ঠাকুমা’র সংখ্যা ন’শ’ - শ্রীধর সেনাপতি

অলংকরণ - মূল প্রচ্ছদ

আলোক দত্ত বয়সে যুবক। ভবিষ্যতে দারুণ উন্নতি করার সম্ভাবনা নিয়ে সে গ্রহাভিযানের কাজে নিযুক্ত হয়েছে। বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে যারা গ্রহ অভিযানে অংশ নেয়, আলোক দত্ত তাদেরই একজন। স্পেশাল অ্যাসপেক্টস ম্যান। তবে স্বভাবে একটু গোঁয়ার, মেজাজ কিছু পরিমাণে খিটখিটেও! সেই ছেলেবেলা থেকে এখন পর্যন্ত তার মুখে প্রধান একটাই প্রশ্ন : শুরু হয়েছিল কীভাবে? হ্যাঁ, প্রশ্নটা সে আজীবন করে আসছে। একগুঁয়ে মানুষ তো।

অভিযানে যারা বেরিয়েছে, তাদের সকলেরই নাম কী উচ্চারণে, কী অর্থে বেশ গুরত্বপূর্ণ। বেশ মানানসইও বটে! যে যার নাম পছন্দসই বেছে নিয়েছে। যেমন, ম্যানব্রেকার ক্র্যাগ! জজ ব্লাড! ট্রাবল ট্রেন্ট! কিন্তু আলোক দত্ত বাপ মায়ের দেওয়া নামের প্রতি তবুও বিশ্বস্ত। অবশ্যি পৃথিবীর একই অঞ্চলের মানুষ তারা নয়।

গোড়াতে ম্যানব্রেকার বলেছিল, ‘আলোক দত্ত-র মতো একটা মামুলী নাম নিয়ে কেউ কখনও হিরো বনতে পারে না।’ তারপর তার গলা থেকে যেন বাজের আওয়াজ শোনা গিয়েছিল, ‘আমাদের এই গ্রহাভিযানে তুমি একজন স্পেশাল অ্যাসপেক্টস ম্যান। আমরা তোমার জন্যে একটা নাম ঠিক করে রেখেছি। এখন থেকে ওই নামই ব্যবহার হবে।’

আলোক দত্ত ম্যানব্রেকারের ধমক থোড়াই কেয়ার করে। তবু কৌতূহল জেগেছিল। নামটা কী? শুধিয়েছিল চোখ নাচিয়ে হেসে।

ম্যানব্রেকার জবাব দিয়েছিল, ‘ব্লেইজ বোল্ট! অর্থাৎ দ্রুত ধাবমান আলোকচ্ছটা!’

‘না। আমার আসল নামই চালু থাকবে।’

‘তুমি বরাবর ভুল করে আসছো। নতুন নাম মাঝে মধ্যে একটা নতুন ব্যক্তিত্ব বয়ে আনবে। আমি তো আগে বেশ একটু ভীতুই ছিলাম। ম্যানব্রেকার নামটা নেবার পরই কোথা থেকে যেন একটা বেপরোয়া ভাব অনুভব করছি ভেতরে ভেতরে। মারদাঙ্গা খুনোখনিতে যে পটু, সে নামটা কেমন বেছে নিয়েছে দেখো। জর্জ ব্লাড়! হে হে। আর, ওই ট্রাবল্ ট্রেন্ট—’

‘থাক।’ আলোক দত্ত তাকে থামিয়ে দিয়ে জজসাহেবের রায় ঘোষণা করার মতো বলেছিল,

‘আমার নাম আলোক দত্তই থাকবে।’

 

উপগ্রহটি খুবই ছোট। নাম এ্যাসটারয়েড্-জিরো। কিন্ত, সবদিক দিয়ে উন্নতি করেছে চরম। বেশ কিছু দিন হয়ে গেল, অভিযাত্রীরা এখানে এসে পৌঁছেছে। থাকবে আরও কয়েকটা দিন। গ্রহবাসীদের সঙ্গে তাদের মস্ত একটা কনট্র্যাক্ট হয়ে গেছে। শুধু মুখের কথায় না। রীতিমতো দেশীয় ভেলভেটের মতো গাছের বাকলের ওপরে তারা লিখে দিয়েছে তাদের চুক্তিপত্র। গ্রহবাসীদের চুক্তির সর্তগুলো অভিযাত্রীরা ধরে রেখেছে নিজেদের প্যারাফেল টেপের বুকে। তারা গ্রহবাসীদের মনকে ইতিমধ্যে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। বশ করেছে মিষ্টি মিষ্টি কথার ফাঁদে আর ব্যবহারে।

এখানে দুটো বাজার। খুবই জমজমাট। সারা জগতের অদ্ভুত যতসব জিনিসপত্র শুধু যেন এখানে এসেই জমে রয়েছে। পৃথিবীতে কত লাক্সারী ট্রেড করবে করো। তার জন্যে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারে অফুরন্ত মাল!

এদিক ওদিক ঘুরে দেখবার পর ম্যানব্রেকার বললো, ‘এসব তো গেল সাধারণ দিক। মিঃ ব্লেইজ্ বোল্ট! সরকারী সনদ অনুযায়ী তোমার কাজ ভিন্ন রকমের। আমাদের দলে তুমি স্পেশাল অ্যাসপেক্টস ম্যান। এই গ্রহ থেকে তোমাকে এমন কিছু বিশেষ খবর বা বস্তু জোগাড় করে নিয়ে যেতে হবে, যার সঙ্গে এই গ্রহবাসীদের সামাজিক সভ্যতা রীতিনীতি ইত্যাদির বিষয়গুলো জড়িয়ে রয়েছে। এখানে জ্যান্ত পুতুলগুলো দেখেছো? তাদের সম্পর্কে কি জানতে পেরেছো কিছু? পুতুলগুলোর যেমন একটা কালচারাল দিক রয়েছে তেমনি তাছে তাদের মাকেট ভ্যালুও!’

