কার্তিকবাবুর কড়চা - নীলাদ্রি মুখার্জি

দিন তিনেকও হয়নি সৌমিত্র বড়জোড়া জেলা পুলিশ স্টেশনে এসআই হিসেবে বদলি হয়ে এসেছে। এমনিতে বাঁকুড়া জেলার এই থানাটার আবহাওয়াটা মোটের উপর বেশ নিরুপদ্রবই বলা যায়, কিন্তু আসা ইস্তক থানার বড়বাবু এমন এক খুনের তদন্তে সৌমিত্রকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন যে তাতে তার নাকানিচোবানি খাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বড়বাবু কার্তিক লাহিড়ীর বাজারে যে খুব সুনাম আছে এমন নয়, তবে আর দশটা পুলিশ যে কারণে দুর্নামের ভাগীদার হয় কার্তিকবাবুর ক্ষেত্রে কিন্তু কারণটা সম্পূর্ণ আলাদা। ঘুষ খাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে জনগণকে বিপাকে ফেলা, অসাধু ব্যবসায়ীদের মদত দেওয়া ইত্যাদি কোন প্রকার অভিযোগের ভাগীদার কার্তিকবাবু হননি।

কিন্তু কার্তিকবাবুর সমস্যা এগুলি থেকেও অনেক বেশি গুরুতর। যেমন ধরুন কার্তিকবাবুর কাছে থানায় একজন আত্মহত্যার কেস রিপোর্ট করতে এল, এবার হয়তো সেই বিষয়টি খুব একটা গুরুতর নয়। ধরা যাক বিষ খেয়ে আত্মহত্যার ঘটনা। সাধারণত অন্যান্য আধিকারিকরা একটা প্রাথমিক তদন্ত সেরে ময়না তদন্তের রিপোর্ট বার করে বিষয়টিতে ইতি ঘটাবেন কিন্তু কার্তিকবাবু সেই দলে পড়েন না!

যতক্ষণ না কোন বিষয়কে তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করে তদন্তের নাড়িভুঁড়ি বার করবেন ততক্ষণ তার শান্তি নেই। যেমন ধরুন বিষক্রিয়ার মৃত ব্যক্তি কোন বিষ খেয়ে মারা গেছেন, তিনি সেই বিষ কোথায় পেলেন, সেই বিষ জাতীয় বস্তু কে বিক্রি করেন, কেনই বা মৃত ব্যক্তি সেই বিষ খেলেন, সেই বিষ এলাকাতে কীভাবে এলো, সেই বিষের উৎপত্তিস্থল কী বা কোথা থেকে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর তিনি যতক্ষণ না পাবেন ততক্ষণ তদন্ত চলতে থাকবে।

এবার কথা হল সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে যে এটাই তো একজন কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব, কিন্তু মুশকিল হয়েছে কখনো কখনো বিষয়গুলিকে নিয়ে কার্তিকবাবু এত বাড়াবাড়ি করেন যে তাতে তার সহকর্মীরা, বাদী বিবাদী পক্ষের লোকজন, এমনকি স্বয়ং জজ সাহেব পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কাছারিতে এমন ঘটনা বহুবার হয়েছে যে জজ সাহেব কার্তিকবাবুকে তদন্ত আর আগে না এগোবার পরামর্শ এবং অনুরোধ দুই করেছেন। তার কারণ সাধারণ দৃষ্টিতে যে তদন্ত জলের মতো সহজ বলে মনে হয় সেই তদন্তকেও তাত্ত্বিকভাবে পর্যালোচনা করতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হন এই বয়স্ক পুলিশ অফিসারটি।

সৌমিত্র যেদিন থানায় জয়েন করে তার দিন দুয়েক পরে রাজনৈতিক রেষারেষির জেরে খুন হয় এলাকার এক মস্তান। সৌমিত্র তদন্তে নেমে খুনি সন্দেহে দু’জনকে গ্রেফতার করে এবং জবরদস্ত জেরার মুখে তাদের মধ্যে একজন খুনের দায়ভার স্বীকার করে। ঘটনাটা এখানেই শেষ হয়ে যেত কিন্তু যতক্ষণ না কার্তিকবাবু নিশ্চিত হচ্ছেন যে তার হেফাজতে থাকা বয়ান দেওয়া ছেলেটি যে খুনি ততদিন তিনি এই তদন্তকে চালিয়ে যাবেন। সচরাচর কার্তিকবাবু তদন্তভার হাতে নিলে বাকি অফিসারেরা সেই তদন্তকে এড়িয়ে চলে কিন্তু যেহেতু সৌমিত্র নতুন এসেছে কার্তিকবাবু তাকেই পাকড়াও করেছেন।

—আচ্ছা স্যার বিল্টু তো স্বীকার করেছে যে কাজটা ও-ই করেছে তাহলে এতদিন ধরে নিয়ে যাওয়ার কী প্রয়োজন?

চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে সৌমিত্রর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন কার্তিকবাবু। তারপর আবার মুখের সামনে ডাই করে রাখা ফাইল এর গভীরে ডুবে গেলেন।

সৌমিত্র ছাড়বার পাত্র নয়, সে আবার বলল, জবাব দিলেন না যে স্যার? বন্দুকটাও তো উদ্ধার হয়েছে তার সাথে বিল্টুর ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে তাতে। এর থেকে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে বলুন?

মুখের সামনে খোলা ফাইলটা এবার বন্ধ করে রাখলেন কার্তিকবাবু। সৌমিত্রর মুখের দিকে কৌতুকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন

—ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করলেই কি আর সব সময় অপরাধীকে শনাক্ত করা যায়? অনেক সময় ফিঙ্গারপ্রিন্ট তো ভুলও হতে পারে।

ছয় বছর হয়ে গেল সৌমিত্র পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছে কিন্তু এখন অব্দি এই ধরণের অদ্ভুত কথা কখনো শোনেনি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট আবার ভুল হয় নাকি! সে তো শুনেছে কুড়ি কোটি লোকের মধ্যে দুজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করে তাও সেটা আপেক্ষিক, সব সময় হয় না। তাহলে কার্তিকবাবু সেই জিনিসটিকে কেন মাথার মধ্যে রাখছেন? যদিও কার্তিকবাবু পদমর্যাদায় সৌমিত্রর থেকে অনেকটাই বয়োজ্যেষ্ঠ তবুও সিনিয়র অফিসারকে প্রশ্নটা করার লোভ সামলাতে পারলো না সৌমিত্র। বলল

—এটা আপনি কী বলছেন স্যার? আমার চাকরি জীবনের এ ধরনের কথা তো আমি কখনো শুনিনি। এমনও নয় যে আমি প্রথমবার খুনের তদন্তে অংশগ্রহণ করেছি।

কথাটা কার্তিকবাবু ঠিক হজম করতে পারলেন না। নিজের মনেই খানিকটা বিড়বিড় করলেন আর তারপর বললেন

—ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কে তোমার ধারণা ঠিক কতোটা?

সৌমিত্র কিন্তু এই প্রশ্নের জন্য একেবারে প্রস্তুত ছিল না। আমতা আমতা করে বলল

—আমাদের ফরেন্সিক স্টাডিতে যেটুকু শিখিয়েছে সেটুকুই জানি স্যার। তাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যে কখনো ভুল হয় সেটা শুনিনি।

সৌমিত্র কথা শুনে হাসি পেল কার্তিকবাবুর। তিনি বিলক্ষণ জানেন যে তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আর সহকর্মীরা খুব একটা সহজভাবে নেয় না তাও এক্ষেত্রে সৌমিত্রকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ইতিহাস না জানালেই নয়। পুলিশের চাকরি যে শুধু কম্পিটিটিভ পরীক্ষাতে পাশ করলেই হয় না তার সাথে অপরাধ বিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রয়োজন সেটা বোঝানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে সৌমিত্র আজকালকার ছেলে তো, তাই যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা না দিলে সে কোনোকালেই পুরো বিষয়টা মন থেকে বিশ্বাস করতে পারবে না।

পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছে কার্তিকবাবু হাঁক পাড়লেন

—ওরে আমার আর মেজোবাবুর জন্য দু’কাপ চা নিয়ে আয় দেখি। তারপর সৌমিত্রর দিকে ফিরে বললেন

—আমি জানি আজকালকার দিনে অত ভেবেচিন্তে পড়াশোনা করে কেউ খুনের তদন্ত করে না। তবে আমার বদ অভ্যাস এই বুড়ো বয়সে আমি ছাড়তে পারিনি তাই চা খেতে খেতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ইতিহাস সম্পর্কে তোমাকে জানানো আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলে আমার মনে হয়।

ডিউটির শেষলগ্নে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কে জ্ঞান শুনতে সৌমিত্রর মোটেই ইচ্ছা করছিল না কিন্তু সিনিয়র অফিসার বলে কথা! অগত্যা চুপ করে বসে কার্তিকবাবুর কথা শোনা ছাড়া আর কোন উপায় সৌমিত্র দেখতে পেল না।

গলা খাঁকরে শুরু করলেন কার্তিকবাবু, বললেন, আচ্ছা সৌমিত্র ফিঙ্গারপ্রিন্ট অর্থাৎ আঙ্গুলের ছাপ, এই বিষয়টা মানুষ কবে থেকে ব্যবহার করত বল তো? চিন্তা নেই তুমি তোমার ধারণাটাই বল, সঠিক না হলেও চলবে।

খানিকক্ষণ ভেবে সৌমিত্র বলল, এই আঙ্গুলের ছাপ এর ব্যাপারটা মডার্ন এরা থেকেই চলছে বলে আমার ধারণা তবে ২০০-৩০০ বছর আগে হয়তো সম্পত্তি লেনদেন বা অর্থনৈতিক লেনদেন এই ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপের ব্যবহার হত।

—তোমার কথাটা কিছুটা ঠিক তবে পুরোটা নয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ব্যবহার আধুনিক যুগের অনেক আগে থেকে চলে আসছে এবং সেটা পৃথিবীর কোন একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে নয় বরং গোটা বিশ্ব জুড়ে। প্রাচীনকালেও এর ব্যবহার হয়েছে এবং এটা শুধু আমার কথা নয়, এর যথেষ্ট প্রামাণ্য নথিও এখন মানুষের হাতে চলে এসেছে।

—প্রাচীন বলতে ঠিক কত পুরনো বলছেন আপনি?

