নেফিলিম - প্রলয় কুমার নাথ

অলংকরণ - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল
(১)

দুই পাশে জঙ্গলে ঘেরা সরু রাস্তাটা দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলছিল রুদ্রশেখর বাবুর দামী ইটিওস গাড়িটা। মাঝে মাঝেই এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে জমির ওপর দিয়ে চলার সময় অল্প বিস্তর ঝাঁকিয়ে উঠছিল পেছনের সিটে বসা মদ্যপ রুদ্র বাবুর ভারী শরীরটা, আর সেটাই ছিল তার যত বিরক্তির কারণ। ঠিক তখনই তিনি জড়িয়ে যাওয়া গলায় কাঁচা খিস্তি ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন ড্রাইভার সুরেশের নামে, যেন সব দোষ একমাত্র সুরেশেরই! আর গালিগালাজ করবেন নাই বা কেন, এত পয়সা খরচ করে বারে গিয়ে রঙিন তরল সেবন করার ফসল তার এই নেশা, এখন গাড়ির ঝাঁকুনিতে এত অল্প সময়ে তন্দ্রাচ্যুত হলে চলবে কেমন করে?

সুরেশের তার নেশাগ্রস্ত মালিকের এমন ব্যবহার গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। তার অবশ্য রুদ্র বাবুর দ্বারা উচ্চারিত প্রতিটা খিস্তির জন্য একই প্রত্যুত্তর, “বুরা মত মানিয়ে সাব, রাত বহুত হো গায়া হে, ইস লিয়ে পাক্কা সড়ক ছোড়কে আপকো ইস রাস্তা সে ঘর লে যা রাহা হু…”

অবশ্য সুরেশের কথা এক বর্ণও মিথ্যা নয়। এমনিতেই সময়টা শীতকাল। তার ওপর এটা কলকাতা নয়, পশ্চিম মেদিনীপুরের এই মফঃস্বল শহরে ঠান্ডার দাপট এমনিতেই বেশি। এখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। এই গতিতে চলতে পারলে, আর এক ঘন্টার মধ্যেই লোকালয়ে পৌঁছতে পারবে তারা।

রুদ্রশেখর বাবুদের মত মাঝ বয়সী বিপত্নীক ধনাঢ্য মানুষদের জীবনে চলার পথে একাকিত্ব দূরীকরণের একমাত্র সহায় হয়ে ওঠে মদ্যপান, আর এই কথাটা বুঝেই এই মফঃস্বল শহরগুলিতেও রমরমিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে ডান্স বারগুলো। তবে মদ্যপান লোকে নিজের বাড়িতেও করতে পারে, কিন্তু স্বল্প পোশাক পরা সুন্দরী নারীদের মৃদু মধুর আলিঙ্গনের স্বাদটা বোধহয় এই বারগুলিতেই ভালো পাওয়া যায়! তাই সপ্তাহের বেশির ভাগ দিনেই সন্ধ্যা হলে যেন তর সয় না রুদ্র বাবুর, সাজসজ্জা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেই তিনি সুরেশকে গাড়ি ছোটাতে বলেন বারের উদ্দেশে। সেখানে দুই হাতে পয়সা ওড়ান তিনি, অধিকাংশ দিনেই ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায় তার। সেখান থেকে পাকা রাস্তা দিয়ে যেতে গেলে আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়, এটাই হল ফিরতি পথে এই জঙ্গলে ঘেরা পাথুরে রাস্তাটা বেছে নেওয়ার কারণ।

এমন সময় হঠাৎ একটা বিকট শব্দ করে থেমে গেল গাড়িটা! নেশাগ্রস্ত রুদ্র বাবু আবারও সুরেশের উদ্দেশে খিস্তি প্রয়োগ করে, চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “কীরে, হঠাৎ গাড়ি থামালি কেন, হ্যাঁ?”

সুরেশ সেই কথার কোনো প্রত্যুত্তর দিল না, সে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে, গাড়ির ইঞ্জিনের ঢাকনা খুলে চিন্তিত মুখে কী যেন পরিদর্শন করতে লাগল। তারপর তার মালিকের উদ্দেশে বলে উঠল, “সাব, ইঞ্জিন জাদা গরম হো গায়া হে, থোড়া সা পানি লাগেগা…”

রুদ্র বাবু তার ভারী হয়ে আসা চোখের পাতাদুটিকে কোনো মতে খুলে একবার চেয়ে দেখলেন তার চারি পাশটা। গাড়ির সামনের সিটদুটির পেছনে রাখা জলের বোতলগুলি সম্পূর্ণ ফাঁকা। জলের কোনো চিহ্নমাত্র নেই গোটা গাড়িতে। যাহ, বাবা মস্ত বড় ঝামেলায় পড়া গেল তো! সুরেশ ব্যাপারটা আগেই বুঝেছিল, সে করুণ কণ্ঠে বলে উঠল, “আপ কুছ দের কে লিয়ে গাড়ি মে ওয়েট কিজিয়ে সাব। পাশ হি জঙ্গল কে কিনারে এক নদী হে, মে ওয়াহা সে পানি লেকে আতা হু…”

এই বলে গাড়ির পেছনের ডিকি থেকে জলের খালি পাত্রটা বার করে, সে জঙ্গলের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

দুই পাশের জঙ্গলের ভেতরে সারি সারি শাল সেগুন গাছগুলির মাথার ওপর গোল থালার মত চাঁদ উঠেছে মেঘমুক্ত নৈশ আকাশে। চাঁদের রূপালী আলো পড়ে যেন এক মায়াবী জগতের সৃষ্টি হয়েছে চারিদিকে। এই জনমানবশূন্য বনভূমিতে মাঝে মাঝে কোনো রাত জাগা পাখির কর্কশ ধ্বনি আর শেয়ালের চিৎকার ছাড়া আর কিছুই কানে আসে না। রুদ্র বাবুর এবার নেশা কেটে গিয়ে বেশ ভয় ভয় করতে লাগলো। এই শীতের রাত্রেও তার কপালে জমে উঠলো বিন্দু বিন্দু ঘাম। তিনি হাতল ঘুরিয়ে গাড়ির পাশের জানলাটা খুলে দিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। বুঝতেও পারলেন না, যে একটা সুদীর্ঘ লম্বা হাত মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকে, একটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল গাড়ির দরজাটা!

