নিঝুম দ্বীপের রাজকুমার - রনিন

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী

(প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক ‘স্যর’ ম্যালকম রসের সহকারী কেন কোবার্নের লাইব্রেরি থেকে উদ্ধারকৃত একটি ডায়েরির কয়েকটি ছেঁড়া পাতা থেকে আহৃত আখ্যান—ম্যালকমকে পাঠানো ইংরেজি অনুবাদের আসল প্রতিরূপ।)

2nd April, 2088

(সময়ের হিসেব মেঘনাদ সেন এবং বৃতি সেনের তৈরী ‘সমান্তরাল সূর্যঘড়ি’ অনুসারে (হ্যাঁ, বাবা এবং মা, সত্যি ওটা নির্ভুল সময়ের হিসেবে দেয় এখনও!)

মন খারাপ।

হ্যাঁ, আজ আমার মন খারাপ। আগে কখনও এরকমটা হয়নি। হবার সুযোগ দিইনি। কিন্তু ইদানিং এই একলা মুহূর্তগুলোকে বেশ ভয় পেতে শুরু করেছি। দৈনন্দিন ব্যস্ত থাকার নাটকের মহড়া দিয়ে দিয়ে আমি যেন কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সাহসের বাঁধ ভেঙে গেছে কখন, বুঝিনি। স্মৃতির কাছে হারিয়ে যাবার লোভে পা দিয়ে দিয়েছি আনমনে। তাই কথায় কথায় দুঃখ এসে জাপ্টে ধরে যখন তখন। বিনবিনে হতাশা মেরুদন্ড দিয়ে বয়ে যায়, পাগল করা একাকিত্ব আমাকে ঠেলে দেয় বিষণ্ণতার অন্ধকূপে। আমি ভয় পাই।

তাই অনেক ভেবে চিন্তে দেখলাম, নিজেকে আরও বেশি করে ব্যস্ত রাখা উচিত। আলগা মুহূর্তগুলোকেও ভরিয়ে দিতে হবে কাজের রঙে। যাতে দুঃখবিলাসী হবার সুযোগ আর সময় দুটোই হাতছাড়া হয়। অনেক কিছু ভেবে তাই বসলাম ঠাকুর্দার উপহার দেওয়া ডাইরিটা নিয়ে। ঠিক করলাম ওটাতেই লিখে রাখবো আমার যাবতীয় দিনলিপি। একা থাকার দুঃসহ পল অনুপলের হিসেব দিয়ে ভরিয়ে দেব নীল মলাটে ঢাকা পাতাগুলোকে। ওই হলদে হয়ে যাওয়া পাতাগুলো হবে বিষণ্ণতার বিরুদ্ধে আমার লড়ার হাতিয়ার।

কিন্তু কিই বা লিখি? দিনলিপি? কড়চা? সকাল থেকে রাত অব্দি এই নিঃসঙ্গ দ্বীপে কীভাবে কাটাই আমার দিনগুলো, তারই আখ্যান?

তবে তাই হোক—

আমার ‘রাজত্বে’ ভোর আসার সুসংবাদটা ‘গোলাপি’ সব্বার আগে আমার কানে পৌঁছে দেয়। লালচে রঙের সূর্যটা যখন পুব আকাশে উঁকি মারে, সমুদ্দুরের নীল ঢেউয়ের বিছানা ছেড়ে মাথা তোলে একটুখানি, ঠিক তখনই ‘ব্যাঙের প্রাসাদ’ থেকে কালচে ঠোঁটজোড়া বার করে গোলাপি ডাক ছাড়ে তারস্বরে। ‘ব্যাঙের প্রাসাদ’ কী সেটাই ভাবছেন তো? আসলে খড়কুটো দিয়ে বানানো ওর বাসাটা একটা ‘ড্রাগন ব্লাড’ গাছের মগডালে শোভা পাচ্ছে। গাছটার পাতাভরা মাথা আর হাড়গিলে লম্বা কান্ডটাকে দূর থেকে দেখলে ব্যাঙের ছাতার মতই লাগে। তাই গোলাপির আস্তানাটাকে আমি ওই নামেই ডেকে থাকি। ভোরের বার্তা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েই সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে ওর ছানাগুলোকে ডানায় ঢেকে নিয়ে। গোলাপি আসলে একটা কালো রঙের হতকুচ্ছিৎ চড়ুই পাখি। কিন্তু ওর পেটের দিকে আশ্চর্য রকমের উজ্জ্বল গোলাপি রঙের আভা। ওই সংসারী চড়ুই পাখিটা আমার সান্ত্রী, ওর ডাকটাই আমার কাছে ভোরের আগমনী।

গোলাপির ডাকে জেগে ওঠে অন্য পাখিপাখালিরা। দক্ষিণের ছোট্ট জঙ্গলে ভোরের আহ্বানে নেমে পড়ে নরম জলপাই রঙের বেলবার্ডগুলো। সেখান থেকে সংবাদ পৌঁছে যায় দক্ষিণের ঝগড়াটে বেবুনদের ঘরে। বেবুনরা জাগলে মুখপোড়া কাঠবেড়ালি হনুগুলোই বা বাদ যাবে কেন? ওরাও গাছে গাছে লাফিয়ে জীবজগৎকে অতিষ্ঠ করে তোলে। সব শেষে ডেকে ওঠে ‘লালু’—লালঝুঁটি মোরগটা। আমার ঘুম ভেঙে যায়।

তারপর দিনভর কাজ।

নিম গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মেজে, সমুদ্রের ফেনা দিয়ে মুখ ধুয়েই দৌড় মারতে হয় পুবদিকের নারকেল বাগানের দিকে। রাতভর টুপটাপ করে খসে পড়া সবজে ফলগুলোকে চটের থলেতে পুরে ফিরতে হয় ঘরে। ঘর মানে আমার রাজপ্রাসাদে। মা ভালোবেসে নাম দিয়েছিল ‘মেঘপুরী’—আমারও বেশ পছন্দের নাম ওটা। মা আর নেই। বাবাও নিরুদ্দেশের দেশে। ধুস—

যাকগে, আবার আমার প্রাত্যহিকীতে ফিরি।

মেঘপুরীতে ফিরেই নারকেলের জল আর সাদা নরম শাঁস দিয়ে পেট ভর্তি করে দোতলার ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশটাকে ভালো করে জরিপ করে নিতে হবে। মেঘ আছে কি নেই, থাকলেও পেঁজা তুলোর মত নাকি সমুদ্রের ঢেউয়ের মত? মেঘের গায়ে কি আঁচড় কেটেছে কেউ নাকি তার ল্যাজটা মাটির দিকে নেমে এসেছে? শেষের দুটো রকমের মেঘ দেখা গেলে বিপদ সমূহ। বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঝোড়োবৃষ্টি অথবা টর্নেডো ধেয়ে আসবে কিনা সে পূর্বাভাস ওই আপাত নিরীহ মেঘগুলোই আমাকে জানিয়ে দেয়। আমি প্রস্তুত হই প্রকৃতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে।

আকাশ পর্যবেক্ষণ শেষ করেই দৌড়তে হবে বিটবাগানের দিকে। মাটি খুঁড়ে লালচে শিকড়গুলো হাতে ঝুলিয়ে বেরোতে হবে পোকাশিকারে। গাছের পাতা, ফুলের পাপড়ি খুঁজে পছন্দমত কীটগুলোকে জোগাড় করে খাবার যোগান দিতে হবে লালু আর তার পরিবারকে। সেখান থেকে মুক্তি পেলে কাপড় কাচার বিরক্তিকর কাজটা সারতে হবে। পাথরের কালো টুকরোটা নিয়ে বালিয়াড়িতে বসে নোনতা জলে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে সবুজ রঙের ল্যাঙটটা। এখন অবশ্য ওর রং সবুজ নেই আর। তবুও আমি ওটাকে সবুজ বলেই ভাবতে বেশি পছন্দ করি। আরও দু’জোড়া বসন আছে বটে, কিন্তু আমি আকৃতিতে বাড়লেও ওরা আর বাড়ছে না। এখন এই জলপাই সবুজ ল্যাঙটটাই আমার ‘রাজবস্ত্র’।

এরপর আবার উত্তরের ডোবায় বাঁশের খাঁচা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কটা মাছ ধরা পড়ল তার ওপর নির্ভর করে আমার পরবর্তী পদক্ষেপ। খাঁচা যদি খালি থাকে তবে বর্শা নিয়ে বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে অল্প জলে পা ডুবিয়ে মাছের সন্ধান করতে হবে। ওদের দেখা পেলে ভালো, না পেলে লালুর খাবারে ভাগ বসানো যাবে নির্দ্বিধায়। সঙ্গে যদি একটু কাঁচপুকুরের কলমিশাক থাকে তাহলে তো আর কথাই নেই। বৃষ্টির জলে পুকুরটা এখন টই টুম্বুর হয়ে আছে। ওখানে শরীর ডুবিয়ে স্নান করতে কী মজা! ডাঙা থেকেই জলের নিচের সবজে দুনিয়াটা দেখতে পাওয়া যায়, ডুবলে ঘুরে বেড়ানো যায় ওদের গোলক ধাঁধায়। আমি যদিও বেশিক্ষণ থাকতে পারি না, একবার ডুব মেরে ওপরে উঠতে বেশ খানিক্ষণ সময় লেগে যায়। তা ছাড়া মা আগে বলত, ওই সবুজ গালিচার আড়ালে নাকি আছে সরীসৃপদের এক অন্য দুনিয়া। আগে বিশ্বাস করতাম, এখন করি না। ভয়টা তবুও মনের কোণে থেকেই গেছে, একটুখানি হলেও।

স্নান করে আমি সাধারণত সমুদ্রের ধরে গিয়ে বসি। ঢেউ গুনি। ঘুমিয়ে পড়ি। অথবা বই পড়ি। হরেক রকমের কাহিনী নিয়ে নাড়াচাড়া করি অলস দুপুর জুড়ে। কিচ্ছু ভালো না লাগলে দূর দিগন্তের দিকে চেয়ে থাকি আনমনে। কাঠ, বালি পাথর আর মাটি দিয়ে বানানো আমাদের দু’তলা বাড়িটার খুপরি জানলা দিয়ে উড়ে আসা রোদে ভেজা ঠান্ডা হাওয়া আমাকে উদাস করে তোলে। চোখে স্বপ্নের রং লাগে। মন উড়ু উড়ু হয়ে ওঠে।

বিকেলের আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে বুড়ো ‘আর্গোস’। কচ্চিৎ কদাচিত। যেদিন ওর ইচ্ছে হয়। বলতে ভুলে গেছি আর্গোস আসলে একটা ‘সামুদ্রিক কচ্ছপ’। বলা ভালো বিশাল আকৃতির কচ্ছপ। ওর কমলা রঙের শক্ত খাঁজকাটা খোলসটার ওপরে আমি দিব্যি শুয়ে পড়তে পারি হাত পা ছড়িয়ে। আর্গোসের বয়েস নাকি একশো বারো বছর। অন্তত সেরকমটাই ওর দাবি এবং ওর খর্বকায় ছুঁচোলো ল্যাজটা প্রমাণ করে যে বৃদ্ধ প্রাণীটা আসলে পুরুষ প্রজাতির।

‘জীবন অনিত্য—’ আর্গোস মাঝে মাঝেই বলে থাকে কথাটা। ও এরকমই। ভাবুক, দার্শনিক এবং প্রাজ্ঞ।

ঠিক শুনেছেন, আর্গোস কথা বলতে পারে। আমিও চমকে উঠেছিলাম প্রথমবার ওর ভারী ঘুমপাড়ানো কণ্ঠস্বর শুনে।

“ওহে ছোকরা, আমিই নিশ্চয় একমাত্র মিরাকল নয় এই গোটা মহাবিশ্বে!”

ও ধমকে উঠেছিল।

সে তো নয়ই। কত কিছুই তো হয় এই পৃথিবীতে। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। সূর্যদেশ থেকে সেই রাতে দাদুর নৌকোয় চেপে যখন আমরা পাড়ি দিলাম অকুল সমুদ্রে, চারদিকে তখন সর্বগ্রাসী ঝড় আর বৃষ্টি। বিশাল ঢেউগুলোর নিচেও গুমগুম শব্দের চমকানি। মাটি আর পাথরগুলোকে একটু একটু করে গিলে নিচ্ছিল চিরদিন আমাদের ঘিরে রাখা জলাভূমিগুলো। গ্রাম-গঞ্জ-শহর-দেশ-মহাদেশ গিলে নিয়ে খিদের আগুনে পুড়ছিল নীল জলরাশি। সেই মৃত্যুযজ্ঞের মধ্যেও তো আমরা চারটে প্রাণী বেঁচে গেছি? ছোট্ট দ্বীপটাকে আশ্রয় করে ঘর বেঁধেছি। মিরাকেল হয়। আমি তাই আর্গোসের কথা মেনে নিয়েছিলাম চুপচাপ।

কিন্তু আজ দুপুরে ও আসেনি। গতকালও না। তার আগের দিনও না।

আর্গোসের কিছু হল নাকি? বয়সটা তো আর কম নয় তার! একশো বারো—দাদু মারা গেছিলেন আশিতে। আর্গোস অবশ্য বয়েসের কথা উঠলেই বিরক্ত হয়। দুশোর আগে ওসব ভেবে লাভ নেই, তার মতে। কেমন নির্বিকার সবজান্তা কচ্ছপ বলুন তো? ওর সঙ্গে দু-চারটে মনের কথা ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিলে দিনটা কেমন ফুরফুরে লাগে। কিন্তু বিগত তিনটে দিন সে সুযোগ আমার কপালে জোটেনি।

কথা বলার সঙ্গী না পেয়ে তাই মন খারাপের লক্ষণগুলো প্রকট হয়ে পড়ছে। বাবা মা আর দাদুর কথা মনে পড়ছে। তাদের হাসি-কান্না-গল্প-ঠাট্টায় মুখর দিনগুলোর কথা ছবির মত ফুটে উঠছে মনের পাতায়। আর অকারণে চোখের কোণটা ভিজে যাচ্ছে।

আর লিখতে ভাল্লাগছে না। এখন একটু ‘অর্ধবৃত্ত দ্বীপের গাইডবুক’ খুলে বসি। লেখক—ব্রতীন সেন। আমার ঠাকুর্দা। আকৃতির জন্যই দাদু এই দ্বীপটার এরকম নাম রেখেছিলেন। এখানকার জলবায়ু, গাছপালা, প্রাণী সবকিছু সম্পর্কে টীকা-টিপ্পনী লিখে রেখে গেছেন তিনি। ওটাই আমার পাঠ্যবই অথবা সময় কাটাবার হাতিয়ার। বেঁচে থাকবারও বটে। বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়বো একসময়।

কিন্তু ও কীসের শব্দ হচ্ছে?

একটানা ঘ্যানঘ্যানে কান্নার মত সুর। যন্ত্রণা। মৃত্যু। অসহায় বিপন্নতা। অসহ্য!