—প্রায় খ্রিস্টপূর্ব সোয়া দুই হাজার বছর আগেকার কথা বলছি।

—বলেন কী!

এবার আর আশ্চর্যের সীমা রইল না সৌমিত্রর। রসকষহীন আলোচনা আশা করেছিল সে কিন্তু যেভাবে কার্তিকবাবু তাকে টাইম মেশিনে চড়িয়ে বসালেন তাতে মুগ্ধ হয়ে শোনা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না বড়জোড়া থানার নতুন মেজবাবুর।

সদ্য আগত চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কার্তিকবাবু বলে চললেন

—এই আঙ্গুলের ছাপের ব্যাপারটা সেই মেসোপটেমিয়া সভ্যতা সময় থেকে চলে আসছে। সবথেকে পুরনো আঙ্গুলের ছাপের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় ব্যাবিলন সাম্রাজ্যের পাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে। ব্যাবিলন বলতে আজকের ইরাক দেশ যেখানে সেখানে। খনন কার্য চালিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রমাণ পেয়েছেন যে তখনকার দিনে ব্যবসায়িক দেওয়া-নেওয়ার জন্য প্রমাণ হিসেবে আঙ্গুলের ছাপ ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ব্যাবিলনের পত্তন হয়েছিল আনুমানিক তেইশশো খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তাহলে বুঝতে পারছ তো যে বিষয়টা কতটা পুরনো!

সত্যি কথা বলতে সৌমিত্র‍র এবার বিষয়টাতে অল্প অল্প করে আগ্রহ জন্মাচ্ছিল। পুলিশের প্রযুক্তিগত কচকচানিতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকার কারণে হোমিসাইড শাখার শহরতলির পোস্টিং ছেড়ে সে এসেছে এই ধ‍্যাড়ধ‍্যাড়ে গোবিন্দপুরে। কিন্তু প্রযুক্তিগত কচকচানিতেও যে এত প্রাচীন ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে তা সৌমিত্রর ধারণার বাইরে।

—আচ্ছা স্যার, প্রাচীনকালে শুধুমাত্র ব‍্যাবিলনেই আঙ্গুলের ছাপের প্রচলন ছিল?

—না, মোটেই না‌। মাটির পাতে আঙ্গুলের ছাপের ব‍্যবহার ২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে চিনেও যেমন ছিল তেমনি ১৪০০ খ্রীষ্টাব্দে পারস‍্যেও তার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

—বলেন কী?

—একেবারেই তাই। মজার ব‍্যাপার কী জানো এই অপরাধের ক্ষেত্রে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর প্রথম ব‍্যবহার ব্রিটিশেরা দাবী করলেও চিনের কিন সাম্রাজ্যের সম্রাটরা ডাকাতদের ধরার পর তাদের নথিভুক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে শনাক্তকরণের জন্য এই পদ্ধতি ব‍্যবহার করতেন। ভাবতে পারো সেই কতশো বছর আগের পদ্ধতি আমরা আজও ব‍্যবহার করে চলেছি!!

—আচ্ছা স্যার, এই যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং সেটার পিছনে যে বিজ্ঞান, সেটা মানুষ কবে ব‍্যাখ‍্যা করতে পারে?’

—দ‍্যাখো সৌমিত্র, আমার বিশ্বাস যে অনেক প্রাচীনকালেই মানুষ এই বিজ্ঞানটা পুরো আয়ত্ত করে ফেলেছিল, তবে নথি অনুযায়ী ১৬৮৪ খ্রীষ্টাব্দে "Philosophical Transactions of the Royal Society of London" নামক গবেষণাপত্রে ডঃ নেমায়াহ গ্রিউ ইউরোপীয়দের মধ‍্যে প্রথম হাতের পাতার ফ্রিকশন রিজের কথা উল্লেখ করেন।

—ডঃ গ্রিউই প্রথম ফ্রিকশন রিজের কথা বলেছেন এমন প্রামাণ‍্য নথি যদি থেকে থাকে, তাহলে প্রাচীন কালের মানুষ যে এই বিজ্ঞানটা আয়ত্ত করে ফেলেছিল, আপনার এহেন ভাবনার কী কারণ?

সৌমিত্রর গলায় কৌতূহলমিশ্রিত সন্দেহের সুর শুনে বেশ খুশিই হলেন কার্তিকবাবু। আজকালকার ছোকরা অফিসারদের মধ্যে এই অনুসন্ধিৎসু, কৌতূহলী ব‍্যাপারটা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে! একজন তদন্তকারী হতে গেলে সাহস, ক্ষুরধার বুদ্ধির পাশে মানুষের এই দুটি সহজাত প্রবৃত্তি যে কতটা উপযোগী তা কার্তিকবাবু হাড়ে হাড়ে জানেন।

—আসলে সৌমিত্র, পুরাতন কালের ব‍্যাপারগুলো তো আজকালকার তাত্ত্বিকেরা মানতে চান না, তবে তাই বলে সেগুলো মিথ্যা হয়ে যায় না!

