দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস গেম - অপরেশ পাল

‘এদিকে কাছাকাছি কোথাও হাতের ডানধারে পড়বে মস্ত এক রহস্যময় দ্বীপ’, বলল হইটনি। ‘কী দ্বীপ?’ রেইনসফোর্ড জিজ্ঞেস করল।

‘পুরানো নথিপত্রে নাম পাওয়া যায়- জাহাজডুবির দ্বীপ। অদ্ভুত নাম তাই না? নাবিকদের মনে এই দ্বীপ সম্পর্কে আশ্চর্য একটা ভীতি আছে। জানি না, কেন যে একটা জায়গাকে ঘিরে এরকম কুসংস্কার...’

‘কোন মানে হয় না।’ বললেন রেইনসফোর্ড। বাইরের অন্ধকারের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সে।

চারদিক থেকে যেন চেপে ধরেছে ইয়ট-টিকে গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের স্যাঁতসেঁতে গাঢ় অন্ধকার। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে রাতটাকে।

‘তোমরা তো ভাল চোখ।’ একটু হেসে বলল হুইটনি। ‘চারশো গজ দূর থেকেও তোমাকে দেখেছি এক গুলিতে ঝোপের মধ্যে লুকানো হরিণ ফেলতে। কিন্তু সেই তোমার পক্ষেও এই নিকষ কালো ক্যারিবিয়ান রাতে চার মাইল দূরের আলো দেখা সম্ভব নয়।’

‘চার গজও দেখতে পাচ্ছি না!’ স্বীকার করলো রেইনসফোর্ড। ‘উঃ! মনে হচ্ছে সামনে যেন কালো একটা ভেজা মখমল ঝোলানো।’

‘আমরা যে জায়গায় চলেছি সেটা এত খারাপ না। আর কয়েক দিনেই পৌঁছে যাব। জানোয়ারের জন্যে বিশেষ রাইফেল তো আছেই সঙ্গে। মজা হবে। আমাজানের উজান বেয়ে গেলে ভাল শিকার পাওয়া যাবে। সত্যিই শিকার জিনিসটা অদ্ভুত এক খেলা, তাই না?’

‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা’, রেইনসফোর্ড বলল। ‘হ্যাঁ, ঠিক। তবে তা শুধু শিকারের পক্ষে, জানোয়ারের পক্ষে নয়।’

‘বাজে বোকো না, হুইটনি! তুমি একজন শিকারী, দার্শনিক নয়ও। জানোয়ারের কেমন লাগে না লাগে তাতে কী এসে যায়? কে পরোয়া করে একটা জানোয়ারের অনুভূতির?'

‘হয়তো জানোয়ার করে।’ বললো হুইটনি।

‘বাঃ! ওদের তো কোনও বোধশক্তি নেই।'

‘তাই মনে করি আমরা। কিন্তু আমার মনে হয় একটা জিনিস ওরা পরিস্কার বোঝে—সেটা হচ্ছে ভয়, ব্যথা পাওয়ার ভয়, মৃত্যুর ভয়।’

'আবহাওয়াটা বোধহয় দুর্বল করে দিয়েছে তোমার মন। একটু বাস্তববাদী হও, হুইটনি। পৃথিবীতে শুধু দুটো শ্রেণী আছে--- শিকারী আর শিকার। কপাল ভাল, তুমি আমি শিকারী হয়ে জন্মেছি যাকগে, দ্বীপটা কী ছাড়িয়ে এসেছে এতক্ষণে?’

‘অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না ঠিক। ছাড়িয়ে এসে থাকলে তো খুবই ভাল কথা।’

‘কেন?’ চট করে জিজ্ঞেস করল রেইনসফোর্ড।

‘জায়গাটার একটা খ্যাতি আছে—মানে, কুখ্যাতি।’

‘নরখাদক?’

‘না। নরখাদকরা পর্যন্ত ওই অভিশপ্ত জায়গায় বাস করতে পারে না। কিন্তু নাবিকরা কেমন করে জানি এসব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তুমি খেয়াল করনি, আজ নাবিকদের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা আর অস্থির ভাব?’

‘তাই তো! আমার কাছে কেমন একটু অদ্ভুত ঠেকেছিল, কিন্তু তত খেয়ল করিনি। এখন তোমার কথা শুনে মনে পড়ছে। ক্যাপ্টেন নেলসন পর্যন্ত...’

‘হ্যাঁ! ওই দুর্দান্ত সাহসী সুইডিশ বুড়ো পর্যন্ত! যে কিনা খোদ শয়তানের কাছে গিয়ে আগুন চাইতে পারে। ওর নীল চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি দেখতে পেয়েছি আজ, যা আর কখনও দেখিনি। ওর কাছ থেকে শুধু এটুকুই বের করতে পারলাম: "নাবিকদের জন্যে জায়গাটা অশুভ, স্যার।" তারপর একটু থেমেই আবার বলল: “কিছু অনুভব করতে পারছেন না?” তোমাকে বললে তুমি হাসবে, কিন্তু সত্যি বলছি, সেই মুহূর্তে অদ্ভুত ঠান্ডা কী যেন অনুভব করলাম আমি। একটুও বাতাস ছিল না; সমুদ্রটা ছিল একেবারে স্থির, শান্ত। দ্বীপটার দিকে এগোচ্ছিলাম তখন আমারা। বিশ্বাস কর, হঠাৎ হিম হয়ে গেল বুকের ভেতর—শিউরে উঠলাম কী এক অজানা আশঙ্কায়।’

‘নিছক মনগড়া,’ বলল রেইনসফোর্ড। ‘একজন কুসংস্কারাচ্ছন্ন নাবিক নিজের মনের ভয় দিয়ে পুরো জাহাজের সবার মনে ভয় ধরিয়ে দিতে পারে।’

‘হতে পারে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার কাছে মনে হয় একটা অদ্ভুত ক্ষমতার বলে নাবিকরা আগে থেকেই টের পায় অমঙ্গল বা বিপদ। মাঝে মাঝে ভাবি অমঙ্গল একটা স্পর্শগ্রাহ্য জিনিস, এরও একটা বিশেষ ধরনের তরঙ্গ-বিস্তার আছে, আলো আর শব্দের মত। একটা অশুভ জায়গা চারিদিকে অমঙ্গলের বার্তা ছড়ায়। জায়গাটা এখন ভালোয় ভালোয় পার হয়ে যেতে পারলেই বাঁচা যায়। যাক, আমি এখন শুতে চাললাম, রেইনসফোর্ড।’

‘আমার ঘুম আসছে না। পিছনের ডেকে বসে আরেক ছিলিম তামাক টানব ভাবছি,’ রেইনসফোর্ড বলল।

‘তাহলে চলি আমি। সকালে নাস্তার সময় দেখা হবে।’

‘আচ্ছা এসো।’

এঞ্জিনের চাপা ধুকধুকানি আর প্রপেলার ধাক্কার ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আসছে কানে। এছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ। ডেকের ওপর একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ওর প্রিয় ব্রায়ার পাইপটা টানছে রেইনসফোর্ড। ঘুম ঘুম একটা আচ্ছন্ন ভাব ঘিরে ধরছে ওকে। মনে মনে ভাবল, ‘ইশ্! এত অন্ধকার যে চোখ বন্ধ না করেই ঘুমোনো যায়। রাতেই হবে আমার চোখের পাতা...’

হঠাৎ একটা শব্দে চমকে উঠল রেইনসফোর্ড। ডান দিক থেকে এল শব্দটা ওর কান ভুল শুনতে পারে না। অন্তত এই ব্যাপারে তো নিশ্চয়ই নয়—এ শব্দ সে অনেক শুনেছে। আবার এল শব্দটা, আবার। এই নিশ্চিদ্র অন্ধকারে কে যেন গুলি ছুঁড়ল তিনবার।

বিস্মিত রেইনসফোর্ড লাফিয়ে উঠে ছুটে গেল রেলিং-এর ধারে। যেদিক থেকে এই শব্দটা এল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেদিক নজর করবার চেষ্টা করল সে। কিন্তু মনে হচ্ছে সামনে একটা কালো কম্বল ঝোলানো—কিছুই দেখা যাচ্ছে না ওটা ভেদ করে। দেখার সুবিধে হবে মনে করে রেলিং-এর ওপর ভারসাম্য রেখে উঠে দাঁড়াল সে। একটা দাড়িতে বাড়ি লেগে পাইপটা ছিটকে পড়ে গেল মুখ থেকে। ধরবার চেষ্টা করল সে পাইপটা। বেশি ঝুঁকে পড়ল। একটা ছোট্ট কর্কশ আওয়াজ বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে যখন বুঝল ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছে। পড়েই মুহূর্তে তলিয়ে গেল সে ক্যারিবিয়ান সাগরের রক্তোষ্ণ জলে।

সাঁতার কেটে উপরে ভেসে উঠল সে—চিৎকার করবার চেষ্টা করল। কিন্তু ঢেউয়ের ঝাপটা এসে লাগল চোখে মুখে; লবাণাক্ত পানি হাঁ করা মুখের ভেতর ঢুকে দম আটকে মরার জোগাড় করল। দ্রুত চলে যাচ্ছে ইয়ট সমানের দিকে। দিশেহারার মত ইয়টের অপসৃয়মান আলোর পিছন পিছন ফুট পঞ্চাশেক সাঁতার কেটে থামল সে। জীবনে বহু বিপদের সম্মুখীন হয়েছে সে বুঝল, মাথাটা ঠান্ডা রাখতে হবে এখন। একটা আশা ছিল, কেউ হয়ত ওর চিৎকার শুনে থাকতে পারে। কিন্তু সে সম্ভাবনা কম, কারণ পূর্ণবেগে ছুটে চলে যাচ্ছে ইয়ট। কাপড়-চোপড় খুলে ফেলল রেইনসফোর্ড, নইলে ভেসে থাকতে পারবে না বেশিক্ষণ। তারপর প্রাণপণে চিৎকার করতে থাকল। ক্রমে ইয়েটের আলোগুলো আবছা হয়ে এল, জোনাকীর মত ম্লানভাবে টিপটিপ করছে এখন; তারপর হারিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।

গুলির আওয়াজের কথা মনে পড়ল ওর। ডানদিক থেকে এসেছিল শব্দটা। ধীরে ধীরে এগোল সে ডান দিকে। বেশ অনেকক্ষণ সাঁতার কাটবার পর অবসন্ন হয়ে এল দেহ। মনে হল যেমন কত যুগ ধরে সে কেবল সাঁতার কেটেই চলেছে। আর খুব সম্ভব একশ ফুট এগোতে পারবে, তারপর...       

হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পেল রেইনসফোর্ড। অন্ধকার থেকে ভেসে এল কোন আহত জানোয়ারের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ। কোন জানোয়ারের মুখ থেকে এই চিৎকার বেরোল বুঝতে পারল না সে, বুঝবার চেষ্টাও করল না; আবার নব উদ্যমে সাঁতরে চললে সে শব্দটার দিকে। আবার রাতের নিস্তব্ধতাকে ঘিরে ধ্বনিত হল সেই অপার্থিব তীক্ষ্ণ আর্তনাদ।

তারপরই সেই আর্তনাদকে রুদ্ধ করে দিয়ে এল গুলির শব্দ।

‘পিস্তলের গুলি,’ সাঁতার কাটতে কাটতে বিড়বিড় করে বলল রেইনসফোর্ড। দশ মিনিটের আপ্রাণ চেষ্টার পর সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একটা শব্দ এল কানে। সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে পড়ছে তীরের পাথরের ওপর। কিছু দেখা যাচ্ছে না অন্ধকারে। আন্দাজে ভর করে এগাল রেইনসফোর্ড। কিছুদূর এগিয়ে হঠাৎ হাত ঠেকল পাথরে। ভাগ্যিস বিশেষ ঢেউ ছিল না সাগরে, নইলে চুরমার হয়ে যেত ওর দেহ পাথরে আছড়ে পড়ে। যেটুকু শক্তি অবশিষ্ট ছিল সেটুকু প্রয়োগ করে পানি ছেড়ে উঠল সে। প্রায় খাড়া ভাবে উঁচু হয়ে আছে একড়োখেবড়ো পাথুরে পাড়। বহুকষ্টে পাথরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে উঠে এল। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে ঘন জঙ্গল। এই ঘন ঝোপঝাড় আর গাছপালার মধ্যে ওর জন্য যে কত ভয়ঙ্কর বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে সে কথা ভাবল না রেইনসফোর্ড এখন। ক্লান্ত অবসন্ন দেহটাকে টেনে নিয়ে জঙ্গলের ধারে পৌঁছে সটান শুয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ল সে গভীর নিন্দ্রার কোলে।

চোখ খুলেই সূর্যের দিকে চেয়ে বুঝল রেইনসফোর্ড বিকেল হয়ে গেছে। ঘুমের পর বেশ চাঙ্গা বোধ করছে সে, কিন্তু খিদতে জ্বলছে পেট। এদিক ওদিক চাইল সে অনেকটা খুশি মনে।

‘যেখানে পিস্তল আছে, সেখানে নিশ্চয়ই মানুষ আছে। আর যেখানে মানুষ আছে, সেখানে নিশ্চয়ই খাবার আছে,’ ভাবল রেইনসফোর্ড। ‘কিন্তু এমন একটা বিদঘুটে জায়গায় যারা বাস করে তারা কেমন ধরনের মানুষ?’       

একেবারে তীর থেকেই শুরু হয়েছে গহন অরণ্য, কোথাও ফাঁক নেই এতটুকু। ভেতরের ঢুকবার কোনও রাস্তা দেখতে পাওয়া গেল না। গাছ আর লতাপাতার ঘর বুনোনি দুর্ভেদ্য করেছে এই অরণ্যকে। সাগর-তীর ধরে এগোল সে। অল্প কিছুদূর গিয়েই থমকে দাঁড়াল রেইনসফোর্ড। এক জায়গায় ঝোপঝাড় তছনছ হয়ে আছে, আগাছা আর লতাপাতা ছিন্ন-ভিন্ন। পাথরে গায়ের শেওলা উঠে গেছে একেকখানে। তারপরেই চোখ পড়ল রক্ত পড়ে কালচে-লাল হয়ে আছে বেশ খানিকটা জায়গা। কোনও বড়-সড় জন্তু হবে। খানিকটা দূরেই একটা ছোট চকচকে জিনিস চোখে পড়ল। তুলে নিল সেটা হাতে। কারট্রিজের খোলা একটা।

‘পয়েন্ট-টু-টু ক্যালিবার,’ বলল ও। ‘আশ্চর্য! জন্তুটা তো বেশ বড়ই মনে হল। শিকারীয় বুকের পাটা আছে বলতে হবে। বোঝা যাচ্ছে এত হালকা অস্ত্রের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ করেছে জানোয়ারটা। খুব সম্ভব প্রথম যে তিনটে গুলির শব্দ পেয়েছিলাম, সেগুলো দিয়ে জখম করেছিল শিকারী এটাকে। আর পিছন পিছন অনুসরণ করে এসে শেষের গুলিটা দিয়ে খতম করেছে।’

ভাল হবে পরীক্ষা করল সে মাটিটা, তারপর যা খুঁজছিল পেয়ে গেল। শিকারীর জুতোর দাগ। খাড়া উঁচু পাড় ধরে ও যেদিকে যাচ্ছিল সেদিকেই গেছে পদচিহ্ন। সন্ধ্যা লেগে আসছে। সেই পথ ধরেই চলল রেইনসফোর্ড। পিচ্ছিল পচা কাঠের ওপর কিংবা আলগা পাথরে পড়ে ফস্কে যাচ্ছে পা--- কিন্তু এগিয়ে চলল সে।

আবছা অন্ধকার নেমে আসছে সাগরে, জঙ্গলে। হঠাৎ মোড় ঘুরতেই অনেকগুলো বাতি দেখতে পেল রেইনসফোর্ড। গ্রামের মত মনে হচ্ছে দূর থেকে। কিন্তু কিছুদূর এগিয়েই অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে দেখল সব আলোই আসছে প্রকাণ্ড একটা প্রাসাদ থেকে। বিরাট উঁচু কাঠামোর নক্সা অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সাগর তীরে খাড়া উঁচু পাড়ের তীরে করা হয়েছে এই প্রাসাদটিকে—পদলেহন করছে সমুদ্র।

‘মরীচিকা!’ ভাবল রেইনসফোর্ড। কিন্তু যখন চোখা শিক বসান লোহার দরজার গেটটা খুলল তখন বুঝল মরীচিকার মাথা নয়, সত্য। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই প্রকাণ্ড একটা দরজা, দরজার লোহার কড়া, সবই সত্য—কিন্তু তবু যেমন একটা অবাস্তব ছমছমে ভাব বিরাজ করছে।

কড়াটা মরচে ধরে শক্ত হয়ে আছে, যেন কোনদিন কেউ ব্যবহার করেনি এটা। লোহার কড়া ধরে নাড়া দিল সে। এত জোরে আওয়াজ হল যে নিজেই চমকে উঠল রেইনসফোর্ড। মনে হল ভেতরে যেন কারও পদশব্দ শোনা গেল। কিন্তু দরজাটা বন্ধই থাকল। আবার কড়া নাড়ল সে। এবার হঠাৎ খুলে গেল দরজাটা এক ঝটকায়। ভেতর থেকে উজ্জ্বল আলো এসে চোখের ওপর পড়তেই ধাঁধিয়ে গেল ওর চোখ। আলোটা সহ্য হয়ে যেতেই চোখ পড়ল প্রকাণ্ড দৈত্যের মত একটা চেহারা। জীবনে এত বিশাল চেহারার মানুষ আর দেখেনি রেইনসফোর্ড। পেটা শরীর, নাভি পর্যন্ত ঘোর কালো দাড়ি। পরিধানে কালো উর্দি। এক হাতে একটা লম্বা ব্যারেলের রিভলভার সেটা সোজা রেইনসফোর্ডের হৃৎপিণ্ডের দিকে লক্ষ করে ধরা। কালো দাড়ির জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে ক্ষুদ্র দুটো উজ্জ্বল চোখ লক্ষ করছে রেইনসফোর্ডকে।       

‘ভয় পেয়ো না,’ হাস্যকর শোনাল কথাটা রেইনসফোর্ডের মুখে। ‘আমি ডাকাত নই। ইয়েট থেকে পড়ে গিয়েছিলাম সাগরে। আমার নামে সেঞ্জার রেইনসফোর্ড, বাড়ি নিউ ইয়র্ক।’

একটুও বদলাল না দৈত্যের চোখের ভয়ঙ্কর দৃষ্টি। রিভলভারটা এমন স্থিরভাবে ধরে রয়েছে লোকটা যে মনে হচ্ছে যেন মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ও যে রেইনসফোর্ডের কথা বুঝতে পারল, তা মনে হল না। যেন কথাগুলো শুনতেও পায়নি।

‘আমি নিউ ইয়র্কের সেঞ্চার রেইনসফোর্ড,’ আবার বলল সে। ‘একটা ইয়ট থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি ক্ষুধার্ত।’

কোনও উত্তর নেই। বুড়ো আঙুল দিয়ে রিভলভারের হ্যামারটা তুলল লোকটা ওপরে। এমন সময়ে রেইনসফোর্ড দেখল শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল লোকটার, খটাং করে দুই বুটের গোড়ালিতে বাড়ি মেরে খালি হাতটা কপালে তুলে সামরিক কায়দার স্যালিউট করল সে। রেইনসফোর্ডকে নয়—আরেকজন লোক নেমে আসছে চওড়া মার্বেল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে। ঋজু, লম্বা, একহারা চেহারা। চমৎকার আধুনিক ছাঁটের। এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল লোকটা।

মার্জিত কণ্ঠে যথেষ্ট সৌজন্যের সঙ্গে লোকটা বলল, ‘আপনার মত একজন স্বনামধন্য শিকারীকে স্বাগত জানাতে পারে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং সম্মানিত বোধ করছি, মি. সেঞ্জার রেইনসফোর্ড। আপনার পদধূলি লাভ করে আমার এই প্রাসাদ ধন্য হল আজ,’ করমর্দন করল দুজন।

‘তিব্বতের তুষার-চিতাবাঘ শিকার সম্পর্কে আপনার মূল্যবান বইটি পড়েছি আমি। আমার নাম জেনারেল য্যারফ্।’

প্রথমেই রেইনসফোর্ডের চোখে পড়ল লোকটির আকর্ষণীয় চেহারা। দ্বিতীয়ত, মুখের আদলে লোকটা অদ্ভুত মৌলিক ছাপ। ভদ্রলোক লম্বা, প্রৌঢ়, মাথার চুল ধবধবে সাদা, কিন্তু ঘন ভুরু আর গোঁফ কুচকুচে কালো। চোখ জোড়াও অত্যন্ত কালো আর উজ্জ্বল, চোয়ালটা একটু উঁচু, চোখা নাক, বাদামী গায়ের রঙ--- দেখলেই বোঝা যায় এই লোক হুকুম করতেই অভ্যস্ত, তামিল করতে নয়, রীতিমত সম্ভ্রান্ত-বংশীয়। উর্দি পরা দৈত্যের দিকে ফিরে একটা ইঙ্গিত করল জেনারেল। রিভলভারটা কোমরে গুঁজে রেখে আবার স্যালিডিট ঠুকলো দৈত্যটা। তারপর চলে গেল ভেতরে।

