শিবশঙ্কর মিষ্টান্ন ভান্ডার - সাগরিকা রায়

অলংকরণ - মৈনাক দাশ

পাঁচ বছর আগে আমাদের তারকমণি দত্ত লেনে একটি মিষ্টির দোকান খুলেছিলেন বিপ্রবাবু। খুব নাম ছিল দোকানের। কিন্তু দোকানটা ইদানিং আর মোটেই পয়া নয়। কেউ রটিয়ে দিল, ওই দোকানের মিষ্টি দিয়ে পুজো দিলে মা-কালী খুশি তো হনই না, ক্রুদ্ধই হন। শুনে গোপাল স্যার ছুটে এলেন দাদুর কাছে। দাদু মনমোহিনী বিদ্যাপীঠের সংস্কৃতের টিচার ছিলেন ছাব্বিশ বছর আগে। তখন মাধ্যমিকে কেউ কেউ সংস্কৃত নিত। দাদু সংস্কৃত জানেন, শাস্ত্রপাঠ করেন। এবং জ্যোতিষ জানেন। গোপাল স্যারের ছেলে মাধ্যমিক দিয়েছে। পরীক্ষার ঠিক আগের দিন ‘মায়ের ইচ্ছে’ কালীবাড়িতে গিয়ে পুজো দিয়েছেন গোপাল স্যার। সেই পুজোর প্রসাদ খেয়েই ছেলে গিয়েছে পরীক্ষা দিতে। এখন মা-কালী যদি শিবশঙ্কর মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টি অপছন্দ করেন, তাহলে স্যারের ছেলের রেজাল্ট বোঝাই যাচ্ছে! স্যারের মা কেঁপে ঝুপে একাকার। গোপাল স্যার চিন্তায় যখন অর্ধমগ্ন, তখন স্যারের মা গলায় গমক তুলেছে—হ গুপাল, হুপায় কী হুপায় কী?

হুপায় মানে উপায় খুঁজতেই আমার দাদুর কাছে আসা গোপাল স্যারের। দাদু ভেবেচিন্তে বললেন—দাঁড়াও। অত হুড়োহুড়ি করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। আমি দেখছি। এই বলে গোপাল স্যারকে বিদায় দিয়ে দাদু নিজেই বিপ্রবাবুর মিষ্টান্ন ভান্ডারে গেলেন—হ্যাঁ বিপ্রবাবু, বলছি, সুগার ফ্রি মিষ্টি আছে কিছু?

বিপ্রবাবু মাথা নেড়ে নেড়ে খানিক ভাবলেন—সুগার ফ্রি? তা বললে হবে? আটা-ময়দায় কিছু পরিমাণ শর্করা রয়েছে। সম্পূর্ণ সুগার ফ্রি যাকে বলে, তা পেতে হলে আপনাকে একঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। আমার ল্যাবে আমি সম্পূর্ণ সুগার ফ্রি মিষ্টি বানিয়ে আনছি।

একথা শুনেই দাদু থ! মিষ্টির কারিগর রতন ঘুপচি ঘরে বসে মিষ্টি বানায়। সেই ঘর কিনা ল্যাব? গামছায় বেনারসির আঁচল? হে হে! দাদুর হাসি পাবেই। কারণ এই রতন কদিন আগেই জেলে গিয়েছিল। অপরাধ মোটেই ছিল না ওর। ময়দা, ছানা কিনে আনছে মিষ্টির জন্য। এমন সময় দেখে রাস্তায় খুব ভিড়। কারা সব চেঁচাচ্ছে –দিতে হবে! দিতে হবে! রতন ভিড়ের পাশ কাটিয়ে আসছে, কেউ একজন বলল—রতনা, সামনে দেখ, একখানা বাঁশ রাস্তায় পেতে রাখা আছে। ওটা ডিঙোলেই কিন্তু আড়ষ্ট হতে হবে। কেউ যাচ্ছেনা দেখছিস তো?

