এপ্রিল ২০১৯



প্রচ্ছদশিল্পী - পিয়াল চক্রবর্তী


(প্রতিটি লেখা Hyperlink করা আছে। লেখার ওপর ক্লিক করে পড়ুন।)



উপন্যাস


প্রবন্ধ


অনুবাদ কমিকস


গল্প

মায়াং-এর পুঁথি প্রদীপ কুমার বিশ্বাস
ফাঁদ সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
গহনে সায়নদীপা পলমল
বাগানের বেঞ্চ মধুমিতা সেনগুপ্ত
নেপথ্যচারী এরশাদ বাদশা
ডায়াল অ্যান আলিবাই মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
অ্যা পয়জন দ্যাট লিভস নো ট্রেস লুৎফুল কায়সার
দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস গেম অপরেশ পাল
বন্ধ ঘরের ভেতর বিভাবসু দে
দ্য মোয়াবাইট সাইফার তমোঘ্ন নস্কর


সম্পাদকের কথা

প্রিয় পাঠকবন্ধুরা,

প্রথমেই আপনাদের সবাইকে জানাই নতুন বাংলা বছরের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। শারদ সংখ্যার পর আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম সাহিত্যের আলাদা আলাদা গোত্র নিয়ে এক একটি সংখ্যা করার, যাতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার বিস্তর সুযোগ থাকে। সেই মত গত জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছে কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি সংখ্যা। সেটি কিঞ্চিৎ হলেও পাঠকানুকুল্য পাওয়ায় এবারে নতুন বাংলা বছরের শুরুতে আমাদের নিবেদন - বিশেষ অপরাধ ও রহস্য সংখ্যা।

তবে ‘অপরাধ ও রহস্য’কে আদৌ সাহিত্যের গোত্র বলা যায় কিনা তা নিয়ে পাঠক ও লেখকমহলে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে শরদিন্দু ব্যোমকেশকে নিয়ে তাঁর প্রথম গল্প-সংগ্রহ ‘ব্যোমকেশের ডায়েরী’র ভূমিকায় (১৯৩৩) লিখেছিলেন, “ডিটেকটিভ গল্প সম্বন্ধে অনেকের মনে একটা অবজ্ঞার ভাব আছে- যেন উহা অন্ত্যজশ্রেণীর সাহিত্য- আমি তাহা মনে করি না। Edgar Allan Poe, Conan Doyle, G. K. Chesterton যাহা লিখিতে পারেন, তাহা লিখিতে অন্ততঃ আমার লজ্জা নাই।” আমাদেরও মতে, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, যাঁরা সাহিত্যের অন্যান্য গোত্রে প্রথিতযশা, তাঁরা যখন ‘অপরাধ ও রহস্য’ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন, আমাদের আর এটা সাহিত্যের গোত্র কিনা তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে!

‘অপরাধ ও রহস্য’ নিয়ে কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবে উঠে আসবে পাল্প ম্যাগাজিন বা মণ্ড-পত্রিকাদের কথা। বর্তমান সময়ে জনরা ফিকশন আবার ফিরে এসেছে পাঠকের মনে। ভাবলে অবাক লাগে, একটা সময় বিভিন্ন জনরায় নানা স্বাদের লেখা নিয়ে নিয়মিত প্রকাশিত হত মাসিক রহস্য পত্রিকা, মাসিক রোমাঞ্চ আর মাসিক গোয়েন্দা! শুধু এই তিনটি নয়, বিভিন্ন সময়ে ১৫-১৬টি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে এই বাংলার বুকেই। কী হলো তাদের? অনীশ দেব তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘রহস্য রোমাঞ্চ গোয়েন্দা পত্রিকার সেরা ১০০ গল্প’-এর ভূমিকা ‘রহস্যময় দিন, রোমাঞ্চকর রাত’-এ সে দুঃখের কাহিনী জানিয়েছেন, “সত্তর দশকের যে-উত্থান আশা জাগিয়েছিল, পরের দশকে সেটা খুব দ্রুত স্তিমিত হয়ে গেছে। তবে এর কারণ হিসেবে শুধুমাত্র অডিয়ো-ভিশুয়াল মিডিয়ামকে দোষ দেওয়া যাবে না। কিংবা আধুনিক মুদ্রণ পদ্ধতির জাঁকজমককে দায়ী করা যাবে না। এই দুইয়ের কাছে পত্রিকাগুলো হেরে তো গিয়েছিলই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল একঘেয়ে দুর্বল রচনার চাপ। এই তিনের কাছে নতিস্বীকার করে ‘ওরা’ নিভে গিয়েছিল।”

এখন ‘অপরাধ ও রহস্য’ বললেই পাঠকের মনে ভেসে ওঠে দেশ বিদেশের নানা গোয়েন্দাদের কথা। কিন্তু ‘অপরাধ ও রহস্য’ মানে কি শুধুই গোয়েন্দা? আমরা চেয়েছিলাম চিরাচরিত গোয়েন্দাদের পাশাপাশি থাকুক অন্যরকম লেখা যার মধ্যে দেখা মিলবে অপরাধীদের মনস্তত্বের কিংবা তদন্তের সত্য ঘটনার। সে কাজে কতটা সফল হয়েছি তা পাঠকরাই বলবেন। পাঠকদের মতামত এক্ষেত্রে যে খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা বলাই বাহুল্য। কাজেই ভালো লেগেছে, খারাপ লেগেছে বা মনে দাগ কাটেনি, যে কোনো ধরণের মতামত আমাদের জানাতে ভুলবেন না। আমরা ধন্যবাদ জানাই সমস্ত লেখক ও শিল্পীকে, যাঁদের একের পর এক অসাধারণ কাজে এই সংখ্যা সেজে উঠেছে।

তাহলে আর দেরি কীসের, রহস্যময় সাগরে ডুব দিন। যাত্রা শুভ হোক!

ধন্যবাদান্তে,

পাপ - পৃথ্বীশ গজী

বি. দ্র.- এই লেখার কিছু অংশের বিবরণ ও ভাষা সব ধরণের পাঠকের উপযুক্ত নয়।

রাহুল অফিসে বেরিয়ে যেতেই ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল যূথিকা।

গতকাল রাত থেকেই আকাশের মুখ ভার। সঙ্গে বৃষ্টিও হচ্ছে অবিরাম। সকালবেলা বৃষ্টির বেগ একটু কমলেও পুরোপুরি ধরেনি এখনও।

এরকম দিনে তাদের স্কুলে খুব বেশি ছেলেমেয়ে আসে না । আর কচিকাঁচাগুলো না থাকলে গোটা স্কুল বিল্ডিংটাই প্রাণহীন লাগে তার। এদিকে জুলাই মাস পড়ে গেলেও যূথিকা এই বছরে একটাও ছুটি নেয়নি। তাই আজ সিএল নিতে দু’বার ভাবেনি সে। কিন্তু স্কুলে না গেলেও এরকম দিনে একলা ঘরে বসে থাকতেও যে মন চায় না যূথিকার। ইচ্ছা করে তার ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে কোনও হাইওয়ের ধারে দাঁড়িয়ে ভিজতে। তারপর তার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে খোলা আকাশের নীচে আস্তে আস্তে মিশে যেতে তার শরীরে।

কিন্তু সে গুড়ে বালি!

এই দেশে উন্মুক্ত যৌনতা যে সামাজিক অপরাধ।

অবশ্য সেটাই যে একমাত্র কারণ তাও নয়। আসলে যূথিকার ভালোবাসার মানুষটাই আর নেই তার কাছে।

রাহুল তো তার ভালোবাসার জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই।

আর ঋক তো গিয়ে বসে আছে সুদূর বেঙ্গালুরুতে।

হাজারবার বললেও যূথিকাকে নিয়ে যায়নি সেখানে।

অন্যের বউয়ের সঙ্গে প্রেম করা আর তাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া—ব্যাপার দুটোর মধ্যে বোধহয় ফারাক আছে বিরাট!

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আড়াআড়িভাবে এসে ধাক্কা মারছিল যূথিকার চোখেমুখে। চারপাশে আর সেরকম উঁচু বাড়ি নেই বলেই তিনতলার ব্যালকনিতে বৃষ্টির ছাঁট বেশি। চাকরি পাওয়ার পর, যূথিকার অনুরোধে কোন্নগরে এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল রাহুল। তখন বিয়ে না হলেও জমে উঠেছে ওদের ভালোবাসা। অথচ হিসাব মত দেখতে গেলে বিয়ে কেন যূথিকা আর রাহুলের ভালোবাসাটাই হওয়ার কথা নয় কখনও। যূথিকা চন্দননগর প্রাইমারি স্কুলের বাংলার মাস্টারমশাই বিধানবাবুর একমাত্র মেয়ে। এখন অবস্থা একেবারে পড়ে গেলেও ওদের বংশটা কিন্তু বনেদী।

আর রাহুল...

রাহুলের সঙ্গে যূথিকার পরিচয় হয়েছিল ফেসবুকে; যূথিকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। সেবছরই বিধানবাবু একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিয়েছিলেন মেয়েকে।

পথচলা খুব আস্তে আস্তে শুরু হলেও যূথিকা আর রাহুলের বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়েছিল ম্যাসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপের ভিডিও কলিঙয়ের সৌজন্যে।

ক্রমশ সেই বন্ধুত্বে ফুটতে শুরু করেছিল ভালোবাসার ফুল।

বয়স একটু বাড়ার পর থেকেই ছেলেদের প্রতি তীব্র একটা শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করত যূথিকা। রাহুল দেখতে শুনতে তো বেশ ভালো বটেই, তার সঙ্গে পড়াশুনাতেও তুখোড়। সেইজন্যই বোধহয় কিছুদিনের মধ্যেই যূথিকার চোখে রাহুল হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সুন্দরতম পুরুষ।

সে নিজেই প্রপোজ করেছিল রাহুলকে।

কিন্তু রাহুল তখন প্রেম ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতে চাইত না কিছুতেই। এড়িয়ে যেতে চাইত যে কোনও অছিলায়।

অথচ যূথিকা নাছোড়।

শেষ পর্যন্ত একদিন রাহুলই তাকে সামনাসামনি ডেকেছিল কিছু কথা বলার জন্যে। ডিসেম্বরের এক দুপুরে কলেজ পালিয়ে শ্রীরামপুরের এসডিও ঘাটে সে দেখা করেছিল রাহুলের সঙ্গে। রাহুল তখন কলেজ শেষ করে একটা চাকরি খুঁজছে। প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাত। দামামা বাজছিল যূথিকার বুকের ভিতরে। অথচ রাহুল শান্ত। রাহুলের নির্লিপ্ততা যেন মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছিল যূথিকারও। কিছু বলতে পারছিল না সেও।

শ্রীরামপুরের এসডিও ঘাটটা বাঁধানো। পাশাপাশি বসার জন্যে রয়েছে অনেকগুলো বেঞ্চ। এরকমই একটা বেঞ্চে সেদিন বসেছিল ওরা। গঙ্গা থেকে ভেসে আসা ঠাণ্ডা হওয়া ওদের দু’জনেক জাপটে ধরলেও সে’রকম শীত করছিল না কারুরই। প্রথমে খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকলেও কথা বলা শুরু করেছিল রাহুলই। অল্প কিছুক্ষণ একথা সেকথা বলার পর রাহুল চলে এসেছিল আসল প্রসঙ্গে, “আমিও তোমাকে ভালোবাসি যূথিকা। কিন্তু সব জানলে হয়তো তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”

তখন যূথিকা একথা ভাবতে পারত না তার স্বপ্নেও। তাই সে চেপে ধরেছিল রাহুলের হাত, “রাহুল, তুমি আমায় সব বলতে পারো। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি কখনও ছেড়ে যাবো না তোমাকে।”

সেদিন রাহুল শুনিয়েছিল ওর অভিশপ্ত ইতিহাসের কথা। কিন্তু সব শুনেও ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি যূথিকা। এর কিছুদিন পরেই চাকরি পায় রাহুল। ততদিনে যূথিকার দৌলতে বিধানবাবুও জেনে গেছেন রাহুলের ইতিহাস। তাঁর একেবারেই মত ছিল না মেয়েকে ওই বাড়িতে বউ করে পাঠানোর। কিন্তু নিজের বাবার সমস্ত আপত্তিকে নস্যাৎ করে দিয়ে ফাল্গুন মাসের এক সন্ধ্যায় শেওড়াফুলির সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে যূথিকা বিয়ে করে নেয় রাহুলকে।

বিয়ের পর অবশ্য রাহুল তার শ্রীরামপুরের বাড়িতে নিয়ে যায়নি যূথিকাকে। সোজা এসে উঠেছিল কোন্নগরের ফ্ল্যাটে। চাকরিটা নতুন, তার উপর সেই সময় এমবিএ করছে রাহুল। তবুও যূথিকার জন্য সময়ের অভাব হত না তার। সারাদিন প্রচুর খাটাখাটি গেলেও মাঝরাত অবধি আদরে আদরে ভরিয়ে দিত তাকে।

তখন ভালোবাসার কোনও অভাব ছিল না ওদের মধ্যে। ছুটির দিনগুলোতে ওরা বেরিয়ে পড়ত রাহুলের সদ্যকেনা বাইকটা নিয়ে, পৌঁছে যেত দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে। তারপর সেই রাস্তা ধরে ছুটতে ছুটতে সোজা শক্তিগড়। সেখানকার এক ধাবায় লাঞ্চ করা ছিল ওদের শীতের রবিবারের দুপুরের নিয়মিত রুটিন।

কিন্তু তারপর কী যে হল!

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়াই রাহুলের শরীরটার প্রতি আকর্ষণ হারাতে শুরু করেছিল যূথিকা। তখনও ঋক আসেনি তার জীবনে। তবুও সেই সময় রাতে রাহুলের আহ্বানকে মাঝে মধ্যেই উপেক্ষা করত সে। কিন্তু ব্যাপারটা থেমে থাকেনি এখানেই। শেষ পর্যন্ত রাতের পর রাত রাহুলের ডাকে সাড়া না দিয়ে ঘুমের ভান করে পাশ ফিরে শুয়ে থাকত যূথিকা।

এমন আচরণ কেন করছে যূথিকা? এই নিয়ে রাহুল বারবার কথা বলতে চেয়েছে তার সঙ্গে। কিন্তু যূথিকা এড়িয়ে যেত কায়দা করে।

কী বলবে সে!

এরপর এসেছিল সেই রাতটা। রোজের মতই যূথিকা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়েছিল। এদিকে রাহুল বারবার ডেকে চলেছে তাকে, “যূথিকা প্লিজ আজ একবার…”

না ঘুমলেও ঘুমের ভান করেই পড়েছিল যূথিকা। কোনও সাড়া দেয়নি রাহুলের ডাকে। শেষ পর্যন্ত রাহুল আর থাকতে পারেনি। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর উপরে। খ্যাপা ষাঁড়ের মত টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল নাইটিটা। তারপর কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করেই প্রবেশ করেছিল যূথিকার শরীরে।

সেদিন রাহুলকে বাঁধা দিতে গিয়েও দিতে পারেনি যূথিকা। নাইট ল্যাম্পের আবছা নীল আলোয় রাহুলের পেশীবহুল, নগ্ন, উন্মত্ত শরীরটাকে দেখে ভীষণ ভয় করেছিল তার। চড় থাপ্পড়, আঁচড় বা কামড় কোনওটাই তার দিকে ধেয়ে না এলেও ধর্ষণ কাকে বলে সেদিনই খুব ভালো করে টের পেয়েছিল সে।

সবকিছু মিটে যাওয়ার পর পাশে শুয়ে থাকা রাহুলের নাকডাকার আওয়াজ পেলেও যূথিকা আর ঘুমোতে পারেনি। চোখের জলে ভিজে যাচ্ছিল তার বালিশ। পরদিন আর স্কুলে যায়নি যূথিকা। সকালে সে খানিক কড়া গলাতেই রাহুলকে জানিয়েছিল গতকাল রাতে নেওয়া সিদ্ধান্তের কথা, “রাহুল আমি ডিভোর্স চাই।”

রাহুল তখন অফিসে বেরনোর আগে ব্রেকফাস্টে বসেছে। ফিক করে হেসেছিল যূথিকার কথা শুনে, “ডিভোর্স! কোর্টে লড়তে পারবে তো? করো তো বাপের মত একটা প্রাইমারি স্কুলের চাকরি। সেটাও আবার প্রাইভেট। আমার সঙ্গে বিপুদা আছে। চাইলে আজই আমাকে জেলে ভরো। কয়েকটা দিন। তারপর বেরিয়ে এসে আমি লড়বো। আর তুমি তো জানোই জেলখানা আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। বাকি সব ছেলেদের মত ভয়ে মরি না। আর আমার চাকরি যাবে না। কোম্পানি তার একজন এফিসিয়েন্ট এমপ্লয়িকে এ’রকম একটা ফালতু কেসের জন্য কখনই বার করে দেবে না। তুমি যা করার করে নাও। কিন্তু আমি ডিভোর্স দেবো না।”

রাহুলের কথাগুলো অভিশাপের মত ধেয়ে এসেছিল যূথিকার দিকে। হিসাব মত দেখতে গেলে খুব একটা ভুল কথা বলেনি রাহুল। প্রাইভেট ওই সামান্য মাইনেতে ভালো উকিল ধরে রাহুলের সঙ্গে লড়া সত্যিই মুশকিল। আর এখন বুড়ো বাবা মায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকলেও যে তার কপালে খুব একটা আদর জুটবে না তা বিলক্ষণ জানে যূথিকা। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রাহুলের সঙ্গে রয়েছে বিপুদা! মানে বিপ্রতীপ মুখার্জী। লোকটাকে শুধু ডাকাবুকো বললে ভুল হবে, এই অঞ্চলের এক নম্বর ক্রিমিনাল লইয়ার।

সে আবার রাহুলের পাড়ার ছেলে এবং ওর ছোটবেলার বন্ধু।

তবে কি মুক্তির কোনও উপায় নেই! সারাদিন বেডরুমে বসে চোখের জল ফেললেও কেউ ছিল না তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মত।

এরপর থেকে রাহুলও খুব কম কথা বলে যূথিকার সঙ্গে। শুধু রাত্তিরবেলায় মাঝে মাঝে নিজের শরীরের খিদেটা মিটিয়ে নেয় যূথিকার উপর দিয়ে।

নিয়মিত ধর্ষিতা হতে হতে যূথিকা হয়তো মরেই যেত, যদি না কালবৈশাখীর মত ঋক আসতো তার জীবনে।

ঋকের কথা মনে হতেই কিছুটা ফুরফুরে হয়ে গেল যূথিকার মন। আর ঠিক সেই সময়েই সে শুনতে পেল বেডরুমে রাখা ফোনটা বাজছে।

এই অসময়ে কে ফোন করল? ঋক নয়তো! গত দু’দিন ছেলেটার কোনও পাত্তাই নেই।

যূথিকা এর মধ্যেই বেশ কয়েকবার ফোন করছে ওকে। কিন্তু প্রতিবারই বলছে ফোন সুচইড অফ।

ব্যালকনি ছেড়ে বেডরুমে ঢুকল যূথিকা। কিন্তু বিছানায় রাখা ফোনটার স্ক্রিনে চোখ ফেলতেই সে দেখল কোথায় ঋক, তাকে ফোন করেছে রাহুল!

রাহুল তো তাকে এমন অসময়ে ফোন করে না! অবাক হলেও যূথিকা রিসিভ করল ফোনটা। সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে শোনা গেল রাহুলের ভারি গলা, “শোন যূথিকা, এইমাত্র বিপুদা ফোন করেছিল। বাবার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। আমি শ্রীরামপুর যাচ্ছি। তুমি আসবে?”

রাহুলের এই এক অদ্ভুত ব্যাপার। নিজেদের ভিতরকার সম্পর্ক একেবারে তলানিতে এসে ঠেকলেও, বউ যে তার সঙ্গে আছে সেটা সবাইকে দেখানোর জন্য প্রায়ই টানাটানি করে তাকে নিয়ে।

পুরো সমাজকে নিজের দাম্পত্য সুখ দেখাতে ব্যস্ত রাহুল। অথচ এই মানুষটা ইদানীং যূথিকার শরীর খারাপ হলেও একদিনের জন্যে অফিস ছুটি নিতে পারে না!

হঠাৎ মাথার ভিতরে আগুন জ্বলে উঠল যূথিকার। হিসহিসে গলায় সে বলে উঠল, “আমি যাব না রাহুল। বাবাটা তোমার, আমার নয়।”

রাহুল হয়তো আরও কিছু বলতো। কিন্তু সেসব শোনার কোনও ইচ্ছা বা ধৈর্য আর অবশিষ্ট ছিল না যূথিকার মধ্যে। ফোনটা ডিসকানেক্ট করে কান থেকে সরাতেই সে দেখল জলের একটা হালকা প্রলেপ লেগেছে স্ক্রিনের গায়ে।

তার মানে বৃষ্টির জল যূথিকাকে ছুঁয়ে, ছুঁয়ে ফেলেছে মোবাইলের স্ক্রিনকেও। স্ক্রিনটাকে নাইটিতে মুছতে মুছতে হঠাৎ যূথিকার ইচ্ছা হল নিজের বৃষ্টিভেজা মুখটা দেখতে।

আয়নাটা রয়েছে সামনেই। মোবাইলটা বিছানায় রেখে সেদিকে এগিয়ে গেল যূথিকা। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সে দেখল বিন্দু বিন্দু জল জমে আছে তার নাক আর ঠোঁটের দু’পাশে।

বেশ কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যূথিকার মনে হল রাহুলের হাতে বারবার ধর্ষিতা হলেও এখনও এতটুকু ম্লান হয়ে যায়নি তার সৌন্দর্য।

খাপছাড়া চিন্তাটা একরাশ দমকা বাতাস নিয়ে এলো যূথিকার জন্যে। সেই বাতাসে নিজেকে ভাসিয়ে দিতেই তার মাথায় খেলে গেল একটা অদ্ভুত প্ল্যান।

কাজটা করলে রাহুল হয়তো আরও একবার ফিরে এসে ধর্ষণ করবে তাকে। লোকেও হয়তো বলবে অনেক বাজে কথা। তবুও যূথিকার মনে হল এটাই তার সামনে মোক্ষম একটা সুযোগ দুনিয়াকে দেখানোর যে সে আর রাহুল মোটেও সুখী দম্পতি নয়।

তখন যদি বাধ্য হয়ে রাহুল ডিভোর্স দেয় তাকে!