‘অসম্ভব শক্তি ইভানের দেহে,’ বলল জেনারেল। ‘কিন্তু দুর্ভাগ্য, কথাও বলতে পারে না, কানেও শুনতে পায় না। সাদাসিধে মানুষ, কিন্তু ওর জাতের আর সবারই মত একটু বর্বর, বন্য স্বভাবের। ও একজন কশাক্,’ মৃদু হেসে বলল জেনারেল। লাল ঠোঁট আর ছুঁচালো দাঁত দেখা গেল। ‘আমিও তাই। কিন্তু আসনু, এখানে দাঁড়িয়ে গল্প করা ঠিক হচ্ছে না। পরে অনেক গল্প হবে। এখন আপনার সবচেয়ে আগে প্রয়োজন কাপড়, আহার এবং বিশ্রামের। সব পাবেন। এই জায়গাটার অদ্ভুত একটা মায়া আছে—প্রশান্তি দিয়ে ঘেরা।’

আবার ফিরে এসেছে ইভান। মুখ থেকে একটিও শব্দ বের না করে কেবল ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলল ওকে জেনারেল।

‘ইভানের সঙ্গে যান দয়া করে, মি. রেইনসফোর্ড। আপনি যখন এলেন ঠিক তখুনি খেতে বসতে যাচ্ছিলাম আমি। এখন আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আশা করি আমার কাপড় আপনার গায়ে ঠিকই হবে।’

প্রকাণ্ড একখানা ঘরের মধ্যে ছ’জন শোয়া যায় এমন একটা চাঁদোয়া খাটনো মস্ত খাট পাতা। নীরব দৈত্যের পিছু পিছু এসে ঢকুল রেইনসফোর্ড সেই ঘরে। একটা স্যুট বের করে দিল ইভান। ওটা পরবার সময়েই রেইনসফোর্ড লক্ষ করল যে ওটা লন্ডনের এমন একটা দর্জির দোকান থেকে তৈরি, যারা সাধারণত মর্যাদার থেকে ডিউকের নিচের কারও কাপড় সেলাই করে না।

যে ডাইনিং-রুমে ওকে নিয়ে গেল ইভাবন সেটা বহু দিক থেকেই অসাধারণ। মধ্যযুগীয় একটা জাঁকজমকপূর্ণ ভাব বিরাজ করছে ঘরটায়। সামন্ত যুগের একজন ব্যারনের হলঘরের কথা মনে পড়ে যায়। উঁচু ছাদ, ওক্ কাঠের প্যানেল, দুই কুড়ি লোক বসে ভোজ খাওয়া যায় এমন বিশাল একখানা টেবিল। ঘরের দেয়ালে বহু রকম জন্তু-জানোয়ারের মাথা টাঙ্গানো--- সিংহ, বাঘ, হাতি, হরিণ, ভালুক। জীবনে এগুলোর চেয়ে বড় আর এত সুন্দর নমুনা দেখেনি রেইনসফোর্ড। প্রকাণ্ড টেবিলটা সামনে নিয়ে বসে আছে জেনারেল য্যারফ্, একা।

‘আসুন, মি. রেইনসফোর্ড, একটা ককটেল দিয়ে শুরু করা যাক।’

ককটেলটা সত্যিই অপূর্ব। রেইনসফোর্ড লক্ষ করল, টেবিলের সব কিছুই অত্যন্ত উঁচু শ্রেণীর—দস্তরখান, কাঁচের সরঞ্জাম, রূপোর চামচ, চিনামাটির বাসন-পেয়ালা; সব কিছুই উন্নত রুচি এবং প্রচুর বিত্তের পরিচয় বহন করে।

র্বশ্ খেল ওরা। লাল স্যুপের মধ্যে দুধের সর ফেটে মেশানো, আর সেই সঙ্গে বিভিন্ন মশলা--- রাশানদের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। জেনারেল য্যারাফ্ বলল, ‘সভ্য জগতের সব রকম সুখ সুবিধাই আহরণ কররবার চেষ্টা করি আমার এখানে। কিন্তু হয়ত ত্রুটি আছে, নিজ গুণে ক্ষমতা করবেন, মি. রেইনসফোর্ড। আপনি তো জানেনই এ জায়গাটা সভা জগৎ থেকে কত দূরে। আপনার কি মনে হয় দীর্ঘ সমুদ্র যাাত্রায় শ্যাম্পেনটার গুণ কিছু নষ্ট হয়েছে?’

‘একবিন্দুও না,’ বলল রেইনসফোর্ড। জেনারেলের আতিথেয়তা ত্রুটিশূন্য। কিন্তু একটা ব্যাপারে খুবই অস্বস্তি বোধ করছে জেনারেল—যেন ওর মূল্য নিরূপণ করবার চেষ্টা করছে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে।

‘হয়তো আশ্চর্য হয়েছেন আপনি কেবল নাম শুনেই আপনার পরিচয় বলে দেয়ায়, তাই না?’ বলল জেনালের য্যারফ্। ‘কিন্তু ব্যাপার কী জানেন, ইংরেজি, ফরাসী বা রাশান ভাষায় শিকারের ওপর লেখা যত বই আছে তার প্রত্যেকটি পড়েছি আমি। জীবনে কেবল একটা জিনিসই প্রবল ভাবে আকর্ষণ করে আমাকে, সেটা হচ্ছে শিকার।’

চমৎকার রান্না করা ফিলেট মিগ্নন্ খেতে খেতে রেইনসফোর্ড বলল, ‘গোটাকতক অপূর্ব মাথা জোগাড় করেছেন আপনি। আজ পর্যন্ত আমি যতগুলো মহিষ দেখেছি তার মধ্যে আপনার এই কেপ্-বাফেলোটাই সবচেয়ে বড়।’

‘ও, ওইটা। হ্যাঁ, ওটা ছিল বিশাল দানব।’

‘তাড়া করেছিল আপনাকে?’

‘ছুঁড়ে ফেলেছিল একটা গাছের ওপর। মাথার খুলি ভেঙ্গে গেছিল তো আমার। কিন্তু শয়তানটাকে আমিও ছাড়িনি।

‘আমার ধারণা, সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকার হচ্ছে এই কেপ-বাফেলো।’

এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল জেনারেল। লাল ঠোঁট বের করে অদ্ভুত একটা হাসি হাসল সে। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল, ‘না। আপনার ধারণা ভুল। কেপ-বাফেলো পৃথিবীর সবচাইতে বিপজ্জনক শিকার নয়।’ এক চুমুক মদ খেয়ে নিয়ে সেই একই ভাবে আবার বলল, ‘এখানে এই দ্বীপের জঙ্গলে তার চেয়েও বিপজ্জনক শিকার করি আমি।’

‘এই দ্বীপে হিংস্র জানোয়ার আছে নাকি? বিস্ময় প্রকাশ করল রেইনসফোর্ড। গত রাতের সেই মর্মস্পর্শী আর্তনাদ আর আজ সন্ধ্যার সেই রক্তের দাগের কথা মনে পড়ল ওর।’

‘হিংস্রতম!’ মাথা নাড়ল জেনারেল।

‘সত্যি?’

‘হ্যাঁ। অবশ্য স্বাভাবিকভাবে এই দ্বীপে থাকে না ওরা। আমাকে জোগাড় করে এনে ছাড়তে হয়।’

‘কী আমদানি করেছেন জেনারেল? বাঘ?’

‘না।’ একটু হাসল জেনারেল। ‘বছর কয়েক আগেই বাঘ শিকারের আগ্রহ আমার নষ্ট হয়ে গেছে। সব রকম উপায়েই বাঘ মেরেছি আমি। ওতে আর কোন মজা নেই, সত্যিকার বিপদও নেই কোনও। বিপদ ছাড়া আমার আনন্দ হয় না শিকারে।’

পকেট থেকে একটা সোনার সিগারেট কেস বের করল জেনারেল। কালো লম্বা সিগারেট, একদিকে রূপালী কাগজ মোড়ানো। অতিথির দিকে একটা বাড়িয়ে দিয়ে নিজে একটা ধরাল। ধোঁয়ায় মিষ্টি সুবাস।

‘চমৎকার শিকার জমবে কদিন। আপনি আর আমি। আপনার সঙ্গ পেলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হব, মি. রেইনসফোর্ড,' বলল জেনারেল।’

‘কিন্তু কী শিকার...’

‘বলব। আমি জানি, শুনলে আপনি খুবই মজা পাবেন। আমার মনে হয় যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে আমি দাবি করতে পারি যে একটা অসাধারণ কাজ করেছি আমি। অপূর্ব একটা চাঞ্চল্যকর ব্যাপার আবিষ্কার করেছি। আরও খানিকটা পোর্ট ঢেলে দেব আপনার গ্লাসে, মি. রেইনসফোর্ড?’

‘দিন। ধন্যবাদ।’

দুটো গ্লাসই ভর্তি করে নিয়ে আবার শুরু করল জেনারেল, ‘কিছু লোককে খোদা কবি বানিয়ে পাঠায়, কাউকে রাজা, কাউকে কাঙাল! আর আমাকে বানিয়েছে শিকারী। বাবা বলতেন আমার আঙুল নাকি তৈরিই হয়েছে ট্রিগারের জন্য। উনি ছিলেন মস্ত বড়লোক। ক্রিমিয়াতে আড়াই লক্ষ একর জমি ছিল ওঁর। উনি নিজেও একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন মনেপ্রাণে। আমার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখনই তিনি মস্কো থেকে অর্ডার দিয়ে আমার জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি একটা বন্দুক কিনে এনেছিলেন চড়ুই মারব বলে। যখন ওঁর গোটাকতক শখের মোরগ খতম করে দিলাম, উনি শাস্তি দেননি আমাকে, বরং আমার হাতের টিপের প্রশংসা করেছেন। আমার যখন দশ বছর বয়স তখনই আমি আমার জীবনের প্রথম ভালুক মারি ককেশাসে। এরপর থেকে আমার সারাটা জীবনই একটা লম্বা শিকারের কাহিনী। সেনা-বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম আমি--- সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলেদের তাই রেওয়াজ ছিল আমাদের দেশে। কিছুদিন কশাক ক্যাভল্রির একটা ডিভিশনের সেনাপতিও ছিলাম। কিন্তু আমার আসল আকর্ষণ ছিল শিকার। প্রত্যেকটি দেশের প্রত্যেক রকম শিকার করেছি আমি। জীবনের কত প্রাণী যে আমি মেরেছি তার হিসেব দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব।’ কিছুক্ষণ চুপচাপ সিগারেট ফুঁকল জেনারেল।