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দ্রুত পায়ে নদীর উদ্দেশে চলতে চলতে, হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে গেল সুরেশ। সে যেন এই নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে ভেতর থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠের চিৎকার স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে! আরো একবার, আরো তীব্র গতিতে যেন শব্দটা ধাক্কা মারল তার কানের পর্দায়! সেই মুহূর্তে পেছন পানে ঘুরে রাস্তার দিকে ছুটতে শুরু করল সুরেশ, এই চিৎকার দুটি যে তার মালিকের গলার, তা একটুও বুঝতে ভুল হয়নি তার! নিজের শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে দ্রুততম গতিতে ছুটে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গাড়ির কাছে এসে, একটি ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে থরথর করে কেঁপে উঠল সে….চাঁদের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একটি বিশাল দৈত্যাকৃতি চেহারার নগ্ন পুরুষের দেহ, যেন সাধারণ মানুষের দুগুণ উচ্চতা তার শরীরের! তার পেশীবহুল ডান হাত দিয়ে সে রুদ্রশেখরের গলা ধরে তাকে তুলে ধরেছে সম্পূর্ণ শূন্যে! ভেসে আসছে একটি মৃদু গর্জনের আওয়াজ, আর তার সাথেই মৃত্যুর আগে একবার শেষ চিৎকার করে ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে গেল অসহায় রুদ্রশেখরের দামী ধুতি পাঞ্জাবীতে আবৃত স্থূল শরীরটা!

(২)

ট্রেন থেকে ‘চন্দ্রকোনা রোড’ স্টেশনে নামতেই, বুকের ভেতরটা আরো একবার হুহু করে উঠল সন্দীপের। সন্দীপ বর্মন, বছর তিরিশের সুদর্শন যুবক। কলকাতার অন্যান্য সাধারণ মেধার যুবকদের মতই ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা একটি অখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ। তারপর নেহাৎই স্মার্টনেস আর কথাবার্তায় অগাধ ইংরাজি শব্দ প্রয়োগের খাতিরে সল্ট লেকের একটি আই. টি কোম্পানিতে চাকরি।

ওই এক চেহারাটা বাদ দিয়ে, জীবনে সব কিছুই খুব গড়পরতা সন্দীপের। তার বাবা কাজ করতেন একটি প্রাইভেট ফার্মে, এখন রিটায়ার করেছেন। পেনশন পান নামমাত্র। এখন তাদের সংসার চলে মূলতঃ তাদের একমাত্র ছেলে সন্দীপের আয়ে। শহরের অন্যান্য সুদর্শন ছেলেদের মত, তারও আছে অসংখ্য নারী হৃদয়ে বিচরণ করার নেশা। শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার পরও মুড়ি মুড়কির মত প্রেমিকা বদলানোটা তার কাছে রোজকার কথা। জীবনটাকে দিনের বেলায় অফিসের বসের রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হয়ে, আর রাতে মদ আর নারীদেহের সাথে একাত্ব হয়েই কাটিয়ে দেবে ভেবেছিল সে, যতদিন না এই গড়পরতার মাঝে একদিন হঠাৎ প্রবেশ করল এক সাময়িক চমকের অনুভূতি!

পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা গ্রামের ধনী ব্যবসায়ী রুদ্রশেখর মিত্রের একমাত্র মেয়ে দেবারতীর সাথে তার বিবাহের সম্বন্ধটা একদিন তার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে আসে! দুই পক্ষেরই একে অপরের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করার পর কথা পাকা হয়। বিয়ের দিন অবধি স্থির হয়ে যায়। সন্দীপ যেন হাতে চাঁদ পায়, শ্বশুরের এত ধন সম্পত্তির মালিক হলে সারা জীবন বসে খেতে পারবে সে! শুধু দোষের মধ্যে হল মেয়ের গায়ের রং একটু কালো, তবে তাতে কী বা আর আসে যায়! সে তো শুধু তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে তার বাপের পয়সায় জন্য, সেই বা কৌনসা ওই কালো মেয়ের কপালে সিঁদুর পরিয়ে অন্যান্য সুন্দরীদের সান্নিধ্যে আসার থেকে অধিকারচ্যুত হচ্ছে? বিয়েটা তো আগে হোক, তারপর সে আবার পুরোদমে চালাবে তার কৃষ্ণলীলা!

কিন্তু হায়! এই বিপত্তি যে কপালে ছিল, তা কি সে কখনো জানত? আর দুসপ্তাহ পরেই তার বিয়ে, আর আজ সকালের ফোনেই এলো তার হবু স্ত্রীর কান্নায় ভেঙে পড়া আতঙ্কিত গলা, “বাবা আর বেঁচে নেই, সন্দীপ!…কাল রাতে একটি বার থেকে গাড়ি করে বাড়ি ফেরার পথে, জঙ্গলের মাঝে রাস্তার ধারে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে তাকে…”

আরো কত কিছু বলে চলল দেবারতী, সে সব কথা সন্দীপের কানেও গেল না। কী সর্বনাশের কথা! বুড়োটা মরার আর সময় পেল না! বিয়েটা হয়ে গেলেও তো মরতে পারত! তারপর আবার খুন! মানে বিয়েটা প্রায় বছরখানেকের জন্য কেঁচিয়ে গেল, আর কী! তবুও মুখে নানান সান্ত্বনার কথা বলে চলল সে দেবারতীকে, আর অফিস থেকে অনেক কষ্টে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে সে পাড়ি দিল চন্দ্রকোনার উদ্দেশে। যাই হোক, দেরি হলে হবে, তবে ওই পয়সাওয়ালা বাপের মেয়ের সাথে বিয়েটা কিছুতেই মিস করা যাবে না!

(৩)

সহদেবের সদ্য বিধবা বৌটার শরীরের প্রতি গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ অনিমেষ বাবুর অনেক দিনের লোভ। রাজমিস্ত্রির কাজ করত সহদেব, শুকনো গাছের ডালের মত ছিল তার চেহারা। কিন্তু তার স্ত্রী ভাগ্য ছিল অসাধারণ, নাহলে অমন কুচ্ছিত তালপাতার সেপাই কখনো মালতীর মত এমন ডাগর বউ জোটাতে পারে! সেই সহদেব একদিন কলকাতার কোন কাজ থেকে ফেরার পথে, অসাবধানতার বশে লাইন পারাপার করতে গিয়ে রেলে কাটা পড়ল! তা যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, অপদ বিদায় হয়েছে, এমনই ভাবেন অনিমেষ বাবু।

পঞ্চান্ন বছর বয়স হলেও, বিপত্নীক অনিমেষ বাবুর শরীরে পৌরুষ এখনো অক্ষুন্ন আছে। মেদহীন বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী মানুষটি এখনো ভোর হলেই দৈনিক ডন মুগুর ভাজেন। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! এক কালে তিনি এই গ্রামের মোড়ল ছিলেন, তাছাড়া বাপ ঠাকুরদার রাখা জমিজমা আর সম্পত্তিও যথেষ্ট আছে তার, যে তিনি বাকি জীবনটা আরামেই কাটিয়ে দিতে পারবেন। কত সহস্রবার তিনি আকারে ইঙ্গিতে মালতীকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন তার মনের গোপন ইচ্ছা। তাকে যে তিনি রানী করে রাখতে পারবেন, এই কথাও ব্যক্ত করতে কোন ভুল হয়নি তার। কিন্তু সেই হারামজাদী শুনলে তো তার কথা! সে বাড়ি বাড়ি ঝি-গিরি করে খাবে তাও ভালো, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও কোনো পরপুরুষের সাথে শোবে না! আহা রে, এখনো মালতীর বুকের দিকে তাকাতেই অনিমেষ বাবুর হৃদপিণ্ডটা কেমন যেন মুষড়ে ওঠে!