এবার আমার শিরার মধ্যে দিয়ে হিমেল প্রবাহ বয়ে গেল আচমকা। কান্না থেমে গেছে। যেন কেউ চরম নৃশংসতায় গলা টিপে থামিয়ে দিয়েছে বিরক্তিকর শব্দটাকে। থামিয়ে দিয়েছে তার বাঁচার আকুতিকে। তার মানে, এই মুহূর্তে আমি নিরাপদ নই। কীভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম জানি না। তবুও এই মুহূর্তে তামার তার দুটোকে ছিন্ন করে আলো নেভাতে হবে। ছুরিটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে কার্যকারণ খুঁজতে।

কী হল এরপর, সেটা বেঁচে থাকলে আগামী কাল ডাইরিতে এন্ট্রি করতে পারবো আশা করি। শুভরাত্রি!

3rd April, 2088

আজ সকালে একটা আশ্চর্য ঘটনা চোখে পড়ল। এই দ্বীপে পা রাখা ইস্তক এরকম ব্যাপার স্যাপার দেখিনি কোনদিন। দাদু বলতেন, but there’s always a first time for everything...

দাদুর কথা মনে পড়তেই ‘অর্ধবৃত্ত দ্বীপের গাইডবুক’ খুলে বসে পড়েছিলাম। আর্টিকেল নম্বর ২৩৪২—এ এসে চোখ আটকে গেল।

“রক্ত কাঁকড়া: বিজ্ঞান সম্মত নাম—Gecarcoidea natalis, স্থলবাসী উভচরপ্রাণী।

বিবরণ: লোহিত বর্ণের আটপেয়ে কাঁকড়া বিশেষ। সাধারণত ডাঙায় বাস করলেও মিষ্টি জল অথবা সামুদ্রিক নোনা জলেও এরা সমানভাবে স্বচ্ছন্দ্য। নিকটবর্তী ‘সবুজ দ্বীপে’ এদের প্রচুর সংখ্যায় দেখতে পাওয়া যায়। বছরের বেশির ভাগ সময়ে নিষ্ক্রিয় থাকলেও বর্ষার কিছু আগে এরা দলবদ্ধ হয়ে সমুদ্রের দিকে যাত্রা করে, উদ্দেশ্য—সন্তান উৎপাদন।”

ব্যস, এইটুকুই। প্রশ্নের উত্তর মিলল। কিন্তু আর্টিকেলটা আরও দুটো প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল।

এক, কাঁকড়াগুলো প্রতিবছর এই দ্বীপের ওপর দিয়ে সমুদ্রে যাতায়াত করে না। অন্তত আমি দেখিনি যখন তখন বিগত চোদ্দ বছর ধরে ওরা এ পথ মাড়ায়নি। তাহলে হঠাৎ করে এই বছর তাদের অভ্যাস পাল্টালো কেন?

দুই, সবুজ দ্বীপ? আমাদের এই আধখাওয়া চাঁদের মত দেখতে দ্বীপটাই শুধু একমাত্র ভূখন্ড নয় এই সুবিশাল জলমগ্ন পৃথিবীতে, এটা না বোঝার মত বোকা আমি নই। কিন্তু একটা জঙ্গলি দ্বীপ আমার হাত বাড়ানোর দূরত্বে লুকিয়ে আছে, সেটা তো জানতামই না। আশ্চর্যভাবে দ্বীপটার কথা বাবা, মা বা দাদু কেউই আমাকে বলেনি। কেন?

প্রশ্নদুটোর সঙ্গে একটা ‘পর্যবেক্ষণ’ও জুটে গেছে বিলক্ষণ। সেটা হল, বর্ষা আসছে। লাল কাঁকড়াদের ব্যবহারই সে কথা জানাচ্ছে। ঘ্যানঘ্যানে প্যানপ্যানে কালো আকাশ, পিটপিট করে দিনরাত গাছের পাতায় বৃষ্টির গান। বিরক্তিকর। আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।

কথাটা বলতেই আর্গোস হেসে উঠেছিল।

“কুঁজোর আবার চিৎ হয়ে শোবার ইচ্ছে... স্বাধীনতা... এই জনমানবহীন পৃথিবীতে একলা মানুষের স্বাধীনতা... হুমম!”

আমি রেগে গিয়ে ওকে চিৎ করে শুইয়ে দিয়েছিলাম। শাস্তি দিতেই। বুড়ো রেগে কাই হয়ে সে কী শাপ শাপান্ত শুরু করল! চারদিকে অক্ষম হয়ে হাত পা ছুঁড়ে সে কী গজরানি!

“অলম্বুষ কোথাকার! গুরুজনের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় শেখনি! অশিক্ষিত, নিম্নমেধার জীব”, আরও কত কিছু।

আমি তাকে সাহায্য না করে গালে হাত দিয়ে ওর নিরুপায় অবস্থাটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলাম। অবশেষে বুড়ো নতি স্বীকার করল।

“সাহায্য চাই”, ভাববাচ্যে হার স্বীকার করে নিয়ে আর্গোস জুড়লো, “আমি ক্লান্ত।”

ওকে আবার উপুড় করে শুইয়ে দিতে বেশ খানিকটা পরিশ্রম করতে হল। নিজের পুরোনো অবস্থায় ফিরে গিয়ে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সামনের পা দুটোর ওপরে মাথা রেখে ব্যাজার মুখে বলল, “ইঁচড়ে পাকা ছেলে কোথাকার, অভদ্র…”

আমি তাকে আবার উল্টে দেব বলে বালি ছেড়ে উঠতেই আর্গোস মরিয়া হয়ে ধমকে উঠল, “আবার করলে ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। কী আশ্চর্য বন্ধুত্ব, আমি যে তিনদিন ধরে গায়েব ছিলাম তার কারণটা পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করার নাম নেই, অথচ...”

“বলে ফেল।”

“না বলব না।”

“না বললে...”

“হে ঈশ্বর!”

“ভদ্রলোককে ডেকে কিছু লাভ হয় কি? আগের বার অন্তত হয়নি।”

“দক্ষিণ দিকের খাড়িতে একটা চারপেয়ে প্রাণী দেখা গেছে.... লম্বায় তিন মানুষ, প্রস্থে দুহাত আর সঙ্গে একজোড়া করাতের মত লম্বা চোয়াল... নোনাজলের কুমির... আমার দেখা সব থেকে বড় আর হিংস্র...”

আর্গোসের বর্ণনা যদি সত্যি হয় তাহলে গতকাল রাতের ভয়ানক চিৎকারের একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অস্বস্তিকর ব্যাপার হল, প্রাণীটা যদি আমাদের এই দ্বীপে যখন তখন হামলা করে বসে তাহলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বিলক্ষণ। ওরা মাংসাশী, তার ওপর প্রচণ্ড হিংস্র। অসাবধানতায় আমিও ওর খপ্পরে পড়তে পারি যে কোনদিন। আর যদি পড়ি...

“যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু”, আর্গোস আমার মনের কথা সম্পূর্ণ করে যোগ করে, “আমার একদম পছন্দ নয়। তাই একটু গা ঢাকা দিতে হয়েছিল আর কী।”

“এই কুমিরটা এখানেই বা এসে পৌঁছল কী করে?”

“সবুজ দ্বীপ থেকে এখানকার দূরত্ব আধবেলার হবে”, একটা ছোট্ট হাই তুলে আর্গোস তার বক্তব্য শেষ করে, “ওখানকার মিষ্টি জলে এককালে কিছু কুমির দেখেছি বটে... দু একটা সেখান থেকে দলছুট হয়ে এখানে এসে পৌঁছনোটা অসম্ভব ব্যাপার নয়...”

আবার সবুজ দ্বীপ!

“আমার পুরোনো আস্তানা”, আর্গোস ঘোষণা করে।

“তা ওখানেই তো থাকতে পারতে, এখানে এসে জুটলে কী জন্য শুনি?”

“তোমার রাজত্বে একজন বুদ্ধিমান মন্ত্রীর যদি দরকার হয়, সে কথা ভেবেই আসা”, বুড়ো এবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, তারপর আরেকটা অলস হাই তুলে জানান দেয়, “খিদে পাচ্ছে।”

মিটমিটে শয়তান। খিদে পেলেও দু’পা এগিয়ে খাবার খোঁজার কষ্টটুকু করার ইচ্ছে নেই। অলস কোথাকার! অগত্যা একমুঠো ঘাস ছিঁড়ে আর্গোসের মুখের সামনে তুলে ধরি।

“ঘাস? তাও যদি একটু কচি আর সরেস হত! ছোঁড়া ভুলে যেও না আমি কচ্ছপ, ঘোড়া নই। তাও আবার যে সে কচ্ছপ নয়, একেবারে কথা বলা কচ্ছপ।”

ওর মুখে ঘাসগুলোকে গুঁজে দিয়ে আমি ভাবতে বসলাম।

ভাবনার বেশির ভাগ জুড়ে রইল অদেখা কুমিরটার কাল্পনিক ছবি।

কবে কীভাবে জন্তুটার সঙ্গে মুলাকাত হতে পারে? কেমন করে ভয়ানক সরীসৃপটাকে তাড়িয়ে আমার রাজত্বকে নিরাপদ করতে পারি? কোন উপায়ে প্রাণীটার করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে পারি অর্ধবৃত্ত দ্বীপের নিরীহ প্রাণীগুলোকে? তাড়িয়ে দেওয়া ভালো নাকি একদম নিকেশ করে দেব? দ্বিধাদ্বন্দ্বে জেরবার হয়ে যখন একটা উপায় খুঁজছি ঠিক তখনই আর্গোস মুখ খুলল।

“কী বিরক্তিকর অলস দুপুর।” বিচ্ছিরি শব্দে তৃতীয়বার হাই তুলে কথা বলা কচ্ছপটা চোখ বন্ধ করল।

“আমার সঙ্গে যাবে?”

“উত্তর নির্ভর করে গন্তব্যের উপর।”

“সবুজ দ্বীপে।”

“অনেকটা দূর, রাতের আগে ফিরতে পারবো না।”

“খুব দরকারি কিছু কাজ আছে নাকি তোমার?” ব্যঙ্গ করলাম।

“নাহ”, চোখ পিটপিট করে বুড়ো কচ্ছপটা যেন একটু ভাবলো, তারপর হঠাৎ আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াল, “যাক, আজ বিকেলটা না হয় একটু রোমাঞ্চকর হোক।”

“এই তো চাই!” আমি চিৎকার করে উৎসাহ দিতেই আর্গোস গুটি গুটি পায়ে হাঁটা লাগালো সমুদ্রের দিকে। আমিও লোনা জলে ছপাৎ ছপাৎ করে পা ফেলে উঠে দাঁড়ালাম কচ্ছপটার পিঠে।

মোটা পাখনাগুলো দাঁড়ের মত দুপাশে চালিয়ে আর্গোস জল কেটে যাত্রা শুরু করল। মৃদু মন্থর গতি। ভারহীন ভাসমানতা।

“তোমার ওজন বাড়ছে কিন্তু”, বুড়ো অনুযোগ করলে আমিও ঠাট্টা করলাম, “আরেকটু জোরে সাঁতরাতে পারো না আর্গোস?”

“শয়তান কোথাকার! নিম্নমেধার প্রাণী।”

ঢেউয়ের শব্দ আর আমার হাসি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

বেশ ঘুম পাচ্ছে। শরীর ক্লান্ত।

সবুজ দ্বীপে কীভাবে পৌঁছলাম? কী দেখলাম সেখানে? সেটা লিখবো আগামী কাল। ঘুম থেকে উঠতে হবে খুব সকালে, অনেক কাজ বাকি কিনা। তাই এবার ছুটি নিতে হবে। শুভরাত্রি!

5th April, 2088

(গতকাল খুব ক্লান্ত ছিলাম—তাই একদিনের বিরতি)

ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে। স্বচ্ছ নীলের চাদরটুকুকে উজ্জ্বল আলোয় ভাসিয়ে সে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সমুদ্রের অতল গভীরে তার প্রবেশ নিষেধ। সেখানে অন্ধকারের রাজত্ব। উপরিভাগের ওই ঝকঝকে জলের পরতটাকে চিরে আমি আর আর্গোস চলেছিলাম।

সমুদ্রতলের ওই আলো ঘেরা স্তরটাকে বলে “সানলাইট জোন”।

সূর্যের ছোঁয়া আছে বলেই জল উষ্ণ, ঠিক তার কয়েক ফুট নীচে অন্ধকারের রাজত্বে অবশ্য ঠিক তখনই তুষারের শৈত্য।

সে যাই হোক, নির্ভার জলের চাদর কেটে আমরা দুজনে বেশ পাড়ি জমিয়েছিলাম অজানা দ্বীপের উদ্দেশে। কেন, সেটা ঠিক জানি না। শুধুই কৌতূহল? নাকি আমার প্রিয়জনেরা যে দ্বীপখানা এককালে আবিষ্কার করেছিল সে দ্বীপে নিজের পায়ের চিহ্ন রেখে আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম আমিও তাদেরই একজন? নিজের পায়ের চিহ্ন দেখতে যাচ্ছিলাম নাকি বাপ মায়ের পায়ের চিহ্ন খুঁজতে চাইছিলাম? সত্যি বলতে কী, এত কিছু তখন ভাবিইনি।

আমি তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে একদল সাদা পাখির উড়ে যাওয়া লক্ষ করছিলাম মনোযোগ দিয়ে। যতই এগোচ্ছি, ওদের সংখ্যা বাড়ছে। ঘন হলুদ রঙের লম্বা ঠোঁট, ডানার নিচের দিকে কালো রঙের দীর্ঘ টান। ‘পেলিক্যান’ পাখি। আমি নিশ্চিত। ওদের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে পড়েছিলাম এতটাই যে খেয়াল করতে পারিনি কখন জলের তাপ বেড়ে গেছে অনেকটাই। রোদের ঝাঁঝ, জলীয়বাষ্পের উর্দ্ধগামী প্রবাহ এসব যখন টের পেলাম তখন হঠাৎ আর্গোস জলের তোড় সামলে মুখ উঁচু করে বলল, “বৃষ্টি নামবে।”

—“অনেক আগেই জানি, তোমাকে আর বচন ঝাড়তে হবে না।”

—“তোমার অজ্ঞতা আমাকে এখন আর অবাক করে না। অবশ্য বোকামি ঢেকে রাখার অভিনয়টা দেখে ঘৃণা হয়।”

—“তোমার প্রাগৌতিহাসিক জরাজীর্ণ ডানাগুলোকে যদি একটু জোরে চালাও আর জ্ঞান দেওয়ার মানসিকতা ত্যাগ কর তাহলে আমরা বিকেলের আগেই ওখানে পৌঁছবো, তাই না?”

—“স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ কোথাকার!”

আর্গোস আমাকে ধমকে আবার জলের তলায় মুখ লোকায়।

একটা। দুটো। তিনটে। চারটে...