‘রশিয়ায় যখন বিপ্লব এল আমি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলাম, কারণ জারের কর্মচারীর পক্ষে ওখানে থাকা নিতান্ত আহাম্মকির কাজ হত। বহু সম্ভ্রান্ত রাশান সর্বস্ব খুইয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে আমি মোটা টাকা খাটিয়েছিলাম আমেরিকান সিকিউরিটিতে। কাজেই মণ্টিকার্লোতে চায়ের দোকান কিংবা প্যারিসে ট্যাক্সি চালাতে হবে না কোনদিন আমাকে। স্বাভাবিকভাবেই শিকার করতে থাকলাম আমি নিশ্চিন্ত মনে রকি পর্বতে ধূসর ভালুক, গঙ্গানদীর কুমীর, পূর্ব আফ্রিকার গণ্ডার। আফ্রিকাতেই ঐ কেপ-বাফেলো আমার কুলি ফাটিয়ে দিয়েছিল; ছয়মাস হাসপাতালে পড়ে থাকতে হয়েছিল আমাকে। সেরে উঠেই জাগুয়ার মারতে ছুটলাম আমাজানের দিকে। কারণ, শুনেছিলাম অস্বাভাবিক চতুর ওরা। চুতর না ছাই!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল জেনারেল, ‘একটা শক্তিশালী রাইফেল হাতে বুদ্ধিমান একজন শিকারীর কাছে কিছু নয়। তিক্ততায় ভরে উঠল আমার মন, হতাশায় ভেঙ্গে পড়লাম। এক রাতে ভয়ঙ্কর মাথা-ধরা অবস্থায় তাঁবুতে শুয়েছিলাম, এমন সময়ে হঠাৎ একটা সাঙ্ঘাতিক কথা মনে এল আমার। শিকারে একঘেয়েমি এসে গেছে। অথচ শিকারই আমার জীবনের সবকিছু। শুনেছি অনেক আমেরিকান ব্যবসায়ীদের ব্যবসাটাই জীবনের সবকিছু—হঠাৎ যদি কোন কারণে তাদের সরে যেতে হয় ব্যবসা থেকে, তাহলে জীবনের আর কোনও মূল্যই থাকে না তাদের কাছে, একেবারে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যায়।’

‘হ্যাঁ, তা ঠিক,’ বলল রেইনসফোর্ড।

মৃদু হাসল জেনারেল। ‘ভেঙে খান খান হয়ে যাবার ইচ্ছে ছিল না আমার। কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে আমাকে। দেখুন, আমার মনটা হচ্ছে বিশ্লেষকের মন। নিঃসন্দেহে এই কারণেই শিকারের সমস্যাগুলো এত আনন্দ দেয় আমাকে।’

‘আমারও তাই বিশ্বাস, জোনারেল য্যারাফ্।’

‘কাজেই, আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কেন শিকারে আর মজা পাচ্ছি না। আপনি বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক ছোট, মি. রেইনসফোর্ড, এবং আমার মত অত শিকারও করেননি, কিন্তু তবু আপনি হয়ত উত্তরটা আঁচ করতে পারবেন।’

‘পারছি না।’

‘সাধারণ কথা—শিকারের মধ্যে আমোদটা আর ছিল না। অত্যন্ত সহজ হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা। সব সময় আমি যা শিকার করতে চেয়েছি, মেরেছি। সব সময়। নির্ভুল হওয়ার মত একঘেয়ে ব্যাপার আর কিছুই নেই।’

আরেকটি সিগারেট ধরাল জেনারেল।

‘একটি প্রাণীও আমার হাত থেকে আর নিস্তার পেল না। গর্ব নয়, এটা গাণিতিক নিশ্চয়তা। জানোয়ারের চারটে পা আর সহজাত প্রাবৃত্তি ছাড়া আর তো কিছু নেই। বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে সহজাত প্রবৃত্তি পারবে কেন? যখন এইসব চিন্তা করছিলাম, সত্যি বলছি, সেটা ছিল এক এক অদ্ভুত বেদনার মুহূর্ত।’

শুনতে শুনতে কথার মধ্যে ডুবে গিয়েছে রেইনসফোর্ড। আরেকটু ঝুঁকে বলল সে।

‘যখন হতবুদ্ধি হয়ে ভাবছি কী করা যায়, তখন হঠাৎ স্বর্গীয় প্রত্যাদেশের মত একটা কথা মনে এল।’

‘কী কথা?’ জিজ্ঞেস করল রেইনসফোর্ড।

চোখ মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল জেনারেলের। সাফল্যের একটা নীরব হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে। ‘নতুন একটা প্রাণী আবিষ্কার করলাম।’

‘নতুন প্রাণী! ঠাট্টা করছেন?’

‘মোটেও না,’ জেনারেল বলল। ‘শিকার নিয়ে কখনও ঠাট্টা করি না আমি। একটা নতুন প্রাণীর প্রয়োজন ছিল আমার। পেয়ে গেলাম। তাই এই দ্বীপটা কিনে বাড়ি তৈরি করলাম এখানে। এখানেই আমি শিকার করি। আমার কাজের জন্য চমৎকার এই দ্বীপটি। জঙ্গল আছে, গোলক ধাঁধার মত জংলা পথ আছে, পাহাড় আছে, ঝিল আছে।’

‘কিন্তু সেই জানোয়ারটার নাম তো বললেন না, জেনারেল?’

‘ওহ, পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ শিকার সেটা। এর সাথে অন্য কোনও শিকারের তুলনা হয় না। প্রতিদিন শিকার করি আমি, এবং এখন আমি আর একঘেয়েমিতে ভুগি না। কারণ আমার শিকার বুদ্ধিতে আমার সমকক্ষ।’ হতবুদ্ধি হয়ে বসে রইল রেইনসফোর্ড।

‘আমি শিকারের জন্য আদর্শ কেটি প্রাণী খুঁজছিলাম। নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, আদর্শ শিকারের কী কী গুণ থাকা দরকার? উত্তর এল, সাহস থাকতে হবে, কৌশলী হতে হবে কিন্তু সবচেয়ে বড় যে গুণ—বিচার-বুদ্ধি থাকতে হবে।’

‘কিন্তু কোনও জানোয়ারেই বিচার-বুদ্ধি নেই,’ বাধা দিয়ে বলে রেইনসফোর্ড।

‘আছে জনাব, আছে। একটা প্রাণীর আছে।’

‘আপনি কি বলতে চান...’

‘হ্যাঁ। তাই। কেন নয় শুনি?’

‘এটা নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর একটা ঠাট্টা, জেনারেল য্যারফ্। আপনি ঠাট্টা করছেন আমার সঙ্গে।’

‘কেন ঠাট্টা করতে যাব? শিকার সম্পর্কে কথা বলছি আমি।’

‘শিকার? হায় খোদা! আপনি যা বলছেন তা তো খুন!’

প্রাণ খুলে হেসে উঠল এবার জেনারেল। রেইনসফোর্ডের দিকে কৌতুকের দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, ‘আমার বিশ্বাস হয় না আপনার মত একজন আধুনিক এবং সভ্যতার আলোকপ্রাপ্ত যুবকের মাথায় মানুষের জীবন সম্পর্কে এমন উদ্ভট ভাবপ্রবণতা রয়ে গেছে। নিশ্চয়ই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা...’

‘যুদ্ধ আমাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করতে শেখায়নি, জেরারেল!’ রূঢ় কণ্ঠে বলল রেইনসফোর্ড।

আবার একবার ঘর কাঁপিয়ে ফেটে পড়ল জেনারেল হাসিতে।

‘আশ্চর্য মজার লোক দেখছি আপনি? আধুনিক যুগের একজন উচ্চশিক্ষিত যুবকের মধ্যে এরকম সেকেলে ভিক্টোরিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান, ভাবতেও তাজ্জব লাগছে আমার। এ যেমন হাল ফ্যাশানের মোটর গাড়ির মধ্যে নস্যির কৌটাটা। আপনার পূর্ব-পুরুষ নিশ্চয়ই পিউরিটার ছিল, বহু আমেরিকানের পূর্বপুরুষই তাই। আমি বাজি রেখে বলতে পারি একদিন আমার সাথে শিকারে গেলেই আপনার সমস্ত ধারণা পাল্টে যাবে। সত্যিকার রোমাঞ্চ অপেক্ষা করছে আপনার জন্যে মি. রেইনসফোর্ড।’

‘ধন্যবাদ। আমি একজন শিকারী, খুনী নই।’

‘হায় কপাল!’ বলল জেনারেল একটু অসন্তুষ্ট হয়ে। ‘আবার সেই অপ্রীতিকর শব্দটা ব্যবহার করছেন। আমি প্রমাণ করে দেব যে আপনার এই অহেতুক সঙ্কোচ ও বিবেকদংশন সত্যিই একেবারে ভিত্তিহীন।’

‘প্রমাণ করুন।’

‘জীবনটা শক্তিশালীর ভোগের জন্যে, প্রয়োজন হলে জীবন গ্রহণ করবার অধিকার আছে তার। দুর্বলদের পাঠানো হয়েছে কেবল শক্তিমানদের আনন্দ দেবার জন্যে। আমি শক্তিশালী। কেন আমি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করব না? আমার যদি শিকার করার ইচ্ছে হয়, কেন করব না? এই পৃথিবীর যত দুর্বল অপদার্থদের শিকার করি আমি--- ভবঘুরে জাহাজের নাবিক সব। কালো, সাদা, সঙ্কর, সব রকম। ভাল জাতের একটা ঘোড়া বা কুত্তারও তো এদের এককুড়ি লোকের চেয়ে দাম বেশি।’

‘কিন্তু তারা মানুষ,’ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল রেইনসফোর্ড।

‘ঠিক বলেছেন,’ বলল জেনারেল। ‘সেজন্যেই তো ওদের ব্যবহার করি আমি। বেশ আনন্দও পাই। যতটুকু হোক, বুদ্ধি তো আছে ওদের, কাজেই ওরা বিপজ্জনক।’

‘কোথায় পান ওদের?’

বাঁ চোখটা টিপল জেনারেল। ‘এই দ্বীপকে বলা হয় জাহাজডুবির দ্বীপ। মাঝে মাঝে কোনও রাগান্নিত সমুদ্র-দেবতা পাঠায় এদেরকে আমার কাছে। আর মাঝে মাঝে যখন দেবতা আমার প্রতি দয়া দেখাতে কার্পণ্য করে, আমি দেবতাকে সাহায্য করি অল্পবিস্তর, হরেদরে বেশ পুষিয়ে যায়। জানালার ধারে চলুন দেখাচ্ছি।’

জানালার ধারে গিয়ে বাইরে সমুদ্রের দিকে চাইল রেইনসফোর্ড।

‘দেখুন! ওই দূরে!’ অন্ধকারের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল জেনারেল। প্রথমে কেবল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার দেখতে পেল রেইনসফোর্ড, তাপর যেই জেনারেল একটা বোতাম টিপল, অমনি দূরে সমুদ্রের মধ্যে অনেকগুলো বাতি জ্বলে উঠল একসাথে।

লাল ঠোঁট বের করে হাসল জেনারেল। ‘ওগুলো এমন একটা দিকে পথ নির্দেশ করছে, যেদিকে সত্যি সত্যি কোন পথ নেই। প্রকাণ্ড সব ক্ষুরধার কিনারা বিশিষ্ট পাহাড় হাঁ করা সামুদ্রিক দৈত্যের মত ওঁৎ পেতে আছে। চুরমার করে দিতে পারে ওরা যে কোন জাহাজ অতি সহজেই, ঠিক আমি যেমন ভাবে এই আখারোটটা ভাঙছি।’ কাঠের মেঝের ওপর একটা আখরোট ফলে জুতো দিয়ে মড়িয়ে চুরমার করে দিল জেনারেল। তারপর যেন কোন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে এমন ভাবে আবার বলল, ‘ও হ্যাঁ ইলেকট্রিসিটি আছে। এখানে। সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে চলবার চেষ্টা করি আমরা এখানে যতদূর সম্ভব।’

‘সভ্য! মানুষ খুন করে সভ্যতা?’