ওয়েটিং এরিয়াটা যে খুব বড় তা নয়। পাশাপাশি কয়েকটা চেয়ার রাখা আছে ঘরের এক পাশে। সেগুলোর একটাতেই বসে ঝিমোচ্ছিল রাহুল। ঘড়িতে নয় নয় করেও বিকেল পাঁচটা বাজে। ভিজিটিং আওয়ার শুরু হয়ে গেছে আধ ঘণ্টা আগে। ছোট্ট জায়গাটাতে তাই ক্রমাগত বেড়ে চলেছিল পেশেন্ট পার্টির ভিড়।

সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল তাদের কথাবার্তাও।

কিন্তু সেসব পৌঁছচ্ছিল না রাহুলের কানে। সারাদিনের ছোটাছুটির জন্যেই বোধহয় ক্লান্তি আর বিষণ্ণতায় বন্ধ হয়ে আসছিল তার দু’চোখের পাতা।

শ্রীরামপুরের ‘লাইফ এগেইন’ নার্সিংহোমটাকে খুব বড় বলা চলে না, তবুও এখানেই বাবাকে এনেছে রাহুল। বৃষ্টির সকালে বাজারে গিয়ে হঠাৎ পড়ে গিয়েছিল বাবা। ভাগ্যক্রমে তখন সেখানে ছিল বিপ্রতীপও। একটা টোটো ধরে সেই তখন কোনোরকমে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল ভদ্রলোককে।

তারপর ফোন করেছিল পাড়ার ডাক্তার আকাশবাবুকে।

বিপ্রতীপের ফোন পেয়েই ছুটে এসেছিলেন আকাশবাবু। কিন্তু রোগীকে দেখেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। ততক্ষণে বিপ্রতীপ ফোন করেছে রাহুলকেও। সেই রাহুলকে বলেছিল এই নার্সিংহোমের কথা।

নার্সিংহোমের মালিক ডাঃ ভদ্র নাকি তার খুব চেনা।

ডাক্তার ভদ্র অপরিচিত নয় রাহুলেরও। আগের কোম্পানিতে সে যখন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করতে তখনই ওর পরিচয় হয়েছিল ভদ্রলোকের সঙ্গে। মানুষ হিসাবে অত্যন্ত অমায়িক এই ডাক্তারবাবু। খুব যত্ন করে দেখেছেন বাবাকে। বাবা এখন আইসিইউতে। ছোট্ট নার্সিংহোমটার বৈশিষ্ট্যই হল পাঁচ বেডের ঝকঝকে আইসিইউটা।

তবে সব পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তার ভদ্র একটা আশার কথা শুনিয়েছেন। খুব বেশি ড্যামেজ হয়নি এবারের অ্যাটাকে। নতুন কোনও সমস্যা না হলে কয়েকটা দিন অবজার্ভেশনে রেখে ছেড়ে দেওয়া হবে বাবাকে।

বিপ্রতীপও আজ সারা সকালটাই ছিল রাহুলের সঙ্গে। তারপর দুপুরবেলায় বেরিয়ে গেছে কোর্টের কাজে। ওদের সম্পর্কটা আজকের নয়। রাহুলের বয়স তখন পনেরো। সেই সময়েই জেলে গিয়েছিল বাবা। শ্রীরামপুরে ঠাকুরদার তৈরি ওই বিশাল বাড়িটা ছাড়াও তখন পৈতৃক সম্পত্তিও ছিল কিছু। তার উপর বাবা জেলে যাওয়ার পর ওদের সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল ওর মামা। উত্তরপাড়ায় জিটি রোডের ধারে একটা ভাতের হোটেল ছিল মামার। নিজে ব্যবসা করলেও বিয়ে করা নিয়ে তার ছিল অসম্ভব আপত্তি। ব্যবসা আর দিদির প্রতি কর্তব্যটুকু করা ছাড়া বাকি সময়টুকু সে পড়ে থাকত ঠাকুর দেবতা নিয়ে। তাই খাওয়া-পরা নিয়ে খুব একটা বিপদে পড়তে হয়নি রাহুলদের। তাছাড়া রাহুল ছিল মামার খুব প্রিয়। নিজের বাবার অভাবটা খানিকটা হলেও পূরণ করে দিত এই আপনভোলা মানুষটা। ক্লাস টুয়েলভে ওঠার পর রাহুলকে স্মার্টফোনটা কিনে দিয়েছিল মামাই, যেটা তাকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল যূথিকার কাছে।

কিন্তু এরপরেও সারা পাড়ায় ওরা ছিল একঘরে। সেই সময় রাহুলের একমাত্র বন্ধু ছিল এই বিপ্রতীপ। বছর বাইশের ডাকাবুকো ছেলেটা কোনও এক অজানা কারণে তখন নিজে থেকেই মিশতে শুরু করেছিল রাহুলের সঙ্গে।

মামা এখন আর নেই। রাহুল চাকরি পাওয়ার পর চলে গেছে হরিদ্বারের এক আশ্রমে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ করে বাবা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল রাহুল চাকরি পাওয়ার কয়েকমাস পরে। মা কোনোদিনই মেনে নিতে পারেনি নিজের স্বামীর অপরাধ। মায়ের বদলটা শুরু হয়েছিল বাবা জেলে যাওয়ার পর থেকেই। ওইসময় মা বলতে রাহুলের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন আধপাগল মহিলার মুখ, যে ঘরের এক কোণে বসে বিড়বিড় করে চলেছে আপনমনে। বাড়ির কাজে মায়ের মন ছিল না একেবারেই। কোনও নজর থাকত না নিজের ছেলে, এমনকি নিজের প্রতিও।

শেষ পর্যন্ত বাবা ফেরার বছর খানেক আগে কয়েকদিনের জ্বরে হঠাৎ মারা যায় মা।

বাবার প্রতি কোনও টানই কখনও তৈরি হয়নি রাহুলের। যেমন হয়নি তাদের ওই বিশাল বাড়িটার প্রতি। তবুও আজ সে বাবার জন্য এখানে ছুটে এসেছে কেবল চক্ষুলজ্জার খাতিরে।

সকালবেলায় বিপ্রতীপের ফোন পেয়েও না আসলে বড্ড অসভ্যতামি হয়ে যেত ব্যাপারটা।

এখন ডাক্তার বাবাকে ছাড়লে হাফ ছেড়ে বাঁচে সেও!

 

“কীরে ঘুমিয়ে পড়লি?” হাজারো শব্দের মধ্যেও বিপ্রতীপের গলাটা শেষ পর্যন্ত চিনতে পারল রাহুল। চোখ মেলে তাকাল সে। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বিপ্রতীপ, “শোন তুই বাড়ি গিয়ে খানিক বিশ্রাম নে। আমি আছি এখন।”

ভার হয়ে আছে মাথার ভিতরটা। বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম নিলে মন্দ হয় না। কিন্তু, খুব সাংঘাতিক না হলেও, রোগটা হার্ট অ্যাটাক বলেই ডাক্তার ভদ্র আজ বাড়ির কোনও লোককে থাকতে বলেছেন এখানে। বিপ্রতীপের প্রস্তাব পেয়েও বাড়ি ফিরে যেতে লজ্জা লাগল রাহুলের, “না গো, ঠিক আছি আমি। তুমি বরং গিয়ে তোমার কাজগুলো করো। সারাদিন তো বসে রইলে আমার জন্যে।”

রাহুলের কথা শুনে কী যেন ভাবল বিপ্রতীপ। তারপর বলল, “চল তাহলে গঙ্গার ধারে গিয়ে কিছুক্ষণ বসা যাক।”

বিপ্রতীপের প্রস্তাবটা মনে ধরল রাহুলের। সে বলল, “চলো।”

নার্সিং হোম থেকে বেরিয়ে দু’মিনিট হাঁটলেই গঙ্গা। দু’জনে এসে দাঁড়াল সেখানে। বৃষ্টি থেমে গেছে কিছুক্ষণ আগে। তবুও হাওয়া দিচ্ছিল শনশন করে। এই গঙ্গার ধার এমন একটা জায়গা যেখানে বিপ্রতীপের সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছে রাহুল। বহুদিন পর তাকে টানছিল সেই হারিয়ে যাওয়া সময়টা। কথা বলতে ভালো লাগছিল না তার। চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল দু’জনেই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বিপ্রতীপের হাতের আলতো খোঁচা খেল রাহুল। তার দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছে বিপ্রতীপ “নে ধরা।”

বিপ্রতীপের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে তাতে আগুন জ্বালাল রাহুল।

শরীর এবং মনের ঝিম মেরে থাকা ভাবটা কাটতে চাইছে না কিছুতেই। বিপ্রতীপ পাশে দাঁড়িয়ে। তবুও সিগারেটে কয়েকটা টান দেওয়ার পর মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে ইন্টারনেট অন করল রাহুল।

ব্যাপারটা লক্ষ করলেও কিছু বলল না বিপ্রতীপ। কিছুদিন আগেও পাশের পরিচিত মানুষটা কথা না বলে স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকলে ভীষণ রাগ হত তার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গা সওয়া হয়ে গেছে ব্যাপারটা।

তার উপর সকাল থেকে বড় ধকল যাচ্ছে রাহুলের উপর দিয়ে।

ফোন ঘেঁটে যদি একটু রিলাক্স হতে চায় হোক না।

সারাদিন একবারের জন্যেও অন করা হয়নি। ইন্টারনেট অন করতেই ওয়াটসঅ্যাপে টুং টুং করে ঢুকতে শুরু করল জমে থাকা ম্যাসেজগুলো।

কিছুক্ষণ পরে ফোনটা শান্ত হয়ে যেতেই রাহুল ঢুকে পড়ল ফেসবুকে।

ফোনে কখনও ফেসবুক থেকে লগ আউট করে না সে।

ফেবুর দেওয়াল ভরে আছে তার জন্য অপ্রয়োজনীয় সব পোস্টে। তবুও নেশার মত স্ক্রোল করে নীচে নামছিল রাহুল। কিন্তু হঠাৎ আটকে গেল তার আঙুল। শক্ত আর থমথমে হয়ে গেল মুখখানা।

কী হয়েছে বুঝতে পারছিল না বিপ্রতীপ। একটু পরে রাহুল নিজেই তাকাল তার দিকে। ফোনটা বিপ্রতীপের হাতে চালান করে দিয়ে শক্ত গলায় বলল, “আমার সঙ্গে এলো না। অথচ এটা দেখো!”

মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিপ্রতীপ দেখল স্ক্রিন থেকে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে যূথিকা। চোখ মুখ দেখে বোঝা যায় বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখেই তুলেছে ছবিটা। ছবির উপরে লেখা ‘আজ মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না কো মন...’

এই পর্যন্ত ঠিক ছিল তবুও। কিন্তু ছবির উপরে সময়টা দেখে চমকে উঠল বিপ্রতীপও।

রাহুল আর যূথিকার সম্পর্কের কোনও কিছুই অজানা নয় তার। কিন্তু সেসব কিছুই মনে পড়ল না তার। শুধু অস্ফুটে গলা থেকে বেরিয়ে এলো কয়েকটা শব্দ, “আজকেই! মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে!”

আরও একবার মৌনতা নেমে এলো দু’জন অসমবয়সী বন্ধুর মাঝখানে। কিছুক্ষণ পর মুখ খুলল রাহুল নিজেই, “তোর এত গরম! আজ বাড়ি ফিরে মেরেই ফেলব তোকে।”

আহত বাঘের মতই গরগর করছে রাহুলের গলার আওয়াজ। বিপ্রতীপ কিছুটা সময় দিল তাকে শান্ত হওয়ার জন্যে। তারপর আস্তে আস্তে চলা কোনও স্টিম ইঞ্জিনের মত শুরু করল তার কথা, “দ্যাখ রাহুল আমি একজন ক্রিমিনাল লইয়ার। আবেগ নয়, খুব বুদ্ধি দিয়ে চলতে হয় আমাকে। যূথিকা যা করেছে তা নিশ্চয়ই অন্যায়। কিন্তু তার জন্যে তুই আর একটা অপরাধ করতে পারিস না। মারধর করার পর ও যদি থানায় গিয়ে তোর নামে এফআইআর করে তাহলে তুই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেসে ফেঁসে যাবি। আর আমাদের দেশে আদালত এক্ষেত্রে ছেলেদের থেকে মেয়েদের কথাই বেশি শোনে। তোকে তো আগেও বলেছি রাহুল, থাকতে না পারলে ওকে ডিভোর্স করে দে। ব্যাপারটা যাতে তাড়াতাড়ি মিটে যায় সে ব্যবস্থা আমি করবো। আর এটাও বলছি তোকে বেশি টাকা পয়সাও দিতে হবে না । আমি নিজে দেখব সবকিছু। তোর বয়সও এমন কিছু নয়। এরপর আবার নতুন করে শুরু করতে পারবি সবকিছু।”

বিপ্রতীপের কথা শুনে প্রতিহিংসার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল রাহুল, “আমাকে কোনও ভদ্রবাড়ির মেয়ে বিয়ে করবে না বিপুদা। একমাত্র ওই ছিল যে সব জেনেও... সেইজন্যই ওকে এত ভালবাসতাম। ও ছিল আমার জীবন। বিশ্বাস করো, আমি ওর প্রতি কোনও অবহেলা কখনও করিনি। সবসময় চেষ্টা করতাম ওর চাহিদাগুলোকে পূরণ করার। অথচ ও বিনা কারণে একটু একটু করে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিল আমার কাছ থেকে। ছোটবেলা থেকে কষ্ট পাচ্ছি বিপুদা। সুন্দর পৃথিবীটা একটু একটু করে তৈরি হচ্ছিল আমার সামনে। আমার সবকিছু ছিল ওকে ঘিরে। অথচ ও… যদি থাকবিই না তো আমাকে স্বপ্ন দেখতে শেখালি কেন? আমি শিওর বিপুদা। ও অন্য কারুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু আমিও ওকে এত সহজে ছেড়ে দেব না! সারাজীবন দগ্ধে দগ্ধে মরেছি। ব্যাপারটা আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। আমি ওকেও ছাড়বো না। শেষ করে দেব।”

এসব কথা আগেও শুনেছে বিপ্রতীপ। নিজে ক্রিমিনাল লইয়ার হওয়ার সুবাদে মানুষের সাইকোলজি কিছুটা হলেও বোঝে সে। রাহুলকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। রাহুল তাকে অন্তত মিথ্যা বলবে না। সারাজীবন কষ্ট করে আসা একটা মানুষ যদি হঠাৎ তার ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে ফেলে তখন তার এরকম প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বিপ্রতীপের বড় অদ্ভুত লাগে মেয়েটার আচরণে। রাহুলের সবকথা শোনার পর সেও প্রায় নিশ্চিন্ত যে যূথিকা জড়িয়ে পড়েছে অন্য কারুর সম্পর্কে। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক ছেলে বা মেয়ে আছে যারা ডিভোর্স সম্ভব নয় বলেই বউ বা বরের চোখে ধুলো দিয়ে উপভোগ করে নিষিদ্ধ ভালোবাসার স্বাদ। রাহুলও ডিভোর্স দিতে চায় না ওর বউকে। সবকিছু বজায় রাখার জন্যে রাহুলের সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয়টা করে গিয়েও তো মেয়েটা জড়িয়ে পড়তে পারত আরও একটা সম্পর্কে!

কাজটা খুব কঠিন ছিল না যূথিকার পক্ষে। বিশেষ করে রাহুল যখন সারাদিন অফিসে থাকে।

অনেক কথাই বলার ছিল বিপ্রতীপের। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল রাহুল এখন সেসব শোনার অবস্থায় নেই। সিগারেটটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। একটা টান মেরে সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিপ্রতীপ বলল, “এত প্রতিহিংসা ভালো নয় রাহুল। তবে তোকে কয়েকটা কথা বলি। জানিস তো আমাদের লাইনটা বড় খারাপ। তবুও চেষ্টা করেছি ন্যায়ের পক্ষে থাকতে। বলতে পারিস এটা আমার নেচার। ওকালতি শুরু করার আগে থেকেই। একটা সময় পাড়ায় কেউ তোদের সঙ্গে মিশত না। তখন আমি নিজে যেচে বন্ধুত্ব করেছিলাম তোর সঙ্গে। কারণ আমার মনে হত এই ছেলেটা তো কোনও অন্যায় করেনি। আর এখন তো তুই আমার ঘরের লোক হয়ে গেছিস।

“রাহুল এখন তুই বড় হয়ে গেছিস। জীবনটাও তোর। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখিস। প্রতিহিংসা আর রাগের বশে এমন কিছু করে বসিস না যে কোর্টে তোর পক্ষে দাঁড়াতে আমার পা কেঁপে যায়।”

‘ঘর বেঁধেছে পথের ধারে যাদের দল

তাদের কাছে মেঘ মানেই নোংরা জল।’

কবীর সুমনের গাওয়া দুটো লাইন। অনিকেত যখন প্রথম শুনেছিল তখন সে ক্লাস ফোরের ছাত্র। পুরো গানটা আর মনে নেই। কিন্তু ওই দুটো লাইন অদ্ভুতভাবে গেঁথে গেছে স্মৃতিতে। বৃষ্টির দিনে ডিউটিতে বেরতে হলে লাইনগুলো বারবার তার মাথার মধ্যে উঁকি মারে। ছোটবেলায় গান শিখত অনিকেত। সে’সব পাট ক্লাস টেনে ওঠার পর চুকে গেলেও এখনও নিজের মনে গানের কলি গুণগুণ করে বড় আরাম পায় সে।

আজ সকালে রাহুলের সঙ্গে ইম্পরট্যান্ট মিটিং-এ বসার কথা ছিল অনিকেত এবং আরও কয়েকজনের। রাহুলের বাবার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় মিটিং ক্যানসেল হয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে ছুটি পায়নি অনিকেত। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ডিউটি করতে হয়েছে তাকে। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি। দিনভর বাইক নিয়ে ঘুরতে হয়। মিটিং ক্যানসেল হয়ে যাওয়ার পর সে গিয়েছিল জাঙ্গিপাড়ায়। সেই কাজ মিটে গেছে সন্ধে সাতটা নাগাদ। রাত্তিরে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে ডিনার সেরে এসেও ওই দুটো লাইন গুণগুণ করছিল অনিকেত। সারাদিন যা ভিজেছে রাতে একটু রাম পেলে ভালো হত। কিন্তু ওই রাস্তায় একটা ভালো বার নেই বললেই চলে। আর বাড়িতে একলা বসে মদ খাওয়া অসম্ভব তার পক্ষে। কারণ তার মা। ছেলে বাড়িতে বসে মদ খাচ্ছে একবার টের পেলে দক্ষযজ্ঞ বাঁধতে যে কয়েক সেকেন্ডও সময় লাগবে না, অনিকেত খুব ভালো করেই জানে সেটা।

বছর চব্বিশের অনিকেত এখনও বিয়ে করেনি। আরও ভালো করে বললে এখনও ভালোবাসা সেভাবে ধরা দেয়নি তার কাছে। শ্রীরামপুরের দে স্ট্রীটের ‘মে ফেয়ার’ অ্যাপার্টমেন্টের দু’তলার একটা ফ্ল্যাটে বাবা আর মায়ের সঙ্গে থাকে সে। টু বিএইচকে এই ফ্ল্যাটটা বড়। বিয়ে না করলেও ফ্ল্যাটের সবথেকে বড় বেডরুমটাই বরাদ্দ হয়েছে তার জন্যে। তার বিছানাটাও বেডরুমটার মতই বড়। সেখানে উপুড় হয়ে শুয়ে পাশে রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিয়ে অনিকেত আগুন লাগাল তাতে।

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারোটা পেরিয়েছে একটু আগেই। কাল রবিবার। অনিকেতের ছুটি। ছোটবেলায় রাত জেগে পড়াশুনা করার অভ্যাস ছিল তার। শুধু পড়াশুনা নয়, অনিকেতের গল্পের বই পড়ার সময়ও ছিল রাত্তিরবেলা। এখন কাজের চাপে রাত জাগা হয় না। কিন্তু আজ শনিবার বলে কথা! সপ্তাহের এই একটা দিন বাবা আর মা শুয়ে পড়ার পরেও আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকে সে।

একদম নিজের মত করে।

অবশ্য এই ব্যক্তিগত সময়টাতে অনিকেত যে খুব গোপনীয় কিছু করে তা নয়। গল্পের বইয়ের নেশা এখনও ছাড়তে না পারলেও সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর বই তার আধিপত্য হারিয়ে ফেলেছে অনেকটাই। তাই শনিবার রাতে নতুন বই হাতের কাছে না থাকলে অনিকেতের সঙ্গী হয় ইন্টারনেট।

আরও ভালো করে বললে ফেসবুক।

রাত্তিরবেলায় ফেসবুক করার জন্য ল্যাপটপই অনিকেতের প্রথম পছন্দ হলেও আরও একটা নেশা আছে তার। স্মার্টফোনের। ওর অন্য সব বন্ধুরা যখন একটা বা খুব বেশি হলেও দুটোর বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করে না, অনিকেতের কাছে আছে তিনটে ফোন আর একটা ট্যাব।

এতগুলো ফোন কিনলেও অফিসের কাজে অনিকেত এর মধ্যে একটা ফোনই ব্যবহার করে। কয়েকবছর আগে কেনা স্যামসাং-এর সেটটা। বাকি ফোনগুলো বাড়িতে পড়ে থাকলেও কখনও-সখনও তারা হয়ে ওঠে অনিকেতের নেট ঘাঁটা আর গেম খেলার সঙ্গী।

আজ হাতের কাছে কোনও নতুন বই নেই। তাই পাশের টেবিল থেকে ল্যাপটপটা তুলে বিছানায় রাখল অনিকেত। সেটাকে অন করে ঢুকে পড়ল ফেসবুকে।

নতুন পোস্ট করার মত কিছুই নেই অনিকেতের হাতে। কী খেয়েছে, সারাদিন কী করেছে এসব কথা ফেসবুকে পোস্ট করতে মোটেও ভালো লাগে না তার। সে আজ ফেসবুকে ঢুকেছে অন্য একটা লোভে।

যদি হঠাৎ অনলাইন পাওয়া যায় কোনও পুরনো বন্ধু বা বান্ধবীকে!

স্ক্রিনের ডানদিকে তাকাল অনিকেত। এই মুহূর্তে লাইনে আছে পলাশ মানে ওর পলাশদা।

পলাশ কলেজে ওর সিনিয়র ছিল। অনিকেত ভাবল ম্যাসেজ করবে পলাশকে। কিন্তু তার আগেই তাকে পিং করল পলাশ নিজেই, “আরে অনিকেত যে!”

“হ্যাঁ।” ছোট্ট জবাব দিল অনিকেত। পলাশের ওখানে এখন দিন। তবে শনিবার বলে হয়তো ছুটি আছে ওর। অনিকেত ভাবল একটু গল্প করা যাবে। সে আরও কিছু লিখতে যাচ্ছিল। কিন্তু ততক্ষণে ফের ঢুকে গেছে পলাশের ম্যাসেজ, “কেমন আছিস?”

“ভালো।” জবাব দিল অনিকেত। আর গৌরচন্দ্রিকা না করে পলাশ পেড়ে ফেলল আসল কথাটা, “অনি, শোন না কলকাতায় ফিরব নেক্সট মান্থ। একদিন তোর সঙ্গে দেখা করব। অনেক আড্ডা হবে।”

পলাশের সঙ্গে দেখা হওয়া মানেই যে আড্ডা হবে তা জানে অনিকেত। সিনিয়র হলেও ওর সঙ্গে খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল পলাশের। সে লিখল, “ফিরছ কবে?”

“পরে বলব তোকে। এখনও ডেট ফিক্সড হয়নি। তবে নেক্সট মান্থ কনফার্ম। শোন না এখন একটু ব্যস্ত আছি, একটু অফলাইন হতে হবে। তোর বৌদি ডাকছে। পরে কথা বলব তোর সঙ্গে। প্লিজ রাগ করিস না।”

আড্ডাটা শুরু হতে না হতেই শেষ! একটু আশাহত হল অনিকেত। কিন্তু কিছু করার নেই। সে লিখল, “ওকে।”

“ওকে বাই। ভালো থাকিস।” ঝড়ের বেগে ঢুকল পলাশের ম্যাসেজ। তারপর অফলাইন হতে এক সেকেন্ডও সময় লাগলো না সুদূর ইউএসএ-তে বসে থাকা মানুষটার।

পলাশ অফ হয়ে যেতেই আরও একবার স্ক্রিনের ডানদিকটা খুঁটিয়ে দেখল অনিকেত। আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে, রাতটা শনিবার হলেও অদ্ভুতভাবে আড্ডা দেওয়ার মত সে’রকম আর কেউ নেই অনলাইনে!

স্কুল অথবা কলজের বান্ধবীগুলোকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বেশিরভাগই এতদিনে বিয়ে করে ঘোর সংসারী।

কিন্তু ছেলেগুলো? ওদের সবাই তো প্রায় ওর মতই ব্যাচেলর। হঠাৎ ছেলেগুলোর উপর ভীষণ রাগ হল অনিকেতের।

শনিবার বলে সব কি মদ খেয়ে উলটে পড়ে আছে!