‘ওপর ওপর দেখে এক একটিকে জ্যান্ত পুতুল মনে হলেও, আমার সন্দেহ, এর গভীরে হয়তো কোন রহস্য রয়েছে।’ আলোক দত্ত বললো, ‘রহস্যের সমাধানও বের করতে হবে। এই গ্রহবাসীরা বলে, তাদের মৃত্যু নেই। তারা অজর অমর! কথাটা তোমরা শুনেছো নিশ্চয়। আমি মনে করি এদের ওই কথার মধ্যেই হয়তো রহস্যটির চাবিকাঠি কোনো রয়েছে।'

‘মিঃ ব্লেইজ্ বোল্ট! আমার কিন্তু ধারণা, এরা খুবই কম বয়েসে মারা যায়। পথেঘাটে দোকানে বাজারে তো শুধু যুবক যুবতীদেরই দেখা যাচ্ছে। বয়স্ক একজন মানুষও নজরে এলো না। তবে কি যুবক বয়স পার হলেই তারা ঘর থেকে আর বেরোয় না?’

আলোকদত্তর হঠাৎ খেয়াল হলো। আরে, তাইতো! তিনদিন ধরে দিকবিদিকে এত ঘোরাঘুরি করা হলো। কোথাও এমন একটা বিশেষ জায়গা তো নজরে এলো না, যেটাকে শ্মশান বা কবরখানা বলে চিহ্নিত করা যায়!

ম্যানৱেকার ফের বললো, এখানে বুড়োরা মারা গেলে বোধহয় তাদের কবর দেওয়া হয়।

‘কোথায় সেই কবরখানা? তুমি কি দেখেছো, মিঃ ম্যানব্রেকার?’ আলোক দত্তর কথায় ব্যঙ্গের সুর।

না! ম্যানব্রেকারও সেটা দেখেনি। মাথা নেড়ে সে জবাব দিল, ‘মৃতদেহটাকে হয়তো পুড়িয়ে ছাই করে বা বাষ্প করে বাতাসে উড়িয়ে দেয়। হয়তো নিজেদের পিতৃপুরষদের প্রতি এদের কোন শ্রদ্ধা নেই।’

‘না, মিঃ ম্যানব্রেকার! তোমার শেষের কথাটিতে আমার আদৌ সায় নেই। অন্যান্য প্রমাণ থেকে একথা আমার কাছে স্পষ্ট যে টয়্যাস্টারয়েডের অধিবাসীদের এনটায়ার কালচার এদের পিতৃপুরষের প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধার ওপরে প্রতিষ্ঠিত।’

‘বেশ। সব রহস্য খুঁজে বের করে তাহলে। তুমি স্পেশাল অ্যাসপেক্টস ম্যান, মিঃ ব্লেইজ বোল্ট। এ কাজটা তোমারই।’

নোকোমা এই টয়্যাস্টারয়েডের মানুষ। পণ্ডিত লোক। পৃথিবীর প্রায় সব মূলভাষা শিখে বসে আছে। আলোক দত্ত ইতিমধ্যে নোকোমার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিয়েছে। নোকোমার মনটা বেশ পরিষ্কার। আর খুব মিশুকেও। তাদের মুখের ভাষা মোটামুটি সহজ করে সে শিখিয়ে দিয়েছে আলোক দত্তকে।

‘আচ্ছা নোকোমা, এই গ্রহবাসীদের কারো কারো মুখে শোনা, তোমাদের নাকি মত্যু নেই। কথাটা কতদূর সত্যি?’ সযোগ বুঝে আসল প্রশ্নটা একদিন করে বসলো আলোক দত্ত। নোকোমা জবাব দিল হাসিমুখেই, ‘কতদূর সত্যি মানে কী? আমাদের—মানে এই গ্রহবাসীদের যদি মৃত্যুই হবে, তোমাদের কাছে এ কথাটা বলার জন্যে কেউ এখানে থাকতো না।’ বলেই হো হো করে খানিক হাসি। তারপর হাসি থামিয়ে ফের বললো, ‘না। আমরা মারা যাই না। আমাদের এলিয়েন কাস্টম হচ্ছে, নকল করা নয়। এটা অবশ্যি অপরের কাছে হাসির ব্যাপার মনে হতে পারে। টয়্যাস্টারয়েডে শুধু নীচুজাতের প্রাণীদের মত্যু ঘটে।’

‘তোমাদের কেউই মারা যায় না?’

‘না। না। একজন কেন এই নিয়মের বাইরে যাবে?’

‘কিন্তু তোমাদেরও তো বয়স বাড়ে। তোমরা খুব বড়ো হয়ে যাও। তখন কি করো?’

‘তখন আমাদের কাজকর্ম আস্তে আস্তে কমে আসে। শেষে একদম বন্ধ হয়ে যায়। দেহে আর শক্তি থাকে না। তোমাদের পৃথিবীর মানুষদের বেলাতেও তো এই নিয়ম, তাই না?’

‘নিশ্চয়। কিন্তু যখন তোমরা খুব বুড়ো হয়ে পড়ো, তখন কোথায় যাও?’

‘কোথাও না। তখন আমরা ঘরে বসে থাকি। কাজকর্ম করবে, ঘুরবে বেড়াবে বয়সে যারা যুবক, তারাই।’

আলোক দত্ত এখানে যেন কিছুটা থমকে গেল। ব্যাপারটা তার নিজের কাছেই ক্রমশঃ হেঁয়ালির মতো হয়ে উঠছে। পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে সে কী রিপোর্ট দেবে, এ গ্রহবাসীদের জন্ম আছে, মৃত্যু নেই! নোকোমাও তো এই অসম্ভব কথাটা আলোক দত্তকে বোঝাতে চায়। এখানে জন্ম আছে, মৃত্যু নেই। কিন্তু শুরু হয়েছিল কিভাবে?

‘নোকোমা, এবার একটু অন্য দিক দিয়ে ব্যাপারটা বোঝবার চেষ্টা করা যাক।’ বিব্রত, প্রায় বিমূঢ়ও, আলোক দত্ত বললো, ‘তোমার বাবা মা কোথায়?’

