রক্তবীজ - বিভাবসু দে

অলংকরণ : সুমিত রায়

আবার সেই একই উত্তর। এই নিয়ে তিনবার হল। প্রতিবার সেই একই কথা... “এধরণের গবেষণা প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিতে হস্তক্ষেপের সামিল, তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রক এর পরীক্ষাগত প্রয়োগের অনুমতি দিতে অপারগ।”

হাঃ! ওরা কি আদৌ বোঝে এই গবেষণা সফল হলে মানুষের জীবনে কী বিরাট আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবে! বিবর্তনের পুরো গতিধারাই পাল্টে যাবে এক ধাক্কায়। হয়তো সবই বোঝে ওরা, কিংবা হয়তো বুঝেও বুঝতে চায় না। আসলে বিজ্ঞানকে বোধহয় বিজ্ঞানীরাই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, ঠিক যেমন সত্যের মুখোমুখি হতে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় তথাকথিত সত্যের পূজারীরাই!

একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এল কৃষ্ণার বুক ঠেলে। চোখেমুখে হতাশার কালচে ছায়া। মন্ত্রক থেকে আসা ভার্চুয়াল লেটারটা এখনও ভেসে আছে ওর চোখের সামনে। কে জানে কবে অনুমতি জুটবে, আদৌ জুটবে কি-না!

আজ একবছর হতে চলল, শুধুমাত্র একটা অনুমতির জন্যে আটকে আছে সবকিছু। কাজটা প্রায় পাঁচবছর আগে শুরু করেছিল কৃষ্ণা। দিনরাত এক করে খেটেছে ওই যৌগটার পেছনে। সুটানো ক্লুয়েজ। একটা অত্যন্ত জটিল জৈব-রাসায়নিক যৌগ। ঠিক পাঁচ এম.এল, আর মানবজাতির পুরো ভবিষ্যতটাই বদলে যাবে! দেড়বছর আগে প্রথমবার গিনিপিগের ওপর পরীক্ষাটা করেছিল ও। একটা গিনিপিগের গায়ে সেই নীলাভ-কালো তরলটা ইনজেক্ট করে ওটার ল্যাজটা কেটে দিয়েছিল। নিয়মমতো সাবজেক্টকে অজ্ঞান করেই এধরণের পরীক্ষা করতে হয়, কিন্তু এক্ষত্রে জ্ঞান থাকাটা জরুরি। কারণ পুরো ব্যাপারটাই ঐচ্ছিকভাবে, মানে মস্তিষ্কের সক্রিয় অবস্থায় হতে হবে।

খুব স্বাভাবিকভাবেই কয়েক সেকেন্ড ব্যথায় ছটফট করল গিনিপিগটা, কিন্তু তারপর...নিজের চোখের সামনে যেন বায়োটেকনোলজির এক যুগান্তর ঘটতে দেখছিল কৃষ্ণা। মাত্র একমিনিটের মধ্যে আবার ল্যাজ গজিয়ে গেল গিনিপিগটার। এক্কেবারে আগের মতোই।

আবার এগিয়ে গেল কৃষ্ণা; এবার একটা পা কেটে দিল। আবার সেই কয়েক সেকেন্ডের ছটফটানি, কিন্তু তারপরেই মুহূর্তের মধ্যে গিনিপিগটার কাটা জায়গায় নতুন পা গজিয়ে উঠল।

সেদিন যেন আনন্দে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিল কৃষ্ণার। ওর এতদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম সফল।

 

বাড়ির দেয়ালে ঘুরে বেড়ানো একটা ছোট্ট টিকটিকি, সেই থেকেই আইডিয়াটা মাথায় এসেছিল কৃষ্ণার। টিকটিকির ল্যাজ কাটা পড়লে আবার আস্তে আস্তে সেই জায়গায় নতুন ল্যাজ গজিয়ে ওঠে; জিনিসটা কারোরই অজানা নয়। কিন্তু সেই পুরো ব্যাপারটাই ঘটে প্রকৃতির নিয়মে, অনৈচ্ছিকভাবেই। কিন্তু যদি এই একই জিনিসকে ঐচ্ছিক করে তোলা যায়? শুধু ল্যাজ কেন, যদি যেকোনও কাটা-পড়া অঙ্গকেই এভাবে ফিরিয়ে আনা যায়? আর সেটা যদি করা যায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডে? চিন্তাগুলো যেন বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠছিল কৃষ্ণার মাথায়।

অঙ্গ! কীভাবে তৈরী হয় দেহের একেকটা অঙ্গ? কোষ দিয়ে। জীবদেহে অনেকধরণের কোষ থাকে। পেশীকোষ, চর্মকোষ, নিউরোন, রক্তকোষ আরও কত কী! কিন্তু কীভাবে আসে এত এত রকমের কোষ? উত্তরটা মোটেই অজানা নয় কৃষ্ণার কাছে। স্টেমসেল। এমন এক বিশেষ ধরণের কোষ যা থেকে প্রয়োজনে অন্য যেকোনও ধরণের কোষ উৎপন্ন হতে পারে। মানুষের দেহেও থাকে ; অস্থিমজ্জায়, অ্যাডিপোস টিস্যুতে। এগুলোকে মোটামুটিভাবে অ্যাডাল্ট স্টেমসেল বলা হয়, এছাড়াও অ্যামব্রায়োনিক স্টেমসেল থাকে ভ্রূণের আদি অবস্থায়। স্টেমসেলকে কাজে লাগিয়ে বেশ কিছু চিকিৎসাপদ্ধতিও রয়েছে, কিন্তু ব্যাপারটা হল সেই সব ব্যবস্থাই যথেষ্ট জটিল ও সময়সাপেক্ষ। যদি এমন কিছু করা যায় যাতে মানুষ ইচ্ছামত নিজের দেহে থাকা স্টেমসেলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারবে যেকোনও কাটা-পড়া বা আহত অঙ্গ! শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো লাগলেও কৃষ্ণার মন বলছিল একাজ সম্ভব; ও পারবে। আর সে পেরেও ছিল।