—সে তো বটেই।

—ফ্রিকশন রিজের সর্বপ্রথম গ্রন্থভুক্তিকরণের কথা যদি বলো, তাহলে সেটা হয়েছে চৌদ্দশো শতকে পারস‍্য ভাষায় লেখা "জামল তারিখ" এর মাধ‍্যমে। খাজা রশিদুদ্দিন ফজলোল্লা হামাদানির পৃষ্ঠপোষকতায় লেখা এই গ্রন্থে সর্বপ্রথম আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে মানুষের শনাক্তকরণের কথা বলা হয়েছে। এবং এই ফ্রিকশন রিজের কথাও প্রথম উল্লেখ করা হয়েছে এই গ্রন্থে।

—আচ্ছা, এই যে ফ্রিকশন রিজ, তার মানে আমাদের এই আঙ্গুলের চামড়ার খাঁজ তো?

—একেবারেই তাই এবং এই খাঁজের বিন‍্যাস প্রায় প্রতিটা মানুষের আলাদা এবং তার জন‍্যই শনাক্তকরণের জন্য এই পদ্ধতি ব‍্যবহার করা হয়। তবে …

—তবে কী স্যার?

—না থাক, সেটা না হয় শেষে হবে‌। তার চেয়ে বরং তোমাকে "বিদলু" দিয়ে শুরু করি?

—অ্যাঁ, বিদলু! সেটা আবার কী?

সৌমিত্রর খাবি খাওয়া ভঙ্গি দেখে মনে মনে বেশ মজাই পেলেন কার্তিকবাবু। হেসে বললেন

—শারীরস্থানবিদ কথাটার অর্থ জানো?

—সেরেছে, এত কঠিন বাংলা আমার জানা নেই স্যার।

—শারীরস্থানবিদ কথার অর্থ হল অ্যানাটোমিস্ট অর্থাৎ শরীরের অঙ্গ প্রত‍্যঙ্গ নিয়ে যাদের কারবার আর কী!

—তা এই বিদলুর সাথে অ্যানাটোমির কী সম্পর্ক?

—সম্পর্ক আছে ইয়ং ম‍্যান। ডঃ গ্রিউয়ের গবেষণাপত্র প্রকাশ পাওয়ার অব‍্যবহিত পরেই অর্থাৎ ১৬৮৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রখ‍্যাত ডাচ অ্যানাটোমিস্ট গোভার্ড বিদলু তার লেখা শারীরস্থানবিদ‍্যা সংক্রান্ত যুগান্তকারী বই "অ্যানাটমি অফ দ‍্য হিউম‍্যান বডি" প্রকাশ করেন যা আজও প্রায় সাড়ে তিনশো বছর পরেও চিকিৎসাশাস্ত্রে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই এই বইতেই প্রথম চিত্রাকারে ফ্রিকশন রিজের ব‍্যাখ‍্যা দেওয়া হয়। যদিও এতে বিদলু আঙ্গুলের ছাপের অনন‍্যতা অর্থাৎ Uniqueness সম্বন্ধে বিশদে কিছু বলে যাননি।

—তাহলে আজকের এই অনন‍্যতার তত্ত্বটা এল কোথা থেকে?

—আসলে বিদলুর পরেও আর একজন শারীরস্থানবিদ‍্যার ইতালিয় অধ‍্যাপক মারসেলো ম‍্যালপিঘি বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ‍্যাপনা করা-কালীন আঙ্গুলের চামড়ার শৈলশিরা, সর্পিল ও বৃত্তাকার আঁকিবুঁকির ওপর লিখে গেছেন, কিন্তু বিদলু বা ম‍্যালপিঘি কেউই আঙ্গুলের ছাপের অনন‍্যতার ব‍্যাপারে কোন প্রামাণ্য তথ‍্য রেখে যাননি।

এরপর ১৭৮৮ সালে জার্মান চিকিৎসক জে.সি.এ.মেয়ার একটি বই লেখেন যার নাম "Anatomical Copper-plates with Appropriate Explanations" । এই বইতে মেয়ারই প্রথম বলেন যে মানুষের আঙ্গুলের ছাপ হল অনন‍্য অর্থাৎ একজন মানুষের আঙ্গুলের ছাপ কিছুতেই অন‍্য মানুষের হাতের ছাপের সাথে মিলবে না। মেয়ার এখানে লিখেছেন

“Although the arrangement of skin ridges is never duplicated in two persons, nevertheless the similarities are closer among some individuals. In others the differences are marked, yet in spite of their peculiarities of arrangement all have a certain likeness”

এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে পুরোটা শুনছিল সৌমিত্র। সত‍্যিই তো, এই অজ পাড়াগাঁতে এসে, আপাতনিরীহদর্শন এই বড়বাবুটি যে এমন জ্ঞানের আধার তা সে মোটেই প্রথমে আন্দাজ করতে পারেনি। তার সাথে এটাও বুঝতে ওর অসুবিধা হল না যে কার্তিকবাবু এতদিন শুধু উলুবনেই মুক্তো ছড়িয়ে গেছেন আর সেই কারণেই বাজারে তার এত দুর্নাম। সৌমিত্র জিজ্ঞাসা করল

—আচ্ছা বড়বাবু, এগুলো তো না হয় বুঝলাম কিন্তু আধুনিক যুগে অপরাধ ক্ষেত্রে বা আইনানুগভাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ব‍্যবহার কবে থেকে চালু হল? নিশ্চয়ই ইউরোপেই চালু হয়েছিল তাই না?

