ঘুমিয়ে গেছে। রাত হয়েছে তো।" অনন্তবাবুর হাত লক্ষ করে বারান্দার কোণের দিকে তাকালাম। টালির চাল থেকে মোটা হুক দিয়ে ঝোলানো আছে একটা বড়সড় খাঁচা,আর তার ভেতর পালকের মধ্যে ঘাড় গুঁজে ঘুমোচ্ছে একটা গাঢ় সবুজ রঙের টিয়া পাখি। "ও, আচ্ছা", হাসিমুখে বললাম, “আমি ভাবলাম টুনি বোধহয় আপনার ছেলে কিংবা মেয়ের নাম।" হঠাৎ কেমন একটা ছায়া পড়ল অনন্তবাবুর মুখে, শুকনো গলায় বিড়বিড় করলেন, “হুঁহ! ছেলে! মেয়ে! আমাদের কপালে নেই বুঝলেন! নইলে এরকম হয়? আরো কত কী যে কপালে আছে... হা ভগবান!" বলতে বলতে হঠাৎ যেন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল অনন্তবাবুর মুখ, ঠোঁট কামড়ে অন্ধকারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। চুপ করে বসে রইলাম। কী ঘটেছে হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। কিন্তু আমার আশঙ্কার চেয়েও বাস্তবটা যে আরো ভয়ঙ্কর সেটা বুঝতে পারলাম যখন ফুঁপিয়ে উঠলেন অনন্তবাবু, “প্রথমবার আমার একটা ছোট্ট মেয়ে হয়েছিল... এই এত্তটুকু", দুহাত বুকের কাছে জড়ো করে বলে চললেন, "ভেবেছিলাম নাম রাখবো পরি! কিন্তু... মাত্র সাতদিন, জানেন... কী এক অজানা জ্বর হল, সাতদিনের মাথায় আমাদের ছেড়ে চলে গেল সে...”, অবরুদ্ধ গলায় বলতে থাকলেন, “এক বার নয়, তিন তিন বার! প্রতিবার জন্মানোর ক’দিনের মধ্যেই ভগবান তাদের কেড়ে নিতে থাকলেন আমাদের কোল থেকে। হয়তো এ জন্মে ‘বাবা’,‘মা’ ডাক শোনা আমাদের কপালে নেই... ভগবান চান না...”

আস্তে আস্তে হাত রাখলাম অনন্তবাবুর পিঠে। কিছু কিছু কষ্টের সান্ত্বনা হয় না, কোনো কোনো ক্ষতি অপূরণীয়ই থেকে যায়। পেছন থেকে একটা ফোঁপানির আওয়াজে ঘুরে দেখলাম, কখন যেন রান্নাঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছেন অনন্তবাবুর স্ত্রী। আমি পেছনে ঘুরতেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে একছুটে চলে গেলেন ঘরের মধ্যে। দুহাতে মুখ ঢেকে বসেছিলেন অনন্ত বাবু। বিড়িটা খসে পড়েছে দাওয়ায়। একটা গুমোট পরিবেশ ধীরে ধীরে চেপে বসছে আধো অন্ধকার বাড়িটায়, বহুকালের যন্ত্রণাদায়ক এক অধ্যায় যেন হঠাৎ-ই অপরিচিত বাতাসে খুলে গেছে। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। না জেনেশুনে কতখানি আঘাত করে ফেললাম আমি? আমার এই অনুশোচনা হয়তো কিছুটা বুঝতে পেরেই মুখ মুছে মাথা তুললেন অনন্তবাবু, হালকা স্বরে বললেন, “ছাড়ুন আমার দুঃখের কাহিনী। দুটো দিন বেড়াতে এসেছেন, মন খারাপ করলে হয় নাকি! এখন পুরো শান্তিনিকেতন সেজে উঠবে দোলের রঙে... আবীর উড়বে, পলাশ-কৃষ্ণচূড়া সেজে উঠবে... আপনার সব প্ল্যান করা হয়ে গেছে?”

—“হ্যাঁ,মোটামুটি”,বসন্তোৎসবের প্রসঙ্গে সামান্য সহজ হয়েছি আমি, “কাল ভোর ভোরই বেরিয়ে পড়ব। প্রথমে পাঠভবন, কলাভবন, ছাতিমতলা...”

—“বুঝেছি বুঝেছি”,আমাকে থামিয়ে দিলেন অনন্তবাবু, “তারপর কঙ্কালীতলার মন্দির, খোয়াইয়ের মেলা... ওই গড়পড়তা বাঙালী শান্তিনিকেতন এসে যা দেখে আর কী! তবে আপনি তো মশাই অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন? তাহলে আপনাকে এমন একটা জিনিসের কথা বলতে পারি, যা কোনো ট্যুরিস্ট গাইডলিস্টে পাবেন না।”

—“কী জিনিস?”,অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

—“একটা গাছ", মিটিমিটি হাসলেন অনন্ত বাবু।

—“মানে? গাছ আবার দর্শনীয় জিনিস নাকি?", আরো বেশি অবাক হয়েছি।

—“দর্শনীয় বলে দর্শনীয়! দেখলেই বুঝতে পারবেন কী জিনিস! ভগবানের এ এক আশ্চর্য সৃষ্টি! সৃষ্টি কেন বলি, এ স্বয়ং ভগবানই!”,উৎসাহে জ্বলজ্বল করে উঠল অনন্তবাবুর দুই চোখ।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। গ্রাম-গঞ্জ এলাকায় স্থানীয় মানুষ কুসংস্কার বশত গাছ-টাছের পুজো করে জানি। আর ধর্মভীরু লোকজনদের কাছে সেসব জায়গা দর্শনীয়ও হয়ে যায়। সেরকম কোনো কিছুর কথা বলছেন অনন্তবাবু? ধুস, তেমন কিছুতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু আলোচনা করতে যাব, এমন সময় রান্নাঘরের দোরগোড়া থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল, “ভাত হই গ্যাছে।” উঠে পড়লেন অনন্তবাবুও, “চলুন, গরম গরম খেয়ে নিন। সামান্যই আয়োজন... খাওয়ার পরে নাহয় আবার বসা যাবে।” আমারও খিদেয় পেটে গানবাজনা শুরু হয়ে গেছিল, তাই তখনকার মতো বিষয়টা মুলতবি রেখে অনন্তবাবুর পেছন পেছন পা বাড়ালাম।

রান্নাঘরে ঢুকতে চোখে পড়ল মেঝের এক দিকে স্টোভ, বাসনপত্র, রান্নার জিনিসপত্র... আর অন্য দিকটায় পরিপাটি করে পাশাপাশি দুটি ফুলতোলা আসন পাতা, তার পাশে রাখা একটি করে জলভরা স্টিলের গ্লাস। অনন্ত বাবুর স্ত্রীর রুচি দেখে মন ভরে গেল। সঙ্গে ওনার রান্নার হাতও যে খারাপ নয়, সেটা মুখে গ্রাস তুলেই বুঝলাম। আমরা বসামাত্র দুটো কানা তোলা স্টিলের থালায় গোল করে সাজানো গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, সরু করে কাটা আলুভাজা, বেগুনভাজা আর পাশে ছোটো বাটিতে ডিমের ঝোল এসে গেল। তৃপ্তি করে খেলাম। খাওয়ার পর মৌরি চিবোতে চিবোতে দাওয়ায় এসে বসলাম। কাল পূর্ণিমা। বিশাল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। তার আলোয় ভেসে যাচ্ছে ছোট্ট উঠোনটা। তিরতির বাতাসে ভেসে আসছে কোনো এক নাম না জানা রাত-ফোটা ফুলের মিষ্টি গন্ধ। উদাস মুখে বসেছিলেন অনন্তবাবু। আমার মাথার মধ্যে কিন্তু ঘুরঘুর করছিল সেই গাছ দেখার কথাটা। একটু গলা খাঁকরে বললাম, “ইয়ে, ওই কী যেন গাছ দেখার কথা বলছিলেন তখন?"

-"আপনার বোধহয় এই গাছ দেখার বিষয়টা একটু বোকা বোকা লাগছে, না?", তীক্ষ্ম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত সুরে বলে উঠলেন অনন্তবাবু। অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। আমরা আমতা করে বলে উঠলাম, “না না! সেরকম কোনো ব্যাপার নয়... আমি তো তেমন কিছু... "

হঠাৎ উঠে এসে আমার গা-ঘেঁষে বসলেন অনন্তবাবু। একটা অপার্থিব হাসি খেলা করছে তাঁর মুখে। তারপর আমার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে গম্ভীর খসখসে গলায় বলে উঠলেন, “আচ্ছা বিতংসবাবু, কেমন হবে যদি রঙিন প্রকৃতির কোলে ছড়িয়ে থাকা শান্তিনিকেতনে এসে আপনি কয়েকশো বছরের পুরোনো এক রুক্ষ-শুষ্ক দানবাকৃতি পাথরের গাছ দেখতে পান?"

সেই গলার মধ্যে কী যেন ছিল, আমার গা-টা শিরশির করে উঠলো। অস্ফুট স্বরে বললাম, “পাথরের গাছ!"

-"কিংবা গাছের মতো পাথর", জ্বলজ্বলে চোখে দরজার পেছনে জমাটবাঁধা অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, “সৃষ্টির আদিতে জন্ম নেওয়া পাতালের সেই জীব... তান্ত্রিক বাবা তো তাই বলেছিলেন!"

আমার মাথার মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল... পিঠের মাঝ বরাবর যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নামছে। পাতালের জীব! পাথরের গাছ! তান্ত্রিক বাবা! কী বলতে চাইছেন অনন্তবাবু?