জেনারেলের কালো চোখে রাগের আভাস পাওয়া গেল, কিন্তু সে কেবল এক সেকেন্ডের জন্যে। অত্যন্ত ভদ্রভাবে বলল, ‘আহাহা, কী পূণ্যবান ন্যায়পরায়াণ যুবক আপনি! একথা আমি জোরের সাথেই বলতে পারি, যে কাজটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন আপনি, সেটা আমি কক্ষনো করি না। সেটা বর্বরতা। এই মেহমানদের আমি সব রকমের সুবিধা দান করি। প্রচুর পরিমাণে ভাল খাবার খেয়ে আর ব্যায়াম অভ্যাস করে রীতিমত চমৎকার স্বাস্থ্য হয় প্রত্যেকের। কাল সে আপনি নিজ চোখেই দেখতে পারেন।’

‘তার মানে?’

‘আমাদের ট্রেনিং স্কুলটা পরিদর্শন করতে যাব কাল আপনাকে নিয়ে। মাটির নিচের একটা ঘরে সেই স্কুল। জনা বারো ছাত্র এখন আছে সেখানে। এরা সব “স্যান লুকার” বলে একটা স্প্যানিশ জাহাজ থেকে এসেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে জাহাজটা ওই ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সত্যি বলতে কী, খুবই নিচু স্তরের লোক এগুলো--- খারাপ স্বাস্থ্য, তার ওপর জাহাজের ডেক ছাড়া বোঝে না আর কিছু, জীবনে জঙ্গলে প্রবেশ করেনি বোধহয়।’

একটা হাত উঁচু করতেই ঘন টার্কিশ কফি নিয়ে এল ইভান। জিভে জল আসা গন্ধ সে ধূমায়িত কাপে।

বলেই চলল জেনারেল। ‘এটা একটা খেলার মত। বুঝতে পাররেছন? ওদের মধ্যে থেকে একজনকে হয়ত আমি বললাম, আসুন শিকারে যাওয়া যাক। সাথে খাবার দিলাম কিছু, আর একখানা চমৎকার ছুরি। ঘণ্টা তিনেক আগে রওনা করে দিলাম। আমার সাথে থাকবে কেবল ক্ষুদ্রতম ক্যালিবার ও ন্যূনতম পাল্লার একখানা পিস্তল। যদি আমার শিকার তিন দিন আমার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারে তবে সে জিতে গেল। আর যদি আমি ধরে ফেললাম,’ মৃদু হাসল জেনারেল। ‘তো হেরে গেল।’

‘যদি সে রাজি না হয় এই খেলায়?’

‘হ্যাঁ, তাকে মনোনয়নের সুযোগ দেয়া হয়। ইচ্ছে করলে সে নাও যেতে পারে শিকারে। যদি সে যেতে না চায় তবে ইভানের হাতে সমর্পণ করি আমি তাকে। ইভান একসময়ে মহান জারের অপরাধীদের ওপর চাবুক চালাবার জন্যে সরকারীভাবে নিযুক্ত হবার সম্মান লাভ করেছিল। তাছাড়া নির্যাতন সম্পর্কে ওর নিজস্ব কিছু মতবাদ আছে। নিঃসন্দেহে, মি. রেইনসফোর্ড, নিঃসন্দেহে ওরা শিকারের যাওয়াই স্থির করে।’

‘যদি তারা জেতে?’

জেনারেলের মুখের হাসিটা আরও একটু বিস্তৃত হল। ‘আজ পর্যন্ত আমি হারিনি।' কথটা বলেই সঙ্গে সঙ্গে আবার যোগ করল, ‘আপনি আমাকে একটা হাম্বাগ মনে করুন এটা আমি চাই না, মি. রেইনসফোর্ড। সত্যি বলতে কী, ওদের বেশির ভাগই অতি সাধারণ স্তরের মানুষ--- তেমন কোন সমস্যা সৃষ্টি করতেই পারে না। তবে হ্যাঁ মাঝে মাঝে এক আধটা দুর্দান্ত তাতার পাওয়া যায়। একজন তো প্রায় জিতেই যাচ্ছিল। শেষকালে কুত্তা লেলিয়ে দিতে হয়েছিল আমাকে।’

‘কুকুর!’

‘হ্যাঁ। এদিকে আসুন দেখাচ্ছি।’

একটা জানালার ধারে নিয়ে গেল জেনারেল রেইনসফোর্ডকে। জানালা দিয়ে নিচের উঠানে পড়েছে খানিকটা আলো। কাঁপা কাঁপা আলো ছায়ায় মিলে বিকট ছবির মত লাগছে আঙিনাটা। নিচের দিকে চেয়ে রেইনসফোর্ড দেখল আঙিনার ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে দশ বারোটা প্রকাণ্ড কালো ছায়ামূর্তি। শিউরে উঠলে রেইনসফোর্ড। ওর দিকে ফিরে চাইতেই দপ্ করে সবুজ আলো জ্বলে উঠল হাউন্ডগুলোর চোখে।

‘বেশ ভাল সংগ্রহ, তাই না?’ বলল জেনারেল। ‘সন্ধে সাতটার সময় ছেড়ে দিই এদের প্রতিদিন। কেউ যদি আমার বাড়িতে ঢুকবার চেষ্টা করে, কিংবা বেরোবার, তাহলে অত্যন্ত দুঃখজনক কোনও ঘটনা ঘটবে তার কপালে।’ একটা প্রিয় গানের প্রথম কলিটা গুনগুন করল সে।

‘আর এখন আমি আপনাকে দেখাব নতুন মাথাগুলোর সংগ্রহ। চলুন, আমার লাইব্রেরিতে চলুন, মি. রেইনসফোর্ড।’

‘দেখুন আজকের জন্যে আমাকে মাফ করতে হবে, জেনারেল য্যারাফ্। অত্যন্ত অসুস্থ বোধ করছি আমি।’ সত্যিই গা-টা গুলিয়ে এসেছে রেইনসফোর্ডের সারি সারি মানুষের কাটা মাথা দেখতে হবে মনে করে।

‘আহা, সত্যি?’ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল জেনারেল। ‘তা, এত লম্বা সাঁতারের পর এটা অস্বাভাবিক নয়। একটা রাত নিশ্চিন্তে ঘুমালে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি হলপ করে বলতে পারি, কাল ঘুম থেকে উঠে দেখবেন একবারে চাঙ্গা হয়ে গেছেন। তারপর আমার শিকার করব, কেমন? আজ...’

দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে রেইনসফোর্ড ঘর থেকে, কথা বলেই চলল জেনারেল, ‘আজ রাতে আমার সাথে শিকারের যেতে পারছেন না বলে দুঃখ হচ্ছে আমার। আজকে শিকারটা মোটামুটি ভালই হবে আশা করি—প্রকাণ্ড একজন শক্তিশালী নিগ্রো। দেখে মনে হচ্ছে কৌশলীই হবে। আচ্ছা, গুড্ নাইট মি. রেইনসফোর্ড বিশ্রাম নিন গিয়ে।’

 

বিছানাটা এক কথায় চমৎকার, পাজামাটা অত্যন্ত নরম সিল্কের আর সর্বাঙ্গে রয়েছে ওর অপরিসীম ক্লান্তি। কিন্তু কিছুতেই ঘুমাতে পারল না রেইনসফোর্ড। চোখ খুলে চিত হয়ে পড়ে থাকল সে। একবার মনে হল ওর ঘরের বাইরে বারান্দায় যেন কার পদশব্দ শুনতে পাওয়া গেল। দরজা খোলার চেষ্টা করল সে, কিন্তু পারল না। জানালার ধারে গিয়ে বাইরের দিকে চাইল। বেশ উঁচু ও ঘরটা। প্রাসাদের সব বাতি নেভানো--- চারিদিকটা নির্জন, অন্ধকার। কিন্তু এক ফালি চাঁদ রয়েছে আকাশে, তারই আলোয় আবছা ভাবে দেখা যাচ্ছে আঙিনাটা। ছায়ার মত ঘুরে বেড়াচ্ছে কতগুলো কালো, নিঃশব্দ আকৃতি। ঘুরে বেড়াচ্ছে অতন্দ্র প্রহরী। জানালার ধারে ওর শব্দ পেয়েই থমকে থেমে ওপর দিকে চাইল। লোভ জ্বলে উঠল হাউন্ডগুলোর সবুজ চোখে। বিছানায় ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়ল রেইনসফোর্ড।

অনেক রকমভাবে ঘুম আনার চেষ্টা করল সে। চোখটা একটু লেগে এসেছে ভোরের দিকে, এমন সময় বহুদূরেরর জঙ্গল থেকে পিস্তলের আওয়াজ হতেই কেটে গেল তন্দ্রার ভাবটা।

লাঞ্চের আগ পর্যন্ত জেনারেল য্যারফের সাথে দেখা হল না। চমৎকার টুয়ীডের পরিচ্ছদে গ্রাম্য জমিদারের মত লাগছে তাকে। রেইনসফোর্ডের শরীর কেমন আছে জিজ্ঞেস করল সে যথেষ্ট উৎকণ্ঠার সঙ্গে!

‘আমার নিজের অবস্থাও বেশি ভাল না' বলল জেনারেল। ‘মনে মনে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে আছি আমি, মি. রেইনসফোর্ড। আমার পুরানো অসুখটা আবার দেখা দিয়েছে কাল রাতে।’

রেইনসফোর্ড সপ্রশ্ন দৃষ্টি দেখে বলল সে, ‘অবসাদ। একঘেয়েমি।’

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বলল জেনারেল, ‘কাল রাতের শিকারটা একদম জমেনি। লোকটা ঘাবড়ে গিয়ে সোজা ছুটেছে। ফলে পায়ের চিহ্ন ধরে গিয়ে ওকে বের করতে মোটেই অসুবিধে হয়নি। নাবিকগুলোকে নিয়ে এই অসুবিধা; একে তো স্থূলবুদ্ধি, তার ওপর জঙ্গলে যে কীভাবে চলাফেরা করতে হয় সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। নিতান্ত নির্বোধের মত স্পষ্ট সব কাজ করে। অত্যন্ত বিরক্তিকর। আরেক গ্লাস শ্যাব্লিস দিই মি. রেইনসফোর্ড?’