সৌমিত্রর কথা শুনে স্মিত হাসলেন কার্তিকবাবু। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের অনেক ইতিহাসই আজ বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে! বললেন

—সৌমিত্র, তুমি জঙ্গিপুরের নাম শুনেছ?

—মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর?

—উঁহু, হুগলির জঙ্গিপুর। তা ১৮৫৮ সালে হুগলি জেলার চিফ ম‍্যাজিস্ট্রেট স্যার উইলিয়াম হার্শেল প্রথম সিভিল কনট‍্যাক্টসের শনাক্তকরণের জন‍্য আঙ্গুলের ছাপ নেওয়ার ব‍্যবস্থা আইনানুগভাবে চালু করেন।

—আরিব্বাস, এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা ঘটেছিল এই বঙ্গদেশে! এতো এক অভূতপূর্ব ঘটনা!

—সে তো বটেই, তবে অপরাধী ধরতে অথবা তাদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যে পোক্ত তত্ত্বের দরকার হয় তা কিন্তু এই পর্যন্ত কেউই পরিবেশন করতে পারেননি। পুরোটাই ছিল আনুমানিক এবং ঝাপসা তথ‍্যের ওপর নির্ভরশীল।

—তারপর কী হল?

—১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত "The American Journal of Microscopy and Popular Science" নামক বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকার জুলাই সংখ‍্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ‍্যাত মাইক্রোস্কোপিস্ট থমাস টেইলর তার প্রতিবেদনে অপরাধী শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে হাতের পাতার ছাপ এবং আঙ্গুলের ছাপের পক্ষে সওয়াল করেন।

নিউইয়র্কের একটা সংবাদপত্রে এরপর লেখা হয়

" In a recent lecture, Mr. Thomas Taylor, microscopist to the Department of Agriculture, Washington, D.C., exhibited on a screen & view of the markings on the palms of the hands and the tips of the fingers, and called attention to the possibility of identifying criminals, especially murderers, by comparing the marks of the hands left upon any object with impressions in wax taken from the hands of suspected persons. In the case of murderers, the marks of bloody hands would present a very favorable opportunity. This is a new system of palmistry"

—কিন্তু এটা তো শুধু একটা পথদিশা মাত্র বড়বাবু, টেলরের এই বক্তব্যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, নিশ্চয়তার কথা তো কিছু বলা হয়নি।

—ঠিকই বলেছ সৌমিত্র, তবে এই ঘটনা ঘটার কয়েক বছর পরেই এমন দুটি ঘটনা ঘটে যা অপরাধবিজ্ঞানকে এক যুগান্তকারী ইতিহাসের শরিক করে দেয়।

—কীরকম?

—ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ স্যার ফ্রান্সিস গাইতন, যিনি কিনা আবার স্বনামধন্য চার্লস ডারউইনের তুতো ভাই ছিলেন, ১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দে গবেষণা শুরু করেন ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে । শেষমেশ তিনি ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি প্রকাশ করেন একটি বই, যার নাম "Finger Prints" । স্যার গাইতনই ছিলেন প্রথম ব‍্যাক্তি যিনি বিজ্ঞানসম্মত ব‍্যাখ‍্যা দিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টের অনন‍্যতার তত্ত্ব জনসাধারণের সামনে নিয়ে আসেন। এই বইটিই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম প্রকাশিত বই যেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্টকে প্রথমবারের জন্য শ্রেণীবিন‍্যস্ত করা হয়।

—বাহ্, দারুণ ব‍্যাপার তো! তার মানে ডারউইনের তুতো ভাইও তাঁর মতনই ক‍রিতকর্মা ছিলেন।

—অবশ্যই, আর শুধু তো প্রথম বইটাই নয়, "Decipherment of Blurred Finger Prints" এবং "Fingerprint Directori" নামক বইটিও ওয়াকিবহাল মহলে যথেষ্ট সমাদৃত হয়।

—বাবা! এতো একেবারে গুণের ডিপো!

—সে তো বটেই, আধুনিক ফ্রিকশন রিজ বিজ্ঞানের পথিকৃৎও বলা যায় তাকে।

—আচ্ছা স্যার, দ্বিতীয় ঘটনাটা কী?

—দ্বিতীয় ঘটনাটা বলার আগে বলো তো, তুমি বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করো তাই না?