আমার মুখ দেখে বোধহয় মনের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন... একটা নির্মল হাসি ছড়িয়ে পড়ল অনন্তবাবুর মুখে। "সব মাথার ওপর দিয়ে গেল তো? দাঁড়ান, আপনাকে গোড়া থেকে বলি", বলতে বলতে লুঙ্গির গেঁজে থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরালেন। তারপর নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শুরু করলেন, “তা সে শ'দুয়েক বছর তো হবেই! আমাদের এই অঞ্চলে পুরোদমে জমিদার রাজত্ব ছিল। যে সে জমিদার নয়... একদম-ডাকাত জমিদার, বুঝলেন! শোনা যায়, মল্লিকদের পূর্বপুরুষরা এককালে দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই ডাকাতির ধনরত্নে পুষ্ট হয়ে শেষের দিকে ডাকাতির পথ ছেড়ে জমিদার হয়ে রাজত্ব শুরু করে। তবে জমিদার হয়ে যাওয়ার পরও তাঁরা গোপনে ডাকাতের দল পুষতেন আশেপাশের তহশিলে ডাকাতি চালিয়ে ধনসম্পদ লুঠপাট করে আনার জন্য। যাই হোক, মল্লিক বংশের এক বংশধর ছিলেন কন্দর্পনারায়ণ মল্লিক। তাঁর সময়ে হঠাৎ দেশে ভয়ঙ্কর খরা দেখা দিল। নদী-খাল-বিল শুকিয়ে জলের অভাবে কাতারে কাতারে লোক মরতে শুরু করল, রাজবাড়ির কূয়ো-পুকুরগুলোতে জল প্রায় তলানিতে ঠেকল। রাজা দেখলেন মহাবিপদ। এই অঞ্চলে থাকলে জলের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে। সুতরাং,পাইক-বরকন্দাজ সহযোগে পরিবার নিয়ে ঘর ছাড়লেন রাজামশাই। বনের পথে যাচ্ছেন, এদিকে বেজায় তেষ্টা পেয়েছে মহারাজের। দলের লোকেরাও প্রায় ধুঁকছে,পাল্কিবাহকেরাও প্রচণ্ড তেষ্টায় আর পাল্কি বইতে পারে না। “এবার বুঝি মরতেই হবে” ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রাজার নজরে পড়ল এক অদ্ভুত দর্শন গাছ, আর তার নীচে ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকা এক সাধু। দেবদ্বিজে বিশেষ ভক্তি ছিল কন্দর্পনারায়ণের, গিয়ে পড়লেন সাধুবাবার পায়ে। সব শুনেটুনে সাধুবাবা রক্তবর্ণ চোখ ঘুরিয়ে বললেন, “এই বিশালাক্ষ বৃক্ষ তোমাকে রক্ষা করবে বৎস, তোমার রাজ্যের প্রজাদের কোনোরকম অভাব-অভিযোগ থাকবে না। এ বৃক্ষ কিন্তু কোনো সাধারণ শ্রেণীর উদ্ভিদ নয়, সৃষ্টির আদিতে পাতালপুরীতে জন্ম নেওয়া এক বিপুল শক্তিধর প্রাণ! এর ক্ষমতা কতদূর তার কোনো ধারণা সাধারণ ক্ষুদ্র বুদ্ধির মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। শুধু মনে রাখবে, এ গাছের চাই খাদ্য। একটি করে নরদেহ। প্রতি পূর্ণিমা তিথিতে একটি করে মনুষ্য শরীর অর্পণ করতে হবে বৃক্ষদেবতাকে, তবেই তিনি তুষ্ট হবেন। কোনোভাবে যেন দেবতার অপমান না হয়! তাহলে কিন্তু মহা দুর্যোগ নেমে আসবে!” এই বলে কীভাবে তন্ত্রসাধনার দ্বারা বৃক্ষকে জাগিয়ে তুলতে হবে তা শিখিয়ে দিলেন রাজাকে। ভক্তিভরে সেসব শিখলেন কন্দর্পনারায়ণ, এবার শুধু একটি জ্যান্ত নরদেহ চাই। উপায় বলে দিলেন সাধুবাবাই। ভৃত্যদের মধ্য থেকে একজনকে শক্ত করে বাঁধা হল গাছের সঙ্গে, সামনে উপচার সাজিয়ে বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণে পূজা শুরু করলেন সাধুবাবা। দেখতে দেখতে জেগে উঠল গাছ, ধীরে ধীরে পাথর বানিয়ে ফেলল সেই ভৃত্যকে... তারপর তার সমস্ত রক্ত-রস-মাংস আত্মগত করে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিল।”

—“উফ্! কী নৃশংস!”, শিউরে উঠে বললাম, “ভয়ঙ্কর ব্যাপার! কিন্তু গাছ এরকম পাথর বানিয়ে টুকরো করে দিল... এরকম আবার হয় নাকি!”

—“আরে মশাই হয় হয়! এ দুনিয়ায় সবই হয়!”, বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে হাসলেন অনন্তবাবু, “অন্তত আমার বাপ-ঠাকুরদার মুখে তো তাই শোনা! এমনিতেও গাছটা দেখলেই আপনি ব্যোমকে যাবেন মশাই, গ্যারেন্টি দিচ্ছি। অমন পাথরের মতন গাছ... এ আপনি কোথাও পাবেন না! কন্দর্পনারায়ণের পর থেকে তো রাজ্যের যত চোর-ছ্যাঁচড়াদের ওই গাছের সঙ্গে বেঁধেই মারা হত, বংশের অন্তত এক জন করে ওই তন্ত্র-মন্ত্র শিখে রাখতেন। এখন অবশ্য সে জমিদারিও নেই, সেই বীভৎস প্রথাও নেই। তবে গাছটা আছে। সে এক জিনিস মশাই! ঠিক যেন ডালপালা-পাতা সহ একটা গোটা গাছ হঠাৎ পাথরে পরিণত হয়েছে!”

চুপ করে বসেছিলাম। মাথার ভেতরে কিছু পুরনো কথা, পুরনো ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে। বিড়িটা শেষ হয়ে এসেছিল, দাওয়ায় ঠুকে ঠুকে সেটা নিভিয়ে অনন্তবাবু বললেন, “কী ভাবছেন মশাই?”

—“উঁ? আমার এক দিদার কথা... ও কিছু না”,একটা আড়মোড়া ভেঙে হাই তুললাম, “কাল সকালে তো বিশ্বভারতী যাবো, তার আগে ভোর ভোর বেরিয়ে একবার আপনার ওই পাথরের গাছটা দেখে এলে মন্দ হত না। আপনার সময় হবে?”

রাতটা কেটে গেল। পরদিন ভোরে অনন্তবাবুর স্কুটারে করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মিনিট দশেক চলার পর স্কুটারটা একটা চায়ের দোকানের সামনে স্ট্যান্ড করে রাখলেন অনন্তবাবু। ভাঁড় থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিচ্ছি, দোকানিকে বলে বেরিয়ে এলেন হাসিমুখে, “এখান থেকে একটু হাঁটতে হবে, সামান্য চড়াই আছে। স্কুটার নিয়ে ওঠা চাপের ব্যাপার।” চা-টা শেষ করে বললাম, “আপনাদের এখানে জল-হাওয়া কিন্তু তোফা মশাই। কাল রাতে যা একখান ঘুম হল না! এখনও ঘুম ঘুম পাচ্ছে। চলুন হেঁটে হেঁটেই যাই, ঘুমটা কাটবে। কিন্তু আপনার অসুবিধে হবে না তো?”

—“আরে অন্ধের কিবা দিন, কিবা রাত! তেমনি খোঁড়ার কিবা সমতল, কিবা চড়াই!”,হো হো করে হেসে উঠলেন অনন্তবাবু, “তাছাড়া এতো এভারেস্ট নয়, সামান্য টিলা মাত্র।” অপ্রস্তুত হেসে অনন্তবাবুর পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলাম। যত দেখছি এই মানুষটাকে, শ্রদ্ধায়-স্নেহে মনটা ভরে যাচ্ছে। নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচেন, অন্যকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন... তেমনটা বোধহয় আমাদের মতো অনেক শক্তসমর্থ মানুষই পারবে না! আজ সকালে বেরোনোর সময় চিড়ে-দই না খাইয়ে ছাড়লেন না, সারাদিন কী পেটে পড়ে না পড়ে এই বলে। তারপর স্কুটার নিয়ে বেরিয়েও পড়লেন আমার সঙ্গে। লোকালয় ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে চলে এসেছি। প্রথম প্রথম বসন্ত উৎসবে পৌঁছনোর দেরী হয়ে যাবে বলে চিন্তা করছিলাম, তবে কিছুটা হাঁটার পরই বুঝতে পারলাম এসে কোনো ভুল করিনি। চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য এতটাই মনোমুগ্ধকর যে মনে হচ্ছিল বাকি সব চুলোয় যাক, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি এই অপরূপা প্রকৃতিকে! সদ্য জন্মানো কচি সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে উপচে পড়ছে লাল-হলুদ-কমলা রঙ, যেন আগুন লেগেছে বনে! শিমূল-পলাশ-কৃষ্ণচূড়ায় ঢেকে আছে পথ, সবুজ ঘাসের ওপর কখনো কখনো ঝরে পড়েছে উজ্জ্বল লাল ফুলগুলো। ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায় কীসের যেন মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। এক ঝাঁক পাখি টুইট-টুইট করতে করতে উড়ান দিল। “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান...”,গুনগুনিয়ে দু কলি ছিটকে বেরিয়ে এল আমার হেঁড়ে গলা দিয়ে। গলা মেলালেন অনন্তবাবুও। “আপনার তো বেশ রেওয়াজ করা গলা মনে হচ্ছে!”,তারিফের গলায় বললাম। “হেঁ হেঁ, ওই আর কী...”,লজ্জিত হেসে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন অনন্তবাবু, “এই যে পৌঁছে গেছি। এই সেই গাছ।”

সত্যি বলতে কী এই অসাধারণ পরিবেশ উপভোগ করতে করতে গাছটার কথা ভুলেই গেছিলাম। অনন্তবাবুর কথায় সামনের দিকে তাকালাম, আর মারাত্মক এক ঝটকা খেলাম! এরকম কোনো কিছু যে হতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল! গলা দিয়ে ছিটকে বেরোল একটাই আর্তনাদ, “উফফ্!”

হাত দশেক দূরে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত বস্তু। সে এক ভয়াল ভয়ঙ্কর মূর্তি! একটা বিকট কদাকার গাছ, তিন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়ালে যতটা চওড়া হয় ততটা চওড়া তার গুঁড়ি। আর সেই বিশাল গুঁড়ির ঠিক মাঝখানে একটা অন্তত দশ ইঞ্চি রেডিয়াসের বিশাল এক গহ্বর, যার মাঝখান থেকে সামান্য উঁচু হয়ে বেরিয়ে আছে একটা মোটা কাণ্ড... ঠিক যেন একটা চোখ! অনন্তবাবুর গল্পের সেই বিশালাক্ষ গাছ! কিছুক্ষণের জন্য মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না আমার। মোটা গুঁড়িটার ওপর দিক থেকে সাপের মত পেঁচালো আঁকাবাঁকা কিছু ডালপালা আকাশের দিকে উঠে গেছে,সেগুলোর শেষ প্রান্ত লক্ষ লক্ষ ধারালো দাঁত বিশিষ্ট কোনো দানবের হাঁ-এর মতো! তবে সব থেকে বেশী আশ্চর্যজনক এই যে, গাছটার পুরো শরীরটাই মসৃণ স্লেট রঙের! ঠিক যেন ভিনগ্রহ থেকে আসা কোনো বীভৎস জন্তু হঠাৎ কোনো দৈববলে পাথরে পরিণত হয়েছে। অথবা কোনো দক্ষ শিল্পীর বিকৃত কল্পনার ফসল হিসেবে পাথর খোদাই করে বানানো হয়েছে এই কদর্য অবয়ব! এই বসন্তের শাল-পলাশ-মহুয়ার জঙ্গলে যেখানে সদ্য ফোটা ফুলে, কচি পাতায় উপচে পড়ছে রঙের বাহার, সেখানে এই নিষ্প্রাণ ধূসর বর্ণের বিকৃত পাথুরে বস্তুটি যেন এক মূর্তিমান মৃত্যুর প্রতীক। লক্ষ করে দেখলাম সাধারণত বড় বড় গাছের নীচটা যেমন ছাওয়া থাকে কচি সবুজ ঘাস বা বুনো ঝোপে, এখানে তেমন কিছুই নেই। তার বদলে আছে শুধু বড় বড় পাথর খণ্ড। ছোটো বড় কালচে ধূসর পাথরের টুকরো ছড়িয়ে আছে গাছের গোড়া থেকে হাত দশেক দূর... প্রায় আমাদের পায়ের কাছ অব্দি। “এ কী ভয়ঙ্কর জিনিস মশাই! দেখলেই কেমন গা শিরশির করে!”,অস্ফুটে ছিটকে এল আমার গলা দিয়ে, “কী অদ্ভুত সৃষ্টি!”