‘বাইরে কোথাও বেরিয়েছে। তারা এখনও সত্যিকারের বুড়োবুড়ি নয়।’ নোকোমার মুখে মিষ্টিহাসিটি লেগেই রয়েছে আঠার মতো।

‘তোমার ঠাকুর্দারা? ঠাকুমারা?’

‘তাদের কেউ কেউ এখনও বাইরে। বেশী বুড়োরা রয়েছে বাড়িতে। একটা ফ্যামিলীর আমরা ইয়ঙ্গার ব্যাচ। আমার মনে হয় বাড়িতে আমার ঠাকুমা রয়েছে ন’শ’জন।’

‘ এ্যাঁ,’ শুনে রীতিমতো চমকে ওঠে আলোকদত্ত! ঠাকুমার সংখ্যা ন'শ! নোকোমা নিশ্চয় রসিকতা করছে। তার কথার আরও একটু ব্যাখ্যার দরকার। তবেই না বিষয়টা পরিষ্কার হবে!

আলোক দত্ত মজার গলায় শুধলো, ‘কী বললে? তোমার ঠাকুমার সংখ্যা ন’শ’!’

নোকোমার মুখে যেন একটা আলো পড়েছে। চোখ দুটো কী উজ্জ্বল। হাসি হাসি মুখে সে বললো, ‘আমাদের বংশের কারো কারো বংশধরের সংখ্যা আবার অগুনতি। তাদের বাড়িতেই তারা রয়েছে।’

‘এই বংশধরেরা সবাই বেঁচে?’ আলোক দত্ত কপাৎ করে খাবি খেল। অবিশ্বাস্য ঘটনা!

‘থাকবেই তো। সব কিছু কে না বাঁচিয়ে রাখতে চায়?’

দারুণ! দারুণ খবর! একটা চাপা উত্তেজনা আলোক দত্তকে ছটফটিয়ে দিল। ঘোড়ার মতো দু’বার তুড়ুক তুড়ক করে লাফ দিয়ে বলে উঠলো, ‘আমি কি তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারি?’

নোকোমা এবার সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না। মনে মনে কী একটা ভেবে নিয়ে তাকে যেন সতর্ক করে দিয়ে বললো, ‘বয়সে সবার চেয়ে যে বড় তার সঙ্গে তোমার দেখা করাটা ঠিক বিজ্ঞের কাজ হবে না। টয়্যাস্টারয়েডে তোমরা ভিনগ্রহী। অচেনা আগন্তুক। তাই নানান আপত্তির কথা উঠবে। তবে অন্য দু’দশজনকে তুমি অবশ্যই দেখে যেতে পারো।’

ঠিক আছে। আলোক দত্ত তাতেই খুশী হবে। সে উৎসাহিতভাবে বললো, ‘নোকোমা, যদি তোমাদের কেউ কখনও না মারা যায়, তাহলে তোমাদের সম্পূর্ণ জাতিটাই এখনও পর্যন্ত বেঁচে আছে, তাই না?’

‘নিশ্চয়। একটা গাছে যেন ফল ধরে আছে। ফলগুলো গুণে দেখাও হয়েছে। একটাও গাছ থেকে খসে পড়েনি বা কেউ পেড়ে নেয়নি। সবগুলোই যথাযথ গাছে ঝুলে। এই রকম আর কী!’

‘কিন্তু যদি তোমাদের সর্বপ্রথম মানুষটা এখনও পর্যন্ত বেঁচে থাকে, তাহলে তো তোমাদের শুরু—সেই উৎপত্তির কথাটা তোমার জেনে নিতে পারো। শুরু হয়েছিল কী ভাবে? তুমি কি জানো, নোকোমা?’

‘না। আমি জানি না। আমাদের এখানে একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়, ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেবার পক্ষে আমার বয়সটা খুবই কম।’

‘তাহলে কে সেটা জানে? আসলে, জানে কি কেউ?’

‘হ্যাঁ, সব বুড়োবুড়িরা জানে।’

কৌতূহলে ছটফট করতে করতে আলোক দত্ত শুধলো, ‘বুড়োবুড়ি মানে? তোমার চেয়ে কত পুরষ পেছনের মানুষরা জানে এ সষ্টির রহস্য?’

‘দশ পুরুষ। তার বেশী না। যখন আমার ছেলেমেয়েরা দশ পুরুষে পৌঁছবে, তখনই ওই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার অধিকার জন্মাবে আমার! আমি তখন আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবো!’

‘তোমাদের ওই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কথা যদি আমাকে আরও একটু খুলে বলো—’

‘বছরে একবার, সবচেয়ে বুড়ো মানুষদের কাছে আর সব বুড়োবুড়িরা যায়। তাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে জিজ্ঞাসা করে, কীভাবে শুরু হয়েছিল এসব! সবচেয়ে বুড়ো মানুষরা আমাদের উৎপত্তির কথা আর সব বুড়োবুড়িদের বলে। এটাই আমাদের প্রধান উৎসবের দিন। আনন্দ হৈ-হুল্লোড় হাসিগান। শুধু এইসবই চলে দিনভর। তারপর ফের ঘুমিয়ে পড়ে সবচেয়ে বুড়ো মানুষেরা। একবছরের জন্যে। অনেক পুরুষ ধরে এ রীতি চলে আসছে। এটাই আমাদের ধমীয় অনুষ্ঠান।’

 

টয়্যাস্টারয়েডের অধিবাসীরা আমাদের পৃথিবীর মানুষের মতো নয়। বাঁদরের মতো তাদের মুখের আদল। তারা সোজা হয়েই হাঁটে। পরে পা-ঢাকা ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক, কোমরের কাছে বাঁধা। পোশাকের নীচের দিক লক্ষ্য করলে মনে হয় তারা দু’-পেয়ে প্রাণীই। যদিও ম্যানব্রেকারের এ সম্পর্কে এখনও কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। সে বলে, ‘টয়্যাস্টারয়েডের এই মানুষগুলো ঠিক পায়ে হেঁটে বেড়ায় না। যেন গড়িয়ে যায়। হয়তো চাকার সাহায্যে চলে।’