এখন ফেসবুক স্ক্রোল করা ছাড়া আর কোনও রাস্তা খোলা নেই তার সামনে। সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে বেড সুইচের দিকে হাত বাড়াল অনিকেত। টিউবটা অফ হয়ে যেতেই হালকা সবুজ আলোয় ভরে উঠল ঘরটা।

নাইটল্যাম্পটার আলো বড় ভালো লাগে অনিকেতের।

বিছানায় ওঠার আগেই জ্বেলে রেখেছিল সে।

কিছুক্ষণ স্ক্রোল করে শুয়ে পড়াটাই বেটার। ভাবতে ভাবতেই হোমপেজটাকে নিচের দিকে টানছিল অনিকেত। মাঝখানে থামার কোনও ইচ্ছা না থাকলেও থামতে হল তাকে।

ল্যাপটপের ভিতর থেকে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে একটা মেয়ে! মেয়েটার চুল খোলা। চোখে মুখে লেগে আছে বিন্দু, বিন্দু জলের ফোঁটা।

দেখে মনে হয় আজ বৃষ্টিতে ভিজেই সেলফি তুলেছে সে।

মেয়েটার হাসিটা এতটাই মিষ্টি যে ওকে এড়িয়ে চলে যাওয়া কোনও ছেলের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব।

ওর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর কোথাও যেন একটা খটকা লাগল অনিকেতের।

যৌনতা ব্যাপারটা বোঝার পর থেকেই নিজের থেকে একটু বড় বয়সী মেয়েদের প্রতি সে তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে। চোখ মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এই মেয়েটাও বয়সে তার থেকে খানিক বড়। তাই নিজের অজান্তেই মেয়েটার মুখে ডুবে গেল অনিকেত। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হাতড়ানোর পর সে টের পেল একটা অদৃশ্য পরদা সরে গিয়ে তার চোখের সামনেটা ভরে যাচ্ছে হালকা নরম রোদ্দুরে।

তারিখটা মনে নেই অনিকেতের। কিন্তু সময়টা ছিল ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ। মানে এখন থেকে ঠিক ছ’মাস আগের এক সকাল। কোম্পানির পিকনিকে যাওয়ার সময় বাসের অপেক্ষায় কোন্নগর বাটার মোড়ে দাঁড়িয়েছিল অনিকেত, রাহুল আর রাহুলের বউ।

এই মেয়েটা আর কেউ নয়, রাহুলের বউ!

পোস্টের উপর নামটা দেখল অনিকেত। যূথিকা মিত্র। তখন পরিচয় হলেও ফেসবুকে এর আগে যূথিকাকে খুব একটা দেখেনি অনিকেত। হয়তো সেভাবে আপডেট করে না। সেদিন মেয়েটা ওর বরের গা ঘেঁষে কাটিয়েছিল সারাদিন। কিন্তু সে এতটাই সুন্দরী যে অনিকেত ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিল না কিছুতেই।

নিজের ঘরে বসে মেয়েটার প্রতি একটা মোক্ষম টান অনুভব করল অনিকেত।

পাঠাবে নাকি একটা রিকু?

অনিকেতের মনে পড়ে গেল সকালের কথাটা। শ্বশুরের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে আর বৌমা...

মাত্র ন’ঘণ্টা আগে পোস্ট করেছে এই ছবিটা!

তার মানে বর যখন তার বাপকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে তখন ওর বউ ফেবুতে সেলফি পোস্ট করছে!

তাহলে সেদিন পিকনিকের ছবিটা কি মিথ্যে, লোক দেখানো ছিল?

অনিকেত জানে তার বস রাহুল অত্যন্ত সিরিয়াস এমপ্লয়ি। চাকরির জায়গায় নিজের বাবাকে নিয়ে মিথ্যে কথা বলার লোক সে নয়।

অনিকেত অনুভব করল যূথিকার প্রতি আকর্ষণটা যেন সেকেন্ডের মধ্যে বেড়ে গেছে কয়েক হাজার গুণ।

কিন্তু রাহুল যদি ওকে দেখে ফেলে যূথিকার ফ্রেণ্ডলিস্টে! বয়স সাংঘাতিক বেশি না হলেও কোম্পানিতে লোকটার পজিশন ওর থেকে অনেক উপরে।

ওর মত একজন অধস্তনের চাকরি খাওয়ার ক্ষমতা রাহুলের আছে।

কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলেও হঠাৎ অনিকেতের মাথায় খেলে গেল অন্য একটা প্ল্যান। সে লগ আউট করল ফেসবুক থেকে। তারপর নিজের অব্যবহৃত একটা মেল আইডি দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে খুলে ফেলল অন্য একটা ফেক অ্যাকাউন্ট, যার মালিকের নাম দ্বীপ।

মাউসে ক্লিক করে নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে যূথিকাকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে খুব একটা সময় লাগল না তার।

রাহুল বেরিয়ে যেতেই ফ্ল্যাটের দরজাটা বন্ধ করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল যূথিকা।

উফ, আপদটা বিদায় হল এতক্ষণে!

রোজের মতই স্কুল সেরে সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছিল যূথিকা। পরের আধঘণ্টা সে অপেক্ষা করেছে রাহুলের বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে। অন্য কোনোদিন তার এই প্রোগ্রাম থাকলে যূথিকা স্কুল থেকে আর বাড়ি ফিরত না। একটা টোটো বা অটো ধরে পৌঁছে যেত গন্তব্যে।

কিন্তু আজ স্কুল থেকে সোজা বেরিয়ে গেলে যে রাহুলের চোখকে এড়ানো যাবে না তা যূথিকা টের পেয়েছিল গতকাল রাতেই। ছেলেটা আজকাল তাকে সন্দেহ করে। তার উপর বাড়ি থেকে বেরোবার আগে সে যদি দেখে যেত যূথিকা স্কুল থেকে ফেরেনি তাহলে তার সন্দেহের পাল্লা আরও ভারী হত। তবে রাহুল আজ দেরি করে বেরবে সে’কথা ও একবারও বলেনি যূথিকাকে। তবুও যূথিকা যে স্কুলের পর বাড়িতে ঢু মারতে পেরেছে, তার জন্য দায়ী তার চওড়া কপাল।

ভাগ্যিস রাহুল ফোনটা করার সময়েই কিচেনে ঢুকেছিল সে!

গতকাল রাতে ডিনারের পর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অভ্যাসমত সিগারেটে টান দিতে দিতে অফিসের কাউকে একটা ফোন করেছিল রাহুল। যূথিকা তখন এঁটো বাসনগুলো সবে কিচেনের সিঙ্কে রেখেছে। কিচেনটা ব্যালকনির পাশেই। রাহুলের গলার আওয়াজ শুনেই কান খাড়া হয়ে গিয়েছিল যূথিকার। চালাতে গিয়েও চালায়নি ট্যাপটা।

“আর বলো না। হার্ট অ্যাটাকের জন্যে নয় নয়, ইউরিনের ইনফেকশনের জন্যেই বাবাকে এক সপ্তাহ নার্সিংহোমে থাকতে হল। নইলে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন তিনদিনের মাথায় ছেড়ে দেবেন। যাকগে যে কথা বলছিলাম; কাল অফিসে যেতে পারবো না। বাবার ছুটি হবে। দুপুর বারোটা নাগাদ নার্সিংহোমে যাব। তারপর বাবাকে ডিসচার্জ করিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। দেখি কখন সব কাজ মেটে। তুমি একটু সামলে দিও প্লিজ।”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ফোনটা কেটে দিয়েছিল রাহুল।

প্রচণ্ড উত্তেজনায় ততক্ষণে একশোটা হাতি যেন একসঙ্গে দাপাতে শুরু করেছে যূথিকার বুকের মধ্যে। মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল সে।

যাক, খুব বাঁচা বেঁচে গেছে এই যাত্রায়!

তবে রাহুলের বেরোবার সময়টা বরাত জোরে জেনে গেলেও সে কখন ফিরবে, তা জানা ছিল না যূথিকার। আগ বাড়িয়ে সেকথা সে জিজ্ঞেসও করেনি রাহুলকে। কিন্তু নার্সিং হোম থেকে ছুটি করানো ব্যাপারটা বেশ সময় সাপেক্ষ তা যূথিকা জানত। বিয়ের কয়েক বছর আগে তার এক পিসিকে ব্যাণ্ডেলের একটা নার্সিংহোম থেকে ডিসচার্জ করিয়েছিল সে। কতরকমের হ্যাপা তা মনে পড়লে এখনও গায়ে জ্বর আসে তার।

যূথিকা বুঝতে পেরেছিল রাহুলের ফিরতে ফিরতে আজ রাত। শুধু ছুটি করিয়েই যে রাহুলের কাজ মিটে যাবে তা নয়। বাবাকেও সে রেখে আসবে শ্রীরামপুরে। ওই মানুষটাকে এই ফ্ল্যাটে এনে তোলার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। যূথিকা জানে আজকাল তাকে যতটা ঘেন্না করে রাহুল, তার থেকেও বোধহয় বেশি করে ওই মানুষটাকে!

সেদিক থেকে দেখতে গেলে নিশ্চিন্ত যূথিকা। তার হাতে আছে অনেকটা সময়।

সেইজন্যই বোধহয় আজ সকাল থেকেই আর তর সইছিল না তার। তবে কোনও নতুন ছেলের সঙ্গে ডেট করলে প্রতিবারই এই অদ্ভুত অনুভূতিটা সঙ্গী হয় যূথিকার। সারা শরীর জুড়ে চলে এক বশ না মানা শিরশিরানি। মেডিকেল সাইন্স যতই এটাকে হরমোনের খেলা বলুক না কেন, চেনা উন্মাদনাটাকে বারবার উপভোগ করতে ভীষণ ভালো লাগে যূথিকার।

প্রতিদিনের মত স্নান সেরেই স্কুলে গিয়েছিল সে। রাহুল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই পরনের সালোয়ার কামিজটা ছেড়ে ফেলে কাবার্ড থেকে বার করল একটা আকাশী নীল রঙের স্লিভলেস টপ আর কালো জিনস। সেগুলো পরে নিয়ে চুলটাকে পনিটেল করে, চোখে আইলাইনার আর ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ল ফ্ল্যাট থেকে।

আজ বৃষ্টি না হলেও গুমোট হয়ে নেই চারিদিক। আকাশে চলছে মেঘ আর রোদ্দুরের লুকোচুরি। জুলাই মাসের আবহাওয়া চট করে এরকম হয় না। বাড়ির বাইরে পা রেখে সকালবেলার মতই আরও একবার হালকা হয়ে গেল যূথিকার মনটা। কিছুটা হেঁটে সে এসে পৌঁছল কোন্নগর বাটায়। পুরো কোন্নগরের মধ্যে জিটি রোড এই একটা জায়গাতেই সবথেকে বেশি জমজমাট। রাস্তার একপাশে রয়েছে একটা বুড়ো বট। অন্যপাশে বয়ে যাচ্ছে গঙ্গা। গঙ্গার দিকে সার দিয়ে পরপর দাঁড়িয়ে রয়েছে অটো আর টোটো। বেশ কয়েকটা অটোকে টপকে যূথিকা গিয়ে উঠল একটা টোটোয়। তারপর ড্রাইভারের চেয়ারে বসে থাকা ছেলেটাকে বলল, “চারজনের ভাড়াই দেব। তাড়াতাড়ি অবনীন্দ্রনাথের বাগানবাড়ি চলো।”

অবনীন্দ্রনাথের বাগানবাড়ি পৌঁছতে সময় লাগলো না খুব বেশি। কোন্নগর আর হিন্দমোটরের মাঝমাঝি এই জায়গাটা বেশ ফাঁকা। এখানেই গঙ্গার ধারে একসময় বাগানবাড়ি বানিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটা এখন ভাড়া দেওয়া হয় পিকনিক পার্টিদের।

জিটি রোড থেকে একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে গঙ্গার দিকে। বাড়িটা রাস্তার শেষ মাথায় হলেও যূথিকা টোটো থেকে নেমে পড়ল জিটি রোডের উপরেই। ভাড়া মিটিয়ে জিনসের পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে সে মিসকল দিল একটা নাম্বারে।

ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে সব প্ল্যান করা ছিল গতকাল রাতেই। মিনিট তিনেক যেতে না যেতেই যূথিকার সামনে এসে দাঁড়াল একটা বুলেট।

বাইকের আরোহী তার কালো মুখঢাকা হেলমেটটা খুলতেই যূথিকা চিনতে পারল অনিকেতকে।

অনিকেত ওরফে দ্বীপ যূথিকাকে যখন ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছিল তখন ফেবুতে তার বন্ধুসংখ্যা শূন্য। ডিপিতে জ্বলজ্বল করেছে একটা লাল রঙের হার্ট।

মেয়েরা চট করে এমন আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে না। কিন্তু যূথিকা করেছিল। যা কিছু নিষিদ্ধ তাই বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে তাকে। ম্যাসেঞ্জারে কয়েকদিন আড্ডার পর অনিকেত পাঠায় তার নিজের ছবি।

দীঘার সিবিচে সমুদ্রকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে তোলা এই সেলফিটাই নিজের আসল অ্যাকাউন্টের ডিপি হিসাবে ব্যবহার করে সে।

অনিকেত যে যূথিকার একেবারে অচেনা নয় সেই ইঙ্গিত ছবি পাঠানোর আগেই তাকে দিয়েছিল ছেলেটা। যূথিকাও ছবিটা একবার দেখেই চিনতে পেরেছিল অনিকেতকে। পিকনিকের দিন এই ছেলেটাই তো বারবার ধরে ঝাড়ি মারছিল তাকে!

সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক গোপনীয়তার কারণ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যূথিকার সামনে। মনে মনে অনিকেতের বুদ্ধির তারিফ না করে পারেনি সে। তবে পিকনিকের দিন দূর থেকে বা ছবিতে অনিকেতকে যতটা স্মার্ট লেগেছিল, সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে তার থেকেও অনেক স্মার্ট বলে মনে হল যূথিকার। ছেলেটার মেদবর্জিত শরীর, ব্যাকব্রাশ করা চুল, চওড়া কপাল, টানা টানা দুটো চোখ, আর সারা মুখ জুড়ে অবিন্যস্ত দাড়ি চুম্বকের মত টানতে শুরু করেছিল তাকে। ছেলেটার পরনে কালো টিশার্ট আর ছাইরঙা জিনস। স্কিন টাইট টি শার্টের উপর ভাসছে সাদা রঙের একটা নৌকা। নৌকাটার পাশে সাদা হরফে লেখা, ‘সুজন মাঝি রে/ কোন ঘাটে ভিড়াইবা তোমার নাও?’

ছেলেটার রসবোধ দেখে মনে মনে খুশি হল যূথিকা। রাহুলের মধ্যে এই সূক্ষ রসবোধ কোনোদিন খুঁজে পায়নি সে।

যূথিকা একটা ছোট্ট হাসি ছুঁড়ে দিল অনিকেতের দিকে। হালকা হাসল অনিকেতও। তারপর বাইকের পিছনে লাগানো হেলমেটটা তুলে দিল যূথিকার হাতে।

হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে বাইকে উঠে পড়ল যূথিকা। বসল সীটের দু’পাশে পা দিয়ে। অনিকেত বাইক স্টার্ট করতেই সে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার কোমর।

যেন কতদিনের পরিচয় তাদের!

যূথিকার হাতের ছোঁয়া রক্ত গরম করে দিল অনিকেতের। দুপুরবেলার ফাঁকা জিটি রোড ধরে তার বাইক হুহু করে ছুটতে শুরু করল কলকাতার দিকে।

সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাতে ফেরা। ছুটির দিনগুলো বাদ দিলে বাকি দিনগুলোতে রাহুলের একান্ত ব্যক্তিগত সময় বলতে অফিসের মাঝে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। বিকেলবেলায় ওই সময়টা অফিসের জিমে কাটায় সে। কিছুক্ষণ ট্রেডমিল করার পর হালকা ওয়েট ট্রেনিং করে।

এই সময়টাতে রাহুলের কানে গোঁজা থাকে হেডফোন। তার প্রিয় হিন্দি গানগুলো মোবাইলের মেমরি কার্ড থেকে হেডফোনের তার বেয়ে পৌঁছে যায় তার কানে।

কিন্তু আজকের দিনটা ব্যতিক্রম। সময়মত জিমে এসে ট্রেডমিল করতে শুরু করলেও কানে হেডফোন গোঁজেনি রাহুল।

গান শুনতে মোটেও ভালো লাগছে না তার!

বিগত কয়েকদিনে অনেকগুলো ছোট ছোট পরিবর্তন ঘটে গেছে রাহুলের জীবনে। ‘লাইফ এগেইন’ থেকে ছুটি হয়ে যাওয়ার পর বাবাকে কোনও একটা ওল্ড এজ হোমে রেখে দায়মুক্ত হতে চেয়েছিল সে। ভেবেছিল ওই অভিশপ্ত বাড়িটাকে তুলে দেবে কোনও প্রমোটারের হাতে। বিপ্রতীপকে বললে ব্যাপারটা আরামসে মিটে যেত। ছুটি হওয়ার কয়েকদিন আগে কথাটা সে পেড়েওছিল তার বাবার কাছে। কিন্তু পারিজাত রাজি হয়নি। বুড়ো বয়সে অন্য কোথাও গেলে নাকি শান্তিতে মরতেও পারবে না সে!

তাই রাহুল নিমরাজি হয়েই তাকে রেখে এসেছিল শ্রীরামপুরের বাড়িতে। তবে পুরো একা নয়। অসুখের পর থেকে বিপ্রতীপের বাড়িতে যে রান্নার লোক আছে সেই রান্না করে দিয়ে যায় সকাল-বিকেলে। আর ওর বাড়ির কাজের মাসি সপ্তাহে দু’দিন এসে জামাকাপড় কেচে, ঘর পরিষ্কার করে দিয়ে যায়।

আগে পরিজাত সব কাজ নিজেই করত। একটা মানুষ এতবছর জেলে থাকলে এমনিতেই শিখে যায় সবকিছু। হার্ট অ্যাটাকটা হওয়ার আগে কখনও ডাক্তারের ছায়াও মাড়ায়নি সে। তাই পরিজাতের জন্য এর আগে কোনও খরচই ছিল না রাহুলের। কিন্তু এখন হয়েছে। শুধু কাজের লোক নয়, তার সঙ্গে ওষুধেরও।

রাহুল এখন যা মাইনে পায় তাতে এই টাকাটুকু জোগাড় করা খুব একটা চাপ নয় তার পক্ষে। সেটা নিয়ে বিশেষ মাথাও ঘামায় না সে। কিন্তু অন্য একটা বিষয় ক্রমাগত ছুঁচ ফুটিয়ে চলেছে তার বুকের মাঝখানে। দিন দশেক আগের ঘটনা। পরদিনই পরিজাতকে ছুটি দেবে নার্সিং হোম থেকে। তাই ভোর বেলায় ওঠার কোনও চাপ না থাকলেও মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল রাহুলের। পাশ ফিরতেই সে দেখেছিল যূথিকা বিছানায় নেই। রাহুল ভেবেছিল বাথরুমে গেছে ওর বউ। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেও যূথিকা না ফেরায় বিছানার মাথার কাছে লাগানো বেড সুইচ অন করে টিউবটা জ্বেলেছিল সে।

অন্ধকার থেকে হঠাৎ আলোতে চোখ সয়ে যেতে সময় লেগেছিল কিছুটা। তারপর বাথরুমের দরজার দিকে তাকাতেই রাহুল দেখেছিল দরজা বন্ধ। ছিটকিনিটা আটকানো আছে বাইরে থেকে।

আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে এসেছিল রাহুল। রাত্তিরবেলায় বেডরুমে এসি চলে। তাই বন্ধ ছিল ঘরের দরজা। দরজার একপাশে ঘোরানো লক লাগানো। লকটা ঘোরাতেই খুলে গিয়েছিল দরজাটা। দরজার বাইরে হলঘর। হলঘরের একপাশে ফ্ল্যাটের সদর দরজা। অন্যপাশে একটা বিশাল জানলা। হলঘরটার ভিতরের দিকটা ডাইনিং স্পেস আর বাইরের দিকটা ড্রয়িং রুম হিসাবে ব্যবহার করে ওরা। ডাইনিং স্পেসের একপাশে রয়েছে বেডরুম লাগোয়া কিচেন। আর বেডরুমের উলটোদিকে রয়েছে একটা টয়লেট। আর তার পাশে কিচেনের মুখোমুখি রয়েছে আরও একটা ঘর।

দেখতে গেলে খুব ছোট নয় ওদের ফ্ল্যাটটা। বেডরুম থেকে বেরিয়ে রাহুল দেখল বাইরে রাস্তায় জ্বলতে থাকা মারকারি ভেপারের তীব্র আলোটা রোজ রাতের মতই জানলা দিয়ে কিছুটা হলেও এসে পড়েছে হলের মধ্যে। রাত্তিরবেলায় ওই আলোই ঘরের অন্ধকার হালকা করার জন্য যথেষ্ট। সেই আলোতেই রাহুল দেখল দরজার দিকে রাখা সোফা বা ভিতর দিকে রাখা ডাইনিং টেবিল—কোথাও নেই যূথিকা।

অথচ বন্ধ রয়েছে ফ্ল্যাটের মেন দরজা।

ফ্ল্যাটের দরজাটা লক সিস্টেমের। বাইরে থেকে টানলেও বন্ধ হয়ে যায়।

ধক করে উঠেছিল রাহুলের বুকটা।

মেয়েটা মাঝরাতে ওর প্রেমিকের সঙ্গে চম্পট দেয়নি তো!

রাগটা হয়তো আরও বাড়ত, কিন্তু ঠিক সেই সময়েই রাহুলের কানে এসেছিল কি প্যাডের আওয়াজ। ঠিক স্পষ্ট না হলেও রাত অনেক গভীর বলেই শোনা যাচ্ছে এখন।

উলটো দিকের ঘরটার দিকে তাকিয়েছিল রাহুল। বেডরুমের মত সেই ঘরের দরজাতেও টাঙানো রয়েছে একটা পর্দা। বেডরুম থেকে বাইরে এসে সেই পর্দাটা একটু ফাঁক করতেই রাহুল দেখেছিল বন্ধ রয়েছে সেই দরজাও।

বিয়ের পর থেকে এই ঘরে বসেই নিজের ল্যাপটপে খুটখুট করত যূথিকা। ইদানীং নিজের মাইনের টাকা জমিয়ে কয়েকদিন আগে একটা ডেক্সটপ কিনেছে সে।

কথাটা মনে হতেই একটা সম্ভাবনার কথা বিদ্যুতের মত চমকে উঠেছিল রাহুলের মাথায়।

ঘরের ভিতরে ইন্টারনেট থাকা মানে তো খোলা আছে সারা পৃথিবীর দরজা!

রাহুল জানে যূথিকা ফোন থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। হঠাৎ মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল তার। দরজায় ধাক্কা মারতে মারতে পাগলের মত চিৎকার করে উঠেছিল সে, “ঘরের ভিতরে বসে কার সঙ্গে কী করছ? এখুনি দরজা খোল।”

দরজা খুলতে বেশি সময় নেয়নি যূথিকা, “এসো। ঘুম আসছিল না। তাই কবিতা লিখছিলাম। তুমি এত চিৎকার করছ কেন? রাত্তিরবেলায় ফ্ল্যাটের সবাই শুনতে পাবে।”

বরফের মত ঠাণ্ডা যূথিকার কণ্ঠস্বর। আর সেরকমই শান্ত হয়ে আছে তার মুখখানা। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি হয়েছিল রাহুলের। যূথিকার কথাটা তো একেবারে ফেলে দেওয়ার মত নয়। রাতে চিৎকার করা মানে তো নিজের সমস্যা ফ্ল্যাটের বাকি জেগে থাকা লোকগুলোকে বলে দেওয়া। তাছাড়া একসময় তো সত্যিই রাত জেগে কবিতা লিখত যূথিকা।

বিয়ের পর তার প্রথম পাঠকই ছিল রাহুল।

কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রাহুল বুঝতে পেরেছিল অন্য কিছু করলেও নিজেকে ভালো করে করে লুকিয়েই দরজা খুলেছে যূথিকা। টুলবারে কোথাও অন নেই ব্রাউজার এমনকি ইন্টারনেটও। আর ডেক্সটপের স্ক্রিনে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের সাদা পাতায় জ্বলজ্বল করছে বাংলায় লেখা কয়েকটা লাইন,

‘একমুঠো ভালোবাসার জন্যে রক্তস্নান করতেও রাজি আমি

যদি না হই ওই নীল সাগরের দ্বীপ,

আমি লাশদের ঠোঁটে রাখবো ঠোঁট

ভাঙা ক্যানভাসে আঁকা ছিন্ন যোনির মত।’

আধুনিক কবিতা বরাবরই মাথায় উপর দিয়ে বাউন্সারের মত বেরিয়ে যায় রাহুলের। তবুও ভালোবাসার খাতিরে বিয়ের পর পর যূথিকার লেখার প্রশংসাই করতে হত রাহুলকে। কিন্তু সেই রাতে কোনও ভণিতা না করেই সে বলেছিল, “এসব আর লিখতে হবে না। রাত অনেক হয়েছে। শুতে চলো।”

“চলো।” ফের অসম্ভব শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল যূথিকা।

তারপর ডেক্সটপটা শাট ডাউন করে এসে শুয়ে পড়েছিল রাহুলের পাশে।

খানিক পরেই যূথিকার হালকা নাক ডাকার আওয়াজ কানে এসেছিল রাহুলের। বেশ কিছুদিন আগে একবার সুযোগ বুঝে যূথিকার হোয়াটসঅ্যাপও চেক করেছিল রাহুল। সেদিনও সন্দেহজনক কিছুই পায়নি সে।

তবুও দু’চোখের পাতা কিছুতেই এক হচ্ছিল না রাহুলের।

মেয়েটা বারবার বোকা বানিয়ে যাচ্ছে তাকে!