-"এ স্বয়ং ভগবানের লীলা, তাঁরই সৃষ্টি! বুঝলেন!”,বলত বলতে সসম্ভ্রমে কপালে জোড় হাত ঠেকালেন অনন্তবাবু। ভগবানে বিশ্বাস আমার কোনোকালেই নেই, তার ওপর এই কদাকার জিনিসটা দেখে ভগবানের থেকে বরং মূর্তিমান শয়তানই বেশী মনে হচ্ছে। নীচু হয়ে পায়ের কাছ থেকে একটা পাথরের টুকরো তুললাম। গাঢ় স্লেট রঙের নিটোল মসৃণ গা-টা, যেন জল পড়লে পিছলে যাবে। গাছটার শরীরও এই একই পাথরের, দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। জায়গাটা আর ভালো লাগছিল না। চারদিকে এত রঙের বাহার, এত সুন্দর মিষ্টি হাওয়া... তার মধ্যে এই বিদঘুটে জিনিসটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয়! পাথরটা ফেলে দিয়ে ঘুরলাম, “চলুন ফেরা যাক। এখানে আর দাঁড়িয়ে লাভ নেই। একটু জঙ্গলের শোভা উপভোগ করি বরং।”

—“তাই চলুন”,ঘুরলেন অনন্তবাবুও, তারপর যুদ্ধজয়ের গলায় বলতে থাকলেন, “দেখলেন তো! বলেছিলাম না, পুরো চমকে যাবেন! এ যে সে গাছ নয়, বিশালাক্ষ গাছ!” অনন্তবাবুর বকবকানি চলছে, আস্তে আস্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম জঙ্গলের পথে। মনে ফুরফুরে ভাবটা ফিরে আসছে, একটা নরম আলস্য যেন ছড়িয়ে পড়ছিল শরীর জুড়ে। একটা পলাশ গাছের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এতটা চড়াই উঠে গলাটা কেমন শুকিয়ে এসেছে। সঙ্গে জল রাখলে ভালো হয়। অনন্তবাবুকে সে কথা বলতেই তুড়ি বাজিয়ে ব্যাগ থেকে একটা জলের বোতল বের করে বললেন, “সব ব্যবস্থা আছে স্যার! একটা জলের বোতল আমি সবসময় ব্যাগে রাখি!" আগুনরঙা পলাশের ভারে নুয়ে পড়েছে ডালগুলো, তলাটা ঝরে পড়া ফুলে ছাওয়া। দু'চোখ ভরে দেখতে দেখতে অনন্তবাবুর হাত ধরে টানলাম, “তাহলে আর কী... আসুন একটু বসে জল খাই এখানে। ওই বিচ্ছিরি পাথুরে গাছের কথা ছেড়ে একটু আসল প্রকৃতির স্বাদ অনুভব করুন তো মশাই! কী সুন্দর ঠান্ডা ছায়া না?”

আহ্! কঁকিয়ে উঠলাম। ঘাড়ে পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। হাত দুটো নাড়াতে পারছি না। কী যেন ছুঁচের মতো সারা গায়ে ফুটে চলেছে, জ্বালা করছে গোটা শরীর। ধড়মড়িয়ে উঠে বসার চেষ্টা করলাম,পারলাম না। চারদিকটা এতো অন্ধকার কেন? আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এটা কোন জায়গা? মাথাটা যেন দু'মনি বস্তার মত ভারী হয়ে আছে, কিছু ভাবতে পারছি না। একটু দূরে একটা আগুন জ্বলছে না? ছোট্ট একটা আলোর বলের মতন... নাচছে, লাফাচ্ছে... কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে... ওঃ, বড় ঘুম পাচ্ছে আমার। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে... কাছে... আরও কাছে... আমার ভারী চোখের পাতাটা টেনে তোলার চেষ্টা করলাম। আলোটা একেবারে কাছে এসে পড়েছে, একদম মুখের সামনে... কে যেন একটা ফাঁকা হাঁড়ির ভেতর থেকে ডাক দিয়ে উঠল, “খাসনবিশ বাবু! ও খাসনবিশ বাবু! ঘুম ভাঙলো তাহলে?” শব্দগুলো যেন ভোঁতা হাতুড়ির মতো স্নায়ুতন্ত্রে ধাক্কা মারছে, চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আমার। কোনোমতে জড়ানো গলায় বললাম, “কে?”

হাতের মশালটা মাটিতে পুঁতে সামনে এসে উবু হয়ে বসল লোকটা। তারপর বিশ্রী খ্যাকখ্যাক করে হেসে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল, “হবে! হবে! এইবার হবে!”

অনন্তবাবু! বিস্ময়ে আমার চোয়াল ঝুলে গেল! মাথার ভেতর সব কেমন জড়িয়েমড়িয়ে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মশার কামড়ে জ্বলছে গা, শক্ত হয়ে প্রায় চামড়া কেটে বসেছে পাকানো দড়ি। বুঝতে পারছি কোনো কিছুর সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে আমাকে! কিন্তু অনন্তবাবু এরকম হাসছেন কেন? একটা ঝটকা দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই দড়িগুলো যেন আরো চেপে বসল,যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলাম! ফাঁদে আটকা পড়া প্রাণীর মত ছটফটিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, “কী পাগলামি এসব! আমাকে খুলে দিন শিগ্গির!”

—“কী যে বলেন মশাই”,জুত করে বসলেন অনন্তবাবু, “এত দিনে এত কষ্ট করে মাছ ধরা পড়ল জালে, আর আপনি বলছেন তাকে ছেড়ে দিতে!”

বিস্ময়ে আতঙ্কে রা কাড়ল না আমার মুখ দিয়ে! এসব কী বলছেন অনন্তবাবু! তার মানে আমাকে টোপ দিয়ে এনেছেন এভাবে বন্দী করবেন বলে? কী মতলব তাঁর? আমার কাছে তো টাকাপয়সা বিশেষ...

—“হে হে... থিয়েটার করাটা বেশ ভালোই কাজে লাগল, বুঝলেন?”,মশালের আলোয় একটা বিড়ি ধরিয়ে লম্বা টান দিলেন অনন্ত বাবু, “ওফ্, আজ অব্দি কত চেষ্টাই না করেছি! একটা লোককে বিশ্বাস করাতে পারিনি! গুলগপ্পো ভেবে উড়িয়ে দিত সব। আর পা টারও এমন অবস্থ... ল্যাংড়া লোক হয়ে জোর করে কাউকে তুলে আনবো কী করে বলুন তো!”

সম্পূর্ণ স্বাভাবিক স্বরে কথা বলছেন অনন্তবাবু। আমার মাথার ভেতরটা যেন চক্কর কাটছিল। এই মানুষটাকে পরোপকারি, বন্ধুবৎসল ভেবেছিলাম... অতিথিপরায়ণতার আড়ালে তবে এই লুকিয়েছিল! একটা ঠগ-জোচ্চরের পাল্লায় পড়লাম শেষে! দাঁতে দাঁত ঘষে চেঁচিয়ে উঠলাম, “কী চান আপনি? হোটেলের আড়ালে এইভাবে কিডন্যাপিং এর ব্যবসা চালান! থুঃ!”,একদলা থুতু ছুঁড়ে ফেললাম মাটিতে।

—“কিডন্যাপিং!”,হো হো করে হেসে উঠলেন অনন্তবাবু, “আপনাকে কিডন্যাপ করে আমার লাভ কী মশাই! চালচুলোহীন একটা লোক, পাতি রিপোর্টার... সঙ্গে নিশ্চয়ই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে ঘোরেন না! তার জন্য বোতলের জলে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে এত কসরৎ করে আপনাকে এখানে আনতে যাব কেন?”

ঘুমের ওষুধ! শরীরে একটা বিদ্যুৎচমক খেলে গেল আমার! এই জন্য জল খেয়ে গাছের ছায়ায় বসার পর যেন শরীর ছেড়ে দিচ্ছিল আমার, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল! কতক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি? ক’দিন কেটেছে? কী করতে চায় এই লোকটা আমার সঙ্গে? “আপনি...”,ফের গর্জে ওঠার আগেই গম্ভীর স্বরে হাত তুললেন অনন্তবাবু, “দাঁড়ান দাঁড়ান! আপনার সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন। ভাবছেন তো, কেন এখানে আপনাকে এনেছি? এখানে এনেছি একটা গল্প শোনাতে। আপনাকে সেই কন্দর্প মল্লিকের গল্প শুনিয়েছিলাম মনে আছে? সেটা তো এখনো শেষ হয়নি!”

নিষ্ফল আক্রোশে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। গল্প! লোকটা কি উন্মাদ? আমার মুখভঙ্গিকে পাত্তা না দিয়ে আপনমনে বলতে শুরু করলেন অনন্তবাবু, “আরে অত রাগ করবেন না। শুনুনই না গল্পটা! তো তারপর কী হল, বিশালাক্ষ গাছের কৃপায় তো রাজ্যের সব দুর্দশা কেটে গেল, ফুলেফেঁপে উঠল জমিদারিও। নিয়মমতো বৃক্ষ দেবতাকে বলি উৎসর্গ করার রীতিও চলে আসছিল পুরুষের পর পুরুষ ধরে। সবই ঠিক চলছিল, এমন সময় কন্দর্পনারায়ণের দুই প্রজন্ম পর ঘটে গেল একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা!”

দু'হাতে চেপে ধরে এক ধাক্কায় আমার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন অনন্তবাবু! কেমন যেন অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে সেই মুখ! দু'হাতে ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন আমার দিকে, লাল রক্তজবার মতো দু'চোখের মধ্যে মণি দুটো যেন কয়লার মতো জ্বলে উঠল! লালা জড়ানো ঘড়ঘড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “কী হল জানেন? পাপ! পাপ! মহাপাপ হল!”

মশালের আলোয় সেই বীভৎস মুখভঙ্গির সামনে যেন আমার শরীরের প্রতিটা পেশী জমে ঠান্ডা হয়ে গেল! এক অসীম আতঙ্কে বিকৃত হয়ে উঠল অনন্তবাবুর মুখ, “এক পূর্ণিমার রাতে ভগবানকে ভোগ নিবেদনের সময় কীভাবে যেন দড়ি কেটে পালিয়ে গেল বন্দি! ভগবান রুষ্ট হলেন! অভিশাপ নেমে এল পরিবারের ওপর! বংশের প্রত্যেকটা সন্তান হয় মারা যেতে লাগল জন্মের পর, আর নাহলে জন্মাল বিকলাঙ্গ হয়ে! এই আমার মতো!” বলতে বলতে এক ঝটকায় হাঁটু অব্দি তুলে দিলেন পাতলুন, বেরিয়ে পড়ল শুকনো গাছের ডালের মত লিকলিকে পা আর উল্টানো পায়ের পাতা!