তাদের হাতদুটো লক্ষ্য করার মতো। সারা হাত জুড়ে ছোট ছোট অনেক ভাঁজ। ওই হাত দিয়ে ইচ্ছেমত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে তো পারেই, উপরন্তু দরকার হলে খোদ হাতই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একটা জটিল যন্ত্র হয়ে কাজে লেগে যায়।

জর্জ ব্লাডের মত : এই গ্রহবাসীরা সব সময়ে বাঁদরের মুখোস পরে থাকে। গ্রহাভিযাত্রী মানুষেরা তাই কখনও তাদের আসল মুখ দেখতে পায় না।

আলোক দত্ত নিজের আবিষ্কারের কথা অভিযাত্রী বন্ধুদের কাছে বলতেই তো তারা হো হো করে হেসে উঠলো।

ম্যানব্রেকার ব্যঙ্গ করে বললো, “মিঃ ব্লেইজ বোল্ট তার অভ্যাস মতো এখনও চিন্তা করে যাচ্ছে : শুরু হয়েছিল কীভাবে? আচ্ছা মিঃ ব্লেইজ বোল্ট, তুমি কি এখনও একথাটা ভুলতে পারোনি, কোনটা আগে এসেছিল—মুরগী, না ডিম?’

এসব কথা গায়ে মাখতে আলোক দত্ত’র বয়েই গেছে। সে জোরের সঙ্গে ফের তার বিশ্বাসের কথা বললো, ‘উত্তরটা আমি শীগগির পেয়ে যাবো। একটা চমৎকার সুযোগ এসেছে।’

ম্যানৱেকার বললো, ‘তুমি স্পেশাল অ্যাসপেক্টস ম্যান। কিন্তু সময় নষ্ট করছো রঙ অ্যাসপেক্টসয়ের পেছনে। শুরু কী ভাবে হয়েছিল, সেটা জানা বড় কথা নয়। এই গ্রহবাসীরা সবাই অমর থাকে, এ খবরটাই ইম্পর্ট্যান্ট।’

‘আমি কিন্তু এদের উৎপত্তিটাই আবিষ্কার করতে চাই।’ আলোক দত্ত বললো জোর গলায়।

ম্যানব্রেকার অতঃপর তর্ক জুড়ে দিল, ‘বোকার মতো কথা বলছো। তুমি কি বুঝতে পারছো না? উন্নততর বিজ্ঞান, তাদের প্রকৃতি বা স্রেফ বরাত জোর কীসের দৌলতে তাদের এই অবস্থা? এ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতে পারছি না।’

‘মনে হয় তাদের কেমিস্ট্রি।’

‘নিশ্চয়। এখানে অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রি এসেছে বহুকাল আগে। সবজাতের রসায়নই আছে এদের ভাঁড়ারে। নিজেদের শরীরকে এরা ইচ্ছে মত ছোটবড় করতে পারে। এই প্রাণীগুলোকে আমি স্টুপিড মনে করি। কিন্তু এদের এই অত্যাশ্চর্য শক্তিকেও তো স্বীকার না করে পারা যায় না। এই শক্তির পেছনে আসলে কোন রসায়ন কাজ করে, সেটাই আবিষ্কার করা দরকার। সেই দ্রব্য হাতে পেলে পেটেন্ট ওষুধ বানিয়ে আমরা জগৎজোড়া বাজারের অধীশ্বর হয়ে যেতে পারি, মিঃ ব্লেইজ বোল্ট। এ ব্যাপারে তখন আমাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী জুটবে না। কারণ এই টয়্যাস্টারয়েডয়ের অধিবাসীরা তাদের ঘর ছেড়ে কখনও কোথাও যায় না। যা হোক, আমার আরও ধারণা, এরা এদের শরীরের কোষগুলোকে সঙ্কুচিত প্রসারিত করতে পারে। আরও বিচিত্রতম কিছু করতে সক্ষম কিনা, কে বলবে?’

‘না। এদের শরীরের কোষগুলোকে এরা সঙ্কুচিত করতে পারে না। তোমার একথার কোন মানে হয় না, ম্যানব্রেকার।’

‘নেভার মাইণ্ড।’ ম্যানব্রেকার বললো, ‘চলিত প্রয়োগগত রসায়নের বোধহয় বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এরা। তারও এখানে কোন মানে নেই। এখানকার ফারমাকোপিয়া যে-মানুষ তুলে নিয়ে যাবে, তার কখনও মৃত্যুর দরকার হবে না। সেই নাছোড়বান্দা ঘোড়ার পিঠেই তুমি এখন সওয়ার হয়েছো, তাই না? তবে বসেছো পেছন ফিরে। অর্থাৎ ঘোড়ার পিঠে তুমি ঘোড়ার ল্যাজের দিকে মুখ করে বসে আছো, মিঃ ব্লেইজ বোল্ট।’

‘হ্যাঁ। এ সম্পর্কে তারা স্থিরনিশ্চিত। যদি মারা যেতো, তাহলে তারা প্রথম জানতো। নোকোমা তাই বলে।’

‘বলো কী? এদের ভেতরে কৌতুকরসবোধও আছে তাহলে?’

আলোক দত্ত হাসিমুখে বললো, ‘কিছু কিছু। একমাত্র আমি এখন সেটা বুঝতে পারছি। এদের বিশ্বাস, এরা অমর! কথাটা মেনে নিলে, এটাও নিশ্চয় বিশ্বাস করতে হয় এদের আদি প্রাচীনতম মানুষটিও তাহলে এখনও বেঁচে। এদের কাছ থেকে আমি তাহলে জানতে পারবো এই প্রজাতির উৎপত্তির রহস্যটা।’

শুনতে শুনতে ম্যানব্রেকার যেন হঠাৎ ক্ষেপে উঠলো। নিজের চুল আর কান ধরে সেকী টানাটানি। সেইসঙ্গে দুমদাম করে দুরমুশের মতো পা ঠুকতে লাগলো মাটিতে। চেঁচাতে লাগলো ক্ষ্যাপাষাঁড়ের মতো—‘রহস্য! রহস্য! রহস্য! আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। শুধু রহস্যটা জেনে কী লাভ হবে? একটা প্রজাতির উৎপত্তি! চুলোয় যাক। ইউ ফু-উ-ল।’ অদূরে পাহাড় থেকে প্রতিধ্বনি ভেসে এলো, ‘ইউফুল!’