কিন্তু একটা সমস্যা ছিল, যেটা তখন চোখে পড়েনি। পরীক্ষার একদিন পর ও খেয়াল করল গিনিপিগটার গায়ের রঙ যেন আস্তে আস্তে ওই তরলটার মতোই নীলাভ-কালো হয়ে উঠছে। কিন্তু এছাড়া আর কোনও পরিবর্তন বা অস্বাভাবিকতা নেই। রোজকার মতোই সবকিছু করে যাচ্ছে গিনিপিগটা। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে নিজের ছোট্ট খাঁচায় তুরতুর করে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি, সব।

আবার কাজ শুরু করল কৃষ্ণা। যৌগটার আণবিক গঠনে কিছু ফের-বদল করে আবার পরীক্ষা করল সে। এবার সব রেজাল্ট পারফেক্ট! অন্তত গিনিপিগের ক্ষেত্রে।

কৃষ্ণা বেশ বুঝতে পারছিল ও যা করেছে তা যদি ঠিকঠাকভাবে প্রয়োগ করা যায় তবে মানব-ইতিহাসের গতিমুখটাই ঘুরে যাবে।

কিন্তু সেখানেই শুরু হল সমস্যাটা। অনুমতি! মানুষের ওপর এই পরীক্ষা করতে গেলে ওপর থেকে পারমিশন চাই। গত একবছর ধরে বারবার চেষ্টা করেও কিছুই সুবিধা করে উঠতে পারেনি কৃষ্ণা। মন্ত্রকের দপ্তরে বসে থাকা তথাকথিত বড় বড় বিজ্ঞানীদের সেই এক কথা! এধরণের গবেষণা নাকি প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ!

প্রথমবার যখন এই উত্তর এসেছিল, ভারী অবাক হয়েছিল কৃষ্ণা। যাদের প্রকৃতিকে এত ভয় তারা আবার বিজ্ঞানী হয় কীভাবে? ছোটবেলা থেকে ওর একনিষ্ঠ বিজ্ঞানসাধক বাবার মুখে ও বারবার একটা কথাই শুনেছে, যেখানে চেতনার প্রকাশ যত বেশি, সেখানে প্রকৃতির শৃঙ্খল ভাঙার তাগিদও তত বেশি। আর চেতনার উদ্বোধনই তো সত্যিকারের বিজ্ঞান।

কিন্তু নিজের জীবনে গবেষণা করতে এসে বারবার উল্টোটাই দেখতে হয়েছে ওকে। বিজ্ঞানে সত্যের সন্ধান ভুলে গিয়ে শুধু রিসার্চ-পেপারের সংখ্যা আর উঁচু পদের লোভটাই যেন বড় হয়ে উঠেছে চারপাশে। আর যেখানে লোভ সেখানেই ভয়!

 

যতবার মন্ত্রকের ওই চিঠিটার দিকে চোখ পড়ছিল, একটা চাপা রাগে যেন ফুঁসে উঠছিল কৃষ্ণা। “নাহ্, এভাবে কতগুলো অদূরদর্শী মূর্খের জন্যে এতবড় একটা গবেষণা হারিয়ে যাবে, তা কখনও হয় না। হতে দেব না আমি।”

কিন্তু কী করবে ও? গিনিপিগের ওপর ওর কাজ যতই সফল হোক, মানুষের ওপর এর ফলাফল না জানতে পারলে যে এই গবেষণার আসল উদ্দেশ্যই পূর্ণ হবে না। পঙ্গু, আতুর মানুষকে আবার তাদের সম্পূর্ণ অবয়ব ফিরিয়ে দেবার জন্যেই তো এতকিছু, এত পরিশ্রম।

ল্যাবের ডানদিকের দেয়াল ঘেঁষে বানানো ধপধপে সাদা স্পেশাল চেম্বারটা, তারই ভেতর প্রায় তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা আছে সেই তরল সুটানো ক্লুয়েজ। আজ একবছর ধরে অপেক্ষা করছে নিজের পূর্ণতার।

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল কৃষ্ণা। ওর বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে, কিন্তু এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। কাজটা ওকে করতেই হবে।

অন্যের ওপর যদি না-ই হয়, তবে নিজের ওপরই হোক! ওর মাথার ভেতর শিরাগুলো যেন দপদপ করে উঠল। সিরিঞ্জের তীক্ষ্ন সুচে কৃষ্ণা নিজেই নিজের বাঁহাতের ধমনীতে ঢেলে দিল সেই নীলাভ-কালো তরল। ঠিক পাঁচ এম.এল।