কখন যেন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অঙ্কের সংখ্যা থেকে অগুন্তিতে পৌঁছে গেল বুঝলাম না। জল, জল, জল। অথৈ নিরাকার জল।

—“সুবিধের ঠেকছে না হে।”

আবার আর্গোসের সাবধানবাণী। ওর স্বভাবসিদ্ধ অলস ভারী স্বরে নয়। বৃষ্টির কলরব আর ঢেউয়ের কলরোল ছাপিয়ে আমার কান অব্দি ওর বার্তা পৌঁছে দিতে বেশ খানিকটা জোরে এবং তীক্ষ্ণস্বরে চিৎকার করছে বুড়ো কচ্ছপটা। জলের বুক থেকে আকাশ অব্দি উঠে যাওয়া বাতাস আর বৃষ্টির ধূসর স্তম্ভটা তখন আমার চোখে পড়ছে। টর্নেডো।

—“ভয় পেলে নাকি?”

—“হুহ, ওরকম কত টর্নেডো দেখলুম এ জীবনে।”

আর্গোস প্রাণপনে ডানা ঝাপ্টায়। আমি হাঁটু মুড়ে বসে পড়ি, আর্গোসের শক্ত কমলা রঙের খোলটাকে আঁকড়ে ধরি। ওদিকে তখন একটা বিদ্যুতের চমক আকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে নেমে এল সর্পিল গতিতে।

—“কানের পর্দা ফেঁটে গেল। ধন্যবাদ বন্ধু, আমাকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে এই বিপদে টেনে আনার জন্য।”

—“তুমি বড্ড বেশি কথা বলছ।”

—“বলছি... কারণ... আমার বেশ ভয় করছে।”

—“আমারও।”

—“এত ভয় হচ্ছে যে, সকাল থেকে যা কিছু খেয়েছি সব বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছে!”

—“না, তোমাকে আর অনর্থক সমুদ্র দূষণ করতে হবে না।”

—“মুখ সামলে কথা বল, গুরুজনদের সঙ্গে কীভাবে...”

একটা দমকা ঢেউ। আর্গোস তার তোড়ে পাল্টি খেয়ে গেল হঠাৎ। আমিও জলের মধ্যে ছিটকে পড়লাম অগত্যা। হাবুডুবু খেতে খেতে আমি চেয়ে দেখছিলাম দূর দিগন্তে মেঘের ঘন কালো প্রেক্ষাপটে ভয়ানক কোন সরীসৃপের ল্যাজের মত কিলবিল করছে অজস্র জলস্তম্ভ। তারা নড়ছে, সরছে, ভাঙছে, গড়ছে। দূরে সরে যাচ্ছে।

তারপর আরেকটা ঢেউ। বোধহয় আরেকটা জলস্তম্ভ। দুর্দান্ত ঘূর্ণিতে সে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে হারিয়ে গেল সমুদ্রের বুকে।

কতক্ষণ যে ওই ঝড়জলের মধ্যে কয়েদ ছিলাম তা জানি না কিন্তু যখন ছাড়া পেলাম তখন আমি শূন্যে ভাসছি রীতিমত। আমার সঙ্গে একঝাঁক মাছও ছিটকে পড়ল সমুদ্রের মধ্যে, তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে তরতরিয়ে তারা পথ ধরল বাড়ি ফেরার। আমি, ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে জল থেকে দূরে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হলাম। আর তখনই বুঝলাম...পায়ের নিচে শক্ত পাথরের অনুভূতি।

তার মানে আমি ডাঙার খুব কাছেই আছি।

ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে চোখের ওপর হাঁটুর তালু ধরে পলাতক টর্নেডোগুলোকে দেখার চেষ্টা করি। তারপর মাথা ঘুরিয়ে পিছন দিকটা দেখতেই বিস্ময়ে বোবা হয়ে যাই আমি।

পাইন গাছের বড় বড় চূড়াগুলো যেন আকাশটাকে ছুঁতে চাইছে। মোটা মোটা গুঁড়িগুলো সেই কবে থেকে যেন মাটির মধ্যে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কারও অপেক্ষায়। মেঘ কেটে আলতো দিনের আলো জেগে উঠেছে যদিও কিন্তু তবুও এই জঙ্গুলে ভূখণ্ডে এখনও অন্ধকারের আবরণ। কোথাও দূর থেকে একটা পাখির ডাক শুনে শরীরটা আরও বেশি আড়ষ্ট হয়ে পড়ল।

আচ্ছা, তবুও আমি নিরাপদ। কিন্তু আর্গোস?

কথাটা মনে পড়তেই বুকের ধুকপুকানি পাঁজর ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইল যেন। সে আমার বন্ধু। যতই তাকে নিয়ে ঠাট্টা করি না কেন, সেই আমার একমাত্র সঙ্গী। তাকে হারিয়ে আমি এই বিশাল জলজ দুনিয়ায় বাঁচি কীভাবে?

আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে বেশ কিছুক্ষণ বালিয়াড়িতে দাপাদাপি করলাম। আর্গোসের নাম ধরে ডাকলাম। কিন্তু ভূতুড়ে নিস্তব্ধ প্রকৃতি সেই ডাক ফিরিয়ে দিল আমারই কাছে, আমি হতাশ হয়ে বালিতে হাঁটু মুড়ে চোখের জল ফেললাম অগত্যা।

হতাশা একসময় কেটে যায়। আর্গোসকে ছেড়ে নিশ্চয়ই ঘরে ফিরতে পারবো না আমি। তাই এই মুহূর্তে দরকার রাতে মাথা গোঁজার একটা আস্তানা আর খাবার। দ্বিতীয়টা বেশি জরুরি।

কোমরে লতায় বাঁধা চামড়ার থলেটা এতকিছুর মধ্যেও ঠিক আছে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। ছুরি বের করে আরেকবার জঙ্গলটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলাম, মনের ভয় চেপে দৃঢ় পায়ে হাঁটা লাগলাম সবুজ ছায়াঘেরা বনপথে।

“...বল বীর... বল উন্নত মম শির!.... শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর....”

মায়ের কাছে শেখা কবিতাটা আমি কাঁপা কাঁপা গলায় আবৃত্তি করতে থাকি। সবুজের ঘেরাটোপ থেকে বয়ে আসা পাতলা কুয়াশার চাদরটাকে হাওয়ায় ছুরি চালিয়ে ছিন্নভিন্ন করতে করতে এগিয়ে যাই। আবার বনানী কাঁপিয়ে একলা পাখিটা আর্তনাদ করে ওঠে। আমার বীরত্ব চুপসে যায়। চুপ করে হাওয়ার গোমরানি কান খাঁড়া করে শুনি।

সাহসে বুক বেঁধে আবার কবির স্মরণাপন্ন হই।

“..আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস.... মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!....আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর..আমি দুর্বার.......আমি ভেঙে করি সব চুরমার...আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল......আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল...আমি মানি না কো কোন আইন....আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন...আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর....আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী—সুত বিশ্ব-বিধাতৃর....বল বীর ....চির-উন্নত মম শির—”

কবিতার দ্বিতীয় প্যারাটা শেষ করতে গিয়ে বুঝলাম সামনে যা দেখছি তাতে পরের অংশটা ভুলে গেছি বিলকুল।

রুগ্ন শুকনো দোমড়ানো মোচড়ানো কান্ড নিয়ে অজস্র ন্যাড়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে ঘন হয়ে। যেন ভয়ে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে তারা পরস্পরের গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, কানাকানি করছে একে অপরের সঙ্গে। যেখানে তাদের শিকড় মাটির নিচে আশ্রয় নিয়েছে সেখানে অনেকখানি জুড়ে উজ্জ্বল লাল রঙের আভা। রক্ত নাকি?

হাঁটু মুড়ে মাথা নিচু করে লালচে মাটির ওপর চোখ বোলাই। নখ দিয়ে এক চিমটে মাটি খুঁচিয়ে হাতের তেলোয় সেটাকে নেড়েচেড়ে দেখি। ভয় কেটে যায়। ‘এলগি’। সোজা বাংলায় শ্যাওলা। লালা রঙের। ওদের দৌরাত্মে মাটি শুকিয়ে গেছে, জল হাওয়ার পথ বন্ধ করে ওরা মাটির মধ্যে থেকে শুষে নিয়েছে প্রাণশক্তি। তাই গাছগুলোও দেহ রেখেছে অবধারিতভাবে। আমি আবার গলা ছেড়ে কবিতা আওড়াতে শুরু করলাম।

কতক্ষণ কবিতা আর গান গেয়ে কেটেছিল জানি না, তবে অবশেষে মোটা মোটা পাতার গাছটা দেখেই মনটা খুশিতে লম্ফঝম্প করে উঠলো। মাটির খুব কাছেই ঝুলছে সবুজ রোঁয়া ওঠা গাম্বাট ফল। কাঁঠাল। ছুরি দিয়ে ওর ছাল ছাড়িয়ে নিলেই সারিবদ্ধ হালকা হলদে রঙের মিষ্টি শাঁস। তার মধ্যে অজস্র বীজ। আমাদের অর্ধবৃত্ত দ্বীপেও এরকম একটা গাছ ছিল বটে একসময়। বছর তিনেক আগেকার এক ঝোড়ো রাতে বজ্রপাতে শুকিয়ে গেছে গাছটা। এখনও কাঠের চালাঘরটার পাশে তার কঙ্কালসার চেহারাটা রোজ দেখি আমি।

কব্জি ডুবিয়ে কাঁঠাল খেতে খেতে একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। যখন গাছটা বেঁচে ছিল তখন তার কয়েকটা ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেই তো আরও অনেকগুলো গাছ পেতাম। তাহলে তো বজ্রপাতকে লবডঙ্কা দেখিয়ে আমি সমস্ত গরমকালটা এমনি করে সুস্বাদু ফল খেতে পেতাম, তাই না? আমি জিনিয়াস। অনেক দেরি হয়েছে ভাবতে, গাছটা আর বেঁচে নেই এখন।

সে যাকগে, এখন খুঁজতে হবে রাতের আশ্রয় এবং সেই সঙ্গে ঘরে ফেরার উপায়। ঘরে ফিরতে হবে, কিন্তু পথটা চিনি না এবং এবার আমার সঙ্গে আর্গোস থাকবে না আর। কথাটা ভাবতেই বুকের মধ্যেটা কেমন মুচড়ে উঠলো। অনেকখানি পথ পেরিয়ে শেষ অব্দি এসে পৌঁছলাম একখানা কালো পাইনের বনে। মোটা গাছের গুঁড়িগুলো সব সবুজ শ্যাওলায় ঢাকা। মাটিতে ঘন বেগুনি রঙের নাম না জানা ফুলের ঝোপ। আমি নিশ্চিত অর্ধবৃত্ত দ্বীপেও এরকম বুনো ফুল আমি দেখেছি। ওদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যখন মাথা তুললাম দেখলাম একফালি নির্মেঘ আকাশ। তার নিচেই একখানা বৃত্তাকার জলাশয়। বৃষ্টির জল জমে তৈরী হয়েছে মিষ্টি দিঘিটা। মন খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে উঠলো। পিচ্ছিল মাটি আর পাথরের ধাপ পেরিয়ে একছুটে নেমে গেলাম সেখানে, আঁজলা ভরে জল খেলাম পাগলের মত। মুখ মুছতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল একটা গাছের গুঁড়ির দিকে। শ্যাওলা আর লতাগাছের আড়ালে একটা খড়িমাটির দাগ দেখতে পাচ্ছি যেন? খড়িমাটির ওই দাগটা বোঝাচ্ছে মানুষের অস্তিত্বের কথা। কিন্তু কাউকেই তো দেখলাম না এখনও!

ঝটপট ধাপগুলো পেরিয়ে গাছটার কাছে পৌঁছলাম। লতানে গাছগুলোকে দুহাতে মরিয়া হয়ে সরিয়ে হঠাৎ থেমে গেলাম আমি। শরীরে যেন রক্ত নেই আর। হাত আর পায়ের পেশিগুলো শিথিল হয়ে গেল, বুঝতে পারলাম বেশ কয়েকটা হৃদস্পন্দন হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে খড়িমাটিতে আঁকা চিত্রটাকে হাতের ডগায় স্পর্শ করার চেষ্টা করি। তারপরেই মাটিতে বসে পড়ে মনের কপাট খুলে কাঁদতে থাকি।

‘গোরা’।

চিত্র নয়। শব্দ। একটাই। আমার নাম। আমার পরিচয়।

ঘর থেকে এতদূরে এসেও আমার ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছ থেকে বেশি দূরে যেতে পারিনি।

আমি আবার দীঘির কালো জলে পা ডুবিয়ে বসি। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাই।

বাবা এবং মা কেন এসেছিল এই পরিত্যক্ত ভূখণ্ডে? সব উপকরণই তো মজুত আছে আমাদের ছোট্ট চন্দ্রকোনা দ্বীপে, তাহলে কি এমন অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে আছে এই দ্বীপের মাটিতে? নিছক কৌতূহল নাকি প্রয়োজন? হয়ত বা প্রতিবেশীর খোঁজ?

আচ্ছা কেন মা আমার নামটা এখানে লিখে গেছে? মা কি জানত, আমি একদিন এইখানে এসে এমনটি করে খুঁজে পাব তার আসার হদিশ? হয়ত আমি যেখানে বসে আছি এখানে সেদিন তারাও এসে বসেছিল। বাবার কাঁধে মাথা রেখে হয়ত মা আমাদের জীবনপাটের গল্পে মেতেছিল বাবার সঙ্গে? হয়ত এই প্রাগৌতিহাসিক গাছগুলো সেদিন তাদের খুনসুঁটি শুনছিলো গোপনে। আজ যেমন ওরা কান পেতে শুনছে আমার পায়ের শব্দ। হয়ত....হয়ত....

—”পা সরিয়ে নাও—এক্ষুনি।”

চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল সহসা। গলাটা আমার খুব চেনা। আর্গোস।

কিন্তু কোথায় সে? আমি মাথা ঘুরিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করি।

—“বোকা কোথাকার! এক্ষুনি ওপরে উঠে এস...”

ভয়ে ভয়ে পা দুটো জল থেকে সরিয়ে নিতেই একজোড়া পেল্লাই চোয়ালের ঝাপ্টানি হাওয়ায় ‘খটাস’ শব্দ তুলে জলে মিলিয়ে গেল। জলজ প্রাণীটা যখন কালো জলের আড়ালে তার দ্বিতীয় আক্রমণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে তখনি তরতর করে শ্যাওলাঢাকা পাথরের ধাপ পেরিয়ে আমি উপরের দিকে ছুট লাগলাম।

ভাগ্য বিরূপ, প্রায় শেষ ধাপে পা রাখতেই টের পেলাম আমি শূন্যে ভাসছি। তারপর পিচ্ছিল পথে নিচের দিকে পতন।

—“তাড়াতাড়ি কর...হে ঈশ্বর!”