তবে গতকাল ঘটে যাওয়া রুদ্রশেখর বাবুর অপমৃত্যুর খবরটা শুনে বেশ ভড়কে গিয়েছেন অনিমেষ বাবু। রীতিমত দম আটকে আসার ফলে মৃত্যু! এই গ্রামে নাকি কোন এক অশরীরি দানবের উপদ্রব হয়েছে! তাকে নাকি রুদ্র বাবুর ড্রাইভার সুরেশ নিজে চোখে দেখেছে তার মালিককে খুন করতে! যদিও বা সুরেশের কথা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, তবুও মৃতদেহের গলা থেকে যে হাতের ছাপ পেয়েছেন পুলিশেরা, অত বড় হাত নিঃসন্দেহে কোনো মানুষের হতে পারে না! তাই এই বিষয়ে পুলিশ মুখ না খুললেও, গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্কের রেশ! কলকাতা থেকে ছুটে এসেছে রুদ্র বাবুর হবু জামাই, সন্দীপ! কেউ যেন সন্ধ্যার পর আর বাড়ি থেকে বের হতে চায় না!

আতঙ্কিত মনে এই সব কথাই ভেবে চলেছিলেন অনিমেষ বাবু, এমন সময় তার চোখ চলে গেল তার শোবার ঘরের পেছনের জানলার বাইরে। তার বাড়ির পেছনেই আছে একটি বেশ বড় পুকুর, এই জানলা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায় সেটা। এর জন্য নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে করেন তিনি, কারণ অধিকাংশ দিনই এই জানলা দিয়েই গ্রাম্য মহিলাদের ওই পুকুরে স্নান করার দৃশ্য দেখে পুলকিত হয়ে ওঠে তার মন। তবে এখন রাত সাড়ে নটা বাজে। এই সময়ও তিনি চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলেন, বেশ কয়েকটা এঁটো বাসন নিয়ে পুকুর পারে হাজির হল মালতী! বাবা, মেয়েছেলেটার সাহস আছে বলতে হবে! মুহূর্তের মধ্যেই অনিমেষ বাবুর মনে থাকা সকল আতঙ্কের অনুভূতি যেন কোথায় উবে গেল, তার হৃদযন্ত্র আরো দ্রুত বেগে বেজে উঠলো! আজ যেভাবেই হোক তাকে গ্রাস করতেই হবে মালতীকে, মনে এই অভিসন্ধি নিয়ে তিনি আলতো পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে পুকুর ঘাটে এলেন।

আচমকা নিজের কোমরে কোন পুরুষের হাতের রোমশ স্পর্শ পেয়ে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো মালতী। কিন্ত অনিমেষ বাবু তার সর্বশক্তি দিয়ে জাপটে ধরেছেন মালতীকে, তার পায়ের দাপাদাপিতে পুকুরের সিঁড়িতে রাখা বাসনগুলি ঝনঝন শব্দে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। অনিমেষ বাবু এক ধাক্কায় মালতীকে নিচে ফেলে দিলেন, তারপর হ্যাঁচকা টানে খুলে নিলেন তার পরনের কাপড়খানি। একটুও সময় নষ্ট না করে, তার একটি অংশ ছিঁড়ে তিনি বেঁধে ফেললেন মালতীর মুখ। শায়া ও ব্লাউজ পরিহিতা মালতী পুকুর পাড়ে মাটির ওপর এই অবস্থায় পড়ে ছটফট করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীরের ওপর নেমে এলো অনিমেষ বাবুর শরীরের সম্পূর্ণ ওজনটা!

কিন্তু সেই মুহূর্তে, অনিমেষ বাবুর মনে হল, দুটি রোমশ পেশীবহুল সুদীর্ঘ পুরুষের পা যেন এসে দাঁড়াল ঠিক মালতীর মাথার কাছে। আতঙ্কিত হয়ে মালতীর বুকের ওপর থেকে মুখ তুলে সেদিকে তাকালেন অনিমেষ বাবু! তারপর বিস্ফারিত চোখে সেই দশ বারো ফুট লম্বা অতিকায় উলঙ্গ দানবটির দিকে চেয়ে থেকে, তিনি ধীরে ধীরে উঠে পড়লেন মালতীর শরীর থেকে। তার শরীরের সকল কামোত্তেজনা উবে গিয়ে তার জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল আসন্ন মৃত্যুর আতঙ্কের রেশ। নিমেষের মধ্যেই সেই অতিপ্রাকৃত অশরীরিটি তাকে তুলে ফেললো শূন্যে, তারপর তার দেহটিকে ছুঁড়ে ফেলে দিল পুকুরের জলের মধ্যে।

জলের ভেতর থেকে শ্বাস নেওয়ার জন্য তার মাথা তোলা মাত্রই দানবটি ঝাঁপিয়ে নামল পুকুরের জলে। তার এতটাই দীর্ঘাকৃতি চেহারা, যে মাঝ পুকুরের জলও যেন তার হাঁটুর অনেকটাই নীচে! ততক্ষণে মালতী উঠে পড়েছে মাটি থেকে, খুলে ফেলেছে নিজের মুখের বাঁধন। কোনো মতে সে আতঙ্কিত চোখ দিয়ে চেয়ে দেখল, যে ওই দীর্ঘকায় অবয়বটি পুকুরের মাঝে তার দুই পা দিয়ে চেপে ধরেছে অনিমেষ বাবুর গলা! অপার ক্ষিপ্ততায় সে অনিমেষ বাবুর মাথাটা ঢুকিয়ে রেখেছে জলের নীচে। জলের ভেতর থেকে বুদবুদ উঠছে! কিছুক্ষণের মধ্যে, তার ভেতর থেকে অনিমেষ বাবুর দাপাদাপির চিহ্নটা ধীরে ধীরে থেমে গেল…আর এতটা দেখার পর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মালতী!