‘জেনারেল য্যারফ্,’ দৃঢ় কণ্ঠে বলল রেইনসফোর্ড। ‘এখুনি এই দ্বীপ ত্যাগ করতে চাই আমি।’

ঝোপের মত ঘন ভুরু জোড়া উঁচু করল জেনারেল, যেন আঘাত পেয়েছে খুব। বলল, ‘বলেন কী, সবেমাত্র তো এলেন। শিকার করলেন না কিছু না...’

‘আজই যেতে চাই আমি,’ বলল রেইনসফোর্ড। দেখল জোনারেলের ঠান্ডা কালো চোখ চেয়ে আছে ওর দিকে স্থির হয়ে। গভীর মনযোগের সঙ্গে পরীক্ষা করছে ওর মুখের ভাব। হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল জেনারেল য্যারফের চেহারা। বহু পুরানো শ্যাব্লিসের ধুলিমাখা বোতল থেকে আবার রেইনসফোর্ডের গ্লাসটা পূর্ণ করে দিল সে।

‘তাহলে আজ! আজই রাতে শিকারের করতে যাব আমরা--- আপনি আর আমি।’ মাথা নাড়ল রেইনসফোর্ড। ‘না জোনারেল, আমি যাব না শিকারে, মানুষ খুন করতে পারব না আমি।’

কাঁধটা একটু ঝাঁকালো জেনারেল। একটু জাঁক দিয়ে পাকানো আঙুর দাঁতে কাটছিল। বলল, ‘যেমন ভাল বোঝেন। বেছে নেয়ার ভার আপনার ওপর। কিন্তু আমার মনে হয় আমার খেলার ধরনটা আপনার কাছে ইভানের খেলার চাইতে অনেক পছন্দসই হত।’

ঘরের কোণায় দাঁড়ানো দৈত্যটার দিকে চেয়ে একটু মাথা নাড়ল জেনারেল।

‘আপনি কি বলতে চান আমি, মানে, আমাকে...’

আঁতকে উঠল রেইনসফোর্ড। ওকেও যে জাহাজের নাবিকদের মত শিকার করা হতে পারে এটা কল্পনাও করতে পারেনি।

‘জনাব, আপনাকে আগেই বলেছি, শিকার সম্পর্কে কখনও ঠাট্টা করি না। আমি এ ব্যাপারে সব সময়ই বাজে কথা পরিহার করি সযত্নে। আজ অদ্ভুত একটা অনুপ্রেরণা অনুভব করছি আমি। শেষকালে সত্যি আমার সমকক্ষ একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর স্বাস্থ্য পান করবার সযোগ হল।’

গ্লাসটা উঁচু করল জেনারেল, কিন্তু অবাক বিস্ময়ে তার দিকে চেয়ে বসে রইল রেইনসফোর্ড।

‘বিশ্বাস করুন, এই খেলায় আপনি খুব আমোদ পাবেন,’ উৎসাহিত কণ্ঠে বলল জেনারেল। ‘আমার মস্তিষ্কের বিরুদ্ধে আপনার মস্তিষ্ক। আমার জঙ্গল সম্পর্কীয় জ্ঞানের বিরুদ্ধে আপনার জ্ঞান। আমার শক্তি ও সামর্থের জ্ঞানের বিরুদ্ধে আপনার জ্ঞান। আমার শক্তি ও সামর্থের বিরুদ্ধে আপনারটা। এ তো রীতিমত উন্মুক্ত জঙ্গলের দাবা খেলা! আর… জেতার পুরস্কারটাও নেহাত ফেলনা নয়, কী বলেন?’

‘যদি আমি জিতি...’ রেইনসফোর্ড আরম্ভ করেছিল কর্কশ কণ্ঠে, তাকে থামিয়ে দিল জেনারেল।

‘যদি তৃতীয় দিনের মধ্যরাত পর্যন্ত আপনাকে খুঁজে না পাই, তাহলে আমি খুশি মনেই পরাজয় স্বীকার করে নেব, মি. রেইনসফোর্ড। আমার নৌকা আপনাকে আমেরিকার কোনও শহরের কাছে নামিয়ে দিয়ে আসবে।’

রেইনসফোর্ড এখন কী ভাবছে টের পেল জেনারেল।

‘আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন, মি. রেইনসফোর্ড,’ বলল কশাক জেনারেল। ‘একজন ভদ্রলোক এবং স্পোর্টসম্যান হিসেবে আপনাকে কথা দিচ্ছি আমি। অবশ্য এর পরিবর্তে আপনাকেও কথা দিতে হবে যে দেশে ফিরে এই দ্বীপের কথা কাউকে কিছু বলবেন না।’

‘এই ধরনের কোনও কথা আমি দেব না,’ বলল রেইনসফোর্ড।

‘ও। তাই যদি হয়, সেক্ষেত্রে... কিন্তু এখন সেসব আলোচনা করে লাভ আছে কিছু? তিন দিন পর এক বোতল মদ পান করতে করতে এ নিয়ে আলাপ করা যাবে; অবশ্য যদি না...’

মদে চুমুক দিল জেনারেল। তারপর প্রফুল্লভাবে বলল, ‘ইভানের কাছেই শিকারীর পোশাক, খাবার আর একটা ছুরি পাবেন। আপনি আপনাকে কেমাসিন পরবার পরামর্শ দেব, কারণ ওতে পায়ের ছাপ অত্যন্ত অস্পষ্টভাবে পড়ে এবং অনুসরণকারীর পক্ষে খুঁজে বের করার খুবই কষ্টসাধ্য হয়। আরেকটা পরামর্শ আছে—দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যে ঝিলটা আছে ওদিকে যাবেন না। আমরা ওটাকে বলি মৃত্যু ঝিল। চোরাবালি আছে ওখানে। এক গর্দভ নিষেধ সত্ত্বে গিয়েছিল ওদিকে। তা যাক, কিন্তু আসল দুঃখের বিষয় হচ্ছে ল্যাযারাসও গিয়েছিল ওর পিছু পিছু। আমার যে কী কষ্ট লেগেছিল তা আপনাকে বোঝাতে পারব না, মি. রেইনসফোর্ড। ল্যাযারাসকে আমি সবচাইতে বেশি ভালোবাতাম। সবচাইতে সেরা হাউন্ড ছিল ওটা। যাক্, এখন আমাকে একটু মাফ করতে হবে। লাঞ্চের পর প্রতিদিন একটু দিবানিন্দ্রার অভ্যাস আছে আমার। আপনি ঘুমোবার সময় পাবেন বলে মনে হয় না; যত শিগগির সম্ভব রওনা হতে চাইবেন আপনি আমর বিশ্বাস। সন্ধ্যা না নামলে আমি অনুসরণ করব না। দিনের চেয়ে রাতে শিকারে অনেক বেশি রোমাঞ্চ আছে, তাই না? আচ্ছা চলি এখন, মি. রেইনসফোর্ড, আবার দেখা হবে।’ মাথা নুইয়ে কেতাদুরস্ত অভিবাদন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল জেনারেল য্যারাফ্।

অন্য একটা দরজা দিয়ে ঢুকল ইভান। এক হাতে রয়েছে ওর জন্যে খাকী শিকারী পোশাক, একটা ব্যাগে কিছু খাবার আর চামড়ার খাপের ভিতর একট শিকারী ছুরি; অন্য হাতটা রয়েছে লাল কোমরবন্ধের মধ্যে গুঁজে রাখা রিভলভারের বাঁটের ওপর।

দুই ঘণ্টা ধরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে রেইনসফোর্ড। ‘ভয় পেলে চলবে না। মাথাটা ঠিক রাখতে হবে’ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল সে।

 

প্রাসাদের লোহার গেটটা যখন খটাং করে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পিছনে, মাথাটা কেমন ঘুরে উঠেছিল ওর। কেমন একটা আতঙ্কের মত সৃষ্টি হয়েছিল মনের মধ্যে। জেনারেল য্যারফের কাছ থেকে যত দূরে সরে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল, কেবল এই চিন্তাটাই তাড়িয়ে নিয়ে চলেছিল ওকে। এখন একটু সামলে নিয়ে থামল সে। ভাল করে অবস্থাটা একবার পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।

রেইনসফোর্ড বুঝল সোজাসুজি পালানো বৃথা, এভাবে এগালে সাগরের মুখোমুখি উপস্থিত হতে হবে। দ্বীপের চারদিকে সমুদ্র—জঙ্গলের মধ্যেই লুকোবার চেষ্টা করতে হবে।

‘অনুসরণের জন্যে পায়ের চিহ্ন ফেলে যাচ্ছি,’ বিড়বিড় করল রেইনসফোর্ড। জংলা পথটা ছেড়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে বিপথে চলতে আরম্ভ করল সে এবার। তারপর বেশ কিছুদূর গিয়ে একই পথের ওপর কয়েকবার এদিকে ওদিকে দৌড়ে অদ্ভুত একটা ধাঁধা তেরি করল সে। শেয়াল শিকারের যত বিদ্যে পেটে ছিল সব মনে আনার চেষ্টা করল; সেইসাথে শেয়ালের এড়িয়ে যাবার কৌশলগুলোও। বেশ পরিশ্রম করে শিকারীকে দিগ্ভ্রান্ত করার ব্যবস্থা করল রেইনসফোর্ড। এদিকে রাত হয়ে এল। ক্লান্ত রেইনসফোর্ড শাখা-প্রশাখা আর কাঁটা ঝোপের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত শরীরে একটা উঁচু জায়গায় ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে উপস্থিত হল। ও বুঝল, আর কিছু করবার নেই এখানে। যদি শক্তি থাকত, তাও এই অন্ধকারে এগাবার চেষ্টা করা নেহাত বোকামির কাজ হত। বিশ্রামের নিতান্তই প্রয়োজন ভাবল, ‘শেয়ালের খেলা তো দেখলাম, এখন উপকথার বিড়াল সাজতে হবে।’

একখানা প্রকান্ড গাছ পেল সে কাছেই। কোনও রকম পায়ের চিহ্ন না রেখে তরতর করে ওপরে গিয়ে উঠে একটা মোটা ডালের গায়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল সে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম পেয়েই নব উদ্দীপনা আর আত্মবিশ্বাস ফিরে এল ওর; কোথা থেকে একটা নিরাপত্তাবোধও এসে উঁকি দিতে আরম্ভ করল। জেনারেল য্যারফের মত উৎসাহী শিকারীর পক্ষেও তাকে খুঁজে বের করা অসম্ভব, মনে মনে ভাবল রেইনসফোর্ড। একমাত্রা পিশাচ ছাড়া কারও পক্ষে এই রাতে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঐ জটিল পদচিহ্ন ধরে এখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু কে জানে, হয়ত জেনারেল একটা পিশাচই...