শুনে রতনের বুকে সাহসের খোল করতাল বেজে উঠল। কেউ যাচ্ছে না ভয়ে, রতনের তো ভয় নেই, দেখাতে এক লাফে বাঁশের গন্ডি পেরিয়ে যেতেই অবাক। আড়ষ্ট তো হল না! মাঝে থেকে পুলিশ এসে ধরে জেলে নিয়ে গেল কালো ভ্যানে চাপিয়ে। হ্যাঁ, ওই ময়দা আর ছানার কথা ভাবছ তো? ওগুলো সব রাস্তায় পড়ে ধুলিসাৎ! বিপ্রবাবু খবর পেয়ে রতনকে ছাড়িয়ে আনলেন এই কথা বলে যে, রতন আর কখনও আইন অমান্য করবে না। রতন তারপর থেকে বাঁশ দেখলে সাত হাত দূরে। এখন বাঁশটা আট হাত দূরে থাকলে কী হবে? সে আমি জানিনে বাপু। গল্পটা বলতে দাও।

তো, বিপ্রবাবু নিজেই দোকানের ভেতরে ঢুকে গেলেন। দাদু বাইরে অপেক্ষমান। খানিক পরে দোকানের চারপাশ মিষ্টি গন্ধে ভরে গেল। আর তারপরেই বিপ্রবাবু চৌকো চৌকো সাদা মিষ্টি এনে হাতে দিলেন। অবশ্যই সুদৃশ্য প্যাকেটে করে। আর একটি মিষ্টি শালপাতার বাটি করে দাদুর হাতে দিলেন—খেয়ে দেখুন, এটাই হল সুগার ফ্রি মিষ্টি। সুগারের সবটুকু এই পদার্থের ভেতর থেকে নিষ্কাসন করা হয়েছে। মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ পেয়েছেন কি? খানিক আগে? দাদু পরীক্ষার খাতা দেখার মত করে মিষ্টি চাখলেন। ও হরি! মিষ্টি কোথায়? স্রেফ অ্যান্ড স্রেফ স্বাদহীন, গন্ধহীন স্বপ্নে দেখা রাজকন্যে যে! যাকে দেখতে ভাল, কিন্তু অস্তিত্বই নেই! মানে সেই দেখার মত স্বাদ নেই । স্বপ্নে খাওয়া মিষ্টির মত একটি বস্তু মাত্র! একে কখনই মিষ্টি বলা যাবেনা। দাদু ভেবে নাম দিলেন—সৃষ্টি। বিপ্রর সৃষ্টি ডায়াবেটিকের জন্য। আসুন, বসুন সৃষ্টি খান। এইভাবে একটা ফ্লেক্স বানিয়ে দোকানের সামনে রাখার পরামর্শও দিলেন দাদু। কথাটা মনে ধরল বিপ্রবাবুর। অনেকক্ষণ দাদুর দিকে তাকিয়ে ভাবলেন আর ভাবলেন। দাদু কিন্তু বিপ্রর চোখের দৃষ্টি দেখে ভয় পেলেন। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে চণ্ডীপুজো করলেন। হে বিপদনাশিনী! রক্ষে কর! বিপ্রবাবু অমন করে তাকাচ্ছিলেন কেন? বড্ড ভয় ধরিয়ে দিয়েছে বিপ্রর দৃষ্টি! কিন্তু একটি কথা জানা হল না বলে দাদু বিকেলের দিকে হাতে পাঁচু গোপালের মন্দিরের তামার তাবিজ বেঁধে ফের গেলেন বিপ্রর মিষ্টান্ন ভান্ডারে। কারণ বিপ্রর চাউনিতে ভারি ভয় পেয়েছিলেন দাদু। দোকানে সবুজ আলো জ্বেলে বিপ্রবাবু একখানি ল্যাপটপ নিয়ে কী সব টাইপ করছেন। দাদু উঁকি দিয়ে দেখে মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না! এটা কী ধরণের অক্ষর রে বাবা? স্প্যানিশ নাকি? দাদু একসময় স্প্যানিশ শিখেছিলেন এক স্প্যানিশ সাহেবের কাছ থেকে। তিনি পরীক্ষা করার জন্য বললেন স্প্যানিশে—কে স এসতো? ইস ইস্প্যানিও? মানে হোয়াট ইজ দিজ? ইজ ইট স্প্যানিশ?