(৪)

গত পরশু দিন রুদ্র বাবু, আর গতকাল অনিমেষ বাবু! এই দুজনেরই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে শিহরিত হয়ে উঠেছে গোটা চন্দ্রকোনা গ্রামের মানুষজন। দুটি ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষদর্শীরা একই দানবিক চেহারার কোনো অতিপ্রাকৃত পুরুষমূর্তিকে হত্যাকারী বলে চিহ্নিত করেছে। আজ সকালে জল থেকে অনিমেষ বাবুর ফুলে ফেঁপে ওঠা কদর্য মৃতদেহটি বার করার পর পুকুর পারে জমে উঠেছে আতঙ্কিত গ্রামবাসীদের ভিড়। এই ক্ষেত্রেও এখনো কিছুই বলেনি পুলিশ। তবে অনিমেষ বাবুকে যে জলের ভেতর ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেই চাপ স্পষ্ট তার মৃতদেহে। ঘাড়ের দুই ধারে নীলচে কালসিঁটের দাগ এই কথার প্রমাণ। তাছাড়া, তিনি ভালো সাঁতার জানতেন, তাই শুধুমাত্র জলে পড়ে গিয়ে ডুবে মরা তার পক্ষে অসম্ভব!

সেই আতঙ্কিত জনতাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছে সন্দীপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর লাশ মর্গে চালান করার উদ্যোগ করতে লাগলেন পুলিশ। তাছাড়া, সুরেশ আর মালতীকেও আরো জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আবারও থানায় ডেকে পাঠালেন তারা। বলাই বাহুল্য, তাদের দেখা ওই অতিপ্রাকৃত দানবটির গল্প বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছেন না তারা, আবার লাশদুটিকে পরীক্ষা করার পর সম্পূর্ণরূপে উড়িয়েও দিতে পারছেন না তাদের কথা। কিছুক্ষণ পর জনতার ভিড় অনেকটা হালকা হলে, চিন্তিত মুখে সন্দীপ তার হবু শ্বশুর বাড়ির পথ ধরলো।

রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কাদের যেন ফিসফিসিয়ে কথা বলার আওয়াজ তার কানে গেল, “কথায় আছে না ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! ঠিকই হয়েছে, আঠেরো বছর আগে করা সেই পাপের শাস্তি হল দুজনের…”

বেশ অবাক হয়ে পেছন ফিরে চাইতেই সন্দীপ দেখল, যে দুজন অতি সাধারণ চেহারার লোক রাস্তার পাশে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে এই কথাবার্তা বলছে। কৌতূহলী চিত্তে সন্দীপ এগিয়ে গেল তাদের দিকে, তারপর তাদের জিজ্ঞাসা করল,

“কে তোমরা? আর কোন পাপের কথা বলছিলে তোমরা, যার শাস্তি এই দুজনকে পেতে হয়েছে?”

সন্দীপকে দেখে বেশ হকচকিয়ে গেল দুজন, তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় একজন বলে উঠল,

“আজ্ঞে বাবু…এই গ্রামের দক্ষিণ দিকে যে চার্চটা আছে, আমরা তার দারোয়ান…”

“বুঝলাম, কিন্তু আঠেরো বছর আগে কোন পাপ করেছিলেন এই দুজনে, সে কথা তো বললে না!”

সন্দীপের এই কথা শুনে দুজনেই ভয়ার্ত চোখে একে অপরের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ ধরে। তারপর আরেকজন ব্যক্তি অত্যন্ত বিনয়ের সুরে বলে উঠল,

“আমরা জানি নে, বাবু…আমরা গ্রামের খেটে খাওয়া গরিব লোক। আমরা নিজের মুখে সে কথা বলতে পারব না, ক্ষমা করে দিন আমাদের… তবে…”

“তবে কী? আমি জানতে চাই কোন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছিলে তোমরা দুজনে!” কড়া গলায় বলে উঠল সন্দীপ।

“সেই কথা জানতে চাইলে, আজ সন্ধ্যা বেলা আপনি ওই চার্চে চলে যান…সেখানে ফাদার এডওয়ার্ড-এর সাথে দেখা করুন…আমাদের থেকে তিনি আরো ভালো করে আপনাকে বলতে পারবেন সব কথা!” এই কথা বলে সন্দীপকে অবাক করে, সেই স্থানে আর একটুও না দাঁড়িয়ে হনহন করে কেটে পড়ল ওই দুই ব্যক্তি!

বাড়ি ফিরে কেমন যেন গুম মেরে রইল সন্দীপ। যদিও বা এই গ্রামের মানুষ মরলে তার কোনো মাথা ব্যাথা নেই, তবুও সম্পূর্ণ ব্যাপারটা সত্যিই খুব রহস্যময়। বিশেষ করে, আঠেরো বছর আগে কী এমন কাজ করেছিলেন এই দুজনে, যার জন্য আজ তাদের মরতে হল! আর কেই বা মারছে তাদের? সেটা কি কোনো মানুষ নাকি অন্য কিছু! একটু ভাবতেই বেশ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তার মন। নাহ, এখন যে তার ওই চার্চের ফাদারের সাথে দেখা না করলেই নয়!

(৫)

সেদিন সন্ধ্যা থেকেই আকাশের বুকে জমেছিল পুরু মেঘের প্রলেপ। ঘন ঘন গুরুগম্ভীর শব্দের সাথে রাতের অন্ধকারকে ফালা ফালা করে ঝিলিক দিয়ে উঠছিল বজ্র বিদ্যুতের তীব্র অলোক রশ্মি! চার্চের একটি অন্ধকার কক্ষে বসেছিল সন্দীপ। কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে, কাউকে কিছু না বলেই চলে এসেছে সে এখানে। বেশ পুরোনো আমলের তৈরি সুবিশাল কক্ষটি, চারিদিকে যীশুখ্রিস্টের নানান ছবি, মূর্তি ও ক্রস চিহ্ন বিরাজমান। একদিকে তিন চারটে মোমবাতি জ্বলছে, মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে আসা ঝড়ো হাওয়ায় তরতর করে কেঁপে উঠছে তাদের অগ্নিশিখা। সেই কম্পমান অনুজ্জ্বল আলোয় আরো রহস্যময় মনে হচ্ছে সামনের ইজি-চেয়ারে বসে থাকা ফাদার এডওয়ার্ডকে।

বয়স আন্দাজ ষাটের কাছাকাছি হবে। লম্বা শীর্ণকায় অতীব ফর্সা চেহারা, মুখে সাদা দাঁড়ি গোঁফের জঙ্গল, পরনে পাদ্রীদের শুভ্রবসন। সন্দীপের এখানে আসার কারণ শুনে প্রথমে তিনি চিন্তিত মুখে কী যেন ভাবলেন। তারপর গম্ভীর মুখে বলে উঠলেন, “দেখুন, আমি জানি না যে সেই সব কথা আপনাকে বলা ঠিক হবে কি না…কিন্তু আপনি যখন এই ঝড় জলের রাতে এখানে এসেই পড়েছেন, তখন আপনাকে নিরাশ করব না!”