আর্গোসের মরিয়া চিৎকার শুনে আমি হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে নিজেকে তুলে ধরি মাটির ওপর। এবার আর ভুল হয়নি, মেপে মেপে পা ফেলে পৌঁছে গেলাম শেষ ধাপে। হাঁপাতে হাঁপাতে পিছন ঘুরে দেখলাম....

কয়েকটা সরীসৃপের শরীর। বিশাল হাঁ, লম্বা ল্যাজ আর পাথরে কোঁদা শরীরে সবুজ ছোপ। কুমির। অনেকগুলো। আপাতত তারা শিকার হাতছাড়া হবার দুঃখে বিষণ্ণ চোখে আমাকে দেখছে।

—“উফঃ বাঁচলাম!”

—“তবুও ধন্যবাদ জানাবার কোনও চেষ্টা নেই। স্বার্থপর!”

—“ধন্যবাদ জানাতে গেলে আগে তোমাকে দেখতে পাওয়া দরকার।”

—“এই তো আমি।”

পাশের পাথরটা যেন নড়ে উঠলো এবার।

—“যাচ্চলে, তোমার ওই বাহারি কমলা রঙের খোলস কোথায় গেল?”

—“এক, অন্ধকার নামছে। দুই, আমার গোটা শরীরে কাদা মাটির প্রলেপ পড়েছে।”

আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওর নোংরা দুর্গন্ধময় খোলসটাকেই জড়িয়ে ধরি। স্বজন ফিরে পাবার সুখ নতুন করে উপলব্ধি করে আমি তখন উন্মাদপ্রায়।

—“গোরা, আমার বয়েস একশো বারো। কীভাবে বেঁচে থাকতে হয় সেটা আমার থেকে ভালো কেউ জানে না, বুঝলে?”

বুড়োর গলাটা কি একটুখানি দাদুর মত শোনালো? আমি হাসিকান্নার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ি।

—“এবার কাজের কথায় আসি?”

—“এস।”

—“এখান থেকে কয়েক পা এগোলেই ঝাউবন, সেটার ওপাশেই আমি চিৎপাত হয়ে পড়েছিলাম অলপ্পয়ে ঝড়ের দৌলতে। দিনভর চেষ্টা করে যখন নিজেকে উল্টোতে পারলাম তখন দেখলাম...”

—“কী দেখলে?”

—“বলব না, দেখাব।”

—“দেখাও।”

—“আমায় অনুসরণ কর।”

আমি বুড়োর নির্দেশ মেনে পথ চলতে শুরু করলাম।

—“আরে মোলো যা, এত হুড়োহুড়ির কী আছে!”

—“মনে রেখ আমি গল্পের খরগোশ না। তাই একটু জোরে জোরে পা ফেল বুড়ো।”

—“অসভ্য অকৃতজ্ঞ দুপেয়ে জীব!”

গজগজ করতে করতে আর্গোস আমার পিছন পিছন চলতে থাকে গন্তব্যের দিকে। ঢালু পথ বেয়ে নিচের দিকে নেমেই চক্ষু চড়কগাছ। বালিয়াড়িতে কাত হয়ে পড়ে আছে একখানা মরচে পড়া জরাজীর্ণ জাহাজ। আকৃতিতে খুব বড় না হলেও, তাকে কেন্দ্র করে যে বন জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে তার আয়তন কম নয় মোটেই।

‘এম ভি লুইসিয়ানা’

লেখাগুলো লোনা জলের ঝাপ্টায় আগের রূপ হারিয়েছে।

—“গন্ধ পাচ্ছ?”

—“হ্যাঁ, বুনো ঝোপঝাড়ের।”

—“ভুল হল, গন্ধটা তেলের।”

—“তেল? কী তেল?”

—“তোমাদের যন্ত্রপাতি চলে যেসব তেলে। মূর্খ কোথাকার!”

আর্গোসের তিরিক্ষি মেজাজে আমি সম্বিৎ ফিরে পাই। একটু একটু করে পরিত্যক্ত জাহাজের কাছে এসে দাঁড়াতেই গন্ধটা পেলাম। ক্ষীণ ঝাঁঝ। চেনা তরল। গন্ধের গতিপথ ধরে ধারালো লোহার ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে যখন তার গভীরে ঢুকলাম, টের পেলাম মাথাটা চড়ায় ঠেকিয়ে জাহাজের বাকিটা ডুবে আছে অগভীর সমুদ্রে। গন্ধটা আসছে ওই নিমজ্জিত অংশ থেকে। আমি ছুরিটাকে বের করে দাঁতের ফাঁকে চেপে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বুড়বুড়ি কেটে একটু একটু করে খুঁজে দেখলাম তার কক্ষগুলো। বাতাসের সন্ধানে ক্ষণিকের জন্য জলতলে পৌঁছে আবার ঝাঁপ দিলাম অভ্যন্তরে। তৃতীয়বারের চেষ্টায় দেখতে পেলাম একজোড়া লোহার সিলিন্ডার, সামুদ্রিক শ্যাওলায় আগাগোড়া মোড়া তাদের শরীর। তীব্র খনিজ তেলের দমবন্ধ করা গন্ধে শরীর গুলিয়ে উঠলেও চারদিকে চোখ ফেরালাম। যা খুঁজছিলাম তা পেয়েও গেলাম। অজস্র এলুমিনিয়ামের জারিকেন। দ্রুত গতিপথ পাল্টে মুখঢাকা দুটো জারিকেন নিয়ে উঠে পড়লাম বালিয়াড়িতে। আর তখনি বুঝলাম ওরা খালি নয়। ওদের পেটের মধ্যে আছে লালচে তরল। ঢাকনা খুলে দিতেই ঝাঁঝটা নাকে এসে ধাক্কা মারলো।

ডিজেল।

বেশিরভাগ জাহাজ চলে গ্যাসোলিন কিংবা এল এস এফ (Low Sulfur Fuel ) এর দৌলতে...মাঝারি বা ছোটখাটো নৌযান চলে ডিজেলে...এই অর্ধনিমজ্জিত জাহাজটাও সেরকমই একটা ডিজেল চালিত নৌযান...লোহার সিলিণ্ডারেও আছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি.. সেই সঙ্গে আছে এরকমই ছোট ছোট জারিকেন ভর্তি আরও জ্বালানি...বাবা এবং মা-ও কোনভাবে পেয়েছিল এর খোঁজ...এখান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করেই তারা...

হিসেবটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় দিব্যি। তাদের পথ ধরেই এই অমূল্য জ্বালানি এসে পৌঁছেছে আমার হাতে। এবার তবে আমার এই দ্বীপে আসার অমোঘ আকর্ষণটা একটা কার্যকারণের রূপ নিল।

—“রাত নামছে কিন্তু।”

আর্গোস ফিসফিস করে ওঠে।

—“চল ফেরা যাক।”

ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে আর্গোস আবার খেঁকিয়ে ওঠে।

—“ওহ, দুটো জারিকেনের এত্ত ওজন কেন?”

—“তাড়াতাড়ি চল, এর পরের বারে আর তোমাকে ভার বইতে হবে না।”

—“মানে? আমার ছুটি?”

—“প্রায় সেরকমই।”

—“অকৃতজ্ঞ কোথাকার!”

আমাদের কথোপকথন সমুদ্রের গর্জনে ডুবে যায়।

সমুদ্র শান্ত। সৌভাগ্যবশত। শান্ত জলের মধ্যে সাঁতরে চলেছে আর্গোস। আমি তার খোলের ওপর বসে আছি ভারী জারিকেনদুটোকে হাতে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই বুড়ো প্রাণীটার গতি আরও শ্লথ হয়ে পড়েছে। ক্লান্তি আর অবসাদে আমার অবস্থাও তথৈবচ। কেমন যেন চোখ দুটো জড়িয়ে আসছে তন্দ্রায়। অনেক কষ্টে লুটের জিনিস আগলে রেখেছি ভবিষ্যতের কথা ভেবে।

—“বেঁচে আছো?”

—“এরকম গতিতে চললে নিশ্চয় আর বেশিক্ষণের জন্য নয়!”

—“একটা জিনিস দেখবে?”

—“আমি এখন ঘরে পৌঁছতে চাই, অনেক কাজ বাকি।”

—“ধুস, বেরসিক ছোকরা!”

—“আচ্ছা, ঠিক আছে দেখি তুমি এমন কী জাদু দেখাতে চলেছ এই নিশুত রাত্তিরে।”

—“রোসা।”

আমি টের পেলাম গতিপথ পাল্টে ফেলেছে আর্গোস। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকার আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাই। কত শত নক্ষত্র। মিটমিট পিটপিট করে জ্বলছে তারারা। তাদের কোনটা জ্বলছে-নিবছে আবার কোনটা স্থির দৃষ্টিতে আমাদের পাগলামি দেখছে গম্ভীর মুখে।

—“ওই দেখ।”

আর্গোসের নির্দেশে আকাশ থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে দৃষ্টিপাত করি। এমন কিছুই নজরে আসে না যার জন্য আর্গোসের গলায় এমন বাধঁনছেড়া ঔৎসুক্য লক্ষ করেছিলাম।

—“হ্যাঁ, অন্ধকার সমুদ্র। এটাই বিগত কয়েক ঘন্টা ধরে দেখে আসছি আমি। ধন্যবাদ, তোমার!”

—“চুপ, চুপ, চুপ।”

আমি কথা বলা বন্ধ করে অপেক্ষা করি আর্গোসের পরবর্তী নির্দেশের জন্য। মনের মধ্যে একটা দমবন্ধ উত্তেজনা গুমরে উঠছে, অকারণেই।

—“লক্ষ্মী ছেলে, এবার আঙুলটাকে আস্তে করে জলে ছোঁয়াও দেখি।”

আমি ভয়ে ভয়ে নির্দেশ পালন করি। বুঝতে পারি বুড়ো কচ্ছপটা সম্পূর্ণ স্থানুর মত জলের ওপর ভেসে আছে। এদিকে আমার অঙ্গুলি হেলন বৃথা গেছে। কোনরকম অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি।

—“আ মোলো যা, আঙুলে কি জোর নেই নাকি! আরও জোরে, গোরা!”

খিঁচুনি খেয়ে আমি প্রাণপনে হাতের তেলোটা নাড়াতে থাকি। ছপাৎ-ছপাৎ-ছপাৎ—

আর তখনই ঘটলো ঘটনাটা।

একটা... দুটো... তিনটে... চারটে। অসংখ্য। আলো জ্বলে উঠলো মহাসমুদ্রের অন্ধকার অতলান্তে। নীলচে দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ল জলতলের অনেকটা বিস্তৃতি জুড়ে। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আরও জোরে হাত নাড়াতে থাকলাম। একটা উন্মাদনা তখন আমায় পেয়ে বসেছে। হাতের ধাক্কায় আরও আরও নক্ষত্র জ্বলে উঠছে জলের নীচে আর আমি পাগলের মত হেসে চলেছি।

—“কেমন লাগলো? কেমন চমকে দিলাম বল?”

—’বায়োলুমিনিসেন্ট স্টারফিশ’.... জলের মধ্যে সামান্য নড়াচড়ায় ওদের শরীর থেকে নিঃসৃত হয় উজ্জ্বল আলো যা কিনা আক্রমকারী শিকারিকে বিভ্রান্ত করতে পারে অথবা চমকে দিতে পারে। পুরো ব্যাপারটা জোনাকিদের মত।

—“বাব্বা, কত জ্ঞান! বলি এসব জানলে কীভাবে?”

—“দাদুর বইটা, ওতেই আছে এসব। তবে আজ প্রথম দেখলাম এমন তারার আলো সমুদ্রের পেটে।”

—“কী সুন্দর না?”

আমি ভাষা খুঁজে পাই না। আকাশ আর নীলচে আলোয় জ্বলে ওঠা এই সমুদ্র আমাকে আশ্চর্য মুগ্ধতায় মূক বানিয়ে ছেড়েছে। আমি শুধু নিষ্পলকভাবে তাকিয়ে থাকি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত জলজ তারাদের নগরীটার দিকে।

আর্গোস চলতে শুরু করেছে আবার। ওর গতিপথে নরম দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছে প্রাণীগুলো। আমরা ঘরে ফিরছি।

—”আর্গোস, শুধু কি ওদের নীল রংই হয়?”

“উহু, যত রং চাও সব পাবে।”

“হলদে?”

“না, ওটা পাবে না...তবে সবুজ পাবে, লাল পাবে।”

“কোথায় দেখতে পাবো ওদের?”

“আমাকে বললেই হবে....নিয়ে যাব।”

“কবে? কবে?”

একটার পর একটা জিজ্ঞাসা নিয়ে আমি বৃদ্ধ প্রাণীটাকে ব্যতিবস্ত করে তুলি। আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কিন্তু আর্গোস বিরক্ত হয় না আজ।

ক্লান্তি কেটে গিয়ে তখন জানার আগ্রহে আমি সতেজ হয়ে উঠেছি আবার।

এভাবেই একসময় পৌঁছে গেলাম আমাদের দ্বীপে। রাত তখন গভীর।

—“এবার রেহাই দাও বাপু, ঘাড়খানা মনে হচ্ছে আর আস্ত নেই!”

—“তোমার ঘাড় আছে? জানতাম না তো?”

—“অভদ্র ঠাট্টা!”