দিনের বেলায় যে পা দেখে করুণা জেগেছিল, ধকধক করে জ্বলতে থাকা রক্তিম আলোয় সেই কঙ্কালসার বীভৎস অঙ্গ দেখে বুকের মধ্যে কাঁপুনি খেলে গেল আমার। পাহাড়প্রমাণ ভয় চেপে বসছে মনের ভেতর, সেই সঙ্গে একটা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাও। শুধু অস্ফুটে বললাম, “মল্লিক... ?”

—“হ্যাঁ। আমাদের আসল পদবি মল্লিক",বাঁকা হাসি উড়ে এলো আমার দিকে, “চৌধুরী শুধুমাত্র উপাধি ছাড়া কিছুই নয়। কাউকে দিই না আমার এই পরিচয়, দিয়ে কী হবে? ডাকসাইটে বনেদি মল্লিক বংশের ছেলে একটা ঝুপড়ি হোটেল চালায়, এই কথা বলতাম সবাইকে?",তেতো স্বর বলে চলল, “আমার স্বর্গত বাবা যোগীন্দ্রনারায়ণ মল্লিক ছিলেন জন্মান্ধ। গরিব স্কুল মাস্টার। একটা চোখ জন্ম থেকেই পুরোপুরি নষ্ট। দুই সন্তানের মৃত্যুর পর আমি এলাম। অনন্তনারায়ণ মল্লিক। কিন্তু জন্মালাম এই খোঁড়া পা নিয়ে। গতকাল রাতে আপনাকে একটাও মিথ্যে কথা বলিনি বিতংসবাবু! সন্তানসুখ আমার কপালে জোটেনি। কিন্তু আমি জানি...”,বলতে বলতে পরম তৃপ্তিতে ভরে গেল তাঁর মুখ। মাটি থেকে হাতে তুলে নিলেন গোল মতো কী একটা জিনিস, তারপর সেটা মাথায় ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “উৎসর্গ পেলেই ফের প্রসন্ন হবেন দেবতা। কেটে যাবে অভিশাপ। মল্লিকবংশ তার উত্তরাধিকারী পাবে।”

একটা গরম লোহার শিক যেন কেউ ঢুকিয়ে দিল আমার কানে। মশালের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি অনন্ত বাবুর হাতে চকচক করছে সকালে দেখা সেই মসৃণ পাথর! শুধু তাই নয়, আমার পায়ের নীচে আশেপাশে চারদিকে ছড়িয়ে সেই পাথর। পিঠের পেছনে ঠান্ডা স্লেটের মতো পাথুরে স্পর্শ অনুভব করতে করতে এতক্ষণে তাকালাম ওপরের দিকে। পূর্ণিমার আলোয় পাতাবিহীন মরা ডালগুলো ডাইনির ধারালো নখের মত উঁচিয়ে আছে! যে গাছের সঙ্গে আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছে, সেটা আর কিছুই নয়... সকালে দেখা সেই পাথুরে গাছ!

জীবনে কখনো কখনো কখনো এমন কিছু পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সমস্ত সাধারণ বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে মানুষ আতঙ্কের শেষ সীমানায় পৌঁছে যায়। সেই রাত্রির নিকষ অন্ধকারের মধ্যে চাঁদের আলোর আবছায়ায় দানবের মতো গাছটাকে দেখে, অনন্তবাবুর বর্ণনায় দেবতাকে নরদেহ উৎসর্গ করার দৃশ্যটা জীবন্ত হয়ে উঠল আমার সামনে! শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমাট বেঁধে যাচ্ছে, তলপেটে চিনচিনে যন্ত্রণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণভয়! উন্মত্তের মতো দড়ি ছেঁড়ার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করতে থাকলাম, “ছেড়ে দিন! ছেড়ে দিন আমাকে! এক্ষুণি দড়ি খুলে দিন অনন্তবাবু! এটুকু দয়া করুন! আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি! প্লিজ ছেড়ে দিন!”

—“ওফ্!”,বিরক্ত হয়ে উঠে এলেন অনন্তনারায়ণ মল্লিক। পাশে রাখা একটা ঝোলা থেকে একদলা কাপড় বের করে আমার মুখে ঠুসে দিতে দিতে বললেন, “বড্ড চ্যাঁচাচ্ছেন আপনি! যদিও আশেপাশে কেউ নেই আপনার এই চিৎকার শোনার জন্য, তাও... সাবধানের মার নেই। আমাকে এখন সাধনায় বসতে হবে, মনঃসংযোগ করতে হবে... জাগিয়ে তুলতে হবে দেবতাকে। এই দিনটার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করেছি আমি।”

মুখে কাপড়টা গুঁজে দিতেই আমার শরীরের সব যন্ত্র যেন বিকল হয়ে গেল। এই তবে শেষ! কাপড়ের দলাটা চেপে ধরেছে আমার শ্বাসনালী। বুক থেকে উঠে আসা একটা বোবা গোঁ গোঁ শব্দ আর চোখ উপচে যাওয়া কান্না ছাড়া যেন আর কোনো অস্তিত্ব নেই আমার! সেদিকে অবশ্য কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সামনের লোকটার। একে একে ঝুলি থেকে বের করে সাজাতে লাগল কয়েকটা ছোট ছোট হাড়, কিছু শিকড়-বাকড়, কালো রঙের কোনো জানোয়ারের লোম, মাটির খুরিতে কালচে লাল রঙের একরকমের থকথকে তরল। দম ফুরিয়ে আসছিল আমার। বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা চিৎকারটা স্তিমিত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ছিল ক্রমশ। সারা শরীরে লক্ষ লক্ষ বিষফোঁড়ার যন্ত্রণা, খাওয়ার-জল বিহীন গোটা একটা দিন কাটানোর পর নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল শরীর। ওই তো, হাড়গুলোকে সাজিয়ে তার ঠিক মাঝখানে তরলভর্তি খুরিটা রাখলেন অনন্ত বাবু, মুখে নির্মল প্রশান্তির ছাপ। চোখের সামনে দৃশ্যপট ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে... পুরোনো কথা মনে পড়ছে... এখানে প্রথম আসার দিনটা... দূরে কোথায় যেন দ্রিমি দ্রিমি মাদল বাজছে... বলির বাজনার মতো... আর কোনোদিন ফেরা হবে না...

প্রায় বুজে আসা চোখের এক কোণে দিয়ে ঠিক তখনি চোখে পড়ল জিনিসটা। আমার অবসন্ন শরীরটা ঝুলে পড়েছে বাম পাশে, সেদিক বরাবর হাতখানেক দূরে পাথরের খাঁজে খুব হালকা আবছায়ার মতো কী একটা যেন চকচক করছে। চোখগুলোকে টেনে বড় করার চেষ্টা করলাম। কী ওটা? এক আঙুল মতো একটা জিনিস... লাল রঙের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে... প্রাণপণে ঝুঁকে পড়লাম আমি, আর তখনি আশার একটা ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল মনের মধ্যে! সৌমিকের দেওয়া সেই চাবির রিং টা! আমাকে এখানে আনার সময় বোধহয় কোনোভাবে বোধহয় পড়ে গেছে পকেট থেকে,পাথরে ধাক্কা খেয়ে খুলে গেছে রিং এ লাগানো ফোল্ডিং পেপার নাইফ! এটা দিয়ে কি দড়ি কাটা যাবে? সম্ভাবনাটা মাথায় আসতেই আমার শরীরে যেন নতুন জোয়ার এল। আড়চোখে দেখলাম পদ্মাসনে বসেছেন অনন্তবাবু, চোখ বোজা। দু'হাতে কোলের ওপর রেখেছেন একখানা পাথর। এই সুযোগ! কোনোভাবে পেতেই হবে ছুরিটা! কিন্তু কিছুটা দূরে পড়ে আছে ওটা, কীভাবে নেওয়া যায়? পা থেকে ইঞ্চিকয়েক দূরে পড়ে আছে জিনিসটা, সামান্য নাড়নোর চেষ্টা করলাম পা। শ্রান্তিতে শরীর নুয়ে পড়ছে, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ, তাও চেষ্টা আমাকে করতেই হবে। পায়ের পাতাটা আস্তে আস্তে সরাচ্ছি বাম দিকে, শক্ত নাইলন দড়ির বাঁধনে যেন চামড়া কেটে যাচ্ছে! অসহ্য যন্ত্রণায় চোখে জল এসে যাচ্ছে আমার। দাঁতের ফাঁকে গোঁজা কাপড়টা কামড়ে ধরে কষ্ট সহ্য করছি, ওই ছুরিটার ওপর এখন নির্ভর করছে আমার বাঁচা-মরা!

কতক্ষণ কাটল জানি না। পা-টা প্রায় পৌঁছে গেছে ছুরিটার পাশে, আস্তে আস্তে বুড়ো আঙুলটা ছুঁল ফলাটা। আর একটু! পায়ের পাতাটা সামান্য পিছিয়ে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলা মারলাম হাতলের দিকটা, পাথরের গায়ে সামান্য আওয়াজ তুলে প্রায় উড়ে এসে আমার পাশে পড়ল ছুরিটা!

আর ঠিক তক্ষুণি গম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন অনন্তবাবু।

এ আমাদের চেনা কোনো ভাষা নয়। চোখ বোজা অবস্থাতেই এক অদ্ভুত করুণ সুরে যেন ইনিয়ে বিনিয়ে মিনতি জানাচ্ছেন অনন্তনারায়ণ মল্লিক। সেদিকে কান দেওয়ার সময় অবশ্য আমার ছিল না। মশার কামড়ে জ্বলছে গোটা শরীর। ছুরিটা এখনো আমার নাগালের বাইরে। ভাগ্যিস হাতটা পিছমোড়া করে বাঁধা নেই! সব শক্তি এক করে কোমর ঘষটে ঘষটে বাম দিকে উপুড় হয়ে পড়লাম। দড়িটা ঘষা লেগে লেগে বাহুর চামড়া কেটে দিচ্ছে, বোধহয় রক্ত বেরিয়ে গেল। শিকড়পোড়া গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করছে। যেকোনো মুহূর্তে চোখ খুলতে পারেন অনন্তবাবু! তার আগেই ওটা কুড়িয়ে নিতে হবে আমায়। মাটিতে প্রায় নাক ঠেকে এসেছে, শক্ত করে বাঁধা হাতদুটো এগিয়ে দিতেই হাতে ঠেকল তীক্ষ্ণ ফলাটা! কোনোমতে ফলাটা তুলে নিয়েই যতটা দ্রুত সম্ভব শরীরটাকে সোজা করে নিলাম। অনন্তবাবুর মন্ত্রোচ্চারণের জোর বেড়েছে,গমগমে কণ্ঠস্বর যেন নিস্তব্ধ জঙ্গলের গাছ থেকে গাছে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসছে। আমার ভেতরে তখন যুদ্ধজয়ের আনন্দ! এবার শুধু দড়িটা কেটে ফেলার অপেক্ষা, ব্যস! মুক্তি! তাড়াতাড়ি ছুরিটা ডানহাতের মুঠোয় নিয়ে বাঁধন কাটতে শুরু করলাম। আর ঠিক তখনি প্রথম অনুভব করলাম একটা অবিশ্বাস্য অথচ ভয়াবহ ঘটনা!