এবার পরীক্ষার দ্বিতীয়ধাপ, ওকে নিজের একটা অঙ্গ কাটতে হবে।

কিন্তু তার আগেই হঠাৎ কৃষ্ণার মাথাটা কেমন যেন পাক খেয়ে উঠল, চোখের সামনে সব কেমন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল একটু একটু করে। দেয়াল ধরেও আর টাল সামলাতে পারল না কৃষ্ণা।

 

ও যে কতক্ষণ এভাবে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল কে জানে! মাথাটা এখনও বড্ড ভার হয়ে আছে। হাতের ওপর ভর দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে বসল কৃষ্ণা।

ক'টা বাজে এখন? বোধহয় রাত হয়ে গেছে! কিন্তু সময় দেখতে গিয়েই ওর হঠাৎ খেয়াল হল হাতের রিস্ট-মোবাইলটা যেন হালকা হালকা কাঁপছে। সেটাতে আঙুল ছোঁয়াতেই কৃষ্ণার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা ছোট্ট চোরকোণা ত্রিমাত্রিক পর্দা।

একি! সাতাশটা মিসকল! সবগুলোই ওর বাবার। “কিন্তু বাবা এভাবে হঠাৎ এতবার কল করল কেন?”

কৃষ্ণার বাবা মানে প্রফেসর হিমাদ্রিশেখর নিজেও একজন অত্যন্ত ব্যস্ত মহাকাশবিজ্ঞানী। অযথা মেয়েকে নিয়ে চিন্তা করার লোক উনি নন। আর উনি তো ভালো করেই জানেন যে কৃষ্ণার এখন ল্যাবে থাকার কথা। এছাড়া আজ তো প্রফেসর হিমাদ্রিশেখরের বাড়ি ফেরার কথাও নয়। 'নোভা' সদ্য ফিরেছে পৃথিবীর মাটিতে; আজ সেটা নিয়েই সারারাত কাজ করবার কথা ওঁর। তবে কি কিছু...

কল-ব্যাক করতেই যাচ্ছিল কৃষ্ণা কিন্তু তখনই হঠাৎ নোটিফিকেশনটা ঝলকে উঠল সামনের সেই ছোট্ট পর্দায়। ওর বাবার করা একটা থ্রি-ডি লাইভ ম্যাসেজ। আঙুল ছুঁইয়ে রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণার সামনে ভেসে উঠল হিমাদ্রিশেখরের একটা ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ।

ওঁর দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল কৃষ্ণার। “বাবা তুমি ঠিক আছো তো? এমন দেখাচ্ছে কেন?”

সত্যিই বড্ড বিধ্বস্ত লাগছিল হিমাদ্রিশেখরকে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, দুচোখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। যেন কোনও অদৃশ্য বিপদের ভয়ে বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। কিছু একটা যে হয়েছে, মোটেই বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না কৃষ্ণার।

“বলছি, সব বলছি। কৃষ্ণা, আমাদের সামনে এখন অনেক বড় বিপদ।” এক অজানা ভয়ে বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছিল হিমাদ্রিশেখরের গলাটা। “যেই কথাগুলো বলছি মন দিয়ে শোন।”

কৃষ্ণার বুকের ধুকপুকানিটা বাড়ছে। ওর চোখে উত্তেজনা আর ভয়ের এক তীব্র মিশেল। আকুল চোখদুটোতে একঝাঁক প্রশ্ন নিয়ে বাবার দিকে তাকাল কৃষ্ণা।

হিমাদ্রিশেখর আবার বলতে লাগলেন, “তোকে আগেই বলেছিলাম, মহাকাশযান 'নোভা' গতকালই শুক্র গ্রহ থেকে ফিরেছে, আর আজ আমি সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকব। বিকেল থেকেই কাজ শুরু হয়ে গেছিল ; 'নোভা'-র ইনার চেম্বার আনলক করে শুক্র থেকে আনা খনিজ ও অন্যান্য পদার্থ পরীক্ষার জন্যে বের করা হচ্ছিল। ঠিকঠাকই চলছিল সবকিছু। আমি নিজেই প্রতিটা সেম্পল-বক্স একবার করে দেখে দেখে রাখছিলাম। এমনসময় হঠাৎ আমার চোখ পড়ে কিছু পাথুরে খনিজের গায়ে লেগে থাকা লাল রঙের একটা দাগের ওপর; খালি চোখে শুকনো ছত্রাক জাতীয় কিছু বলেই মনে হচ্ছিল। কে জানত যে তাতেই সর্বনাশের বীজ লুকিয়ে আছে!”

বলতে বলতে হঠাৎ চমকে পেছন ফিরলেন হিমাদ্রিশেখর, যেন কিছু একটা শুনতে পেয়েছেন। যেন কারও পায়ের শব্দ।

“কী হল বাবা? ঘরে কি কেউ আছে?” একটা চাপা উত্তেজনা যেন ঠিকরে পড়ছিল কৃষ্ণার গলায়। কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম।

কিন্তু কথাটা বোধহয় ঠিক শুনতে পেলেন না হিমাদ্রিশেখর। কোনও জবাব না দিয়েই আবার বলতে শুরু করলেন, “জিনিসটা প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করার জন্যে রাকেশকে দিয়েছিলাম আমি। সে স্পেস-সেন্টারের আরেকটা ঘরে নিয়ে গিয়ে সেটার ওপর কাজ শুরু করে; আমি ছিলাম না সেখানে।

“প্রায় মিনিট কুড়ি হবে, হঠাৎ রাকেশের চিৎকারে চমকে উঠলাম সবাই। দৌড়ে ও-ঘরে যেতেই দেখি রাকেশ দু'হাতে মাথা চেপে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করে যাচ্ছে আর ওর সারা শরীর বারবার কেঁপে উঠছে ভয়ানক খিঁচুনিতে। আমরা এগোতে যাচ্ছিলাম কিন্তু রাকেশ আরও জোরে চিৎকার করে উঠল, 'কাছে আসবেন না প্রফেসর। ওই ছত্রাক...'; কথাগুলো জড়িয়ে আসতে লাগল ওর। কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু তখনও যে অবাক হবার অনেক বাকি!