উত্তেজনা বুকে নিয়ে সন্দীপ একাগ্র চিত্তে চেয়ে রইল তার দিকে, তার হাই পাওয়ারের চশমার কাঁচে প্রতিফলিত হতে লাগল অদূরে রাখা মোমবাতিগুলির কম্পমান অগ্নিশিখা। কোথাও যেন একটা বাজ পড়ল, আর তার সাথেই বলতে শুরু করলেন তিনি।

“আগেই জানতে পেরেছেন, যে এই ঘটনাটা ঘটে আজ থেকে আঠেরো বছর আগে। সেই সময় এই চার্চে কর্মরত ছিলেন লিসা গোমস নামক এক নান। দেখতে ছিলেন অসামান্য সুন্দরী, কিন্তু খুব একটা মিশুকে ছিলেন না তিনি। কেউ কেউ বলতেন তিনি অবিবাহিত, আবার কেউ বলতেন তিনি বিধবা। চার্চের কাজকর্ম বাদ দিয়ে বাকি সময়টা ব্যস্ত থাকতেন বাইবেল তথা খ্রিস্টান ধর্ম সম্বন্ধিত পড়াশোনায়। মনে হত আমাদের সকলকেই এড়িয়ে চলতেন তিনি, যেন সবসময়ই আমাদের সাথে একটা দূরত্ব বজায় রাখতে চান। অবশ্য কেন তিনি এমন করছেন, তার কারণটা পরে একটু হলেও পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল আমাদের কাছে!”

কিছুক্ষণ থেমে, কম্পিত গলায় আবার বলতে শুরু করলেন ফাদার, “সকলেরই একটি ধারণা হয়ে উঠেছিলো, যে এই মহিলার সান্নিধ্য অশুভ! হয়তো তিনি Witchcrafty বা Satanism এর সাথে যুক্ত, কোন অশুভ শক্তির ছায়া যেন সর্বদা বিরাজ করত তার চারিপাশে, তাই যতজন তার খুব নিকটে থেকেছে, তাদের প্রত্যেকেরই কোন না কোন অমঙ্গল ঘটেছে! তিনি থাকতেন এই গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ভাড়া বাড়ির একতলায়। বাড়ির মালিক সপরিবারে থাকতেন ওপরে। কিন্তু তার থাকার এক মাসের মধ্যেই হঠাৎ সর্পাঘাতে মারা গেল সেই পরিবারের দশ বছরের ছোট্ট ছেলেটা! তার শোকে তার মা গলায় দড়ি দিয়ে হলেন আত্মঘাতী! আর স্বামী একাকিত্বের যন্ত্রণা না ভুলতে পেরে মদ ধরলেন, তারপর কয়েক বছরের মধ্যেই লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত মৃত্যু হয় তার! শুধু তাই নয়, তার বাড়িতে যে মহিলা ঝি-এর কাজ করত, কিছু দিনের মধ্যেই সে নাকি উন্মাদে পরিণত হয়ে নিজেই নিজের স্বামীর বুকে ছোরা চালিয়ে দেয়!

“চার্চের কাজ আর পড়াশোনা ছাড়াও, তিনি এই গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ইংরাজি পড়াতেন। এই বাচ্চাগুলোর সাথেও নাকি ঘটতে শুরু করল নানান অঘটন। কেউ হল ক্রমাগত দুঃস্বপ্ন দেখার শিকার, কারোর বা নানান অজানা রোগে ভুগে মৃত্যু হল। গ্রামের মানুষজনের কুনজরে পড়লেন তিনি, সকলে মনে করল যে তিনি হলেন ডাইনি! পুলিশ ডেকে তাকে গ্রাম ছাড়া করতে চাইল গ্রামের লোক, কিন্তু এই সকল অঘটনগুলোর সাথে তার প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে থাকার কোনো প্রমাণ নেই, তাই পুলিশ এই বিষয়ে কোন সাহায্য করলেন না গ্রামের লোকেদের।

“আর ঠিক এই মুহূর্তে গ্রামের সকলের রোষের আগুনে যেন ঘি ঢাললেন আপনার হবু শ্বশুর মশাই, রুদ্রশেখর বাবু। কানাঘুষো শোনা যায় যে স্ত্রী বিয়োগের পর, তার নাকি অবৈধ সম্পর্ক তৈরি হয় লিসার সাথে। সেই কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দেন লিসা। তাই পয়সার লোভ দেখিয়ে তখনকার মোড়ল অনিমেষ বাবুকে দলে টানলেন তিনি। গ্রামের সকল অশিক্ষিত মানুষদের বোঝানো হল, যে এমত অবস্থায় লিসাকে শেষ করে দেওয়াই শ্রেয়! সেই মত পরিকল্পনা মাফিক, ওরা এক রাত্রে লিসার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল, বাড়ির মালিকের সপরিবারে মৃত্যুর পর সেখানে একাই থাকতেন তিনি। পরদিন সেই বাড়ি থেকে লিসার বীভৎস দগ্ধ মৃতদেহটিও আবিষ্কৃত হয়!”

আরেকবার কোথাও যেন বাজ পড়ল, আর তার সাথেই এই ঘটনার ভয়াবহতার কথা কল্পনা করে শিউরে উঠল সন্দীপ। “জানি আপনি এই যুগের ছেলে… ভূত প্রেতে বিশ্বাস করেন না… তবুও…” ফাদার এডওয়ার্ড-এর কথাটা সম্পূর্ণ বলার আগেই বলে উঠল সন্দীপ,

“কিন্তু যদি সে কথা মেনেও নিই, তাহলেও তো এই সমীকরণের সমাধান হচ্ছে না ফাদার! লিসার প্রেতাত্মাকে কিন্তু কেউ খুন করতে দেখেনি, কোনো দানবিক চেহারার পুরুষকে সকলে দেখেছে হত্যাকারী হিসাবে, তার সাথে লিসার কী সম্পর্ক?”

অনেকক্ষণ ভেবে ক্ষুব্ধ গলায় ফাদার বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই, সন্দীপ বাবু… তবে ওই বিশালাকায় দানবিক মূর্তির ছায়া নাকি এর আগেও এই গ্রামের কয়েকজন মেষ পালক আর কাঠুরেরা ওই জঙ্গলের শেষে, যেখানে লাল মাটির তৈরি বেশ কিছু খাঁদ আর গুহা আছে, সেখানে দেখেছে! হয়তো সেখানে গেলেই আপনি পাবেন আপনার প্রশ্নের উত্তর!”