 

নোকোমার কাছ থেকে আগাম কোন আমন্ত্রণ ছিল না। আলোক দত্ত নিজেই গেল বাড়িতে। নোকোমা তখন বাড়িতে নেই। খবরটা জেনেই সে এ কাজটি করেছে। ছিঁচকে চোরের মতো চুপিসাড়ে ঢুকে পড়েছিল বাড়িতে।

টয়্যাস্টারয়েডে ন’শ’ ঠাকুমা সম্পর্কে নিজেই একটু খোঁজখবর নিয়ে জানতে চায় আলোক দত্ত এখানে জ্যান্ত পুতুল সম্পর্কে গুজবই বা কতদূর সত্য? নোকোমার সাহায্য ছাড়া নিজের চেষ্টাতে বিষয়টা জেনে নিতে পারলে ক্ষতি কী? এখানে মানুষ বুড়ো হলেও মারা যায় না। মৃত্যু কী, তারা জানে না। কিন্তু ব্যাপারটা যদি সত্যি হয় তাহলে এখানে বুড়োবুড়িরা কী কাজ করে? গ্রহটির এই প্রজাতির উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, সে রহস্য এরা কেউ জানে কিনা, আলোক দত্তর এমন সব চিন্তাই প্রচণ্ড মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।

নোকোমাদের বাড়ি একটা বিশাল পাহাড়ের মাথায়। সমতল জায়গায়। পাথর মাটির সংমিশ্রণে তৈরী। অনেক বাড়ি কাছাকাছি ঝাঁক বেঁধে রয়েছে। তবে প্রতিটি বাড়ি দেখতে বেশ হিমছাম। বাড়িগুলোকে দেখে পাহাড়েরই একটা অংশ বলে ভুল হতে পারে।

প্যাঁচালো পাথরে রাস্তা দিয়ে আলোক দত্ত ওপরে উঠেছিল। নোকোমা তাদের বাড়িটা আগের দিন চিনিয়ে দিয়েছিল, তাই কোন অসুবিধা হয়নি। অবশ্যই চোরের মতো বাড়িতে ঢুকেছে সে। ঢুকেই এক ঠাকুমার সঙ্গে মুখোমুখি। ইনি ন’শ’ ঠাকুমার একজন! বসেছিলেন। আলোক দত্তকে দেখে মুখে তাঁর মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো। আলোক দত্তর সঙ্গে দু’চারটে কথাবার্তা হলো তাঁর। কাউকেই খুব একটা অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়নি। ঠাকুমার ভাষা বুঝতে তেমন আর কষ্ট নেই। নোকোমার কাছে আলোক দত্ত এই ভাষা শেখার পাঠ আগেই তো নিয়ে রেখেছিল।

ঠাকুমার ডাকে একজন ঠাকুর্দা এলেন। মিষ্টি হাসি তাঁরও মুখে। এই দুই প্রাচীন প্রাচীনার চেহারা যুবক আর কাজের মানুষদের তুলনায় কিঞ্চিৎ ছোট। পৃথিবীর শান্ত দয়ালু মানুষের মতো দেখতে। তবে একটা ঘুম-ঘুম বিষাদময় আবহাওয়া যেন ঘিরে রেখেছে মানুষ দুটিকে।

‘এখানে আপনাদের চেয়ে বুড়ো মানুষ আর কেউ আছে?’ আলোক দত্ত সম্ভ্রম দেখিয়ে শুধলো।

‘অনেক অনেক। সংখ্যায় ঠিক কত হবে, কে জানে?’ ঠাকুমা জবাব দিলেন। তাঁর ডাকে সেখানে এসে হাজির হলেন আরও অন্যান্য ঠাকুর্দারা। তাঁদের বয়স আরও বেশী। চেহারায় তাঁরা আরও খাটো। কিন্তু সকলের মুখেই সেই মিষ্টি হাসির ছোঁয়া। চোখে ঘুমঘুম ভাব। না, এদের কারো মুখে কোন মুখোস আঁটা নেই। এখন সেটা পরিষ্কার হয়ে গেল আলোক দত্তর কাছে। ত্রিভুবনে এমন ওস্তাদ কারিগর কেউ নেই, যে এইসব ঠাকুমা ঠাকুর্দার মুখের নিখুঁত নকল করে মুখোস বসাতে পারে।

আলোক দত্ত প্রথম ঠাকুমাকে শুধলো, ‘যিনি বয়সে সবচেয়ে বড়ো, তাঁর বয়স এখন কত হবে?’

তাঁর জবাব, ‘আমরা বলি যে আমরা সবাই সমান বয়সের। কারণ আমরা সবাই চিরস্থায়ী। সকলেরই বয়স এক, এটা সত্যি নয়। তবে বয়সের হিসেব চাওয়াটা এখানে অভদ্রতা।’

না-জেনে না-বুঝে সেকি ঠাকুমা ঠাকুর্দাদের রাগিয়ে দিল? অলোক দত্ত সবিনয়ে বললো, ‘আমাদের পৃথিবীতে একটা জীব আছে। গলদা চিংড়ি। আপনারা তা জানেন না। সেই জীবটিকে যদি জলে রেখে জলটুকু খুব ধীরে ধীরে গরম করা হয়, তাহলে গলদা চিংড়িও খুশী খুশী ভাব নিয়েই গরমজলে এক সময়ে সেদ্ধ হয়ে যায়। একদম ভয় পায় না। কারণ সে জানে না ঠিক কত ডিগ্রী উত্তাপ তার পক্ষে বিপজ্জনক। এখানে আমিও পড়েছি প্রায় সেই রকমই ঝামেলায়। আপনাদের সঙ্গে আমিও এক ডিগ্রী থেকে আর-এক ডিগ্রীতে অবাধে চলে এসেছি। আমার সহজ বিশ্বাস নাড়া খায়নি। আপনাদের সম্পর্কে যে কোন বিশ্বাসের মধ্যে যদি সামান্যতমও বিপদ থাকে, তাহলে আমি তো সেই বিপদের মধ্যেই পড়ে গিয়েছি। যাই হোক, আপনারা যাঁরা এখন এখানে উপস্থিত, তাঁদের সকলের চেয়ে বয়সে বড় এমন আর-কেউ কোথাও আছেন নাকি?’