“একটু পরে আস্তে আস্তে চিৎকার থেমে গেল রাকেশের, উঠে বসল সে। কিন্তু ওর চোখমুখ কেমন যেন ঘোলাটে, শরীরের চামড়াটাও বেশ লালচে হয়ে উঠেছে। আমরা ডাকলাম কিন্তু সে কোনও সাড়া দিল না। ডক্টর কৃষ্ণমূর্তি ওকে ধরে তোলবার জন্যে এগিয়ে গেলেন, আর তখনই সেই বীভৎস ঘটনা! কৃষ্ণমূর্তিকে হিংস্র বাঘের মতো খামচে ধরে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রাকেশ। আমরা কিছু বুঝে উঠবার আগেই চোখের নিমেষে জঙ্গলি জানোয়ারের মতো কৃষ্ণমূর্তির বুক চিরে, সারা শরীর খুবলে মাংস ছিঁড়ে খেতে শুরু করল সে।”

“কী বলছো বাবা! রাকেশ?” আতঙ্কে ঘেন্নায় পেটের নাড়িভুঁড়ি অবধি যেন গুলিয়ে উঠছিল কৃষ্ণার। রাকেশকে ও ভালোভাবেই চেনে, বাড়িতেও এসেছে ওদের। গুজরাটি বামুন; মাংস তো দূর, ডিম দেয়া কেক অবধি ছোঁয় না সে। আর সে কিনা...নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না কৃষ্ণা।

“হ্যাঁ, আমরাও বুঝে উঠতে পারছিলাম না ওটা স্বপ্ন না বাস্তব। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য যে আমাদের নিজের চোখে দেখা। গলগল করে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা; সাদা মেঝে লাল হয়ে উঠছে আমাদের চোখের সামনে। সেই মুহূর্তে আমাদের পাগুলো যেন আতঙ্কে পাথর হয়ে মাটিতে গেঁথে গেছিল। কী করব কেউ কিছুই বুঝতে পারছি না। তখনই হঠাৎ প্রফেসর সিং একটা ভারী রড তুলে পেছন থেকে রাকেশের মাথায় ঘা মারলেন, বেশ জোরেই। মাথা ফেটে রক্তের ফোঁটা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। আর তারপর যা ঘটল তা সুস্থ মস্তিষ্কের যেকোনও মানুষের কাছে আষাঢ়ে গপ্পই মনে হবে।

“দেখতে দেখতে সেই রক্তের ফোঁটাগুলো মুহূর্তের মধ্যে জমাট বেঁধে আকারে বেড়ে উঠতে লাগল আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হবহু রাকেশের মতো আরও প্রায় পাঁচ-ছ'টা মানুষ তৈরী হয়ে গেল। জীবন্ত! ঠিক যেখানে যেখানে রক্তের ছিটে পড়েছিল সেখানে সেখানে একটা করে মানুষ গড়ে উঠতে লাগল। অনেকটা পুরাণের সেই রক্তবীজের মতো। অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্য, নিজের চোখে দেখা সত্য।”

বাবার কথাগুলো শুনতে শুনতে যেন শ্বাস নিতেও ভুলে যাচ্ছিল কৃষ্ণা। এও কি সম্ভব? রক্তের ফোঁটা থেকে আস্ত একটা মানুষ!

হিমাদ্রিশেখর তখনও একনাগাড়ে বলে চলেছেন, “ওরা আস্তে আস্তে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল। চোখে একটা অদ্ভুত হিমশীতল পাথুরে চাউনি, ঠিক যেন একদল চলমান মৃতদেহ! আমাদের কয়েকজন তখনই ছুটে পালাল; আমিও পিছোতে লাগলাম। যেই লোকটা প্রফেসর সিং-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, সিং তার বুকে রডটা গেঁথে দিল। আবার রক্ত ছিটকে পড়ল, আর আবার সেই একই ঘটনা। কিন্তু এবার আরেকটা জিনিস লক্ষ করলাম। রক্তের কিছু ছিটে সিং-এর গায়েও পড়েছিল, কিন্তু সেগুলো দেখতে দেখতে উবে গেল, যেন শরীরে শুষে গেছে রক্তবিন্দুগুলো। ঠিক যেমনটা স্পঞ্জ জলকে শুষে নেয়।

“আর তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঠিক একইভাবে মাথা চেপে ধরে ছটফট করতে লাগল সিং; ঠিক যেভাবে আমরা এসে রাকেশকে দেখতে পেয়েছিলাম।