আমার শরীরের পেছনে পাথুরে জিনিসটার ভেতর একটা কম্পন শুরু হয়েছে! তার গরম উপরিভাগের স্পর্শ জামা ভেদ করে এসে পৌঁছচ্ছে আমার পিঠের চামড়ায়! আস্তে আস্তে রবারের মতো নরম হয়ে যাচ্ছে পাথর... আর খুব ধীরে ধীরে একটা হিসহিসে শব্দের মধ্যে যেন একটু একটু করে বসে যাচ্ছে আমার শরীরটা! জেগে উঠছে গাছ!

এক আদিম আতঙ্কে কিছুক্ষণের জন্য যেন পাথর হয়ে গেলাম আমি। দেরী হয়ে গেল? আর কি নিস্তার নেই? এই মূর্তিমান শয়তান কি এবার সত্যিই পাথরের টুকরো করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে আমাকে? চোখ মেলে তাকিয়েছেন অনন্তবাবুও। মশালের শিখাটা এঁকেবেঁকে যেন বীভৎস কাটাকুটি খেলা করে চলেছে তাঁর মুখে। আমার দিকে তাকিয়ে কী বুঝলেন কে জানে, একটা পাখির পা-কে সেই থকথকে তরলে চুবিয়ে ছিটিয়ে দিতে লাগলেন আমার দিকে! দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে বমি উঠে আসছিল আমার। ফের চোখ বুজে বিড়বিড় শুরু করলেন, যদিও তাঁর ঠোঁটুর কোণে লেগে থাকা উল্লাসের হাসিটা আমার চোখ এড়ালো না।

এই সুদীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবনে বরাবরই দেখেছি চরম বিপজ্জনক অবস্থায় হঠাৎ একটা ভীষণরকম মনের জোর এসে যেন আমার সামনে অন্ধের যষ্টি হয়ে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তেও সমস্ত আতঙ্ক আর বিভীষিকার উর্দ্ধে যেন আমার ভেতর থেকে ছিটকে এল একটা দৃঢ় গলা, “তুই পারবি বুতু! এখনও সময় আছে! চেষ্টা কর! পালাতে হবে তোকে! বাঁচতে হবে!” সম্বিৎ ফিরে এল আমার। জলে ডোবা মানুষ যেভাবে খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরে, সেভাবেই ছুরিটা চেপে ধরে শরীরের সব শক্তি দিয়ে ঘষতে লাগলাম নাইলনের দড়ির ওপর। একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছি... দুপাশ থেকে ভারী পাথর চেপে আসছে... তার মধ্যেই স্পষ্ট অনুভব করলাম,পট্ করে কেটে গেল আমার হাতের বাঁধন! ক্ষিপ্র হাতে একে একে কাটতে শুরু করলাম বাকি দড়িদড়া... এই উন্মাদ কাপালিকের ফের চোখ খোলার আগেই যে করে হোক পালাতে হবে আমাকে! পাথর পিষে দিচ্ছে... গরম হলকায় পুড়ে যাচ্ছে পিঠ... আর তার তালে তালে উচ্চগ্রামে চড়ছে অনন্তবাবুর গলা। কী বিকৃত উল্লাস সেই অদ্ভুত উচ্চারণের মধ্যে! মুখের কাপড়টা খুলে ফেলে হাঁচোরপাচোর করে উঠে দাঁড়ালাম। আর এক মুহূর্ত নয়! আজ আবার পুনরাবৃত্তি হবে ইতিহাসের, আবার পালাবে বন্দী। গাছের ভেতর থেকে আসা হিসহিসে শব্দটা একটু যেন থমকে গেল। পায়ের তলায় একটা মৃদু কম্পন পেলাম। ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি? টলতে থাকা শরীরে পালানোর জন্য পা বাড়ালাম আর তখনি ঘটল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা যার কথা মনে করলে আজও আমার শরীরের সব স্নায়ু কেঁপে ওঠে।

কখন যেন আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন অনন্তবাবু। আমাকে দেখে ভয়ঙ্কর গর্জন করে জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলে উঠল তাঁর চোখ! চোখের নিমেষে দাঁতে দাঁত ঘষে ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলেন... আর এক ঝটকায় কোনোমতে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে মাটির ওপর গড়িয়ে পড়লাম আমি!

সেই মুহূর্তে মাটির ওপর শুয়ে আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে যেন ঘটে গেল মহাপ্রলয়! গলন্ত লাভার মত জ্বলে উঠল পুরো গাছটার শরীর! কানফাটানো হিসহিসে শব্দ ঘিরে ধরল চারদিক থেকে, যেন বহুযুগের বুভুক্ষু এক দানব শিকারের গন্ধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে! আর তক্ষুনি টাল সামলাতে না পেরে গাছের গায়ে আছড়ে পড়লেন অনন্তনারায়ণ মল্লিক।

একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। অনন্তবাবুর দেহটা গাছের শরীর ছোঁয়া মাত্র লক্ষ লক্ষ পাথরের টুকরো যেন সাপের মতো মাথা তুলে দাঁড়াল! লাভার স্রোতের মধ্যে শরীরটা গেঁথে ফেলল সেই পাথরের সাপেরা, পাকে পাকে জড়িয়ে ধরতে থাকল তার খাদ্যকে! পুড়তে থাকা রক্ত মাংস মজ্জার গলিত তরলে যেন তৃষ্ণা নিবারণ হতে থাকল সেই পাতালের জীবের! আর মর্মান্তিক আর্তনাদ করতে করতে তলিয়ে যেতে থাকলেন ডাকাতে জমিদার বংশের শেষ বংশধর! আগ্নেয়গিরির মতো প্রাণ রস শুষে নেওয়া সেই জ্বলন্ত ছিন্নভিন্ন দেহাংশ হাজার হাজার পাথরের টুকরো হয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারদিকে!

কীভাবে যে সেই অভিশপ্ত জায়গা থেকে পালিয়ে এসেছিলাম, তা আর আজ পরিষ্কার মনে পড়ে না। কিন্তু সেদিন যে বীভৎস ঘটনা আমার সামনে ঘটেছিল, তা পরের বহুরাত ধরে করাল আতঙ্ক হয়ে ফিরে ফিরে এসেছে ঘুমের মধ্যে! এমন বিভীষিকাময় সেই সব দৃশ্য, যা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কল্পনা করে উঠতে পারে না! পাথরের টুকরোগুলো ছিটকে পড়ার সময় একটা এসে আটকে ছিল আমার জামার মধ্যে। আজও আমার শেলফের ওপরে রাখা পাথরটা দেখলে অনন্তবাবুর কথা মনে হয়। মনে হয়, কোন মানুষটা আসল? যে হাসিখুশী অতিথিপরায়ণ মানুষটার ঘরে কাটিয়েছিলাম এক রাত, নাকি যে মানুষটা এক অলীক বাসনার ঝোঁকে আমাকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন? একই মানুষের মধ্যে এরকম দুটো সত্তা হয়? বন্ধুর বেশে আসা একটা মানুষের আড়ালের মুখটা আসলে এতটা লোভী, এতটা স্বার্থপর হয়? হয়তো সত্যিই হয়। হয়তো হয় না বলে আসলে কিছু হয় না।

প্রত্যাবর্তন - জাকিউল অন্তু

অলংকরণ - প্রতিম দাস

প্রচণ্ড মিউ মিউ শব্দে আমার চটকা ভাঙলো৷ গাড়ির পেছনের সিটে আমার কোলের ওপর বসে আছে ফেলিক্স৷ আমার পোষা বেড়াল৷ বয়স তিন মাস৷ ভীষণ আদুরে আর বেশ ভীতু৷

গাড়ি চালাচ্ছিলো আমার অফিসের বন্ধু তন্ময়৷ গাড়িতে যাত্রী মাত্র তিনজন৷ আমি, তন্ময় আর ফেলিক্স৷ আমি ফেলিক্সকে কোলে নিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশেই বসেছিলাম কিন্তু ঘুমে চোখ লেগে আসায় একটু পেছনে এসেছি ঘন্টাখানেক হলো৷ ফেলিক্স সাথেই এসেছে৷ আরো ঘন্টাখানেক পর বদলি হিসেবে আমি ড্রাইভ করবো৷

কখন ঘুমে কাত হয়ে গেছি জানি না। ফেলিক্সের মিউ মিউ শুনে ধড়মড় করে উঠেছি৷ ফেলিক্স কোল থেকে নেমে গিয়ে সামনের সিটে গিয়ে বসেছে। আর সামনের উইন্ডশিল্ডের দিকে তাকিয়ে তারস্বরে ডেকে যাচ্ছে৷ যেন করুণ অথচ অদ্ভুত এক টান ওর গলায়৷ এরকম ডাক আমি আগে শুনিনি৷ গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে বলেই বোধহয় অবলা প্রাণীটার স্বাভাবিক ডাক আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে৷

আমি চোখ ডলতে ডলতে সামনে তাকালাম। তন্ময় গাড়ি থামিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে৷ যেন খানিকটা ভয় পেয়েছে৷

জিজ্ঞেস করলাম, “কীরে! কদ্দূর এলাম৷ সমুদ্র কি দেখা যাচ্ছে?”

জবাবে ও বললো, “সমুদ্র দেখতে ঢের সময় বাকি৷ আগে চিন্তা করে দেখ পৌঁছুতে পারবি কি না!”

মাঝরাতে রসিকতা ভালো লাগছিলো না৷ খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, “কেন? গাড়ি রেখে উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করবি নাকি?”

“আরে নাহ! রাস্তায় বোধহয় বিপদ অপেক্ষা করছে রে৷ সাথে তো নিরাপত্তার জন্য কিছু আনলামও না৷”

“কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি৷

“খুব সম্ভবত ডাকাত৷ সামনে রাস্তার ওপর গাছ কেটে ফেলেছে৷ গাড়ি ঐ গাছ ডিঙিয়ে যেতে পারবে না৷ এই সুযোগে ওরা আক্রমণ করবে৷ তুই না বললি এই রাস্তা নিরাপদ?” চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করলো তন্ময়।

 

“হ্যাঁ বলেছিলাম। কোনদিন এই রাস্তায় এরকম ঘটনা ঘটেনি। কক্সবাজারের মানুষ খুব ভালো৷ এদের মন সমুদ্রের মতই উদার৷ এত কাছাকাছি এসে এরকম ঝামেলা হওয়ার মানে হলো কোন নেশাখোর বা পাতি গুন্ডা পথ আটকেছে৷ কিছু টাকা পেলেই ছেড়ে দেবে৷” বললাম আমি৷

তন্ময়ের মুখটা কেমন যেন হয়ে গেলো৷ ওর সঙ্গে শখের ক্যামেরাটা আছে৷ টাকা গেলে যাক৷ ওদিকে ওদের নজর না গেলেই হলো৷

আমি একটু অভয় দিয়ে বললাম, “একটু এগিয়ে দেখ না কী হয়৷”

ফেলিক্সের চেঁচামেচি থেমেছে৷ কিন্তু নতুন একটা শব্দের উদ্ভব হয়েছে তার বদলে। ফেলিক্স গরগর করছে৷ খুব আরামে থাকলে অথবা শত্রু দেখলে অমন করে ও৷ বেড়ালদের খুব স্বাভাবিক স্বভাব৷

গাড়ির ইঞ্জিন চালু হলো আবার। একটু এগিয়ে যেতেই মনে হলো সামনে যে গাছের মতন বস্তুটা পড়ে আছে তাতে মাছের চোখের মণির গর্তের মতন অগভীর গর্ত করা!