বিপ্রবাবু ল্যাপি থেকে মাথা না সরিয়ে স্প্যানিশে জবাব দিলেন—ইসতো এন হেবরিও।

শুনে তো দাদুর মাথায় হাত। শিবশঙ্কর মিষ্টান্ন ভান্ডারের দোকানদার কিনা স্প্যানিশ জানেই, হিব্রুও জানে! ওরে, এটা কী দেয় মিষ্টিতে যে মা-কালী অপছন্দ করছে? মুখে দিলে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে সে মিষ্টি! স্বয়ং পুরোহিত সন্তোষ চক্রবর্তী মশাই নিজের চোখে এই দৃশ্য দেখেছেন বলেই না সকলে জানতে পেরেছে! মনে মনে একথা ভাবছেন দাদু, দেখা গেল বিপ্রবাবু টেলিপ্যাথিও জানেন। মুচকি হেসে বললেন—ছানাটা আমাদের বিশেষ ধরণের গরুর দুধের কিনা। মায়ের অচেনা। কটাদিন খেলেই মুখে রুচে যাবে। এখন অ্যাবজর্ভ হচ্ছে না!

দাদুর হঠাৎ করে রাগ হয়ে গেল। বিপ্রর মধ্যে বেশ একটা পাকামি রয়েছে। কলেজের ছেলেরা এই পাকামিকে আঁতলামি বলে। আঁতেল শব্দটা ফ্রেঞ্চ শব্দ। মানে বুদ্ধিজীবী । ইংরেজিতে যাকে বলে ইন্টেলেকচুয়াল। তো বিপ্রকে একহাত নিতে ইচ্ছে হল দাদুর। বেশ গম্ভীর হয়ে জানতে চাইলেন—আচ্ছা, বিশেষ ধরণের গরু মানে? চারটে ঠ্যাং আছে?

বিপ্র অবাক—চারটে? ছটা বলুন। ছয়টা ঠ্যাং।

—হুর, এমন আবার হয় নাকি? দেখান তো!

—সেটি হচ্ছে না। খেতে ইচ্ছে হলে দুটো খেয়ে দেখুন। বিপ্রবাবু মাথা নেড়ে নেড়ে হু হু করে গান করেন।

এসবের পরে আমার দাদু ভারি মুষড়ে পড়েন। বাড়িতে ফিরে এসে হাত পা ধুয়ে আরাম কেদারায় বসে ভেবে চললেন। আজ বিপ্রর মধ্যে একটা কী রকম যেন ব্যাপার দেখলেন! বেশ অদ্ভুত লাগল বিপ্রবাবুকে। ছয় ঠ্যাঙের গরুর দুধের কথা বলল ঠিকই, কিন্তু তেমন গরু সাত জন্মেও দেখেননি দাদু। শোনেননিও। বিপ্রবাবুর এত সাহস যে তাঁর মত সম্মানীয় মানুষের সঙ্গে ইয়ার্কি করে? দুঃখ হল। আমি সামনের টেবিলে বসে পড়ছি, দাদু আমাকেই খুলে বললেন। আগাগোড়া সব। আমি দাদুকে সাহস দিলাম—ওসব লোকের কথায় কিছু মনে কর না দাদু। তোমাকে সবাই এখানে রেস্পেক্ট করে। উনিও। আজ হঠাৎ কেন মজা করার সাহস পাবেন? এমন হতে পারে উনি মজা করেননি? হয়তো ওঁর গরুটার সত্যিই ছয়টি পা? মাদারিহাটে একবার দেখেছিলাম পাঁচ পা-ওলা গরু। সেই গরু দেখিয়ে গরুর মালিক টাকা তুলছিল! আর কত পুঁতির মালা দিয়ে সাজিয়েছিল গরুটাকে! ধর, তেমন যদি হয়?

দাদু মাথা নাড়েন—ওটা লোক ঠকানো ব্যবসা। একটা পা অপারেশন করে পিঠে জুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতে তো আর গরুর দুধ পালটে যাবে না!