ব্যাপারটা আরও ধোঁয়াটে হয়ে উঠছিল আমার কাছে, কিছু একটা বুঝেও ঠিক যেন বুঝতে পারছিলাম না। মন বলছিল এই অদ্ভুত ঘটনার আড়ালে থাকা বিজ্ঞানটা আমাদের কাছে খুব একটা অচেনা নয়, কিন্তু কিছুতেই যেন ধরতে পারছিলাম না।

“তবে তখন আর সেখানে দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না, অনেকটাই কাছে এসে পড়েছিল ওরা। দাঁড়ালে মৃত্যু অনিবার্য। স্পেস-সেন্টারের ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে ছুটে পালালাম আমি আর রাঘবন। আর তারপর প্রায় উর্দ্ধশ্বাসে যে যার মতো গাড়ি ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম...; কিন্তু পিছু ছাড়েনি ওরা। শিকারী বাঘের মতো গাড়ির পেছনে ছুটছিল। তবু যত জোরে পেরেছি গাড়ি ছুটিয়েছি।

“কিন্তু একসময়, যখন গাড়ি আমাদের বাড়ির প্রায় কাছাকাছি তখনই ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে এল; তাই বাধ্য হয়ে আমি বাড়িতেই, বেসমেন্টে লুকিয়ে পড়লাম। কিন্তু কতক্ষণ এভাবে থাকতে পারব জানি না।

“ভেবেছিলাম ওরা হয়তো এতদূর আসতে পারবে না, কিন্তু সেটা আমার ভুল ছিল। ওরা পৌঁছে গেছে। ঘরের ভেতর ওদের চলাফেরার শব্দ পাচ্ছি। ওরা পাগলের মতো খুঁজছে আমাকে। হয়তো এই শেষ!” গলাটা ভারী হয়ে এল হিমাদ্রিশেখরের। “আমি বেশ বুঝতে পারছি, পৃথিবী এক ভয়ানক বিপদের মুখোমুখি হতে চলেছে। এমন মহাজাগতিক সমস্যার সম্মুখীন আমরা এর আগে কোনওদিন হইনি। জানি না, মানবজাতি এই আণুবীক্ষণিক ভিনগ্রহীদের হাত থেকে আদৌ বাঁচতে পারবে কি-না। তবু বাবা হিসেবে একটা কথা বলছি কৃষ্ণা, আমার যাই হোক, তুই বাড়ি ফিরিস না। যতদূরে হয় পালিয়ে যা! পালিয়ে...”

হিমাদ্রিশেখরের ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল; অস্পষ্ট হয়ে আসতে লাগল শেষের কথাগুলো।

“বাবা। বাবা...”, একটা তীব্র আর্তনাদে ভেঙে পড়ল কৃষ্ণা। ভয়, দুশ্চিন্তা আর এক অজানা আতঙ্ক, যেন একসঙ্গে কৃষ্ণার বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে উঠছিল। থিরথির করে কাঁপছিল ওর হাতের আঙুলগুলো। সারা শরীর ভিজে যাচ্ছিল ঘামে।

“কী করব এখন? দূরে কোথাও পালিয়ে যাব? কিন্তু বাবা? না না, এভাবে বাবাকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে পালাতে পারব না, কিছুতেই না। আমাকে খুঁজতেই হবে...হয়তো বাবা এখনও বেসমেন্টেই লুকিয়ে আছে, হয়তো এখনও ওঁর খোঁজ পায়নি সেই রক্তবীজের দল।” পাগলের মতো বিড়বিড় করতে করতে উঠে দাঁড়াল কৃষ্ণা। শরীরটা এখনও বেশ দুর্বল লাগছে, তবু ওকে যেতেই হবে। বাষ্পে ভেজা চোখদুটো মুছতে মুছতে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ল সে।

ল্যাবের বাইরের ফ্লোটিং-পার্কিঙেই রাখা ছিল গাড়িটা। যত জোরে সম্ভব, ছোটাল কৃষ্ণা। ওর বুকের ভেতরে যেন কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। প্রতিটা সেকেন্ডে এক অজানা ভয় আরও আরও কালো হয়ে ঘিরে ধরছে ওকে।

হাতে সময় খুব কম; ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টকে আরও স্পিড বাড়াতে বলল কৃষ্ণা। “যত জোরে পারো যাও। মেইক ইট ফাস্টার!” গাড়ি এখন আড়াইশো মাইল প্রতি মিনিটে চলছে। বারবার রিস্ট-মোবাইলে সময় দেখছে কৃষ্ণা। আরও প্রায় চার মিনিট।

কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না সে, আরও মাইলখানেক যাবার পরই হঠাৎ একটা রাস্তার মোড়ে এসে ব্রেক কষতে হল। লোকজন পাগলের যে যেদিকে পারছে ছুটছে। সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়া। একটু দূরে কিছু পুলিশও দেখা যাচ্ছে, লেজার বন্দুকের শব্দ শোনা যাচ্ছে বেশ। তাহলে কি...