অথচ কিছুতেই ওকে ধরতে পারছে না সে।

এর পরের ঘটনাটা ঘটেছিল পরের দিন। ডাঃ ভদ্র বিপুদা এবং রাহুল দুজনেরই খুব চেনা বলে ছুটির ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি।

পরিজাতকে বাড়ি পৌঁছে, কাজের লোকেদের বন্দোবস্ত করে রাহুল যখন নিজের বাড়ি ফিরেছিল তখন সবে সাড়ে ছটা বাজে।

সারাদিন অনেক দৌড়াদৌড়ি গেছে। রাহুল ভেবেছিল বাড়ি পৌঁছে কয়েকদিন আগে কেনা হুইস্কির বোতলটা নিয়ে বসবে। সঙ্গে যূথিকাকে বানাতে বলবে ওর প্রিয় অমলেট।

যতই ঝগড়া হোক না কেন, মেয়েটার হাতের রান্নার লোভ এখনও সামলে উঠতে পারেনি সে।

ওদের ফ্ল্যাটে লিফট নেই। সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে রাহুল দেখেছিল ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। কোলাপসেবল গেটে তালাটা ঝুলেছে বাইরে থেকে।

তার মানে যূথিকা নেই ফ্ল্যাটের ভিতরে! অথচ এই সময় তো মেয়েটার এখানেই থাকার কথা।

একজন মানুষ তো অনেক কারণেই বেরতে পারে!

কিন্তু...

যুক্তি আর আবেগের দড়ি টানাটানিতে রাহুল টের পাচ্ছিল তার আবেগ অন্তত এই ক্ষেত্রে যুক্তির থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।

ফ্ল্যাটের চাবি সবসময় তার কাছে থাকে বলে ভিতরে ঢুকতে কোনও অসুবিধা না হলেও রাহুলের ইচ্ছা করছিল ফোন করে যূথিকাকে কয়েকখানা বাজে কথা বলতে।

তবে শেষ পর্যন্ত ফোন করেনি সে।

রাহুল দেখতে চাইছিল ঠিক কটায় বাড়ি ঢোকে যূথিকা।

যূথিকা ফিরেছিল প্রায় পৌনে আটটা নাগাদ। কলিং বেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলেছিল রাহুল। যূথিকার চোখে মুখে তখন সারাদিনের ক্লান্তি। এলোমেলো হয়ে গেছে মাথার চুলগুলোও।

অন্য ছেলে থাকলে বোধহয় নিজের বউয়ের ক্লান্ত মুখটাকেই আগে দেখতে পেত। কিন্তু রাহুলের চোখ প্রথমেই খুঁজে পেয়েছিল যূথিকার পোশাকটা।

স্লিভলেস আর ভি গলা কুর্তির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা উন্মুক্ত কাঁধ আর স্তনবিভাজিকা অসম্ভব আবেদনময়ী করে তুলেছে তাকে। সেই আবেদন এতই তীব্র, যেকোনও ছেলে একবার তাকালে চট করে আর চোখ ফেরাতে পারবে না সেখান থেকে।

তার মানে আজ ও নিশ্চয়ই কোনও ছেলের সঙ্গে…

সেই মুহূর্তে রাগের থেকেও দুঃখটাই বেশি হয়েছিল রাহুলের।

“কোথায় গিয়েছিলে?” গলার স্বর কিছুটা গভীর করে সে প্রশ্নটা করেছিল যূথিকাকে। কিন্তু যূথিকা ফিরেও তাকায়নি তার দিকে। ফ্ল্যাটে ঢুকে সদর দরজাটা বন্ধ করে সোজা ঢুকে পড়েছিল বেডরুমে।

রাহুলের মুখের উপর বেডরুমের দরজাটা বন্ধ করতে এক সেকেন্ডও সময় নেয়নি যূথিকা।

যূথিকার এই ঔদ্ধত্য সহ্য হয়নি রাহুলের। মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল তার। গতকাল রাতের মতই আরও একবার দুমদুম করে সে ধাক্কা মারতে শুরু করেছিল বেডরুমের দরজায়।

ভিতর থেকে সাড়া দেয়নি যূথিকা। কিছুক্ষণ পর দরজা না খোলায় আবার দরজায় ধাক্কা মেরেছিল রাহুল।

না এবারও দরজা খোলেনি।

একবার দরজা খুলুক যূথিকা! রাহুল ভেবেছিল সে আজ ফেলে রেপ করবে ওকে।

বাবার অসুখের পর থেকে আর করেনি বলেই এত বাড় বেড়েছে মেয়েটার!

এর মধ্যেই হঠাৎ রাহুলের চোখ পড়েছিল লকটার দিকে। কোনও কিছু না ভেবে লকটা ঘোরাতেই রাহুলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সামান্য ফাঁক হয়ে গিয়েছিল দরজাটা।

তবে কি যূথিকা আদৌ ভিতর থেকে ছিটকিনি দেয়নি? প্রশ্নটা উঁকি মেরেও পিছলে গিয়েছিল রাহুলের চোখের সামনে থেকে। এসব ভাবতে আর রাজি নয় সে। রাহুল টের পাচ্ছিল জেগে উঠছে তার শরীর। আর তর সইছিল না তার। সে সজোরে একটা ধাক্কা মেরেছিল দরজাটার উপরে।

হাট করে পাল্লাটা খুলে যেতে সময় নেয়নি মোটেও। কিন্তু ঘরের ভিতরে তার জন্য যা অপেক্ষা করছিল তার জন্যে আদৌ প্রস্তুত ছিল না রাহুল।

দরজার সোজাসুজি বিছানা। রাহুল দেখেছিল দরজার দিকে পা করে সেই বিছানায় শুয়ে আছে যূথিকা।

সে সম্পূর্ণ নগ্ন। হাঁটু থেকে ভাঁজ করা পা দুটো ফাঁক হয়ে আছে মাঝখান থেকে।

দৃশ্যটা নিঃসন্দেহে অশ্লীল। যে কোনও পুরুষকেই কামতাড়িত করে তোলে। কিন্তু যূথিকাকে এইভাবে দেখে কোথাও যেন ধাক্কা খেল রাহুলের উন্মত্ততা। সে তো নিজের হাতে মেয়েটার জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে করতে চেয়েছিল সবকিছু।

অথচ তার আগেই...

অবাক হয়ে রাহুল আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। যূথিকা হাত দুটোকেও তুলে রেখেছে মাথার উপরে। রাহুল তার কাছে পৌঁছতেই সে বলেছিল, “করবে তো? সব খুলে দিয়েছি। করে ফেলো।”

ভঙ্গিটা সমর্পণের হলেও যূথিকার চোখে কোনও ভালোবাসার চিহ্ন নেই। সেটা যে থাকবে না তা জানত রাহুল। কিন্তু এই কাজটা করতে গেলেই রাহুল দেখছে প্রচণ্ড ভয়ে কুঁকড়ে যায় মেয়েটার শরীর, ছলছল করতে শুরু করে তার চোখ দুটো।

অথচ আজ যূথিকার শরীরে যেমন ভয় নেই, তেমনই ওর চোখ দুটোতেও নেই বিষণ্ণতা। বরং সেখানে রাহুলের জন্যে জড়ো হয়েছে দুনিয়ার উদাসীনতা।

মেয়েটা আর চেয়েও দেখছে না ওর দিকে।

রাহুল ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর উপরে। কিন্তু যূথিকার শরীরে প্রবেশ করতে করতে সে টের পেয়েছিল আড়ষ্ট নয়, বরং সদ্য মৃতের মতই শিথিল হয়ে আছে তার শরীর। সঙ্গমের উত্তেজনাও যেন স্পর্শ করতে পারছে না তার নারীদেহকে।

অবাক হয়ে রাহুল দেখেছিল ওর চোখের কোণে জমেনি জলের বিন্দুও। বরং আগের মতই উদাসীন সে দুটো। সঙ্গে ঠোঁটের কোণে জমা হয়েছে অদ্ভুত এক অবজ্ঞা।

তবুও থামেনি রাহুল। কিছুক্ষণ পর বীর্যপাত হয়ে গিয়েছিল নিজের নিয়মেই। কিন্তু সবকিছু মিটে যাওয়ার পর রাহুলকে গ্রাস করতে শুরু করেছিল অদ্ভুত এক হতাশা।

তার আক্রমণ আর কষ্ট দিতে পারছে না প্রতিপক্ষকে!

আটকাতে না পারলেও বারবার একই আক্রমণে যূথিকা এখন অভ্যস্ত। সয়ে গেছে তার ক্ষতটা।

রাহুল বুঝতে পেরেছিল একই আঘাতে ফের নতুন করে ক্ষত তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব। যূথিকাকে জব্দ করতে গেলে খুঁজে নিতে হবে নতুন কোনও উপায়।

আর সেটাও আইনের রক্তচক্ষু এড়িয়ে।

কিন্তু কি হতে পারে সেটা? গত কয়েকদিন ধরে বারবার ভেবেও রাহুল কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিল না। ট্রেডমিলের তালে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত পা ফেলে গেলেও রাহুলের মাথায় ঘূর্ণির মত পাক খাচ্ছিল সেই একই চিন্তা।

এর মধ্যেই হঠাৎ বেজে ওঠে তার ট্রাউজার্সের পকেটে রাখা মোবাইলটা।

পকেট থেকে ফোনটা বার করে রাহুল দেখল স্ক্রিনে ফুটে আছে একটা অচেনা নাম্বার।

মনে মনে একটু বিরক্ত হল রাহুল।

কিন্তু এইসব অচেনা নাম্বার থেকেও মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ফোন আসে।

তাই বাধ্য হয়েই ফোনটা রিসিভ করল সে।

এখন জীবন যেন মুচকি হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। অটো থেকে নেমে রত্নদ্বীপ অ্যাপার্টমেন্টের দিকে হেঁটে আসতে আসতে এই কথাটাই ভাবছিল অনিকেত। আজ ইচ্ছা করেই বাইক আনেনি সে। তাতে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

গোপন এই অভিসারের কোনও চিহ্ন রেখে দেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও, এরকম একটা অভিসারে তাকে যে আসতে হতে পারে তা স্বপ্নেও ভাবেনি অনিকেত। কিন্তু কাল সকালে যূথিকার একটা ফোনই ওলটপালট করে দিল সবকিছু, “শোনো, আজ আর কাল রাহুল থাকবে না। আজ ভোরে হায়দ্রাবাদ গেছে। পরশু আসবে। প্লিজ আজ ছুটি নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে চলে এস। জানলে আগেই তোমাকে ফোন করতাম। কিন্তু আমাকেও যাওয়ার কথাটা বলেনি।”

গতকাল তারকেশ্বর গিয়েছিল অনিকেত। যাওয়ার পথেই ফোন করেছিল যূথিকা। রোজ অফিসে যেতে হয় না বলেই রাহুলের হায়দ্রাবাদ যাওয়ার খবরটা জানত না অনিকেত। কিন্তু যূথিকার কথাগুলো হজম করতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল তার। তারকেশ্বর রোডের একপাশে বাইকটাকে দাঁড় করিয়ে ফোনটা রিসিভ করেছিল সে। যূথিকার কথা শুনে শুধু শরীরই নয় কেঁপে গিয়েছিল তার গলাও, “হ্যাঁ, মানে…”

“কী হল? ভড়কে গেলে?” ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল যূথিকা, “আসতে বলেছি। আসবে হাঁদারাম। বাকিটা আমার দায়িত্ব।”

যূথিকা তাকে হাঁদারাম বলছে। কোথাও একটা ঘা লেগেছিল অনিকেতের। কিন্তু গতকাল অনেকগুলো কাজ ছিল তার। যাওয়া সম্ভব নয় কিছুতেই। ভিতরে ভিতরে কষ্ট হলেও গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল তার গলা, “ঠিক আছে। কিন্তু আজ নয়। সময় পাব নাগো। প্লিজ রাগ করো না। কাল দুপুরে আসছি।”

অনিকেতকে আর জোর করেনি যূথিকা। অবশ্য ফোনেই ওর ফ্ল্যাটের ডায়রেকশন নিয়ে নিয়েছিল অনিকেত। ক্রাইপার রোডের একপাশে রত্নদ্বীপ অ্যাপার্টমেন্টটাকে খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধাও হল না তার। ভর দুপুরে ফ্ল্যাটের সামনে বসে নেই কোনও সিকিউরিটিও। তবে রত্নদ্বীপ অ্যাপার্টমেন্টে কোনও সিকিউরিটির বালাই নেই সেকথা তাকে বলেছিল যূথিকাই। আজ অনিকেতের পরনে একটা সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স। পিঠে রয়েছে একটা ছোট্ট ব্যাগ। আর পায়ে কালো বুট। যূথিকার নির্দেশেই এমন পোশাক পরে এসেছে সে। যাতে কারুর সন্দেহ হলে অনায়াসে নিজেকে ওয়াটার পিউরিফায়ারের সার্ভিস বয় বলে চালিয়ে দিতে পারে।

এসব বুদ্ধি তাকে দিয়েছিল যূথিকাই।

তবে ফোনে নয়।

গতকাল রাতে ম্যাসেঞ্জারে আড্ডা মারার সময়।

দুপুরবেলা বলে ঝিম মেরে আছে গোটা ফ্ল্যাটটা। কোথাও কেউ নেই। তিনতলায় উঠে বাঁদিকে তাকাতেই অনিকেত দেখতে পেল দরজাটাকে।

দরজার উপরে লাগানো একটা পিতলের প্লেটে লেখা আছে ৩০২।

অনিকেত জানে এই ফ্ল্যাটটাই যূথিকাদের।

গতবার এদিক ওদিক ঘুরে, খেয়েদেয়ে আর সিনেমা দেখে সময় কাটিয়েছিল ওরা দু’জন।

কলেজের অনেক বান্ধবীর সঙ্গে এমন ডেট বহুবার করেছে অনিকেত।

কিন্তু একলা একটা মেয়ে দুপুরবেলায় তাকে নিজের ফ্ল্যাটে ডাকছে!

এই অভিজ্ঞতা তার জীবনে প্রথম।

তার উপর মেয়েটা আবার তার থেকে একটু বড়!

যূথিকার দরজায় বেল বাজাতে গিয়ে অনিকেত অনুভব করল উত্তেজনার চোটে কাঁপতে শুরু করেছে তার হাঁটু দুটো।

অনিকেতকে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করিয়ে দরজা খুলল যূথিকা। তার দিকে তাকাতেই চমকে উঠল অনিকেত। যূথিকার চুল খোলা। পরনে একটা নাইটি। গোল গলার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে উন্মুক্ত স্তন দুটোর অনেকটাই।

নির্জন দুপুরে যূথিকাকে দেখে হঠাৎ কামনার আগুনে পুড়তে শুরু করল অনিকেত। চোখ সরানো যাচ্ছে না মেয়েটার দিক থেকে! তার অবস্থা দেখে হেসে উঠল যূথিকা, “কীরে কী দেখছিস? বাইরে থেকেই সব দেখে নিবি? ভিতরে আসবি না?”

তুমিটা তুই হয়ে গেছে। তার উপরে কথাগুলোও যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। তবুও তাকে কোনও উত্তর দিল না অনিকেত। মন্ত্রমুগ্ধের মত ঢুকে পড়ল যূথিকার ফ্ল্যাটে।

অনিকেত ভিতরে ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ করে দিল যূথিকা। তারপর হাতখানা ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে এলো বেডরুমে। অনিকেত যেন পরিণত হয়েছে যূথিকার হাতের পুতুলে। বেডরুমে পৌঁছে তার পিঠব্যাগখানা নিজেই খুলে দিল যূথিকা। আর তর সইছিল না তার। ব্যাগখানা ঘরের এককোণে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, যূথিকা সজোরে একটা ধাক্কা মারল অনিকেতের বুকে।

স্বপ্নের পৃথিবীতে হারিয়ে যাচ্ছিল অনিকেত। আচমকা ধাক্কায় টাল সামলাতে পারল না সে। পড়ে গেল বিছানার উপরে। এই মুহূর্তটার অপেক্ষাতেই ছিল যূথিকা। অনিকেত পড়ে যেতেই সে ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকের উপর। ঠোঁট ডোবাল ছেলেটার ঠোঁটে।

জীবনের প্রথম চুম্বনই এত গভীর! নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল অনিকেতের। দীর্ঘ চুম্বন শেষ খিলখিল করে হেসে উঠল যূথিকা। হাত বাড়াল অনিকেতের জামার বোতামের দিকে।

কিছুক্ষণ পর অনিকেত আবিষ্কার করল অন্তর্বাসটাও আর নেই তার কোমরে।

শুধু নির্জন দ্বীপের মত জেগে আছে তার পুরুষাঙ্গখানা।

সেটার দিকে তাকিয়ে আরও একবার খিলখিল করে হেসে উঠল যূথিকা।

তারপর আবার একটু একটু করে ঝুঁকে পড়ল অনিকেতের বুকের উপরে।

কেন দরজা খুলতে এত সময় নিচ্ছে যূথিকা? আরও একবার বেল বাজাল বিধ্বস্ত রাহুল। কর্মক্ষেত্রে এতবড় একটা ধাক্কা যে তাকে খেতে হবে তা ভাবতেও পারেনি সে। অথচ হায়দ্রাবাদের ফ্ল্যাইটে ওঠার সময় শুধু নয়, ইন্টারভিউ রুমে গিয়েও আত্মবিশ্বাসের আগুনে রাহুল ফুটছিল টগবগ করে।

ইন্টারভিউটা ফেস করার সময়েও সে যথেষ্ট সাবলীল ছিল। অথচ এখন রাহুল জানে চাকরিটা তার হয়েও হয়নি।

শেষ মুহূর্তে বাজিমাত করেছে মুম্বাই থেকে আসা একজন। সবকিছু মিটে গিয়েছিল কালই। কোম্পানিটা প্রাইভেট বলেই দিনের দিন জানিয়ে দিয়েছে সিলেক্টেড ক্যান্ডিডেটের নাম। নতুন চাকরিটা পেলে স্যালারি খানিক বাড়ত রাহুলের। কিন্তু হায়দ্রাবাদ কোন্নগরের থেকে অনেক কস্টলি জায়গা। তাতে স্যালারি বেড়ে রাহুলের যে কতটা লাভ হত তা নিয়ে সংশয় ছিল তার নিজের মনেই। তবে সে কলকাতার কোম্পানি ছেড়ে বেরিয়ে গেলে সবথেকে বেশি খুশি হত দীনেশ মুখার্জী। তার থেকে বয়সে একটু বড় হলেও লোকটা যে তাকে হিংসা করে তা রাহুল জানে। অবশ্য সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইস্ট জোনের মার্কেটিং ম্যানেজার হওয়ার দৌড়ে শেষ পর্যন্ত এই লোকটাকেই তো পিছনে ফেলে দিয়েছিল সে।

সেদিক থেকে দেখতে গেলে রাহুল দীনেশের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে। তবুও দীনেশ মুখার্জীকে নিজের কষ্টার্জিত জায়গাটা ছেড়ে দেওয়ার কোনও ইচ্ছাও ছিল না তার। তার পরেও বেশ কিছুদিন আগে ইন্টার্ভিউটার জন্য অ্যাপ্লাই করেছিল সে।

নতুন চাকরিটা পেয়ে যূথিকাকে নিয়ে হায়দ্রাবাদে চলে আসাই ছিল তার প্ল্যান।

তাতে যেমন মেয়েটাকে নতুন জায়গায় এনে ফেলা যেত, তেমনই খেয়ে নেওয়া যেত ওর চাকরিটাও।

রাহুল ভেবেছিল হাতখরচায় টান পড়লেই জব্দ হবে মেয়েটা।

সম্পূর্ণ অচেনা একটা শহরে হাতে টাকা না থাকলে কিছুটা হলেও তো বন্ধ হবে কোন্ননগরের অসভ্যতামিগুলো।

সপ্তাখানেক আগে যখন সে অফিসে জিম করছে তখনই একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসে তার। সেই কলটা ছিল ইন্টাভিউয়ের জন্যে। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। রাহুলের ইন্টারভিউ ছিল বুধবার। আগের দিন অফিসের ছুটি না মেলায় বুধবার ভোরের ফ্লাইটেই হায়দ্রাবাদ গিয়েছিল সে। কিন্তু জয়েন করতে হলে অফিসিয়াল কিছু কাজ থাকতে পারে ভেবেই ইন্টাভিউয়ের পরদিনই ফেরার টিকিট না কেটে, একদিন পরের মানে শুক্রবারের টিকিট কেটেছিল সে। অনেক কষ্টে রাহুল দ্বিতীয় দিনের ছুটিটা জোগাড় করেছিল। এই মাসেই তো বাবার জন্যে দুটো ছুটি নষ্ট হয়েছে তার।

রাহুলের প্ল্যান ছিল আগামীকাল ভোরের ফ্লাইটে ফিরে এসে অফিসে জয়েন করা। কিন্তু সেসবের প্রয়োজন হয়নি। অবশ্য যূথিকা এখনও জানে আগামীকাল ফিরবে রাহুল। কেন যে রাহুল হঠাৎ হায়দ্রাবাদ গেল তাও জানে না সে। যূথিকার দিক থেকে দেখতে গেলে আজ রাহুলের ফিরে আসা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত! কথাটা মনে আসতেই নিজের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় খেলে গেল রাহুলের।

সে আসবে না জেনেই মেয়েটা ফ্ল্যাটেই ওর প্রেমিককে ডেকে নেয়নি তো?

ক্লান্তি ছাপিয়ে একটা অস্বস্তি আর রাগ কাঁকড়া বিছের মত কামড়াতে শুরু করল তাকে। রাহুল আবার বাজাতে যাচ্ছিল বেলটা। কিন্তু এবার তার আগেই খুলে গেল দরজাটা।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে যূথিকা। মেয়েটার চোখে মুখে ক্লান্তি আর ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।

ছেলেটা কি এখনও রয়েছে ঘরের ভিতরে?

প্রচণ্ড উত্তেজনায় হঠাৎ দরদর করে ঘামতে শুরু করল রাহুল। আজ একবার সে হাতে পাক শুয়োরের বাচ্চাটাকে...

তারপর এমন কেলান কেলাবে যে…

ভিতরে ঢুকে দরজাটা নিজের হাতে বন্ধ করে রাহুল এগিয়ে গেল বেডরুমের দিকে।

সব জানলা খোলা। চলছে ফ্যানও। কিন্তু ঘরের ঠাণ্ডা বলে দেয় একটু আগেও এসি চলছিল এখানে। ঘরের মধ্যে সিগারেটের হালকা গন্ধের সঙ্গে মিশে গেছে একটা পুরুষালী পারফিউমের গন্ধ।

গন্ধটা আগেও কোথাও পেয়েছে রাহুল। কিন্তু কোথায় মনে করতে পারল না সে। তবে বাকি ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে।

তার অনুপস্থিতিতে কোনও একজন পুরুষ এসেছিল এই ফ্ল্যাটে।

হন্তদন্ত হয়ে রাহুল খুঁজতে শুরু করল সেই অনাহূত পুরুষকে।

খাটের নীচ থেকে বাথরুম, বারান্দা এমনকি বন্ধ আলমারি বাদ গেল না কিছুই।

কিন্তু কোথায় সে?