প্রথম ঠাকুমা আলোক দত্তকে ইসারা করলেন তাকে অনুসরণ করতে। আলোক দত্ত চললো। ঘরের মেঝের ভেতর দিয়েই একটা ঢালু পথ। নামতে হলো নীচের দিকে। বাড়ির অতি পুরনো অংশ সেটা।

 

আন্ডারগ্রাউণ্ডে জীবন্ত পুতুলের দল। সারি সারি তাকের ওপরে সাজানা। কুলঙ্গীর ভেতরে নিজের নিজের চেয়ারে বসে রয়েছে তারা। সংখ্যায় কয়েকশ’।

ঠাকুমার সঙ্গে আলোক দত্ত গিয়ে হাজির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুতুলদের অনেকেই যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলো। বাকীরা জেগে উঠলো তাদের কথার আওয়াজ শুনে বা হাতের ছোঁয়া পেয়ে। প্রতিটি পুতুলই অবিশ্বাস্যভাবে প্রাচীন। কিন্তু সদাসতর্ক—চোখমুখের ভাব দেখে বোঝা যায়। চোখে একটু ঘুম-ঘুম ভাব থাকলেও, ছোট্ট ছোট্ট ঠোঁটে মিষ্টি হাসি খেলা করে গেল আলোক দত্তকে দেখে। আলোক দত্ত কথা বললো তাদের সঙ্গে। কী আশ্চর্য! তারা পরস্পরকে ভালভাবে বোঝে।

এসব ব্যাপার লক্ষ্য করে আলোক দত্তর মনে একটু ভয় জাগলো। গলদা চিংড়ি! গলদা চিংড়ি! জলের উত্তাপ বিপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পরিবর্তনটা চিংড়ি বুঝতে পারছে না। আলোক দত্ত মনে মনে আরও বললো, এই ঘটনায় যদি তুমি তোমার বোধশক্তিকে বিশ্বাস করো, তাহলে তুমি তোমার সহজ বিশ্বাসের মধ্যেই জ্যান্ত সেদ্ধ হয়ে যাবে!

এখন তার জানা হয়ে গেল, জ্যান্ত পুতুলগুলো কল্পনা নয়, বাস্তব। টয়্যাস্টাররেডয়ের বর্তমান অধিবাসীদের পূর্বপুরুষ এরাই।

ফের ঘুমিয়ে পড়লো অনেকেই। জেগে থাকায় সময়টা এদের খুবই কম। তবে ঘুমের চরিত্র একই রকম। আলোক দত্ত চলে আসবার আগে জীবন্ত ম্যমিদের অনেকেরই ফের একবার ঘুম ভেঙেছিল। ঘুম ভাঙলেই, স্বল্পক্ষণের জন্যে হলেও বেশ চনমনে হয়ে উঠেছিল। ছটফট করেছিল কথা বলার জন্যে।

চোখে দেখেও সহজে যেন বিশ্বাস হয় না। বিস্ময়ে অভিভূত আলোক দত্ত এক সময়ে বলে উঠলো, ‘অবিশ্বাস্য ঘটনা।’

শুনে তারা সক্কলে, ছোট, আরও ছোট, আরো আরো ছোটরা হাসিমুখে পৃথিবীর মানুষটির কথার অনুমোদন জানালো।

মানুষটি কৌতূহলে ছটফট করতে করতে বললো, ‘বয়সে সবচেয়ে বড় যারা, তারা কোথায়? একেবারে আদিতে যারা এসেছিল? আপনাদের প্রথমতম বৃদ্ধরা—

সেই প্রথম ঠাকুমা জবাব দিলেন, আমাদের বুড়ো মানুষ অনেক আছে। বুড়ো। আরো বুড়ো। আরো আরো বুড়ো। তারও চেয়ে বুড়ো। তবে আরও খোঁজাখুঁজি করাটা তোমার পক্ষে বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তুমি তো এখন পর্যন্ত যথেষ্ট দেখলে। বুড়ো মানুষদের অবস্থাটা স্রেফ ঘুমঘুম। চলো, এবার ওপরদিকে ওঠা যাক।

ওপরে উঠে যেতে হবে? এসব অবিশ্বাস্য ক্ষুদে ক্ষুদে জ্যান্ত পুতুলদের মাটির নীচের আস্তানায় ছেড়ে রেখে? এত তাড়াতাড়ি পারবে না আলোক দত্ত। এদিক ওদিকে অনেকগুলো পথ রয়েছে। সব পথই নীচের দিকে আরও গভীরে চলে গেছে। সেখানেও ওইরকম ঘরের পর ঘর। সংখ্যাহীন! ভেতরে আরও মৌচাকের মতো পথের প্রসার।
আলোক দত্ত এগিয়ে চললো। তার গতি থামাবে কে? ওই ক্ষীণদেহ পুঁচকে জ্যান্ত পুতুলগুলো? আলোক দত্ত যেন পৃথিবীর হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যাচ্ছিল ওই শুঁড়িপথ দিয়ে। ওপরের স্তরে যেখানে আবহাওয়ার ভেতরে ছিল একটা পরিষ্কার গন্ধ, এখন পরিবেশে কেমন যেন ঘুম-ঘুম, হাসি-হাসি, বিষন্নতার সংমিশ্রণ! রীতিমতো উগ্র প্রকৃতির। সময় বা মহাকাল, এভাবেই গন্ধ ছড়ায়।

ঠাকুমার কাঠির মতো হাত শক্ত করে চেপে ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে এসেছে সে। এবার ঠাকুমাকে শুধলো, ‘এখানে যারা আছে, তারা কি বয়সে আপনার চেয়ে বড়?’