গাড়ি থেকে নেমে পড়ল কৃষ্ণা। কিছুটা এগিয়ে যেতেই বুঝল ওর ধারণা ভুল ছিল না। হিমাদ্রিশেখর যেই বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তা এর মধ্যেই শহরের বুকে আছড়ে পড়েছে। এতক্ষণে হয়তো সংখ্যায় অনেকটাই বেড়ে গেছে ওই রক্তবীজের দল।

এমনসময় হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দে বেশ কতগুলো মিলিটারি অ্যারো-ট্রাক এসে নামল আকাশ থেকে, পুরো রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়াল সেগুলো। আর তার ভেতর থেকে দলে দলে স্পেশাল অ্যাকশন ফোর্সের লোকেরা অস্ত্র হাতে এগিয়ে যেতে লাগল সেই ভিড়ের দিকে। তার মানে অবস্থা যথেষ্টই গুরুতর হয়ে উঠেছে।

“কিন্তু বাবার কথা যদি ঠিক হয় তবে তো এদের গুলিতে বিপদ আরও বাড়বে বই কমবে না। যত রক্ত ছিটকে পড়বে তত রক্তবীজ গড়ে উঠবে। এদের আটকাবার কি কোনও রাস্তা নেই?”

বাইরে থেকে দেখতে ব্যাপারটা যতই অদ্ভুত লাগুক, এর আড়ালেও কোনও না কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অবশ্যই লুকিয়ে আছে।

কৃষ্ণার চোখদুটো সরু হয়ে এল। রাস্তার ওদিক থেকে তখনও একইভাবে ভেসে আসছে ভয়ার্ত মানুষের চিৎকার। ওর মাথার ভেতর কতগুলো এলোমেলো চিন্তা যেন জলের ওপর টানা দাগের বারবার মতো কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। ওই ভিনগ্রহী ছত্রাকের মোটামুটি দুটো ধর্ম আছে; এক, মাটিতে পড়লে মানে খোলা হাওয়ায় এলেই মানুষের আকৃতি নিতে পারে, মানে তীব্র গতিতে এবং কোনও এক অজানা জেনেটিক কোড মেনে কোষবিভাজন। আর দুই, যেকোনও মানুষের এবং খুবসম্ভবত যেকোনও জীবের শরীরের রোমকূপের মধ্য দিয়ে ভেতরে ঢুকে পারার ক্ষমতা। তারপর সেই ব্যক্তির পুরো সত্তাই পাল্টে দেয় ওরা, সেই ব্যক্তি নিজেই তখন একটা রক্তবীজ হয়ে ওঠে। তবে কি এই ছত্রাক কোষ জীবদেহের কোষগুলোকে খেয়ে নিজেরাই সেসব কোষের জায়গা দখল করে নেয়? যদি...

তখনই হঠাৎ একটা চেনা শব্দে কৃষ্ণার মাথায় চিন্তার সুতোটা যেন ছিঁড়ে গেল। ফিরে তাকাল সে। “বাবা!”

ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হিমাদ্রিশেখর।

“বাবা, তুমি ঠিক আ...”, কিন্তু মুখের কথাটা আর শেষ করতে পারল না কৃষ্ণা, কয়েক পা এগোতেই বুকটা কেঁপে উঠল ওর। আতঙ্ক আর দুঃখ যেন মনের ভেতর একসঙ্গে ঝড় হয়ে ভেঙে পড়ল। হিমাদ্রিশেখরের চোখদুটো স্থির, পাথরের মতো ঠান্ডা আর শরীরটা যেন কেমন লালচে হয়ে উঠেছে। ঠিক যেমনটা ওই ম্যাসেজে বলেছিলেন হিমাদ্রিশেখর।

আস্তে আস্তে পিছোতে লাগল কৃষ্ণা। ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল। ভয় আর ব্যথার এক প্রচণ্ড টানাপোড়েনে ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে ওর। মনের আনাচে-কানাচে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে সবকিছু।

হঠাৎ কিছু না ভেবেই পেছন ফিরে একটা অন্ধকার মতো গলির দিকে ছুটল কৃষ্ণা। দু'পাশে আকাশছোঁয়া দালানের মধ্যে একটা স্যাঁতসেঁতে সরু ঘুপচি গলি। রাতের অন্ধকারে যেন আরও বেশি কালো মনে হচ্ছে ওর ভেতরটা, যেন একটা হাঁ করে থাকা অদৃশ্য অজগর। সেই অন্ধকারের মধ্যেই আরও জোরে ছুটতে লাগল সে।

কিন্তু কিছুটা গিয়েই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল কৃষ্ণার। গলির মুখ বন্ধ, আর রাস্তা নেই। সামনে উঁচু দেয়াল।

হাপরের মতো উঠছে-নামছে ওর বুকটা। মাথা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গরম ঘাম। চারপাশের এই গুমোট নিস্তব্ধতায় বুকের ঢিপঢিপ শব্দটাও এখন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ও। আর তখনই পেছন থেকে সেই পরিচিত পায়ের শব্দ! ধক করে উঠল ওর ভেতরটা, শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা শিরশিরে স্রোত নেমে গেল।

কৃষ্ণা ভালোভাবেই জানে কে দাঁড়িয়ে আছে ওখানে, তবু পেছন ফিরতে গিয়ে যেন একটা বাঁধভাঙা কান্নায় বুকের পাঁজরগুলো অবধি ছিঁড়ে আসতে লাগল ওর। গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন হিমাদ্রিশেখর...অথবা তাঁর মতো দেখতে এক রক্তবীজ!