রাহুল বুঝতে পারল এবার স্রেফ বরাত জোরে তাকে হারিয়ে দিয়েছে যূথিকা। একটু আগেই এখান থেকে বেরিয়ে গেছে সেই আগন্তুক।

যূথিকা তখনও কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে হলটার ভিতরে। রাহুল এগিয়ে গেল তার দিকে। চাকরি আর শিকার দুটোই হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার কষ্ট যেন অজগরের মত পেঁচিয়ে ধরতে শুরু করেছে তাকে।

যূথিকার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় রাহুল তাকে জিজ্ঞেস করল, “কে এসেছিল এখানে?”

“কেউ না।” খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলার চেষ্টা করলেও কেঁপে গেল যূথিকার গলা।

রাহুলের মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে বিপ্রতীপের বলা কথাগুলোও। আর কথা বাড়াল না সে। ঠাস করে সজোরে একটা চড় মারল যূথিকার গালে।

রাহুলের শক্ত হাতের চড় খেয়ে কেঁপে উঠল যূথিকার শরীর। টপটপ কয়েক ফোঁটা জলও পড়ল দু’চোখের কোল বেয়ে। কিন্তু সেদিকে ফিরেও তাকাল না রাহুল। ফ্রেশ হওয়ার জন্যে পা বাড়াল বাথরুমের দিকে।

জীবনে প্রথমবার নিজের স্ত্রীয়ের গায়ে হাত তোলা মানুষটা জানতেও পারল না যে একটু আগে বেরিয়ে যাওয়া পরপুরুষটি আর কেউ নয়, তারই এক অধস্তন কর্মী।

বাংলার বোতল আর বিড়ির প্যাকেট। ভালোবাসা বলতে এখনও এই দুটো জিনিসই রয়ে গেছে পরিজাতের। যদিও ডাক্তার তাকে বারবার বারণ করছে এই দুটো জিনিসে হাত লাগাতে। তাহলে নাকি এই জীবনটা আর টানতে পারবে না সে।

হাসপাতাল থেকে ছুটি হওয়ার সময় ডাক্তারের সাবধানবাণী শুনে মনে মনে হেসেছিল পরিজাত। হার্ট অ্যাটাকটা হওয়ার পরে ছেলে তার জন্য অনেক দৌড়াদৌড়ি করলেও সে যে তাকে মন থেকে ঘেন্না করে তা বিলক্ষণ জানে পরিজাত। যাবজ্জীবন জেল খাটার পর সমাজের চোখেও সে ব্রাত্য।

এরকম একটা জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও দরকার আছে কি আর?

প্রশ্নটার উত্তর পরিজাত জানে। তবুও ডাক্তারের কথা শুনে গম্ভীরভাবে ঘাড় নেড়েছিল সে। যেন সত্যিই খুব গুরুত্ব দিয়ে শুনছে ভদ্রলোকের কথা।

তবে এটা সত্যি কথা যে বাড়ি ফিরে আসার পরেও কয়েকদিন আর বাংলা অথবা বিড়ি কোনওটার দিকেই নজর দেয়নি পরিজাত। তখন সত্যিই খুব দুর্বল ছিল শরীরটা।

তার উপর ছেলে আবার পয়সা খরচ করে ওষুধ কিনে দিয়ে গেছে!

ইচ্ছা না থাকলেও ছেলের প্রতি স্নেহেই হয়তো সপ্তাখানেক ঠিকঠাক ওষুধও খেয়েছিল সে।

তারপর ছেলে ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ওষুধ কেনার টাকা পাঠিয়ে দিলেও তাতে আর হাত দেয়নি পরিজাত। বাবার জমানো যে কটা সামান্য টাকা এখনও বেঁচে আছে সেটার ভরসাতেই ফিরে গিয়েছিল নিজের গন্তব্যে।

জিটি রোডের ধারে শ্রীরামপুরের সেই পুরনো বাংলার ঠেকটাতে।

তবে হার্ট অ্যাটাকটা হওয়ার পরে রোজ আর ওখানে যায় না পরিজাত। তার বদলে বাড়িতেই কিনে রেখেছে বেশ কয়েক বোতল বাংলা। সারাটা দিন বিড়ির উপর দিয়ে চললেও সন্ধে নামলেই বাংলা হয়ে ওঠে তার সঙ্গী।

সঙ্গে অবশ্য বাদ যায় না বিড়ির বাণ্ডিলটাও।

বোতল থেকে খানিকটা কাঁচা বাংলা গলায় ঢেলে ফের বিড়িতে সুখটান দিল পরিজাত। কলেজে পড়তেই মদের নেশা ধরেছিল সে। তখন নেশার টাকা আসত কখনও টিউশনি করে, আবার কখনও বা বাবার পকেট কেটে।

নেশা একটু গাঢ় হতেই আজ মনে পড়ছে সেই পুরনো কথাগুলো। পড়াশুনায় পরিজাত খুব একটা ভালো ছিল না। তখন চাকরির বাজার এত খারাপ হয়নি বলেই কলেজ পাশ করে একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি জোটাতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি তার। বাবার চাপে পড়ে রুবিকে বিয়ে করলেও সংসারে কোনওদিনই মন ছিল না পরিজাতের। কিন্তু পরিজাত তখনও এত মাতাল হয়ে যায়নি যে, রাতে পাশে কমবয়সী বউ শুয়ে থাকলেও তার শরীর জাগবে না। বিয়ের কয়েক বছর পরেই ওদের মধ্যে এসেছিল বাবু, রুবি যার ভালো নাম রেখেছিল রাহুল।

সেই সময়ে বাংলা নয়, নিয়মিত রাম খেত পরিজাত। সংসারের মত নিজের পৈতৃক সম্পত্তির দিকেও নজর ছিল না তার। কিন্তু সে খুব ভরসা করত পরিতোষকে। রুবি কোনওদিনই খুব ভালো চোখে দেখেনি ব্যাপারটাকে। তবে সময় থাকতে পরিজাত কখনই পাত্তা দেয়নি তার স্ত্রীকে। ভাবত নিজের মায়ের পেটের ভাইটা কখনও তার পাওনা থেকে বঞ্চিত করবে না তাকে।

কিন্তু ভাইয়ের মন যে পুরোপুরি অন্য দিকে চলে গিয়েছিল তা বুঝতে পারেনি পরিজাত। যতদূর মনে পড়ে সেটা ছিল মে মাসের এক রাত। বাবা মারা গেছেন কিছুদিন আগে। সেইজন্যই তখন বোধহয় মদ খাওয়াটা একটু বেড়েছিল। সেদিন একতলায় কোণের ঘরে একলা বসে মদ খাচ্ছিল পরিজাত। রামের পাঁইটটা সবে শেষ হয়েছে। হঠাৎ হাতে কয়েকটা কাগজ নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল পরিতোষ, “সরি দাদা। একটু বিরক্ত করলাম। এই কাগজগুলোতে কয়েকটা সই করে দে। কাল সকালে এগুলো নিয়ে কলকাতা যেতে হবে। বাবার কিছু টাকা পয়সা কলকাতার একটা ব্যাঙ্কে পড়ে আছে। তুলতে তোর সইও লাগবে।”

নেশার ঘোরে কাগজগুলো না পড়েই সই করে দিয়েছিল পরিজাত। কিন্তু কতবড় একটা ভুল যে হয়ে গেছে তা সে টের পেয়েছিল আরও কয়েকদিন পরে। অফিস থেকে ফিরে সবে রামের বোতলটা নিয়ে বসবে, এমন সময় ঘরে ঢুকেছিল পরিতোষ। তার হাতে কয়েকটা কাগজ।

পরিজাত ভেবেছিল আরও কিছু সইসাবুদের ব্যাপার আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু তার অনুমান ঠিক হয়নি। ঘরে ঢুকেই দাদার দিকে বোমাটা ছুঁড়েছিল পরিতোষ, “কিছু করার নেই দাদা। তুই বাবার সমস্ত সম্পত্তি আর বাড়িটাও আমাকে দিয়ে দিয়েছিস। যত তাড়াতাড়ি পারিস এই বাড়িটা ছেড়ে চলে যা।”

“মানে!” আকাশ থেকে পড়েছিলেন পরিজাত। কিন্তু পরিতোষ নির্বিকার। দাদার দিকে এগিয়ে দিয়েছিল কয়েকটা জেরক্স করা কাগজ।

নেশার ঘোরে দাদার করে ফেলা ভুলের প্রমাণ হিসাবে।

কাগজগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে একবুক কান্না যেন ধাক্কা মেরেছিল পরিজাতের গলার কাছে। ছলছলে চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তুই শেষ পর্যন্ত...”

“ঠিক আছে,” তখনও আগের মত নির্বিকার পরিতোষ, “এক মাস সময় দিলাম। তার মধ্যে এখান থেকে না উঠলে আমাকে আইনি রাস্তায় যেতে হবে।”

সেই রাতে মদ খেতে খেতে প্রথমে চোখের সামনে অন্ধকার দেখলেও নেশা হয়ে যাওয়ার পরে নিজের ভিতরে অন্য এক মানুষের উপস্থিতি টের পেয়েছিল পরিজাত।

সেই মানুষটা বদলা নিতে চায় এই অন্যায়ের।

রুবিকে সেই রাতে কিছুই বলেনি পরিজাত। কিন্তু পরেরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই পরিজাত ছেলে আর বউকে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল বাপের বাড়িতে।

এর কয়েকদিন পর এসেছিল সেই রাতটা।

সেদিন বাড়ি খুঁজতে যাওয়ার অছিলায় পরিজাত অফিসে যায়নি। কিন্তু গিয়েছিল পরিতোষ। সকাল থেকে আকাশ মেঘলা করে থাকলেও তুমুল বৃষ্টিটা নেমেছিল দুপুরের পর। তবে বৃষ্টি হলেও সেই রাতটাতে অন্যদিনের মত রামের পাঁইট খায়নি পরিজাত।

একটা নিব খেতে খেতেই বারবার হাত বোলাচ্ছিলে নিজের কোমরে।

ওখানেই তো পাজামার মধ্যে গোঁজা ছিল সকালবেলায় কিনে আনা ভোজালিটা।

অন্যদিন অফিস সেরে রাত আটটার মধ্যে বাড়ি ঢুকলেও সেদিন খুব সম্ভবত বৃষ্টির জন্যেই বাড়ি ফিরতে ফিরতে নটা বেজে গিয়েছিল পরিতোষের। কলিং বেলের আওয়াজ শুনে ভাইকে দরজা খুলে দিয়েছিল পরিজাত। ভিতরে ঢুকে দরজার উলটোদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঘরের দিকে হাঁটা লাগিয়েছিল পরিতোষ। কিন্তু তখনই পরিজাত পিছু ডেকেছিল তার ভাইকে, “এই শোন না।”

ততক্ষণে দরজা বন্ধ করে পরিজাত এসে দাঁড়িয়েছে ভাইয়ের পিছনে। পাজামার ফাঁক থেকে তার হাতে চলে এসেছে চকচকে ভোজালিটা।

এক মুখ বিরক্তি নিয়ে দাদার দিকে তাকাতে গিয়েছিল পরিতোষ। কিন্তু পারেনি। অর্ধেক ঘোরার পরেই ভোজালিটা গেঁথে গিয়েছিল তার পেটে।

পরিজাতের শরীরে তখন ভর করেছে অসুরের শক্তি। ধাক্কা মেরে ভাইকে মেঝেতে ফেলে চেপে ধরেছিল তার মুখটা। ভোজালিটাকে আরও ভালো করে ঢুকিয়ে দিয়েছিল পেটের মধ্যে।

কিছুক্ষণ ছটফট করার পর শান্ত হয়ে গিয়েছিল পরিতোষের শরীর।

ঘরের মেঝে তখন ভেসে যাচ্ছে রক্তের স্রোতে।

সেই রক্ত বন্ধ দরজার কড়িকাঠ ডিঙিয়ে বাইরে এলেও বৃষ্টির ধারা মুছে দিয়েছিল তার চিহ্ন।

তখন চারিদিকে এত ফ্ল্যাট ওঠেনি। এমনিতেই খুব শান্ত ছিল পাড়াটা। তার উপর রাতটা বৃষ্টির বলেই আরও নিঝুম হয়েছিল চারদিক। বাড়ির পিছনের রাস্তাটাতেও এত আলো ছিল না সেই সময়।

সবার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি পরিজাতের।

তবে বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারেনি পরিজাত। কয়েকদিন পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে বিহার থেকে।

আইন চলেছিল আইনের পথে। বন্ধ দরজার উলটোদিকে কেটে গিয়েছিল পরিজাতের জীবনের অনেকগুলো বছর।

পরিতোষ বিয়ে করেনি। আর কোনও দাবীদার ছিল না বলেই ফের বাবার সম্পত্তি গিয়েছিল রাহুলের নামেই।

উকিল আদালতে আর সংসার চালাতে সেই জমানো টাকার অনেকটাই খরচা হয়ে গেলেও রাহুল তাতে হাত দেয়নি কখনও।

যা বেঁচে আছে তাতেই চলে যায় পরিজাতের।

পুরনো সেই দিনগুলোকে যেন চোখের সামনে ভাসতে দেখছিল পরিজাত। কৃতকর্মের জন্যে সেদিনও অনুতপ্ত হয়নি সে, আজও হল না। বরং বোতলের তলায় পড়ে থাকা শেষ বাংলাটুকু এক নিঃশ্বাসে গলায় ঢেলে একটা তৃপ্তি অনুভব করল।

নেশটা চেপে ধরেছে বেশ ভালোভাবেই। এইসময়েই খিদেটা মোচড় দেয় পেটের মধ্যে। পরিজাত বুঝতে পারছিল আজও খিদে পাচ্ছে তার। পল্টুর মা রান্না করে খাবার চাপা দিয়ে গেছে টেবিলে। এতক্ষণে তা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এটা অবশ্য রোজের ব্যাপার। তবে কোনওদিনই তা গরম করে না পরিজাত। নেশার ঘোরে ওই শুকনো খাবারও বিস্বাদ লাগে না তার।

জানলার ধারে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে বাংলা খাচ্ছিল পরিজাত। সেখান থেকে উঠে খাবারের টেবিলের দিকে এক পা এগোতে না এগোতেই হঠাৎ ঘুরে গেল তার মাথাটা। সঙ্গে বুকের ভিতর শুরু হল অসহ্য যন্ত্রণা।

ঠিক যেমনটা হয়েছিল সেবার বাজারে।

আর টাল সামলাতে পারল না পরিজাত। দুম করে পড়ে গেল মেঝেতে।

নিমেষে অন্ধকার হয়ে গেল তার চোখের সামনেটা।

গোল মাটির পাত্রে রাখা রয়েছে ছাইয়ের মত কিছু একটা জিনিস। পরিজাতের অস্থি। ইলেকট্রিক চুল্লীর পিছন দিকে দাঁড়িয়ে মাটির পাত্রটাকে হাতে তুলে নিলো রাহুল।

খবরটা দিয়েছিল বিপ্রতীপ। সকালবেলা হঠাৎ ফোন করে বলেছিল, “অনি একবার শ্রীরামপুরে আসতে পারবি? কাজের মাসি এসে বারবার ডাকলেও সাড়া দিচ্ছে না তোর বাবা।”

বুড়োটা আবার জ্বালাচ্ছে! মনে মনে বিরক্ত হলেও বিপ্রতীপের ফোন পাওয়ার পর আরও একবার অফিস ছুটি নিয়ে শ্রীরামপুর যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না রাহুলের।

রাহুল সেখানে পৌঁছনোর পর বাড়ির দরজা ভেঙে উদ্ধার করা হয় খাবার টেবিলের একটু দূরে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা বাবার নিথর দেহটা।

তখনও তাঁর পাশে গড়াগড়ি খাচ্ছে একটা খালি বাংলার বোতল আর এক বাণ্ডিল বিড়ি।

কী হয়েছে বুঝতে বাকি ছিল না কারুরই। তবুও ডাক্তারের সার্টিফিকেট নিয়ে শ্মশানে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কিন্তু সেখানেও লাইন পিছু ছাড়ছিল না ওদের।

ভাগ্যিস ইলেকট্রিক চুল্লীটা ছিল!

 

শ্মশানে রয়েছে দুটো চুল্লী। সেগুলো আবার একটা ঘরের মধ্যে। চুল্লীর পিছনে অস্থি নিয়ে বেরোবার জন্যে রয়েছে একটা ছোট্ট দরজা। দরজার পিছনে বয়ে চলেছে গঙ্গা। বাবার অস্থিটা হাতে নিয়ে ডোমের নির্দেশে দরজার দিকে পা বাড়াল রাহুল। বাইরে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে। নদীর ধারের গাছগুলোতে ডেকে চলেছে হাজার হাজার পাখির দল।

গতকাল মাঝরাতে বৃষ্টি নেমেছিল। এখনও পিছল হয়ে আছে নদীর ধারে যাওয়ার রাস্তাটা। আস্তে আস্তে পা ফেলে রাহুল পৌঁছে গেল ঘাটে। এখান থেকে কয়েকটা সিঁড়ি সোজা নেমে গেছে গঙ্গা অবধি।

পুরোহিতের পিছন পিছন সেই সিঁড়িগুলো বেয়ে নীচে নেমে এলো রাহুল।

গতকাল রাতে বৃষ্টি হলেও আকাশ আজ সকাল থেকেই পরিষ্কার। অস্থি নিয়ে নদীর কাছাকাছি পৌঁছে ওই পাড়ের দিকে তাকাল রাহুল। শ্মশানের বিষণ্ণতা এই পাড়টাকে যতই আচ্ছন্ন করে রাখুক না কেন, ওইপাড়ে জীবন বয়ে চলেছে নিজের গতিতে। রাহুলের দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল সেদিকে। হঠাৎ তার কানে এলো পুরোহিতের কণ্ঠস্বর, “এবার আপনাকে অস্থি বিসর্জন করতে হবে।”

রাহুল কিছু বলল না। মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন পুরোহিত। মন্ত্রপাঠ শেষে পুরোহিতের নির্দেশে নদীর উলটো দিকে তাকিয়ে রাহুল তার বাবার অস্থি নিক্ষেপ করল গঙ্গায়।

হিন্দুদের এ বড় অদ্ভুত নিয়ম! বিদায়বেলায় একবার শেষ দেখাও দেখা যাবে না পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যাওয়া মানুষটার দিকে। মায়ের বেলায় বড় কষ্ট হয়েছিল রাহুলের। অস্থি গঙ্গায় ফেলে দিয়ে উঠে আসার সময় বারবার তার মনে হচ্ছিল মা দাঁড়িয়ে আছে পিছনে।

হয়তো গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে চলেছে আপনমনে!

কিন্তু বাবার জন্যে ভালোবাসার এক বিন্দুও নেই বলেই হয়তো সেই শূন্যতার অনুভূতি ছুঁতে পারছিল না রাহুলকে।

তার বদলে অন্য একটা চিন্তা আষ্টেপিষ্টে জাপটে ধরতে শুরু করেছিল তাকে।

এতদিন ধরে বয়ে চলা পাপে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল পৃথিবীর বুক থেকে!

১০

চানাচুর আর চিকেন টেংরি কাবাবের সঙ্গে উড়ে গেছে প্রথম বোতলটা। পলাশ হ্যানিকেন বিয়ারের দ্বিতীয় বোতলটা খুলে সেখান থেকে অর্ধেকটা ঢেলে দিল অনিকেতের গ্লাসে। দেশে ফেরার আগে থেকেই ম্যাসেঞ্জারে আর হোয়াটসঅ্যাপে বারবার অনিকেতকে পিং করেছিল সে। ফিরে যাওয়ার আগে একদিন বসতে চায় অনিকেতের সঙ্গে।

বেশ কয়েক বছর আগে ইউএসএ-তে যাওয়ার আগে পলাশ ওর বন্ধুদের একটা পার্টি দিয়েছিল কলকাতার চায়না টাউনে। সেবার মদের ফোয়ারা চলেছিল। অনিকেত জানত পলাশের সঙ্গে বসা মানে আবার মদের ফোয়ারা চলবে। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা সামলে সে এবার সময় বার করতে পারছিল না কিছুতেই। এদিকে পলাশের বন্ধুবৃত্তের মধ্যে এখনও অনিকেতই একমাত্র রয়ে গেছে কলকাতায়। শেষ পর্যন্ত পলাশ ফিরে যাওয়ার আগের দিন দুপুর আর বিকেলটা ফ্রি করতে পেরেছে অনিকেত।

দশতলার ব্যালকনিতে পাতা হয়েছে একটা প্লাস্টিকের টেবিল। টেবিলের দু’পাশে রাখা দুটো প্লাস্টিকের চেয়ারে মুখোমুখি বসেছিল সে আর পলাশ। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি হলেও সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে বলেই বোধহয় গরম নেই একদমই। ইউএসএ-তে যাওয়ার পর প্রথমবার দেশে ফিরে পলাশ নিউটাউনের এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল।

রিটায়ারমেন্টের পর গুড়াপে পৈতৃক বাড়িতে ফিরে না গিয়ে সে নাকি এসে উঠবে এখানে!

তবে পলাশের ফিউচার প্ল্যান নিয়ে কোনও উৎসাহ নেই অনিকেতের। গ্লাসে ঢালা বিয়ারটাতে আলতো চুমুক দিল সে। পলাশও ওর সঙ্গে টেনে চলেছে একই দমে। সেও গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে হাত বাড়াল টেবিলের এক কোণায় রাখা হটপটটার দিকে। সেখান থেকে দু’পিস মটন বার করে চালান করে দিল অনিকেতের প্লেটে।

কলকাতার এক বিখ্যাত রেস্টুরেন্টের রেওয়াজি খাসি। কিছুক্ষণ আগেই জোম্যাটোতে অর্ডার করে আনিয়েছে পলাশ। হটপটটার জন্যে এখনও গরম রয়ে গেছে পিসগুলো। সেটাতে আলতো করে কামড় দিয়ে ফের গলায় একটু ঠাণ্ডা বিয়ার ঢালল অনিকেত। নেশাটা যেন চেপে ধরতে শুরু করেছে একটু একটু করে। পলাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “খাসা বানিয়েছে কিন্তু।”

সামান্য হাসল পলাশ, “হুঁ, তোর জন্যই তো আনালাম। কলজেই তো দেখেছি তুই মটন খেতে ভালবাসিস।”

কথাটায় মিথ্যা কিছু নেই। সামান্য হাসল অনিকেত। তারপর গ্লাসটা তুলে নিয়ে পড়ে থাকা বাকি বিয়ারটা গলায় ঢালল সে।

“দাঁড়া আরও দুটো বোতল আছে। নিয়ে আসছি।” অনিকেতের উত্তর না শুনেই উঠে ঘরের ভিতরে চলে গেল পলাশ। ফ্ল্যাটে একটা ছোট্ট রেফ্রিজারেটর আছে। সেখান থেকে একটা বোতল বার করে নিয়ে এসে খানিকটা বিয়ার ঢেলে দিল অনিকেতের গ্লাসে।

বিয়ারে চুমুক দিল অনিকেত। বেশ ভালোরকম ঝিম মারতে শুরু করেছে মাথার ভিতরটা। অনিকেত ভাবল এবার থামতে হবে। সে মুখ তুলে তাকাল পলাশের দিকে, “এটাই কিন্তু শেষ। আর নয়।”

“তোর যা ইচ্ছা।” ফের হাসল পলাশ। কিন্তু তারপরেই একটু গম্ভীর হল তার মুখ, “শোন না অনি। তোর একটা হেল্প চাই। পারবি?”

