ডায়াল অ্যান আলিবাই - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ

‘রালফ,’ মেঘস্বরে বললাম আমি। ‘ধনী কাউকে আত্মহত্যা করতে দেখলে আমার সন্দেহ চাগিয়ে ওঠে।’

‘কেন, হেনরি?’

‘কেননা,’ হাসলাম মলিন হাসি। ‘সন্দেহ করাই আমার কাজ।’

সে যাই হোক, অকুস্থল একদম টিপটপ দেখছি।

অরভিল টাকার, বয়েস ষাটের ঘরের মাঝামাঝিতে হবে, বিকেল তিনটের সময় মৃত অবস্থায় সোফার ওপর মরে পড়ে ছিলেন। স্টাডিতে প্রবেশ করে তখন তার এই দশা দেখতে পায় হাউজকিপার কাম রাঁধুনি। মিসেস ব্রিউস্টার তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার জন্যই এসেছিলেন ঘরে।

টাকারের মাথায় একটা মাত্র ক্ষত পাওয়া গিয়েছে, তবে সেটা বুলেটের বলে সেই একটা ক্ষতই যথেষ্ট। ওর পাশেই পড়ে আছে একটা .৩২ ক্যালিবারের রিভলভার। বাড়ির কেউ নাকি কোন গুলির আওয়াজ শোনেনি!

টাকারের আঙুলের ছাপ মিলেছে বন্দুকে, বাঁ হাতে তিনি একটা কাগজ ধরেছিলেন। টাইপ করে ওতে লেখা: ‘অ্যাড্রিয়ানকে জিজ্ঞেস করো ৫৬৩-২৭০৪।’

দেরি না করে নম্বরটায় ডায়াল করলাম আমি। আবিষ্কার করলাম যে ইউনাইটেড ট্রাবল হট লাইনে ফোন করেছি! বিপদে পড়া লোকদেরকে সাহায্য করে এরা। এই মুহূর্তে অ্যাড্রিয়ান অফিসে নেই, তবে সেদিন সন্ধ্যে সাতটায় পাওয়া যাবে। সঙ্গে সঙ্গে মহিলার অ্যাপার্টমেণ্ট পাঠিয়ে দিলাম একজন অফিসারকে, তাকে নিয়ে আসতে বললাম টাকারের বাড়িতে।

তারপর মিসেস ব্রিউস্টারকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কাজে মন দিলাম।

‘মিসেস ব্রিউস্টার,’ শুরু করলাম আমি। ‘মি. টাকার কেন আত্মহত্যা করলেন, তা কি আপনি জানেন?’

মধ্য-পঞ্চাশের মহিলার চোয়ালটা বেশ বড়। ‘স্বাস্থ্য তার খারাপ ছিল, খুব বাছ-বিচার করে খেতেন।’

‘কত দিন হলো মি. টাকারের হয়ে কাজ করছেন?’

‘পঁচিশ বছর, দুই-এক বছর এদিক-ওদিক হতে পারে।’

‘ভদ্রলোকের উত্তরাধিকারীদের নাম জানেন নাকি?’

‘আমার জানামতে তেমন আছেন মাত্র একজন, মিস বিয়েট্রিস, তার ভাগ্নী।’

‘আপনার উল্লেখ আছে নাকি মি. টাকারের উইলে।’

‘আমাকে তো আছে বলেই জানিয়েছিলেন।’

‘কী দিয়ে গিয়েছেন, জানেন নাকি?’

‘আমার আনুগত্য এবং উপযুক্ত সেবার কারণে...পঞ্চাশ হাজার ডলার।’

দূরে সরিয়ে নিলাম রালফকে, যেন মহিলা শুনতে না পায়। ‘রালফ, খুন করার জন্য কিন্তু হাজার পঞ্চাশেক ডলার মোটিভ হিসেবে ফেলনা নয়। হয়তো ভদ্রলোক ঘুমিয়ে থাকার সময় মহিলা লুকিয়ে প্রবেশ করে টাকারের কামরায়। তারপর গুলি করে মেরে ফেলা একদম সহজ। বুড়োর আঙুল ট্রিগারে চেপে ধরলেই হলো।’

‘নোটটা? ওটার কথা ভুলে গেলে নাকি, হেনরি?’