হুম। সেটাও কথা। আচ্ছা, আমি চুপচাপ দেখছি। এখনই দাদুকে কিছু বলার দরকার নেই।

পরের দিন থেকেই আমি অবজার্ভ করতে শুরু করলুম। সাধারণত বিপ্রবাবুর দোকানে খুব ভিড় হয়। সারাদিনই ভিড়। ইদানিং ভিড় কমতির দিকে। মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়ার মত ভিড়টা আর নেই। বরং পাশের পার্বণ মিষ্টান্ন ভান্ডারে সেই ভিড়টা ঢুকে গিয়েছে। ভাবলুম, শিবশঙ্করের জিলিপির দারুণ স্বাদ। জিলিপি কিনে দেখি, স্বাদ আগের মতই আছে কি-না।

বিপ্রবাবুকে দেখলুম ক্যাশে বসে টাকা গুনছেন। দুটো লোক দাঁড়িয়ে ঠোঙা গুছিয়ে রাখছিল। প্ল্যাস্টিকের ঠোঙা আর চলে না। এখন সব দোকানে কাগজের ঠোঙা। দিদু তাই কয়েকটা ভাল দেখে প্ল্যাস্টিকের ঠোঙা যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছে—কি জানি, কখন আবার দরকার হয়, বলে। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই তিনজনই চোখ তুলে তাকাল। ভাবটা—কী চাই? গোছের।

দেড়শো গ্রাম জিলিপি নিয়ে দোকানের একটি টেবিলে বসেছি। বেশ লালচে রঙের গরম জিলিপি দেখে জিভে জল এল। একটা জিলিপি তুলে কামড় বসালাম। চিনির রস গড়িয়ে পড়ল হাত বেয়ে। কিন্তু… ছ্যা ছ্যা! এ কেমন জিলিপি? একফোঁটা মিষ্টি নেই! ফ্যাসফেসে স্বাদ! না মিষ্টি, না ঝাল, না টক…কিছুই নেই এই জিলিপিতে! এমন জিলিপি আমি কখনও খাইনি! ছিঃ! কী বিশ্রি স্বাদ! আমার অবস্থা হল, কমলের কাজিন বিধুদার মত। বিধুদা বিয়ে করেননি। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যেতে তাঁর আফশোস হল। কিন্তু তখন আর পাত্রী কোথায়? এদিকে কমলের বিয়ে হল। বিয়ের পরে মিন্টুদা বিধুদাকে জিজ্ঞাসা করেছে—কমলের বউ কেমন হল বিধু? বিধুদা সড়াৎ করে জিভে ঝোল টেনেছেন—‘আর বল না! এক্কেবারে রাজভোগ! কিন্তু…!’ আমার এখন জিলিপি মুখে দিয়ে সেই ‘কিন্তুটা’ মনে পড়ল। এসব কথা শুনেছি মিন্টুদার ভাইপো টুলুর থেকে। টুলু আমার ক্লাসমেট। জিলিপি দেখতে দারুণ, কিন্তু এই জিনিস তো আমার সেই জিলিপি নয়! এতো স্বপ্নের সেই জিনিস। দেখতে পারছি, কিন্তু স্বাদ নিতে পারছি না! কিছু বলব ভেবে তাকিয়ে দেখি বিপ্রবাবু কখন দোকান থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন। গেলেন কোথায়? খাবারের দাম নিয়েছেন অথচ এই বাজে মিষ্টি সার্ভ করছেন? অভিযোগ করতেই হবে। উনি পালিয়ে যাবেন কোথায়? দোকানের স্টাফ দুজনের একজন ঘুমোচ্ছে চেয়ারে হেলান দিয়ে। আরেকজন বাইরে দাঁড়িয়ে ঝাড়পোঁছ করছে। আমি দেখলাম দোকানের ভেতরে যাওয়ার একটি দরজা রয়েছে। চারপাশে তাকিয়ে টুক করে সেই দরজার ভেতরে ঢুকে গেলাম। ঢুকেই অবাক হয়ে গেলাম। ভেতরে একটা বিশাল বড় অ্যাকোয়ারিয়াম। কত রকমের মাছ সেই জলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের বাড়িতেও আছে অ্যাকোরিয়াম। আমি মাছ চিনি। গোল্ড ফিস, টাইগার শার্ক, কমেড, আঞ্জেল, সোর্ড, ডিসকাস মাছ…! এত্তবড় অ্যাকোরিয়াম আমি এই প্রথম দেখলুম। এখানে, এই অন্ধকারে এত্তবড় অ্যাকোরিয়াম রেখেছেন কেন বিপ্রবাবু? কিন্তু উনি এখানে নেই মানে অন্য কোথাও গিয়েছেন? এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে এলাম। এসে টেবিলে বসে জিলিপি নাড়াচাড়া করতে করতে দেখলুম, বাইরে থেকে বিপ্রবাবু এসে দোকানে ঢুকছেন। আচ্ছা, উনি বাইরে গিয়েছিলেন?