ততক্ষণে বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। আর বেশি কথা না বাড়িয়ে সন্দীপ বিদায় নিল ফাদারের কাছ থেকে। আজ যেন তার মন মানছে না কোনো সতর্কতা, আসন্ন বিপদের কথা জেনেও যেন সে মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে যেতে চায় এই রহস্যের জট খুলতে।

(৬)

বৃষ্টিমুখর এই রাতের অন্ধকারে গোটা জঙ্গলটাকে যেন মনে হচ্ছিল কোনো স্বপ্নলোকের প্রেতপুরী। হুহু করে জলের ঝাপটা নিয়ে তিরবেগে ছুটে আসা ঝড়ো হাওয়ার দাপটের সাথে আছে স্যাঁতস্যাঁতে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ। এক নাগাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া শুধু মাঝে মাঝে শোনা যায় মাটির ওপর পড়ে থাকা ভিজে গাছের পাতার ওপর কারোর মচমচ পদধ্বনি। দুরুদুরু বুকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে সন্দীপ। রাত থাকতে থাকতে তাকে যে পৌঁছতেই হবে এই বনাঞ্চলের শেষে ওই পাহাড়ি গুহাগুলির কাছে। সেখানেই হয়তো কোন এক গহ্বরের ভেতর লুকিয়ে আছে তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর! কে এই হত্যাকারী দানব? কেনই বা সে লিসার হয়ে আঠেরো বছর পূর্বে ঘটা সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে চাইছে এক এক করে সকল অপরাধীদের হত্যা করে? এই সব ভাবতে ভাবতেই সন্দীপ হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছে গেল জঙ্গলের শেষ প্রান্তে, যেখানে প্রকৃতি তার অমোঘ শৈল্পিক কারুকার্যে সৃষ্টি করেছেন লাল মাটি আর পাথরের তৈরি এই অসংখ্য ছোট বড় গুহাগুলিকে।

অন্ধকারের মধ্যে টর্চের আলো জ্বালিয়ে সন্দীপ তার চারিপাশে চেয়ে দেখতে লাগল। এখানে অজস্র গুহা গহ্বর আছে, এগুলির মধ্যে সে কীভাবে খুঁজে পাবে সেই অজানা হত্যাকারীর ঠিকানা! এমন সময় তার টর্চের আলো গিয়ে পড়ল অনতিদূরে, একটি সুবিশাল গুহার মুখে। তার ভেতর থেকে যেন আলোর ঝলকানি প্রতিফলিত হচ্ছে, একটি যীশু খ্রিস্টের ক্রস চিহ্ন থেকে! দৃশ্যটা বেশ অদ্ভুত লাগলো সন্দীপের। সে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল সেই গুহার পানে। গুহার কাছে এসে, তার ভেতর টর্চের আলো ফেলে আরো বেশি চমকে উঠল সে, এটাতো একটা কবর! একটা খ্রিস্টান কবর! যেন খুব সদ্য তৈরি করা হয়েছে সেটা, এখনো যেন কাঁচা আছে সেখানকার সিমেন্ট বালি! ভালো করে টর্চের আলো ফেলে, সেই ক্রস চিহ্নের নীচে পাথরের ফলকে লেখা নামটা এবং সেই ব্যক্তির মৃত্যুর তারিখটা দেখে আবার শিহরণের পালা সন্দীপের! সেখানে লেখা আছে:

“লিসা গোমস, জন্ম: ১৮ ফেব্রুয়ারি’ ১৯৭০, মৃত্যু: ২৮ নভেম্বর’ ২০১৮”

আজ তো পয়লা ডিসেম্বর’ ২০১৮! এ কীভাবে সম্ভব! তার মানে লিসার মৃত্যু হয়েছে মাত্র তিনদিন আগে! কিন্তু ফাদার এডওয়ার্ড যে বললেন, আঠেরো বছর আগেই মারা গিয়েছেন লিসা! তার মানে কি তিনি মিথ্যা কথা বললেন? বেশি কিছু ভাবার আগেই পেছন থেকে কারোর হেঁটে আসার পদশব্দের ধ্বনি শুনে সচকিত হয়ে পেছন ফিরে চেয়ে দেখলো সন্দীপ। একটি অস্পষ্ট নারীর অবয়ব যেন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে তার দিকে! আতঙ্কে সন্দীপের শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটি হিমেল স্রোত বয়ে গেল! কে ওটা! কে? ওটা কি লিসার প্রেতাত্মা! ধীরে ধীরে এক পা দুপা করে পিছু হটতে লাগলো সন্দীপ। তারপর গুহাটির পাথুরে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ভয়ে কাঁপতে লাগল সে। তবুও কম্পিত হাতে ধরে রাখা টর্চের আলোটা ফেলার চেষ্টা করল সে ওই নারীমূর্তির গায়ে! সেই অশরীরি নারীর গায়ে আলো পড়ার পর যেন আরো বেশি চমকে উঠল সন্দীপ, অস্ফুট কণ্ঠে সে বলে উঠল,

“দেবারতী… দেবারতী, তুমি… এখানে, এই সময়!”

(৭)

“হ্যাঁ সন্দীপ, আমি… এখানে, এই সময়…. নিশ্চয় খুব অবাক হচ্ছ আমাকে দেখে! আজ সন্ধ্যাবেলা তোমার পেছনে লোক লাগিয়ে যখন জানতে পারলাম যে তুমি চার্চের উদ্দেশে বেরিয়েছ, তখনই বুঝলাম যে তুমি এখানে আসবেই! আর তাই তো আমিও এখানে এই সময় চলে এলাম….” ঠোঁটের কোণে একটি বাঁকা হাসি নিয়ে বলে উঠল দেবারতী।

সন্দীপ মুখে কিছু বলতে পারল না, শুধু অবাক হয়ে চেয়ে রইল দেবারতীর দিকে। অগত্যা সেই আবার বলে উঠল, “তোমার কী মনে হয়, সন্দীপ? লিসা গোমস কি সত্যিই একজন ডাইনি ছিলেন? তিনি কি Satan এর আরাধনা করতেন? কেনই বা যারা তার সান্নিধ্যে বেশি সময় কাটিয়েছিল, তাদের সবার সাথেই কোনো না কোনো অঘটন ঘটেছে?”

সন্দীপকে আবারও চুপ করে থাকতে দেখে, বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে হেসে উঠল দেবারতী, তারপর বলল, “না সন্দীপ, না…তিনি কোনো শয়তানের আরাধনা করতেন না, ওসব মিথ্যা রটানো কথা!”