ঠাকুমা জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ। বয়সে এতই বড় আর আকারে এমনই ছোট যে আমিও তাদের আমার হাতের চেটোয় ধরতে পারবো না।’

প্রতিটি ঘরে ক্ষুদে ক্ষুদে আর অতি বুড়ো প্রাণীদের নজরে আসতে লাগলো। হ্যাঁ, আলোক দত্ত এখন সেদ্ধ-হয়ে-যাওয়া গলদা চিংড়ি। নিশ্চয়ই! এ সব কিছু তাকে বিশ্বাস করতে হবে। নিজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতা। নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি সহযোগে উপলব্ধি করা।

আলোক দত্ত একটি ক্ষুদে ঠাকুমাকে দু-আঙুল দিয়ে টুক করে তুলে নিল, ‘ঠাকুমা, এখানে কি আপনার চেয়েও বুড়ো মানুষ কেউ আছে নাকি গো?’

বলেই কান পেতে শুনতে পেল, ‘আছে বৈকি। তারা আকারে আমার চেয়েও ছোট। তুমি প্রায় শেষের কাছে চলে এসেছো, নাতি।’

তারপরই আলোক দত্তর দু-আঙুলের মধ্যে এই ক্ষুদে ঠাকুমাটির ঘুমন্ত শরীর ঝুলে পড়লো। ফের তাই বসিয়ে দিতে হলো তাকে তার নিজের জায়গাতে। এখানে যার বয়স যত বেশী, ঘুমও তার তত বেশী। | আরও নীচের দিকে নামতে নামতে আলোক দত্ত পাহাড়ের একেবারে মূলের কাছে পৌছে গেল। এখানের পথ নিরেট পাথরকাটা। সংখ্যাতেও অবশ্যি কম। কিন্তু সে যা হোক, টয়্যাস্টারয়েডের এই স্তরের প্রাণীগুলোকে খালি চোখে আর দেখা যাবে তো? ওপরের স্তর থেকে ছোট হতে হতে সব শেষ স্তরে কী চেহারা নিয়ে তারা পৌঁছেছে? তাদের সঙ্গে কি কথাবার্তা চালানো যাবে? আলোক দত্তর ভয়, হয়তো ওসব আর সম্ভব হবে না। তাহলে তো তাদের উৎপত্তি-রহস্য অন্ধকারেই রয়ে গেল।

কিন্তু নোকোমা কি বলেনি যে সব বুড়োবুড়িই সে রহস্য জানে? বলেছিল তো! তবে, আলোক দত্ত সেটা এদের বয়সে সবচেয়ে বুড়ো মানুষটির মুখ থেকেই শুনে যাবে আশা করেছিল।

‘সেই আদি প্ৰথমতম মানুষটি এখানে কে? থাকেন কোথায়? উঠুন। উঠুন। সাড়া দিন।’ সবচেয়ে নীচের তলার সবচেয়ে প্রাচীনতম ঘর বলে মনে হয়েছে জায়গাটিকে। তাই আলোক দত্ত অস্থির হয়ে কথাগুলো বললে।

‘এটা কি আমাদের বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান?’ একজন ঘুম ভেঙে জেগে উঠে ক্ষীণতম গলায় প্রশ্ন রাখলো। চেহারা তার পৃথিবীর নেংটি ইঁদুরের চেয়েও ছোট। তবে মৌমাছির চেয়ে বড় নয়। আলোক দত্ত বললো, ‘এটা একটা বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। গোড়াতে কীভাবে শুরু হয়েছিল দয়া করে একটু বর্ণনা দিন।’

সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীণ একটা শব্দ শোনা গেল। তার কথা শুনে একযোগে হেসে উঠলো কি লক্ষ কোটি জীবাণু? আলোক দত্ত মনে মনে খুবই বিরক্ত। তবে কৌতূহলকে বশে রাখতে পারল না। সাগ্রহে ফের শুধলো, ‘বয়সে আপনাদের সকলের চেয়ে বড় কে? কে আপনাদের মধ্যে প্রথম?’

‘আমি!’ এবার চাপা গলায় বলে উঠলেন একজন, ‘আমিই হলাম এদের প্রথমা। প্রথম ঠাকুমা। আর সবাই আমার ছেলে মেয়ে। তুমিও কি আমার ছেলেমেয়েদের ভেতরে একজন?’

‘নিশ্চয়।’

‘তাহলে তুমিও হবে চূড়ান্ত সন্তান। কারণ আর সকলের মতো তুমি নও।’

‘গোড়াতে ছিল কেমন? আপনিই তো প্রথমা। তাহলে আপনি কি জানেন আপনার উদ্ভব কী ভাবে হয়েছিল?’ দারুণ উত্তেজনায় সর্বাঙ্গ কাঁপছিল আলোক দত্তর।

জবাব এলো, ‘জিনিসগুলোর আরম্ভের প্রণালী এতই মজার! একটা কৌতুক! স্রেফ একটা কৌতুক!’ বলে সবচেয়ে বড় ঠাকুমা হেসে তো কুটিকুটি।

‘তাহলে কৌতুকটাই আমাকে বলুন। যদি স্রেফ একটা কৌতুকই আপনাদের জাতির জন্ম দিয়ে থাকে, তাহলে সেই সৃষ্টি সংক্রান্ত কৌতুকটা কী, দয়া করে আমাকে একবার শোনান।’

‘সেটা তুমি নিজেই নিজেকে বলো।’ ঠাকুমা যেন টুংটাং করে বেজে উঠলেন, ‘যদি তুমি আমার সন্তানদের একজন হও, তাহলে তুমিও সেই কৌতুকের একটা অংশ। ওহ! এটা বিশ্বাস করাও খুব মজার। এই ঘুম থেকে জেগে ওঠা, হাসি তামাসা করা, তারপর ফের ঘুমিয়ে পড়া দারুণ লাগে।’

হতাশায় মনটা যেন পড়ে যায় অলোক দত্তর। প্রায় তীর ছুঁয়ে কি তরী ডুববে?