যেন অজস্র চোখ অপলক দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে৷ এটা কী গাছ কে জানে৷ গাছটা বাঁকা হয়ে পড়ে আছে। অনেকটা নমনীয় সরীসৃপের মতন!

আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয়৷ গাছটার আকার খুব ছোট নয়৷ মোটামুটি বড়ই৷ এই গাছ কেটে ফেলতে হলে লোকবল দরকার। তার মানে কি...? সামনে কঠিন বিপদ আসন্ন!

আরেকটু এগিয়ে গেলাম৷ কিন্তু এবার মনে হলো গাছটা আমাদের থেকে পালাচ্ছে৷ যত সামনে এগোনো হচ্ছে গাছটা ততই যেন আরো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে!

লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে গিয়ে ক্লান্তিতে কি আমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে? সম্ভাবনা আছে৷ কিন্তু দুজনের একসাথে দৃষ্টিভ্রম হওয়াটা কি যৌক্তিক?

অবশ্য দুজনেই প্রায় সমান ক্লান্ত৷ তাছাড়া মাঝখানে রাস্তা ভুল করায় ঘন্টাদুয়েক নষ্ট হয়েছে৷ নইলে আগেই পৌঁছে যেতাম৷

আচ্ছা অবলা বেড়ালটা কি দেখে অমন চেঁচালো? ওর চোখে কিছু পড়েছে কি না? কুকুর বেড়াল নাকি এমন অনেককিছুই দেখে যা মানবচোখে ধরা পড়ে না৷

এসব ভাবতে ভাবতেই তন্ময়ের ডাক কানে এলো৷

জিনিসটা পাশে সরে যাচ্ছে ৷ দেখতে পাচ্ছিস জিতু?

হুম। আমারো চোখে পড়লো৷ সামনে মনোযোগ দিতেই দেখলাম ঐ গাছের মতন বস্তুটা রাস্তা ছেড়ে পাশের জলাশয়ের দিকে নেমে যাচ্ছে৷ জলের ছপাত ছপাত শব্দও বুঝি কানে এলো৷ সবটাই কল্পনা!

তবুও আমি তন্ময়কে স্পিড বাড়াতে বললাম৷ হাইওয়েতে ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটে মাঝেমধ্যে। এটা হয়তো সেরকম কিছুই৷

সিলেটের কোন রাস্তায় যেন আধামানব আধা ছাগলের এক অবয়ব রাস্তা পারাপার করে। কম গতির কোন গাড়ি দেখলেই ধীরে ধীরে রাস্তা পার করে সে৷ ওকে দেখতে গিয়ে থামলেই বিপদে পড়তে হয় যাত্রীদের৷

স্যাটানিক এই ব্যাপারগুলো মানতে ইচ্ছা হয় না কিন্তু আজকের ঘটনাটায় কেমন সব গুলিয়ে যাচ্ছে৷ এগুলো বলতে গেলেই সেই বিজ্ঞান, অশিক্ষা কুসংস্কারের বেড়াজালে জড়িয়ে যাবো৷ ঘটনাটা নিজের মাঝে রাখাই শ্রেয়৷

বাকিপথ প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে পাড়ি দিলাম৷ আর কোন ঝামেলা হলো না৷ শুধু মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিলো প্রকাণ্ড কিছু একটা আমাদের গাড়িকে অনুসরণ করছে৷ আমরা পেছনে তাকালেই রাস্তা ছেড়ে পাশের ক্ষেত বা জলাশয়ে নেমে যাচ্ছে৷

 

আমরা যখন পৌঁছালাম তখন সাড়ে তিনটা বাজে৷ ইংরেজিতে এই সময়টাকে বলে ডেভিলস আওয়ার৷ যত বন্দী ভূত, পেত্নী, দত্যি দানোকে নাকি এই সময় ছেড়ে দেওয়া হয় দুনিয়া দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য৷

অনলাইনে একটা ফাইভ স্টার হোটেল বুক করা ছিলো৷ হোটেল সি কুইন৷ বেশ উন্নতমানের হোটেল৷

নাম কা ওয়াস্তে ফাইভ স্টার না৷

রিসিপশনের ফর্মালিটি সেরে রুমে ঢুকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না৷ ভেবেছিলাম উঠে দেখবো দুপুর হয়ে গেছে।

কিন্তু মাত্র দশটা বাজে৷ যাক সমুদ্রে নামা যাবে আজ৷

সমুদ্রের তীরের আবহাওয়ার মধ্যেই একটা সতেজতা আছে৷ ক্লান্তি ভুলে যাওয়া যায়৷

আমাদের কাজ বিকালে। বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভ রোডের পাশেই সি বীচে কোম্পানীর রিসোর্ট হচ্ছে৷ সেখানে মিটিং আছে।

তন্ময়কে ডাক দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ফেলিক্স এখনো ঘুমে৷

ইন্টারকমে কল দিয়ে দুটো কফি অর্ডার করলাম। কফি শেষ করে ব্যাগ থেকে ক্যাটফুড আর ফেলিক্সের প্রিয় পুতুলটা বিছানায় রেখে দিলাম৷ গলার লিশটা বিছানার

আলনার সাথে আটকে দুজনে বের হয়ে পড়লাম৷

রিসিপশনে বলে রাখলাম যেন ওর খেয়াল রাখে৷ তবুও টেনশন হচ্ছিলো৷ অবশ্য ফেলিক্স শান্ত বেড়াল৷ ও একা থাকলে পুতুলটা নিয়ে খেলবে৷ খুব বেশি হলে হয়তো ঘরটা একটু নোংরা করবে৷ সেটা ব্যাপার না৷

ওকে পেয়েছিলাম একমাস আগে৷ অফিসে যাবার পথে৷ মা বেড়াল ওকে রেখে চলে গেছে৷ কালো বেড়াল নিয়ে অনেকের কুসংস্কারের ফসল হিসেবে ওকে কেউ নিয়েও যায়নি৷ আমার বেড়াল পোষার অভ্যাসটা সেই ভার্সিটি থেকেই৷ অবশ্য আমার প্রিয় বেড়াল ‘মিনি’ মারা যাবার পর থেকে আর পোষা হয়নি৷

অনেকদিন পর বেড়াল দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না৷ ফ্ল্যাটে নিয়ে এলাম।

মজার ব্যাপার হলো সেই রাতে আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলাম৷ স্বপ্নটা এখনো মনে আছে৷

গমগমে কণ্ঠে কেউ আমায় বলছে, “ত্রাতা একদিন আপনার মঙ্গল করবেন৷”

কালো বেড়াল নিয়ে সারাদিন অনেক কথা শুনেছি৷ নেটে ঘাটাঘাটি করেছি অনেক৷ এসবের ফলাফল আমার সেরাতের স্বপ্ন।

 

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সী বীচ এই কক্সবাজার৷ আমরা নামলাম সুগন্ধা পয়েন্টে৷ তিনটে পয়েন্টের মধ্যে মাঝারি এটা৷

বেশ গোছানো৷ ছোট একটা ঝাউবন আছে৷ মাঝেমধ্যে নাটক সিনেমার শুটিং হয় এখানে৷ কারণ এই পয়েন্টে ভিড় অনেক কম হয় ।

 

সমুদ্রে নেমে শরীরের ক্লান্তি যেন মিশে গেলো জলে৷ দুই বন্ধু বাচ্চাদের মতন অনেকক্ষণ জলে দৌড়াদৌড়ি করলাম৷ টিউব ভাড়া করে ভাসলাম কিছুক্ষণ৷ জেট স্কিতে চড়লাম৷

প্যারাগ্লাইডিংয়ের শখটাও পূরণ হলো এবার৷

এমন করে কখন জোয়ার শেষ হয়ে ভাটার সময় হয়েছে টের পাইনি৷ তীরে দাঁড়িয়ে থাকা লাইফগার্ড হুইসেল বাজাচ্ছে জল থেকে উঠে পড়ার জন্য৷

আমরা উঠতে যাবো এমন সময় তন্ময় আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো৷ ওর চোখেমুখে কীসের যেন আতঙ্ক।

অন্য হাতটা সমুদ্রের দিকে উঁচিয়ে ধরলো৷

আমি তাকাতেই কেমন যেন ধোঁকায় পড়ে গেলাম৷ গত রাতে রাস্তায় যেরকম অসংখ্য চোখওয়ালা আঁকাবাঁকা গাছের মতন বস্তুটা দেখেছি সেটা একটু দূরে জলের মধ্যেও দেখতে পাচ্ছি!

এ ঠিক যেন গাছ না৷ যেন অক্টোপাসের মতন কিলবিলে শুঁড় ওগুলো৷ যতই দেখছি ততই বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে৷

পুকুরের পানা যেমন পুকুরের জলকে একসময় সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে ঐ বস্তুগুলোও সাগরের জলকে ঢেকে ফেলছে৷ পানার সাথে এদের পার্থক্য হলো রঙে৷ এদের রঙ কড়া বেগুনি৷ এই রৌদ্রস্নাত দিনে এমন অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে আর বীচের কেউ দেখছে না কেন?

লাইফগার্ড কাছে এগিয়ে এলো।

“এই যে স্যার, হুইসেল শুনতে পাননি নাকি? তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন৷ আজ আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাবে৷ বিপদ সংকেত দেখানোর সম্ভাবনাও আছে।” বলে সমুদ্রের দিকে একবার তাকালো৷

 

আমি একবার ওর চোখের দৃষ্টি পরখ করে নিলাম৷ নির্লিপ্ততা মাখা৷ যেন কিছুই চোখে পড়েনি৷

ওদিকে দিগন্ত থেকে যেন কালো মেঘ ধেয়ে আসছে৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই বৃষ্টির দেখা পাবো৷

অন্য দিন হলে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করাটা স্বস্তির হতো৷ কিন্তু আজ মন টানছে না৷ সামনের দৃশ্যটা যদি আমাদের দৃষ্টিভ্রমের একটা অংশও হয়ে থাকে তবুও আমার এখানে থাকতে ইচ্ছা করছে না৷ হুট করেই ফেলিক্সের জন্য মনটা কেমন করে উঠছে৷

 

তন্ময় বললো, “ওটা কি আমাদের কাল রাত থেকেই ফলো করছে নাকি?” ওর চোখেমুখে কেমন যেন বিষাদের ছায়া৷

আমি তন্ময়কে অনেক আগে থেকেই চিনি৷ ও ভয় পাচ্ছে না৷ কিন্তু দুঃখবোধটা চোখে পড়ছে৷ কোথায় একটা খাপছাড়া ভাব৷

আর কিছুক্ষণ বীচে থাকলে বীচ আমাদের যেন গিলতে আসবে৷ তাই আর দেরি করলাম না৷

বীচের বালির অংশটা পার হয়ে আবার ফিরে তাকালাম৷ কোনকিছুই পরিবর্তিত হয়নি৷

সাগরজলের উপরিভাগ গাঢ় বেগুনি হয়ে উঠেছে। যেন বিচিত্র রঙের শৈবালের আস্তরণ৷ মাঝেমধ্যে ঢেউয়ের তালে দুলে উঠছে সেগুলো৷

আবার মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে ঢেউ স্থির হয়ে গেছে। কিলবিলে শুঁড়ের মতন বস্তুগুলোই নড়ছে জীবন্ত প্রাণীর মতন!