‘উম, মানে...নোটটায় তো আর সই করা ছিল না।’

‘তা ছিল না। কিন্তু, হেনরি, ওটা তো আসলে সুইসাইড নোটও না। শুধু একটা নাম এবং ফোন নম্বর আছে ওতে। সই করবেন কেন?’

ঠিক সেই মুহূর্তে কামরায় পা রাখল বিয়েট্রিস, টাকারের ভাগ্নি। মেয়েটির সঙ্গে ধূর্ত-চোখের এক পুরুষ। ‘ইনি হচ্ছেন ক্ল্যারেন্স কেনিকট।’ পরিচয় করিয়ে দিল সে।

মাথা নেড়ে সায় জানাল যুবক, আলতো করে চাপড় বসালো বিয়েট্রিসের হাতে।

কেন যেন আমি আলতো-করে-চাপড়-বসানো-যুবকদের পছন্দ করি না। তাই সন্দেহভাজনের তালিকায় ঢুকিয়ে দিলাম লোকটার নাম।

শুরু হলো আমার জিজ্ঞাসাবাদ। ‘আপনার মামা কেন আত্মহত্যা করলেন, তা জানেন?’

‘বেচারির স্বাস্থ্য খুব একটা ভাল ছিল না। আচ্ছা, তিনি একটি নোট লিখেছেন না?’

‘ওই সেরকমই বলা চলে আরকী। আপনি ছাড়া ভদ্রলোকের কোন উত্তরাধিকারী নেই?’

‘আমার জানা মতে নেই।’

এবার আলোচনায় যোগ দিল কেনিকট। ‘ডাক্তার র‍্যাথবোর্নকে এক লাখ এবং মিস ব্রিউস্টারকে পঞ্চাশ হাজার বুঝিয়ে দেয়ার পর, যা থাকত তা সবই বিয়েট্রিসের।’

চোখ সরু করে জানতে চাইলাম, ‘সে কথা আপনি জানেন কীভাবে?’

‘কারণ আমি অরভিল টাকারের উইল অনুসারে সব বণ্টনের দায়িত্বে আছি।’

আমাকে এবার সরিয়ে আনল রালফ। ‘কিছু বুঝতে পারলে, হেনরি?’

‘রালফ,’ বললাম আমি। ‘মানব-চরিত্র আমি ভালই বুঝি। মেয়েটিকে খুনি হতে পারে না!’

‘কেন?’

‘মেয়েটি ওই ধরনের নয় বলে। কিন্তু ওই কেনিকট ব্যাটাকে পছন্দ হচ্ছে না, লোকটা আততায়ী হতে পারে!’

‘তোমার লজ্জা পাওয়া উচিৎ, হেনরি। বেশ-ভূষা দেখে একজনকে অপরাধী ঠাউরে বসেছ!’

‘বলছি না যে এখনই ওকে গ্রেফতার করতে হবে। কিন্তু যেভাবে বিয়েট্রিসের পেছনে ছোঁক-ছোঁক করছে, তাতে তো মনে হচ্ছে যে মেয়েটিকে বিয়ে করার তালে আছে। পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা হলেই, বিয়েটা সেরে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে বসবে!’

আচমকা কামরায় প্রবেশ করল আমার পাঠানো অফিসার, সঙ্গে কালোকেশি এক তরুণী; বয়েস হবে বিশের কোঠায়।

‘আহ,’ বললাম আমি। ‘আপনি নিশ্চয়ই অ্যাড্রিয়ান?’

মাথা নেড়ে সায় জানাল মেয়েটি। ‘আর আপনি হচ্ছেন ডিটেকটিভ সার্জেণ্ট হেনরি এস. টার্নবাকল।’

অ্যাড্রিয়ান ম্যাককালামের গল্পটা শুনলাম এরপর।

‘মি. টাকার আমাকে গত সপ্তাহে মোট তিনবার ফোন করেন। তবে তখন তাকে টাকার নামে চিনতাম না। নাম জানতে চাইলে কেবল নামের প্রথম অংশটা বলতেন তিনি।’

এই পর্যায়ে এসে নিজের পরিচয়ে আমাকে কিছু কথা জানাবার সিদ্ধান্ত নিল মেয়েটি। ‘আমি প্রতি সপ্তাহে তিন ঘণ্টা করে হটলাইনটায় কাজ করি, শুক্র-শনি বাদে। এর পেছনে যেমন মানবিক কারণ আছে, তেমনি আছে আমার পি.এইচ.ডি.-এর থিসিসও।’

‘টাকার সাহেব কেন হটলাইনে ফোন করছিলেন?’