আমি হেসে বিদায় দিই আর্গোসকে। হাতে জারিকেন ঝুলিয়ে আমি ভিজে বালিয়াড়ি পেরিয়ে প্রাসাদের দিকে পা ফেলি। আমার বাহন তখন ঢেউয়ের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছে। কোথায় থাকে ও? জিজ্ঞাসা করিনি কোনদিন।

মাটির পথটা শেষ হতেই নজর গেল কিছু দূরেই অন্ধকার ফুঁড়ে জেগে থাকা মূর্তিগুলোর দিকে। দাঁড়িয়ে পড়ি। গন্তব্য পাল্টে যায়। পায়ে পায়ে ঘাসে ঢাকা প্রান্তরটায় এসে দাঁড়াই। এখন থেকে দূরে আকাশের গায়ে জেগে থাকা গোল চাঁদটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আলোয় আলো হয়ে আছে দিগন্তের চকককে জলরাশি। আমার সামনে তখন ঘুমিয়ে আছে আমার গোটা পরিবার। বাবা, মা, দাদু। পাশাপাশি। যেন হাতে হাত ধরে অপেক্ষা করছে তারা। আমার জন্য। পাথরের গায়ে ওদের নাম লেখা। কবরের নিচে তাদের আশ্রয়।

চোখ দুটো ভিজে আসে হঠাৎ। পাশের ঝোপ থেকে বুনো লিলি ফুল গুলোকে ছিঁড়ে কয়েকমুহূর্ত চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি। ফুলগুলোকে ওদের কবরে সাজিয়ে রেখে পাথরগুলোকে স্পর্শ করি একে একে। ঠান্ডা লোনা হাওয়া আমাকে ছুঁয়ে যায়, স্বান্তনা জানায় বোধহয়।

8th April, 2088

যে তিনটে দিন কেটে গেছে সবুজ দ্বীপের বৃত্তান্ত লিখতে সেই তিনটে দিন কিন্তু আমার কেটেছে নানা ব্যস্ততায়। শুধু তাদের কথা লেখার সুযোগ পাইনি বিশেষ। আজ একে একে লিখবো বিগত তিনদিনের দিনলিপি।

সবুজ দ্বীপ থেকে ফেরার পর মনটা বেশ উচাটন হয়ে পড়েছিল। একটা উত্তেজক কাজ হাতের সামনে তাই বোধহয় ভুল করে লালুকে বিট খাওয়াতে ভুলে গেছিলাম। সে সপরিবারে আমাকে ঠুকরে দিয়ে মনে করিয়ে দিল তাদের দুরবস্থার কথা। এককাঁড়ি ফলমূল আর ঘাসপাতা জোগাড় করে দিয়ে তবে তার হাত থেকে মুক্তি পেলাম। এদিকে আবার হাওয়াকলটাকে চালু করতে ভুলে গেছিলাম বলে দিনভর বিদ্যুতের যোগান বন্ধ। তাই খানিক গাজর চিবিয়ে খিদে মেটাতে হল। রাতে যখন অন্ধকার নামল দিক চরাচরে, আমি পাথরে পাথর ঠুকে আগুন জ্বালালাম শুকনো পাতায়। তার পাশে চাদর মুড়ি দিয়ে বসলাম দাদুর লেখা বইখানা বগলদাবা করে।

এই ফাঁকে বলে রাখি, সত্যিই এই দ্বীপে একটা ছোট্ট হাওয়াকল আছে। এ হাওয়াকল বাকি সবার মত লাঠির ডগায় চাকার মত ঘুরতে থাকে না। এর আকৃতি ও প্রকৃতি অভিনব। চারখানা ত্রিপলের পতাকা সামুদ্রিক হাওয়ায় পতপত করে উড়তে থাকে দিনভর, তাদের ডগা থেকে বাঁধা চারখানা সরু তামার তার ওদের কম্পনজাত গতিশক্তিকে পৌঁছে দেয় একটা ব্যাটারিতে। সেখান থেকে দরকারে অদরকারে আমি বিদ্যুতের যোগান পাই। আপনি হয়ত হাসছেন মনে মনে। হাওয়াকল, ব্যাটারি...ঠাট্টা পেয়েছ ছোকরা? আসলে দাদু ছিলেন জীব বিজ্ঞানী, বাবা ছিল পদার্থবিদ্যার প্রফেসর আর মা ছিল ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার। বুঝতেই পারছেন, তাদের সম্মিলিত বুদ্ধির দৌড় ঠিক কতটা হতে পারে?

যাক সে কথা। এবার ফেরা যাক আমার ‘ব্যস্ত’ জীবনে।

আমি এ কদিন ‘অর্ধবৃত্ত দ্বীপের গাইডবুক’ নিয়ে পড়েছিলাম। পাতার পর পাতা উল্টে দাদুর হাতে আঁকা আর লেখা প্রবন্ধগুলো পড়তে পড়তে কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেছিল চোখে। কত কিছু জানতেন ওই বুড়ো মানুষটা। পাতায় পাতায় তাঁর প্রজ্ঞার পরিচয় পেয়ে আমি এককথায় মোহিত হয়ে পড়েছিলাম। গোটা রাত জেগে কুমিরদের সম্পর্কে পড়াশোনা করে আমি যখন ঘুমোতে যাব বলে ভাবছি ঠিক তখনি বেল্লিক লালু ডেকে উঠলো তারস্বরে। ঘুমের দফারফা হয়ে গেছে, তাই ছুরিখানা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম দ্বীপে টহল মারতে। এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরেও কাজ হল না বিশেষ। সরীসৃপটা কোথায় যে গা ঢাকা দিয়ে আছে তার হদিশ মিলল না। এদিকে আবার আর্গোসেরও দেখা নেই। তাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে একদিক থেকে। আমি নিশ্চিন্তে একলাটি মেতে ছিলাম ভয়াল প্রাণীটাকে ধরার পরিকল্পনা আঁটতে।

একটু একটু করে মনের মধ্যে জেগে উঠছিল একটা অপরিষ্কার রূপরেখা। সেটিকেই রূপায়িত করতে নাওয়া খাওয়া ভুলে নেমে পড়লাম অবশেষে।

“লোডস্টোন?” আমার দিকে তাকিয়ে আর্গোস প্রশ্ন করেছিল, “সেটা আবার কী বস্তু?”

—“চুম্বক পাথর। ওদের মধ্যে থাকে ম্যাগনেটাইট আকরিক। বিদ্যুতের সাহায্যে ওদেরকে লোডস্টোনে পরিণত করা যায়, এবং সেই কারণেই ওরা চুম্বকের মত আচরণ করে প্রাকৃতিকভাবেই।”

—“প্রাকৃতিক চুম্বক? তা বলি তোমার ঠাকুরদা কি ‘ঘরে-বসে-চুম্বক-বানাও’ গোছের কিছু লিখে যাননি?”

—“লিখে গেছেন, কিন্তু ওটা বানাতে যে পরিমাণ বিদ্যৎ শক্তির প্রয়োজন তা আমার এই হাওয়াকল জোগাড় করতে পারবে না।”

—“ধুর, তবে আর কী লাভ হল এত এত পড়াশোনা করে?”

—“বাজে কথা না বলে একটু সাহায্য করলে ভালো হত না?”

—“আহা, তোমার এই নিরুপায় অবস্থাটা যে কী আনন্দের সে কী আর বলব!”

—“আর্গোস, যদি দিনভর রোদ্দুরে চিৎ হয়ে হাত পা না ছুঁড়তে চাও তাহলে চুপ কর।”

—“ঠিক বলেছ। চুপ করে থাকাই ভাল। হোক না আমার বয়েস একশো বারো, আমার মাথায় যতই জমা থাক শতাব্দীপ্রাচীন খবরের বোঝা, আমি চুপ করেই থাকবো। কারণ আমি যদি মুখ খুলি তাহলে তোমার আত্মশ্লাঘা ধাক্কা খাবে। ধাক্কা খেয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তা সে যতই তোমার নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হোক না কেন। হ্যাঁ, আমি চুপ করেই থাকব। চোখ মেলে দেখব তোমার পতন এবং মৃত্যু। যখন ওই কুমিরটা এক কামড়ে তোমাকে ছিন্নভিন্ন করে জলযোগ সারবে আমি তখন আমি নিশ্চন্তে ঘাস চিবোব আর মনে মনে হাসব। ওই শেষ হল এই পৃথিবীর অন্তিম জীবিত মানুষটার, নির্বোধ অহংকারী মনুষ্যত্বের কী নির্মম পরিণতি, আমি ভাবব।”

—“বাপরে, দার্শনিক বটে তুমি একখানা। তা বলি কী, আমাকে দিয়ে জলযোগ করার পর কুমিরটা কি তোমায় ছেড়ে দেবে ভেবেছ?”

কথায় কাজ হল। আর্গোস কয়েকমুহূর্ত মুখ বন্ধ রেখে মাথা খাটাল বোধহয়।

—“জানো বোধহয়, সত্তর বছর আগে এই দ্বীপের দক্ষিণে ছিল একটা ঊষর দ্বীপমালা। বালি বালি আর বালি সেখানে। খুবই অজ্ঞাত কুলশীল এই দ্বীপমালাকে নিয়ে কারোরই বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু মুশকিল হল, এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যাবার সময় বেশ কয়েকটা জাহাজ হারিয়ে গেল জলের তলায়। সবার ধারণা হল, কোন আশ্চর্য কারণে ওই জায়গাটা অভিশপ্ত। কেউ কেউ ভাবলেন, ওই দ্বীপের চারদিকে আছে নরকের দরজা। বিজ্ঞানীরা মানলেন না। তারা মাথা নাড়িয়ে বললেন, নিশ্চয় ওখানে এমন কিছু আছে যাতে নাবিকদের কম্পাস কাজ করছে না একদম। দিক হারিয়ে ডুব পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ঘটছে দুর্ঘটনাগুলো। কেউ বিশ্বাস করল না। অবশেষে তোমার দাদুর মতই কিছু পাগল বিজ্ঞানী ওখানে যন্ত্রটন্ত্র সাজিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন...”

—“ওইখানে লোডস্টোন আছে?”

—“আছে, কিন্তু বিশাল পরিমাণে। আকরিক পাথর বালি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে মাটির ওপরে। সেখানে প্রাকৃতিক কারণে ঝড়ঝঞ্ঝা আর বজ্রপাত হয় প্রতিনিয়ত।”

—“বজ্রপাত!”

—“একদম ঠিক, ওই বজ্রপাতের দরুন, খনিজ আকরিকের সম্ভারটা লোডস্টোনে পরিণত হয়েছে।”

—“তিনখানা দ্বীপই?”

—“হুম, তারপরেই শুরু হল দ্বীপে খনিজ উদ্ধারের কাজ। অবশ্য মহাপ্রলয়ের পর সেসব এখন জলের নিচেই কোথাও লুকিয়ে আছে।”

—“ধন্যবাদ।”

—“আমায় যেন আবার যেতে বোলো না, আমি ব্যস্ত।”

—“কী এমন রাজকার্য করছ শুনি?”

—“ঘুমোবো।”

—“ঠিক আছে, এরপর আমার সঙ্গে কথা বলতে এলে তোমার কী হাল করি...”

—“ভদ্রলোকের এই ভাষা! ছিঃ!”

আমি আর্গোসকে মুখ বেঁকিয়ে ভেংচি কেটে কথায় দাঁড়ি টানলাম। এক ছুট্টে পৌঁছে গেলাম গোলাপিদের আস্তানায়। ওদের ব্যাঙের ছাতার মত দেখতে গাছের কান্ড থেকে গুনে গুনে তিরিশ পা ফেলে বালিয়াড়ির ধারে এসে দাঁড়ালাম। দৌড়ে জলে নামলাম, কোমর জলে পৌঁছে একটা লম্বা শ্বাস বুকের খাঁচায় বন্দি করে ঝাঁপ দিলাম সমুদ্রের বুকে।

এই দিকটায় বালিয়াড়ির শেষে পাথরের বাঁধুনি আছে। ওই কঠিন দেওয়ালের ধার ধরে জলের গভীরে নামলে বেশ কয়েকটা অন্ধকার খোঁদল দেখা যায়। সর্বসাকুল্যে সাতটা। বিশেষ একটি গুহায় লুকিয়ে আছে আমার কাঙ্খিত জিনিসটা। গুহায় ঢুকতেই কতগুলো রঙিন মাছ আমাকে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে গেল ল্যাজ ঝাপটে।

‘অবধূত’, অন্ধকারে সাদা অক্ষরে লেখা কথাটা এখনও পড়া যাচ্ছে বিলক্ষণ। ওর শরীরে বালির আর খাদের পাতলা পরত জমেছে বটে তবে এখনও সে যে কর্মক্ষম, সেটা দিব্যি মালুম হয়।

অবধূতের ঠিক মাঝখানটায় একটা দড়ি বাঁধা আছে। দড়ির দুই প্রান্তে ভারী পাথরের চাঙড় বাঁধা। ফাঁপা যন্ত্রটাকে জলের তলায় লুকিয়ে রাখতেই এই উপায়। ঠেলাঠেলি আর গুঁতোগুঁতি করে পাথর সরিয়ে ওর ধাতব শরীর মুক্ত করে টেনে নিয়ে এলাম গুহার বাইরে।

ফাঁপা হালকা ধাতুর তৈরী স্পিডবোটটা আমাকে নিয়ে ভেসে উঠলো জলের ওপরে। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

তারপর?

তারপর আর কী? সবুজ দ্বীপের উপকূলে পাওয়া ডিজেলের সাহায্যে অবধূতের ইঞ্জিন চালু করলাম। এক লাফে ওর সওয়ারি হয়ে আবার যাত্রা করলাম নতুন গন্তব্যের দিকে।

কোথায়? উত্তর আপনার জানা। লোডস্টোনের খোঁজে। কিন্তু কোথায় আছে সেই নিমজ্জিত খনি? কীভাবে খুঁজে পেলাম সে খনিজের সন্ধান? বলব, তবে সময় হলে।

9th April, 2088

সন্ধ্যার আগেই ফিরলাম। হ্যাঁ, লোডস্টোন মানে চুম্বকপাথরে বোট ভর্তি করে। ঠেলে ঠেলে অবধূতকে চড়ায় টেনে তুলে বালিয়াড়িতে শরীর এলিয়ে দিলাম। অর্ধেক কাজ শেষ। এবার বাকি অর্ধেক কাজ শেষ করতে প্রয়োজন আর্গোসের। এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে বুড়ো কচ্ছপটার খোঁজ করতে গিয়ে হতাশ হলাম। সে এখন পলাতক। তাই আর অপেক্ষা না করে ফিরলাম প্রাসাদে।

পরের দিন খুব সকালে লালুর চারদিক কাঁপিয়ে ডেকে ওঠারও অনেক আগে বেরিয়ে পড়লাম দাদুর বাইনোকুলারটা হাতে নিয়ে। যে করেই হোক এই দ্বীপে উড়ে এসে জুড়ে বসা কুমিরটাকে বুদ্ধির ধারে ঘায়েল করতেই হবে। তার আকৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে আমার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো ভুল হতে পারে। ভুল মানে মৃত্যু। অন্তত এই ক্ষেত্রে।

সবার আগে ছুটলাম কাঁচপুকুরের ধারে, ভদ্রলোক সেখানে নেই। নারকেল বাগানেও তিনি গরহাজির। কবরের লিলি বাগানেও নট নড়নচড়ন। বিটবাগানেও অপরিসীম শান্তি। তাহলে গেলেন কোথায় লম্বাচোয়াল সরীসৃপ মশায়? আমি যখন রীতিমত বিরক্ত হয়ে তার উদ্দেশে হাওয়ায় গালমন্দ ছুঁড়ছি ঠিক তখনিই একটা শব্দ এসে পৌঁছল কানে। হাসির শব্দ। কেউ কাউকে অপমান করতে যদি ঠাট্টা করেন তাহলে যেমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসেন, ঠিক সেইরকম। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম ‘তাদের’, এ দ্বীপে যাদের সংখ্যা সবথেকে বেশি।

‘মিরক্যাট’।

দাদু ওদের সম্পর্কেও লিখে গেছেন বেশ কয়েক পাতা। মরুভূমিতে বাস হলেও ওরা আজ কোন কারণে এই সুজলা সুফলা দ্বীপের বাসিন্দা। হয়ত অন্য কোথাও যাবার নেই বলেই। ওরা কিন্তু বালিয়াড়ির ধারেই ঘরসংসার সাজিয়ে বসেছে, বলা যায় দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছে। মিরক্যাট আসলে বেজিদের বংশের প্রাণী। নকুল বা নেউলের সঙ্গে তাদের ‘তুতো’ সম্পর্ক অনেকটা। এদের অবশ্য একটা বৈশিষ্ট্য আছে, দু’পায়ে খাঁড়া হয়ে ওরা দিব্যি মানুষ মানুষ হাবভাব করতে পারে, অল্প সময়ের জন্য হলেও।

ওদের হাবভাবে এমন একটা দলবদ্ধ চনমনে ভাব ছিল যে নজর আটকে গেল আচমকা। বাচ্চা বুড়ো ছেলে মেয়ে সবাই মিলে নানা কাজে ব্যস্ত তারা। কেউ মাটি খুঁড়ে পোকা খুঁজছে, কারো মুখে ফলের শক্ত বীজ, কেউ বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে অপত্যস্নেহে গদগদ, কেউ আবার দুপায়ে দাঁড়িয়ে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে। ভাবখানা এমন, “কী রে, কিছু বলবি নাকি?”