কথাটা বলে একবার সৌমিত্রর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন কার্তিকবাবু। গতকাল রাতে বিশ্বকাপের খেলা দেখার জন্য যে সৌমিত্র শরীর খারাপের বাহানা করে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ে, সন্দেহটা সেখান থেকেই দানা বাঁধে। আজ সকালে সৌমিত্রর মোবাইলে লিওনেল মেসির ওয়ালপেপারটা সন্দেহকে সত‍্যিতে পরিণত করে। আমতা আমতা করে সৌমিত্র বলল

—ইয়ে মানে স্যার, ওই আর কী!

—চিন্তা নেই, গতকালের ব‍্যাপারে জবাবদিহি চাইবো না, নির্ভয়ে বলো।

—হ‍্যাঁ স্যার, আপনি ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু আমাদের আলোচনার সাথে আর্জেন্টিনার কী সম্পর্ক?

—আছে সৌমিত্র আছে, গভীর সম্পর্ক আছে। ১৮৯২ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আইরেসে ইনস্পেক্টর এদুয়ার্দো আলভারেজ বিশ্বে সর্বপ্রথম অপরাধীকে শনাক্ত করতে ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব‍্যবহার করেন।

—বলেন কী?

—আর বলছি কী! আর ঘটনাটাও ছিল খুব নৃশংস।

—কী রকম?

—ফ্রান্সিসকা রোহাস নামক জনৈকা মহিলা তার দুই পুত্রসন্তানকে খুন করে এবং নিজেকে আক্রান্ত প্রমাণ করার জন্য সেই মহিলা নিজের গলাতেও ছুরি চালিয়ে দেন। রোহাস দোষ চাপানোর চেষ্টা করেন জনৈক এক ব‍্যাক্তির ওপর। কিন্তু রোহাসের দুর্ভাগ্য যে সেই চেষ্টা ব‍্যর্থ হয় ইনস্পেক্টর আলভারেজের তৎপরতায়, কেননা, অপরাধস্থলে একটি দরজার পাল্লায় পাওয়া যায় রোহাসের রক্তাক্ত হাতের ছাপ। আর সেই ছাপ পরীক্ষা করে রোহাসকে খুনি হিসেবে শনাক্ত করে আলভারেজ। এবং এটিই পৃথিবীর প্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্ত করার উদাহরণ।

—বাব্বা, এতো একেবারে ক্রাইম থ্রিলার গল্পের মতন!

—তা একবারেই ঠিক বলেছ, তবে ক্রাইম থ্রিলার গল্পে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণের ইতিহাস কিন্তু বাস্তবের থেকেও পুরোনো।

—তাই নাকি? কী রকম?

—মার্ক টোয়েনের নাম শুনেছ তো?

—অবশ্যই, তিনি তো বিশ্বখ‍্যাত সাহিত‍্যিক।

—ঠিক, আর এই টোয়েনই তার বই "লাইফ অন দ‍্য মিসিসিপি"-তে এক আততায়ীকে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ‍্যমে পাকড়াও করার কথা বলেছেন। সেটাও বুয়েনস আইরেসের ঘটনার প্রায় দশ বছর আগে।

—অভূতপূর্ব ব‍্যাপার, সত‍্যিই এধরণের মানুষের সৃষ্টি এইজন্যই কালজয়ী হয়।

—ঠিকই বলেছ তুমি।

—আচ্ছা স্যার, আমার মনে একটা প্রশ্ন ছিল।

—বলো না।

—আচ্ছা এই যে আমরা এখন দাগী অপরাধীদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে রাখি ভবিষ্যতে তদন্তের সুবিধার জন‍্য, সেই পদ্ধতিটি কারা চালু করেন?

—এই পদ্ধতি চালু হওয়ার পিছনে আছেন পরাধীন ভারতবর্ষের হতভাগ্য দুই বঙ্গসন্তান।

—বলেন কী!

—ঠিকই বলছি। ১৮৯৭ সালে পরাধীন ভারতবর্ষের সিংহাসনে আসীন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে অপরাধীদের আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করে রাখা হবে। সে মতানুযায়ী সেই বছরের শেষেই আমাদের শহর কোলকাতায় অ্যানথ্রোপোলজিকাল ব‍্যুরোতে গড়ে ওঠে বিশ্বের সর্বপ্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব‍্যুরো।

আর অ্যানথ্রোপোলজিকাল ব‍্যুরোকে ফিঙ্গারপ্রিন্টের আঁতুড়ঘর বানিয়ে তোলার পিছনে হাত ছিল যে বঙ্গসন্তানদ্বয় তাঁদের নাম আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র দাস। মূলতঃ এই দুই ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞের হাত ধরে আধুনিক প্রয়োগমূলক ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সূচনা হয়। আজও পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে ফিঙ্গারপ্রিন্টের যে ‘হেনরি সিস্টেম’ এর মাধ‍্যমে অপরাধী শনাক্ত করা হয় তার আবিষ্কর্তা এই দুই বঙ্গসন্তান। কিন্তু পরাধীন ভারতের বাসিন্দা তায় আবার বাঙালি তাই সেই আবিষ্কারের কৃতিত্ব যায় তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরির দখলে।

—ইসস, এরকম ঘটনা সত‍্যিই দুর্ভাগ্যজনক। তবে সে তো আরও কত বাঙালি কৃতীর সাথে এরকম ঘটেই চলেছে। তবে স্যার একটা প্রশ্ন আছে।

—বলো না!