যা পার্টি দিলে পলাশদা! একশবার করব—কথাটা প্রায় জিভের ডগায় এসে গিয়েছিল অনিকেতের। কলেজ লাইফে মদ খেয়ে উলটোপালটা বকলেও চাকরিতে আসার পর অনেক কষ্টে নিজেকে শুধরেছে সে, “হ্যাঁ, পলাশদা বলো।”

“হুঁ,” বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পলাশ বলল, “শোন অনি তোকে একটা সত্যি কথা বলি। স্টেটস ফেরার ইচ্ছা নেই আমার। আর তুই তো জানিস তোর বৌদি জার্মান। এদেশে এসে মানিয়ে নিতে পারবে না। সেইজন্যই তোকে ডেকেছি।”

“তুমি ফিরবে না তো আমাকে কেন ডাকলে?” নেশার ঘোরেও অবাক হল অনিকেত।

“দেখ মা আর বাবাকে বলিনি আর ফিরব না। কিন্তু প্ল্যানটা আমার অনেকদিনের। ওদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যেই ফ্ল্যাটটা কিনেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ফ্ল্যাটটা আটকে রেখে এতগুলো টাকা জ্যাম করে রাখারও কোনও মানে হয় না। তাই বেচে দেব ভাবছি।”

“সে তো তোমার সিদ্ধান্ত পলাশদা।” ফের অবাক হল অনিকেত, “তুমি আমাকে বলছ কেন?”

“বলছি।” অনিকেতের প্রশ্নের উত্তরে সামান্য হাসল পলাশ, “কারণ তোকে দরকার আছে আমার। আমি ফ্ল্যাটটার জন্য অ্যাড দেব। দালালও ধরা আছে আমার। কিন্তু অত দূরে বসে সবকিছু মনিটর করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আর এখানকার দালাল মানে অচিন্ত্যকে পুরো ভরসা করতে পারছি না। তো আমি বলছি তোর যদি আপত্তি না থাকে আমি তোর নাম্বারটা দিয়ে যাব অ্যাডে এবং অচিন্ত্যর কাছে। অচিন্ত্যর নাম্বারও থাকবে তোর কাছে। মালিক হিসাবে যদি ফিজিক্যাল প্রেজেন্সের দরকার হয় তাহলে তোকেই আসতে হবে। মানে তেমন যদি কিছু দরকার পড়ে তবেই। তোকেই বলছি বাধ্য হয়ে। আর তো সেরকম কেউ এখন আর এখানে নেই।”

কলেজ লাইফ থেকেই কম্পিউটার, ইন্টারনেট এইসব বিষয়ে পলাশের জ্ঞান ছিল অসাধারণ। ওর কাছ থেকেই একসময়ে সাইবার হ্যাকিং শিখেছিল অনিকেত। হয়তো গুরুদক্ষিণা হিসাবেই এইটুকু সাহায্য চাইছে পলাশ। না এমনিতেই করত না অনিকেত। কিন্তু পলাশের প্রস্তাব শুনে হঠাৎ অনিকেতের মনে পড়ল এখানে ঢোকার মুখে সিকিউরিটিটার কথা।

পলাশের অ্যাপার্টমেন্টটা একটা কমপ্লেক্সের অংশ। সব মিলিয়ে চারটে বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট আছে এখানে। কমপ্লেক্সের মেন এন্ট্রান্সে চেয়ার পেতে একটা বুড়ো লোক বসে থাকে সবসময়। লোকটা এখানকার সিকিউরিটি। ক্যাব থেকে নেমে প্রথমে এই লোকটাকেই দেখতে পেয়েছিল অনিকেত। বেলা তিনটের সময়েই কীরকম লাল হয়ে আছে তার চোখ দুটো!

ক্যাবটা ওদের নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল রাস্তার ওপারে। এখানে রাস্তাটা খুব চওড়া না হলেও গাড়ি চলে অনবরত। এইসব জায়গায় রাস্তা পেরোতে হয় খুব দেখেশুনে। কিন্তু রাস্তা নয়, অনিকেত তাকিয়েছিল লোকটার চোখের দিকে। পলাশ বুঝতে পেরেছিল অনিকেত কী দেখছে। তাকে ছোট্ট একটা কনুইয়ের খোঁচা মেরে ফিসফিস করে সে বলেছিল, “বুঝলি অনি সকাল থেকে মালটা গাঁজা খায়। আমি নিজের চোখে দেখেছি।”

“সত্যি! কিন্তু এরকম লোককে রেখেছে কেন?”

“তুই কি কিছুই বুঝিস না!” ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসেছিল পলাশ, “চল এসব ফালতু কথায় কাজ নেই। রাস্তাটা পার হই।”

কথাগুলো মনে পড়তেই চকচক করে উঠল অনিকেতের মুখটা, “সে হয়ে যাবে পলাশদা। তোমার চিন্তা নেই। কিন্তু কাজটা করে দেওয়ার জন্যে আমিও তোমার কাছ থেকে একটা জিনিষ চাইব।”

“বল,” আলতো হাসল পলাশ, “কী চাস?”

“তেমন কিছু নয়। উত্তর দিল অনিকেত, “তোমার ফ্ল্যাটের চাবিটা। যতদিন না বিক্রি হচ্ছে এখানে মাঝে মাঝ মাল খেতে আসব। বারে মালের দাম তো রোজই বাড়ছে। আশাকরি মাল খেতে এলে তোমার আপত্তি থাকবে না। আর অচিন্ত্যও আমাকে বিরক্ত করবে না।”

“ধুস। ও তোকে বিরক্ত করবে কী রে? আমি এমনিতেও তোকে আমার ফ্ল্যাটের চাবিটা দিয়ে যেতাম। কখন কী দরকার হয়।”

পলাশ পকেট থেকে একটা চাবি বার করে এগিয়ে দিল অনিকেতের দিকে। সেটাকে নিজের জিম্মায় চালান করতে করতে অনিকেতের ঠোঁটে ফুটে উঠল একটা চোরাগোপ্তা হাসি, যার হদিশ আদৌ পেল না পলাশ।

১১

স্মোকিং জোন। কাজের ফাঁকে যারা সিগারেট খায় তাদের জন্যে বরাদ্দ আছে জায়গাটা। আটতলার উপর খোলা ছাদের মত এই জায়গাটা বাকি সব অফিস স্টাফের মত ঋকেরও বড় প্রিয়। এখানে দাঁড়ালে যে কেবল সিগারেট খাওয়া যায় তাই নয়, দু’চোখ ভরে দেখাও যায় বেঙ্গালুরু শহরটাকে।

সিগারেটে টান দিতে দিতে ঋক তাকিয়েছিল শহরটার দিকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেঙ্গালুরুকে যতই পলিউটেড মনে হোক না কেন, আটতলার উপর থেকে এই শহর এখনও সবুজে ঢাকা।

এত সবুজ যে কোনও মেট্রোতে পাওয়াই বেশ কষ্টকর।

একনাগাড়ে সবুজের সমারোহের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ঋকের মনে পড়ে গেল যূথিকার কথা।

প্রায় কুড়ি দিন তার কোনও যোগাযোগ নেই মেয়েটার সঙ্গে!

চাইলেই সে ফোন করতে পারত যূথিকাকে। কিন্তু ঋক করেনি। নিজের ভালোবাসাটাকে কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়ার তাগিদটা বেঙ্গালুরুতে এসেই অনুভব করতে শুরু করেছিল সে। তার আগে বইমেলা থেকে বর্ষাকালের মাঝামাঝি, সময়টুকু কেটে গিয়েছিল স্বপ্নের মত।

তার কারণ যূথিকা।

ঋক আর যূথিকার প্রথমবার মুখোমুখি দেখা হয়েছিল বইমেলায়। এক মঙ্গলবার দুপুরে একাই মেলাতে এসেছিল সে। ওদের দু’জনের পরিচয়ের কারণ ঋকের নতুন লেখা উপন্যাস। ছোটবেলা থেকে ঋক বইপোকা। অনেক দিন ধরে লেখালেখিও করে ফেসবুকে। সেই সুবাদে আগেই একটা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল তার। তার উপর বইমেলায় প্রকাশিত হওয়ার আগে নিজের উপন্যাসটা নিয়ে ফেসবুকে বিস্তর মার্কেটিংও করেছিল ঋক। এমবিএ করা ঋকের কাছে ব্যাপারটা খুব অভিনব না হলেও সেই মার্কেটিং কিন্তু তাকে জুটিয়ে দিয়েছিল আরও অনেক নতুন পাঠক আর পাঠিকা।

যূথিকা ছিল তাদের মধ্যেই একজন।

অন্য সব পাঠক বা পাঠিকারা আসে, বই কেমন লাগল জানায়, তারপর হারিয়েও যায় কিছুদিন পরে। নতুন করে তাদের দেখা আবার পাওয়া যায় কোনও নতুন লেখা প্রকাশিত হওয়ার পরেই।

কিন্তু যূথিকার বেলায় তা হয়নি।

অন্যের বউ হয়েও মেয়েটা ঢুকে গিয়েছিল তার জীবনের গভীরে।

যূথিকা তার অত্যাচারী বরের কথা আর নিজের জীবনের দুঃখের কাহিনী শুনিয়ে ঋকের মন জয় করেনি। কয়েকদিন ওর সঙ্গে মেশার পরেই ঋকের মনে হয়েছিল যূথিকা এমন একটা মেয়ে যার প্রেমে পড়া যায় বারবার।

ঋকের মনে হত হতভাগ্য তো সেই পুরুষ, যে যূথিকার ভালোবাসা পায় না।

যূথিকার ভালোবাসার ডাকেই সাড়া দিয়েছিল ঋক। ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতম হয়েছিল তাদের সম্পর্ক। প্রথম প্রথম ওরা দেখা করতে কোনও রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফেতে। কিন্তু ভালোবাসা যত জমাট হচ্ছিল তত প্রয়োজন বাড়ছিল একান্ত ব্যক্তিগত কোনও জায়গার। হাওড়ায় নিজের রক্ষণশীল বাড়িতে একজন বিবাহিত মেয়েকে নিয়ে ঋক যেতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু কলকাতা শহরের আনাচেকানাচে বেশ কয়েকটা ছোটবড় হোটেল আর লজে কত ব্যক্তিগত সময় যে ওরা কাটিয়েছে তার হিসাব নেই।

যূথিকার শরীর ছিল পালকের মত। ওর সঙ্গে সঙ্গমের সুখও ছিল অপার্থিব। তবুও একটা অপরাধ বোধ তাড়া করে বেড়াত ঋককে।

হাজার হোক, যূথিকা তো অন্যের বিয়ে করা বউ।

কখনও বা একটা আশঙ্কাও ঘিরে ধরত তাকে।

মেয়েটা ওকে ব্যবহার করে নিজের শরীরের চাহিদা মেটাচ্ছে না তো?

হঠাৎ বেঙ্গালুরুতে একটা নতুন চাকরি পাওয়ার পর সেই ভাবনাগুলোতে শান দেওয়ার একটা সুযোগ পেয়েছিল ঋক।

তাই ইচ্ছা করেই একটা নতুন ফোন কিনে সে অফ করে দিয়েছিল কলকাতার নাম্বার দুটো, যেগুলো রয়েছে যূথিকার কাছে।

গায়েব হয়ে গিয়েছিল ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ থেকেও। এমনকি একবারের জন্যে ঢোকেনি তাদের স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও, যেখানে দিনে একবার না ঢুকলে আগে রাতে ঘুম আসত না তার।

যূথিকার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে ঋক নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল কলকাতার চেনা পৃথিবী থেকেও। কোথা থেকেও তার খবর যেন না পেয়ে যায় মেয়েটা।

ঋক ভেবেছিল ভালোবাসাটা সত্যিকারের হলে এর মধ্যে কিছুতেই তাকে ভুলে যাবে না যূথিকা।

এখন ঋক জানে যূথিকা তাকে মিস করেছে। এই ক’দিন মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঋক যখন তার মোবাইলটা অন করেছে তখনই মিস কল অ্যালার্টে ঢুকেছে যূথিকার নাম।

শেষ কলটা এসেছিল দিন কয়েক আগে।

একবার নয় বেশ কয়েকবার।

ব্যাপারটা বড় শান্তি দিয়েছে তাকে। চাইলে তখনও যূথিকাকে ফোন করতে পারত ঋক।

কিন্তু আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করে গেছে সে।

ঋক বিশ্বাস করে অপেক্ষাতেই আরও জমাট বাঁধে ভালোবাসা।

কিন্তু আজ যূথিকার সঙ্গে কাটানো সময়টা সত্যিই দু’হাত তুলে ডাকছে তাকে। হঠাৎ ঋকের মনে হল আর সে অপেক্ষা করতে পারবে না। এখন জায়গাটা বেশ ফাঁকা হয়ে আছে। কেউ নেই চারপাশে। তাছাড়া এটাই তো আদর্শ সময় যূথিকাকে ফোন করার। দুপুরবেলায় বাড়িতে থাকে না ওর বরও।

ঋকের পকেটে এখন দু’খানা ফোনই থাকে। পকেট ঘেঁটে পুরনো মোবাইলটা বার করে ঋক অন করল সেটাকে। তারপর দুরুদুরু বুকে ঋক ডায়াল করল যূথিকার নাম্বার।

কে জানে এতদিন পর ফোন পেয়ে কত অভিযোগই না করবে মেয়েটা!

মেয়েটাকে কী অজুহাত দেবে সেটা মনে মনে সাজিয়েও নিচ্ছিল ঋক।

কিন্তু একবার নয় দু’বার রিং হয়ে লাইনটা কেটে গেলেও ওপাশ থেকে ফোন ধরল না কেউই।

১২

একী অদ্ভুত আবদার ছেলেটার!

অবাক হলেও মুখের হাসিটা ধরে রাখল যূথিকা। পাশে বসে থাকা অনিকেতের ঊরুতে হাত রেখে সে বলল, “কিন্তু কেন?”

“তোমায় যদি একটু দেখতে চাই, তাহলে কি তুমি না করবে? আগের দিন তো…”

কথাটা শেষ করতে পারল না অনিকেত। তার আগেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল তার মুখ।

এরকম অভিব্যক্তি মেয়েদের ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক হলেও ছেলেদের জন্যে নয়।

কিন্তু গতবার যা কাণ্ড হয়েছিল!

ছেলেটাকে একেবারে বশ করে ফেলেছিল যূথিকা। কলের পুতুলের মত সে শুনে যাচ্ছিল তার কথা। ওর নগ্ন শরীরটার উপর নিজের ইচ্ছা মত খেলা করেছিল যূথিকা। প্রতিবার তার আঙুলের ছোঁয়ায় ঘন হচ্ছিল ছেলেটার প্রতিটি নিঃশ্বাস, সঙ্গে নতুন করে জেগে উঠছিল তার প্রতিটি রোমকূপ। সেদিন ছেলেটার শরীরের উপর খেলা করতে করতে পুরুষ দেহটাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল যূথিকা।

এত আবেগে ভেসে যায় একজন পুরুষের শরীরও!

এর আগে আরও দু’জন পুরুষের সঙ্গে বিছানা ভাগ করে নিলেও পুরুষের শরীরের এই রহস্য তো অধরাই ছিল যূথিকার চোখে।

কিছুক্ষণ অনিকেতের শরীরের উপর খেলা করার পর নিজের নাইটিটাকে খুলে বিছানার এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যূথিকা হাত বাড়িয়েছিল ছেলেটার তলপেটের দিকে।

কেটে গিয়েছিল আরও কিছুটা সময়। সেদিন ব্রা পরেনি যূথিকা। তবে নাইটিটা খুলে ফেললেও প্যান্টিটা খোলেনি সে। অনিকেতের পৌরুষের জ্বলন্ত লাভা ওর যোনিকে নয়, নিভে গিয়েছিল হাতদুটোকে ভিজিয়ে দিয়েই।

বয়সে খানিকটা ছোট বলেই সেদিন ওকে সমস্ত সুখ একবারে দেয়নি যূথিকা। চেয়েছিল ছেলেটা বারবার ছুটে আসুক তার কাছে। ওর শরীরটা ভীষণ দরকার তার।

বিশেষ করে যতদিন না ঋকের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হচ্ছে।

এখনও ডিভোর্সের নাম না নিলেও আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে রাহুল। এটা কোনও ঝড়ের পূর্বাভাস কিনা যূথিকা জানে না। কিন্তু তার অবুঝ মন বলে এবার নিশ্চয়ই রাহুলও ভাবছে তাকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা। সেই কারণেই আজকাল আগের থেকে একটু হলেও বেশি চনমনে থাকে যূথিকা। তার সেই চনমনে ভাবটা আরও বেড়ে গিয়েছিল গতকাল দুপুরে, অনিকেতের ফোন পাওয়ার পর।

লাঞ্চ করে তখন সবে একটু শুয়েছে যূথিকা। ঠিক এই সময়েই তাকে ফোন করেছিল অনিকেত। সে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এসেছিল ছেলেটার গলা, “যূথিকা। একটা রিকোয়েস্ট করবো। তোমায় খুব মিস করছি। কাল দুপুরে একবার আসতে পারবে?”

লম্বা লম্বা শ্বাস পড়ছে। ছেলেটা যে খুব উত্তেজিত তা বোঝা যাচ্ছে খুব ভালো করেই। ওর গলা শুনে ভিতরে ভিতরে একটা ছটফটানি অনুভব করেছিল যূথিকাও। কিন্তু তখনও অসম্ভব শান্ত ওর কণ্ঠস্বর, “কোথায় আসব?”

“নিউটাউনে আমার এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে। চিন্তা নেই ও এখানে থাকে না। কয়েকদিন আগেই স্টেটসে চলে গেল। ওর ফ্ল্যাটের চাবিটা হাতে এসেছে। হাত করে নিয়েছে সিকিউরিটিকেও। ওর বাবা আর মা এখন থাকে গুড়াপে। এটুকু গ্যারেন্টি দিতে পারি কেউ কোনওভাবে বিরক্ত করবে না।”

সিকিউরিটিকে হাত করে নেওয়া যে খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয় তা জানে যূথিকা। আর ফ্ল্যাট মানে তো অনেক নিরাপদ। কারুর চোখে পড়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

যূথিকার ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়েছিল দুষ্টু একটা হাসি, “তুই না… আচ্ছা যাব।”

“ঠিক আছে। ঠিক দুপুর বারোটা। অবনীন্দ্রনাথের বাগানবাড়িটার ওখান থেকে তোমায় পিক করে নেব।”

ফোন কেটে দিয়েছিল অনিকেত। নিজের বাইকে করেই যূথিকাকে সে নিয়ে এসেছে বিশাল এই অ্যাপার্টমেন্টটাতে। দশতলা অ্যাপার্টমেন্টটা যথেষ্ট বিলাসবহুল হলেও কেমন ফাঁকা ফাঁকা। দেখে মনে হয় কেউ থাকে না আশেপাশে।

লিফটে করে উপরে উঠে এসেছিল ওরা দু’জন।

সেখান থেকে সোজা ফ্ল্যাটের বেডরুমে।

বেডরুমের বিছানায় ওরা বসে আছে পাশাপাশি।

অনিকেতের চোখের দিকে তাকিয়ে যূথিকা দেখল অসীম আগ্রহে ছেলেটা তাকিয়ে আছে তার দিকে।

একজন ছেলের পক্ষে একজন মেয়েকে এরকম প্রস্তাব দেওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।

তার উপর ছেলেটা তো ভিডিও কলিং-এ তাকে করতে বলেনি ব্যাপারটা।

যূথিকা হাত রাখল অনিকেতের মাথায়। আঙুলগুলো আলতো করে তার চুলে চালিয়ে দিতে দিতে সে বলল, “চল, আমি রাজি।”

চকচক করে উঠল অনিকেতের চোখ দুটো। সে উঠে গিয়ে দাঁড়াল দেওয়ালের পাশে। আর যূথিকাও বিছানার উপর হাঁটু মুড়ে বসে সরিয়ে ফেলল তার শাড়ির আঁচল।

একটু একটু করে অনিকেতের সামনে নগ্ন হবে সে।

দু’চোখ ভরে অনিকেতকে উপভোগ করতে দেবে তার সৌন্দর্য।

যূথিকা শুধু জানতে পারল না দুটো জিনিস। অনিকেতের শার্টের পকেটে রাখা পেনটার মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকা একটা লেন্স অনিকেতের মতই নিঃশব্দে দেখে চলেছে তাকে। আর ভাইব্রেট করে চলেছে তার ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যে সাইলেন্ট মোডে রাখা মোবাইলটা।

তাকে ফোন করেছে ঋক।

রাহুলের হাতে চড় খাওয়ার পর যার কথাই সবথেকে বেশি মনে পড়ছিল যূথিকার।

১৩

বাসটা তাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে অফিসের সামনে। ঝকঝকে কাচের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকেই অনিকেত দেখল গ্রাউন্ড ফ্লোরেই দাঁড়িয়ে আছে লিফটখানা। দরজাটা খোলা। অফিসের লিফটে সবসময় একজন লিফটম্যান থাকে। খোলা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছিল নতুন কোনও যাত্রীর। বাস থেকে নামার ঠিক আগেই একটা ম্যাসেজ ঢুকেছিল অনিকেতের ফোনে। সেটা দেখতে গিয়েই সে দেখেছিল দশটা বাজতে আর মিনিট পাঁচেক বাকি। হাতে তো আর সময় নেই বললেই চলে! বাস থেকে নেমেই দৌড় লাগিয়েছিল অনিকেত। অফিসে ঢোকার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই স্পিডটা একটু কমে গেলেও লিফট অবধি পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগল না তার। লিফটের ভিতরে পা রেখেই লিফটম্যানের উদ্দেশে ছোট্ট একটা নির্দেশ ছুঁড়ে দিল অনিকেত, “সিক্সথ ফ্লোর।”

উপরে ওঠার মত আর কোনও যাত্রী নেই। তবুও অনিকেতের নির্দেশ পেয়ে আর অপেক্ষা করল না লিফটম্যান। একটা বোতাম টিপতেই দরজা বন্ধ হয়ে গিয়ে লিফটটা উঠতে আরম্ভ করল উপরে।

মাসের শেষদিনে অফিসে আসার কোনও প্ল্যান ছিল না অনিকেতের। দেখতে গেলে রোজের মত সকাল আটটার সময়ে বাইক নিয়ে বেরোবারও কোনও তাড়া ছিল না তার। সন্ধের পর দুটো ভিজিট আছে। অনিকেত ভেবেছিল আজ নিজের মত করে কাটাবে দিনটা। সাড়ে এগারোটার পর ফোন করবে যূথিকাকে।

মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা খুব দরকার!