অস্ফুট কণ্ঠে সন্দীপ বলে উঠলো, “তাহলে… ওই অঘটনগুলো…”

তার কথা শেষ না হতেই দেবারতী বলল, “তোমার হয়তো এই কথাগুলো কোন কল্প-বিজ্ঞানের গল্প বলে মনে হবে, তবুও এটাই সত্যি! বলছি, শোনো…

“পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকেন, জন্ম থেকেই যাদের মস্তিষ্কে চলা চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতিগুলি থেকে উৎপন্ন হয় নেগেটিভ বা ডার্ক এনার্জি! কোন কারণে তারা এই ভাবে জন্ম নেন, সেই কথা আমরা কেউ জানি না! তবে এটা বুঝতে পারি, যে কোনো সাধারণ মানুষ যদি উপরোক্ত মানুষদের সান্নিধ্যে বেশি সময় ধরে থাকেন, তাহলে তাদের এই নেগেটিভ এনার্জির প্রভাবে নানা দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। এমন কিছু অঘটন, যার সঠিক কারণ আমরা কোনোদিন খুঁজে বার করতে সক্ষম হব না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই ধরণের সাইকিক অ্যাটাকের ক্ষেত্রে, নেগেটিভ এনার্জি সম্পন্ন ব্যক্তিটির শুধুমাত্র নিজেকে সকলের কাছ থেকে দূরে রাখা ছাড়া আর কিছুই করার উপায় থাকে না!”

অপার বিস্ময় বলে উঠল সন্দীপ, “তার মানে লিসা গোমস ছিলেন তেমনই এক নেগেটিভ এনার্জি সম্পন্না মহিলা!”

“শুধু লিসা গোমস নন,” সন্দীপকে আরো অবাক করে বলে উঠল দেবারতী, “আমি নিজেও তেমনই এক নেগেটিভ এনার্জি সম্পন্না নারী!”

বাকরুদ্ধ সন্দীপকে বলেই চলল সে, “একটি শিশুর জন্ম থেকে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ হন তার মা। কিন্তু আমার জন্মের তিন মাসের মধ্যেই, যে মা আমাকে সর্বদা বুকে করে আগলে রাখতেন, তিনিই একদিন রাত্রে হার্ট-ফেল করে মারা গেলেন। ঘটনাটা খুবই অস্বাভাবিক, কারণ এর আগে এই সংক্রান্ত কোনো অসুখ তার ছিল না!…পরে যখন প্রথম স্কুলে গেলাম, দেখতাম যে অন্যান্য কোন ছেলেমেয়ে আমার সাথে মিশতে চাইত না। কারণ যারাই আমার সাথে বন্ধুত্ব পাতায়, হয় তারা কোনো না কোনো রোগে ভুগে কষ্ট পায়, নাহলে তাদের প্রিয়জনদের হারানোর মত দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়…এমনকি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, বাড়ির পোষা কুকুরটা, দুমাস ধরে যে সবসময় আমার পাশে পাশে থাকত, সেও একদিন কোন অজানা রোগে মুখ দিয়ে রক্ত বার হয়ে মারা গেল!

“মায়ের মৃত্যুর পর বুঝতে পারতাম যে বাবা আমাকে একদম পছন্দ করেন না। আমার উপস্থিতিতে সবসময়ই কেমন যেন বদ মেজাজি হয়ে ওঠেন, ছোটখাটো বিষয়ে সকলকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে থাকেন। তিনি একাকিত্বে ভুগতে শুরু করলেন, মদ এবং বাজারে মেয়েমানুষদের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে লাগলেন…একটু বড় হয়ে ওঠার পর আমার পরিচয় হল লিসা ম্যাডামের সাথে! তিনি বাড়িতেই আমাকে ইংরাজি পড়াতে আসতেন। তার সম্বন্ধে সকল কথা আমি তখন থেকেই শুনি, বুঝতে পারি যে আমার জীবনের সাথে অনেক মিল আছে তার জীবনের! আশ্চর্যজনক ভাবে, একমাত্র তিনিই আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমরা নিজেরা একে অপরের এত কাছাকাছি এতদিন ধরে থাকলেও, না তো আমার কোনো ক্ষতি হয়েছে, না তো তার। বুঝতে পেরেছিলাম, যে যেহেতু আমরা দুজনেই নেগেটিভ এনার্জি সম্পন্না, তাই আমাদের দুজনের মধ্যে কারোর ওপর অন্যের নেগেটিভ এনার্জি কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না!

“রাগে ঘৃণায় বিদ্বেষে আমার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠেছিল, যখন ওই বাড়িতেই বাবা লিসা ম্যাডামকে নিষ্ঠুর ভাবে ধর্ষণ করলেন। সেই ঘরের দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটাই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম আমি, কিন্তু তখন মাত্র বারো বছর বয়স! বাপের বিরুদ্ধে কথা বলার কোন সাহস জুগিয়ে উঠতে পারলাম না। শুধু এতেই ক্ষান্ত হলেন না বাবা, তিনি ওই বাড়িতেই অনিমেষ বাবুকে ডেকে লিসা ম্যাডামের মুখ চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে চাইলেন। গ্রামের মানুষজনের মধ্যে তার ডাইনি হওয়ার মিথ্যা কথা রটানোর পরিকল্পনা করলেন। ম্যাডামের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে তাকে পুড়িয়ে মারার কথা বললেন। সেই রাত্রে সব কথা গোপনে শুনে আমি ম্যাডামকে তা জানিয়ে দিই। কোনো এক বিশ্বস্ত লোকের সাহায্যে, ম্যাডামের মতই দেখতে, এমন একটি নারীর লাশ হাসপাতালের মর্গ থেকে নিয়ে আসা হয়। তারপর সেটাকে তার বেডরুমে রেখে, আমরা বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে এই জঙ্গলে পালিয়ে আসি। পরদিন, সকলে ওই আগুনে পোড়া লাশটিকে দেখে মনে করে যে লিসা ম্যাডামের মৃত্যু হয়েছে!

“এরপর থেকে এই জঙ্গলের গুহাই হয়ে ওঠে ম্যাডামের বাসস্থান। গ্রামের কোনো মানুষ এদিকে খুব একটা আসেন না, ওনার সকল দরকারি জিনিসপত্রের যোগান দিতাম আমি…এতদিন আমরা সাধারণ মানুষের ওপর এই এনার্জির কুপ্রভাবের কথা জেনেছি, বুঝতে পারিনি এর অন্যান্য ব্যবহারগুলির কথা! বুঝতে পারিনি, এই নেগেটিভ বা ডার্ক এনার্জির সাহায্যেই আমাদের সামনে খুলতে পারে এক অন্য জগৎ বা প্যারাল্যাল ইউনিভার্সের রাস্তা!… হ্যাঁ, সন্দীপ, তুমি নিশ্চয় ওয়ার্মহোলের সম্বন্ধে শুনেছ, যা হল এক জগৎ থেকে অন্য জগতে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা! এই ধরণের শত শত ওয়ার্মহোল আমাদের চারিপাশেই আছে, কিন্তু সাধারণ অবস্থায় তাদের ভেতরের যাত্রাপথের মুখ থাকে বন্ধ। কিন্তু নেগেটিভ এনার্জির সাহায্যে এই সুড়ঙ্গমুখ খোলা সম্ভব, যা করতে পেরেছিলেন লিসা ম্যাডাম! হয়তো এই ক্ষমতাকেই প্যারাসাইকোলোজির ভাষায় বলা হয় সাইকোকাইনেসিস!”