আমি জিলিপিগুলো খেতে পারিনি, সেকথা বিপ্রবাবুকে বলে দিলাম। এটাও বললাম, আগে এই দোকানের জিলিপি কত ভাল ছিল। এখন কেন এমন বিশ্রি স্বাদ?

বিপ্রবাবু অবাক অবাক চোখে তাকালেন—তাই নাকি? আমিও শুনতে পাচ্ছি, ইদানিং নাকি আমার দোকানের মিষ্টির স্বাদ নষ্ট হয়ে গিয়েছে! জানি না বাপু, কেন এমন হচ্ছে! আচ্ছা, আমি দেখছি। কাস্টমারের দিকটা আমার দেখাই তো উচিত। বলে বিপ্রবাবু চিন্তিত মুখে দোকানে ঢুকে গেলেন। আমি আর কিছু বললাম না। বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিপ্রবাবু নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এটাই যথেষ্ট। আর একটি ব্যাপার দেখে ভাল লাগল। দাদুর সঙ্গে বিপ্রবাবু যেমন ব্যবহার করেছেন, এখন কিন্তু ব্যবহার পালটে গিয়েছে। সবাই অভিযোগ করছে বলে উনি মাথা ঠান্ডা করেছেন, এমন হতে পারে!

আমি দোকান থেকে বেরিয়ে ভজাদার দোকান পেরিয়ে যেতে যেতে দাঁড়ালাম। ভজাদার একটা বিরাট অ্যাকোয়ারিয়াম আছে। একটু দেখি গিয়ে।

সত্যি বড় আকোরিয়াম। কিন্তু বিপ্রবাবুর অ্যাকোয়ারিয়াম অনেক বড়। ভজাদা দুশো টাকায় টাইগার শার্ক কিনেছে। হালকা কালো রঙের রূপচাঁদ মাছ আছে। এছাড়াও ব্ল্যাকমূর, অস্কার ফিস দেখলাম। বিপ্রবাবুর অ্যাকোয়ারিয়ামে আরও কিছু অচেনা মাছ দেখেছি। আজকাল কত নতুন ধরণের মাছ আসছে ! ভজাদা প্ল্যাস্টিকের ঘাস, গাছ, ম্যাট, সিলিকন কোরাল দিয়ে সুন্দর সাজিয়েছে অ্যাকোয়ারিয়াম। আমার এত রকমের মাছ নেই। তবে আর সব আছে। একটা এল ই ডি লাইট লাগানো আছে। বিপ্রবাবুর অ্যাকোয়ারিয়ামে সবুজ আলো দেখেছিলাম! দোকানেও সবুজ আলো ছিল! বিপ্রবাবু সবুজ আলো ভালবাসেন তাহলে!

ভজাদা হেসে বলল—দেখা হয়ে গেল? জল পালটাস তো বাড়ির অ্যাকোয়ারিয়ামে?

—হ্যাঁ ভজাদা। বলে দোকান থেকে নেমে এলাম। বাড়িতে যাব। দাদুর সঙ্গে কয়েকটা কথা নিয়ে আলোচনা আছে। মনের কোণে খিচ ধরে আছে! কিছু একটা অদ্ভুত লাগছে। যেটা আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু মন ঠিক বুঝেছে। সেটা কী জানতে হবে।

বাজার পেরিয়ে গলিতে ঢুকে পড়েই চমকে উঠলাম। আমার খানিকটা আগে আগে বিপ্রবাবু গলি থেকে বেরিয়ে গেলেন। এইমাত্র দোকানে ছিলেন! এখন আবার এদিকে কোথায় যাচ্ছেন উনি? আমি প্রায় দৌড়ে গিয়েও ওঁকে ধরতে পারলুম না। কোথায় গেলেন, বুঝতেই পারলুম না। আশ্চর্য তো!