ওদের ব্যস্ত খেলাঘরের ঠিক মাঝখানটায় একটা শুকনো গাছের ডালে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে একটা কালো কোট পরা ফিঙে। গম্ভীর মুখে সে চারদিকটা দেখছে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। তার হাবভাবে বেশ একটা মাস্টারমশায় সুলভ আমি-সব-জানি ছাপ। আমার ঠোঁটে হাসি ফুটলো। পাখিটার মতলব ভালো নয়। আমি জানি।

এমন সময় হঠাৎ ফিঙে ডেকে উঠলো। সব্বাই মিলে চমকে টমকে একাকার কান্ড। মিরক্যাটগুলোর চোখ গেল অবশেষে আকাশের দিকে। সেখানে বিশাল ডানা ভাসিয়ে নিশ্চিন্তে উড়ে চলেছে একটা ঈগল পাখি। শান্ত, রাজকীয় তার চাল। নিরীহ ভূমিচারী প্রাণীগুলো সেই দৃশ্য দেখেই দৌড় মারলো নিজের নিজের আস্তানায়। খেলাঘর ফাঁকা। শুধু ফিঙে বসে আছে সাহসী সৈনিকের মত। ঈগল চরম অবজ্ঞায় তাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হারিয়ে গেল দিগন্তে। ছোট্ট প্রাণীগুলো আবার বেরিয়ে এল কোটর ছেড়ে। যে যা করছিল সেটাই আবার করতে শুরু করল চরম মনোযোগ দিয়ে।

আবার ডাক। ফিঙের। এবার আর আকাশের দিকে তাকাল না কেউ। আসন্ন বিপদের পূর্বাভাস পেয়ে সক্কলে মিলে গা ঢাকা দিল নিজেদের ঘরে।

আর কালো কোটধারী ফিঙে?

সে হঠাৎ করে শুকনো ডাল ছেড়ে তড়িৎগতিতে নেমে এসে মুহূর্তের মধ্যে সাফ করে চলে গেল মিরক্যাটগুলোর দিনভরের খাটনির ফসল। একে একে গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে এল সরল সাদাসিধে মিরক্যাটগুলো। ওদের চোখে বিস্ময়। বিভ্রান্তি।

সব থেকে বেশি কষ্ট হল একটা ক্ষুদে মিরক্যাটকে দেখে। সে বেচারা প্রচুর অধ্যাবসায় নিয়ে বালির গভীরে পৌঁছে একখানা সরেস কাঁকড়া বিছে সবেমাত্র মুখে তুলেছিল। ফিঙের চাতুর্যে সেটা এখন অদৃশ্য। বেচারা আকাশের দিকে সজল চোখে তাকিয়ে মাথা চুলকাচ্ছিল হতাশ হয়ে। ‘জীবন অনিত্য’—আর্গোসের দার্শনিক মন্তব্যটা মনে পড়ে গেল। আমি কয়েক পা এগিয়ে অতি সাবধানে এসে দাঁড়িয়েছিলাম ক্ষুদেটার সামনে। নিজের ভাগের বিটটা একটু দাঁতে কেটে তার মুখের সামনে ধরেছিলাম। সে দুহাত বাড়িয়ে আমার হাতে ধরা স্বান্তনা পুরস্কারটা ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিল। আর ঠিক তখনই...

সোনালী বালি ঠেলে বেরিয়ে এল একজোড়া ধারাল চোয়াল। নিঁখুত নিশানা, অব্যর্থ কামড়। বিস্মিত চোখ দুটো মেলেই নিরীহ শিশুটা মিলিয়ে গেল ভয়ানক সরীসৃপটার মুখের আড়ালে। সবকটা মিরক্যাট একসঙ্গে হল্লা করে উঠলো প্রথমে, তারপর দৌড়ে পালালো। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম পাথরের মূর্তির মত। হাতে ধরা খাবারের টুকরোটা মাটিতে খসে পড়ল। কুমিরটা হেলতে দুলতে বালির ওপর নিজের দাগ কেটে সমুদ্রে শরীর ভাসালো। তবে যাবার আগে আমার দিকে তাকিয়ে যেন মুচকি হাসলো। ব্যঙ্গ। তাচ্ছিল্য। যেন ব্যাটা বলতে চাইছে, এ দ্বীপের শাসকের সিংহাসন বদল হয়ে গেছে। এবার থেকে অর্ধবৃত্ত দ্বীপের সে-ই একমাত্র স্বঘোষিত রাজা।

জীবন অনিত্য। আর্গোস বলেছিল।

কি জানি কেন, সেই মুহূর্তে আমার চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেছিল। প্রাণীটাকে বোঝানোর সময় এসেছে, ওর দাঁতের জোরকেও হারাতে পারি আমি। একটা গোটা দুনিয়াজোড়া সুনামি এড়িয়ে এখনও টিকে আছি আমি, এখনও সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছি অবলীলায়। ওই প্রাণীটাও অবশ্য সেদিক থেকে আমার যোগ্য উত্তরসূরি। কিন্তু আমার কাছে আছে পূর্বপুরুষের জ্ঞান আর ডারউইনের তত্ত্ব। আমাকে তাই মাত দেওয়া সহজ নয়।

এতদিন বিপদের আভাস পেয়েছিলাম, আজ শত্রুর সঙ্গে মোক্ষম সাক্ষাৎ হয়ে গেল। এতদিন প্রস্তুতি নিয়েছিলাম লক্ষ্যহীনভাবে, আজ একটা গন্তব্যের হদিশ পেলাম।

এতদিন গাছের ছাল দিয়ে দড়ি বানিয়েছিলাম, আজ সেটাতে একটা মাপমত ফাঁস বাঁধলাম।

এরপর কী হল? জানাব আগামীকাল। যদি বেঁচে ফিরি। আর যদি না ফিরি তাহলে এইটুকুই হবে আমার স্বান্তনা, আমি বিনাযুদ্ধে হার মানিনি। যদি না ফিরি তাহলে এই দ্বীপটা হয়ত আমাকে ভুলে যাবে। তবে আমি ঠিক ফিরে আসবো সমদ্রের ভিজে হাওয়া হয়ে। নিঃসাড়ে ছুঁয়ে যাবো তিনখানা পাথরের ফলককে। জানিয়ে যাব, আমি না থেকেও আছি সবার মধ্যে।

10th April, 2088

ভাগ্যিস আর্গোসের দেখা পেলাম। ও তখন সকালের নরম রোদে হাত পা ছড়িয়ে বালির ওম নিচ্ছিল মনের সুখে। বুড়োর শান্তিতে আগুন লাগাতেই প্রথমে ওর খোলসটা লক্ষ করে একটা পেয়ারা ছুঁড়লাম।

লক্ষ্যভেদ হল। আর্গোস নড়ে উঠলো একটুখানি।

এবার ছুঁড়লাম ওর সবথেকে প্রিয় ফলটা। হালকা সোনালী হলদে রঙের ‘ক্লাউডবেরি’। পাকা টসটসে ফলটা মুখে দিলে মাখনের স্বাদ মিলবে, জিভে লাগবে মন ভালো করা মিঠে অনুভূতি। এবার কিন্তু বুড়ো মাথা নাড়াল, আগ্রহের সঙ্গে ফলটা মুখে চালান করে দিয়ে আমার দিকে তাকাল।

—“কী হে, মতলবটা কী? আজ এত আদিখ্যেতা যে?”

—“সবকিছুতেই মতলব খোঁজার বদভ্যাসটা ছাড়ো তো।”

—“খুঁজি বলেই না শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে এদ্দিন বেঁচে আছি হে। মনে রেখে, জীবন...”

—“অনিত্য? এক কথা বারবার বলে আমার কান পচিয়ে দিয়েছ , এবার আপাতত একটু চুপ থাক। এই ফাঁকে ক্লাউডবেরিটা একটু চেখে দেখি। বিটবাগানের পাশেই ছোট্ট ঝোপটা পুরো সোনার খনি হয়ে আছে এই সুস্বাদু ফলে, সবটা তুলে ঘরে জমিয়ে রেখেছি বুঝলে?”

—“আমি নিশ্চয় আমার ভাগটা পাবো?”

—“তোমার ভাগ? কী এমন রাজকার্যটা করেছ বল তো যে তোমাকে ভাগ দিতে যাব? বন্ধুত্বের তাড়নায় একটা দিয়েছি, তুমি খেয়ে হজম করে ফেলেছ। ব্যাস, হিসেব মিটে গেল!”

—“স্বার্থপর! আত্মকেন্দ্রিক অসভ্য দু’পেয়ে প্রাণী!”

আমি গালাগালগুলো অম্লান বদনে হজম করে আর্গোসের মুখের কাছে মুখ নিয়ে আসি, দরকারি কথা বলছি এমনভাবে তার চোখে চোখ রেখে মেপে মেপে কথাগুলো বলি পরিকল্পনামত।

—“আর্গোস, যদি সত্যিই ফল খেতে চাও তাহলে সাহায্য করতে হবে। কুমিরটাকে ধরতে তোমার দরকার পড়বে। তুমি আছো তো আমার সঙ্গে?”

—“নেই মানে? তোমাকে চুম্বকদ্বীপের খবর কে দিল হে ছোকরা?”

—“তুমি একটা লম্বা ইতিহাস বলেছ। সে গল্প অদরকারি ছিল। তবে আমি ওই বাজে গল্পটার মধ্যে থেকেও নিজের মাথা খাটিয়ে খুঁজে নিয়েছি দ্বীপখানা। ওটা শুধু আমার একক কৃতিত্ব বুঝলে?”

—“বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে এই তোমার কথা বলার ছিরি?”

আর্গোস খিঁচিয়ে ওঠে, তারপর অবশ্য সামান্য বিরতি নিয়ে আমার দিকে কৌতূহলী কুতকুতে চোখদুটো মেলে আবার প্রশ্ন করে।

—“তা বলি, কীভাবে খুঁজে পেলে জলে ডোবা দ্বীপখানার হদিশ?”

—“সবুজ দ্বীপে যাবার সময় যে টর্নেডোর সামনে পড়েছিলাম মনে সেকথা আছে?”

—“বিলক্ষণ মনে আছে।”

—“সেই সময় আমরা দেখেছিলাম আকাশ থেকে বারবার সমুদ্রের ওপর আছড়ে পড়ছে বজ্রের রেখা?”

—“হ্যাঁ, সে কি ভোলা যায় নাকি?”

—“তুমি বোধহয় লক্ষ করনি, প্রতিবারই বজ্রপাত হচ্ছিল ঠিক একটি বিশেষ জায়গায়। তোমার গল্পটা যদি ঠিকঠাক মনে করতে পারি তাহলে তুমি বলেছিলে, ‘ওই বজ্রপাতের দরুন, খনিজ আকরিকের সম্ভারটা লোডস্টোনে পরিণত হয়েছে’, মনে পড়ছে?”

—“সমুদ্রের গহীন প্রেতলোকে ভেসে বেড়ানো দৈত্য তিমির ধারালো দাঁতের দিব্যি!”

—“তাহলেই বুঝেছ, কেন এই ফলগুলোতে তোমার ভাগ নেই?”

—“আহা রাগ করছ কেন! যা বলবে তাই করব। বলা যায় না হয়ত এইবারই আমি এমন কিছু একটা করে ফেললাম যে...”

—“ধুস, তোমার দ্বারা হবে না। তুমি বুড়ো, তায় দুর্বল।”

—“একবার চেষ্টা করেই দেখ না।”

—“তারপর এখন ফলের লোভে বললে বটে সাহায্য করবে পরে হয়ত পালিয়ে গেলে লেজ তুলে!”

—“সত্যিকারের মরদ কথার দাম দিতে জানে, বুঝলে?”

কাজ হয়েছে। আমি এরপর আসল প্রস্তাবটা পাড়ি।

—“আর্গোস তোমাকে মাছ ধরার ফাৎনা সাজতে হবে।”

—“কী?”

—“অথবা বাঘ শিকারের জন্য ব্যবহৃত ছাগলছানা।”

—“অসম্ভব!”

—“তাহলে ফলগুলো তোমার নয়। আর সেই সঙ্গে এটাও প্রমাণিত যে তুমি সত্যিকারের ম...”

—“রাজি, রাজি, রাজি।”

আমি মুচকি হাসলাম।

এরপর আর্গোসকে সঙ্গে নিয়ে চললাম খাঁড়ির দিকে। যেখানে সমুদ্রের ঘোলা জল অনেকখানি ঢুকে পড়ে দ্বীপের মধ্যে ঠিক সেখানে এসে দাঁড়ালাম। গর্বের সঙ্গে সামনে রাখা ফাঁদখানা দেখালাম বুড়ো কচ্ছপটাকে।

—চারখানা গাছের ডাল মাটির উপর খাঁড়া করে পুঁতে দেওয়া… ওদের আড়াআড়ি একটা ডাল আবার দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা... একটা বড়সড় ফাঁস ঝুলছে ওই ডান্ডাটা থেকে... “এই তোমার কুমির ধরা ‘কল’?”

ওর গলা থেকে একটা বিচ্ছিরি তাচ্ছিল্যের হাসি ঝরে পড়ল।

—“আমার নিঁখুত শিল্পকলাকে অপমান করার জন্য তোমাকে এখানে ডেকে আনিনি। বাধ্য ছেলের মত ওই ফাঁদটার পিছনে গিয়ে দাঁড়াও দেখি!”

—“হাস্যকর....বিপজ্জনক.....শিশুসুলভ...”

আর্গোস গজগজ করে থপথপিয়ে জলাজঙ্গল আর জোলো ঘাস মাড়িয়ে ফাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে ব্যাজার মুখে। যদিও মাঝে মাঝে ইতস্তত মাথা ঘুরিয়ে সে পরীক্ষা করে নেয় চারপাশটা।

—“তোমায় তো দেখাই যাচ্ছে না, আরেকটু এগিয়ে এস।”

—“দুঃখিত, আমি এখানেই সুরক্ষিত মনে করছি নিজেকে।”

—“কুমির যদি আজ না ধরা পড়ে তবে কিন্তু...”