—আচ্ছা এই আজিজুল আর হেমচন্দ্রবাবুর তৈরী করা পদ্ধতি তো অনেক বছর আগেকার, এবং আমরা আজও যদি সেই পদ্ধতির ব‍্যবহার করে থাকি তাহলে কোথাও গিয়ে কি সেই পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন নয়? মানে অনেক পুরোনো তত্ত্বকে নতুন করে ভাঙ্গা-গড়া করা হচ্ছে, নতুন আঙ্গিকে সংশোধন করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রেও কি তার প্রয়োজনীয়তা নেই?

—পুরোনো তত্ত্বের সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মার্কিন মুলুকের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডেরাল ব‍্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশান একবার যা কেলোর কীর্তি করেছিল তাতে চট করে অন্তত ফিঙ্গারপ্রিন্টের বুনিয়াদি তত্ত্বকে কেউ ঘাঁটাবে বলে মনে হয় না।

—বলছেন কী! এফ.বি.আই-ও ভুল করে!

—আলবাৎ করে। একশোবার করে। তোমাকে যে ঘটনার কথা বলব সেটাতেই করেছে। এবং সেই ভুল ক্ষমার অযোগ‍্য!

—কী সেই ভুল স্যার?

—২০০৪ সালে স্পেনের মাদ্রিদ শহরের ট্রেনে বোমা বিস্ফোরণের কথা মনে আছে তোমার?

—অবশ্যই আছে স্যার। সে তো মর্মান্তিক এক ঘটনা! প্রায় দুশো মানুষের মৃত্যু হয় সেই ঘটনায়। জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়দা সম্ভবত স্প‍্যানিশদের ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রতিবাদে ঐ ন‍্যক্কারজনক ঘটনাটা ঘটায়।

—ঠিকই বলেছ তুমি। তা সেই ঘটনার তদন্ত করতে নেমে এফ.বি.আই এক ব‍্যাক্তিকে পাকড়াও করে যার নাম ব্র‍্যান্ডন মেফিল্ড। তা এই মেফিল্ড ছিল একজন ধর্মান্তরিত আমেরিকান মুসলিম। এফ.বি.আই সন্দেহভাজন জঙ্গিদের আঙ্গুলের ছাপের সাথে মেফিল্ড এর আঙ্গুলের ছাপ মেলাতে পারার ফলে তাকে নিজেদের হেফাজতে বন্দী করে।

তবে মেফিল্ডের সৌভাগ্য যে তার পাশে দাঁড়ায় স্প‍্যানিশ পুলিশ প্রশাসন। তাদের বিশেষজ্ঞরা জানান যে পরীক্ষার পদ্ধতিগত ভুলের ফলেই মেফিল্ড এর আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। মার্কিন সংস্থাটি প্রথমে ভুল স্বীকার না করতে চাইলেও পরে চাপের মুখে নিজেদের পরীক্ষার পদ্ধতিগত ভুল স্বীকার করতে বাধ‍্য হয় এবং মেফিল্ডকে দুসপ্তাহ পরে মুক্ত করে দেওয়া হয়। আমেরিকার কোর্টে এইজন্য সংস্থাটিকে তীব্র ভৎসনার সম্মুখীন হতে হয় এবং মেফিল্ডকে ক্ষতিপূরণ বাবদ সংস্থাটিকে কুড়ি লক্ষ মার্কিন ডলার জরিমানাও দিতে হয়‌।

—বাব্বা, এতো পুরো কেচ্ছা, নিশ্চিতরূপে আমেরিকার মুখ পুড়েছিল সে সময়।

—অবশ‍্যই।

—আচ্ছা স্যার, আপনি যে এতকিছু বললেন, তার সাথে বিল্টুর কেসটার কী সম্পর্ক?

—বিল্টু খুনটা একা করেনি সৌমিত্র।

—মানে? এটা কী বলছেন আপনি? পিস্তলে বিল্টুর হাতের ছাপ, ফরেনসিক রিপোর্টেও এসেছে সেই পিস্তলের গুলিই নিমাইয়ের শরীরে ঢুকেছে, তার ওপর নিমাইয়ের শার্টের দুকাঁধে বিল্টুর হাতের ছাপ আর সর্বোপরি বিল্টুর জবানবন্দি। এর পরেও একথা কী করে বলছেন?

—আচ্ছা বিল্টুর সাথে নিমাইয়ের সম্পর্ক কেমন ছিল বলে তোমার মনে হয়?

—একে অপরের রাইভাল গ‍্যাংয়ের ছেলে, তার ওপর বিল্টু আর নিমাইয়ের শত্রুতা তো সর্বজনবিদিত। তাই ভালো সম্পর্ক নয় সে তো বলাই যায়।

—তাহলেই ভাবো, যাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক তারা কি আর রাস্তায় কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে?

—তার মানে?

—মানে বলতে চাইছি যদি গুলি করতেই হয় তাহলে বিল্টু নিমাইয়ের কাঁধৈ হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে কেন? সে তো সামনে বা পিছনে দূরে দাঁড়িয়ে গুলিটা করবে, তাই না?