আমাকে এখনই দোকানে যেতে হবে। দেখব দোকানে উনি কখন ফেরেন। আমি ফের বিপ্রবাবুর দোকানে গেলাম। দেখি, দোকানে সবুজ আলো ছড়িয়ে আছে। বিপ্রবাবু ল্যাপি খুলে কাজ করছেন! তাহলে গলি দিয়ে বেরিয়ে উনি দোকানে এসেছেন? এত তাড়াতাড়ি? আমি কি দোকানে ঢুকব? কী বলব ঢুকে? আমার কাছে পয়সাও নেই যে মিষ্টি কিনতে এসেছি বলব! কী করি? হুমম! একটু চিন্তা করে দেখি…! আচ্ছা, বিপ্রবাবু কেন একটি রহস্যময় মানুষ হয়ে উঠলেন আস্তে আস্তে! আগেও ওঁকে দেখেছি। জন্ম থেকেই দেখছি। অথচ সেই পুরনো বিপ্রবাবু খুব দ্রুত পালটে গিয়েছেন। দেখি, আরেকবার । উনি কি এখনও ল্যাপি নিয়ে বসে আছেন? দোকানে উঁকি দিয়ে দেখতেই সাঙ্ঘাতিক চমকে উঠেছি। উফ! লোকটা ফের গেল কোথায়? নিশ্চয় ভেতরে গিয়েছেন! কারণ এখন উনি বাইরে মোটেই আসেননি। আমি নিজেই বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। বাইরে যদি আসতেন, আমি দেখতে পেতামই। উনি অবশ্যই দোকানের ভেতরের দরজাটা দিয়ে গিয়েছেন। আমি যাব। দেখব, ওই দরজা দিয়ে বিপ্রবাবু কোথায় যান!

দোকানে ঢুকেই তাড়াহুড়ো করে ভেতরের দরজার কাছে চলে এলাম। এখন দোকানে গোটা ছয়েক কাস্টমার আছে। এসময় সিঙ্গারা ভাজা হয়। কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত বলে আমাকে কেউ লক্ষ করেনি। আমি ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ঘরটা ভারি অন্ধকার! অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরে জল চকচক করে নড়ছে। মাছেরা হুটোপুটি করছে। গোল্ড ফিসগুলো একেবারে কর্নারে এসে চুপ করে আছে! নট নড়নচড়ন!

ঘরের মধ্যে কোথাও কিন্তু বিপ্রবাবুর ট্রেস নেই! অদ্ভুত কান্ড! আচ্ছা, অন্য কোন দরজা কি আছে এখানে যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না?

ঘরটা ছোট। অর্ধেকটা জুড়েই আবার অ্যাকোয়ারিয়াম। তাহলে বিপ্রবাবু কোথায়?

এইসময় আমি দেখলাম, গোল্ডফিস দুটো যেন ভয় পেয়েছে এমন ভাবে ছুটোছুটি করছে! আকোরিয়ামের পেছনের দিকের কাচের গায়ে একটা নীল দাগের কাছে ওরা যাচ্ছে বারবার। অবাক কান্ড। এরকম দাগ কেন? কীসের দাগ ওটা? তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখতে পাচ্ছি দাগটা আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাচ্ছে! ক্রমশ ফাঁক হয়ে গেল। যেন কাচের গায়ে একটা দরজা খুলে গেল! সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন বিপ্রবাবু! মাছেদের মত সাঁতরে উনি বেরিয়ে এলেন অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে। আমি লুকিয়ে পড়তে পেরেছিলাম বলে উনি দেখতে পেলেন না! বাইরে এসে গা মুছে জামাকাপড় চেঞ্জ করে দোকানে ঢুকে গেলেন। আশ্চর্য! দেখি, অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরের নীল দাগটা ফের জোড়া লেগে গিয়েছে।