সেই ঘোলাটে চোখদুটো হিংস্র চাউনি নিয়ে তাকিয়ে আছে কৃষ্ণার দিকে।

“বাবা...”, কষ্টটা যেন আরও তীক্ষ্ন হয়ে বুকে বিঁধছে ওর। একটা দলা পাকিয়ে ওঠা কান্না, ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল কৃষ্ণা। ঘাম আর চোখের জল, মিশে যাচ্ছে ওর গলা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে। ঝাপসা চোখে যেন জন্মান্তরের স্মৃতির মতো ভেসে উঠছে ছোটবেলার কত কত ছবি। বাবার কোলে বসে কাটানো হাজারো মুহূর্তগুলোর ভিড়, শীতের দুপুরে মিঠে রোদে গা এলিয়ে বাবার মুখে শোনা সেসব বিজ্ঞানের গল্প... আর বাবা! সেই মায়ামাখা মুখটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠতে লাগল কৃষ্ণার চোখের সামনে। আর ঠিক তখনই ওর চোখ পড়ল সামনে থেকে এগিয়ে আসা ওই ঘোলাটে চোখদুটোতে। কী ভীষণ প্রাণহীন সেই দৃষ্টি।

“না, এভাবে মরব না আমি। একবার অন্তত লড়তেই হবে। যে সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে তো আমার বাবা নয়, ওঁর অবয়বে শুধু একদলা ভিনগ্রহী ছত্রাক।” দেয়াল ঘেঁষেই আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল কৃষ্ণা। ততক্ষণে আরও কাছে এগিয়ে এসেছে সেই রক্তবীজ। ওর ঠোঁটের ফাঁকে ঝিলিক দিচ্ছে রক্তেভেজা দাঁতগুলো। আর তখনই হঠাৎ...কৃষ্ণা সেই ভুলটাই করল যা শেষমুহূর্তে হিমাদ্রিশেখরও করেছিলেন। পাশে পড়ে থাকা একটা তিনকোণা লম্বাটে কাঠের টুকরো সেই রক্তবীজের পেটে গেঁথে দিল কৃষ্ণা। সঙ্গে সঙ্গে বেশ খানিকটা থকথকে রক্ত ছিটকে পড়ল ওর চোখেমুখে।

প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। মাথাটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যথায়। চোখমুখ কুঁচকে যাচ্ছে ওর। সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে খিঁচুনিতে। হয়তো আর কয়েক সেকেন্ড, তারপরেই কৃষ্ণাও বদলে যাবে একটা রক্তবীজে।

অসহ্য একটা জ্বালাপোড়া! সারাটা গা যেন জ্বলে যাচ্ছে ওর, পুড়ে যাচ্ছে ভেতর থেকে। ওর গলা চিরে বেরিয়ে এল একটা তীব্র আর্তনাদ।

এই কি তবে শেষ?

কিন্তু হঠাৎ যন্ত্রণাটা যেন কমতে লাগল একটু একটু করে। মাথাটাও হালকা হয়ে আসছে। গায়ের জোরে নিজেকে ঠেলে উঠে বসল কৃষ্ণা। ওর চোখের সামনে এখন ওর বাবার মতো দেখতে ছয়টা রক্তবীজ দাঁড়িয়ে আছে ; হিমাদ্রিশেখরের শরীর থেকে ছিটকে পড়া রক্তেই জন্ম হয়েছে এদের। স্থির দৃষ্টিতে কৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। কৃষ্ণাও কি তবে এখন ওদেরই একজন?

এমনসময় হঠাৎ নিজের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল সে। ওর সারটা শরীর নীলাভ-কালো হয়ে উঠেছে। ঝড়ের কালো রাতে বিদ্যুতের রেখার মতো পুরো ব্যাপারটা যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল ওর মাথায়। “সুটানো ক্লুয়েজ!”

ওই ভিনগ্রহী ছত্রাক থেকে উৎপন্ন প্রতিটা রক্তকণা আসলে একেকটা স্টেমসেল যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও অত্যন্ত দ্রুত বিভাজিত হয়ে, যেই শরীর থেকে ছিটকে পড়েছে তারই একটা প্রতিরূপ তৈরী করে ফেলে। এটাই এই রক্তবীজের পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল বিজ্ঞান। আর কৃষ্ণার আবিষ্কৃত সেই যৌগ তো স্টেমসেলকে নিয়ন্ত্রণ করারই শক্তি দেয়। কৃষ্ণার শরীরে ঢুকে পড়া সেই সর্বগ্রাসী ছত্রাক এখন ওর নিয়ন্ত্রণে।

 

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল কৃষ্ণা। ওর ভেতরে যেন একটা অজানা শক্তি দাউদাউ করে জ্বলছে। একটা বীভৎস পৈশাচিক তরঙ্গ শিরশির করে ছড়িয়ে পড়ছে ওর প্রতিটা স্নায়ুতে। যেন সর্বনাশের এক বাঁধভাঙা স্রোত!

হঠাৎ হিংস্র সিংহের মতো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রক্তবীজটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কৃষ্ণা। যেন ওর অস্তিত্বের গভীর থেকে কোনও এক অজানা শক্তি চালিত করছিল ওকে।

শরীরের সব শক্তি দিয়ে কৃষ্ণাকে মারার চেষ্টা করতে লাগল সেই রক্তবীজ, জোরালো কামড়ে কৃষ্ণার কাঁধ থেকে একদলা মাংস ছিঁড়ে নিল সে। কিন্তু দেখতে দেখতে আবার ভরাট হয়ে উঠল সেই জায়গা, যেন কিছুই হয়নি!