ভয়াল একটি রাত এল আহত সাপের মত বুকে হেঁটে। মৃত্যুর মত স্তব্ধ হয়ে আছে অরণ্য। ঘুম এল না রেইনসফোর্ডের চোখে। ভোর রাতে আকাশটা যখন একটু ধূসর হয়ে আসছে, তখন ভয় পাওয়া পাখির চিৎকারে সেদিকে চাইল রেইনসফোর্ড। কী যেন এগিয়ে আসছে, ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয় ধীরে সাবধানী পা ফেলে। যে পথে রেইনসফোর্ড এসেছিল, ঠিক সেই পথ ধরে এগোচ্ছে সেটা। ডালের গায়ে সেঁটে পাতার ফাঁক দিয়ে চেয়ে রইলো রেইনসফোর্ড। দেখলো এগিয়ে আসা বস্তুটি একটা মানুষ। জেনারেল য্যারফ!

চোখ জোড়া সামনে মাটির ওপর অত্যন্ত একাগ্র ভাবে নিবদ্ধ। গাছের প্রায় নিচ এসে থামল জেনারেল, হাঁটু গেড়ে বসে গভীর মনোযোগের সাথে মাটি পরীক্ষা করছে সে। ঠিক চিতাবাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করল রেইনসফোর্ডের, কিন্তু দেখলে জেনারেলের ডান হাতে ছোট একটা ধাতব জিনিস—অটোমিটেক পিস্তল। সামলে নিল সে নিজেকে।

কয়েকবার মাথা নাড়ল শিকারী, যেন মহা ফাঁপড়ে পড়েছে। তারপরই সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোনার কেস থেকে একটা কালো সিগারেটা বের করে ধারাল। উগ্র সুগন্ধী ধোঁয়া সোজা উঠে এল রেইনসফোর্ডের নাকে।

শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় শুয়ে থাকল রেইনসফোর্ড। মাটি ছেড়ে জেনারেলের দৃষ্টি এবার এক ইঞ্চি দু’ইঞ্চি করে উঠে আসছে গাছ বেয়ে ওপরে। বরফের মত জমে গেল রেইনসফোর্ড—কেঁপে উঠল ওর অন্তরাত্মা। কিন্তু শিকারীর তীক্ষণ দৃষ্টি কিছুদূর উঠেই থেমে গেল; ওর বাদামী মুখে একটা সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল। তার সঙ্গে মুখ থেকে ধোঁয়ার একটা চক্র ছাড়ল জেনারেল হাওয়ায়, তারপর হঠাৎ পিছনে ফিরে হাঁটতে শুরু করল। ফিরে গেল সে যে পথে এসেছিল সেই পথে। ছোট ছোট আগছায় লেগে ওর শিকারের বুট থেকে যে শব্দটা আসছিল, ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে গেল সেটা।

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন। একটা গরম কাঁপা কাঁপা স্বস্থির নিশ্বাস বেরিয়ে এল রেইনসফোর্ডের বুকের ভেতর থেকে। একেবারে দমে গেছে সে—অত্যন্ত দুর্বল আর অসুস্থ মনে হচ্ছে নিজেকে। অদ্ভুত! রাতের অন্ধকারেও এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনুসরণ করে পৌঁছেছে জেনারেল এখানে এসে; অথচ আর কেউ এলে দিনের বেলাতেও এই এলোমেলো বিভ্রান্তিকর পদচিহ্ন ধরে এগাতে পারত না। নিশ্চয়ই কোন অলৌকিক ক্ষমতা আছে ওর। নেহাতই দৈববলে বেঁচে গেল রেইনসফোর্ড এ-যাত্রা। একেবারে কাছে এসেও দেখতে পেল না ওকে কশাক জেনারেল। পরমুহূর্তেই আসল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শিউরে উঠল ওর সর্বশরীর। তাই তো!

হাসল কেন জেনারেল? কেন হঠাৎ ঘুরে চলে গেল?

বিশ্বাস করতে চাইছিল না মন, কিন্তু বুঝল, যা ভেবেছে তাই-ই ঠিক—সূর্যোদয়ের মত সত্য। ওকে খেলাচ্ছে জেনারেল। বিড়াল যেমন ইঁদুরকে খেলায়, তেমনি! ভয় কাকে বলে জানল রেইনসফোর্ড এ প্রথম।

‘ভয় পেলে চলবে না—মাথাটা ঠিক রাখতে হবে।’

গাছ থেকে নেমে এল সে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দিয়ে এগোল আবার। মুখের চোহারায় একটা অমনীয় ভাব ফুটে উঠল ওর। দ্রুত চিন্তা চলেছে মাথার ভিতর। শ’তিনেক গজ গিয়েই থামল সে। একটা প্রকাণ্ড মরা গাছ হেলে পড়ে আছে একটা ছোট গাছের ওপর বিপজ্জনক ভাবে। খাবারের ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে খাপ থেকে ছুরিটা বের করে নিয়ে পূর্ণোদ্যমে কাজ আরম্ভ করল রেইনসফোর্ড।

কাজ শেষ করে গজ তিরিশেক দূরে মাটিতে পড়ে থাকা একটা মোটা কাঠের গুঁড়ির ওপাশে শুয়ে পড়ল সে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। আবার আসছে বিড়াল ইঁদুরের সাথে খেলা করতে।

ব্লাড হাউন্ডের মতো স্থির নিশ্চত পায়ে এগিয়ে আসছে জেনারেল য্যারফ্ পদচিহ্ন অনুসরণ করে। কিছু এড়াচ্ছে না তার অনুসন্ধিৎসু চোখ থেকে। প্রতিটা দুমড়ান ঘাসের ডগা, আগাছার মোচড়ান শাখা, শেওলার ওপর পায়ের চিহ্ন, যত অস্পষ্টই হোক না কেন... সবকিচিুই চোখে পড়ছে জেনারেলের। এমন মগ্ন চিত্তে এগিয়ে আসছে যে খেয়াল করার আগেই রেইনসফোর্ডের ফাঁদে এসে পড়ল সে। একটা ডালে পা লাগল ওর। একটু বাইরের দিকে বেরিয়ে ছিল ডালটা--- ওটাই ট্রিগার। পা দিয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথেই বিপদ টের পেল জেনারেল এবং ঠিক বানরের মত ক্ষিপ্র এক লাফে পিছিয়ে এল। কিন্তু আরও দ্রুত সরা উচিত ছিল। মরা গাছটা যে ছোট গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে ছিল, সেটাই কায়দা করে কেটে রেখেছে রেইনসফোর্ড। যেই ট্রিগার স্পর্শ করা হল অমনি মড়মড় করে ভেঙ্গে পড়ল মরা গাছটা মাটিতে। পড়বার সময় প্রচণ্ড একটা আঘাত লাগল জেনারেলের কাঁধে। আর অল্প দেরি হলেই গুঁড়ো হয়ে যেত সে প্রকাণ্ড গাছটার তলায়। টলে উঠল জেনারেল, কিন্তু পড়ে গেল না, রিভলভারটাও ধরে থাকল শক্ত করে। আহত কাঁধটা সেখানে দাঁড়িয়েই ঘসছে সে এখন এক হাতে। অল্পদূরে কাঠের আড়ালে শুয়ে আবার একবার শিউরে উঠল রেইনসফোর্ড ভয়ে। একটা তীক্ষ্ণ বিদ্রুপের অট্টহাসিতে ঝংকৃত হয়ে উঠল আশপাশের জঙ্গল।

‘রেইনসফোর্ড!’ উঁচু গলায় ডাকল জেনারেল। ‘যদি আমার কণ্ঠস্বরের পাল্লার মধ্যে থাকেন, আমার বিশ্বাস তাই আছেন, তাহলে আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন। খুব কম লোকেই জানে কী করে তেরি করতে হয় মালয়ের মানুষ-ধরা ফাঁদ। আমার সৌভাগ্য যে আমি মালাক্কায় শিকার করেছি। আপনি দেখছি রীতিমত আকর্ষনীয় লোক, মশাই। আমি এখন ফিরে যাচ্ছি কাঁধের সামান্য আঘাতটা একটু ব্যান্ডেজ করতে। কিন্তু প্রস্তুত থাকবেন আসছি। আসছি আমি আবার।’

চোট্ খাওয়া কাঁধটা ডলতে ডলতে যেই জেনারেল চোখের আড়াল হল অমনি আবার ছুটতে আরম্ভ করল রেইনসফোর্ড। কয়েক ঘন্টা দিশেহারার মত মরিয়া হয়ে ছটুল সে—বুঝল যেখানেই যাক, নিস্তার নেই ওর। সন্ধে এল, অন্ধকার হয়ে এল চারদিক, কিন্তু এগিয়ে চলল সে। ওর মোকাসিনের তলায় মাটিটা নরম হয়ে উঠল, উদ্ভিদগুলো যেন ঘন ঠেকছে আগর চেয়ে, পেকা মাকড় কামড় দিতে আরম্ভ করল। এমন সময় আর এক পা সামনে এগোতেই পা গেঁথে গেল ওর কাদার মধ্যে। পা বের করবার চেষ্টা করল সে কিন্তু ওর পাটাকে যে শুষে টেনে ধরতে চাইছে পাঁক, মস্ত একটা জোঁকের মত। গায়ের জোরে টান দিয়ে পা বের করে নিল সে কাদার মধ্যে থেকে। বুঝতে পারল কোথায় এসে পৌঁচেছে সে। মৃত্যু-ঝিল, আর তার চোরাবালি।

মুঠো দুটো শক্ত করে রেখেছে রেইনসফোর্ড, যেন নিজের মনোবলটাকে আঁকাড়ে ধরে আছে, একটু ঢিল দিলেই কেউ কেড়ে নেবে। নরম মাটি পেয়ে ওর মাথায় বুদ্ধি খেলল একটা চোরাবালি থেকে ফুট দশেক পিছিয়ে দাঁড়াল সে, তারপর প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মত মাটি খুঁড়তে আরম্ভ করল।

ফ্রান্সে রেইনসফোর্ড মাটি খুঁড়েছে, এক সেকেন্ড বিলম্বে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। তখন যুদ্ধের সময়। কিন্তু আজকের এই মাটি খোঁড়ায় তুলনায় সেটা ছিল ছেলেখেলা। গর্তটা ক্রমেই গভীর হতে থাকল। যখন কাঁধের চেয়ে উঁচু হয়ে গেল পাড়টা, তখন বেরিয়ে এসে গোটাকতক চারাগাছ থেকে অনেকগুলো খুঁটি কেটে নিয়ে এল একটা খুব চোখা ছুরি দিয়ে।