‘তার স্বাস্থ্যগত সমস্যার জন্য। খুব মন খারাপ করে থাকতেন, এমনকী আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কথা বলে তাকে থামাতে পেরেছিলাম। মানে তখন সেটাই মনে হয়েছিল আরকী। বারবার ভদ্রলোকের পুরো নাম জানতে চেয়েছিলাম, ইচ্ছে ছিল সাহায্য পাঠাবো। কিন্তু তিনি জানাননি।’

‘মি. টাকার কি আপনাকে নাম ধরে চেয়েছিলেন?’

‘প্রথমবার চাননি। সেবার আমি ডিউটিতেই ছিলাম। তবে তারপরের বারগুলোতে তিনি আমাকে ছাড়া মুখই খুলতেন না!’

দৃশ্যপটে তখন এসে হাজির হয়েছেন ডা. র‍্যাথবর্ন। মাঝবয়সী ভদ্রলোক, এসেই মাথা নাড়লেন কেনিকট এবং বিয়েট্রিসের দিকে চেয়ে। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অরভিল আত্মহত্যা করেছেন?’

‘দেখে সেটাই মনে হচ্ছে, অন্তত এই মুহূর্তে আমরা তেমনটাই ভাবছি। আপনি কি দয়া করে আমাকে অরভিল টাকারের শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে জানাবেন?’

শ্রাগ করে জবাব দিলেন ডা. র‍্যাথবর্ন। ‘শরীর তার যথেষ্টই খারাপ ছিল, বয়েস তো আর কমছিল না। তবে আরও দশ-পনেরো বছর ঠিক বেঁচে থাকতে পারতেন।’

হাসলাম আমি, উদ্দেশ্যপূর্ণ হাসি। ‘টাকারের উইলে কি আপনার নাম আছে?’

‘আছে। যত দূর জানি, আমাকে এক লাখ ডলার দিয়েছে। সেই ছেলেবেলা থেকে আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি।’

‘আজ বিকেলে, এই ধরুন দুইটা থেকে তিনটার মাঝে আপনি কোথায় ছিলেন?’

ইতস্তত করলেন ডাক্তার সাহেব। ‘অফিসেই ছিলাম। সে কথা আমার রিসিপশনিস্ট এবং আরও আধ-ডজন রোগী নিশ্চিত করে বলতে পারবেন।’

‘শেষ কবে দেখা হয়েছিল টাকারের সঙ্গে?’

‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যের দিকে। একসঙ্গে দাবা খেলেছিলাম বেশ কিছুক্ষণ।’

অ্যাড্রিয়ানের দিকে ফিরলাম আমি। ‘টাকার সাহব কি কেবল নিজের স্বাস্থ্য নিয়েই কথা বলতেন?’

‘অনেকটা তেমনই। লিভার, কিডনি, পাকস্থলী এবং বাতের ব্যথা নিয়ে অনুযোগ করতেন তিনি।’

ভ্রু কুঁচকে ফেললেন ডা. র‍্যাথবর্ন। ‘কী বললে? বাতের ব্যথা? ওর তো বাত ছিল না!’

কিছুক্ষণ ভেবে জবাব দিল মেয়েটি। ‘এখন মনে পড়েছে, বাতের কথা বলেছিলেন মাত্র একবার।’ পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, ‘আপনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যেয় এখানে এসে ভদ্রলোকের সঙ্গে দাবা খেলেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আটটার দিকে কি পনেরো-বিশ মিনিটের অন্য তিনি উঠে গিয়েছিলেন?’