উপরোধে ঢেকি গেলা মুখে আর্গোস আরেকটু এগিয়ে আসে, তারপরেই আবার দুপা পিছিয়ে যায়।

—“আচ্ছা, যদি কুমিরটার টানাটানিতে গাছের ডালগুলো ভেঙে যায়? মানে আমি বলতে চাইছি, তুমি নিশ্চয় এর বিকল্প কিছু ভেবে রেখেছ কিছু?”

—“হ্যাঁ, সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। তবে কিনা যদি দেখ ডালগুলো মড়মড়িয়ে ও তোমাকে তাড়া করছে তবে বোকার মত দাঁড়িয়ে না থেকে ল্যাজ তুলে পালাতে ভুল না যেন।”

—“সে আর বলতে! যদিও ‘ল্যাজ তুলে’ কথাটার মধ্যে কেমন যেন একটা ব্যঙ্গের আভাস পেলাম যেন!”

—“এবার চুপ কর দেখি, আরও অনেক কাজ বাকি।”

এই ফাঁকে কোমরে শক্ত করে বাঁধি চামড়ার থলেটাকে। কাদাজল থেকে পাঁক তুলে গোটা গায়ে মেখে নিই, ছুরিটা বার করে হাতের পাঞ্জায় একটা মোক্ষম আঁচড় টানি। যতটা না ভেবেছিলাম, চামড়াটা কাটলো তার থেকেও অনেকখানি বেশি। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথার কামড়ানি হজম করে থলের মধ্যে থেকে পরিষ্কার কাপড় বের করে ক্ষতের চারদিকে বেঁধে নিই। ওদিকে কাদা জলের সঙ্গে মিশে গেছে তাজা লাল রক্ত। আমি আবার ফিরে আসি আর্গোসের কাছে।

—“ওহ, তুমি? আমি ভাবলাম...”

—“অপেক্ষা কর, সত্যিকারের মরদ হবার মুরোদ আছে কিনা সেটা সব্বাইকে চোখে আঙুল তুলে দেখাতে হবে।”

—“চোপরাও, হতচ্ছাড়া শয়তান কোথাকার।”

—“নড়বে না। ঠিক তো?”

—“যাচ্চলে, কোথায় গেলে হে। আমি তো তোমার গলা শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না কেন?”

—“যাক, তুমি যখন আমাকে দেখতে পাচ্ছ না তখন কুমিরটাও পাবে না আশা করি। সেটাই উদ্দেশ্য। এবার মুখ বন্ধ করে বসে থাকো। ওদিকে সূর্যের আলোয় তোমার কমলা রঙের বাহার যা খুলছে না, আহা!”

—“উফ, ভয়ে আমার...”

—“চুপ।”

সত্যিই আমরা চুপ করেছিলাম অনেকক্ষণ। কতক্ষণ? কে জানে! কাদা জলে বেশ কয়েকটা জোঁক যে পায়ের রক্ত চুষে বেঢপ মোটা হয়ে কোনরকমে ঝুলে আছে সেটা বেশ টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু উপায় নেই, নড়াচড়া দেখলেই ‘চিড়িয়া ভাগল বা’।

এর সঙ্গে জুটলো মশা। তার ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ের দিকটা অবশ হয়ে এসেছে প্রায়। গায়ে মাখা কাদামাটি শুকিয়ে চামড়ায় চড়চড় করছে। কিন্তু ধুরন্ধর প্রাণীটার আর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।

ঘাস গাছের শীষ ধরে ঝুলছিল একখানা দোয়েল পাখি। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে তার ওড়াউড়ি লক্ষ করতে করতে যখন ভাবলাম আমি ঘুমিয়ে পড়তে পারি ঠিক সেই সময়ে দোয়েল পাখিটার মনোযোগ আমার ওপর পড়ল। আরও আধঘন্টা সে আমার মাথায় এবং কাঁধে বসে তার শক্ত ঠোঁটের কারিগরি দেখিয়ে চলল। নড়াচড়া বারণ, তাই মুখ বুজে তার সব অত্যাচার সহ্য করলাম। একসময় সেও বোধকরি বিরক্ত হয়ে রণে ক্ষান্ত দিয়ে উড়ে পালালো। এরপর দেখলাম একটু দূরেই ‘সি ল্যাভেন্ডার’ ঝোপে তিনটে প্রজাপতির খুনসুঁটি। বেগুনি রঙের সুগন্ধি ফুলের গোছায় লেগেছে তাদের লাল রঙের বাহারি পাখার রক্তিম রেণু। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের ফুলকেলি দেখে বুঝলাম ওদিকে সূর্যের তাপ কিছু কমে এসেছে। দুপুর পেরিয়ে ধীর পায়ে বিকেলের নরম আলো প্রবেশ করেছে চারদিকে জলঘেরা দ্বীপটায়। প্রমাদ গুনলাম। বেশিক্ষণ নেই আর। এর পর যদি অন্ধকার নামে তাহলে সমস্ত পরিকল্পনা চৌপাট। কখন যেন চোখ দুটো বুজে এসেছিল নিজের অজান্তে। আধো নিদ্রা আধো জাগরণের মধ্যেই দেখলাম ঘাসবনে হুড়োহুড়ি পড়েছে। সতর্ক হয়ে চোখদুটো পুরো খুলতেই বুঝলাম, দুটো ডাহুক পাখির মধ্যে তুমুল লড়াই বেঁধেছে। হাতের মুঠো শিথিল হল, আবার শরীর জুড়ে শ্রান্তি নামলো।

দাদু বলতেন, আমরা যখন ঘুমোই তখনও নাকি আমাদের মস্তিষ্ক জেগে থাকে। সে নাকি শরীরের নানা খুঁটিনাটির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখে। তার পাহারায় কোনও ভুল ত্রুটি হবার জো নেই। তাই আমরা ঘুমোলেও মশার উৎপাত ঠেকাতে আমাদের হাত-পা নড়ে ওঠে। জল তেষ্টা পেলে ঘুম ভেঙে যায়। প্রয়োজন মত সে আমাদের স্বপ্ন দেখায় আবার দুঃস্বপ্নও টেনে এনে সতর্ক করে।

আমার ক্ষেত্রেও বোধহয় ঠিক সেটাই ঘটল। একটা খিঁচুনি অনুভব করলাম শরীরে। আলস্যের বন্ধন ছিঁড়ে যেন কেউ আমাকে ঝাঁকিয়ে জাগিয়ে দিল হঠাৎ করে। চোখ খুলেই যেটা দেখলাম সেটা যেমন আকস্মিক ঠিক তেমনি ভয়ানক।

খুনে সরীসৃপটা কখন যেন চুপিসাড়ে ঘাসবন পেরিয়ে উপস্থিত হয়েছে আমার বানানো ফাঁদটার সামনে। খুব মনোযোগ দিয়ে সে দেখছে ফাঁসের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিকারের দিকে। আমি কুমিরটার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালাম আর্গোসের দিকে। আর সেই সঙ্গে মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল।

অলস বুড়ো প্রাণীটা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, অসাবধানতাবশত তার মাথাটা বিপজ্জনকভাবে বেরিয়ে এসেছে ফাঁদের সঙ্গে বাঁধা ফাঁসের খুব কাছে। “অলপ্পয়ে বুড়ো, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই মরবে আজ”, আমি হাত মুঠো করে নিঃশব্দে তার উদ্দেশে গাল দিয়ে উঠি, “ওঠো আর্গোস, ওঠো। পিছিয়ে যা-ও-ও—”

কিন্তু বুড়ো নড়বে না। মরণঘুমে ব্যস্ত এখন সে। আমি অসহায় আক্রোশে একটা শক্ত কিছু খুঁজি, একটা ঢিল পাটকেল পেলে তাকে যদি সতর্ক করতে পারি সেই দুরাশায়। কিন্তু সামান্য নড়াচড়ায় বিপদ হতে পারে। আমাদের শিকার যদি পরিকল্পনার আঁচ পেয়ে পালায়? যদি না পালিয়ে আমাকেই আক্রমণ করে বসে? চিন্তাপ্রবাহগুলো আমাকে কিছুক্ষণ অসাড় করে রেখেছিল। আমি দেখলাম, কুমিরটা মুখ খুলেছে। সামান্য বিরতি, ঝড়ের পূর্বাভাস। বিপদের সংকেত। প্রাণীটা আর্গোসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত। আমি দিশেহারা হয়ে চিৎকার করে আর্গোসকে ডাকতে গেলাম, আর তখনই প্রাণীটা একটা লম্বা লাফ দিয়ে করাতের মত দাঁত নিয়ে গিলে ফেলতে চাইল আর্গোসকে।

আশ্চর্য ঘটনা। মিরাকল। আমার মতই বুড়ো কচ্ছপটারও বোধহয় মস্তিকের একটা অংশ জেগে ছিল বিপদের মোকাবিলায়। নড়াচড়ার শব্দে কিনা জানি না, সে ঘুম ভেঙে উঠতেই ভয়াল দাঁতগুলোর এগিয়ে আসায় একটা প্রাণান্ত প্রয়াসে পিছিয়ে এল বেশ খানিকটা। তারপর পড়িমরি করে ছোট্ট পা দুটো চালিয়ে ঘাসবনে পিঠটান দিল। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।

আর্গোস বেঁচে গেল এ যাত্রা।

শিকার ফস্কেছে। কুমিরটা ঠিক বুঝতে পেরেছে তাকে ধরার জন্য ফন্দি এঁটেছি আমরা। ফাঁসখানা ততক্ষণে তার চোয়ালের চারদিকে বেড় দিয়ে চেপে ধরেছে। সে তখন বন্ধ মুক্ত হতে বেদম লম্ফোঝম্প করতে শুরু করেছে। আমি হাসলাম। এই সময়—

চামড়ার থলিটা থেকে লম্বা দড়ির রশি বার করে ঝাঁপিয়ে পড়লাম কুমিরটার ঘাড়ের ওপর। গায়ের জোরে ওর মুখটাকে চেপে ধরে দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধলাম ওর বিশাল হাঁমুখখানা। জলে কাদায় একাকার আমি আর প্রাগৌতিহাসিক মাংসাশী প্রাণীটা। ওর লেজের ঝাপটে ঘাসবন তখন এলেমেলো এবং বিপর্যস্ত। একসময় আমি উঠে দঁড়ালাম। জোরে জোরে শ্বাস নিলাম। এখনও অনেক কাজ বাকি।

—বাহ্, বাছাধন তো একদম কুপোকাৎ!

ঘাসবনের আড়াল থেকে আর্গোসের ভাঁজপড়া চামড়ায় ঢাকা মুখটা দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট কালো কুচকুচে উজ্জ্বল চোখ দুটো জানাচ্ছে সে আমার বাহাদুরিতে নিতান্তই মোহিত। আমি আড়চোখে সরীসৃপটার মুচড়ে মুচড়ে ওঠা শরীরটাকে দেখে নিয়ে হাতের দড়িটা গোটাতে থাকি।

—“তোমার পালানোটা দারুন লাগলো, আর্গোস! একদম মরদের মত কাজই বটে।”

—“উপায় ছিল না তো! ঘুম ভেঙে চোখ খুলতেই যা দেখলাম, ওহ!”

আর্গোস যেন শিউরে উঠলো।

—“আচ্ছা, তুমি যদি ঝটপট নিজের খোলের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে তাহলেই তো সবদিক রক্ষা পেত, তাই না?”

—“আমি আসলে, ওই কী যেন বলে, ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ হয়ে পড়েছিলাম আর কী। তবে আর যাই হোক, আমি কোন অবস্থাতেই চাইতাম না জন্তুটার ধারালো দাঁতগুলো আমার পাঁজরে কাতুকুতু দিক।”

আমি হাসি চেপে দড়ির প্রান্ত ধরে আরেকটা হ্যাঁচকা টান মারলাম। ওপর প্রান্তে বাঁধা ‘অবধূত’ জলকাদার ওপর দিয়ে ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে এসে হাজির হল আমার সামনে। সাবধানে হাতে ধরা প্রান্তটা জন্তুটার গলায় বাঁধা ফাঁসের দড়ির সঙ্গে বাঁধলাম তারপর সঙ্গে আনা লোডস্টোনের দুটো টুকরোও বেঁধে ফেললাম ওর মাথার ওপর আর নিচের দিকে। কাজটা সহজসাধ্য তো ছিলই না, উপরন্তু বিপজ্জনকও ছিল বটে। তবে সবকাজ শেষ করে যখন অবধূতের ঘাড়ে চেপে ওর ইঞ্জিন চালু করলাম তখন আকাশ ধূসর রঙে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে আর হাওয়ায় সেই ভিজে ভাবটা চামড়ায় টের পেতে শুরু করেছি।

—“কোথায় চললে? আমার কি কোন দরকার আছে আর?”

আমি আর্গোসের দিকে ফিরে তাকাই। ওর আগ্রহী মুখের দিকে কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি আটকে যায়।

—“তোমার কাজ ফুরিয়েছে বন্ধু, ধন্যবাদ।”

‘অবধূত’ আর আমি যান্ত্রিক কোলাহলে ঘাসবন কাঁপিয়ে অগভীর জলাজঙ্গল মাড়িয়ে ছুটে চলি। আমাদের শিকার তখন জলের মধ্যে নিরুপায় আক্রোশে ল্যাজ আছড়ে আমাদের অনুসরণ করেছে। উপায় নেই তার, সে এখন আমাদের হাতে বন্দি। শুধু একটাই ভয়, ওর ক্রমাগত নড়াচড়া আর টানাটানিতে পলকা বোটটা না আবার ঢেউয়ের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে। আর সেই সঙ্গে যদি ওর মুখের বাঁধনটা আলগা হয়ে পড়ে ঘটনাচক্রে? নোনতা জলের মধ্যে খাদ্য আর খাদকের যদি মুখোমুখি আবার দেখা হয়? ঠান্ডা হাওয়া নাকি ভয়ানক একটা সম্ভনার কথা ভেবে আমার শরীরটা কেঁপে উঠলো একটুখানি। ওদিকে দূর আকাশে আবার বাজ পড়তে শুনলাম ‘কড়াৎ’ শব্দে।

জল চিরে আমাদের ভাসান চললো জানা গন্তব্যের দিকে।

না, কোনও গোলমাল হয়নি। দ্বীপের কাছে পৌঁছতেই যদিও ঠিক আগের বারের মতই ঝড় বৃষ্টির সম্মুখীন হয়েছিলাম, কিন্তু এবার বিধি সঙ্গ দিয়েছেন। অবশ্য কাজটা সহজ ছিল না কোনমতেই। গভীর জলে নামতেই প্রাণীটা প্রাণপনে আমাদের তাড়া করেছে, তাকে পিছু ফেলে এগিয়ে যেতে অবধূতের কান মুচড়ে গতি বাড়িয়ে রাখা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। ওদিকে ঢেউয়ের আকৃতি ক্রমশ বাড়ছিল ঝোড়ো হাওয়ার ধাক্কায়। ফুলে ফেঁপে ওঠা নীলচে ফেনায় ঢাকা পাহাড়ি তরঙ্গগুলোকে কাটিয়ে আমরাও ছুটছিলাম এঁকেবেঁকে, সাপের মত। রক্তে বইছিল রোমাঞ্চের উন্মাদনা, ঠান্ডায় রোমকূপগুলো খাঁড়া হয়ে উঠেছিল। দৃষ্টি ছিল সামনের দিকে।