অনিকেত আর যূথিকার শেষবার দেখা হয়েছিল পলাশের ফ্ল্যাটে। অনিকেতের হিসাবে সেই দিনটা তার জীবনের সেরা দিনগুলোর একটা। সেদিন যূথিকা যেন এসেছিল তার চাহিদাগুলোকে পূরণ করার জন্যেই। অনিকেতের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হওয়ার পর ওর ইশারাতেই পিছন দিকে ঘুরে গিয়েছিল সে। কিছুক্ষণ পর আবার অনিকেতের দিকেই মুখ ফিরিয়েছিল যূথিকা।

অনিকেত তখন দু’চোখ ভরে উপভোগ করছে যূথিকার সৌন্দর্য। তার হুঁশ ফিরেছিল যূথিকার হাতের ইশারায়।

সে অনিকেতকে ডাকছে তার দিকে।

অনিকেতের লুকনো ক্যামেরায় ততক্ষণে বন্দি হয়ে গেছে যূথিকার পুরো শরীর। ক্যামেরায় নিজেকে নগ্ন দেখার কোনও ইচ্ছা ছিল না অনিকেতের। তাই যূথিকার ডাকে সাড়া দেওয়ার আগেই অনিকেত খুলে ফেলেছিল তার শার্টখানা। দেওয়ালে টাঙানো হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দিয়েছিল সেটাকে।

জামার পকেটে রাখা ক্যামেরার মুখটা তখন ঘুরে গেছে দেওয়ালের দিকে।

যূথিকা নগ্ন হয়েছিল বিছানাতে বসেই। অনিকেতও উঠে পড়েছিল সেখানে। প্যান্টের ভিতরে তার পৌরুষ জাগতে শুরু করেছিল অনেক আগেই। সেদিকে তাকিয়ে হেসেছিল যূথিকা। আগের দিনের মতই তার হাতেই উদোম হয়েছিল অনিকেত। কিন্তু এরপর যূথিকা ঝাঁপিয়ে পড়েনি তার উপর। বরং পুরোপুরিভাবে সঙ্গ দিয়েছিল রতিক্রীড়ায় অনভিজ্ঞ অনিকেতকে। ওইদিন অনিকেতের হাত খেলা করেছিল যূথিকার শরীরের আনাচে কানাচে। নরম পেলব ওই শরীরের মধ্যে একজন পুরুষকে দেওয়ার মত কতটা সুখ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা যূথিকার শরীরের উপরে শুয়ে তার বুকে মুখ ঘষতে ঘষতেই অনুভব করেছিল অনিকেত। যূথিকার হাত দুটো তখন জাপটে ধরে আছে অনিকেতকে। শেষ পর্যন্ত চিত হয়ে শুয়ে নিজের ভাঁজ করা ঊরু দুটোকে আস্তে আস্তে ডানার মত মেলে দিয়েছিল যূথিকা।

এই কাজটা একটু আগে ক্যামেরার সামনেও করেছিল সে। তখন অনিকেত ছিল নিশ্চল। কিন্তু এত কাছ থেকে নারীদেহের গোপনতম উপত্যকাকে দেখতে পেয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারেনি অনিকেত।

প্রথমদিন না পারলেও দ্বিতীয়দিনই কেনা কনডমের সদ্ব্যবহার করে ফেলেছিল সে।

ওই দিনটার পর থেকেই কেবল শরীর নয়, একটা অন্যরকম টান সে অনুভব করতে শুরু করেছে যূথিকার প্রতি। তার প্রতিটা মুহূর্তই হয়ে উঠেছে যূথিকাময়।

এই অনুভূতিটার নামই হয়তো ভালোবাসা!

কিন্তু ওখান থেকে ফেরার পরেই হঠাৎ বদলে গিয়েছে মেয়েটা। এর মধ্যে অনিকেত একদিন যূথিকাকে নিয়ে ফের পলাশের ফ্ল্যাটে আসতে চাইলেও সে রাজি হয়নি। তার উপর ম্যাসেজ বা ফোন কোনও কিছুতেই সে ঠিকমত সাড়া দিচ্ছে না অনিকেতকে।

এত কিছুর পরেও কিন্তু অনিকেত কিছুতেই রাগতে পারছিল না যূথিকার উপরে। তার বদলে একটা ভয় একটু একটু করে জমা হচ্ছিল ওর বুকের ভিতরে।

আর সেটাই বাড়িয়ে দিয়েছে আজ সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা।

তখন সকাল সাড়ে ছটা বাজে। ঘুম থেকে উঠে অভ্যাসত নিজের মোবাইলটা অন করেছিল অনিকেত। এই সময়ে কোনও অফিসিয়াল কল তো দূরে থাক, এমনি কোনও ফোনও আসে না তার। কিন্তু আজ অন হওয়ার পরেই বেজে উঠেছিল ফোনটা।

এই সময়ে ফোন! অবাক হয়েছিল অনিকেত। ফোনটা হাতে নিতেই আরও একবার চমকে উঠেছিল সে।

অসময়ে তাকে ফোন করেছে রাহুল!

এ মাসের টার্গেট পুরো হয়ে গেছে গতকালই। গতকাল রাত দেড়টা অবধি কাজ করে তার ডিটেল সবকিছু পাঠানোও হয়ে গেছে রাহুলের কাছে। প্রতিমাসে একই কাজ করছে অনিকেত। সে খুব ভালো করে জানে তার রিপোর্টে কোনও ভুল নেই। সেইজন্য ডিসপ্লেতে রাহুলের নাম দেখে ধড়াস করে উঠেছিল অনিকেতের বুকটা।

সে যে ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই কি তাহলে সত্যি হয়েছে!

তার যূথিকার ভিতরে ঘটে যাওয়া সবকিছু জেনে গেছে রাহুল?

তার হৃদযন্ত্রের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল ফোনের ওপার থেকে বলা রাহুলের ছোট্ট একটা কথা, “আজ সকাল দশটায় অফিসে আমার সঙ্গে দেখা করবি।”

কেন? জিজ্ঞেস করতে গিয়েও পারেনি অনিকেত। ভয়টাকে জোর করে গিলে নিয়ে গম্ভীর গলায় সে উত্তর দিয়েছিল, “ঠিক আছে দাদা। আমি পৌঁছে যাব।”

লিফটটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যেতেই অনিকেত সামনের দিকে তাকাল। ডিজিটাল ডিসপ্লেতে দেখাচ্ছে সিক্সথ ফ্লোর। কর্পোরেট অফিস বলতে যা বোঝায় অনিকেতদের অফিসটাও তাই। কোম্পানিটা বিদেশি হলেও ভারতের বাজারের অনেকটাই ধরে রেখেছে। ওদের অফিসটাও তাই ঝাঁ চকচকে। দেখলে যে কেউ ফাইভস্টার হোটেল বলে ভুল করতে পারে। রোজ দেখলে জায়গাটাকে কতটা ভালো লাগবে তা বলা মুশকিল, কিন্তু মাঝেমধ্যে এখানে আসলে এমনিতেই মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। তবুও অনিকেত অনুভব করছিল একটা অজানা ভয় ছায়ার মত অনুসরণ করছে তাকে। হাওড়া থেকে এসি বাসে করে এসে টুক করে সেন্ট্রাল এসির মধ্যে ঢুকে পড়লেও তার কপালে জমতে শুরু করেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজের ভয় লুকিয়ে রাখাই দস্তুর। কাজটা খুব ভালো করে না করতে পারলে অনেক রকম হয়রানি তো পেতেই হয়, এমনকি যেতে পারে চাকরিটাও। তাই নিজের ভিতরে হয়ে চলা অস্বস্তিটাকে জোর করে হজম করে লিফট থেকে নেমে এলো অনিকেত। সামনে করিডোরটা ধরে খানিকটা এগোতেই সে দেখতে পেল ঘরটা।

ঘরের দরজার সামনে লেখা আছে ছোট্ট দুটো লাইন।

“রাহুল মিত্র।

মার্কেটিং ম্যানেজার। ইস্ট জোন।”

এই ঘরটাই রাহুলের। সদ্য কোম্পানি তাকে নিজস্ব একটা কেবিন দিয়েছে। দরজাটা সামান্য ফাঁক করে অনিকেত উঁকি মারল ভিতরে।

সঙ্গে সঙ্গে একটা পাথর নেমে গেল তার বুক থেকে!

কেবিনের ভিতর রাহুল নেই। কিন্তু কেবিনের একপাশে রাখা সোফার উপরে বসে আছে রূপযানী, দিবাকর আর ইকবাল।

অনিকেতের মতই মেডিকেল রিপেজেন্টেটিভ ওরাও।

ক্যাবটা অনিকেতকে নামিয়ে দিল পার্ক স্ট্রীটের একটা বিখ্যাত বারের সামনে। সাড়ে বারোটা বাজে। খানিকটা বিয়ার খেয়ে ট্রেনে আপের ভিড় শুরু হওয়ার আগেই আজ বাড়ি ফিরবে অনিকেত। রাহুল ওদেরকে ডেকেছিল ওদের কোম্পানীর সদ্য লঞ্চ করা ওষুধটার মার্কেটিং-এর জন্যে। কাল সকাল থেকে শুরু হবে ওদের কাজ।

সবকিছু ভালোয় ভালোয় মিটে গেলেও একটা কাঁটাও যেন খচখচ করছিল অনিকেতের মাথার ভিতরে। রাহুলের ব্যবহার আজ তো একদম স্বাভাবিক ছিল।

তাহলেও যূথিকা কেন এমন করছে তার সঙ্গে?

উত্তর জানা নেই অনিকেতের। প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই মুহূর্তে সেটার উত্তর খুঁজতে ইচ্ছা করছিল না তার। কোনও বড় পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট হলে নিজেকে যেরকম হালকা লাগে ঠিক সেরকমই হালকা লাগছিল অনিকেতের। তাকে হাত তুলে ডাকতে শুরু করেছিল বারের মায়াবী পরিবেশ আর বিয়ারের বোতল।

অনিকেত বারের সামনে এসে দাঁড়াতেই সিকিউরিটি খুলে দিল বারের দরজা।

কিন্তু বারের ভিতরে ঢুকতে গিয়েও থমকে গেল অনিকেতের পা দুটো।

সৌজন্যে বারের এক কোণের ছোট্ট একটা টেবিলে ঘটে চলা একটা দৃশ্য।

ওই টেবিলটায় দু’পাশে মুখোমুখি বসে আছে যূথিকা এবং আরও একটা ছেলে। যূথিকা নয়, প্রথমেই অনিকেতের চোখ গেল ছেলেটার দিকে।

একটু খুঁটিয়ে দেখার পরেই ছেলেটাকে চিনতে পারল অনিকেত। এতো ঋক, মানে ঋক বিশ্বাস, ফেসবুকে লেখালেখি করে। ‘আগামী বিশ্ব’ বলে ওর একটা উপন্যাসও বেরিয়েছে গত বইমেলায়, যেটা কিনেওছিল অনিকেত।

ঋকের লেখার ধরণ মনে দাগ কেটেছিল অনিকেতের। অন্য সময় হলে সে হয়তো নিজে গিয়েই পরিচয় করত ঋকের সঙ্গে। কিন্তু এখন যূথিকার মুখোমুখি বসে আছে ছেলেটা। ওদের মাঝখানে রাখা একটা বিয়ারের বোতল। সেটা থেকে পুরো বিয়ারটা গ্লাসে ঢালা হয়ে গেলেও গ্লাস দুটোর দিকে নজর নেই কারুরই। যূথিকা ওর হাত দুটো মেলে দিয়েছে টেবিলের উপরে, আর ছেলেটা নিজের হাত দুটো রেখেছে যূথিকার হাতের উপরে।

কোনও কথা না বললেও দু’জোড়া চোখ নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে।

এই দৃশ্যের মানে বোঝার মত বয়স এবং বুদ্ধি দুটোই আছে অনিকেতের।

সে অনুভব করল হঠাৎ সরতে শুরু করেছে তার পায়ের তলার মাটি।

আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না অনিকেত।

ছিটকে বেরিয়ে এল বার থেকে।

নিজেদের মধ্যে মগ্ন দু’জন নারী পুরুষ তখন জানতেও পারল না যে আরও একজোড়া পরিচিত চোখ দেখে ফেলেছে তাদের।

১৪

বাড়ি ফিরেই ল্যাপটপ চালু করে ইন্টারনেট অন করল অনিকেত। তার বুকের ভিতরে চলছে হাজারো ডাইনোসরের দাপাদাপি।

যে করেই হোক, সত্যটা উদঘাটন করতে হবে তাকে!

পার্ক স্ট্রিট থেকে হাওড়া আসার সময়েই অনিকেত অনুভব করেছিল একটা অসহ্য যন্ত্রণা আস্তে আস্তে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে তার বুকের ভিতর। বাড়ি ফেরা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না বলেই দুপুরের ডাউন শ্রীরামপুর লোকালটা ধরেছিল সে। বসেছিল জানলার ধারে। অসহ্য কষ্টটা ততক্ষণে জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেছে। নিজের প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে তার শীতলতা অনুভব করতে পারছিল অনিকেত।

এ কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে চলেছে সে!

কিন্তু হতাশার সমুদ্রে ডুবতে ডুবতেও মানুষ একটা খড়কুটো পেলেও তাকে আঁকড়ে ধরে ভেসে ওঠার চেষ্টা করে। চেষ্টা করছিল অনিকেতও।

হয়তো পুরোটাই তার মনের ভুল!

হয়তো ওরা দু’জনে ভালো বন্ধু!

কিন্তু কী করে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছবে অনিকেত? প্রশ্নটার উত্তর কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না সে। কিন্তু মানুষ যখন কোনও বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে তখন খুলে যায় তার মস্তিষ্কের গোপন দরজাগুলো। সেখান থেকে উঁকি মারা একটা স্মৃতি অন্ধকারের মধ্যেও একটা আলোর দিশা দেখিয়েছিল তাকে।

বেশ কিছুদিন আগের কথা। একদিন রাত্তিরে ম্যাসেঞ্জারে বসে যূথিকাকে প্রশ্নটা করেছিল অনিকেত, “তুমি হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করো না কেন?”

“তুই কি পাগল হলি অনি? ম্যাসেঞ্জার পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড। আর পাসওয়ার্ড ক্রাক করার ক্ষমতা ওর নেই। অন্যদিকে, ধর আমি আর তুই হোয়াটসঅ্যাপ করলাম। আর বাইচান্স ফোনটা ওর হাতে পড়ল। তোর তো চাকরি যাবেই, আর আমার…”

কথাটা শেষ না করেই কয়েকটা স্মাইলি পাঠিয়েছিল যূথিকা।

ওর কথাগুলো মনে পড়তেই বিদ্যুৎ চমকেছিল অনিকেতের মাথায়।

হ্যাঁ একমাত্র ম্যাসেঞ্জারই পারবে এই প্রশ্নের জবাব দিতে।

এখনও পর্যন্ত অযাচিতভাবে কারুর প্রোফাইলে ঢোকেনি অনিকেত। কিন্তু অনিকেত বুঝতে পেরেছিল সত্যিটা জানতে আজ যূথিকার ফেসবুক প্রোফাইল হ্যাক করা খুব দরকারি।

তখনই মনে মনে পলাশদাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল অনিকেত। ল্যাপটপে ইন্টারনেটটা কানেক্ট হয়ে যেতেই অনিকেত ঢুকে পড়ল সেই নিষিদ্ধ পৃথিবীর সন্ধানে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর সে বুঝতে পারল যে তার কব্জায় এসে গেছে যূথিকার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট।

যূথিকা আর ঋকের ইনবক্সে ঢুকতে খুব বেশি সময় লাগল না অনিকেতের। কিন্তু সেখানে ঢুকে আরও একবার পায়ের তলার মাটি সরে গেল তার।

“তোমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখব আমি।”

“রাহুল নয়, তোমার শরীরের গোপন উপত্যকায় থাকবে কেবল আমার অধিকার।”

“ওয়ানা টু হ্যাভ সেক্স উইথ ইউ বেবি। তুমি ব্যাঙ্গালোর চলে যাওয়ার পর আমি কেবল শুকিয়েই মরে গেছি। শুধু তোমাকে নয়, তোমার শরীরটাকেও ভীষণভাবে মিস করছি।”

গতকাল রাতে যূথিকার পাঠানো শেষ ম্যাসেজটা পড়ার পর অনিকেতের মনে হল কেউ যেন শেষ হয়ে যাওয়া মিনারেল ওয়াটারের বোতলের মত দুমড়ে মুচড়ে তাকে ফেলে দিয়েছে ডাস্টবিনে।

ইনবক্স ঘেঁটে সে তখন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে একবার নয়, দিনের পর দিন কেবল যৌনগন্ধী ম্যাসেজ চালিয়ে গেছে ওরা দু’জন!

১৫

নিজের বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল ঋক।

সারাদিন প্রচুর খাটুনি গেলেও কিছুতেই ঘুম আসছিল না তার।

কয়েকদিন আগেই ঋক কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরুতে ফিরেছে। নতুন চাকরিতে জয়েন করার পর যে এভাবে কলকাতা যাওয়ার সুযোগ এসে যাবে তা ভাবতে পারেনি সে। ঋক দু’দিনের জন্য কলকাতা গিয়েছিল অফিসের কাজেই। কাজটা ছিল একদিনের। আরও একদিন ছুটি সে নিয়েছিল যূথিকার সঙ্গে দেখা করার জন্যে। সেদিন অফিসে দাঁড়িয়ে দু-দু’বার মিসকল হয়ে গেলেও সন্ধেবেলাতেই তাকে ফোন করেছিল যূথিকা।

তাদের সম্পর্কের থেমে যাওয়া চাকাটা আবার ঘুরতে শুরু করেছে তার পর থেকেই।

ঋক জানে বাড়ি থেকে প্রচুর বাধার মুখোমুখি হতে হবে তাকে। তবুও কলকাতায় ফিরে সে যূথিকাকে জানিয়ে দিয়েছে তার সিদ্ধান্ত। পার্ক স্ট্রিটের হোটেল বারে আধঘন্টা কাটিয়ে ও যূথিকাকে নিয়ে গিয়েছিল একটা লজে। ওদের মধ্যে আরও একবার সবকিছু হয়ে যাওয়ার পর সে যূথিকাকে জানিয়েছিল তার সিদ্ধান্ত, “যূথিকা তোমাকেই আমি পেতে চাই আমার জীবনসঙ্গিনী হিসাবে।”

রাহুলের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে সে যূথিকাকে পরামর্শ দিয়েছে আইনি পথে যাওয়ার।

ঋক সবরকমভাবে সাহায্য করবে তাকে।

প্রথমে একটু দোনামনা করলেও, একবার সিদ্ধান্তে আসতে পেরে নিজেকে বড় ভালো লাগছে ঋকের। আর তো কয়েকটা বছরের অপেক্ষা। তারপর একসঙ্গে জীবন শুরু করবে ওরা।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে সেই অনাগত ভবিষ্যতের কথাই ভাবছিল ঋক। সবে রাত এগারোটা । আরও ঘণ্টা দুয়েক পরে অনলাইন হবে যূথিকা। তার ঘুম না আসার আসল কারণ হয়তো সেটাই।

একবার ঘুমিয়ে পড়লে ঘুম ভাঙা যে কতটা মুশকিল তা খুব ভালো করে জানে ঋক।

তবে শুধু যূথিকার সঙ্গে দেখা করাই নয়, ওইটুকু সময়ের জন্য কলকাতা গেলেও তার মধ্যেই ঋক কলেজ স্ট্রিট ঘুরে কিনে এনেছে বেশ কয়েকটা নতুন বই। যতই অনলাইনে বই কেনা যাক না কেন, ঋকের মনে হয় কলেজ স্ট্রিট ঘুরে বই কেনার মজাই আলদা। বইগুলো পড়ে আছে তার মাথার কাছে। ঘুমটাকে তাড়াবার জন্যে সেগুলোর মধ্যে থেকে একটা কল্পবিজ্ঞানের বই হাতে তুলে নিতে যাচ্ছিল ঋক। তার আগেই হঠাৎ বেজে উঠল হোয়াটসঅ্যাপটা।

তার মানে কোনও ম্যাসেজ ঢুকেছে।

বেশ কয়েকটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আছে ঋক। তার মধ্যে একটা অফিসের গ্রুপ। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজ আসে সেখানে। বাধ্য হয়েই বই থেকে চোখ ফিরিয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে পড়ল অনিকেত।

কিছুক্ষণ আগে ডিনারের পরেই সব ম্যাসেজ চেক করেছিল সে। তাই এই মুহূর্তে একটা ছাড়া আর কোনও ম্যাসেজ নেই।

সেটা এসেছে তাদের স্কুলের গ্রুপ থেকে।

এই গ্রুপটা ওদের ব্যাচের নিজস্ব গ্রুপ। স্কুলটা একেবারে বয়েজ স্কুল ছিল বলে এই গ্রুপে কোনও মেয়েও নেই।

ঋকের মনে হয় ছোটবেলার বন্ধুরা মুঠোবন্দি হয়ে আছে গ্রুপটার মধ্যে।

একটা ভিডিও এসেছে। পাঠিয়েছে অর্ঘ্য। এই ছেলেটা মাঝেমধ্যেই গ্রুপে পানু পোস্ট করে। গ্রুপের সবাই তাকে ডাকে পানুবাবা নামে। পঁচাত্তর জনের গ্রুপে অর্ঘ্যর দর্শক নেহাত কম নেই। ওর পানু মানেই তো মেয়েদের শরীরের লুকনো খাঁজ অথবা সঙ্গম। ঋকও অর্ঘ্যর একজন নীরব দর্শক। ভিডিওগুলো ভীষণ উপভোগ করে সে।

যূথিকার শরীর নিয়ে অনেক কিছু করে ফেললেও ওই নেশাটা এখনও যায়নি তার।

ডানহাতের তর্জনীর ছোট্ট ছোঁয়ায় ঋক ঢুকে পড়ল গ্রুপটার মধ্যে। এখনও ডাউনলোড করা হয়নি ভিডিওটা। স্পষ্ট দেখা না গেলেও মনে হচ্ছে কোনও মেয়েরই ছবি। ছবিটার নীচে অর্ঘ্য লিখেছে, “মার্কেটে নতুন। আমি অন্তত আগে পাইনি। তোরা মস্তি কর।”

লেখাটা দেখে উৎসাহ যেন আরও বেড়ে গেল ঋকের। তার তর্জনীর ছোঁয়া পেয়ে ডাউনলোড হতে শুরু করল ভিডিওটা।

কিন্তু তখনও ঋক জানত না কী সাংঘাতিক একটা চমক অপেক্ষা করে আছে তার জন্যে।

ডাউনলোড শেষ হতেই ঋক দেখল ভিডিওর শাড়ি পরা মেয়েটা তার ভীষণ চেনা!

১৬

অফিসের পার্টি মানেই হৈ-হুল্লোড়, দেদার মদ খাওয়া আর অন্যের বউয়ের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করা।

কয়েক পেগ পেটে পরার পর মেয়েগুলোও ছেলেদের প্রতি উদার হয়ে যায়।

তারপর…

কর্পোরেট দুনিয়ার এই কালচারটা কখনই পছন্দ হয় না রাহুলের। তাই অন্য সব জায়গায় যাওয়ার সময় যূথিকাকে নিয়ে টানাটানি করলেও অফিসের পার্টিতে কখনও ওকে নিয়ে আসেনি সে।

আর এখন তো সে উপায়ও নেই রাহুলের।

কয়েকদিন আগে যূথিকা ডিভোর্স চেয়ে কেস করেছে শ্রীরামপুর কোর্টে।

যূথিকার ঘটনাটা ভীষণ নাড়িয়ে দিয়ে গেছে তাকে। তবে কেস করলেও ফ্ল্যাট ছেড়ে যেতে রাজি নয় মেয়েটা। আসলে ফ্ল্যাটটা রয়েছে দু’জনের নামেই। রাহুল জানে তার মাশুল এখন চুকোতে হচ্ছে তাকে।

ইনভেস্টমেন্টটা পুরোপুরি তার হলেও ছেলে হওয়ার অন্যায়ে শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটটা না তাকেই ছাড়তে হয়!

মেয়েটা যে এরকম বিষধর সাপের মত কামড় বসাবে তা ভাবতে পারেনি রাহুল। অথচ সেবার মেয়েটাকে চড় মারার পর নিজেরই খারাপ লেগেছিল তার। এরপর আর সে ঝাঁপিয়ে পড়েনি যূথিকার উপরে। বদলে মেয়েটার প্রতি উপেক্ষার মাত্রাটা বাড়িয়ে দিয়েছিল আরও। ভেবেছিল আর কোনও মাথা গরম নয়, একটু একটু করে পিষে মারবে যূথিকাকে।

যতই বাইরে গিয়ে ফস্টিনস্টি করুক, রাহুলের বিরুদ্ধে ডিভোর্স কেস ফাইল করার ক্ষমতা হবে না তার।

কিন্তু রাহুলের হিসাব মেলেনি। ঠিক ভয় না পেলেও একটা অস্বস্তি যেন তারপর থেকেই সবসময় রাহুলের সঙ্গী।

তবে আশার কথা বিপ্রতীপের মত একজন উকিল রয়েছে তার সঙ্গে।

পার্টিতে আসলে মুখের হাসিটা ধরে রাখে রাহুল। সৌজন্য বিনিময় করে সবার সঙ্গে। কিন্তু আজ হাজারো ভিড়ের মাঝে ভীষণ চুপচাপ বসেছিল সে। তিন খানা ব্ল্যাক ডগের পেগ উড়ে গেলেও তার মাথার ভিতরে ডেঁয়ো মাছির মত ভন ভন করে পাক খাচ্ছিল একটাই চিন্তা।

কার জোরে এতটা সাহস পেল মেয়েটা?