 

হোটেলে ফিরে ভেবেছিলাম একটু ঘুমিয়ে নেবো৷ দিনটা মেঘলা হয়ে আসছে৷ কিন্তু এসেই দুঃসংবাদ শুনতে হলো।

ফেলিক্স রুম থেকে পালিয়েছে!

এসি রুম৷ জানালা বন্ধই থাকে৷ বের হবার অন্য কোন পথ নেই৷ রুম ক্লিন করার জন্য লোক ঢুকে কোন বেড়াল দেখতে পায়নি৷ গলার লিশটা খাটের পাশের আলনার সাথে লাগানো আছে৷ খাটের ওপর ক্যাটফুড আর ওর খেলনাটা একইভাবে পড়ে আছে৷

ক্লিনার খাটের ওপর লোম দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো৷ ও ভেবেছে কী না কী জন্তু খাটের ওপর বসেছিলো। পরে রিসিপশনে জানানোর পর ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়৷

সারা হোটেল তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওকে আর পাওয়া যায়নি৷

এমনিতেই সাগরের ঘটনাটায় মাথা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, ওদিকে আবার ফেলিক্সের অন্তর্ধান মনটাকে বিষিয়ে তুললো৷ পোষা প্রাণীগুলো একসময় আত্মার আত্মীয় হয়ে যায়৷ মানুষের চাইতে ওদের প্রতি ভালোবাসাটা তখন বেশি আসে৷ কারণ ওরা মানুষের মতন স্বার্থপর হয় না৷ ভালোবাসার প্রতিদানে ওদের কাছে দ্বিগুণ ভালোবাসা পাওয়া যায়৷

ওদিকে সময় ঘনিয়ে আসছে৷ বিকেলে কোম্পানির রিসোর্টে মিটিং৷ ভেবেছিলাম মিটিং এর নাম করে তন্ময়ের সাথে একটা ঝটিকা সফর হয়ে যাবে কিন্তু এটা যে এমন বিষাদের সফরে রূপ নেবে কে জানতো৷

 

তন্ময় আমার কাঁধে হাত রেখে অনেক বোঝালো৷ হোটেল ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে ওরা ক্ষমা চেয়েছে৷ এমনকি একটা নতুন পারসিয়ান বেড়াল গিফট পর্যন্ত করতে চেয়েছে৷ কিন্তু তাতে আমার মন সায় দেয়নি৷ ফেলিক্সকে হারানোর কষ্টটা থেকে যাবে৷ ওর জায়গা কেউ কোনদিন নিতে পারবে না৷

 

পড়ন্ত বিকালে গাড়ি নিয়ে বের হলাম । মেরিন রোড ধরে হিমছড়ি পার হয়ে যেতে হবে৷ রাস্তার বামপাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড় আর ডানে সমুদ্রের অসীম জলরাশি। সৌন্দর্যের এক অসম্ভব সুন্দর মেলবন্ধন।

মন ভালো থাকলে হিমছড়ির পাহাড়ে একবার চড়তাম ৷ উঁচু পাহাড় থেকে সাগর দেখার মতন মোহনীয় দৃশ্য আর দুটো হয় না। কিন্তু ফেলিক্সকে হারিয়ে সেটাও আজ ঠুনকো মনে হচ্ছে৷

বেড়ালরা নাকি তাদের মনিবের শরীরের গন্ধ পায় অনেকদূর থেকেই৷ আমি এখনো আশা করছি রাতে ফেরার পর হয়তো দেখবো ফেলিক্স ফিরেছে৷

তন্ময় গাড়ি চালাচ্ছিলো। কিন্তু দেখলাম ও মাঝেমধ্যেই স্টিয়ারিং বামে ঘুরিয়ে হালকা ব্রেক কষে পাহাড়ের দিকে কী যেন দেখার চেষ্টা করছে৷ প্রথমে মনে হলো গাড়ির ইঞ্জিনে কোথাও সমস্যা করছে তাই বামে কোথাও থামাবে৷ কিন্তু না৷

ও উঁকি দিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করছে৷ আমি ওকে কী দেখছে জিজ্ঞেস করতে যাবো এমন সময় আমার চোখে পড়লো জিনিসটা৷

শরীরে অজান্তেই একটা হালকা কাঁপুনি অনুভব করলাম। রাস্তার সমান্তরালে পাহাড়ের দিকটায় একটা বিশালাকার বস্তু আমাদের পাশাপাশি ভেসে চলেছে৷ পাহাড়ের মেটে সবুজ রঙ ধারণ করেছে সে। দেখতে ভয়ালদর্শন সাপের মতন! আকারে বিরাট৷ পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলছে তাই বোঝা যাচ্ছে না৷

চলনে কিন্তু ভুজঙ্গ ভাবটা থেকে গেছে৷ সরীসৃপ সদৃশ এঁকেবেঁকে চলাটা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে কারণ ওটা ভূমিতে চলছে না৷ মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উপরে শূন্যে ভাসতে ভাসতে সামনের দিকে এগোচ্ছে৷ চলার ছন্দ আমাদের গাড়ির গতির সমানুপাতিক। তন্ময় যতবার গাড়ি থামিয়েছে ততবার ওটার গতিও মন্থর হয়ে এসেছে৷

শুধু মাঝেমধ্যে গাছগাছালির আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বস্তুটা৷ অবশ্য বস্তু না বলে প্রাণী বললেই বা দোষ কোথায়!

প্রাণীটার দেহের সবুজ আবরণের কারণেই পাহাড়ে ছদ্মবেশে ঘোরাটা হয়তো আমরা ছাড়া আর কারোর চোখে পড়েনি।

অশুভ এই সত্ত্বা কি শুধুই আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে কিনা সেটাই বা কে জানে৷

কিন্তু এই প্রাণী আমাদের অনুসরণ করছে কেন?

গতরাতের ঘটনা বা আজ দুপুরের ঘটনার সাথে এর কোন সম্পর্ক আছে কি?

তন্ময়কে দেখলাম খানিকটা ঘাবড়ে গেছে৷ বিশেষ করে প্রাণীটা যখন রাস্তার খুব কাছে চলে আসছে তখন সত্যিই একটা ভয়ের শিহরণ খেলে যাচ্ছে মনে৷ গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে কমিয়েও তো লাভ নেই। তাই আমি ওকে বললাম বামে না তাকিয়ে গাড়ি চালাতে৷

 

রিসোর্টে পৌঁছে বেশ ক্লান্ত লাগছিলো৷ অথচ এই মেরিন ড্রাইভ রোডে সারাদিন গাড়ি নিয়ে চক্কর দিলেও আগে ক্লান্তি স্পর্শ করতো না৷ মেজাজ থাকতো সামুদ্রিক বাতাসের মতই ফুরফুরে। মনের বোঝাটা রাস্তায় আসতে আসতেই ভারী হয়েছে৷ সেটাই যে অযাচিত ক্লান্তির কারণ তা সহজেই বুঝতে পারছি।

রিসোর্টের মিটিং সেরে এক্সিকিউটিভদের হোটেলে সাথে করে আনতে হলো৷ আমাদের হোটেলেই থাকার ব্যাবস্থা করলাম। ভোরে ঢাকায় ফিরবে ওরা।

হোটেলে ফেরার সময় রাস্তায় আর তেমন কিছু চোখে পড়লো না। তন্ময় অবশ্য একবার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু বোঝাতে চেয়েছিলো কিন্তু সাথে অপরিচিত লোক থাকায় ওকে ইশারায় থামতে বলেছিলাম।

আমাদের সাথে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটা সবাই সমানভাবে নেবে না। নেশাখোর বা পাগল ভাবতেও ওদের বাঁধবে না৷

তাই আপাতত এটা নিজেদের মধ্যে রাখাই ভালো।

একেবারে ডিনার সেরে রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে কফি অর্ডার করলাম। শরীর ক্লান্ত কিন্তু মন ছুটোছুটি করছে। ঘুম এমনিতেও হবে না। কফি আসার পর তাতে একটা চুমুক দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম। কানে হেডফোন গুঁজে রাগ ভৈরবী ছেড়ে দিলাম। সুরলহরীতে মনের উৎকণ্ঠা যদি কিছুটা হলেও কমে।

তন্ময় শুয়ে পড়েছে৷ ঘুমাক বেচারা৷ গাড়িতে ও কী বলতে চেয়েছিলো সেটা শুনতে ইচ্ছা করছে কিন্তু ওকে বিরক্ত করতে চাইছি না।

রাত যখন প্রায় আড়াইটা তখন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো ঘরে৷ ল্যাপটপের চার্জ শেষ৷ ওটা চার্জে দিলাম।

মনে পড়লো ব্যালকনিতে গেলে এখন সমুদ্র দেখা যাবে৷ ঢেউয়ের গর্জন শুনতে পাবো৷ আরেক কাপ কফি হলে ভালো হতো কিন্তু সকালের আগপর্যন্ত কেটারিং সার্ভিস বন্ধ৷

ব্যালকনিতে গিয়ে গ্লাসের স্লাইডার টেনে দিলাম। এসির বাতাসে ঘুমাক তন্ময়৷

আজ ফেলিক্স সাথে থাকলে ওকে কোলে নিয়েই দাড়াতাম এখানে৷ ভাবনাটা মাথায় আসাতে মনটা নিমিষেই বিষণ্ণ হয়ে উঠলো৷ সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। জোয়ারের ফেনিল ঢেউ দেখা যাচ্ছে৷

মাঝরাতের সমুদ্র যেন ডাকছে আমায়৷ হঠাৎ দেখে মনে হচ্ছে এই বিশাল সমুদ্র কতটা নিঃসঙ্গ৷

ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলাম। এমন সময় মনে হলো একবার যাবো নাকি সী বীচে? ঘুম তো আর আসবে না৷ বীচ ধরে একটু হেঁটে আসলে যদি মনটা একটু ভালো হয়। যেই ভাবা সেই কাজ৷ রুম লক করে নেমে এলাম নিচে৷ রিসিপশনে বাতি জ্বলছে কিন্তু কেউ নেই সেখানে৷ নিচের গেট খোলা। গার্ডদের কাউকেও দেখলাম না। কাল রাতে হোটেলে ঢোকার সময় হোটেল চত্বরে বেশ লোক সমাগম ছিলো। আজ একটা মানুষও নেই।