অবশেষে যখন আমরা পৌঁছলাম সবুজ দ্বীপের একদম কাছটায়, দেখলাম একখানা সুবিশাল ঢেউ যেন আমাদেরই লক্ষ্য করে হিংস্র শ্বাপদের মত এগিয়ে আসছে হুড়মুড়িয়ে। দেরি না করে বোটের হাতল ছেড়ে তাকে চলতে দিলাম খেয়াল খুশিমত। সেই ফাঁকে ছুরি চালিয়ে মোটা দড়ির রশিটাকে কাটতে সচেষ্ট হলাম। আড়চোখে বারবার দেখতে লাগলাম আগুয়ান ঢেউয়ের বিস্তার, কাঁপা কাঁপা হাতে তখন আমি মরিয়া হয়ে ছুরির ধারালো প্রান্তটা ঘষে চলেছি দড়ির গায়ে। সংঘর্ষ অবধারিত। মনোযোগ টিকিয়ে রাখা খুব জরুরি। তাই একসময় জলের প্রাচীরটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে গায়ের সব শক্তি আঙুলের ডগায় এনে ফেললাম। একসময় দড়ি কেটে জলের মধ্যে হারিয়ে গেল আমাদের ভয়াল শিকারটা। ততক্ষণে আমার বোটটা জলের উৎরাই চড়তে ব্যস্ত।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হাতল মুচড়ে অবধূতের গতিপথ পাল্টালাম। একটা অর্ধবৃত্ত জলের সর্বনাশা প্রলেপ আমাদের সমুদ্রের মধ্যে পিষে ফেলতে মাথার ওপরে উঠে এল। আর তারপর আছড়ে পড়ল সমুদ্রবক্ষে।

আমরা তার মুঠো এড়িয়ে ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছি নিরাপদে। অবধূতের ইঞ্জিন তখন কাঁপছে, কাঁপছে হাতলটাকে মুঠোয় ধরা আমার হাতটাও।

মুক্তি। সমুদ্রের বুকে আকাশের কোনও এক কোণ থেকে ঝরে পড়ল বিদ্যুতের চমক। প্রকৃতি যেন চরম আক্রোশে আমাদের পালিয়ে যাওয়াটা দেখলেন একবুক আক্রোশ নিয়ে। আমি হাসলাম, এই ঝড় জল আর বিপদের মধ্যেও। বলেছিলাম না, উন্মাদনা। পূর্বপুরুষের দান, রক্তের দোষ। বেঁচে থাকার অভ্যাস।

একসময় ফিরলাম অর্ধবৃত্ত দ্বীপে। অন্ধকার বালিয়াড়িতে নৌকোটাকে ঠেলে তুললাম। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়লাম বেলাভূমিতে। আর্গোসের ঠিক পাশটায়।

—“পৃথিবীর সবচেয়ে তিনটে মধুর ধ্বনি কী কী বলতে পার?”

বুড়ো গম্ভীর গলায় আমাকে প্রশ্ন করে।

—“জানি না।”

—“বৃষ্টি পড়ার শব্দ..... প্রাগৌতিহাসিক কোন অরণ্যে গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার গান আর......বালিয়াড়িতে বয়ে আসা শান্ত সমুদ্রের গুঞ্জন।”

আমি নিশ্চিত হলাম, কথাটা আমি কোনও একটা বইয়ে পড়েছি। অবধূতের ঘাড়ে গোটা সংসারকে নিয়ে আমার বাবা মা এবং দাদু যখন পালিয়েছিল তখন সঙ্গে করে এনেছিল অজস্র বই। গীতবিতান, সঞ্চয়িতা, ওয়ার এন্ড পিস, ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি, মাদার...আরও কত কত বই। তাদের কোথাও এরকম একটা কথা ছিল বোধহয়। মা একসময় বইগুলো পড়ে শোনাত আমায়। মায়ের গলা শুনতে পেলাম যেন হঠাৎ।

“গোরা”—মায়ের গলায় কী মিষ্টি শোনাত ডাকটা!

বইয়ে লেখা শব্দগুলো সত্যি, আর্গোস তার জীবনবোধ দিয়ে যা অনুভব করেছে তার একটাও বর্ণ মিথ্যে নয়। তবুও আমার মত সর্বহারা একজন কিশোরের কাছে মায়ের ডাকটাই বোধহয় সব চাইতে মধুর। কে জানে!

—“কী ব্যাপার চুপ কেন?”

বুড়োর কৌতূহল দেখে হাসি পেল। সে এখন আমার অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ শুনে এবং সে সম্পর্কে নিজের সুচিন্তিত মতামত দিয়ে আমায় ধন্য করতে চায়।

—“কাজ শেষ, খুনে জন্তুটাকে ফিরিয়ে দিয়েছি সবুজ দ্বীপে ওর পরিবারের কাছে। আশা করি আর অসুবিধা হবে না।”

—“হবে, একশো বার হবে। তুমি নির্বোধ, বোকা আর বুদ্ধিহীন একটা জীব। অসহ্য!”

আমি আর্গোসকে মনে করিয়ে দিতে চাইছিলাম যে তিনটে বিশেষণের মানে একই, কিন্তু সে আমায় সুযোগ দিল না।

—“এটুকু তোমার জানা উচিত ছিল যে ওরা একবার যেখানে শিকার পায় সেখানে বারবার হানা দিতে পছন্দ করে। যতই তুমি ওদের তাড়াও, অন্য কোথাও নির্বাসনে পাঠাও আবার শিকারের খোঁজে পথ চিনে ঠিক হামলে পড়বে পুরোনো আড্ডায়।”

—“তাই নাকি?”

আর্গোস এবার আমার দিকে বিভ্রান্ত চোখে তাকায়।

—“ঠাট্টা করছ নাকি?”

—“আরে বাবা এত অল্পেই রাগলে চলে?”

—“তার মানে বলতে চাইছ গল্পের মধ্যে কিছুটা আমাকে বলনি?”

—“বলিনি কারণ ভেবেছিলাম তুমি বুঝবে না। আসলে আমি বইয়ে পড়েছিলাম কুমিরররা ঠিক তোমার বর্ণনা মতই বারবার হানা দেয় একই লোকালয় বা জনপদে। ওদের মস্তিষ্কের একটা অংশ ওদের সাহায্য করে এই পথ খোঁজার কাজে। মাটির গভীরে থাকা চৌম্বকক্ষেত্রকে সনাক্ত করতে পারে কুমিরের দল। তাই পথ চিনে নিতে সুবিধা হয় ওদের। বুঝলে?”

—“এটুকু আমার জানা, তবে চুম্বক টুম্বকের বাগাড়ম্বরটা বাদ দিয়ে।”

—“কিন্তু চুম্বকের ব্যাপারটা না জানলে আমি ওর চোয়ালের দুপাশে লোডস্টোন বেঁধে দেবার কাজটা করতাম না। আর যদি তা না করতাম তাহলে রক্তের স্বাদ নিতে জন্তুটা আবার ফিরে আসতো এইখানে।”

—“কালো পাথরগুলোর সঙ্গে কুমিরটার সম্পর্ক কী?”

—“পাথরদুটোর চৌম্বকক্ষেত্র সরীসৃপটার মস্তিষ্কের চারদিকে একটা অদৃশ্য পর্দা বিছিয়ে দেয়, সেই পর্দা ভেদ করে ভূগর্ভের চৌম্বকক্ষেত্র ওর অনুভূতিতে ধরা দেবে না। ফলে এখন থেকে ও সমুদ্রে হন্যে হয়ে খুঁজবে আমাদের ঠিকানা ছাড়াই।”

—“ওহ, সোজা বাংলায় বল না বাপু!”

—“মানে, প্রাণীটা আর কিছুতেই ফিরবে না। বুঝলে?”

আর্গোস কিছুই না বলে একটা নিশ্চিন্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছিল, তাই বালির শয্যা ছেড়ে উঠলাম। শুকনো গাছের ডাল সাজিয়ে পাথর ঘষে আগুন জ্বালালাম। কয়েক পা এগিয়ে পাতলা ঢেউয়ের মধ্যে চোখ চালিয়ে একটা রুপোলি ঝলক দেখে ঝাঁপিয়ে পড়লাম তার ওপরে। নিডল ফিশ। লম্বা ছুঁচোল ঠোঁট, সাপের মত দীর্ঘ চেহারা। সুখাদ্য।

আগুনে ঝলসানো মাছটাকে যখন খিদের তাড়নায় চেটেপুটে খাচ্ছিলাম আর্গোস মুখ ব্যাজার করে আমায় শাপ শাপান্ত করছিল একমনে।

—“বর্বর...রাক্ষস কোথাকার... মানুষের এই লোভ....সবকিছু গিলে নিয়েছে...তবুও শিক্ষা নেই....অহম....অহম..অহম....খিদে... খিদে..সব শেষ করে দেব...স-অ-অ-ব...”

কিছুক্ষণ পর আগুনের আঁচ যখন কমে এসেছে, আর্গোস যখন ঘুমের ঘোরে আউড়ে যাচ্ছে মানুষের প্রতি তার তীব্র ঘৃণার কথাগুলো, আমি তখন কালচে নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে ছিলাম শান্তভাবে। নিভু নিভু আঁচ থেকে আগুনের ফুলকিগুলো হাওয়ার ধাক্কায় উড়ে যাচ্ছিল এলোমেলো। আমি তখন শুধুই ভাবছিলাম।

ভাবতে ভাবতে অজান্তেই কোমরে বাঁধা চামড়ার থলিতে হাত চলে গেছে কখন বুঝতে পারিনি। আর্গোস জানে না, ওকে পুরো গল্পটা শোনাইনি আমি। সবুজ দ্বীপে মাংসাশী প্রাণীটাকে ভাসিয়ে দিয়ে আমি যে খালি হাতে ফিরিনি সেটা ওকে বলতে দ্বিধা হয়েছিল। জানতাম না ও আসলে আমার গল্পের শেষটুকু শুনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। তাই যখন বুড়ো দার্শনিক ঘুমিয়ে পড়েছে ঠিক তখনিই থলের মধ্যে থেকে টেনে বার করতে ইচ্ছে হল আমার ‘আবিষ্কারটাকে’।

সবুজ দ্বীপ পেরিয়ে শান্ত সমুদ্রে যখন পড়লাম আমি আর অবধূত ঠিক তখনিই সাগরের বুকে অল্পজলে জেগে থাকা কোরাল প্রাচীরে গায়ে চকচক করতে দেখেছিলাম তাকে। কৌতূহল বড় বালাই। কাছে গিয়ে হাত বাড়াতেই লাল নীল হলুদ সবুজ বেগুনি কোরালগুলোর মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল একটা কাঁচের বোতল। মুখ বন্ধ। তার পেটের ভেতরে দুর্গন্ধময় সবজে জল, কাঁচের দেওয়ালে ধুলো আর শ্যাওলার পাতলা আস্তরণ। তার মধ্যেই একটুকরো কাগজ। মনের মধ্যে তখন এক দঙ্গল ভূমিকম্প। একটার পর একটা পাহাড় যেন ভেঙে পড়ছে মনের গভীরে। মনে পড়ছে মায়ের পড়া জুল ভার্নের সৃষ্ট সেই সব অভিযানগুলোর কথা। ওখানেও তো এরকমই হত। তাই না?

ছিপিটা খুলে কাগজের টুকরোটা বের করে চোখের সামনে ধরি। আগেও পড়েছি। নিভে আসা আলোর সামনে তুলে ধরলাম কাগজটাকে। আবার পড়লাম।

ছেড়াখোড়া আধভেজা কাগজের শরীর থেকে আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে। খসখসে তামাটে কাগজের গায়ে লেখা দুটো সংখ্যা। জলের ছোঁয়ায় তাদের খানিকটা মুছে গেছে। পড়ে আছে একটা অবিকৃত সম্ভাবনা।

‘১৭.৭১৩৪° দ, ১৭৮.০৬৫০° পূ’

খয়েরি রঙের ভাঙাচোরা সংখ্যা এবং বর্ণমালা। আপাত দৃষ্টিতে অর্থহীন। কিন্তু আমি জানি ওর মধ্যে লুকিয়ে থাকা গুপ্ত সংকেতের রহস্য। এতদিনের বই পড়ার অভিজ্ঞতা আমাকে চিনিয়ে দিয়েছে কাগজের বুকে ফুটে ওঠা বার্তার অর্থ।

অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ। একটা ঠিকানা। কেউ চরম বিপদের মধ্যে মরিয়া আশায় বুক বেঁধে তার অবস্থান জানিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে মহাসাগরের বুকে। কেউ অপেক্ষা করছে। উদ্ধার পাবার আশায়। কারা যেন অপেক্ষা করছে। আমার জন্য। কবে লেখা, কে পাঠিয়েছে এই বার্তা জানি না। সে আদৌ বেঁচে আছে কিনা জানি না। তবুও এই তারাভরা বিশাল আকাশের নিচে যে আমি যে বিলুপ্তপ্রায় একটি প্রজাতির শেষ নমুনা নই সেই কথাটাই ভাবতেই ইচ্ছে করল আজ। এই এক পৃথিবী ভর্তি জলজ দুনিয়ায় আমি যে সম্পূর্ণ একলাটি নই সেই ধারণাটা বারবার মনের মধ্যে গুঞ্জন করে উঠলো। রক্তে আবার পাল তোলার ইচ্ছে জাগলো। কিন্তু এই সুন্দর দ্বীপটা? তার কী হবে? এই ছায়াঘেরা দিন আর শান্ত তারকাখচিত রাতগুলো? আমার সবুজে ঘেরা ছোট্ট রাজত্ব? তাদের কী হবে? ওই তিনটে পাথরের টুকরো, আমার পরিবার পরিজন? তাদের কী হবে? আর্গোস—আমার একমাত্র বন্ধু, তাকেই বা কীভাবে বলব, “বিদায়”?

প্রশ্নগুলো আমায় ভাবাচ্ছিল। কিন্তু সব প্রশ্নের আড়ালে ওই চিরকুটে লেখা বোতলবন্দি ঠিকানাটা বারবার চোখের সামনে ভাসছিল। কানের পর্দায় ধাক্কা মারছিল অদৃশ্য দামামার বাজনা আর একটা বাক্য, “But still, like dust, I’ll rise”

সমুদ্দুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ মুড়ে শুয়ে পড়ল। আমিও আর্গোসের শক্ত খোলসে মাথা রেখে ঘুমের হাতে আত্মসমর্পণ করলাম।

আমাদের দ্বীপে আলতো পায়ে নিঝুম নির্জনতা নেমে এলো সবার অলক্ষ্যে!

(অ)সমাপ্ত

পাঠকেরা যা পড়ছেন