এবারে আমি আস্তে আস্তে নেমে গেলাম অ্যাকোয়ারিয়ামে। পায়ের পাতায় জলের স্পর্শ পেলাম। জল খুব ঠান্ডা নয়। আস্তে আস্তে জলের ভেতর নেমে দেখছি, জল বেশ গভীর। সাঁতরে নীল দাগটার কাছে এলাম। নীল দাগটা খুলে যায় কী করে? আঙুল দিয়ে টাচ করলাম। কিন্তু কিচ্ছু হল না। কী করব ভাবছি, হঠাৎ গোল্ডফিস দুটো সাঁতরে নীল দাগের কাছে এসে ঝাপটা মারতেই কাচ ফাঁক হয়ে গেল! প্রথমে অল্প, পরে একজন মানুষ ঢোকার মত । কিন্তু সেই ফাঁক দিয়ে জল বেরিয়ে গেল না! জল ওখানে, ওই নীল দাগের কাছে এসে স্থির। যেন জেলি। আমি সেই জল মেখে ঢুকে গেলাম নীল দাগের ভেতর দিয়ে। যেখানে ঢুকেছি, সেখানে জল নেই। শুকনো একটা সরু সবুজ আভাযুক্ত গলিপথ ধরে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে আমার যেন শরীর বলে কিছু নেই! হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছি। যেতে যেতে একটা সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। কেউ একজন উল্টোদিক দিয়ে আসছে! কে? এই গলিপথে লুকিয়ে পড়ার মত জায়গা নেই। কী করব? নাহ, কিচ্ছু করার নেই। যা আসুক, মুখোমুখি হতে হবে।

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। পায়ের নীচে মাটি নেই। কিছুই নেই, যেন বাতাসে ভর করে দাঁড়িয়ে আছি। যে আসছিল, বা যা আসছিল, সে-ও দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি কথা বলে উঠলাম। কেন যে কথা বললাম জানি না। আসলে ভয় আঁকড়ে ধরেছিল আমাকে তীব্রভাবে। ভয়েই চেঁচিয়ে উঠেছি—কে ওখানে? বিপ্রবাবু?

বিপ্রবাবুর নামটাই মাথায় ঘুরছিল বলে ওই নামটাই আগে মাথায় এল। আশ্চর্যের বাকি ছিল আরও। উল্টোদিক থেকে খুব চেনা গলায় কে বলে উঠল—বিপ্রবাবু?

—কে? বিপ্রবাবুকে চেন?

—চেন? যেন প্রতিধ্বনি হচ্ছে।

—চিনি। এই পথে বিপ্রবাবু যাতায়াত করেন। মিষ্টির দোকান থেকে। বলতে বলতে আমি এগিয়ে গেলাম। সে-ও এগিয়ে আসছে। আমরা এবারে মুখোমুখি। আমি সেই সবজে আলোর ভেতরে যেটুকু দেখতে পাচ্ছি, তাতে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি। আমার অপোজিটে যে দাঁড়িয়ে, সে হুবহু আমিই! যেন আয়নায় নিজেকে দেখছি। দেখতে দেখতে অভূতপূর্ব অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পারছি, আমি হয়তো অন্য দুনিয়ার আমিকে দেখছি! সমান্তরাল পৃথিবীর আরেকটা আমি! আমাদের ক্লাসে স্যার এই বিষয়ে বলেছিলেন—ব্ল্যাক হোলের ওপরে আমাদের এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মত আরেক অবিকল মহাবিশ্ব আছে। ওখানে যা আছে, সব এই পৃথিবীর ট্রু কপি। প্রত্যেকটি প্রাণীর কার্বন কপি আছে ওখানে! এই তাহলে আমার কার্বন কপি? বিপ্রবাবু তাহলে সমান্তরাল পৃথিবীর মানুষ। এই বিশ্বে ঢুকে পড়েছেন। অন্য দুনিয়ার খাবার নিয়ে এসেছেন, যা এই দুনিয়ার মুখে রুচছে না! তাহলে এই দুনিয়ার বিপ্রবাবু কোথায়? এখানে প্রবেশ করে এখানকার বিপ্রবাবুকে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষা চলছে? আসল বিপ্রবাবু বুঝতেই পারছেন না, তাঁর দোকানে অনুপস্থিতির সময় অন্য একজন বিপ্রবাবু জাঁকিয়ে বসেছেন! এবং ব্যবসার সর্বনাশ করছেন! আমাকে ফিরে যেতে হবে। বিপ্রবাবুকে ফিরিয়ে দিতে হবে তাঁর জায়গায়। নিজের নিজের পৃথিবীতে ফিরে যাবে বিপ্রবাবুদের।