সন্দীপের যেন কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না, সে শুধু বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলো দেবারতীর দিকে। আবার বলতে শুরু করলো দেবারতী, “এবার নিশ্চয় জানতে চাও, কে ওই দানবিক হত্যাকারী, তাই তো? এর জন্য আমাদের মনে করতে হবে, বাইবেলে বর্ণিত সহস্র বছর পূর্বে ঘটা একটি ঘটনার কথা। Sons of God নামক কিছু অতি-প্রাকৃত ফেরেশতা (Angel) ঈশ্বরের সাথে বিরোধিতা করে স্বর্গ থেকে মর্তে নেমে আসেন। পৃথিবীর সাধারণ নারীদের সাথে সহবাস করে, তারা বংশবৃদ্ধি করা শুরু করেন। এই ফেরেশতাদের ঔরসজাত যে সন্তানদের জন্ম দিতেন সাধারণ নারীরা, তারা কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন এক প্রকারের বৃহদাকার দানব, যাদের বলা হত নেফিলিম। কিন্তু এই পাপের শাস্তি হিসাবে ঈশ্বর ওই ফেরেশতাদের টার্টারস নামক একটি অন্ধকার জগতে নির্বাসিত করেন। নেফিলিমরাও মারা পড়েন তার দ্বারাই সৃষ্ট পৃথিবী ব্যাপি একটি বন্যায়!

“লিসা ম্যাডাম তার নেগেটিভ এনার্জি দিয়ে এমনই এক টারটারাস-এর সাথে এই জগতের সংযোগকরী ওয়ার্মহোল-এর রাস্তা খুলে দেন। যার ফলে সেখান থেকে তার কাছে হাজির হন এমনই এক ফেরেশতা! এবং তার সাথে মিলিত হয়ে, তিনিও জন্ম দেন এক নেফিলিমকে! তার জন্মাবার সাথেই সেই ফেরেশতা নিজের জগতে ফিরে যান, আর তার পর থেকে ম্যাডাম সযত্নে প্রতিপালন করতে থাকেন এই নেফিলিমকে।…তিনদিন আগেই একটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ম্যাডাম, কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে দিয়ে কথা দেওয়ান, যে তার এই সন্তানের সাহায্যেই আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে গ্রামের সকলের ওপরে, যাদের জন্য তিনি ধর্ষিত হয়েছেন, বাধ্য হয়েছেন এই জঙ্গলের গুহায় লুকিয়ে বসবাস করতে!”

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলে উঠলো সন্দীপ, “তার মানে তুমি… তুমি…”

তার কথা শেষ না হতেই মুখে একটি ক্রুর হাসি খেলে যায় দেবারতীর, সে বলল, “হ্যাঁ, আমি!…আমিই সেদিন বাবার গাড়ি থেকে জলের চিহ্নটুকুও সরিয়ে রেখেছিলাম, যাতে ওই জঙ্গলের মাঝের রাস্তায় তাদের গাড়ি বিকল হয়ে গেলে বাবাকে নেফিলিম দ্বারা হত্যা করানো যায়!…আমিই পরদিন রাত্রে বাড়ির জলের পাম্পের লাইন কেটে দিই, যাতে মালতীকে রাতের এঁটো বাসন গুলো মাজতে পুকুর ঘাটে যেতে হয়। জানতাম আমি, তাকে দেখে সেখানে অনিমেষ বাবু আসবেনই, আর সেই সুযোগে তাকেও নেফিলিম দ্বারা হত্যা করানো যাবে!…এভাবেই, যে সকল গ্রামবাসীরা লিসা ম্যাডামের সাথে হওয়া ওই অন্যায়ের সাথে কোনো ভাবে যুক্ত ছিল, তাদের সকলকে একে একে নেফিলিমের শিকার বানাবো আমি… হা হা হা হা!”

সন্দীপের হঠাৎ মনে হল, যেন একটা বিশালাকার ছায়ামূর্তি তার বড় বড় পা ফেলে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সেই গুহার ভেতরেই এগিয়ে আসছে! যেন তার পদশব্দে কম্পিত হয়ে উঠছে গোটা ধরিত্রীতল! দেবারতী একবার জ্বলন্ত চোখে পেছন পানে ঘুরে দেখল, তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে সন্দীপকে চিৎকার করে বলে উঠল, “তোমার কী মনে হয় সন্দীপ? তোমার পেছনে লোক লাগিয়ে তোমার হাজারও নারীসঙ্গের কথা জানতে পারিনি আমরা? তোমার মত দুশ্চরিত্র লম্পট ছেলের সাথে কখনো বিয়ে করতে চাই আমি? বাবা শুধু আমার মত কালো অপয়া মেয়েকে বাড়ি থেকে দূর করতে চাইছিলেন তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে, আর আমিও তার মুখের ওপর কোনো কথা বলতে পারিনি! তোমার মত পুরুষেরা বাবা আর অনিমেষ বাবুর দলেই পড়ো…আর এখন তো তুমি এই সব কথা জেনে গেলে, তাই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখলে আমি বাকি গ্রামবাসীদের ওপর প্রতিশোধ নেবো কী করে বল? হা হা হা হা…”

সন্দীপ অস্ফুট কণ্ঠে যেন কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু আতঙ্কে তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোলো না। হঠাৎ দেবারতীর পেছন থেকে অন্ধকারের মাঝে দৃশ্যমান হল কামানের গোলার মত দুটি জ্বলন্ত চোখ… একটি সুবৃহৎ রোমশ পুরুষালি হাত এগিয়ে এল সন্দীপের কাছে…মুহূর্তের মধ্যে সেটা তার গলা ধরে তার বলিষ্ঠ শরীরটাকে তুলে দিল সম্পূর্ণ শূন্যে… শোনা গেল নেফিলিমের ক্ষিপ্ত চাপা গর্জনের আওয়াজ… সেই দীর্ঘদেহী দানবটির পাশে তার অর্ধেকেরও কম উচ্চতার অধিকারিণী দেবারতীর হিংস্র হাসিমুখটা দেখতে দেখতেই দম আটকে অন্ধকার নেমে এল সন্দীপের দুচোখের সামনে!

পাঠকেরা যা পড়ছেন