কৃষ্ণার কাছে একটু একটু করে খোলসা হয়ে উঠছে নিজের আবিষ্কৃত সেই যৌগ আর এই মারণ-ছত্রাকের মিলিত শক্তির রহস্য...কৃষ্ণার শরীরের প্রতিটা কোষ যেন অনুভব করছে ওর দেহে তিলতিল করে জেগে উঠতে থাকা সেই ভয়ঙ্কর সত্তাকে।

কৃষ্ণা নিজের শরীরে ঢুকে পড়া এলিয়েন স্টেমসেলগুলোকে কাজে লাগিয়ে শরীরের প্রতিটা পেশীকোষকে পালটে দিতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইস্পাতের মতো মজবুত হয়ে উঠল ওর শরীরটা। এই ভিনগ্রহী কোষের এটাই তো বিশেষ গুণ, এরা যেকোনও কোষকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারে।

কৃষ্ণার সামনে এখন এক বিরাট যুদ্ধ। পুরো মানবজাতিকে বাঁচানোর যুদ্ধ। এই রক্তবীজদের যে করেই হোক শেষ করতে হবে ওকে।

এক প্রচণ্ড অমানুষিক শক্তিতে, মাটিতে শুয়ে হিংস্র গর্জনে ছটফট করতে থাকা ওই রক্তবীজটার বুক চিরে দু'ফালি করে ফেলল কৃষ্ণা। মুখ হাঁ করে থাকা পাঁজরের মধ্য দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে এল রক্তের স্রোত। কিন্তু এই রক্ত মাটিতে পড়তে দেওয়া যাবে না। আর তার একটাই উপায়।

ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই রক্তস্রোতে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল কৃষ্ণা, চুষে খেতে লাগল সেই রক্তবীজের রক্ত; শেষ ফোঁটাটা অবধি। নিজের সারা শরীর দিয়ে ও যেন শুষে নিতে লাগল সেই সর্বনাশের বীজ।

সেই রক্ত যত কৃষ্ণার শরীরে যাচ্ছে, ওর শরীরটা আরও বেশি পরিমাণ স্টেমসেলকে কাজে লাগিয়ে বেড়ে উঠছে ক্রমশ। গায়ের কাপড় ফেটে ছিঁড়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে আর এক ঘোর নীলাভ-কালো বিকট মূর্তিতে পরিণত হচ্ছে ওর গোটা শরীরটা।

যখন সেই রক্তবীজের ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত বুক থেকে মুখ তুলল কৃষ্ণা, তখন ওর সারাটা মুখ ভিজে আছে থকথকে কালচে লাল রক্তে; দু'হাতেও সেই একই রক্ত। কিন্তু এই রক্ত কার? এই রক্তে কোথাও কি এখনও মিশে আছে ওর বাবার অস্তিত্ব? একটা চাপা কষ্ট যেন বুকফাটা চিৎকার হয়ে বেরিয়ে এল ওর গলা ঠেলে। একটা প্রচণ্ড আর্তনাদ। যেন এক অকারণ আত্মগ্লানি ভেতর থেকে ফালাফালা করে দিচ্ছে ওকে।

মানবিক ব্যথা আর এক অতিমানবিক হিংস্র শক্তি যেন মিশে গিয়ে আগুনের হলকা হয়ে ঠিকরে পড়ছে ওর দুচোখে। কৃষ্ণার পিঠ অবধি নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলো কালবৈশাখীর মেঘের মতো এলোমেলো হয়ে হাওয়ায় উড়ছে! আরও কালচে হয়ে উঠছে ওর সারাটা শরীর।

দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল ওর মুখে লেগে থাকা সেই রক্ত ; কিন্তু সামনে এখনও আরও পাঁচটে রক্তবীজ দাঁড়িয়ে আছে, আর সারা শহরে তো অগণিত। আস্তে আস্তে কৃষ্ণার দিকে এগিয়ে আসছে তাদের লালচে শরীর থেকে এলিয়ে পড়া কালো ছায়াগুলো। আরও কাছে এগিয়ে আসছে তারা।

এখনও অনেক রক্ত বাকি! একটা তীব্র নারকীয় উল্লাস, এক অদ্ভুত পৈশাচিক আনন্দ যেন সারা শরীরে মৃত্যুর উৎকট মাদকতা ছড়িয়ে বয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণার শিরায় শিরায়। রক্ত চাই, আরও রক্ত! রক্তপিপাসাটা যেন হুঁ হুঁ করে বেড়ে উঠছে। ওর দেহের প্রতিটা কোষ যেন চিৎকার করে বলছে আরও রক্ত চাই!

কিন্তু এরা কোন কোষ? কৃষ্ণার না সেই ভিনগ্রহী ছত্রাকের?

নৃশংস হুংকারে চারপাশ কাঁপিয়ে সেই রক্তবীজদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এক ঘোর নীলাভ-কৃষ্ণবর্ণা নগ্ন নারীমূর্তি। যেন প্রলয়ের বীভৎসতম উল্লাসে বুক চিরে রক্ত খেতে লাগল তাদের।

আরও রক্ত চাই! আরও! আরও!

সেই ভীষণ চামুণ্ডা মূর্তির ঘন কালো ছায়ার অতল অন্ধকারে একটু একটু করে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগল কৃষ্ণা।

পাঠকেরা যা পড়ছেন