—আমরা ফিরে যাচ্ছি নিজের নিজের জায়গায়। সমস্বরে বলে উঠলাম আমি ও আমার কার্বন কপি। আমি যা ভাবছি, সে সেটাই ভাবছে। আমরা ব্যাক করলাম। জানিনা, সমান্তরাল দুনিয়ার সেকেন্ড বিপ্রবাবুর এই দুনিয়ায় আসার জন্য কি অ্যাকোয়ারিয়াম আছে? সেই অ্যাকোরিয়ামের ভেতর দিয়েই কি আমার কপি এখানে চলে এসেছিল? বিপ্রবাবু প্রথমে কীভাবে আমাদের দুনিয়ায় ঢুকলেন? এই অ্যাকোরিয়ামের ভেতর দিয়েই পথটা আছে, উনি জানতেন!

হয়তো জানতেন না । আবিষ্কার করেছিলেন কোন এক অজানা সময়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এই পৃথিবীতে এসে ফিরে যেতে মন চায়নি তাঁর। চেয়েছিলেন এখানে রয়ে যেতে। অথচ আমাদের বিপ্রবাবুর মাথায় কেন এই ব্যাপার এল না? উনি কেন সমান্তরাল পৃথিবীর পথ খুঁজে পেলেন না? যদি সবটাই কার্বনকপি হয়? এটাও হওয়া উচিত ছিল। কার্বন কপির একজন যেটা ভাবছে, অন্যজনেরও সেটাই ভাবা উচিত!

আমি সাঁতরে বেরিয়ে এলাম বাইরে। আজ আবার সেকেন্ড বিপ্রবাবু অন্য পৃথিবীতে যাবেন। আমি লুকিয়ে বসে রইলাম। সুযোগ চাই। যদি আমার কার্বন কপি আমার মত করে কাজটা করতে পারে, তাহলে আর ভয় নেই এই বিশ্বের বিপ্রবাবুর।

অনেক রাতে সেকেন্ড বিপ্রবাবু অ্যাকোয়ারিয়ামে নামলেন। নীল দাগের কাছাকাছি গিয়ে কাচ ফাঁক হতে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এবারে উনি নিশ্চয় সেই সরু সবুজ আভাযুক্ত গলিপথে…! অ্যাকোয়ারিয়ামের সব জল বের করে দিলাম। মাছগুলো ছটফট করতে করতে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে একসময় মরে গেল। তারপর অ্যাকোয়ারিয়ামটার পেছনের কাঁচে আস্তে আস্তে আঘাত করে চিড় ধরিয়ে ফেলে একবার চিড়ের মধ্যে জোরে আঘাত করতে কাচ ফেটে চুরমার! মাছগুলোকে মরতে হল! কিচ্ছু করার ছিল না আমার!

বিপ্রবাবুর কপি আর ফিরতে পারবেন না এই দুনিয়ায়।

পরদিন সকালে মিষ্টি কিনতে গিয়েছি। দেখি, হরু যাদব এসেছে ছানা দিতে। দোকানে ভারি মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে! রসগোল্লা জ্বাল হচ্ছে। একটু ওয়েট করলে গরম রসগোল্লা পাব। ততক্ষণ বসে না থেকে জিলিপি খাই। দেখি স্বাদের বদল হল কি-না।

গরম জিলিপিতে কামড় বসাতেই মিষ্টি গরম রসে মুখ ভরে গেল। শিবশঙ্কর মিষ্টান্ন ভান্ডারে ফের ভিড় জমে উঠছে! বিপ্রবাবু হাসলেন—আজ মিষ্টি ভাল হবে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছি। মা-কালীরও পছন্দ হবে। গ্যারান্টি।

মিষ্টি নিয়ে ফিরে আসছি। এই বিপ্র নিজের জায়গা ফিরে পেল। ওই বিপ্র? সে কি নিজের দোকানটা খুলেছে আজ? খুলেছে নিশ্চয়। হিসেবমত আমার কার্বন কপিরও এখন মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা।

পাঠকেরা যা পড়ছেন