—ঠিক তো, এরকমভাবে তো ভেবে দেখিনি।

—আচ্ছা বিল্টুদের লিডার, ওই কাউন্সিলরের ছেলে রমেশ, সে ব‍্যাটা কী স্টেটমেন্ট দিয়েছে?

—সে তো বলছে সে ওইদিন কোলকাতা গেছিল, মামার বাড়ি রাতে ছিল আর গতকাল দুপুরে ফিরেছে। যাওয়ার আসার ট্রেনের টিকিট আর গত পরশুর কোলকাতাতে সিনেমা হলের টিকিট দেখিয়েছে।

—আচ্ছা সৌমিত্র, এমনও তো হতে পারে রমেশ টিকিট কেটে গত পরশু সকালে বাড়িতে লুকিয়ে রইল সারাদিন, তারপর রাতে নিমাইকে মেরে দিল। আর তারপর গতকাল সকালে সিনেমার টিকিটটা কাউকে একটা দিয়ে আনিয়ে নিল যেটা আগেই কেটে রেখেছিল।

—তাহলে বিল্টু মিথ‍্যা বলবে কেন?

—সে পয়সা দিলে আর ভয় দেখালে সবাই বলবে।

—আপনি হঠাৎ রমেশকেই সন্দেহ করছেন কেন? সে তো সত‍্যিও বলতে পারে।

—তা পারে, তবে দুটো খটকা আর একটা কানাঘুষো আমাকে রমেশই যে খুনি সেটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে।

—কী সেগুলো স্যার?

—প্রথমত, তোমার নিমাইয়ের বডি নিয়ে আসার পর গতকাল আমি একবার অকুস্থলে যাই, ফরেনসিকের একটা ছেলেকে নিয়ে। তা নিমাইয়ের দেহ যেখানে পড়েছিল তার থেকে প্রায় ১০০ মিটার দক্ষিণে লাইটপোস্টে আমি রক্তমাখা আঙ্গুলের ছাপ দেখতে পাই। সেদিনই নমুনা সংগ্রহ করে আমি কোলকাতার ল‍্যাবে পাঠাই আর রমেশের থেকে সংগ্রহ করা নমুনা তার সাথে হুবহু মিলে যায়।

দ্বিতীয়ত আততায়ী খুন করে খুনের অস্ত্রটা লোপাট ক‍রার বদলে সেটা অকুস্থল থেকে খানিক দূরে ফেলে যাবে কেন?

এটা কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়? ওরা কি এতই বোকা বলে তুমি মনে করো?

—সেটাও তো ঠিক!

—তাহলে এখন কী করবে বলে ঠিক করেছ?

—বিল্টুকে আর একবার ভাল ক‍রে রগড়ানি দিলে হয় না অথবা খানিকটা লোভ বা ভয় দেখালেও হয়তো কাজ হতে পারে!

—সেটা করে কী লাভ হবে?

—কেন স্যার, ওর ঠিক বয়ানটা নিয়ে নেব!

—কোর্টে খাটবে সেটা? বিল্টু তো বলবে যে পুলিশ মারধর করে জোর করে লিখিয়ে নিয়েছে।

সত্যিই আর কোন জবাব থাকল না সৌমিত্রর কাছে। কার্তিকবাবু চেয়ারটা সরিয়ে নিয়ে দরজা দিয়ে বেরোনোর আগে বললেন

—এক কাজ করো সৌমিত্র, আজ বাড়ি ফেরার সময় একবার নতুনপাড়ার দিকটায় ঘুরে এসো। যে ফ্ল‍্যাটের সামনে ঘটনাটা ঘটেছিল তার পাঁচ তলায় এক বৃদ্ধ পুরো বিষয়টা দেখেছে। বছর পাঁচেক আগে ওই বৃদ্ধর জমি রমেশের বাবা কেড়ে নেয়। ফ্ল‍্যাটের নিচে গোলমাল হতে দেখে, ভদ্রলোক বুদ্ধি করে পুরো ঘটনাটা নিজের মোবাইলে ভিডিও করে রেখেছে। আসছে মঙ্গলবার কোর্টে তুলব ভদ্রলোককে, তুমি বরং একজন সশস্ত্র কনস্টেবল নিয়োগ করে দিয়ে এসো।

হতভম্ব হয়ে কার্তিকবাবুর প্রস্থানপথের দিকে তাকিয়ে রইল সৌমিত্র। লোকটা কি জিনিয়াস না ক্ষ‍্যাপা! কেস যদি সমাধান করে ফেলেছে তা হলে ফিঙ্গারপ্রিন্টের এত কথা ফাঁদার কী মানে? তাহলে কি লোকটা ফিঙ্গারপ্রিন্টের গল্পের শেষ পরিচ্ছেদটা বোঝানোর জন‍্যই এত কথা বলল! গ্লানিমিশ্রিত হতাশায় মাথা নাড়তে নাড়তে বড়বাবুর পথ অনুসরণ করল সৌমিত্র।

পাঠকেরা যা পড়ছেন