একবার যদি খুঁজে পাওয়া যেত সেই ছেলেটাকে!

কিন্তু ছেলেটাকে এখনও খুঁজে পায়নি রাহুল।

কীভাবে পাবে জানে না তাও।

মেয়েটা হোয়াটসঅ্যাপে কিছুই রাখে না তা আগেই দেখেছে সে। আর ফেসবুকে যূথিকার ফ্রেন্ডলিস্টটা বেশ লম্বা হলেও রাহুল সেখানে ঢুকে দেখেছে তার আর যূথিকার মিউচুয়াল ফ্রেণ্ড ছাড়া আর কাউকে দেখায় না সেখানে।

সেই লোকগুলো বেশিরভাগই রাহুলের বন্ধুস্থানীয় এবং ঘোর সংসারী। আগে এদের সন্দেহ হলেও এখন আর সেভাবে হয় না রাহুলের। এরা যূথিকার সঙ্গে শুতে পারে একশোবার, কিন্তু নিজের বউ বাচ্চা ছেড়ে ওর সঙ্গে সংসার পাতবে?

ব্যাপারটা নিজেরও কীরকম অবিশ্বাস্য লাগে রাহুলের।

অবশ্য মানুষের মন তো!

কিছুই বলা যায় না।

এদিকে মেয়েটা সবকিছু এতটাই গোপনে করে চলেছে যে রাহুল কিছুতেই কিছু করে উঠতে পারছে না। অনেকদিন আগে সে ভেবেছিল গোয়েন্দা লাগাবে যূথিকার পিছনে। তখন ব্যাপারটায় মন সায় না দিলেও হালকা নেশায় রাহুলের মনে হল কাজটা করার সময় এসে গেছে।

গ্লাসের তলায় পড়ে থাকা হুইস্কিটা এক চুমুকে শেষ করল রাহুল। প্রথমেই বিপ্রতীপকে জানাতে হবে তার নতুন প্ল্যানের কথাটা। বাইরে যাওয়ার জন্যে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে রাহুল এমন সময় তার কান এল একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর, “আরে রাহুল, কোথায় যাচ্ছ? তোমার সঙ্গে আমার একটু পার্সোনাল কথা আছে।”

সামনে তাকিয়ে রাহুল দেখল ওর দিকে এগিয়ে আসছে দীনেশ মুখার্জী। এখনই ডিভোর্সের কথাটা অফিসে বলেনি রাহুল। তবু লোকটাকে দেখে মনে মনে প্রমাদ গুনল সে, “কী কথা দাদা?”

“বাইরে এসো, বলছি।”

দীনেশকে অনুসরণ করে রাহুলও ব্যাঙ্কোয়েটের পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। এইদিকে হোটেলের এমারজেন্সি এক্সিট। দরজার সামনে দিয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে বেসমেন্ট অবধি।

বাইরে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিতেই অনেকটা হালকা হয়ে এল ভিতরের আওয়াজ। হোটেলের পিছন দিক বলেই জায়গাটা একেবারে খালি। রাহুল কিছু বলতে যাচ্ছিল দীনেশকে, কিন্তু তার আগেই দীনেশ নিজের পকেট থেকে বার করল ফোনটা। ইন্টারনেট অন করা ছিল আগেই। হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে একটা ভিডিও বার করে তুলে দিল রাহুলের হাতে।

ভিডিওটার উপরে লেখা ফরোয়ার্ডেড। তার মানে কেউ পাঠিয়েছে দীনেশকে। কিন্তু ভিডিরও মধ্যে শাড়ি পরা মেয়েটাকে দেখে চমকে উঠল রাহুল।

এটা আর কেউ নয়, যূথিকা!

রাহুলের আঙুলের আলতো চাপে চালু হয়ে গেল ভিডিওটা। মিনিট পাঁচেকের ভিডিওটা শেষ হওয়ার আগেই রাহুল অনুভব করল সে আর নিজের মধ্যে নেই।

ভোঁভোঁ করতে শুরু করেছে মাথার ভিতরটা।

রাহুলের অবস্থা দেখে চটপট তার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে নিল দীনেশ। চারপাশটা ঘোলাটে হয়ে গেলেও রাহুল শুনতে পেল দীনেশের গলার আওয়াজ, “বউকে সামলাও রাহুল। ব্যাপারটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। এদিকে বউ ঘরোয়া বলে তাকে অফিসের পার্টিতেও আনতে চাও না। অফিসের সবাই হাসহাসি করছে ভিডিওটা দেখে। বস এবার তোমার বউকেই না চেয়ে বসে। চাপটা কিন্তু তখন তোমাকেই নিতে হবে। এমডিগুলো বোধহয় এরকমই হারামি হয়।”

১৭

নিজের বিছানার উপর চুপচাপ বসেছিল যূথিকা। কখন যে রাত নেমেছে তা জানা নেই তার। রত্নদ্বীপ অ্যাপার্টমেন্টের তিনশ দুই নম্বর ফ্ল্যাটে আজ আলো জ্বলেনি। শোনা যায়নি কিচেনে রান্না করার শব্দ। সন্ধেবেলায় বোকাবাক্সের সামনে বসে না থেকে যে কাজটা করতে বেশি পছন্দ করে ফ্ল্যাটের মালকিন যূথিকা।

আসলে যূথিকার জীবন হঠাৎ যেন টালমাটাল হয়ে গেছে আজ বিকেলের পর থেকেই। দিনের ওই সময়টাতে একবার ফোনে নেট করে সে। কিন্তু আজ নেট অন করার পর অবাক না হয়ে পারেনি যূথিকা।

বারবার বারণ করার পরেও তাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা ভিডিও পাঠিয়েছে ঋক।

এখন কেস চলছে। যূথিকা জানে ঋকের ম্যাসেজ যদি কোনওভাবে রাহুলের হাতে পড়ে যায় তাহলে আদালতে সেটা তার বিপক্ষে যেতে পারে। একে তো কাল রাতে অনলাইন হয়নি ছেলেটা। সেই সময় বন্ধ ছিল ওর ফোনও। আর এখন এই কাণ্ড!

যূথিকা ভেবেছিল একবার দেখে নিয়েই ডিলিট করে দেবে ভিডিওটা।

আর তারপর রাহুল ফেরার আগেই ফোনে আচ্ছা করে ঝাড় দেবে ছেলেটাকে।

কিন্তু নিজের হিসাবমত চলতে পারেনি যূথিকা। ভিডিওটা ডাউনলোড হওয়ার পরেই শুকিয়ে গিয়েছিল তার ভিতরটা।

মোবাইল স্ক্রিনের ওপারে দাঁড়ানো মেয়েটা সেই। আর এই শাড়িটা এখনও অবধি একবারই পরেছে সে।

অনিকেতের সঙ্গে ওর বন্ধুর ফ্ল্যাটে যাওয়ার দিনে।

বাচ্চা ছেলেটাকে সে ভোগ করেছে ঠিকই। কিন্তু ছেলেটা যে এইভাবে প্রত্যাঘাত করবে তা সে ভাবতে পারেনি মোটেই। মাথায় বাজ পড়েছিল যূথিকার। কোনও কিছু না ভেবেই সে ফোন করেছিল অনিকেতকে। অনিকেত যেন অপেক্ষাতেই বসেছিল এই ফোনটার। দু-তিনবার রিং হওয়ার পরেই ওপাশ থেকে ভেসে এসেছিল ওর গলার আওয়াজ, “হ্যাঁ বলো।”

“এটা তুই কী করেছিস অনি!” যূথিকার গলায় তখন খ্যাপা ষাঁড়ের উন্মত্ততা। কিন্তু তার উত্তরে অনিকেত ছিল মাপা, “তুমি সুন্দরী। পুরুষরা তোমার শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকবে হাঁ করে। আসতে চাইবে তোমার কাছে। আর তুমি প্যান্টির মত ব্যবহার করবে তাদেরকে। যখন চাইবে পরে নিয়ে তোমার গন্ধ শোঁকাবে। তারপর যখন চাইবে খুলে ফেলে দেবে আস্তাকুঁড়েতে। তাই না? ঋকের সঙ্গে তোমার যে কী সম্পর্ক সেটা আর কেউ না জানুক আমি জেনে গেছি।”

পরিমিত হলেও আক্রোশ যেন ফেটে বেরোচ্ছিল অনিকেতের গলায়। কিন্তু আর কথা বাড়ায়নি সে। কেটে দিয়েছিল ফোনটা। হতভম্ব যূথিকা এরপর অনেকবার অনিকেতকে ফোন করলেও কয়েকটা রিং হওয়ার পর প্রতিবার একই উত্তর পেয়েছিল সে, ‘দ্য নাম্বার ইউ আর ট্রায়িং টু রিচ ইজ কারেন্টলি বিজি। প্লিজ কল আফটার সাম টাইম।’

তখন যূথিকার দিশেহারা অবস্থা। উপায়ান্তর না দেখে সে ডায়াল করেছিল ঋকের নাম্বার। ওপাশ থেকে ঋক ফোন তুললেও কিছু বলেনি সে। যেন অপেক্ষা করছিল যূথিকার কথা শোনার জন্যে। ততক্ষণে সমস্ত উত্তেজনা থিতু হয়ে গিয়ে যূথিকাকে ঘিরে ধরতে শুরু করেছে একটা সীমাহীন আতঙ্ক। তবু ঋক কথা বলছে না, মুখ খুলেছিল সে-ই, “ঋক...”

হঠাৎ যেন দলা পাকানো কান্না এসে ধাক্কা মেরেছিল তা গলার কাছে। সেই আওয়াজ হয়তো পৌঁছে গিয়েছিল অনেক দূরে বেঙ্গালুরুতে বসে থাকা ঋকের কানেও। কিন্তু তাতেও মন গলেনি ঋকের। তার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা, “দেখো যূথিকা। তোমাকে কিছু বলার আছে। এটা যে ডিপ ফেক নয় তা স্পষ্ট। তুমি সেলেব নয় যে, তোমার হাজার হাজার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ায়। তুমিই তো সেদিন বারে বসে বলেছিলে রাহুল এখন আর ফিরেও তাকায় না তোমার দিকে। আর এই ছবি তো আমি তুলিনি। যতদূর দেখে মনে নয় তুমিই ক্যামেরা ফিট করে রেখেছ যূথিকা। তার মানে আমাকে নিয়ে তুমি স্যাটিসফায়েড নয়। এইসব ভিডিও পোস্ট করে নতুন ছেলে খুঁজছ। আমি কেন তোমার পিছনে টাকা এবং সময় দুটোই নষ্ট করব?”

ফোন কেটে দিয়েছিল ঋকও। তারপর থেকে যূথিকা যতবার ঋককে ধরার চেষ্টা করেছে মোবাইলের ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এসেছে একই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর, “দ্য নাম্বার ইউ আর ট্রায়িং টু রিচ ইস কারেন্টলি সুইচড অফ।”

দু’জন পুরুষের বলা দুরকমের কথা শিকারি বাজের মত ঘুরপাক খাচ্ছিল যূথিকার চারপাশে। কিন্তু এবার কী করবে সে? এ’রকম একটা স্ক্যান্ডেল মাথায় নিয়ে বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তার নেই।

হঠাৎ যূথিকার মনে হয়েছিল সে আশ্রয় নেবে কোনও বান্ধবীর কাছে। কিন্তু অনেক চিন্তা করেও সে’রকম কোনও কাছের বান্ধবীর নাম মনে আসেনি যূথিকার। স্কুলেও তো সে সেভাবে মিশত না কোনও মেয়ের সঙ্গেই।

কেবল ছেলেদের পিছনে ছুটে ছুটেই…

ভিডওটা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরে সেই পুরুষ জাতটার চোখে সে একজন বেশ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

কৃতকর্মের জন্য জীবনে প্রথমবার বড় কষ্ট হয়েছিল যূথিকার। হঠাৎ গুম হয়ে গিয়েছিল সে। হাজার মশার কামড় খেলেও আর উঠতে পারেনি বিছানা ছেড়ে।

যূথিকা হয়তো সারারাত বসে থাকত এইভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উঠতেই হল তাকে।

বারবার কেউ কলিং বেল বাজাচ্ছে।

বিছানা থেকে উঠে টলতে টলতে কোনওরকমে সদর দরজার কাছে এল যূথিকা।

তারপর খুলে দিল ফ্ল্যাটের সদর দরজা।

বাইরে দাঁড়িয়ে রাহুল। ফ্ল্যাটের বাইরে তার পিছনে একটা সিএফএল জ্বললেও, সামনে কোনও আলো না থাকায় যূথিকা দেখতে পেল না রাহুলের চোখ দুটো।

প্রচণ্ড রাগে যেন কোনও নিশাচরের মতই জ্বলে উঠতে চাইছে সে দুটো।

১৮

গত কয়েকদিন ধরে একদম ঘেঁটে আছে বিপ্রতীপ। রাহুল যে এতবড় একটা অপরাধ করে ফেলবে তা ভাবতে পারেনি সেও। অশান্তি তো চলছিল গত অনেক দিন ধরেই, কিন্তু তাই বলে গলা টিপে সে একদম মেরেই ফেলল যূথিকাকে।

কিন্তু কী এমন করেছিল যূথিকা যে রাহুল এতটা ক্ষেপে গেল। বুঝতে পারছিল না বিপ্রতীপ। শেষ পর্যন্ত অনেক পাত্তা লাগিয়ে দু’দিন আগে একটা ভিডিওর হদিশ পেয়েছিল সে।

তখনই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায় বিপ্রতীপের কাছে। ঘটনার পর চারদিন কেটে গেলেও এখনও ফেরার রাহুল। যূথিকার বাবা রাহুলের নামে থানায় এফআইআর দায়ের করলেও এখনও পুলিশের খাতায় ফেরার হয়ে আছে ছেলেটা।

ব্যাপারটা নিয়ে মিডিয়াতেও খুব শোরগোল শুরু হয়েছে। সবাই মৃত্যুটাকে পরকীয়ার জেরে বলে বাইট দিলেও ভিডিওটার কথা বলছে না কেউই।

বিপ্রতীপ জানে মৃতার চরিত্রে দাগ লাগালে যে কোনও সময় ঘা লাগতে পারে পাবলিক সেন্টিমেন্টও।

চেম্বারে আজ সেরকম ভিড় নেই। সেখানে একলা বসেই এইসব সাত-পাঁচ চিন্তা করছিল বিপ্রতীপ।

তার খারাপ লাগছিল রাহুলের জন্যে।

বেচারা…

হঠাৎ বিপ্রতীপ খেয়াল করল সামনে টেবিলে রাখা মোবাইলটা কাঁপছে। ফোন এসেছে একটা অচেনা নাম্বার থেকে। দেখে বোঝা যায় ল্যান্ড লাইন। আর জায়গাটা কলকাতার বাইরে।

বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল বিপ্রতীপের। ফোনটা রিসিভ করতেই সে শুনতে পেল রাহুলের গলা, “বিপুদা বলছ?”

রাহুলের গলা সে চেনে। বিপ্রতীপ অনুভব করছিল তোলপাড় শুরু হয়েছে তার সমস্ত স্নায়ুতে, “তুই কোথায় রাহুল?”

“বিশাখাপত্তনমে। শহরের এক কোণে একটা ফোনবুথ এখনও আছে। সেটা থেকেই তোমাকে ফোন করছি। যাই হোক, তুমি নিশ্চয়ই এতদিনে জেনে গেছ কেন আমি যূথিকাকে খুন করেছি।”

অসম্ভব ঠাণ্ডা রাহুলের কণ্ঠস্বর। কোনও পাকা অপরাধীর মত কথা বলছে সে। জীবনে প্রথমবার কোনও অপরাধীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অসহায় মনে হল বিপ্রতীপের। নিজেকে সামলাতে খানিকটা সময় নিল বিপ্রতীপ’ “হ্যাঁ সবই জানি রাহুল। ব্যাপারটা যে অত্যন্ত রাগের মাথায় ঘটে গেছে সেটাও জানি। কিন্তু তুই ফিরে এসে কোর্টে সারেণ্ডার কর। ভিডিওটা আছে আমাদের হাতে। ওটা তোর পক্ষেই যাবে। তোর সাজা যাতে কম হয়, সে দায়িত্ব আমার।”

“সাজা!” ফোনের ওপার থেকে হেসে উঠেছিল রাহুল, “বাবা যাব্বজীবন টেনে এসেছে। সাজাতেও আমি ভয় পাই না বিপুদা। কিন্তু তার আগে তোমাকে কয়েকটা কথা বলি। বাবাকে দাহ করে ওর অস্থিটা গঙ্গায় ভাসিয়ে আমার অদ্ভুত লেগেছিল। এতদিন ধরে বয়ে চলা পাপের চিহ্নটুকুও মুছে যেতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা লাগল! যুথিকার গলাটা যখন টিপে ধরেছিলাম তখনও ভেবেছিলাম ওর সঙ্গেও শেষ হয়ে যাবে ওর পাপও। কিন্তু পরে মাথা ঠাণ্ডা হওয়ার পর বুঝতে পারি আমি ভুল করেছি। ওকে খুন করে নয়। কিন্তু ওর পাপের চিহ্ন মিটিয়ে ফেলতে হলে বন্ধ করতে হবে হোয়াটসঅ্যাপকেই। সে ক্ষমতা আমার নেই। দেখো বিপুদা, আমি এখনও মনে করি ও আমারই বউ ছিল। আমি চাই না ওর শরীর নিয়ে অন্য কেউ মজা করুক। কিন্তু এনক্রিপশনের পৃথিবীতে আমি নিরুপায়। যূথিকাকে খুন করে আমার কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু আমার কষ্ট হচ্ছে এটা ভেবে যে ওর শরীরটা দেখে কত ছেলে এখনও… আমি সত্যিই সহ্য করতে পারছি না। আর কোর্টে ওই ভিডিওটা তোলা মানে তো...”

এসব কী বলছে রাহুল! সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল বিপ্রতীপের। তবুও সে বলল, “রাহুল ফিরে আয়। কতদিন ফেরার হয়ে বাঁচবি। যা অন্যায় করেছিস তার সাজা তোকে পেতেই হবে। কিন্তু তারপরেও তো তুই একটা জীবন পাবি।”

কথাগুলোর কোনও মানে যে এখানে হয় না বিপ্রতীপ জানে। অনেকদিন জেল খেটে বেরোবার পর খুব কম মানুষই আছে যারা বাঁচতে পেরেছে নতুন করে।

তার নিজের কানেই কেমন বোকাবোকা শোনাল কথাগুলো।

কিন্তু তারপরেই বিপ্রতীপ খেয়াল করল আর কোনও সাড়াশব্দ নেই ওপাশ থেকে।

খুব সম্ভবত রাহুল কেটে দিয়েছে ফোনটা!

এক বছর পরে

কোনওরকমে চ্যানেলে একটু জায়গা পেতেই পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছল অনিকেত। লোকাল ট্রেনের দুটো মুখোমুখি সিটের মাঝের জায়গাটাকে এই লাইনের যাত্রীরা চ্যানেল বলে। এখন এটাই অনিকেতের রোজের রুটিন। বিগত ছ’মাস সে সকালবেলার তারকেশ্বর-হাওড়া লোকাল ধরে সোজা চলে আসে হাওড়ায়। সেখান থেকে ওর ব্যাঙ্কে। মাইনে একটু কম হলেও নতুন চাকরিটাকে লুফে নিয়েছিল অনিকেত। যূথিকা আর রাহুলের ওই ঘটনার পর ওকে কেউ ধরতে না পারলেও, ওই কোম্পানিতে থাকতে মন চাইছিল না তার।

ব্যাঙ্কের চাকরিটা পাওয়ার পর অনিকেত সত্যিই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে ।

আজ গতবছর আজকের দিনেই খুন হয়েছিল যূথিকা। এরপর কিন্তু পুলিশ আর ধরতে পারেনি রাহুলকে। যূথিকা মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর বিশাখাপত্তনমের কাছে কোনও একটা স্টেশনে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে রাহুল। ওখানে গিয়ে ওর বডিটাকে শনাক্ত করে এখানে নিয়ে এসেছিল শ্রীরামপুর কোর্টের একজন ল-ইয়ার। ভদ্রলোক নাকি রাহুলের আত্মীয়।

তখন ব্যাপারটা নিয়ে খুব হৈচৈ হয়েছিল। মিডিয়া ফ্ল্যাশ না করলেও ওই অভিশপ্ত ভিডিওটার কথাও জেনে গিয়েছিল পুরনো কোম্পানির সবাই। শুধু কেউ জানতে পারেনি কে পোস্ট করেছিল ভিডিওটা? নিজের পরিচয়টা খুব ভালো করে লুকিয়েই ভিডিওটা হোয়াটসঅ্যাপে ছেড়েছিল অনিকেত। সৌজন্যে তার একাধিক মোবাইল। প্রথম থেকে দ্বিতীয় ঘুরে ভিডিওটা যখন তার তৃতীয় ফোনে পৌঁছোয়, ততক্ষণে ফরোয়ার্ডেড হয়ে গেছে সেটা।

আর যূথিকার ভিডিওটা ঠিক কোথায় তোলা হয়েছিল তা বুঝতে পারেনি কেউই। ভিডিওটাকে এডিট করার সময় ব্যাকগ্রাউণ্ডটাকে কর্প করে হেজি করে দিয়েছিল অনিকেত।

একান্ত নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখার জন্য তৈরি করা ভিডিওটাকে রাগের মাথায় পাবলিক করে দিলেও তার পরিণতি যে এত ভয়ংকর হতে পারে তা বুঝতে পারেনি সে। ধরা পড়ার ভয়ে কাউকে কিছু বলতে না পারলেও যূথিকা আর রাহুলের পরিণতি এক বছর পরেও অনিকেতকে তাড়া করে বেড়ায় ভূতের মত।

ওই ঘটনার পরে আর কোনও মেয়ের দিকে তাকাতেও ভীষণ কুণ্ঠাবোধ হয় তার।

অনিকেত জানে না এই পাপের হাত থেকে সে মুক্তি পাবে কী করে!

আজ সকাল থেকেই কেবল যূথিকা পাক খেয়ে চলেছে অনিকেতের মাথার ভিতরে। ট্রেনের ভিড়েও আনমনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে।

কিন্তু হঠাৎ সামনে চোখ পড়তেই শক্ত হয়ে গেল তার শরীর।

সোমবারের সকালে ভিড় জেনারেল কম্পার্টমেন্টে মেয়েদের খুব কমই দেখা যায়। আর আজ চারপাশে একটাও মেয়ে নেই। তাই বোধহয় তার সামনে, পিছন করে বসে থাকা ছেলেগুলো নিশ্চিন্তে দেখছে ভিডিওটা।

এই ভিডিও তুলেছিল অনিকেতই। সেটার দিকে তাকাতেই সে বুঝল একদম শেষে এসে পৌঁছেছে ভিডিওখানা, যেখানে উদোম যূথিকা হাতের ইশারায় ডাকছে তাকে।

যূথিকার সেই কামাতুর আহ্বান জাগাতে পারল না অনিকেতের পৌরুষ। সে শুধু অনুভব করল প্রচণ্ড একটা অপরাধবোধ মরুঝড়ের মত এসে ধূসর করে দিয়েছে তার সামনেটা।

“আমি ওখানে থাকলে… উফফ!”

ভিড়ের মধ্যে বলা একটা ছেলের কথা যেন অনেক দূর থেকে কানে ভেসে এল অনিকেতের। ভয়ংকর রাগ হলেও ছেলেগুলোর সঙ্গে ঝগড়া করতে পারল না সে। কয়েক ফোঁটা জল কেবল টপটপ করে গড়িয়ে পড়ল তার চশমার ফাঁক দিয়ে।

তবুও চিৎকার করে কাঁদতেও পারল না অনিকেত। দাঁড়িয়ে থাকল এক আদিম প্রস্তরখণ্ডের মত।

ওদের সবাইকে নিয়ে ট্রেনটা তখন ছুটে চলেছে হাওড়ার দিকে।

পাঠকেরা যা পড়ছেন