 

সকালে লাইফগার্ড বলেছিলো আবহাওয়া অনেক বেশি খারাপ হবে৷ হয়তো সে কারণেই লোক নেই বাইরে৷ হাঁটতে হাঁটতে বীচের রাস্তায় এলাম । বীচে যেতে পাঁচ মিনিট লাগলো৷ স্বভাবতই এখানে লোক থাকার কথা না, থাকলেও কম ; তবুও কেন জানি আশা করছিলাম কেউ থাকুক৷

 

মানুষের চলাচল নেই তাই কি না জানি না, এক সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কিচ্ছু কানে আসছে না৷ চারপাশ এতটা নীরব যেন দম বন্ধ হয়ে আসবে৷ এখন মনে হচ্ছে তন্ময়কে সাথে আনলে বোধহয় ভালো হতো৷ ভীষণ একা লাগতে শুরু করেছে আচমকা। বীচের দোকানপাট আগে অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকতো৷ আজ সেগুলোও বন্ধ। যেন শহরজুড়ে কারফিউ লেগেছে৷

পুরনো দিনের একটা বদভ্যাস মনে পড়ে গেলো৷ একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হতো৷ একা একা ভাবটা একটু হলেও কমতো৷

এসব অগোছালো চিন্তার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছিলাম হঠাৎ একটা পরিচিত শব্দে চিন্তায় ছেদ পড়লো৷ শব্দটা কী সেটা বুঝে মনটা আনন্দে ভরে উঠলো৷

কোথাও থেকে কিছুক্ষণ পরপর মিউ মিউ শব্দটা ভেসে আসছে! এটা ফেলিক্সের গলা৷ রাতের নিকষ অন্ধকার চিড়ে ওর মিউ মিউ শব্দটা ঘুরপাক খাচ্ছে।

আমি হন্নে হয়ে শব্দটার উৎস খুঁজতে লাগলাম। মনে হচ্ছে বীচের যে অংশটায় জোয়ারের জল এসে বালি ছুঁয়ে যাচ্ছে সেখান থেকে আসছে শব্দটা৷ কিন্তু এই সুদীর্ঘ পথে আমি কোথায় খুঁজবো ওকে!

একটা আশার বিষয় হচ্ছে জায়গাটা খোলামেলা৷ কিন্তু ওর গায়ের রংটা কালো হওয়ায় বেশ অসুবিধা হচ্ছে৷ শব্দ শুনে এই মনে হচ্ছে কাছে আবার এই মনে হচ্ছে দূরে৷ ওদিকে আমার মোবাইলটা রুমে ফেলে এসেছি৷ ফ্ল্যাশ জ্বাললে ফেলিক্সের জ্বলজ্বলে চোখদুটো দূর থেকেও চোখে পড়তো কিন্তু এখন সে উপায় নেই৷

হোটেল থেকে যে তন্ময়কে ডেকে আনাবো তার সুযোগও নেই। ভয় হচ্ছে যদি ওকে ডাকতে গেলে ফেলিক্স হারিয়ে যায়।

একা একা দিশেহারা লাগছে৷ কখন বেড়ালটাকে কোলে নেবো সেটা ভেবে মনটা ছটফট করছে।

ফেলিক্সের শব্দটা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে৷ ধীরে ধীরে শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলতে লাগলো। মনে হলো একটা না৷ অন্তত হাজারটা বেড়াল একসাথে ডেকে উঠছে৷

গমগমে সে শব্দের কম্পাংক

কিছুক্ষণের মধ্যে এমন বেশি হয়ে দাঁড়ালো যে আমার মাথা টনটন করে ব্যাথা করতে আরম্ভ করলো।

হাজার হাজার বেড়াল মাথায় চড়ে নাচছে যেন।

ধীরে ধীরে অসহ্য হয়ে উঠছে সব৷

আমি উদ্ভ্রান্তের মতন ছুটোছুটি করতে লাগলাম৷ কখন যে নিজের পা দুটোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি জানি না৷ শুধু এতটুকু মনে আছে যে আমি সমুদ্রের দিকে হেঁটে চলেছি আর দিগন্তরেখা থেকে চোখ ধাঁধানো একটা আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে৷ সেই আলো আর শব্দের তীব্রতায় জ্ঞান হারালাম৷

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি আধভেজা হয়ে পড়ে আছি বালিতে৷ চোখ খুলতে গিয়েও আলোর তীব্রতায় বন্ধ হয়ে আসছে৷

শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে উঠে বসলাম৷ চারদিকের আলোর পরিমাণ বেড়ে গেছে। আলোর উৎস সমুদ্রে৷ ঠিকমতো তাকানোই যাচ্ছে না৷ অনেকটা সময় গেলো ধাতস্থ হতে৷ সাগরের ফেনিল জলের ওপর যেন থিয়েটারের পর্দা বসানো হয়েছে!

চারদিক থেকে সেই পর্দায় যেন ফেলা হয়েছে উজ্জ্বল ফ্লাডলাইটের আলো! সেই আলোয় এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি চারপাশ ৷

মিউ মিউ শব্দটা আবার শুরু হয়েছে৷

কিন্তু এবার সেই সুরটার মধ্যে একটা নমনীয়তা আছে৷ কানে লাগছে না৷ এই সুরটার মধ্যে কোন একটা সংকেত আছে যেন৷

সেই সংকেত আমি ধীরে ধীরে টের পেতে লাগলাম৷ অগোছালো বেড়ালের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে একটা উপাখ্যানে পরিণত হচ্ছে৷ মনে পড়ছে ফেলিক্সকে যেদিন কুড়িয়ে পেয়েছিলাম সেদিনের কথা৷ সেই রাতে স্বপ্নে কাউকে বলতে শুনেছিলাম, “ত্রাতা একদিন আপনার মঙ্গল করবেন৷”

 

সাগরের ঢেউ উত্তাল হয়ে উঠছে!

আলোকিত সমুদ্রে আবির্ভূত হচ্ছে সেরাতের রাস্তা আটকানো গাছের মত বস্তুটা। ক্রমান্বয়ে দেখলাম আজ সাগরে দেখা বেগুনি শুঁড়ের মত দেখতে জিনিসটা।

সকালে যেটা দেখেছিলাম৷ তারপর বিকেলে দেখা সবুজ সাপের মতন প্রাণীটা। এসবকিছুই একটা বিশালাকার শরীরের অংশ৷ সব অঙ্গগুলো অক্টোপাসের শুঁড়ের মতন কিলবিল করছে! ছটফট করছে সদ্য কাটা কর্ষিকার মত!

সবকিছুর সম্মিলিত রূপ আকার দিয়েছে একটা ভয়াবহ কুৎসিত প্রাণীর৷ দিগন্তরেখা জুড়ে তার বিস্তার। বিশাল সমুদ্রটা যেন তার অস্তিত্বের কাছে তুচ্ছ এক জলাভূমি!

প্রাণীটার মাথার অংশটা দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম!

আমার নিরীহ বেড়াল ফেলিক্সের মুখটা যেন বেলুনের মতন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে জুড়ে দেয়া হয়েছে সেখানে।

আমার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার ধরণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷

ফেলিক্স! এতকিছুর মূলে ফেলিক্স ছিলো। শান্ত, নিষ্পাপ বাচ্চা বেড়ালটা!

আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি৷ কিন্তু এই মৌনতার মাঝেই যোগসূত্র স্থাপিত হচ্ছে দানব ফেলিক্সের সাথে।

আমার মনে জমা হওয়া হাজারটা প্রশ্নের জাল ছিন্ন করে ফেলছে ও৷

যার ভাব সম্প্রসারণ করলে দাঁড়ায় এরকম।

দখলের নেশাটা অশুভ শক্তিদের একটা লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য!

গ্যালাক্সীর পর গ্যালক্সী জুড়ে তাদের বিস্তার। কত নাম না জানা গ্রহ ধবংস হয়ে গেছে তাদের দখলদারিত্বে।

জনবসতিপূর্ণ গ্রহগুলো তাদের নির্মমতায় পরিণত হয়েছে ধবংসস্তূপে! সব গ্রহের পর এবার পালা এসেছে পৃথিবীর! তিনভাগ জলে তাদের অধিকার স্থাপিত হয়ে গেছে। যে প্রবল শক্তির আধার তাদের কাছে আছে তাতে নিমিষে স্থলভাগের ভূখণ্ড উপড়ে নিতে পারবে সে বা তারা৷

একটা কথা শুনে প্রায় পাথর হয়ে গেলাম! ধ্বংসযজ্ঞ নাকি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে৷ আমি এইজন্য হোটেল থেকে বের হয়ে কাউকে দেখিনি৷ চোখের সামনে সাগরে মরা মাছের মতন ভেসে উঠছে শত শত লাশ!

আমি ফেলিক্সকে বাঁচিয়েছিলাম৷ তাই সে আমায় প্রাণভিক্ষা দিতে চাইলো। জনবিরল এই পৃথিবীর একমাত্র বাসিন্দা হয়ে যাবো আমি৷ আমার আত্মীয়স্বজন আর প্রিয় মুখগুলো পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে৷

আর আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে কাপুরুষের মতন একা বাঁচতে!

কিন্তু আমি আমার মনোভাব বুঝিয়ে দিতেই কেমন যেন নড়েচড়ে বসলো প্রাণীটা৷ আমি মরে যাই এটা ওরা চাইছে না৷ ওরা ওদের ত্রাতার রক্ষককে মারবে না৷ কিন্তু এর বাইরেও কোন একটা সত্য লুকিয়ে আছে যা আমাকে জানাতে চাইছে না ও৷

কিন্তু আমি মনস্থির করে ফেলেছি৷ ওদের বিকট সত্তায় কোথাও একটা মনোযোগের ঘাটতি ছিলো৷

 

সেই সুযোগে আমি প্রাণপণে ছুটে সমুদ্রে নেমে গেলাম। প্রচণ্ড রাগে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠলো প্রাণীটা!

প্রাণীটার মনের খবর পাচ্ছি আমি৷ আমি মরে গেলে মরতে হবে ওকেও৷ ধবংস হবে সে। আবার অশুভ সত্তার আগমণের জন্য যুগযুগ ধরে অপেক্ষা করতে হবে! পৃথিবী আবার পুনর্জন্ম লাভ করবে৷

এই চক্রটা বহুকাল থেকেই চলে আসছে৷ বিভিন্ন অপশক্তির প্রভাবে পৃথিবী ধবংস হয়েছে শতবার৷ কিন্তু কেউ না কেউ স্বেচ্ছামৃত্যুতে ফিরিয়ে এনেছে প্রিয় ধরণীকে৷

আমার শরীরে অসংখ্য বিষাক্ত তীর বিঁধে যাচ্ছে যেন৷ অথচ এই মুহূর্তে কেউ জীবিত থাকলে আমার মুখের হাসিটাই আগে দেখতো!

পাঠকেরা যা পড়ছেন