খুঁটিগুলো গর্তের নিচে গেঁথে দিল সে চোখা মুখগুলোর ওপর দিকে করে। আগাছা আর গাছের শাখা দিয়ে একটা শতরঞ্চির মত বুনে ঢেকে দিল সে গর্তের মুখ। তারপর ঘেমে নেয়ে ওঠা ক্লান্তিতে অবশ দেহটা কোনমতে টেনে নিয়ে গিয়ে একটা বজ্রপাতে পোড়া গাছের আড়াল বসে পড়ল।

একটু পরেই টের পেল সে শিকারী আসছে; নরম মাটির ওপর পায়ের থপ্ থপ্ শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। তাছাড়া মৃদু বাতাসে ভেসে আসছে জেনারেলের সিগারেটের সুগন্ধ। রেইনসফোর্ডের কাছ মনে হল যে জেনারেল অস্বাভাবিক দ্রুত এগিয় আসছে; আগের মত প্রতিটা পায়ের চিহ্ন দেখে ধীরে ধীরে আসছে না। ওখানে গুটিসুটি মেরে রেইনসফোর্ড দেখতে পাচ্ছে না জেনারেলকে। গর্তটা রয়েছে ওর চোখের আড়ালে। এক মিনিট তো যেন একটা বছর তারপরেই একটা অদম্য আবেগ অনুভব করল সে—খুশির চোটে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করল ওর। স্পষ্ট শুনতে পেল সে সরু শাখাগুলো মট্ মট্ করে ভেঙে গেল, তীক্ষ্ণ একটা আর্তনাদ উঠল ধারাল খুঁটিগুলো ঠিক জায়গা মত প্রবেশ করতেই। এক লাফে গোপন জায়গা থেকে বেরিয়ে এল সে। পর মূহূর্তেই আঁতকে উঠে সরে গেল পিছনে আবার। গর্ত থেকে তিন ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক, হাতে টর্চ।

‘ভালই বুদ্ধি করেছেন, মি. রেইনসফোর্ড!’ বলল জেনারেল উচ্চকণ্ঠে। ‘আপনার বর্মী বাঘের ফাঁদে আমার সেরা হাউন্ডটা প্রাণ বিসর্জন দিল। এবারও জিতলেন না। দেখা যাক আমার সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে কী করতে পারেন আপনি। বাড়ি ফিরে যাচ্ছি আমি এখন বিশ্রাম নিতে। কৌতুকপ্রদ একটি সন্ধ্যার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’

ভোরবেলা কীসের একটা শব্দ জেগে উঠে রেইনসফোর্ড দেখে ঝিলের ধারে শুয়ে আছে সে। দ্বিতীয়বার শব্দটা কানে যেতেই তড়াক করে উঠে বসল সে। দূর থেকে আসছে শব্দটা, অস্পষ্ট, কিন্তু বুঝল রেইনসফোর্ড, বাঘের মত ছুটে আসছে একদল হাউন্ড।

রেইনসফোর্ড বুঝতে পারছে, দুটো জিনিসের যে-কোনও একটা করতে পারে সে এখন। যেখানে আছে সেখানে বসেই অপেক্ষা করতে পারে, অর্থাৎ আত্মহত্যা করতে পারে; আর না হয় পালাবার চেষ্টা করতে পারে। তাহলে অবশ্যম্ভাবীকে ঠেকানো না গেলেও কিছুক্ষণের জন্যে বিলম্বিত করা হয়। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে চিন্তা করল সে কোনটা করবে। দুটোই প্রায় সমান। হঠাৎ একটা চমৎকার বুদ্ধি খেলে গেল ওর মাথায়। বেল্টটা টাইট করে নিয়ে ঝিল থেকে সরে গেল সে জঙ্গলের মধ্যে। হাউন্ডের হুঙ্কার এগিয়ে আসছে কাছে, আরও কাছে, একেবারে কাছে। একটা গাছে চড়ল রেইনসফোর্ড। সিকি মাইল দূরে দেখতে পেল ঝোপঝাড় নাড়াচড়া করছে। দূর থেকে দেখা গেল জেনারেল য্যারফের পাতলা চেহারাটা। তার একটু সামনেই প্রকাণ্ড একটা কাঁধ দেখা গেল ঝোপের আড়াল থেকে।

দৈত্য-প্রমাণ ইভানকে যেন কী এক অদৃশ্য শক্তি টেনে আনছে এগিয়ে। রেইনসফোর্ড বুঝল ইভানের হাতে ধরা আছে ভয়াল হাউন্ডগুলোর গলার চেইন।

দুই-এক মিনিটের মধ্যেই এসে উপস্থিত হবে। খুব দ্রুত চলছে রেইনসফোর্ডের মাথার চিন্তাগুলো। ইউগান্ডায় শেখা একটা আদিম কৌশলের কথা ভাবছে সে। গাছ থেকে নেমে এল রেইনসফোর্ড। একটা বড়সড় চারাগাছের সাথে ছুরিটা বেঁধে ফেলল অনূরসণকারীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে, ধনুকের মত বেশ অনেকখানি টেনে বাঁকিয়ে বেশ কায়দা করে চারাগাছটা বাঁধল সে বুনো আঙুরের লতা দিয়ে তারপর ছুটল প্রাণপণে। টাটকা গন্ধ পেয়ে আরও জোরে হুঙ্কার ছাড়ল হাউন্ডগুলো। আজকে রেইনসফোর্ড পরিষ্কার বুঝল শিকারী কুকুরের তাড়া খেলে জানোয়াদের কেমন লাগে।

বেশ খানিকদূর গিয়ে দাঁড়িয়ে একটু দম নিয়ে নিচ্ছে সে। হঠাৎ হাউন্ডগুলোর প্রাণ কাঁপানো ডাক থেমে গেল। সেইসাথে রেইন্স্ফোর্ডর হৃৎপিণ্ডও গেল থেমে। নিশ্চয়ই ছুরির কাছে পৌঁছেছে ওরা।

উত্তেজিত রেইনসফোর্ড আছড়ে-পাছড়ে একটা গাছে উঠে চেয়ে দেখল পিছন দিকে। পশ্চাদ্ধাবনকারী থেমে গিয়েছে। কিন্তু যা দেখতে পারে মনে করে গাছে উঠেছে

রেইনসফোর্ড-এর সে-আশা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে গেল। পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দাঁড়িয়ে আছে জেনারেল য্যারফ্। কিন্তু ইভান নেই। ছুরিটার নিশানা একেবারে বিফল হয়নি। সড় সড় করে নেমে এল রেইনসফোর্ড গাছ থেকে। নেমেই টের পেল আবার তাড়া আরম্ভ করেছে কুকুরের পাল।

‘ভয় পেয়ো না! সেঞ্জার, ভয় পেয়ো না! হাঁপাতে হাঁপাতে নিজেকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করল রেইনসফোর্ড। সামনে দৌড়ে চলল সে। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। হঠাৎ গাছের ফাঁক দিয়ে ঠিক সামনে নীল দেখতে পেল সে এক ঝলক। একবারে কাছে এসে পড়েছে হাউন্ডগুলো। সেই ফাঁকটার দিকে এগোল রেইনসফোর্ড। ফোকর গলে ওপাশে পৌঁছল সে। সমুদ্রের পারে এসে দাঁড়িয়েছে সে। প্রাসাদের চূড়াটা দেখা যাচ্ছে ওখান থেকে বিশ ফুট নিচে হিস্ হিস্ গর্জন তুলে পাথরে মাথা কুটছে সমুদ্রতরঙ্গ। একটু দ্বিধা করল রেইনসফোর্ড। হাউন্ডের হঙ্কার এল কানে। খুব কাছে। ঝাঁপিয়ে বসে পড়ল মাটিতে। রুপোর পাত্র থেকে কিছুটা ব্র্যান্ডি পান করল, তারপর একটা সুগন্ধী সিগারেট ধরিয়ে গুনগুন করে একটা গানের কলি ভাঁজল কিছুক্ষণ।

সেই সন্ধ্যায় জেনারেল য্যারফ্ তার মস্ত খাবার ঘরের চমৎকার ডিনার খেল। সেই সঙ্গে পান করল এক বোতল পল রোজার আর আধ বোতল চেম্পারটিন্। দুটো ব্যাপ্যার মনের মধ্যে খচ্ খচ্ করছে বলে পরিপূর্ণ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হল সে। একটা হচ্ছে: ইভানের শূন্যস্থান পূরণ করা খুবই কঠিন হবে; আর অন্যটা, শিকার ওর হাতছাড়া হয়ে গেল। অবশ্য আমেরিকানটাই রণে ভঙ্গ দিল, খেলল না পুরোটা খেলা। খাবি খেয়ে মরাটা কি বেশি আরামপ্রদ হল? মনটা হালকা করবার জন্যে লাইব্রেরিতে কিছুক্ষণ পড়ল সে মার্কাস অরেলিয়াসের লেখা। দশটার দিকে বই বন্ধ করে শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকল সে। দরজা বন্ধ করতে করতে ভাবল সে, অপূর্ব একটা ক্লান্তির আবেশ লেগেছে দেহে। আকাশে চাঁদ আছে, তাই আলো জ্বালার আগে জানালার ধারে গিয়ে উঠানের দিকে চাইল সে একবার। হাউন্ডগুলোকে ডেকে বলল, ‘চিন্তা কী, আরেকদিন হবে।’ তারপর বাতি বেদি দিল ঘরের।

‘রেইনসফোর্ড!’ আঁতকে উঠল জোনারেল। ‘আপনি! আপনি এখানে এলেন কী করে?’

‘সাঁতারে,’ বলল রেইনসফোর্ড। ‘ওই পথেই অনেক তাড়াতাড়ি আসা যায়।’ মৃদু হাসল জেনারেল। বলল, ‘আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন, মি. সেঞ্জার রেইনসফোর্ড। খেলায় আপনি জিতেছেন।’

রেইনসফোর্ড হাসল না একবিন্দুও। ‘আমি এখনও কুকুর লেলিয়ে দেয়া বন্য জানোয়ার রয়ে গেছি,’ গম্বীর কণ্ঠে বলল সে। ‘প্রস্তুত হয়ে নিন, জেনারেল য্যারফ্!’ মাথা নুইয়ে কেতা দুরস্ত অভিবাদন করল জেনারেল। ‘আচ্ছা?’ চমৎকার! দুজনের একজনের মৃতদেহ দিয়ে আজ কুকুরের ভোজ হবে, অন্যজন ঘুমাবে এই চমৎকার নরম বিছানায়। হুঁশিয়ার, রেইনসফোর্ড!’

বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল দুজন একে অন্যের ওপর।

এত আরামের ঘুম আর জীবনে কখনও ঘুমায়নি সে, ভাবল রেইনসফোর্ড সকালে উঠে।

পাঠকেরা যা পড়ছেন