‘ফের ঘুমিয়ে পড়বেন না।’ আলোক দত্ত চেঁচিয়ে বললো, ‘শুরু হয়েছিল কী ভাবে? এখনি বলুন আমাকে।’ বলেই হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর ফাঁকে সে বন্দী করে ফেললো সর্বজ্যেষ্ঠা ঠাকুমাকে।

ঠাকুমার আপত্তি, ‘এটা বাষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। ওই অনুষ্ঠানে তুমি তিন দিন ধরে রহস্যটা অনুমান করবে। আমরা হাসাহাসি করবো। বলবো,
না—না—না—! যা ভেবেছো তার চেয়ে ন’গুণ বেশী জটিল। বিষয়টা ভাবো, আরো আন্দাজ করো।’

‘না। তিনদিন ধরে আমি তা ভেবে দেখবো না। এখনি শুনতে চাই সেটা। না বললে আপনাকে আমি আমার হাতের মুঠোয় পিষে খতম করে দেব।’

রাগত কণ্ঠে ভয় দেখায় আলোক দত্ত। তবে গলায় জোর নেই। স্বরও কাঁপা কাঁপা।

‘তাকাও আমার মুখের দিকে। তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি আমি। তারপর যদি তুমি সেই অপকর্মটি করতে পারো, তাহলে একটা অবাক কাণ্ডই হবে।’ শান্ত মিষ্টি সুরে সর্বজ্যেষ্ঠা ঠাকুমা বললেন।

অভীযাত্রীদের যে কোন বেপরোয়া সদস্য ওই অপরাধটি খেলার ছলেই করে যেতে পারতো। তাদের হাতে একটার পর একটা জীবন্ত পুতুল খতম হয়ে যেত ওই রহস্যটি আবিষ্কার করার উদ্দেশ্য। বিবেক বোধের ধার ধারতো না। নাম আলোক দত্ত না হয়ে ব্লেইজ বোল্ট হলেই ওজনদার নামের গুণেই সেও হয়তো তেমন কাজ করতে পিছপা হতো না। যেমন ম্যানব্রেকার বলে থাকে, মানুষের নামের মধ্যেও নাকি বিশেষ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটতে পারে।

‘বলুন। বলুন আমাকে।’ মনের মধ্যে নিদারুণ যন্ত্রণা নিয়ে আলোক দত্ত সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালো, ‘সারা জীবন ধরে জানতে চেষ্টা করেছি। শুরু হয়েছিল কীভাবে? যে কোন জিনিসের আরম্ভটা কীভাবে হয়? আপনি জানেন—’

‘আমরা জানি। যেভাবে এসব শুরু হয়েছিল, তা ভারী মজার ব্যাপার। নিদারুণ একটা কৌতুক। বোকার মতো, ক্লাউনের মতো, এমনি অদ্ভুত জিনিস। কেউ সেটা আন্দাজ করতে পারে না। বিশ্বাস করতে পারে না।’

‘আমাকে বলন। আমাকে বলুন।’ আলোক দত্তর মুখ ছাইরঙা। সে এখন প্রায় উন্মাদ।

‘না, না। তুমি আমার সন্তানের অংশ নও।’ সর্বজ্যেষ্ঠা ঠাকুমার অতি ক্ষীণ স্বরও যেন আনন্দে খল খল করে বাজলো, ‘বাইরের অচেনা কারো কাছে কৌতুকের কথা বলাটাও মস্তবড় এক কৌতুক! তাকে এমন মজার অবিশ্বাস্য কথা শোনানোর মানে তাকে অপমান করা। বহিরাগতদের মৃত্যু আছে। আমার কৌতুকের কথা শুনে বহিরাগত কেউ হাসতে হাসতে দম ফেটে মারা যাক, এটা আমার ইচ্ছে নয়। আমার বিবেকেরও সায় নেই।’

‘আমাকে বলুন। অপমান করুন। হাসতে হাসতে আমায় মরতে দিন।’
প্রায় মৌমাছি আকারের লক্ষ লক্ষ জীব হেসে উঠলো একযোগে। ওপর দিক থেকেও হাসির ঢেউ ছুটে এলো। বিচিত্র হাসির আওয়াজ। হাসির আওয়াজ! তারা হাসছে। এবং হাসছে। এবং হাসছেই! ওই হাসি ক্ৰমে সংক্রামিত হলো আলোক দত্তর মধ্যে। একটা অব্যক্ত অতৃপ্তির যন্ত্রণা বুকে নিয়ে সীমাহীন হতাশায় ভেঙে পড়া পৃথিবীর ওই মানুষটিও একসময়ে হাসি জুড়ে দিল হো হো করে।

মহাকাশযানের কাছে সে যখন ফিরে গেল, মুখে কোন কথা না বলে তখনও সে ওই রকমই হাসছিল।

[ আর. এ. ল্যাফাটির ‘নাইন, হানড্রেড গ্র্যান্ডমাদার্স' অবলম্বনে রচিত ]
‘ফ্যানটাসটিক’ পত্রিকার ‘বার্ষিকী ১৯৮৩’ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এই গল্পটি। ‘ফ্যানটাসটিক’-এর সমস্ত লেখার বর্তমান প্রকাশক ‘কল্পবিশ্ব পাবলিকেশানস’-এর সৌজন্যে লেখাটি এবারের সংখ্যায় পাঠকের সামনে আবার নিয়ে এল ‘পরবাসিয়া পাঁচালী’।

পাঠকেরা যা পড়ছেন