‘না তো! সাড়ে সাতটার দিকে বসে আমরা প্রায় দশটা পর্যন্ত একটানা খেলেছি।’

‘আহ!’ অ্যাড্রিয়ানের কণ্ঠে বিজয়ের সুর। ‘তাহলে আমাকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আটটার দিকে হটলাইনে ফোন করেছিল কে? যদি টাকার সেদিনে আমাকে ফোন না করে থাকেন, তাহলে পরের দিনগুলোতেও তিনি করেননি! কেননা কণ্ঠ ছিল একই, আমার পরিষ্কার মনে আছে।’

চিবুক ঘষতে লাগলেন ডাক্তার র‍্যাথবর্ন। ‘তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে নিজেকে টাকার বলে পরিচয় দেয়া লোকটা ভুল করে নিজের রোগের কথাই বলে ফেলেছিল।’

আরেকটু হলেই কথাটা আমি বলে ফেলতাম।

কেনিকটের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন ডাক্তার সাহেব। ‘তোমার বাতের সমস্যা আছে না, ক্ল্যারেন্স?’

আমি ভেবেছিলাম, লোকটা খেপে যাবে। বলবে-ওর মতো আরও হাজারো মানুষের বাতের সমস্যা আছে। কিন্তু কেবল শ্রাগ করল লোকটা।

চোখ পিটপিট করল বিয়েট্রিস টাকার। ‘কিন্তু ক্লারেন্স কেন অরভিল মামাকে খুন করবে?’

কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতে চাইলাম। কিন্তু তার আগেই ডাক্তার সাহেব বলে বসলেন, ‘যতদূর জানি, দেনায় ডুবে আছে ও। তবে খুন করতে চাইবার কারণ হিসেবে বলব-তোমাকে বিয়ে করে তোমার মামার সব সম্পদ হাতিয়ে নেবার তালে ছিল ছেলেটা!’

কেনিকটের দিকে তাকাল বিয়েট্রিস। ‘আরে, ক্লারেন্স! যে লোক কিছু হলেই আমার হাতে আলতো করে চাপড় বসায়, তাকে বিয়ে করার কথা তো আমি কল্পনাও করতে পারি না!’

কেনিকটের দিকে তাকাল অ্যাড্রিয়ান। ‘আমি এখানে আসার পর তুমি একটা কথাও বলোনি। নিশ্চয়ই অবাক হয়ে গিয়েছ আমায় দেখে! মুখ খুলছ না, কারণ তোমার কণ্ঠ শোনা মাত্র আমি চিনে ফেলব।’

আমাদের সবার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল লোকটা। তারপর পকেট থেকে একটা কলম আর নোটবুক বের করে তাতে লিখল, ‘আমার উকিল আসার আগে আমি একটা কথাও বলব না!’ তারপর ওটা এগিয়ে দিল আমার দিকে।

আর সন্দেহের অবকাশ রইলো না। সবাই মিলে আমার কেসটার সমাধান করে ফেলেছে। এখনও নিরেট প্রমাণ মেলেনি বটে, কিন্তু অচিরেই যে মিলে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

কিন্তু তাই বলে তো আর আমার মন ভাল হয়ে যায় না! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘রালফ, জীবন এত ছোট...কিন্তু দিনগুলো এত বড় কেন?’

‘মন খারাপ কোরো না, হেনরি।’ সান্ত্বনা জানাল রালফ। ‘একেবারে প্রথম থেকেই তো আন্দাজ করে বলছিলে যে কেনিকট খুনি।’

‘আন্দাজ করা, আর খুঁজে বের করার মাঝে পার্থক্য আছে, রালফ। আমি অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্যটাকে খুঁজে বের করতে চাচ্ছিলাম।’ সবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তাতে কোন বাধা চাইনি।’

‘তা তো তুমি পারতেই, হেনরি। কিন্তু কী আর করবে বলে, সংখ্যায় যে এরা দলে ভারী! সবাই মিলে কেসটার সমাধান করেছে।’

সংখ্যায় ভারী? হাসি ফুটে উঠল আমার মুখে। হুম, তা হতে পারে। যদি আরেকটু সময় পেতাম, তাহলে একাই বন্ধ করে দিতে পারতাম এই কেসের ফাইল!

পাঠকেরা যা পড়ছেন